Home কিস অফ বিট্রেয়াল কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৯

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৯

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৯
লামিয়া রহমান মেঘলা

আধার নেমেছে ধরণীজুড়ে।
সন্ধ্যার ম্লান আলো ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। অস্তগামী সূর্যের শেষ আভাটুকুও যেন নিভে আসছে প্রকৃতির বুক থেকে। চারদিকের নীরবতায় এক ধরনের বিষণ্নতা মিশে আছে।
জেবরান দাঁড়িয়ে আছে ছাদের এক কোণে। তার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের অর্ধেকটা ইতোমধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে এসেছে। ধোঁয়ার সরু রেখা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, অথচ জেবরানের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে দূর আকাশের দিকে।
হঠাৎ কায়ান এসে দাঁড়ায় জেবরানের পেছনে।
কারও উপস্থিতি টের পেয়ে জেবরান ধীরে ধীরে ফিরে তাকায়। পেছনে কায়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার মুখে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তি ফুটে ওঠে। সে দ্রুত হাতের সিগারেটটা মাটিতে ফেলে দেয়।
কায়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে জেবরানের কাঁধে হাত রাখে। কণ্ঠে মৃদু প্রশ্ন,

“এটা কবে থেকে ধরলি?”
জেবরান জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটলেও চোখের বিষণ্নতা তা ঢাকতে পারে না।
“মজার ছলেই ভাই, তেমন কিছু নয়।”
কায়ান মৃদু হাসে। সেই হাসির আড়ালে যেন লুকিয়ে থাকে ছোট ভাইয়ের মনের খবর বুঝে ফেলার এক গভীর নিশ্চয়তা।
“আমার থেকে কি লুকাবি তুই?”
কথাটা শুনে জেবরান কিছুক্ষণ নীরব থাকে। তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে।
“সত্যি বলেছেন ভাই। কী লুকাব আপনার থেকে?”
কায়ান আর কিছু বলে না। নিঃশব্দে ভাইকে নিজের কাছে টেনে নেয়। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকে।
তার কণ্ঠে তখন গভীর মমতা,

“জীবন প্রতিটা ক্ষণ সহজ সময় বয়ে আনে না। কখনো কখনো জীবন কিছু পরীক্ষার সম্মুখীন করে মানুষকে। মনে করবি, এটা সেই পরীক্ষা। তুই ঘরে যা। শিমুলের সঙ্গে কথা বল। বাকিটা আমি দেখে নেব।”
কথাগুলো যেন জেবরানের বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত শক্তি ভেঙে দেয়। সে এগিয়ে এসে ভাইকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
কায়ানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। স্নেহভরে ভাইয়ের মাথায় হাত রাখে সে।
“আমি থাকতে এত চিন্তা কেন করিস?”
এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না জেবরান। রীতিমতো কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টগুলো অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।
কায়ান মৃদু হাসে। ভাইয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার স্পর্শে যেন একটাই আশ্বাস লুকিয়ে থাকে, যত কঠিন সময়ই আসুক, জেবরানকে একা সামলাতে হবে না।

গুটি গুটি পায়ে সময় যেন আপন গতিতে এগিয়ে গেল। দেখতে দেখতে কয়েকটি দিন পেরিয়ে গেল, আর সেই সঙ্গে বদলে গেল অনেক কিছু।
আজকাল শিমুলকে যেন আগের সেই মানুষটির মতো মনে হয় না। তার আচরণে এসেছে এক অদ্ভুত পরিবর্তন। আগের মতোই সে সবকিছু করছে, তবে এবার যেন দায়িত্ববোধের চেয়েও বেশি কিছু মিশে আছে তার প্রতিটি কাজে। মন থেকে করছে সবকিছু, আপন করে।
সেরিনও ধীরে ধীরে সেই পরিবর্তনটা অনুভব করছে।
সকালের কোমল আলো তখনও পুরোপুরি ঘরটাকে ভরিয়ে তুলতে পারেনি। ঘুম ভাঙতেই সেরিনের চোখ গিয়ে পড়ে কায়ানের দিকে। লোকটা আজকাল কেমন যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সারাক্ষণ ছুটোছুটি, কাজের ব্যস্ততা, তার ওপর গত রাতের ঘটনাটা।

ভাবতেই সেরিনের মুখটা কুঁচকে যায়।
কাল রাতের দৃশ্যটা সত্যিই ভয়ঙ্কর ছিল।
সেরিন বিরক্ত হয়ে কোমড়ে হাত রাখে।
মেরেই ফেলবে তাকে কবে!
অবশেষে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সে। ফ্রেশ হয়ে শাওয়ার সেরে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। কায়ান তখনও গভীর ঘুমে ডুবে আছে। মুখজুড়ে ঘুমের নিস্তরঙ্গ ছাপ, যেন পৃথিবীর কোনো ব্যস্ততাই তাকে স্পর্শ করতে পারছে না।
সেরিন আর তাকে বিরক্ত করে না। নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
নিচে এসে দেখে, শিমুল আর আহি অনেক আগেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সকালের ব্যস্ততায় বাড়িটা ধীরে ধীরে সরব হয়ে উঠছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে নানা রকম খাবারের গন্ধ, উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে আছে বিয়েবাড়ির ব্যস্ততা।
সেরিন এগিয়ে যেতেই তার চোখে পড়ে আহিকে। শিমুলের মা তাকে দিয়ে নাড়ু পাকাচ্ছেন।
সেরিন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়।

