খান সাহেব পর্ব ৩৮
সুমাইয়া জাহান
পাঁচটার এলার্ম বাজতেই ঘুম ভাঙাল শেরাজের। চোখ বন্ধ রাখা অবস্থায় হাতরে এলার্ম বন্ধ করল সে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। সুমু আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে তার বুকের ওপর ঘুমিয়ে আছে। শেরাজ ভাবল, “রাতে সে তার বউয়ের বুকের মধ্যে ছিল, আর এখন তার বউ তার বুকের মধ্যে।” ব্যাপারটা দেখে আলতো হাসল সে। সুমুর ঘুম ভাঙানোর জন্য দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এলো তার। সুমু কোমর সমান চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। সেখান থেকে কিছু চুল হাতে নিলো শেরাজ। চুলগুলো দিয়ে সুমুর কানের কাছে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। সুমু প্রথমে কয়েকবার বিরক্ত হয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিল। শেরাজ একইভাবে বারবার বিরক্ত করাতে উঠে বসল সুমু। শেরাজ হাসতে হাসতে বলল,
“আগে জানতাম না যে, বউকে জ্বালানো এতো মজা।”
সুমু কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পেল না। সারাজীবন সে দেখল ওয়াইফরা হাজব্যান্ডদের জ্বালায়, কিন্তু তার ক্ষেত্রে উল্টো। তার হাজব্যান্ড তাকে জ্বালাচ্ছে। সুমু চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
“নামাজ পড়বেন না?”
“হুম পড়ব। চলো ওযু করে আসি। তারপর আমি আবার জিম সেন্টারে যাব।”
দুজনে একসাথে ওযু করে নামাজে দাঁড়াল। নামাজ শেষ করে রোজকারের মতো একে অপরের জন্য দোয়া করল। শেরাজ সুমুকে কাছে টেনে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমু জায়নামাজ ভাঁজ করে রাখল। শেরাজ জিম সেন্টারে যাবার জন্য রেডি হতে গেল। সুমু বেডের ওপর ফোন নিয়ে বসল। শেরাজ রেডি হয়ে এসে সুমুর কপালে ছোট করে ঠোঁট ছুঁয়ে “বাই সুইটহার্ট” বলে বেরিয়ে গেল। সুমুও আলতো হেসে কোরিয়ান ড্রামা দেখাতে মন দিল।
পাঁচ মিনিট বাদে শেরাজ আবারও রুমে ফিরে এলো। সুমু ফোন রেখে বেড থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“ফিরে এলেন যে? যাবেন না?”
শেরাজ একবার সুমুর দিকে তাকিয়ে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি বের করে বলল,
“ভাবছি আজ ওয়ার্কআউট বাড়িতেই করব।”
“বাড়িতে?”
“হুম! আজ চেস্ট ডে ছিল। তাই ভাবলাম বাড়িতেই করি।”
“ওহ আচ্ছা, ওকে করেন।”
শেরাজ গায়ের টি-শার্ট খুলে বলল,
“হুম, কাম সুইটহার্ট।”
সুমু এগিয়ে গেল। সে টি-শার্ট সুমুর হাতে দিয়ে বলল,
“আমি পুশ আপ দিব, তুমি আমার পিঠের ওপরে বসে বা শুয়ে থাকবে। আজ তোমার ওয়েইট আমার ডাম্বেল হবে।”
সুমু ভ্রু কুঁচকালো।
“আপনি এইটার জন্য আজ বাড়িতে ওয়ার্কআউট করতে চাইছেন, তাই না?”
