Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ১৩

খান সাহেব পর্ব ১৩

খান সাহেব পর্ব ১৩
সুমাইয়া জাহান

ঘড়ির কাঁটায় দুপুর দুটো বাজে। শেরাজরা সেই সকালে নাস্তা করে ঘুরতে বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি। সুমু বিষণ্ন মনে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার বাড়ির গেটের দিকে। হাসি বেগম অনেকবার এসে ডেকে গেছেন। শীতকাল হলেও দুপুরের রোদের তেজ একটু বেশি থাকে। দুপুরে খেয়ে সকলে ভাত ঘুম দিচ্ছে। সুমুর দুপুর বেলায় ঘুম আসেনা। তাই সে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ গেটের দিক থেকে চোখ সরিয়ে দূরে গাছে মগডালের ওপর বসা পাখি দুটির দিকে চোখ গেল তার। পাখি দুটি হয়তো প্রেম করছে। নয়তো একজন আরেকজনের মাথা নিয়ে বুকের সাথে মিশিয়ে অপরজনকে আগলে রেখেছে। সুমু মনে প্রশ্ন জাগল,

“আগলে রেখেছে? হ‍্যাঁ সত্যিতো আগলে রেখেছে।”
নিজের মনকে প্রশ্ন করে, নিজেই নিজের মনকে প্রশ্নের উত্তর দিল। হঠাৎ আবারও তার মনে নতুন প্রশ্ন জাগল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“আচ্ছা আমাকে কি কেউ কোনোদিনও আগলে রাখবে? ভালোবাসবে? আচ্ছা! কেউ কি কোনোদিনও এক আকাশ সমপরিমান ভালোবাসা নিয়ে আমার সামনে আসবে? কে আসবে? খান সাহেব?”
নামটা বলেই আফসোসের সাথে হাসল সুমু। সেই সাথে তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস। সে আবারও বলল,
“কি যোগ্যতা আছে আমার, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার। কোথায় সে আর কোথায় আমি। চাঁদকে দূর থেকেই দেখতে হয়। তাকে ধরতে চাওয়া মরিচিকা ছাড়া কিছুইনা। খান সাহেবও আমার কাছে মরিচিকা।আমাকে কোনদিক দিয়ে তার সাথে মানায় না। সে তো একফালি চাঁদের টুকরো। আর আমি…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সুমু। গাড়ির শব্দ কানে আসতেই গেটের দিকে তাকাল সে। সে বলল,

“রাহিন ভাইয়ারা এসে গেছে। তার মানে খান সাহেবও এসেছে।”
কথাটা বলে দৌড়ে নিচে নামল সুমু। রাহিনরা বাড়ির ভেতরে ঢুকল। সুমু করিডরে দাঁড়িয়ে দেখছে। রাহিন ও তার ফ্রেন্ডরা সবার জন‍্য গিফট নিয়ে এসেছে।
ড্রয়িংরুমে কেউ নেই। সকলে ঘুমাচ্ছে। হাসি বেগম জেগে ছিলেন রাহিনদের জন‍্য। তিনিও কিছুক্ষণ আগে সুমুকে বলে ঘুমাতে চলে গেছে। সুমু করিডর ছেড়ে নিচে নেমে এল। রাহিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাইয়া! তোমরা গোসল করে খেতে আসো। বাড়ির সকলে ঘুমাচ্ছে। আমি তোমাদের খাবার সার্ভ করে দিচ্ছি।”
রাহিন সুমুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“তোকে আর কষ্ট করত‍ে হবেনা সুমু। আমরা খেয়ে এসেছি। তুই ওপরে যা। আমরা ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিব।”
সুমু “আচ্ছা” বলে চলে গেল। রাহিনরাও রুমে চলে গেল। শেরাজ নিজের রুমে এসে হাতের ঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রাখল। ফোনটা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় মেসেজ দিয়ে, গায়ের শার্ট খুলে টাওয়েল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল শাওয়ার নিতে। বেশকিছু সময় পর মাথা মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল ওয়াশরুম থেকে। পরনে তার শুধু টাওয়েল। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা মুছতে ব‍্যস্ত হয়ে পড়ল। ঠিক তখনই রুমের দরজায় নক পড়ল। শেরাজ অনুমতি দিল রুমে ঢোকার। সুমুর হাতে চায়ের কাপ। সে মাথা নিচু করে রুমে ঢুকল। এখনো মাথা তুলে তাকায়নি সে। মাথা নিচু করেই হেঁটে টেবিলের কাছে গিয়ে টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা রাখল। সে মাথা তুলে তাকাতে তাকাতে বলল,

“আচ্ছা! এই অসময় চা খায় কে বলুন’তো? এই নিন আপনার চা..আ…আ….”
চক্ষু চরোগাছ সুমুর। আপনাআপনি মুখ হা হয়ে গেল তার। চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখবে কল্পণাও করেনি। ভিডিওতে দেখলেও লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিত সুমু। কিন্তু আজ? লজ্জায় মরি-মরি অবস্থা সুমুর। চোখের সামনে তার খান সাহেব শুধু একটা টাওয়েল পড়ে ড্রসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফর্সা পিঠের ওপর বিন্দু বিন্দু পানি মুক্তার দানার মতো চিকচিক করছে। চুলগুলো কপালের ওপর লেপ্টে আছে, তা দিয়ে চুয়ে চুয়ে পানি পড়ছে। কতোটা স্নিগ্ধ লাগছে দেখতে। পেশিবহুল হাতগুলো ফুলে আছে।
“আমাকে পর্যবেক্ষণ করা হয়ে গেলে, আসতে পারো। আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে সামনে এসো, বাকিটাও খুলে দিচ্ছি। ভালো করে পর্যবেক্ষণ করো।”
হঠাৎ শেরাজের কন্ঠে ধ‍্যান ভাঙাল সুমুর। লজ্জায় আর তাকিয়ে থাকতে পারল না সে। চোখ নামিয়ে নিয়ে অবাক হয়ে বলল,