“আম্মা বেগম, আহি আপুকে কেন বসিয়েছেন এসব করতে? বাকিরা আছে তো। আহি আপু, তুমি যাও। আমি করছি।”
আহি মৃদু হেসে সেরিনের দিকে তাকায়।
“আরে হয়ে গেছে সেরিন। আমি নিজেই এসেছি এসব করতে।”
সেরিন মাথা নাড়ে।
“ইটস ওকে। এখন বিয়ের দিন ঘনিয়ে এসেছে। কালকেই বিয়ে। আজ কিছু হলে ভালো লাগবে না।”
কথার সঙ্গে সঙ্গেই সে আহিকে সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়। তারপর নিজেই বাকি পিঠাগুলো বানানোর কাজে লেগে পড়ে।
সময় যেন আজ একটু বেশিই দ্রুত ছুটছে।
এরই মাঝে একে একে কয়েকজন মেহমান এসে উপস্থিত হয়। শিমুলের মা-বাবাও এসে পৌঁছান। বাড়ির পরিবেশ মুহূর্তেই আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। চারদিকে মানুষের আনাগোনা, কথাবার্তা আর বিয়েবাড়ির ব্যস্ততা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

সবকিছু সামলে সেরিন অবশেষে ব্রেকফাস্ট নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে আসে।
ঘরে ঢুকেই তার চোখ আবারও গিয়ে থামে কায়ানের ওপর।
লোকটা তখনও ঘুমিয়ে আছে।
সেরিনের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। ধীর পায়ে সে কায়ানের কাছে এগিয়ে যায়। তারপর কোমল স্বরে তাকে ডাকতে থাকে,
“উঠুন। একটু পর আহি আপুর হলুদের অনুষ্ঠান। আর কত ঘুমাবেন?”
কায়ানের ঘুম ভাঙে কি না, বোঝার আগেই কম্বলের ভেতর থেকে তার হাত বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেরিনকে টেনে নেয় নিজের দিকে।
আকস্মিক ঘটনায় সেরিনের মুখ থেকে বিস্ময়ের শব্দ বেরিয়ে আসে। পরক্ষণেই সে গিয়ে পড়ে কায়ানের নিচে।
কায়ানের বাহু তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে। সেরিন নড়াচড়া করার সামান্য সুযোগটুকুও পায় না।

“ও মা! এগুলো কী? ছাড়ুন আমাকে, বদ লোক।”
কায়ান যেন তার কোনো কথাই শুনছে না। ঘুমজড়ানো মুখটা সেরিনের ঘাড়ের কাছে এনে মৃদু স্বরে বলে,
“গুড মর্নিং, লিটল ওয়াইফি।”
সেরিন বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকায়।
“গুড মর্নিং। এখন ছাড়ুন আমাকে। নিচে কত মেহমান।”
কায়ানের বাহুর বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
“তাতে আমার কী? আমার বউকে আমি আদর করব।”
সেরিন চোখ বড় বড় করে তাকায়।
“এহ, ছাড়ুন। সারা দিন এসব মাথায় ঘুরে আপনার, বদ লোক।”
কায়ানের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে ওঠে। সে সেরিনের ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়।
“উম, ইউ স্মেল লাইক ভ্যানিলা।”
মুহূর্তেই সেরিনের শরীরের ভেতর দিয়ে মৃদু এক শিহরণ বয়ে যায়। তার চোখের পাতায় নেমে আসে অস্বস্তি আর লজ্জার মিশেল।
কায়ান সেই প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে বাঁকা হাসে। তার হাত সেরিনের পেটের ওপর স্থির হয়।

“এখনো কাঁপুনি হয় আমার স্পর্শ পেয়ে?”
সেরিন আর কোনো উত্তর দেয় না। শুধু চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে নেয়।
কায়ান ধীরে ধীরে তার দু চোখের পাতায় চুমু খায়।
চারপাশের পৃথিবী যেন মুহূর্তের জন্য থমকে যায়।
কায়ান আরও কাছে ঝুঁকতে যাবে, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ে।
“সেরিন! সেরিন! কোথায় তুমি?”

আহির কণ্ঠ ভেসে আসতেই সেরিনের সম্বিত ফিরে আসে। সে তড়িঘড়ি করে কায়ানকে ধাক্কা দেয়।
কায়ান তখনও নিজের জগতেই মগ্ন ছিল। আচমকা ধাক্কায় কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে সে বিছানা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়।
দৃশ্যটা দেখে সেরিন আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হেসে ফেলে।
বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কায়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
“ফ্লোরের সঙ্গে রোমান্স করুন আপনি।”
কায়ান মেঝে থেকে উঠে বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকায়।

কিস অফ বিট্রেয়াল পর্ব ৫৮

“রাতে দেখে নেব।”
সেরিন ভেংচি কাটে।
“ব্রেকফাস্ট করে নিয়েন।”
এই বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না সে। দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ মিলিয়ে যেতেই কায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দরজার দিকে তাকিয়ে থেকে তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক বাঁকা হাসি।
তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দুষ্টুমি।
“ভিলায় নিয়ে যাই একবার। এরপর দেখব, কোথায় উড়ো তুমি।”

কিস অফ বিট্রেয়াল শেষ পর্ব