“ইন্টেলিজেন্ট গার্ল।”
শেরাজ মেঝেতে মিরর ডোরের সামনে গিয়ে পুশ আপ দেওয়ার জন্য রেডি হল। সুমু আবারও বেডের ওপর গিয়ে বসে বলল,
“আমি এইসব পারব না। আপনি দয়া করে জিম সেন্টারে যান।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমু বেডের অপরপ্রান্তে গিয়ে বলল,
“আমি পড়ে যাব, খান সাহেব। আর তার থেকেও বড় কথা, আমি আপনার শরীরের ওপর পা দিতে পারব না। আপনি আমার কতো সিনিয়র বলুন তো? আর তার থেকে আরও বড় কথা, আপনি আমার হাজব্যান্ড।”
“তোমার হাজব্যান্ডই তোমাকে বলছে, এসো সুইটহার্ট। তুমি নরমালি বসবে, এসো।”
“আমি পড়ে যাব।”
“পড়বেনা, এসো।”
“আপনার কষ্ট হবে।”
এই পর্যায়ে এসে শেরাজ হেসে ফেলল। সুমু মুগ্ধ নয়নে তার খান সাহেবকে দেখছে। শেরাজ হাসির তালে তালে সুমুর কাছে এগিয়ে গেল। সুমু কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধরে ফেলল সুমুকে। হাসি থামিয়ে বলল,
“তোমার থেকেও বেশি ওয়েইটের এক একটা ডাম্বেল তুলি, সুইটহার্ট। নাও, কাম।”
শেরাজ সুমুকে বেড থেকে নামাল। মিরর ডোরের সামনে মেঝের ওপর উঁপুর হয়ে শুয়ে সুমুকে চোখ দিয়ে ইশারা করল পিঠের ওপর উঠে বসার জন্য। সুমু অস্বস্তি অনুভব করল। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
“কুইক সুইটহার্ট!”
সুমু উঠে বসল শেরাজের পিঠের ওপর। শেরাজের কাঁধ শক্ত করে ধরে বসে রইল সে। শেরাজ কিছু একটা ভেবে সুমুকে নামতে বলল।
সুমু হাফ ছেড়ে বাঁচার মতো নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ মিররের মধ্যে দিয়ে সুমুর মুখটা দেখে আলতো হেসে বলল,
“ফোনটা নিয়ে এসো। আমি পুশআপ দেওয়ার সময় মিরর ভিডিও নিবা।”
সুমুর আশায় পানি ফেলে দিল শেরাজ। মুখটা গোমড়া করে ফোনটা নিয়ে এলো সুমু। সে আবারও উঠে বসল শেরাজের পিঠের ওপর। সুমু ব্যাক ক্যামেরা অন করল। শেরাজ ধীরে ধীরে পুশআপ দেওয়া শুরু করল। প্রথম দিকে সুমু ভয় পেলেও আস্তে আস্তে হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। শেরাজ সুমুর হাসিমাখা মুখটা দেখে নিজেও আলতো হেসে বলল,
“ক্যান ইউ স্লিপ অন মি, সুইটহার্ট?”
সুমু মৃদু হেসে জবাব দিল,
“ইয়েস!”
শেরাজ আলতো হেসে পুশআপ দেওয়া অফ করে দিল। সুমু উঠে দাঁড়াল। চিপসের প্যাকেট এনে শেরাজের ওপর শুয়ে পড়ল সে। শেরাজ আবারও পুশআপ দেওয়া শুরু করল। সুমু চিপস খেতে খেতে বলল,
“ব্যাপারটা আমার কাছে খুব মজার লাগছে। কিন্তু, আপনার কি কষ্ট হচ্ছেনা?”
“রিয়াজ ওয়েটস মোর দ্যান ইউ। বাট টুডে’স পুশ-আপস আর গিভিং মি টুয়াইস অ্যাজ মাচ স্ট্রেংথ অ্যাজ ইউজুয়াল।”
সুমু চিপসের প্যাকেটটা মেঝের ওপর রেখে শেরাজের পুশআপ দেওয়া অবস্থায় উঁপুর হয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে বলল,
“আজ এতো বেশি শক্তি বাড়ার কারণটা কি?”
“ইউ সুইটহার্ট!”
