খান সাহেব পর্ব ৩৮ (২)
সুমাইয়া জাহান
চৌধুরী ম্যানশন যেন আলোর সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। ঝকঝকে পোশাক, নামি-দামী গেস্টরা, আর ক্যামেরার ঝলকানি– সব মিলিয়ে যেন এক স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ।
শেরাজদের গাড়ি এসে থামল চৌধুরী ম্যানশনের সামনে। শেরাজরা সকলে গাড়ি থেকে নামল। অনন্যা খাতুন সকলকে দাঁড়াতে বলে বাড়ির ভেতরে গেল।
শেরাজ সারবাজকে জিঙ্গাসা করল,
“আইয়ুবরা কই?”
“ওরা ভেতরে।”
“মামু ইনভাইটের দায়িত্ব কাকে দিয়েছিল?”
“আরিয়ানকে!”
শেরাজ আর কিছু বলল না। স্যান্ডি আসতেই স্যান্ডিকে নিয়ে একটু সাইডে চলে গেল সে।
অনন্যা বেগম আবারও ফিরে এলো। তার সাথে এলো মৌ সেন আর আফতাব চৌধুরী। সুমু দুজনকে সালাম দিল। আফতাব চৌধুরী ভদ্রতারসহিত উত্তর দিলেন। সুমুকে দেখে মৌ সেন সুমুর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সুমু পা থেকে মাথা পযর্ন্ত ভালো করে পরখ করল মৌ সেনকে। সাজগোজ আর অ্যাটিটিউডে এখনও ঠিক সিনেমার হিরোইন। মৌ সেন হালকা হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে বললেন,
“তুমি তাহলে সেই মেয়ে, যার জন্য শেরাজ বেটা আমার রোজাকে বাদ দিয়ে তোমাকে নিজের বউ করল?”
সুমু নম্রভাবে হেসে উত্তর দিল,
“আমি যতদূর জানি, খান সাহেব রোজা আপুকে নিজের বোনের চোখে দ্যাখে।”
মৌ সেন ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তার হাসিতে মিষ্টি বিষ। তিনি ব্যঙ্গ করে বললেন,
“তোমার মতো সাধারণ মেয়েদের উপরে তো এখনকার ছেলেদের নজর পড়েনা, তাহলে তুমি কীভাবে শেরাজ বেটার মনে জায়গা করে নিলে?”
সুমু কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শেরাজ তখন পাশে এসে দাঁড়াল। ঠান্ডা গলায় বলল,
“সাধারণ আর খাঁটি, এই দুটো জিনিস একসাথে থাকলে তা সবচেয়ে দুর্লভ হয়, মামিমনি।”
মৌ সেন হালকা থতমত খেয়ে সরে গেল। নিজের স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,
“যাক, ভেতরে এসো। সবাই অপেক্ষা করছে, আজকের পার্টির মূল চরিত্রদের দেখবে বলে।”
আফতাব চৌধুরী বললেন,
“অনন্যা তুই শেরাজ বেটা আর সুমু মামনিকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে ওপরে চলে যা। ওদের স্পেশালভাবে সকলের সামনে প্রেজেন্ট করা হবে। আর বাকিরা আমার সঙ্গে এসো।”
অনন্যা বেগম ভাইয়ের কথায় সম্মতি জানালো। সুমুর অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে। শেরাজ সুমুর হাত শক্ত করে ধরল। নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“তোমার গায়ে কেউ আঁচড় দিতে চাইলে, তাকে আগে আমাকে পেরোতে হবে, সুইটহার্ট।”
“কে আঁচড় দিবে আমার গায়ে?”