“বাকিটাও খুলে দেবেন মানে?”
শেরাজ আয়নার মধ্যে দিয়ে সুমুর লজ্জা পাওয়া মুখটা দেখল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে সে বলল,
“আমি জানতাম, তোমার মোটা মাথায় আমার এমন সহজ কথাটা ঢুকবেনা। তাই বলছি আমার সামনে এসো। খুলে দিয়ে তোমাকে বোঝাচ্ছি যে, আমি বাকিটা বলতে কি বুঝেয়েছি।”
“এই মুহুর্তে সুমুর মনে হচ্ছে কথাটা শোনার সাথে-সাথে জমিন ফেটে চৌচির হয়ে গেল না কেনো, তাহলে সুমু মাটির নিচে গিয়ে নিজেকে লুকাতে পারত। ইশশ্ কি লজ্জা! এই খান সাহেবটা এতো অসভ্য। আগে জানলে কোনোদিনও ওনার সামনে আসতাম না।”
কথাটাগুলো মনে মনে ভেবে ছুট্টে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সুমু। শেরাজ সুমুর যাওয়ার পানে তাকিয়ে হেসে বলল,
“এই অসয়মের চা খাওয়ার কারণ তুমি কি কোনোদিনও বুঝবে, সুইটহার্ট? তোমাকে একপলক আলাদাভাবে দেখার পিপাসা এই চায়ের মাধ্যমে মেটে আমার।”

সন্ধ্যায় ড্রয়িংরুমে সকলে উপস্থিত। আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব, শামীম সাহেব, ইফতিয়াক সাহেব, নয়ন সকলে সোফায় বসে খোশগল্পে মজেছে। মিনা বেগম, হাসি বেগম, খুশি বেগম সবার জন‍্য চা, নাস্তা বানাচ্ছেন। সুমুরা সকলে মাইশার রুমের আড্ডা দিচ্ছে।
শেরাজরা সকলে নিচে নেমে এলো। হাতে সকলের শপিংব‍্যাগ। রাহিন রাইফকে বলল,
“এই রাইফ! যা তো, বাকি সবাইকে ডেকে নিয়ে আয়।”
রাইফ দৌড়ে চলে গেল সুমুদের ডাকতে। সুমুরা আড্ডায় মেতেছে। তাদের টপিক ঘুরতে যাওয়া নিয়ে। সকালেই সকলে মিলে ঠিক করেছে কক্সবাজার যাবে। রাইফ রুমে এসে বলল,
“আপু তোমরা সকলে নিচে চলো। রাহিন ভাইয়া ডাকছে। রাহিন ভাইয়া ও তার সব ফ্রেন্ডদের হাতে শপিংব‍্যাগ। মনে হয় সকলকে গিফট দেবে। চলো, চলো, তাড়াতাড়ি নিচে চলো।”
কথাটা বলে রাইফ আবারও দৌড়ে চলে গেল। মাইশারাও আর বসে থাকল না। উঠে পা বাড়াল ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে। সুমু বাদে সকলে চলে যাচ্ছিল। সামিয়া সুমুকে বসে থাকতে দেখে বলল,

“সুমু আপু তুমি বসে আছো কেনো? নিচে যাবেনা?”
সুমুর মনে পড়ে গেল দুপুরের কথা। সে বালিশে মাথা গুঁজে দিয়ে বলল,
“না রে, তোরা যা। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।”
মাইশা সুমুর কথাশুনে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“ঘুম পাচ্ছে মানে? এইতো দিব্বি আমাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলি। তখনতো তোর চোখে কোনো ঘুম ছিলিনা। যেই নিচে যাবার কথা শুনলি, ওমনি ঘুম পেয়ে গেল। ব‍্যাপারটা কি তোর বলতো? নিচে কেনো যেতে চাইছিস না?”
সুমু বোকার মতো হেসে বলল,

“আসলে কি বলোতো আপু, ঘুম আমার তখনও পাচ্ছিল। কিন্তু তোমাদের বুঝতে দেয়নি। তখন আড্ডা দিচ্ছিলাম তাই ঘুমটা দুই চোখের কাছে খুব একটা পাত্তা পায়নি। এখনতো আড্ডাটা ভেঙ্গে গেছে। আর ঘুমটাও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। আড্ডাটা ভেঙে যাওয়াতে ঘুমটাও পাত্তা পেয়ে গেল, আর দুই চোখে এসে ভর করল। এখন আর কোনো ভাবেই আমি এই ঘুমকে ফেরাতে পারব না। তোমরা যাও।”
কথাগুলো বলেই চোখ বন্ধ করল সুমু। মাইশা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে এইসব সুমুর নিচে না যাবার বাহানা। মাইশার মাথায় একটি প্লান আসলো। সে মুখে বলল,
“আচ্ছা! সুমু, তাহলে তুই ঘুমা। আমরা যায়।”
মাইশা সকলকে নিয়ে রুমের বাহিরে গেল, কিন্তু নিচে গেল না। সে সকলকে নিয়ে দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু মাইশাদের চলে যেতে দেখে, বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠল। আর তখনি হুড়মুড়িয়ে মাইশারা রুমে ঢুকল। নাজমিন এসেই বলল,