সুমু আলতো হেসে চোখ বন্ধ করে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তার খান সাহেবকে। শেরাজ প্রেয়সীর প্রশান্তি দেখে আলতো হাসল।
আটটার দিকে দুজনে একসাথে নিচে নামল ব্রেকফাস্ট করার জন্য। শেরাজ অফিসে যাবার জন্য একবারে রেডি হয়ে এসেছে। রিয়াজ আর শাহরুখ সকাল সকাল ব্রেকফাস্ট করে একজন টিউশনিতে, তো একজন একাডেমিতে চলে গেছে। ফিরোজা সোফায় বসে ফোনে কার্টুন দেখছে। বাকিরা সকলে ডাইনিংরুমে উপস্থিত। ইশিতা সকলকে খাবার সার্ভ করছে। শেরাজ চেয়ারে বসে সুমুকে বসতে বলল। সুমু অস্বস্তিবোধ করল। মৃদুস্বরে বলল,
“ইশিতার সাথে খেয়ে নেব।”
অনন্যা খাতুন ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। শেরাজ কিছু বলার আগেই তিনি বললেন,
“ইশিতার সাথে খাওয়ার কি আছে? ওহ আচ্ছা! খান ম্যানশনে তো এখন আবার পলিটিক্স চলছে। যাই হোক, ইশিতা এখনই খেতে বসবে। বাকি যারা আছে তারাও যেন বসে পড়ে।”
সুমু চুপচাপ বসে পড়ল। ইশিতার উদ্দেশ্যে বলল,
“ফিরোজা খেয়েছে?”
“ভাইয়া বাড়িতে থাকলে, ও ভাইয়াকে ছাড়া খায় না।”
কথাটা বলে ইশিতা ফিরোজাকে আনতে গেল। সুমু চাপাস্বরে শেরাজকে বলল,
“যখন আপনার আর ফিরোজার সম্পর্কে জানতাম না, তখন কি ভাবতাম জানেন?”
“ফিরোজা আমার মেয়ে?”
“আপনি কীভাবে জানলেন?”
“রাহিন বলেছিল। আর শুধু তুমি না, আমার সব ফ্যান ফলোয়ারসরা তখন এইটাই ভাবত।”
“স্বাভাবিক নয় কি?”
“অবশ্যই স্বাভাবিক!”
“আপনাদের দুজনের চেহারায় আংশিক মিল আছে।”
“সময় হোক, এমন কিছু প্রিন্স আর প্রিন্সেস আসবে, যাদের শুধু ফেস নয়, স্বভাব- চরিত্রের সাথেও তোমার আর আমার অধিকাংশ মিল থাকবে।”
সুমু মুচকি হেসে খাবারের দিকে মন দিল। ইশিতা ফিরোজাকে নিয়ে এলো। শেরাজ ফিরোজাকে কোলের ওপর বসিয়ে খাইয়ে দিতে লাগল। আরিয়ান চোরাচোখে একবার সুমুর দিকে তাকাল। অনন্যা খাতুন খাবার চিবুতে চিবুতে শেরাজদের উদ্দেশ্যে বললেন,
“আজ তোমরা তিন ভাই একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে পারবে?”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সারাবাজ, অনন্যা খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেনো বড়মামনি? কোনো প্রয়োজন?”
“হুম! গতকাল আমার বড় ভাইজান আমাদের সকলকে ইনভাইট করেছেন। শেরাজ বিয়ে করেছে, সেই উপলক্ষ্যে উনি আজ রাত আটটায় একটা পার্টি থ্রো করেছেন। আমাকে কালকেই বলেছিল, কিন্তু, কাল যা হলো, তাই আর বলা হয়নি।”
“মামু যে আমাদের জন্য পার্টির অর্গানাইজেশন করছে, এইটা কি উনি আমার থেকে পারমিশন নিয়ে করেছে? নাকি একবারও আমাকে জিঙ্গাসা করে করেছে?”
“সবকিছু তোমাদের মতামত নিয়ে করতে হবে নাকি?”