“কেউ না, এসো।”
সুমুর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। একটা অভিমান, একটা গোপন অভ্যন্তরীণ শক্তি তার মধ্যে। কেউ পছন্দ না করুক, তবে তার পাশে তার “খান সাহেব” আছে, আর এইটুকুই তার জন্য যথেষ্ট।
চৌধুরী ম্যানশনের আজকের রাত যেন কোনো রাজকীয় উৎসব। ঝাড়বাতির আলোয় ঝকমক করছে প্রতিটা কোণা।
দূরে দাঁড়িয়ে মৌ সেন অতিথিদের অভ্যর্থনা করছেন। আরিয়ান তার বেস্ট ফ্রেন্ডদের জন্য অপেক্ষা করছে। রোজা ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে।
পার্টিতে প্রবেশ করল একজন। পরনে কালো স্যুট, ঠান্ডা মুখ, চোখে ভয়ানক নীরবতায় রায়য়ান চৌধুরী। আরিয়ানের বেস্ট ফ্রেন্ড। আরিয়ান রায়য়ানকে দেখে উঠে দাঁড়াল। আলতো হেসে বলল,
“আজ দেখতে পাবি তাকে।”
“হুম! আর তাই এই পার্টিতে আসা আমার।”
দুই ফ্রেন্ড মিলে আড্ডায় মজে গেল। সারবাজরা এসে আইয়ুবদের সাথে যোগদান করেছে। অনন্যা খাতুন নিজের ছোট ভাই আদনান চৌধুরী আর তার ওয়াইফ রুহি খাতুনের সাথে কথা বলছে।
মৌ সেন সকলের অ্যাটেনশন পাবার জন্য হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে বললেন,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! আপনারা সকলে জানেন, আজকের পার্টি দুজন বিশেষ মানুষের জন্য। তারা কিন্তু অলরেডি আমাদের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাহলে, আর অপেক্ষা না করি। চলুন, ডেকে নেই তাদের।”
মৌ সেন একটু থেমে মাইক্রোফোনে আবারও বলে উঠলেন,
“এ্যান্ড নাউ, দ্য মোমেন্ট উইভ অল বিন ওয়েটিং ফর। প্রেজেন্টিং… মিস্টার অ্যান্ড মিসেস শেরাজ খান!”
আলো নিভে গেল। হালকা মিউজিক বাজছে একটা রাজকীয় পিয়ানোর সুর। আলো ফিরে আসতেই দেখা গেল, সুমু ধীরে ধীরে নেমে আসছে মার্বেল সিঁড়ি বেয়ে। পরনে বেবি পিংক কালারের লেহেঙ্গা, মাথায় হালকা সিস্পল টিকলি, গলায় শেরাজের দেওয়া হীরের নেকলেস। শেরাজ সুমুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সুমু একটু হেসে তার হাতে হাত রাখল। দুজনের ঠোঁটে হালকা হাসি।
পার্টিতে উপস্থিত সকলে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্যামেরাম্যান ফটো তুলতে ব্যস্ত। আরিয়ান সুমুর দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। রোজা রাগিচোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে।
চৌধুরী ম্যানশনের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে মৃদু গান। ভায়োলিন আর পিয়ানোর সূক্ষ্ম সুর। ড্যান্সফ্লোরের উপর তৈরি হয় একটা ছোট র্যাম্প। হঠাৎ সঙ্গীত বদলালো। একটা রোমান্টিক, স্লো বিটের ট্র্যাক শুরু হলো,
“রাবাতা… রাবাতা…”
ধোঁয়ার মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে সুমুর হাত ধরে র্যাম্পে উঠে এলো শেরাজ। দু’জনের একসাথে হাঁটার সময় হালকা বাতাসে সুমুর চুল উড়ে গিয়ে শেরাজের চোখের সামনে পড়ল। শেরাজ সুমুর চুল সরিয়ে দিল। ব্যাস, ক্লিক! ক্যামেরা ফ্ল্যাশে তাদের এই মুহূর্তটা বন্দি হয়ে যায়।
অতিথিদের করতালি ভেসে উঠল। কিন্তু কিছু চোখ আছে কাঁটার মতো। তবুও, ওই রাত্রির আলোয় সবার চোখ আটকে আছে একটা দৃশ্যে, সুমুদের হাতে হাত রাখা আর দুজনের চোখে চোখ রেখে সকলের সামনে হেঁটে আসার মধ্যে।
স্যান্ডি দূরে দাঁড়িয়ে সিকিউরিটি চেক করছে। আর একই সাথে চোখ রাখছে চারপাশে, কারণ তার স্যারের অনুমান, এই জাকজমক রাত্রির ভেতরেই হয়ত একটা অন্ধকার লুকিয়ে আছে।
আরিয়ান তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে। রায়য়ান মৃদুস্বরে বলল,
“শেরাজ’স উইকনেস!”
“কিছু বললি?”
রায়য়ান তাকাল আরিয়ানের দিকে। আলতো হেসে বলল,
“না!”