“সুমু আপু! তুমি নাকি ঘুমাও? এইটা তোমার ঘুম? উঠে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে ঘুমাচ্ছো তুমি?”
সামিয়া হেসে বলল,
“আরে নাজমিন বুঝিসনা, আপু ট্রেন্ড বের করছে। নতুন স্টাইলে ঘুমানোর ট্রেন্ড।”
সামিয়ার কথা শুনে সকলে হেসে উঠল। মাইশা এগিয়ে এসে বলল,
“ঘুম না ঘোড়ার ডিম পেয়েছে ওর।”
রাইশা বিরক্তির নিয়ে তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। সে মুখে বলল,
“এতো ডং করার কি মানে সুমু আপু? তোমার ডং দেখলে বিরক্ত লাগে আমার। সবার কাছে ইম্পর্টেন্স পাওয়ার জন‍্য, এসব ইচ্ছা করে করো তাইনা?”
ইফতিয়া ব‍্যাঙ্গ করে হেসে বলল,

“ঠিক বলেছিস রাইশা। এইসব ও ইচ্ছে করেই করে। যাতে সবাই ওকে দাম দেয়। যত্তসব নেকামি।”
রাইশা আর ইয়তিয়ার কথাশুনে সকলের মুখের হাসি নিভে গেল। মাইশা ইফতিয়া আর রাইশাকে ধমকে উঠে বলল,
“এইসব কি ধরনের ব‍্যবহার তোদের। কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, জানিস না? কোনো ম‍্যানার্স শিখিসনি তাইনা?”
রাইশা বোনের ধমক খেয়ে আর কোনো কথা বলল না। ইফতিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“সরি আপু! তবে এতো নেকামি দেখলে গা জ্বলে যায়। তাই তখন আর ম‍্যানার্স ঠিক থাকেনা।”
সুমু হাসছে ওদের দুজনের কথা শুনে, যেন ওদের দুজনের কথা শুনে খুব মজা লাগছে তার। সে মুখে হাসি রেখেই ইফতিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আমার নেকামি দেখলে যদি তোর গা এতোই জ্বলে যায়, তাহলে দেখিসনা আমার নেকামি। আমি কি তোকে ইনভাইট করে নিয়ে আসি আমার নেকামি দেখার জন‍্য।”
ইফতিয়া সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“শোন! চোখের সামনে নেকামি করলে দাওয়াত দিয়ে আনতে হয়না।”
সুমু আবারও হেসে বলল,

“তাহলে রাখিস কেনো তোর চোখদুটো আমার দিকে? চোখ বন্ধ করে রাখতে পারিস না? আর রাইশা! তোর যখন এতোই বিরক্ত লাগে তাহলে তুইও তাকাসনা আমার দিকে। তাহলে তো আর দেখতে হয়না আমার ডং, নেকামি। আর শোন! নেকামি, ডং মেয়েরাই করে, ছেলেরা না। আর আমি যেহেতু মেয়ে, আমি তো নেকামি,ডং করবোই। তোদের ইচ্ছা করলে তোরাও করতে পারিস।”
সুমুর কথাশুনে আর একমিনিটও দাঁড়াল না ওরা। দুজনেই হনহন করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। ওরা দুজন বেরিয়ে যেতেই আবারও উচ্চস্বরে হেসে উঠল সুমুরা। মাইশা গিয়ে সুমুকে বেড থেকে টেনে নামাল। তারপর চারজনেই চলে গেলে ড্রয়িংরুমের উদ্দেশ্যে।

ড্রয়িংরুমে অলরেডি সকলকে গিফট দেওয়া হয়ে গেছে। মাইশারা আসতেই ওদের গিফট দিল রাহিন। আনোয়ার সাহেব বার বার করে বলছেন, এইসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না। রাহিনের সব ফ্রেন্ডরা সকলের জন‍্য গিফট এনেছে। শেরাজ পুরুষদের জন‍্য পাঞ্জাবী, মহিলাদের জন‍্য শাড়ি আর ছোটদের জন‍্য ড্রেস এনেছে। আইয়ুব সকলকে জুতা গিফট করেছে। এইভাবে এক এক জনে এক একটা জিনিস গিফট করেছে। শেরাজ সবাইকে গিফট দিলেও সুমুকে দেয়নি। আইয়ুর জিঙ্গাসা করলে বলেছে, সুমুর কথা তার মনে ছিল না। অন‍্য একদিন ওর জন‍্য নিয়ে আসবে। কিন্তু হাসি বেগম বারন করেছে শেরাজকে। তিনি বলেছেন, আর কিছু না কিনতে। আইয়ুবরা ঠোঁট টিপে হাসছে। ওরা খুব ভালো করেই জানে শেরাজ সবার জন‍্য গিফট আনতে ভুলে গেলেও সুমুর জন‍্য গিফট আনতে কিছুতেই ভুলবেনা। এদিকে, সুমুর অভিমান হয়েছে খুব। সে তো নিচে আসতেই চাইছিল না। মাইশারাই জোর করে ওকে নিয়ে এলো। এখানে না আসলে এতো বড় অপদস্ত হতে হতোনা তাকে। সে মনে মনে বলল,

