খান সাহেব পর্ব ১৯
সুমাইয়া জাহান
সিকদার বাড়িতে আজ পুরো থমথমে পরিবেশ। সকাল থেকেই সকলে চুপচাপ। রোজকারের মতো ড্রয়িংরুমে আজ কারো ভিড় নেই। সকলে যার যার মতো রুমের মধ্যে আছে। শামীম সাহেব এখন অনেকটা সুস্থ। ঘুম ভাঙার পর মেয়ের খবর জানার জন্য উতলা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। হাসি বেগম সবকিছু খুলে বলেন শামীম সাহেবকে। তারপর থেকেই শামীম সাহেব আরও চুপ মেরে গেছেন। শেরাজ কালরাত থেকেই খুব প্রফুল্ল মেজাজে আছে। সকালে একবার বন্ধুদের সাথে নিয়ে সে বাহিরে ঘুরেও এসেছে। সুমুর সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর নিজেকে শেরাজের রুমে দেখে খুব অবাক হয়েছে। মস্তিষ্ক আস্তে আস্তে সচল হতেই কালরাতের কথা মনে পড়ে তার।
শামীম সাহেবের কথা মনে পড়তেই ছুটে যায় শামীম সাহেবের কাছে। খুশি বেগম আর মিনা বেগম কালরাতের পর থেকে ক্ষেপে আছেন। সুমুর ক্ষতি করাটা এখন তাদের কাছে অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাইশা কাল শশুর বাড়িতে চলে যাবে। বাড়ির কারও মনের অবস্থা খুব একটা ভালো না। সুমু দুপুরে খেয়ে এসে বসেছিল শামীম সাহেবের কাছে। কালরাতের পর শেরাজের সাথে আর দেখা হয়নি সুমুর। দেখা হয়নি বললে ভুল হবে, সুমু নিজে থেকেই দেখা করতে চায়নি।
শেরাজের রুমের দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে সুমু। তার ভেতরে যেতে খুব অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। এতোদিনের পরিচয়টা কেমন এক নিমিষেই বদলে গেল তাদের। সুমুর খান সাহেবের যদি অন্যকেউ না থাকত, তাহলে হয়তো আজকে সে তার খান সাহেবের বউ হওয়ার খুশিতে পাগল হয়ে পাবনা চলে যেত। কিন্তু এখন সে কিছুইতে এই বিয়েটাকে মেনে নিতে পারছেনা। তার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ রুমের ভেতর থেকে শেরাজ বলল,
“বাহিরে দাঁড়িয়ে অনশন না করে। ভেতরে এসো।”
শেরাজের কন্ঠ শুনে রুমের দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সুমু। তারপর আলতো হাতে দরজা ঢেলে ভেতরে ঢুকল। রুমটা ডিম লাইটের লাল আলোয় আলোকিত। দেখতে বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে। রুমটার চারদিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিল সে। শেরাজকে একধ্যানে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাথা নিচু করে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। তারায় ভরা আকাশের দিকে একধ্যানে তাকিয়ে রইল সুমু। আজ তার সাথীর সাথে অনেক কথা বলার আছে সুমুর। আকাশের চাঁদও হয়তো সুমুর দিকে তাকিয়ে সুমুর কথা শোনার অপেক্ষায় আছে।
এইভাবে কেটে গেল কতটা সময় কে জানে। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিত টের পেল সে। সেই সাথে চেনা পরিচিত পারফিউমের মিষ্টি সুবাস ভেসে এলো তার নাকে। চোখ বন্ধ করে সুবাসটাকে বুক ভরে টেনে নিল সে। শেরাজ সুমুর কর্ম দেখে নিঃশব্দে আলতো হাসল। আবারও কতটা সময় গেল কে জানে। ওভাবেই দুজনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ শেরাজ নিরবতা ভেঙে বলল,
“রুমে চলো সুমু। এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ঠান্ডায় জ্বরটা আবারও ফিরে আসবে।”
চোখ খুলে তাকাল সুমু। কন্ঠে কাতরতা নিয়ে সে বলল,
“আপনি এমন কোনো করলেন, খান সাহেব?”
