ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১
মারিয়াম ফুল
আটলান্টিকের ওপর দিয়ে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর বিমানটি তখন ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ডানা মেলেছে। নিউইয়র্ক অনেক আগেই দিগন্তে মিলিয়ে গেছে, সামনে অন্তহীন নীল জলরাশি। কেবিনের ভেতরে ম্লান নীল আলো। যাত্রীদের কেউ ঘুমে বিভোর, কেউ বা হেডফোনে গান শুনছে। সব মিলিয়ে এক থমথমে প্রশান্তি।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ফালাফালা করে দিয়ে কেবিনের শেষ প্রান্ত থেকে ধাতব কিছু আছড়ে পড়ার কর্কশ শব্দ শোনা গেল। পরক্ষণেই বাতাসের বুক চিরে বেরিয়ে এলো এক নারী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ চিৎকার! একজন এয়ার হোস্টেস দৌড়ে পেছনের দিকে যেতেই হ্যাঁচকা টানে তাকে পাশের সিটের ওপর ফেলে দেওয়া হলো।
মুহূর্তের মধ্যে কেবিনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাতজন লোক সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তারা সাধারণ যাত্রী সেজে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিল। সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা, চোখের মণি দুটো বন্য জানোয়ারের মতো অস্থির। একজনের হাতে ধারালো কিছুর ঝিলিক, অন্যজন একটি ইলেকট্রনিক জ্যামার উঁচিয়ে ধরল।
“কেউ নড়বেন না! যে নড়বে, তার খুলি আর ঘাড়ে থাকবে না!”
কর্কশ কণ্ঠের সেই হুঙ্কারে পুরো কেবিনে মুহূর্তের মধ্যে হিমাঙ্ক নেমে এলো। হাইজ্যাকারদের তিনজন ককপিটের দিকে পা বাড়ালো। সিসিটিভি স্ক্রিনে কেবিনের বিশৃঙ্খলা ধরা পড়তেই ককপিটের ভেতর কো-পাইলটের হাত কেঁপে উঠল।
প্রধান চালকের আসনে বসা মানুষটি কিন্তু নির্বিকার। তার দীর্ঘ বলিষ্ঠ আঙুলগুলো একবার কন্ট্রোল প্যানেল ছুঁয়ে গেল। সে কোনো আর্তনাদ করল না, কোনো প্রশ্নও করল না। শুধু একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। সে জানে, এই মুহূর্তে সে কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, সে এই বিমানের শেষ রক্ষাকর্তা।
ইন্টারকম অন হলো। পুরো বিমানে একটা ভরাট, গম্ভীর কিন্তু অসম্ভব শান্ত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো:
“সবাই নিজের জায়গায় স্থির থাকুন। মাথা নিচু করুন এবং সিটবেল্ট শক্ত করে বাঁধুন। শান্ত থাকুন।”
সেই কণ্ঠে এমন এক সম্মোহনী শক্তি ছিল যে, আতঙ্কিত যাত্রীরা অবচেতনে মাথা নিচু করে ফেলল। ঠিক তখন মাঝের সারি থেকে একজন অফ-ডিউটি সিকিউরিটি অফিসার রুখে দাঁড়ালেন। শুরু হলো ধস্তাধস্তি,ককপিটে বসা সেই মানুষটি বুঝল, ভেতরে বসে থেকে এই লড়াই জেতা যাবে না। সাতজন প্রশিক্ষিত হাইজ্যাকারকে দমানো কঠিন। সে অটোপাইলট সিস্টেম রি-চেক করে ধীরপদে উঠে দাঁড়ালো।
ককপিটের আর্মার্ড ডোর যখন খুলল, তখন হাইজ্যাকাররা ভাবেনি ভেতর থেকে স্বয়ং “যমদূত” বেরিয়ে আসবে। সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম, কাঁধে চারটে গোল্ডেন স্ট্রাইপ। দীর্ঘকায় শরীরটা দরজায় দাঁড়াতেই কেবিনের আলো যেন তার ওপর এসে পড়ল। ক্যাপের ছায়ায় তার মুখটা তখনো অস্পষ্ট।
হাইজ্যাকারদের লিডার দাঁত কিড়মিড় করে চিৎকার করল, “পিছনে যা ক্যাপ্টেন! নাহলে এই অফিসারকে শেষ করে দেব!”