“উনি সকলের জন‍্য আনল আর আমার কথাটাই ভুলে গেল। যাবে নাই বা কেনো? আমি কে, যে আমার কথা ওনাকে মনে রাখতেই হবে।”
কথাগুলো মনে মনে বলে সে মুখে বলল,
“আমার কিছু লাগবে না। আমার নতুন ড্রেস অনেক আছে।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে একবার দেখে নিল ওই অভিমান করা মুখটা। সুমুর মুখটা দেখে বড্ড হাসি পেলে শেরাজের। তবুও নিজেকে সংযত রেখে বলল,
“আঙ্কেল! আমি ওপরে যাচ্ছি, ফ্রেশ হতে।”
আনোয়ার সাহেব শেরাজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হ‍্যাঁ, বাবা যাও। ফ্রেশ হয়ে এসে ডিনার করে নাও । তারপর রুমে গিয়ে লাগেজ গুছিয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকাল সকাল বেরোতে হবে তো তোমাদের সকলকে।”
শেরাজ মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল।
আনোয়ার সাহেব সকলের উদ্দেশ্যে বললেন,

“সবাই খেয়ে রুমে গিয়ে লাগেজ গুছিয়ে নাও। কেউ আজ রাত জাগবেনা। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়বে।”
আনোয়ার সাহেবের আদেশ পেয়ে সকলে যার যার রুমে চলে গেল গিফট রেখে আসতে। রাইশা আর ইফতিয়া অনেক খুশি হয়েছে। শেরাজ সুমুকে গিফট দেয়নি বলে তারা ভীষণ খুশি। দুজনে সুমুর সামনে দিয়ে হেসে যাচ্ছে। হঠাৎ ইফতিয়া বলল,
“এই রাইশা জানিস, এই ড্রেসটা আমার জীবনের সবথেকে প্রিয় ড্রেস। এইটা আমি যত্ন করে তুলে রাখব।”
কথাটা বলে ইফতিয়া শপিংব‍্যাগের ওপর চুমু খেলো।
রাইশাও হেসে বলল,
“আমার ক্রাশ শেরাজ খানের দেওয়া ড্রেস। আমিতো কাল কক্সবাজারে এইটা পড়েই যাব। এই ইফতিয়া আপু! কাল তুমি আমাকে অনেক পিক তুলে দিবে। আমি সেই সব পিক সোশ্যাল মিডিয়াতে আপলোড দিবো।”
কথাগুলো বলে দুজনে হাসতে হাসতে ওপর চলে গেল। সুমুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনোয়ার সাহেব সুমুর কাছে এসে মাথায় হাত রেখে বললেন,

“ছেলেটা অনেক বিজি মামনি, তাই হয়তো ভুলে গেছে। তুমি মন খারাপ করো না। কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসো, তোমাকে আমি নতুন ড্রেস কিনে দিব।”
সুমু আনোয়ার সাহেবের কথায় মুচকি হেসে বলল,
“আমি মন খারাপ করিনি মামা। আমার সত্যি নতুন ড্রেস লাগবে না।”
আনোয়ার সাহেব সুমুর কথাশুনে আলতো হেসে বললেন,
“তুমি অনের লক্ষীমেয়ে মামনি। যাও, খেয়ে শুয়ে পড়ো।”
আনোয়ার সাহেব চলে গেলেন। সুমুও রান্নাঘরে দিকে যেতে নিচ্ছিল, ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল লামিয়া। মুখে তার তৃপ্তির হাসি। সে মুখ দিয়ে “চ” বর্গীয় শব্দ করে বলল,

“কিছু জ্বলছে মনে হচ্ছে?এই সুমু তুমি কি পোড়া পোড়া একটা স্মেল পাচ্ছো? পাচ্ছো না? আমি পাচ্ছি জানো? আমার কোনোদিনও পোড়া গন্ধ ভালো লাগত না, জানো? কিন্তু আজ, এই তোমার মন পোড়া গন্ধটা আমার খুব ভালো লাগছে। ইচ্ছে করছে পারফিউম বানিয়ে রোজ ইউজ করি। তোমার জন‍্য খুব কষ্ট হচ্ছে সুমু। যার জন‍্য তোমার এতো বিদ্রোহ। সেই তোমার জন‍্য গিফট আনতে ভুলে গেল। দিজ ইজ নট ফেয়ার। তোমার খান সাহেব সত্যি তোমাকে ভুলে গেল। এরপরেও তুমি বলবে, সে তোমার খান সাহেব?”
সুমু লামিয়ার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকাল। ঠোঁটে আলতো হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“সুমুর ভালোবাসা এতো সস্তা না যে, সামান‍্য একটা গিফটের জন‍্য সেই ভালোবাসা শেষ হয়ে যাবে। সে সুমুর খান সাহেব ছিল, আছে, আর সারাজীবন থাকবে।”
লামিয়া মুহুর্তেই রেগে গেল। সে সুমুর দিকে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“এরপরেও এতো কথা বড় কথা কোন মুখ দিয়ে বলো তুমি? এতো বড় কথা বলার মুখ আছে তোমার?”
সুমুর আবারও হেসে বলল,
“যেই মুখ দিয়ে আগে বলতাম, সেই মুখ দিয়েই বলছি। আর আমি মনে করি, কিছু কিছু মানুষের সাথে কথা বলা, তর্ক করা, প্রতিযোগিতা করাটাও লজ্জার ব‍্যাপার।”
লামিয়ার দিকে আঙুল তাক করে সে আবারও বলল,