“দেখেছিস, এই সেই নারী।”
“হুম, দেখলাম।”
মৌ সেন মাইক্রোফোন শেরাজের হাতে দিলো। শেরাজ আলতো হেসে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার কিছুই বলার নেই। আজ আমি আমার ওয়াইফের উদ্দেশ্যে শুধু একটা কথাই বলব,
তুমি শুধু আমার ভালোবাসা না, তুমি আমার অহংকার।”
সবার সামনে সুমু একটু লাজুকভাবে হেসে বলল,
“আর আপনি আমার সাহস, খান সাহেব।”
সকলে আবারও করতালি দিল। মৌ সেন রোজার কাছে গিয়ে বলল,
“এই মেয়ে নাকি বিডির কোন গ্রাম থেকে উঠে এসেছে? কই দেখেতো তেমনটা মনে হ য়না। এত এত লাইট, ক্যামেরার সামনেও এই মেয়ে এতটা স্মার্টলি আছে কীভাবে?”
“জানিনা মম। তবে আমার মাথায় একটা আইডিয়া আছে।”
“কি আইডিয়া?”
“সুমুর জন্য সফট ড্রিঙ্কস পাঠাই, অ্যালকোহল মিশিয়ে। ড্রিঙ্কস খেলে সুমু মাতাল হয়ে সিনক্রিয়েট করবে। এতে এস.কের মান-সম্মান নষ্ট হবে, আর এস.কে সুমুকে ছেড়ে দিবে।”
মৌ সেন রাগি চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এইসব চিপ আইডিয়া কীভাবে আসে তোমার মাথায়? এই পার্টি ভর্তি ক্যামেরা। আমাদের বাড়িতেও ক্যামেরা আছে। শেরাজের বেশিক্ষণ সময় লাগবেনা তোমাকে খুঁজে বের করতে।”
“তাহলে কি করব, মম? এই সুমুকে আমার একদম সহ্য হচ্ছেনা।”
“আপাতত কিছু করতে হবেনা।”
মৌ সেন এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। তার সাথে রুহি খাতুন ও গেলেন। দুজনে সুমুকে ডায়মন্ডের নেকলেস উপহার দিলেন। সুমু হাসি মুখে তাদের উপহার গ্রহন করল। গেস্টরা র্যাম্প এন্ট্রির পর একে একে সকলে এসে শুভেচ্ছা জানালো নবদম্পতিকে। প্রচুর গিফট দিল সকলে। সুমু একটু আড়ষ্ট, কিন্তু হাসিটা মুখে ধরে রেখেছে। শেরাজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রতিটি পলকে পাহারাদারের মতো। আইয়ুবরা ডাক দিতেই শেরাজ সুমুর কাছে ইশিতা আর ফিরোজাকে রেখে আইয়ুবদের কাছে গেল। শেরাজ চলে যেতেই সুমুর কাছে এগিয়ে এলো আরিয়ান চৌধুরী। আরিয়ানের পরনে আজ কোরিয়ান ব্লেজার। কোরিয়ান স্টাইল হেয়ার, চোখে ব্ল্যাক রিমলেস চশমা, মুখে আত্মবিশ্বাসী হাসি, হাতে ওয়াইনের গ্লাস। সে গিয়ে দাঁড়াল একদম সুমুর কাছে। সুমু একটু অপ্রস্তুত হয়ে পেছনে সরে গেল। আরিয়ান একবার ঘাড় কাত করে হেসে তাকাল শেরাজের দিকে। তারপর সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফাইনালি চৌধুরী ম্যানশনে আমাদের নতুন রানীর আগমন। ওয়েলকাম বিউটিফুল।”
আরিয়ানের কথায় ভদ্রতা থাকলেও চোখে ভদ্রতা নেই। তার সেই নিঃশব্দ চাহনি, যেই চাহনি শরীরকে গভীর ভাবে পরখ করে।
সুমু একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে নম্রভাবে বলল,
“ধন্যবাদ!”