শেরাজ একপা এগিয়ে সুমুর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“কোনটা?”
সুমুর দৃষ্টি আকাশের চাঁদের দিকে। সে আফসোসের সাথে বলল,
“এই বিয়েটা।”
শেরাজ অকপটে জবাব দিল,
“শেরাজ খানের চোখের সামনে কোনো মায়ের জাতিকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বললে, সেটা শেরাজ খান মেনে নিতে পারে না।”
সুমু ঘুরে দাঁড়াল শেরাজের দিকে। সে শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাই বলে বিয়ে করে নেবেন? আপনার ভালোবাসার মানুষটার কি হবে এখন?”
শেরাজ তাকালো সুমুর দিকে। সে কিছুক্ষণ ভালো করে কিছুক্ষণ পরখ করে দেখল সুমুকে। ইচ্ছে না থাকার সত্যেও বলল,
“ওমানে ফিরে গিয়ে তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। তুমি তখন আমার বাসায় সার্ভেন্ট হিসেবে থাকবে। রোজ তিনবেলা আমার আর আমার হবু বউয়ের জন্য চা, কফি বানিয়ে খাওয়াবে। আর তাছাড়া তুমি নিজেও তো এমনটা চেয়েছিলে।”
ছলছল করছে সুমুর চোখ দুটো। কান্নাকে সে তার চিরসাথী বানিয়ে নিয়েছে। শেরাজের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল সে। ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায়না। পূনরায় আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
“তার একটা ছবি দেখাবেন?”
“কেনো?”
“নিঃসন্দেহে সে একজন ভাগ্যবতী নারী। একজন অভাগী হয়ে একজন ভাগ্যবতী নারীকে দেখার কৌতূহলটা খুব বেশী জেকে ধরেছে আমাকে। তাই তাকে একটিবার দেখে, নিজেকে একটু ভাগ্যবতী ভাবতে চাই। যদিও তাকে দেখতে চাইবার মতো কোনো যোগ্যতা আমার নেই। তবুও…”
“ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছাটা আমি পূরণ করে দিব। তবে ছবিতে না। ফেস টু ফেস দেখা করাবো।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। সে চুপচাপ রুমের ভেতর চলে আসলো। শেরাজও সুমুর পিছু পিছু রুমে চলে আসলো।
সুমু মেঝেতে বিছানা করছে নিজের জন্য। শেরাজ এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে বিছানো বিছানাকে পা দিয়ে লাথি মেরে নষ্ট করে দিল। সুমু কোনো কথা না বলে এলোমেলো করে দেওয়া বিছানাটাকে আবারও ঠিক করতে লাগল। সুমুর কাজ দেখে শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এইসব সিনেমাটিক ড্রামা অফ করে, চুপচাপ বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ো।”
সুমু তবুও কোনো কথা না বলে নিজের কাজে মন দিল। শেরাজ এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সে সুমুর বাহু ধরে টেনে দাঁড় করালো তাকে। চোখ তুলে তাকাল সুমু। শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সোজা কথা কানে যায় না, তাইনা? যা বলেছি তাই করো। আমার সাথে ঘাড়ত্যারামি একদম করতে আসবে না। চুপচাপ বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ো, নয়তো ছাদে নিয়ে গিয়ে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দেব। শা*লা আমি ভালো হলে গোটা দুনিয়াটাই খারাপ হয়ে যায় দেখছি।”
সুমু আফসোসের স্বরে বলল,
“কেনো খান সাহেব, আপনি খারাপ বুঝি?”
শেরাজ কিছুটা অস্বস্তিবোধ করল। প্রসঙ্গ পাল্টে সে বলল,
“তোমার শরীরে জ্বর জ্বর ভাবটা এখনো আছে। নিচে ঘুমালে জ্বরটা আবারও ফিরে আসতে পারে। সো! বেশি কথা না বলে সেটা বলেছি, সেটা করো।”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“দয়া করছেন?”
শেরাজ এক ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে বলল,
“দয়া?”