“যেমন তুমি। ইউ নো হোয়াট লামিয়া? মূর্খের সাথে তর্ক করাটা বোকামি। তাই আমি তোমার মতো মূর্খের সাথে তর্কে যেতে চাইনা।”
কথাগুলো বলে চলে যাচ্ছল সুমু। পেছন থেকে লামিয়া বলল,
“তুমি অনেক অহংকারী একটা মেয়ে সুমু।”
লামিয়ার কথাটা শুনে সুমু দাঁড়িয়ে পড়ল। সে ঘুরে তাকাল লামিয়ার দিকে। ঠোঁটে হাসি রেখে বলল,
“শেরাজ খানের মতো একটা মানুষকে ভালোবাসি। একটু অহংকারী না হলে চলবে বলো। খান সাহেবকে ভালোবাসাটাই আমার অহংকার।”
কথাগুলো বলে রান্নাঘরে চলে গেল সুমু। লামিয়া দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“তোমার এই অহংকার যদি আমি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে না পারি, তাহলে আমার নাম লামিয়া চৌধুরী না।”

সকলে ডিনার শেষ করে লাগেজ গুছাতে চলে গেছে। সুমুর মন একটু খারাপ। সে ভাবছে,
“সকলকে যোগ্য জবাব দিলেও, দিনশেষে আমিতো মানুষ। আমার খারাপ লাগেতো। কষ্ট হয়তো।”
কথাটাগুলো ভাবছে আর লাগেজ প‍্যাক করছে সুমু। যাবার বিন্দু মাত্র ইচ্ছা নেই তার। তবুও যাচ্ছে। কারণ ওতোগুলো শাকচুন্নির মাঝে তার সাদা-সিঁধে, নিষ্পাপ খান সাহেবকে ছেড়ে দিতে পারে না সুমু। লাগেজ প‍্যাক করছে আর ফোনের দিকে বারবার তাকাচ্ছে সে। ঘড়ির কাঁটায় রাত দশটা। সন্ধ্যা থেকে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মানুষটা টেক্সট করেনি সুমুকে। সুমু অপেক্ষা করছে তার মেসেজের। হঠাৎ ফোনে টুং করে শব্দ হলো। খুশিতে চকচক করে উঠল সুমুর মুখ। মেসেজটা আর পড়ে দেখার প্রয়োজন মনে করল না সে। ফোনটা হাতে নিয়ে দৌড়ে চলে গেলে রান্নাঘরে। বেশি করে দুধ দিয়ে দারুন এককাপ চা বানালো সুমু। চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ছুটলো কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে। শেরাজের পারমিশন পেয়ে রুমে ঢুকলো সে। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে চলে আসতে নিলই শেরাজ ডাক দিল তাকে।

“সুমু!”
পা থমকে গেল সুমুর। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট “হুম” বলল। শেরাজ ডিভান থেকে উঠে দাঁড়াল। আলমারি থেকে একটা প‍্যাকেট বের করে এনে সুমুর পেছনে এসে দাঁড়াল। প‍্যাকেটটা সুমুর সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“দিস ইজ ফর ইউ, সুমু।”
সুমু প‍্যাকেটটা না নিয়েই ঘুরে দাঁড়াল। সে তাকিয়ে রইল তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজ চোখ দিয়ে ইশারা করল প‍্যাকেটটার দিকে। ইশারার সাথে সুমুও তাকাল প‍্যাকেটটার দিকে। আনমনেই হাতটা বাড়িয়ে প‍্যাকেটটা হাতে নিল। মাথা নিচু করে প‍্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজ বুঝতে পারল সুমু নিজের মধ্যে নেই। তাই সে হাত দিয়ে তুড়ি মারল সুমুর মুখের সামনে। হুঁশ ফিরল সুমুর। একবার প‍্যাকেটটার দিকে তো একবার শেরাজের দিকে তাকাল সে। শেরাজ এখনো সুমুর দিকেই তাকিয়ে আছে। অপেক্ষা করছে সুমুর প্রশ্নের। শেরাজের অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটিয়ে সুমু প্রশ্ন করল,
“আপনি আমার জন‍্য গিফট এনেছেন, তাহলে তখন সবার সামনে কেনো দেননি?”
শেরাজ দুইহাত প‍্যান্টের পকেটে গুজে দাঁড়াল। ঠোঁটে মৃদ‍ু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“কারণ তুমি স্পেশাল।”
সুমু এমন উত্তর কল্পণাতেও আশা করেনি। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। শেরাজ সুমুর অবাক হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সে কোনোমতে নিজের হাসিটাকে চেপে বলল,
“মুখে মশা ঢুকে যাবে তো, সুমু।”
সুমু চটজলদি মাথা নামিয়ে নিয়ে বলল,

“স্পেশাল?”
“হুম, খুব স্পেশাল।”
“কিন্তু, কেনো?”
“কারণ তুমি আমাকে রোজ খুব ভালো চা, কফি বানিয়ে দাও। আমার খেয়াল রাখো। যখনি বলি তখনি রুমে চা, কফি, খাবার নিয়ে আসো। তাহলে কি তুমি আমার কাছে স্পেশাল নও, বলো?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। মানুষটার একটা কথায় কতোটা আশা দেখলো সে। কিন্তু এ কি উত্তর দিল উনি। এইসবের জন‍্য আমি তার কাছে স্পেশাল। হ‍্যাঁ, ঠিকিতো। তাছাড়া আর কি? অন‍্য কোনোভাবে আমি কেনো তার কাছে স্পেশাল হবো? চা, কফির দিক দিয়ে স্পেশাল হতে পেরেছি এইটাই অনেক।
মনে-মনে কথাগুলো ভেবে মুখে বলল”
“ও, আচ্ছা!”
“হুম! কেনো সুমু, তুমি কি ভেবেছিলে?”
“না, কিছুনা। গিফটটার জন‍্য আপনাকে ধন‍্যবাদ। আমি তাহলে এখন রুমে যায়।”
শেরাজ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“হুম, যাও। আর ড্রেসটা পছন্দ হয়েছে কি না, জানিও।”
“আচ্ছা” বলে চলে গেল সুমু। সে মনে মনে বলল,