শেরাজ আরিয়ানকে সুমুর কাছে দেখে এগিয়ে এলো। সে এসে একদম সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল ঢাল হয়ে। আরিয়ান একটু হেসে বলল,
“রিল্যাক্স, ব্রো। জাস্ট সেয়িং হাই। তবে সত্যি বলছি, তোর পছন্দ বেশ অন্যরকম।”
শেরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,
“ও আমার পছন্দ নয়, ও আমার আত্মা।”
আরিয়ান চোখ নামিয়ে হাসল, তারপর সুমুর দিকে আরেকবার তাকাল। এইবার একটু বেশি সময় ধরে। একটা হাসি তার ঠোঁটে, যেন সে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটাতে চলেছে।
সুমু নিজেও টেঁর পেল আরিয়ানের নজর স্বাভাবিক নয়। তার ঠান্ডা গায়ে একটা অজানা ভয় ছড়িয়ে গেল। শেরাজ রাগিস্বরে বলল,
“চোখ নামা, আরিয়ান।”
আইয়ুবরা দূর থেকে সবটা লক্ষ্য করল। রাহিন সারবাজকে বলল,
“এই আরিয়ান আমার বোনের দিকে নজর দিয়েছে, তাইনা?”
“হয়তো!”
“তুই কিছু কর, সারবাজ।”
“কি করব?”
“জানিনা। তবুও কর। নয়তো এই পার্টির মধ্যে আজ ঝামেলা লেগে যাবে।”
সারবাজ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে মঞ্চে উঠে গেল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান।” তার গলায় একটু দুষ্টু সুর। “আজকের হাইলাইট হচ্ছে আমাদের নতুন নবদম্পতির রোমান্টিক ড্যান্স। আর এই ড্যান্সটা কিন্তু আমি নিজে অর্গানাইজ করেছি। ড্যান্সের মিউজিক থেকে শুরু করে স্পটলাইট পর্যন্ত। তাই যদি ভালো না লাগে, গালি আমাকে দিয়েন। বাট আই’ম শ্যোর, ইটল বি ম্যাজিক্যাল।”
আরিয়ান সরে গিয়ে দাঁড়াল। অতিথিরা হাসিতে ফেটে পড়ল। শেরাজের মুখ গম্ভীর, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসি। সুমু একটু লাজুক, একটু নার্ভাস।
সারবাজ চোখ টিপ দিয়ে বলল,
“এস.কে সাবধানে, সুমুকে পড়ে যেতে দিস না। আর সুমু, আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, নাচ আর প্রেম দুটোতেই তুমি এক্সপার্ট।”
সুমু মৃদু হাসল। সারবাজ মিউজিক প্লে করল। অডিও স্পিকারে “তেরে লিয়ে” গানটা বাজতে লাগল। আলো নরম হলো, ফুলের পাপড়ি ঝরতে লাগল উপর থেকে। আইয়ুবরা সকলে শেরাজের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর হাত ধরল। তাদের দুজনের চোখে চোখ। কেউ কিছু বলল না, শুধু একে অপরের মাঝে এক অদৃশ্য মায়ায় জড়িয়ে গেল। সুমুর ওপর স্পটলাইট পড়তেই শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“সবাই আছে, তাও মনে হচ্ছে শুধু তুমি আর আমি আছি।”
সুমু হাসল। লাইট অফ হয়ে গেল। শেরাজের হাতের ওপর থেকে সুমুর হাত সরে গেল। শেরাজ ব্যাকুল হয়ে উঠতেই স্পটলাইট পড়ল র্যাম্পের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সুমুর ওপর।
“জাগি, জাগি শোয়ি না মে সারি রাত
তেরে লিয়ে!
ভিগি, ভিগি পালকে উদাছ
তেরে লিয়ে!
আখিয়া বিছায়ি মেনে তেরে লিয়ে
দুনিয়া ভুলায়ি মেনে তেরে লিয়ে!”
শেরাজ ব্লেজার খুলে আইয়ুবের হাতে দিয়ে এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। পার্টিতে উপস্থিত সকল গেস্ট আর শেরাজের ফ্রেন্ডরা একসাথে হুল্লোড় করে উঠল। শেরাজ গিয়ে সুমুর সাথে নাচে তাল মেলাল। দুজনে ঠোঁট গানের তালে তালে নড়ছে।
“ওওও বিখরি তেরি খুশবুমে,
মেরি জিন্দেগী কি তালাশ মে!
ডুবে লামহে মেরে,
হার পাল তেরে এহাসাছ মে!
মেরে খাব কেহেনে লাগে,
পালকো মে রাখলে ইনহে!
থোরা চ্যান মিল যায়েগা,
তু ইশারা কার দে ইনহে!”