“অবশ্যই নিতে হবে। এখন কি আমি সেই ছোট শেরাজ আছি, যে তোমাদের সিদ্ধান্ত আমার ওপর চলবে। আমার আর আমার ওয়াইফের জন্য পার্টি থ্রো করছে, কিন্তু একবারও আমাকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করেনি, আজীব।”
রোজা খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমি পাপাকে বলে দিচ্ছি পার্টি ক্যানসেল করে দিতে।”
অনন্যা খাতুন রোজার হাত ধরলেন।
“বস রোজা, তুই ভাইজানকে বারণ করবিনা।”
রোজা রাগিস্বরে বলল,
“কেনো বারণ করব না, ফুফুমনি? তোমার ছেলে চেঞ্জ হয়ে গেছে। পাপা ওদের জন্য পার্টি রেখেছেন, আর তোমার ছেলে বলছে, তার অনুমতি কেনো নেওয়া হলো না। কই আগে তো এমন ছিল না তোমার ছেলে।”
অনন্যা খাতুন শেরাজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এইটা তোমাদের বিয়ের গিফট। আর তিনি তো তোমাকে কল করেছিলেন সবটা জানানোর জন্য, তুমি কল পিক করোনি।”
শেরাজ টিস্যু দিয়ে ফিরোজার মুখ মুছে দিয়ে বলল,
“এতো কথা শুনতে চাইনা। আমি আর সুমু কোথাও যাচ্ছিনা।”
“যাচ্ছোনা মানে? তাহলে পার্টি কাদের জন্য রাখা হয়েছে?”
“সে বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। তোমার ভাইকে কল করে, না করে দাও। আর তাছাড়া আমার অফিসে কাজ আছে। এইসব পার্টি অ্যাটেন্ড করার মতো সময় আমার হাতে নেই।”
কথাগুলো বলে শেরাজ ফিরোজার গালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিরোজাকে কোলে থেকে নামিয়ে দিয়ে সুমুকে “আসছি” বলে চলে গেল। অনন্যা খাতুনের ডাক কানে নিল না সে। অনন্যা খাতুন খাওয়া ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুমুর উদ্দেশ্যে বললেন,
“ওকে বোঝাও। আমার ছেলে তো এখন তোমার কথা ছাড়া আর কারো কথার দাম দেয় না, তাই ওকে বোঝাও। আমি আমার সম্মান তোমাদের জন্য নষ্ট করতে পারব না। নিজেকে তো এই বাড়ির বউ বলে দাবি করো। তোমার মামাশশুর সবাইকে ইনভাইট করে ফেলেছেন। এখন তোমার মামাশশুরের সম্মানের সাথে আমার সম্মানটাও জড়িয়ে আছে। আমার ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের চোখের সামনে তোমাদের জন্য আমাকে যেন ছোট হতে না হয়।”
কথাগুলো বলে অনন্যা খাতুন চলে গেলেন। রোজাও চলে গেল অনন্যা খাতুনের পিছু পিছু। সারবাজের ফোনে কল আসতেই, সে কোনোমতে খেয়ে আরবাজকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সুমু না খেয়ে বসে রইল। ইশিতা সুমুর কাঁধে হাত রাখল। সুমু তাকাল ইশিতার দিকে। আরিয়ান সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। সাহাবাজ সাহেব বললেন,
“কষ্ট পেওনা মামনি। শেরাজকে বোঝাও। অন্য সময় হলে আমি বারণ করতাম। কিন্তু, কালকের ঘটনার জন্য এমনিতেই তোমার শাশুড়ি অনেক রেগে আছেন। আর এদিকেও সবাইকে নাকি ইনভাইট করা হয়ে গেছে। এখন এইটা রেপুটেশনের ব্যাপার। তুমি বোঝালে শেরাজ অবশ্যই বুঝবে।
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“আপনারাও যাবেন, আব্বু?