“হ্যাঁ, দয়া! দয়া করছেন আপনি আমাকে। প্রথমত, আমার মান-সম্মান বাঁচানোর জন্য নিজের ভালোবাসার মানুষ থাকার পরেও আমাকে বিয়ে করে দয়া করেছেন। আর দ্বিতীয়ত, মেঝেতে ঘুমালে আমার জ্বর আবার ফিরে আসতে পারে বলে, আমাকে বেডে ঘুমাতে দিয়ে দয়া করছেন।”
শেরাজ তিন আঙ্গুলের সাহায্যে সুমুর চোয়াল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“শেরাজ খানের কাছে কৈয়ফিত চাইছো? তোমার তো নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করা উচিত যে, তুমি শেরাজ খানের বর্তমান লিগ্যাল ওয়াইফ। তুমি কি ভাবো মেয়ে? তোমাকে নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকার মতো এতো সময় আমার কাছে আছে? বুঝেছি, সোজা কথা তোমার কানে ঢুকবে না। তাই, তোমাকে তোমার ভাষায় বোঝাব আমি।”
কথাগুলো বলে সুমুকে টেনে নিয়ে বেডের ওপর ফেলে দিল সে। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে সুমুর। তবুও কোনো কথা না বলে বিছানা থেকে নেমে যেতে চাইল। শেরাজ সুমুকে রেখে আলমারির কাছে গেল। আলমারি থেকে সুমুর চারটা ওড়না বের করে আনলো। আজ সকালেই সুমুর যাবতীয় জিনিসপত্র শেরাজের রুমে শিফট করা হয়েছে। সেখান থেকেই চারটা ওড়না বের করে আনলো শেরাজ। দুইটা ওড়না দিয়ে সুমুর দুই হাত বাঁধল বেডের সাথে। আর বাকি দুইটা ওড়না দিয়ে দুই পা বাঁধল। তারপর দুইহাত পকেটে গুজে সুমুর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি এভাবেই সারারাত পড়ে থাকবে।”
শেরাজ সুমুর পায়ের কাছ থেকে ব্লাঙ্কেটটা নিয়ে সুমুর শরীরে জড়িয়ে দিল। তারপর কিছুক্ষণ সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে গিয়ে বসল ল্যাপটপের সামনে।
গড়ির কাঁটায় রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই। চাঁদনী আলোয় ভেসে যাচ্ছে নিস্তব্ধ আকাশ। নক্ষত্ররা যেন ছোট ছোট প্রদীপ জ্বালিয়ে বসে আছে চাঁদের চারপাশে। হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দ তুলছে, যেন প্রকৃতি নিঃশব্দে লোরি গাইছে। ঠিক এমন মনমুগ্ধকর সময়ে ছাদের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন ব্যক্তি। কারো মুখে শব্দ নেই। দুজনেই যেন নিরবতা পালন করছে।
হঠাৎ নিরবতা ভেঙে শামীম সাহেব বললেন,
“বিয়েটা কি তুমি ভেবে করেছো?”
শেরাজ পকেটে হাত ঢুকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শেরাজ খান তার জীবনের প্রতিটা কাজ ভেবেই করে শশুরমশাই, কিন্তু আপনার মেয়েকে ভালোবাসার সময় এতো ভেবে বাসিনি।”
শামীম সাহেব কেঁশে উঠলেন। শেরাজ শামীম সাহেবের অবস্থা দেখে গোপনে দুষ্টু হেসে বলল,
খান সাহেব পর্ব ১৮
“পরশু আপনার মেয়েকে নিয়ে হানিমুনে যাচ্ছি। দোয়া করবেন আমার জন্য।”
শামীম সাহেব শেরাজের কথা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তিনি কিছুক্ষণ শেরাজের দিকে তাকিয়ে থেকে হনহন করে ছাদ থেকে নেমে চলে গেল। তার বলার অনেক কিছু থাকলেও, শেরাজের নির্লজ্জ মার্কা কথা শোনার পর নিজের কথাগুলো বলার রুচি মরে গেছে তার। শেরাজ তার শশুরমশাইয়ের অবস্থা দেখে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তার সেই হাসি একদম প্রাণখোলা হাসি। যেই হাসিতে যেকোনো মেয়ে পাগল হতে বাধ্য।