ড্যান্স শেষ হতেই সকলে হাততালি দিল। শেরাজের চোখমুখ অস্বাভাবিক। রাগে লাল হয়ে গেছে তার চোখ। সে আইয়ুবদের কাছে গিয়ে বলল,
“সুমুর ওপর আক্রমণ হতে যাচ্ছিল। রিভলবার তাক করা হয়েছিল।”
আইয়ুবরা সকলে চোখ বড় করে তাকাল। রাহিন ভীতু কন্ঠে বলল,
“তুই কীভাবে জানলি?”
“ড্যান্সের ভেতর আমার চোখ ওপরে করিডরের দিকে যায়। সেখানে একজন সুমুর দিকে গান তাক করে রেখেছিল। স্যান্ডি সবটা ম্যানেজ করে নিয়েছে।”
আইয়ুব বলল,
“শয়তান ভয় পাচ্ছে, এস.কে।”
ভ্রু কুঁচকালো শেরাজ।
“মানে?”
“তুই এখনো চুপ করে আছিস। শয়তান ভয় পেয়ে যাচ্ছে।”
শেরাজ তেড়ে যেতেই সারবাজ আটকালো তাকে। শেরাজ রাগ কন্ট্রোল করে বলল,
“তোরা সকলে আজ আমাদের বাড়িতে যা। আর হ্যাঁ, সুমুকে সাবধানে বাড়িতে নিয়ে যাবি। মনে রাখিস, আমার জানটা তোদের ভরসায় ছেড়ে যাচ্ছি। ওকে সাবধানে বাড়িতে নিয়ে যা।”
“সুমুকে কি বলব?”
“তোদের কিছু বলতে হবেনা। আমি বলে যাচ্ছি।”
“ওকে!”
শেরাজ সুমুর কাছে গেল। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কি হয়েছে আপনার? কোনো সমস্যা?”
“না! শোনো সারবাজদের সাথে খেয়ে বাড়িতে চলে যাও। এখানে আর থাকতে হবেনা। আমি মামুকে বলে দিচ্ছি।”
“কিন্তু, কেনো?”
“কারণ, কাল আমার আফগান মিনি মার্টের ওপেনিং হবে। একজন কর্মী কল করে জানালো, কি জানো একটা প্রবলেম হয়েছে। আমি স্যান্ডিকে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন, আমাকেও যেতে হবে।”
“আপনি খেয়ে যাবেন না?”
“না, আমি বাহির থেকে খেয়ে নিব। সাবধানে বাড়িতে চলে যাও।”
সুমু মাথা নাড়াল। শেরাজ আফতাব চৌধুরীকে বলে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল।
দূর থেকে একজোড়া চোখ সবটা দেখল। সে আফসোসের সূরে বলল,
“মিশন ফেল!”
লোকটা হাসল। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“খেলা তো সবে শুরু হলো, সুন্দরী।”
সুমুরা সকলে হালকা খেয়ে আফতাব চৌধুরীদের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ির উদ্দেশ্যে। সুমু খুব খুশি হলো, আজ রাতে রাহিন খান ম্যানশনে থাকবে শুনে। তবে তার মনের মধ্যে খান সাহেবের চিন্তা।
ঘরটা অন্ধকার, দেওয়ালে শিকল ঝুলে আছে। এক কোণে জ্বলছে একটিমাত্র বাতি। বাতিটার আলো ঠিক যতটুকু দরকার, ততটুকুই দেয়। ভয় দেখানোর জন্য যথেষ্ট, বাঁচার আশার জন্য যথেষ্ট নয়। ঘরের দেয়ালে ধাতব শব্দ বাজছে। শিকলের ঘষাঘষি, দরজার ধাতব লক খুলছে ধীরে ধীরে। বাতির নিচে পড়ে আছে ছেলেটা। চোখ বন্ধ করে রেখেছে। মনে মনে হয়তো ভেবেই নিয়েছে, আজই তার শেষ দিন। ছেলেটার হাত দুটো শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। রক্ত জমে আছে তার মুখে, গলায়, কাপড়ে। হাত-পা বাঁধা, মুখে কাপড় গোঁজা। মাথা নিচু, চোখে আতঙ্ক।
হঠাৎ দরজাটা খুলে যায় ঝাঁং করে। দরজা খুলে ধীর পায়ে ভিতরে ঢোকে শেরাজ। তার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে স্যান্ডি। তীব্র চুপচাপ, চোখে হিসেবি শীতলতা। শেরাজ গিয়ে ছেলেটার সামনে দাঁড়াল। পরনে ব্ল্যাক ব্লেজার। দুজনের চোখেই অদ্ভুত নীরবতা, যেন এই নিঃশব্দতাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। শেরাজের চোখে ঠান্ডা আগুন, ঠোঁটে হালকা ঘৃণা মেশানো হাসি। সে নিচু গলায় বলল,
“আমার কলিজার দিকে হাত বাড়ানোর জন্য তোর কলিজার এত সাহস কীভাবে এলো? খুন করতে চেয়েছিলি, তাই তো?”