“না মামনি। আমি, তোমার ছোটবাবা, তোমার ছোটমামনি– আমরা কেউ যাব না। আমাদের এইসব ভালো লাগেনা। বাকিরা সকলে যাবে।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। একে একে সকলে নাস্তা করে উঠে চলে গেল। সুমু ফিরোজাকে সাথে নিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
ছাদে একা দাঁড়িয়ে বিকালবিলাস করছে সুমু। বিকালবিলাস নামটা তার রাখা। এই বাড়িতে আসার পর আজ প্রথম ছাদে পা রাখল সে। বিকালের আকাশটা সবসময় অপূর্ব সুন্দর লাগে তার। এই সময়টাতে পাখিদের নিজ গন্তব্যে ফেরার তাড়া থাকে। পরিবেশটা হালকা শীতল আর চোখ ধাঁধানো সুন্দর থাকে। সুমু আপন মনে সমুদ্রের শান্ত পানির দিকে তাকিয়ে আছে। এতক্ষণ দোল খেতে খেতে এখন সে বোরিং ফিল করছে।
শেরাজদের বাড়ির ছাদটা খুব সুন্দর করে সাজানো। নানান রকম ফুল আর ফলের গাছ দিয়ে সাজানো ছাদটা। ছাদের ঠিক মাঝখানে দোলনা রাখা। ছাদের ডানপাশে একটি আর্চ রাখা। পুরো আর্চটিকে জড়িয়ে আছে মাধবীলতা ফুলের গাছ আর মরিচ বাতি। আর্চটির সামনে রাখা আছে দুটি ডিভান। ডিভানের মধ্যে রাখা একটি সেন্টার টেবিল। ছাদের ডানপাশটায় গ্রিণ গ্লাস কার্পেট বিছানো। দূর থেকে দেখতে একদম সবুজ ঘাসের মতো লাগে। সুমু এসব দেখে আপন মনে কিছু একটা ভাবছে। বিকালের ফুরফুরে হাওয়াতে তার অবাধ্য চুলগুলো আর ওড়নাটা মুক্ত পাখির মতো উড়ছে। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন সুমুর চোখ আটকে ধরল। সুমু ভাবনার মাঝে বাঁধা পড়ল। আলতো হেসে হাতদুটো একবার ছুঁয়ে বলল,
“ইশিতা?”
ইশিতা সুমুর চোখ ছেড়ে দিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
“কীভাবে বুঝলে?”
“তোমার শরীর থেকে ফ্রেন্ড ফ্রেন্ড একটা স্মেল পাই আমি।”
“ফ্রেন্ড ফ্রেন্ড স্মেল? ইন্টারেস্টিং তো। তা আর কার কার থেকে কিসের কিসের স্মেল পাও তুমি?”
“যেমন ধরো, আমার খান সাহেবের শরীর থেকে হাজব্যান্ড, হাজব্যান্ড স্মেল পাই। শাশুড়ির থেকে শাশুড়ি, শাশুড়ি। রিয়াজের থেকে মিনি ফ্রেন্ড, মিনি ফ্রেন্ড। আরও অনেক আছে।”
ইশিতা হাসল সুমুর ফানি কথা শুনে। সে ভেবে বলল,
“কই আমি তো আমার হাজব্যান্ডের থেকে এমন কোনো স্মেল পাইনা।”
“ভালো করে অনুভব করার চেষ্টা করো, তুমিও পাবে।”
“আচ্ছা, করব। কিন্তু তুমি না ঘুমিয়ে এখানে কী করো?”
“বিকালবিলাস করছি।”
“বিকালবিলাস?”
“হুম!”
“তোমার এই বিকালবিলাসের সাথে যদি এককাপ চা বা কফি হয়, তাহলে কেমন হবে?”
“জমে যাবে। তবে চা হলে।”
“তাহলে, তুমি থাকো। আমি চা নিয়ে আসছি।”
“তুমি একা কেনো যাবে? আমিও যাই, চলো।”
“না সুমু, তুমি এ বাড়ির রুলস ভুলে গেছ?
“আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি যাও।”
ইশিতা হাসি মুখে ছাদ ত্যাগ করল। সুমু আবারও সমুদ্রের পানির দিকে তাকাল। মিনিট খানেক বাদেই আবারও কেউ সুমুর চোখ আটকে ধরল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“ইশিতা আবারও?”
তবুও ছাড়ল না সুমুর চোখ। সুমু হাতজোড়া ছুঁয়ে দেখল। মুহুর্তেই সুমুর হাসি নিভে গেল। হাতজোড়ার মালিক সুমুর চোখ ছেড়ে দিল। সুমু পিছন ফিরে তাকিয়ে ভয় পেয়ে কিছুটা পিছিয়ে গেল। সামনে তাকিয়ে বুকে ফুঁ দিয়ে বলল,
“এসব কি ধরনের অসভ্যতা? আর আপনি এখানে কী করছেন?”