“তার খান সাহেব তাকে ভোলেনি। মনে করে ঠিকি তার জন‍্য গিফট এনেছে।”
রুমে গিয়ে খুশি মনে গিফটটা দেখল সুমু। একটা সুন্দর গর্জিয়াস কালো শাড়ি, তার সাথে ম‍্যাচিং অর্নামেন্টস। সুমু সবকিছু দেখে খুব অবাক হলো। শাড়িটা চোখ ধাঁধানো সুন্দর। যে কেউ দেখলে শাড়িটার প্রেমে পড়ে যাবে। ঠিক যেমন যেকোনো মেয়ে ওনাকে দেখলে প্রেমে পড়ে যাবে, ঠিক তেমনি যেকোনো মেয়ে ওনার দেওয়া এই শাড়িটা দেখলে, এই শাড়িটার প্রেমে পড়ে যাবে। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শাড়িটা ঠিক খান সাহেবের মতোই সুন্দর। মানুষটা দেখতে যতোটা সুন্দর, মানুষটার পছন্দটাও ঠিক ততোটাই সুন্দর।”
সুমু শাড়িটা গায়ের ওপর দিয়ে আয়নায় একবার দেখে নিল নিজেকে। নিজেকে বলিউড নায়কা ভেবে আয়নার সামনে এক্টিং করতে লাগল। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে মেসেজ করল কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে।

ইফতিয়া আর খুশি বেগম রুমে বসে আছে। ইফতিয়া খুশিতে উম্মাদ হয়ে আছে। সে বারবার শেরাজের দেওয়া ড্রেসটা দেখছে। খুশি বেগম মেয়ের কর্মে বিরক্ত হয়ে বললেন,
“একটা সাধারণ ড্রেস এতোবার করে দেখার কি আছে?’
ইফতিয়া আয়নাতে তাকিয়েই বলল,
“এইটা সাধারণ ড্রেস না আম্মু। এইটা আমার লাইফের সবথেকে প্রিয় ড্রেস। আম্মু তুমি দেখলে? শেরাজ আজ সুমুকে কীভাবে সবার সামনে আপমান করল?”
খুশি বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালো মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“অপমান?”
“হ‍্যাঁ, আম্মু আপমান। দেখলেনা কেমন সবার জন‍্য গিফট আনল, শুধু সুমুকে বাদ দিয়ে।”
খুশি বেগম মেয়ের বোকা-বোকা কথা শুনে রেগে গেলেন। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

“বোকামিটা কম করে, মাথাটা একটু খাটা। তুই শিওর হলি কি করে যে, শেরাজ সুমুর জন‍্য কিছু আনেনি?”
ইফতিয়া আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকাল। কথাটা না বুঝার ভঙ্গিতে বলল,
“মানে? তুমি কি বলতে চাইছো আম্মু?”
খুশি বেগম মেয়েকে ডেকে পাশে বসালেন। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুই বোকা ইফতিয়া, তাই শেরাজের মতো চতুর ছেলের চালাকি ধরতে পারিসনা। তোর ভুল ধারনা যে শেরাজ সুমুকে কিছু দেয়নি। দেখ হয়তো আলাদা ভাবে অবশ্যই কিছু দিয়েছে। আর সেই জিনিসটা হয়তো তোদের দেওয়া জিনিসের থেকেও এক্সপেনসিভ।”
ইফতিয়া খুশি বেগমের দিকে ড‍্যাবড‍্যাব করে তাকিয়ে রইল। মুখে দিয়ে একটুও শব্দ করল না সে। খুশি বেগম আবারও বললেন,
“কক্সবাজারে থাকাকালীন ওদের দুজনের দিকে চব্বিশ ঘন্টা নজর রাখবি, আর সব আপডেট টাইম টু টাইম আমাকে দিবি।”
ইফতিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তারপর মা-মেয়ে দুজনেই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।

ভোরের আলো এখনো ফুটেনি। চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে আছে। সকলে উঠে রেডি হয়ে গেছে। সবাই আজ শেরাজের দেওয়া ড্রেস পড়েছে। সকলে অলরেডি ড্রয়িংরুমে চলে এসেছে। মিনা বেগমরা সকলের জন‍্য নাস্তা বানাচ্ছেন। না খায়িয়ে কাউকে ছাড়বেনা তারা। বাড়ির বড়রা কেউ যাবেনা। আনোয়ার সাহেব বলেছেন, ছোটোদের আনন্দের মধ্যে তারা ঢুকতে চায়না। আর তাছাড়া সবাই চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা হয়ে যাবে। তাই বড়রা কেউ যাবেনা। সকলে মিলে ঠিক করেছে গাড়িতে না, বাসে যাবে। আনোয়ার সাহের প্লেনের টিকিট কেটে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কেউ রাজি হয়নি। সকলে মিলে ঠিক করেছে বাসে নাচ,গান, আনন্দ করতে করতে যাবে। হাসি বেগম সকলের জন‍্য খাবার প‍্যাক করছে, সাথে দিয়ে দেবেন বলে। খুশি বেগম নিজের দুই মেয়েকে বারবার বলছেন, ওখানে গিয়ে যাতে সাবধানে থাকে। প্রায় সকলেই নিচে নেমে এসেছে। সুমু এখনো আসেনি। রাহিনরা সকলে হালকা নাস্তা করে বাসের কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