ক্যাপ্টেন এক পা এগিয়ে এলো। তার ঠাণ্ডা গলার স্বর পুরো কেবিনে গমগম করে উঠল:
“এই ফ্লাইটে কোনো নির্দেশ দিলে সেটা আমি দিই। আর তোমাদের জন্য আজকের শেষ নির্দেশ হলো—অস্ত্র নামাও। কারণ আর এক পা যদি এগোও, তবে এই প্লেনটা যেমন গন্তব্যে পৌঁছাবে না, তোমরাও জীবিত মাটিতে নামবে না।”
হাইজ্যাকারের দ্বিধাগ্রস্ত মুহূর্তটাকেই ক্যাপ্টেন কাজে লাগাল। চোখের পলকে সে বাম দিকে এক দুর্দান্ত স্লাইড নিয়ে সামনের হাইজ্যাকারের কবজিতে একটা ব্লান্ট ফোর্স আঘাত করল। প্রচণ্ড শব্দে লোকটার হাত থেকে অস্ত্রটা ছিটকে পড়ল।
ক্যাপ্টেনের লড়াই ছিল দেখার মতো। সে একা তিনজনকে সামলাচ্ছিল। একের পর এক নিখুঁত পাঞ্চ আর কিকে হাইজ্যাকাররা পর্যুদস্ত হয়ে পড়ল। সিটের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এক হাইজ্যাকার ছিটকে গিয়ে পড়ল পাশের ফুড-ট্রলির ওপর। ক্যাপ্টেনের এই রণমূর্তি দেখে সাধারণ যাত্রীরাও সাহস ফিরে পেল। আরও চার-পাঁচজন সুঠামদেহী যাত্রী মিলে বাকি হাইজ্যাকারদের জাপটে ধরল।
কয়েক মিনিটের রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের পর সাতজন হাইজ্যাকারকেই সিটবেল্ট আর হাতের কাছে পাওয়া দড়ি দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হলো। পরিস্থিতি সামলে সেই ক্যাপ্টেন দ্রুত ককপিটে ফিরে গিয়ে কন্ট্রোল নিল।
প্লেনটা মসৃণভাবে চট্টগ্রামের রানওয়েতে অবতরণ করল।চাকা স্পর্শ করল মাটিতে।কেবিনে ধীরে ধীরে স্বস্তির নিঃশ্বাস আবারো ফিরে এলো ।যাত্রীরা হাসি দিয়ে একে অপরকে দেখছে, ধন্যবাদ জানাচ্ছে।রানওয়ের পাশে বিশেষ একটি প্রভাতের মতো আলো জ্বলছে।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে যখন ফ্লাইটটা ল্যান্ড করল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কিন্তু ঘটনা ততক্ষণে ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বিমানে থাকা এক তরুণীর তোলা ভিডিও এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি। সোশ্যাল মিডিয়া ততক্ষণে তোলপাড়।
ফেসবুক, টুইটার (X), আর টিকটকে একটাই হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং— #HeroInTheSky। নিউজ পোর্টালগুলোর হেডলাইন:
আকাশে মৃত্যুঝুঁকি, শত যাত্রীকে বাঁচিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন বাঙালি ক্যাপ্টেন
সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্টের বন্যা বয়ে যাচ্ছে:
“কে এই ক্যাপ্টেন? উনার নাম কি! নিউ ক্রাশ আনলকড!”
বিমান থেকে যখন সেই মানুষটি ধীরপায়ে নিচে নেমে এলো, তখন চারদিকে হাজারো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ডজনখানেক নিউজ চ্যানেলের মাইক তার সামনে। ডিসি সাহেব একগাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। চারদিকে তখন শোরগোল—কে এই বীর?
ডিসি সাহেব হাত বাড়িয়ে দিয়ে উচ্চস্বরে বললেন, “আপনার মতো সাহসী মানুষ আমাদের গর্ব। আপনার সম্মাননা গ্রহণ করুন…”
ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষটি তার ক্যাপটা খুলল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে প্রথমবার পরিষ্কার ফুটে উঠল তার তীক্ষ্ণ নাক, উজ্জ্বল গায়ের রঙ আর গভীর শান্ত চোখজোড়া। সে মৃদু হেসে নিজের পরিচয় দিল:
“ধন্যবাদ। আমি ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র।”
মুহূর্তের মধ্যে মিডিয়ার সব ক্যামেরা আর শত শত মানুষের নজর গিয়ে স্থির হলো তার ওপর। দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টার এই রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর অবশেষে দুনিয়া চিনল তাদের নতুন হিরোকে— যার নাম এখন সবার মুখে মুখে, রাইহাম চৌধুরী রুদ্র।