আরিয়ান সুমুর পাশে এসে দাঁড়াল। সুমু সরে গিয়ে কিছুটা দূরে দাঁড়াল। আরিয়ান ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
“আমি ছাদে ইশিতা আসার পরেই এসেছি। তোমরা আমাকে লক্ষ্য করোনি, কারণ আমি আর্চের ওই সাইডে ছিলাম। তখন শুনলাম, তুমি নাকি মানুষের শরীরের স্মেল অনুভব করে বলে দিতে পারো, আসলে সে কে। তাই আমিও একটু ট্রাই করে দেখলাম আরকি। কিন্তু, তুমি তো পারলেনা।”
“কিছু অনুভূতি আমরা আমাদের খুব প্রিয় আর কাছের মানুষদের ক্ষেত্রেই অনুভব করি।”
“তাহলে কি আমি তোমার কাছের মানুষ না?”
“অবশ্যই না!”
কথাগুলো বলে সুমু চলে এলো। সে ছাদের দরজার কাছে আসতেই ইশিতার মুখোমুখি হলো। ইশিতা আলতো হেসে বলল,
“চলে যাচ্ছো যে?”
সুমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইশিতা সামনে তাকিয়ে দেখল আরিয়ান তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইশিতা চাপাস্বরে বলল,
“আরিয়ান ভাইয়া এখানে কী করছে?
“জানিনা। চলে রুমে যাই।”
সুমু ইশিতার হাত ধরে নিচে চলে এলো। দুজনে মিলে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। ইশিতা সুমুর হাতে চায়ের কাপ দিল। সুমু কাপটা হাতে নিয়ে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইশিতা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“কি হয়েছে সুমু? কোনো সমস্যা?”
“তখন সকলে মিলে ওনাকে বোঝাতে বলল। রাত আটটায় আমাদের যেতে বলা হয়েছে। এখন চারটা দশ বাজে। আমি কিছুইতে বুঝতে পারছিনা ওনাকে কীভাবে রাজি করাবো।”
“দেখো সুমু, সকলের ধারনা ভাইয়া তোমার কথা শুনবে। আমারও তাই মনে হয়। তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো।”
“আচ্ছা, একটু দাড়াও।”
সুমু রুমে এলো। বেডের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে আবারও বেলকনিতে গিয়ে শেরাজকে কল করলো। দুবার রিং হতেই শেরাজ কল রিসিভ করল।
“আসসালামু ওয়ালাইকুম, খান সাহেবা!”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, খান সাহেব!”
“তো ম্যাডাম, হঠাৎ কল করলেন যে?”
সুমু কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“অফিসে কি অনেক কাজ?”
“কেনো বলুন তো ম্যাডাম?”
“ওই আসলে, আমার ভালো লাগছেনা আপনাকে ছাড়া। আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবেন? এই ধরুন ছয়টার দিকে?”
“পারব। কিন্তু ভালো লাগছেনা কেনো? ফিরোজা, ইশিতা ওরা কোথায়?”
“ইশিতা আমার কাছেই আছে। আর ফিরোজা ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ভালো না লাগার কারণটা আপনি।”
“তাই নাকি ম্যাডাম? হাজব্যান্ডকে এতো মিস করছেন আপনি?”
“হুম! আর তাছাড়া আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
“কী কথা বলুন, ম্যাডাম?”
“এখন না। আপনি আগে বাড়িতে আসুন, তারপর বলব।”
“ওকে সুইটহার্ট! আমি ছয়টার আগেই চলে আসব।”
“সত্যি?”
“তিন সত্যি!”
“আচ্ছা, তাহলে আপনি এখন কাজ করুন। আমি রাখছি।”
“ওকে সি ইউ, বাই।”
“বাই!”
কল কেটে দিল সুমু। হাসিমুখে ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাড়াতাড়ি বাসায় আসার জন্য রাজি হয়েছে। কিন্তু, পার্টিতে যাবার জন্য কী রাজি হবে?”