সুমু নিচে নেমে এলো। পরনে তার গোলাপী কালারের চুড়িদার। চুড়িদারের ওপরে গরম শীতের কাপড়। শেরাজের দেওয়া শাড়িটা পরেনি সে। শাড়িটা পরলে বাড়ির সবার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। তাই শাড়িটা অন্য একদিন পড়বে বলে ঠিক করেছে। নিচে এসে হালকা নাস্তা করে, বমির ঔষধ খেয়ে নিল সে। বাস সুমুর একদম সহ‍্য হয়না। হাসি বেগম আর শামীম সাহেব দুই মেয়েকে কাছে ডেকে আদর করলেন এবং সাবধানে থাকার কথা বললেন। সকলে একসাথে বাড়ির বাহিরে এলো। বাড়ির বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে সকলে উঠে পড়ল বাসে। একপাশে সব ছেলেরা আর একপাশে সব মেয়েরা বসেছে। শুধু মাইশা আর নয়ন একসাথে বসেছে। শেরাজ আর আইয়ুব একসাথে বসেছে। শেরাজ যেখানে বসেছে সেখান থেকে সুমুকে স্পষ্ট দেখা যায়। গাড়ি ছাড়ল ভোর পাঁচটা বাজে। আনোয়ার সাহেব ড্রাইভারকে বারবার বলেছেন, সাবধানে গাড়ি ড‍্রাইভ করতে। গাড়ি ছাড়তে না ছাড়তেই সকলের গান বাজনা শুরু হয়ে গেল। শেরাজ তার প্রেয়সীকে দেখছে, যে এখন ঠোঁটে মুচকি হাসি রেখে সকলের হুল্লোড় উপভোগ করছে। সকলে “কাশ্মীর মে তু কান্যাকুমারী” গানের তালে তাল মিলিয়ে গান গাইছে। আইয়ুব, রাহিন, সারবাজ মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে ডান্স করছে। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। পুরো বাসে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।

কক্সবাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত নয়টা বেজে গেল। পনেরো ঘন্টা আঠাশ মিনিটের রাস্তায় ওদের লেগেছে সতেরো ঘন্টা। রাস্তা অনেক বার বাস থামিয়ে সকলে এটা ওটা খেয়েছে। ওয়াশরুমে গিয়েছে। আইয়ুব ভালো ভিউ পেলে গাড়ি থামিয়ে ভিডিও শ‍ুট করেছে। এইভাবে আরো একঘন্টা ত্রিশ মিনিট নষ্ট করেছে। আজ সকলে খুব টায়ার্ড। আগে থেকেই রিসোর্ট বুক করে রাখার জন‍্য কারো খুব একটা অসুবিধা হয়নি। আজ আর কেউ বের হবেনা। সকলে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে রেস্ট নিতে চলে গেল। কাল ভোরে উঠে সকলে সূর্যদ্বয় দেখতে যাবে বলে ঠিক করল আর দুপুর পর্যন্ত সমুদ্র পাড়েই কাটাবে বলে ঠিক করল।

নতুন দিনের শুরু হলো। অন্ধকার থাকতেই সকলে ঘুম থেকে উঠেছে। শীতে সবাই ঠকঠক করে কাঁপছে। তারপরেও সবাই সূর্যদ্বয় দেখতে যাবেই। সকলে রেডি হচ্ছে। সুমু ঠিক করেছে আজ শাড়িটা পড়বে। শাড়িটা একা একাই পড়ে নিলো সে। কিন্তু কুঁচি ম‍্যানেজ করতে পারছেনা। সামিয়া আর নাজমিন তাকে হেল্প করল কুঁচি ধরতে। সামিয়া আর নাজমিন অনেকবার প্রশ্ন করেছে শাড়িটার ব‍্যাপারে, কিন্তু সুমু বলেনি। তাই দুজনও কুঁচি ধরতে চায়নি। সুমু সবটা বলার পরে কুঁচি ধরে দিয়েছে। সুমু ওদের দুজনকে খুব বিশ্বাস করে, তাই নির্দ্বিধায় বলেছে ওদের।
শাড়িটা পড়ে হালকা সেজে শাড়ির ওপর লেডিস হুডি পড়ে নিল সুমু। তারপর বেরিয়ে পরল রুম থেকে। সকলে রিসোর্টের বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিল। সুমুকে দেখে সকলে অবাক। শেরাজের নিঃশ্বাস আটকে গেছে। চোখের পলক পড়ছেনা তার। সকলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুমু লজ্জায় মুখ নামিয়ে নিল। আইয়ুব শেরাজের কানের কাছে গিয়ে বলল,

“মেয়েরা হট হলে ছেলেরা জ্বলে যায়। তুইতো দেখছি জমে গেছিস।”
শেরাজ বিরক্তির চোখে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“গরমে জমে গেছি, আয়ুবা।”
কথাটা বলে আবারও সে সুমুর দিকে তাকাল। আইয়ুব ঠোঁট টিপে হেসে বলল,
“আর তাকাসনা ভাই। মেয়েটা লজ্জায় মরে যাচ্ছে।”
শেরাজ আনমনেই বলল,
“আর ও যে প্রতিনিয়ত আমাকে একটু একটু করে খুন করছে, সেটা তোদের চোখে পড়ছেনা।”
আইয়ুব শেরাজের চোখের সামনে হাত রাখল। শেরাজ বিরক্তির সাথে আইয়ুবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বিরক্ত করিসনা। দেখতে দে।”
আইয়ুব হেসে বলল,
“আমি তোকে খুন হবার হাত থেকে বাঁচাচ্ছি।”
শেরাজ আর কিছু না বলে চলে গেল গাড়ির কাছে। সকলে মিলে সুমুকে প্রশ্ন করল,
“এতো সুন্দর শাড়ি কবে কিনল?”
সুমু হেসে বলল,
“বাসা থেকে আসার সময় কিনে এনেছিলাম। পড়িনি আগে। “
সুমুর মিথ্যা শুনে শেরাজ আলতো হাসল। তারপর সকলে মিলে চলে গেল সমুদ্রের উদ্দেশ্যে।