স্যান্ডি এসে ছেলেটার মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দিল। ছেলেটা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আ… আমি ভুল করে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দিন।”
শেরাজ এগিয়ে এসে ছেলেটির চোখে চোখ রাখল।
“তুই শুধু ভুল করিসনি। তুই আজ আমার বুক থেকে আমার কলিজাটা বের করে নিতে চেয়েছিলি। আর এখন মৃত্যুর ভয় পাচ্ছিস? আজ থেকে আমি তোর সব ভয়কে এক এক করে সত্যি করে তুলব।”
ছেলেটা কাঁপে, চোখে জল, মুখে কোনো শব্দ নেই। সান এবার এগিয়ে এলো। হাতে একটা লোহার বক্স। সে বক্স খুলে দিল শেরাজের হাতে। ভেতরে সেই বন্দুকটা, যেটা দিয়ে ছেলেটা সুমুকে মারতে চেয়েছিল।
শেরাজ হাসল। এই হাসিতে মুগ্ধতা নেই, আছে ধ্বংস আর রাগ। সে ধীরে ধীরে হাঁটুমুড়ে বসল ছেলেটার সামনে।
“আজ আমার সুইটহার্টের গায়ের যদি এক ফোঁটা রক্ত তোর এই রিভলবারের বুলেটের দ্বারা বের হতো, তাহলে আজ এই আলো তুই দেখতে পেতিস না। কিন্তু এখন আমি তোর সাথে এমন কিছু করব, যা মৃত্যুর থেকেও ভয়ংকর।”
ছেলেটা কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসল। রক্ত লেগে আছে মুখে, চোখ লাল। ছেলেটা গলা কেঁপে উঠল। মুখে অস্পষ্ট স্বীকারোক্তি,
“আ… আমি বসের কথা অনুযায়ী কাজ করছিলাম, বিশ্বাস করুন। আমাকে মাফ করে দিন।”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“তুই আমার কলিজার দিকে রিভলবার তাক করেছিস, আর এখন বলছিস তুই শুধু তোর বসের কথা অনুযায়ী কাজ করছিস ? আচ্ছা তাহলে বল, কে সে?”
“আমি বেইমানি করতে পারব না। তার নাম বললে, সে আমাকে মেরে ফেলবে।”
শেরাজ উচ্চস্বরে হেসে বলল,
“আর আমি কি তোকে আদর করব? তবে হ্যাঁ, আমি তোকে একবারে মারব না। তোকে আমি ঠিক সেই পরিমান যন্ত্রণা দিব, যে পরিমাণ যন্ত্রণা দিলে তুই আমার সামনে হাঁটুমুড়ে বসে বলতে বাধ্য হবি, আমি কেনো তোকে এখনও মারছিনা। তুই আমার পায়ে পড়ে মৃত্যু ভিক্ষা চাইবি।”
কথাগুলো বলে শেরাজ রহস্যময়ী হাসি দিল। মুহুর্তেই তার হাসির মুগ্ধতা কেটে গিয়ে ভেতরের দানব জেগে ওঠল। স্যান্ডি হাতে তুলে নিল গ্লাভস। সে একটু ভেবে বলল,
“স্যার! ওকে বিষ দিয়ে মারি?”
“না, এত সহজে ও শেষ হবে না। এই র্কীটটা প্রতিদিন জেগে উঠবে, আর ভাববে আজ হয়তো আমি মরব, কিন্তু, মরবে না। কারণ মৃত্যু ওকে আমি দিব না। আজকে থেকে আমাদের এই ঘরই হবে ওর নতুন ঠিকানা। আমি রিকোয়েস্ট করা বা এক কথা বারবার বলিনা। আজকের পর ওর সাথে প্রতিদিন এমন কিছু করবে, যাতে ও নিজে ওর বসের নাম বলে।”
স্যান্ডি মাথা নেড়ে বলল,
“ওকে, স্যার!”