ইশিতা সুমুর হাত ধরে বলল,
“হবে সুমু। তুমি বললে অবশ্যই হবে।”
সুমু ভারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে চুমুক বসাল। সে জানেনা, তার খান সাহেব পার্টিতে যেতে বলার কথা শুনলে কীভাবে রিয়াক্ট করবে।
পাঁচটা চল্লিশে বাড়িতে ফিরল শেরাজরা। সুমু রুমের মধ্যে ফিরোজা আর রিয়াজের সাথে বল নিয়ে খেলছে। শেরাজকে রুমে আসতে দেখে রিয়াজ ফিরোজাকে নিয়ে অন্য রুমে চলে গেল। শেরাজ সুমুর কাছে এসে বলল,
“দেখলে আমার ছোট ভাইটা কতো ম্যাচিউর?”
“হুম! আপনি যান, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। আর হ্যাঁ, আপনি কী এখন কিছু খাবেন?”
“না। লাঞ্চ তো বাসা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, তুমি খেয়েছো?”
“হুম!”
“ওকে, শাওয়ার নিয়ে আসি। দেন শুনব তোমার কথা।”
“আচ্ছা!”
শেরাজ চলে গেল শাওয়ার নিতে। সুমু বেডের ওপর বসে অপেক্ষা করতে লাগল। পনেরো মিনিট বাদে শেরাজ চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো। ওয়ারড্রব থেকে টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করে পরে নিয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে সুমুর পাশে গিয়ে বসল।
“বলো সুইটহার্ট, কী বলতে চাও?”
“বলব। তবে আপনি রাগ করবেন না তো?”
“রাগ করার মতো কিছু? তাহলে থাক, বলার দরকার নেই।”
সুমু মাথা নিচু করে বসে রইল। শেরাজ সুমুর হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
“নির্ভয়ে বলো, আমি রাগ করব না।”
“যদি করেন?”
“তাহলে, আদর করে রাগ ভাঙিয়ে দিও।”
সুমু কিছুটা সময় নিয়ে বলল,
“আমাদের পার্টিতে যাওয়া উচিত। আম্মুর সম্মান জড়িয়ে আছে এখানে। আপনি আর না করবেন না। প্লিজ, চলুন।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল,
“এই ব্যাপারে আমি কোনো কথা শুনতে চাইনা। অন্য কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।”
“কেনো শুনতে চান না? আম্মুর সম্মানের কথা একবারের জন্য ভাবুন।”
“সুমু প্লিজ, বললাম তো যেতে চাইনা। প্লিজ, এই টপিকটা চেঞ্জ করো।”
“কি সমস্যা আপনার? কেনো যেতে চান না?”
“সেটা তুমি বুঝবেনা।”
“বুঝিয়ে বলুন।”
“তোমার এতো বোঝার দরকার নেই।”
সুমু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। সে আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে রইল। শেরাজ তাকাল সুমুর দিকে। ভারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেডের ওপর উঠে বসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল সুমুকে। সুমু ছ্যাঁত করে উঠল। শেরাজ আবারও জড়িয়ে ধরল তাকে। সুমু উঠে যেতে নিলেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“গেলে তুমি খুশি হবে?”
“হয়তো। তবে, আপনি যখন চাইছেন না, তাহলে থাক।”
“কিন্তু, আমার কাছে তো আমার সুইটহার্টের চাওয়াটা বেশি ইম্পর্টেন্ট।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ আবারও বলল,
“সময়মতো রেডি হয়ে নিও।”
সুমু খুশি হয়ে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ ভ্রু নাচাতেই সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শেরাজকে।
সাতটার দিকে বাড়ির প্রায় সকলে রেডি হয়ে নিচে নামল। সকলের সাথে অনন্যা খাতুনও যাচ্ছেন। সারবাজরা সকলে রেডি। ইশিতা ফিরোজাকে রেডি করে নিচে নামল। ইশিতার পরনে ব্ল্যাক সিল্কের শাড়ি। ফিরোজার পরনে গোল লং ফ্রক। ফিরোজাকে পুরো পুতুলের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে ইশিতা। সারবাজ ফিরোজাকে কোলে তুলে নিল। বাড়ির সকল পুরুষ সদস্যদের পরনে ব্ল্যাক ব্লেজার। আরিয়ান আর রোজা বিকালের দিকেই চলে গেছে তাদের বাড়িতে। সুমু আর শেরাজ এখনো নিচে আসেনি। অনন্যা খাতুন বললেন,
“যাদের জন্য পার্টি, তারা কই? আমরা অলরেডি অনেকটা লেট।”
সাহাবাজ সাহেব অনন্যা খাতুনকে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। অনন্যা খাতুন তাকালেন সিঁড়ির দিকে। শেরাজ আর সুমু হাত ধরে নেমে আসছে। দুজনে ঠোঁটে মিষ্টি হাসি। শেরাজের বরাবরের মতোই পরনে ব্ল্যাক ব্লেজার। সুমুর পরনে বেবি পিংক কালারের লেহেঙ্গা। দুজনকে অসম্ভব সুন্দর দেখতে লাগছে। অনন্যা খাতুন মুগ্ধ হয়ে তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। নিজের অজান্তেই তিনি বললেন,
“মাশাআল্লাহ্!”