সকলে সমুদ্র পাড়ে নেমে দাঁড়িয়েছে। আজ সূর্যদ্বয় দেখবে সবাই। চারপাশে এখনও কুয়াশার আবরণ। প্রায় দশমিনিটের মধ্যে সূর্যের দেখা মিলল। সুমুর চোখ চিকচিক করছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। প্রকৃতির কি অপরূপ সৌন্দর্য। সকলে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। সকলে যখন সূর্যদ্বয় দেখতে ব‍্যস্ত, তখন শেরাজ তার প্রেয়সীকে দেখতে ব‍্যস্ত। আস্তে-আস্তে বেলা বাড়ল। সকলে সি ফুড খেলো। এখন সকলের হাতে ডাবের পানি। রাহিনরা ঠিক করেছে পানিতে নামবে। ছেলেরা একপাশে আর মেয়েরা একপাশে নামল। শেরাজ সুমুকে টেক্সট করে বারণ করেছে পানিতে নামতে। সুমু বুঝতে পারল না সকলে নেমেছে, সে নামলে কি প্রবলেম। হঠাৎ সুমুর খেয়াল হলো পরনের শাড়িটা পাতলা, তাই হয়তো খান সাহেব তাকে নামতে বারণ করছে। সারবাজ ভিডিও ক্লিপ নিচ্ছে। শেরাজের ফোনে কল এসেছে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখল স‍্যান্ডির কল। ফোনটা রিসিভ করতে সাইডে গেল। সুমুও সুযোগ পেল। সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,

“সরি খান সাহেব! আপনার কথার অবাধ‍্য হলাম। সমুদ্রের পাড়ে এসে পানিতে নামার লোভটা সামলাতে পারলাম না আমি। আমি অল্প ভিজব খান সাহেব। আর শাড়িটাকে সামলে নিব আমি।”
কথাগুলো বলে পানিতে নামল সে। শেরাজ ফোনে অফিসের ব‍্যাপারে কথা বলছে। হঠাৎ করো চিৎকারে শেরাজ ঘুরে তাকাল পানির দিকে। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেলো শেরাজের। চারপাশ শুনশান হয়ে গেল তার। চোখের সামনে তার প্রেয়সী ভেসে যাচ্ছে। মাইশা, নাজমিন, সামিয়া, রাইফ, চিৎকার করে কাঁদছে। আইয়ুবরা আলরেডি সুমুর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। শেরাজের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। আর একমিনিটও না দাঁড়িয়ে পানিতে ঝাপিয়ে পড়ল সে। সকলকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল শেরাজ। সুমু বাঁচার জন‍্য অনেক চেষ্টা করছে। সে সাতার জানা মেয়ে, তাই এখনো ডুবে না গিয়ে ভেসে আছে। কিন্তু শাড়ি তার হাত-পা পেঁচিয়ে ধরেছে। সুমুর চোখের সামনে তার মা-বাবা,বোন সমস্ত প্রিয় মানুষদের চেহারা ভেসে আসলো। সবশেষে তার খান সাহেবের মুখটা ভেসে আসলো। এতেই মুচকি হাসল সুমু। তার আয়ু হয়তো এইটুকুই ছিল। কিন্তু সুমু যে বাঁচতে চায়। কিন্তু কিভাবে? আল্লাহর ডাক এসে গেছে। সুমুকে হয়তো এবার যেতে হবে। সুমুর হয়তো আর তার খান সাহেবকে দেখা হলো না। কিন্তু এখন সুমুর জীবনে কোনো আফসোস নেই। তার জীবনের সবথেকে বড় ইচ্ছা আল্লাহ পূরণ করে দিয়েছে। সে তার খান সাহেবকে সামনে থেকে দেখতে পেয়েছে। আর কি চাই সুমুর? কিছুনা। এইবার সুমু শান্তিতে চোখ বন্ধ করতে পারবে।
সে তার ভাবনার মাঝে মনে মনে বলল,

খান সাহেব পর্ব ১২

“আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি খান সাহেব। কিন্তু কখনও বলা হলোনা আপনাকে। হয়তো নিয়তি চায়নি আপনি কথাটা জানুন। শেষবারের মতো প্রিয় মা-বাবা মুখটা দেখতে পারলাম না। ছোটবোনটাকে জড়িয়ে ধরতে পারলাম।”
এতো আফসোসের মধ্যে আজ সুমুর মুখে তৃপ্তির হাসি। আর কতো যুদ্ধ করবে সে, এইবার যে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। অস্পষ্ট চোখে দেখল কেউ একজন পাগলের মতো অতি নিকট এগিয়ে এসেছে তার। মুখটা ভালো করে দেখার আগেই চোখ বন্ধ হলো সুমুর। পানির ওপরে থাকা হাতদুটো আস্তে-আস্তে তলিয়ে যেতে লাগল। সে ডুবে যেতে লাগল সমুদ্রের অতলে।

খান সাহেব পর্ব ১৪