ছেলেটা এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠল। হাত জোড় করে বলল,
“ছেড়ে দিন আমাকে। আমি আর এ ভুল কোনদিনও করব না। আমাকে ক্ষমা করে দিন।”
শেরাজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুই যা করেছিস, সেটা ক্ষমার যোগ্য না। আর আমার কলিজার দিকে হাত বাড়ানো মানেই আমার রাগের আগুনে ঘি ঢালা। সুমুকে আঘাত করার চিন্তা করা মানেই আমার শেষ রাগ আর সুযোগ—তোর উপর। তাই ক্ষমা করার মতো কোনো সুযোগ নেই।”
শেরাজ ইশারা করল স্যান্ডিকে। স্যান্ডি ধীরে ধীরে একটা হ্যাভি কর্পস কাটার নিয়ে এলো। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো ছেলেটার। সে কান্নাজড়িত গলায় বলল,
“আমাকে মারবেন না, প্লিজ। আমাকে ছেড়ে দিন।
শেরাজ গ্লাভস পরে ছেলেটার গলায় হাত রেখে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুই মরবি না। তুই বাঁচবি। কিন্তু, নিজের হাতদুটো ছাড়া। কারণ, তোর এই হাত দিয়েই তুই আমার বউয়ের বুকে গুলি ছুঁড়তে চেয়েছিলি।”
ছেলেটা কাঁদতে থাকল, মাফ চাইতে থাকল। তার শরীর কাঁপছে, চোখ দিয়ে গলগল করে জল পড়ছে।
“প্লিজ, আমি আর কিছু করব না। আমার হাত না…”
স্যান্ডি এগিয়ে এলো ছেলেটার দিকে। শেরাজ ফিসফিস করে আবারও বলল,
“তুই জানিস, একটা শরীরের সবথেকে বেশি যন্ত্রণাদায়ক জায়গা কোথায়? সেইটা, যখন তীব্র অসহ্য যন্ত্রণায় আত্মা বেরিয়ে আসতে চায়, অথচ মৃত্যু আসে না। আমি সেই জায়গাটায় তোকে নিয়ে যাব।”
স্যান্ডি গ্লাভস পরে মেশিনটা তুলে নিল। সে ছেলেটার চোয়ালের নিচে একটা ইনজেকশন ঢুকিয়ে দিল। ছেলেটা অচেতন হওয়ার ঠিক আগে তার হাত দুটো কেটে নেওয়া হলো। চেতনা থাকার ফলে গলা কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠল ছেলেটা।
“ওকে বাঁচিয়ে রাখা চাই। ডাক্তার এনে ওর চিকিৎসা করাও।”
কথাগুলো বলে শেরাজ বেরিয়ে যাওয়ার আগে শেষবার পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
“আমার সুমুকে আঘাত করার শাস্তি, মৃত্যু না। শাস্তি, জীবিত থেকে প্রতিদিন মরার মতো কষ্ট পাওয়া। আর আমি সেই কষ্টটাকেই তোর জন্য নিখুঁত করে তুলব।”
বেরিয়ে গেল শেরাজ। ছেলেটা এখনো চেতনা হারায়নি। স্যান্ডি বাঁকা হেসে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৩৮
“আমার স্যার ম্যামের জন্য একদিকে মোমের মতো, অন্যদিকে শত্রুর জন্য আগুনের থেকেও ভয়ঙ্কর। সে যখন কাউকে এই ঘরে ধরে আনে, তখন শুধু শাস্তি নয়, হয় একরকম মানসিক খেলা, প্রতিশোধের সূক্ষ্ম ছায়াচ্ছন্নের প্রতিফলন। যা তোর মতো চামচাদের ধারনার বাহিরে। মনে রাখবি, যিনি ভালোবাসায় কোমল, তার ভেতরে প্রতিশোধের আগুন ভয়ংকর।”
কথাগুলো বলে ছায়ার মতো বেরিয়ে গেল স্যান্ডি। ছেলেটা পড়ে রইল অন্ধকারে নিজের কৃতকর্মের জন্য মৃত্যুর অপেক্ষায়। তবে মৃত্যু কি তার এতো সহজ আসবে, হয়তো না।