সাহাবাজ সাহেব বড় চোখ করে তাকালেন তার বউয়ের দিকে। অনন্যা খাতুন স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি সমস্যা আপনার?”
“না! একটু আগে কিছু একটা শুনলাম মনে হলো।”
“কি শুনেছেন?”
“মাশাআল্লাহ টাইপ কিছু।”
“ভুল শুনেছেন আপনি।”
“ওহ আচ্ছা! ঠিক আছে যাও তাহলে।”
ইশিতা সুমু কাছে গিয়ে সুমুর পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরক করে বলল,
“ইউ আর লুকিং সো গর্জিয়াস।”
সুমু মুচকি হেসে বলল,
“থ্যাংক ইউ, ইশিতা। তোমাকেও খুব সুন্দর লাগছে।”
ফিরোজা দৌড়ে এলো সুমুর কাছে। সুমু হাঁটুমুড়ে বসল ফিরোজার সামনে। ফিরোজা সুমুর গালে টুপ করে চুমু খেয়ে বলল,
“মিত্তি এততা পরী।”
সুমু ফিরোজাকে বুকে জড়িয়ে নিল। শেরাজ ফিরোজাকে কোলে তুলে নিল। অনন্যা খাতুন সকলকে তাড়া দিল বেরোনোর জন্য। শেরাজ সারবাজের উদ্দেশ্যে বলল,
“ইশিতা, আরবাজ আর ফিরোজা আমাদের গাড়ি যাক। তুই মম, শাহরুখ আর রিয়াজকে নিয়ে আয়।”
সারবাজ সম্মতি জানিয়ে বাসা থেকে বের হলো। সুমু, সাহাবাজ সাহেব, শেহেজাদ সাহেব আর আফিয়া খাতুনের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শেরাজ ড্রাইভিং সিটে বসেছে। সুমু তার পাশের সিটে বসেছে। ইশিতা, আরবাজ আর ফিরোজা ব্যাক সিটে বসেছে। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে। চৌধুরী ম্যানশনে পৌঁছাতে শেরাজদের পাঁয়তাল্লিশ মিনিট মতো লাগবে। সুমু রাতের শহর দেখতে ব্যস্ত। শেরাজ খুব দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করছে। গাড়ির মধ্যে মৃদু আওয়াজে “যারা ছা দিলমে দে জাগাতু” গানটা বাজছে। শেরাজ, আরবাজ আর ফিরোজা গানে তালে তালে সুর মিলাচ্ছে।
খান সাহেব পর্ব ৩৭ (২)
পাতালঘরে আজ খুশির জোয়ার নেমেছে। ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে সেই মানব। সে আয়নাতে আরও একবার নিজেকে দেখে বলল,
“তুমি শিওর যে ওরা পার্টির জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছে?”
“ইয়েস বস।?! আমাদের লোকেরা ওদের বেরোতে দেখছে।”
“গুড! তোমাদের কি করতে হবে মনে আছে তো?”
“ইয়েস বস!”
“শুধু ইয়েস বস, ইয়েস বস করোনা। কাজটা আমার হওয়া চাই।”
“হয়ে যাবে, বস।”
“গুড!”
আবারও আট্টহাসিতে মেতে উঠল সেই মানব। আয়নাতে আরও একবার নিজেকে দেখে বেরিয়ে গেল পার্টির উদ্দেশ্যে
