ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৮
মারিয়াম ফুল
গুদামের সেই রক্তভেজা মেঝে থেকে মির্জা মেহেরকে অমানবিক নিস্তব্ধতায় পাঁজাকোলা করে গাড়িতে তুলল। মেহের বাধা দিল না, তার সেই শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। তার শ্বেত শুভ্র ওড়না তখন অন্তুর বুকের তাজা রক্তে রাঙানো। সায়েদ ভিলার ফটক যখন খুলল, তখন রাত শেষের পথে। মেহের যখন সেই বিধ্বস্ত অবস্থায় ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়াল, উপস্থিত সবার বুকের ভেতরটা এক অজানা আতঙ্কে কেঁপে উঠল।
মির্জা ড্রয়িং রুমের মাঝখানে এসে গগনবিদারী অট্টহাসি দিল। সে নূর আর মেঘলাকে টানতে টানতে সবার সামনে আনলো । মির্জার চোখে তখনও খুনের নেশা। সে কামিনী দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল—
“দেখে নাও আম্মা, তোমার সোনার মেয়েকে এই হারামি গুলা পালাতে সাহায্য করেছে…”
মির্জা নূরের দিকে এগিয়ে গিয়ে তার গলার ওড়নাটা টেনে ধরল। নূর তখন ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, ভয়ে তার ফ্যাকাসে মুখটা নীল হয়ে গেছে। মির্জা কোনো দয়া দেখাল না, সবার সামনে ঘোষণা করল
“এই বিশ্বাসঘাতক মেয়েকে আমি আজই তালাক দেব!যে আমার কথা শোনে না, আমার রক্তকে তার পেটে বয়ে বেড়ানোর কোনো অধিকার নেই ওর।”
এরপর মির্জা মেঘলার দিকে ফিরে সজোরে এক চড় বসিয়ে দিল। চড়ের তীব্রতায় মেঘলা মেঝেতে ছিটকে পড়ল। মির্জা হিসহিস করে বলল,
“আর এই আপদটাকে কালকের সূর্য ওঠার আগেই অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি করা হবে। আমৃত্যু জেল খাটবে ও এখানে…”
মেহের এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু নূর ভাবির সেই অসহায় মুখ দেখলে তাকিয়ে রইল, যার বাবা-মা কেউ নেই – এতিম এক মেয়ে যাকে কোন এক সময় ভালোবেসে মির্জা বিয়ে করেছিল, আজ সেই মির্জা নির্দয় হয়ে তাকে বারবার আঘাত করছে —আর মেঘলার ওপর এই পৈশাচিক নির্যাতন দেখে মেহেরের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। সে বুঝতে পারল, মির্জা খুব সূক্ষ্মভাবে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে লক্ষ্য বানিয়েছে। মেহের নিজের জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, কিন্তু তার ভালোবাসার জন্য অন্য নিরপরাধ মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে—এই পাপ সে বইতে পারবে না।
মেহের আর্তনাদ করে উঠল, “থামো….ভাইয়া তুমি থামো। তুমি যা চেয়েছিলে তাই হবে। আমি… আমি এই বিয়েতে রাজি। তুমি, ছেড়ে দাও ওদের।”
মির্জার ঠোঁটে এক পৈশাচিক জয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে জানত মেহেরকে বাগে আনার এটাই একমাত্র ব্রহ্মাস্ত্র। চৌধুরী পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব আর ব্যবসার দাপট সায়েদ পরিবারের জন্য এক বিশাল সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে আজ মেহেরকে কোরবানির পশু হতে হচ্ছে।
মেহের তার বাবা, মা আর ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো অশ্রু নেই, আছে শুধু এক সমুদ্র হিমশীতল ঘৃণা। সে মনে মনে বলে উঠলো —
‘আজ থেকে এই সম্পর্কের সুতোগুলো আমি নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেললাম। তোমরা আমার জন্মদাতা হতে পারো, কিন্তু আমার আপন কেউ নও। তোমরা সবাই আমার কাছে আজ থেকে মৃত।’
মেহের নিজের অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেকে শান্ত করল। এই সায়েদ ভিলার নরককুণ্ডে থাকলে মির্জা যেকোনো সময় তার বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। তার চেয়ে চৌধুরী পরিবারের অন্দরমহলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলা অনেক বেশি নিরাপদ। সে জানে না কার সাথে তার বিয়ে হচ্ছে। গত কয়েকদিনের ধ্বংসলীলায় সে নিউজ বা মিডিয়া দেখার কোনো সুযোগ পায়নি। বিমানে মাস্ক পরা সেই উদ্ধত রুদ্রই যে তার হবু স্বামী, তা মেহেরের কল্পনারও অতীত।
মেহের শান্ত গলায় কামিনীর দিকে তাকিয়ে বলল ,
“যার সাথে আমার বিয়ে হবে… তার সাথে অন্তত একবার কথা বলতে চাই আমি।” কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে যায়। তার চোখে কোনো অবাধ্যতা ছিল না, ছিল শুধু একটুখানি নিশ্চয়তা খোঁজার চেষ্টা। কারণ মেহের কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করতে চায় না—না নিজের সাথে, না অন্য কারও সাথে।
কিন্তু ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
মির্জা কপাল কুঁচকে তাকালেন, আর কামিনী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলেন,
“তা সম্ভব না, মেহের।”
তার গলায় ছিল কঠোরতা, সাথে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
“সে এখন দেশের বাইরে… আর তাছাড়া,” একটু থেমে আবার বললেন,
“সে নিজেও দেখা করতে চায় না। বিয়েতে রাজি হয়েছে—আমাদের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।”
মেহের মাথা নিচু করল।
মেহেরকে বন্দী করে হলো তার নিজেরই ঘরে
শব্দগুলো খুব সহজ ছিল, কিন্তু তার ভেতরে কোথাও যেন একটা নীরব ভাঙন ছড়িয়ে পড়ল।
নীরব ভাঙনটা এবার আর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকল না—চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।মেহের দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছিল অদ্ভুতভাবে, যেন প্রতিটা শ্বাসে জমে আছে হাজারটা না-বলা কথা।
হঠাৎ করেই সে চিৎকার করে উঠল—
“অন্তু… কই তুমি, অন্তু?
এভাবে চলে যাওয়ার কথা ছিল না তো…
কষ্ট দিয়ে এভাবে চলে গেলে?
আমাকে একা রেখে?”
তার গলা কেঁপে উঠল—
“তুমি জানতেই পারলে না… আমাদের জীবনে নতুন এক অতিথি আসছে…
“আচ্ছা অন্তু, বলো তো… আমি কী উত্তর দেব?
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৭
যেদিন ওই বাচ্চাটা জিজ্ঞেস করবে—‘বাবা কোথায়?’আমি কী বলব তখন?
আমাদের তো একটা ছোট্ট সংসার হওয়ার কথা ছিল… তবু কেন… কেন তুমি চলে গেলে? তুমি ছেড়ে গেছো অন্তু, তুমিও ছেড়ে গেছো… আমি তোমাকে ক্ষমা করব না, আমাকে উত্তর দিতেই হবে তোমাকে। এভাবে আমাকে ছেড়ে তুমি পৃথিবী থেকে চলে গেলে অন্তু… কেন গেলে? কী দোষ ছিল আমার?
