খান সাহেব পর্ব ৪৫
সুমাইয়া জাহান
রাত তিনটা বাজে। হসপিটালের কেবিন রুম চুপচাপ নিঃস্তব্ধতা ছেঁয়ে আছে। কেবিন ঘরের দেয়াল জুড়ে হালকা নীল আলো। দেয়ালের কোণে স্যালাইন স্ট্যান্ড থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে। ইসিজি মেশিন থেকে একটানা বীট পিপ, পিপ, পিপ শব্দ করেই চলেছে। মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছে, ডানদিকে সোফায় ব্লাঙ্কেটা মুড়িয়ে বসে ঘুমাচ্ছেন মৌ সেন। তার পাশে কুঁকড়ে শুয়ে আছে রোজা। চোখের কোণে কান্নার দাগ শুকিয়ে গেছে।
আরিয়ান বিছানায় নিস্তেজ শুয়ে আছে। তার মুখে অক্সিজেন মাস্ক, হাত-পা তীব্রভাবে ব্যান্ডেজে মোড়া, কপালে কালশিটে, গালের বা’দিকে গভীর কাটা দাগ, বুকের বা পাশে হালকা নড়াচড়া হচ্ছে।
হঠাৎ তার চোখের পাতা কেঁপে উঠল। কিছুক্ষণের ঝাপসা দৃষ্টির পর সে চোখ খুলে আস্তে আস্তে তাকাল। দেয়াল, আলো, স্যালাইনের নীচে ঝুলে থাকা তার শরীরে সব অচেনা লাগছে। সে ধীরে মাস্ক সরাল। শুকনো ঠোঁট জোড়া হালকা খোলার চেষ্টা করল। ফিসফিস করে বলল,
“সু… সুমু!”
কেবিনে বাতাস বয়ে গেল। সে আবার চোখ বন্ধ করে। তখনই মস্তিষ্কের মধ্যে শুরু হয় ঝড়। কালকের সমস্ত ঘটনা তার মনে পড়তে লাগল।
আরিয়ান গাড়িতে বসে আছে। সিটের ওপর ফোনে সুমুর একটা হাস্যজ্বল ছবি। আরিয়ান গার্ড নিয়ে বের হয়নি। কোরিয়াতে সে যেতে না চাইলেও, মৌ সেন তাকে বাধ্য করেছে যাবার জন্য।
হঠাৎ গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটা এসইউভি। আরিয়ান ব্রেক কষল। মুহূর্তেই মুখোশধারী কিছু লোক গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। আয়ান কিছু বলার আগে লোকগুলো তার মুখ ঢেকে টেনে গাড়ি থেকে নামাল। আরিয়ান নিজের আত্মরক্ষা তো দূরে থাক, মুখ ফুটে কিছু বলার সুযোগ পায়না।
অন্ধকার কুঠুরি। চোখমুখে কালো কাপড় আর হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে আরিয়ানকে। ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে সে। দেয়ালে পানি পড়ার শব্দ। মাটির নিচে যেন ঘরটা। হাত পেছনে বাঁধা। ঠান্ডায় তার দেহ কাঁপছে। শরীরের প্রতিটি জায়গা রক্তে ভেজা। বেঁধে রাখা টাইট ব্যান্ডেজে দেহের পেশিগুলো টান ধরে আছে। তার শ্বাস প্রশ্বাস উঁচু নিচু হয়ে উঠছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রচন্ড।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল। বুটের শব্দ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো কেউ। একজন এসে আরিয়ানের চোখের কাপড় খুলে দিল। আরিয়ান নিঁভু নিঁভু চোখে সামনে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। আরিয়ান তাকিয়ে রইল, তার চোখে বিরাট এক শূন্যতা। শেরাজের চোখে আগুন, মুখে কোনো রকম মায়া বা দয়াবোধ নেই। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“সাহস তো কম না তোর, আরিয়ান। আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়াস তুই? তুই কী ভেবেছিস, শেরাজ খানের কলিজার দিকে তোর মতো একজন ছোটলোক হাত বাড়াবে আর আমি চুপচাপ দেখে যাব? আরে ওই, তুই জানিস না আমি কে? আর কী করতে পারি?”
সে আরিয়ান দু’হাতে ধারালো দিয়ে আঘাত করল। মুহুর্তেই ফিনকি দিয়ে ছিঁটে রক্ত বেরিয়ে এলো। শেরাজ রক্ত দু’হাতের তালুতে তুলে নিল। তার হাতে রক্ত যেন মেহেদির পড়ার মতো মনে হলো। সে আরিয়ানের হাতের কাঁটা জায়গায় পা দিয়ে চেপে ধরল। আরিয়ান কুঁকড়ে গেল। তার শরীর সহ্য করতে পারল না। শেরাজ একেবারে আক্রমণাত্মক হয়ে আরও একটি লাথি দিল তার পাঁজরে। মূহুর্তেই আরিয়ান চিৎকার করে উঠল।
শেরাজ আরো তীব্র গলায় বলল,
“এই সান, মুখ বাঁধার পড়েও ওর গলা থেকে আওয়াজ বের হয় কীভাবে?”
স্যান্ডি কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বাঁকা হেসে আরিয়ানকে বলল
“তোর মতো একজন নোংরা পুরুষের কোনো যোগ্যতা নেই আমার সুমুর দিকে চোখ তুলে তাকানোর।”
আরিয়ান মুখে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগে শেরাজ আরিয়ানকে তুলে দাঁড় করিয়ে মুখে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে পাঞ্চ মারল। চোয়ালে রক্ত ছিঁটকে গিয়ে দেওয়ালে লাগল। সে আরিয়ানকে ফেলে দিয়ে আবারও পাঁজর বরাবর লাথি মারল। স্যান্ডি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। শেরাজ গর্জন ছেড়ে বলল,
“সান, আমার স্টিক কই?”
স্যান্ডি গিয়ে হকস্টিক এনে শেরাজের হাতে দিল। হাতে হকস্টিক পেয়ে শেরাজ জানো মারের আনন্দে মেতে উঠল। একদম পশুর মতো আক্রোশ ঝাড়ে আরিয়ানের ওপর। ক্লান্ত হয়না সে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“যা আমার, সেটা অন্য কেউ ছোঁবে না। কেউ না। আর কোনোদিনও আমার কলিজার দিকে হাত বাড়ানোর চেষ্টা করলে, এমন অবস্থা করব তোর লাশটা দেখলেও মানুষ ভয়ে আঁতকে উঠবে।”
সে আরিয়ানের মাথাটা নিচু করে ধরল। আরিয়ানের আঘাতগুলো থেকে একে একে রক্ত ঝরে মেঝেতে পড়ছে। শেরাজ তাকে মেঝেতে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। মেঝেতে গড়িয়ে পড়ে যন্ত্রণা ছটফটিয়ে উঠল আরিয়ান। তার শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভব হচ্ছে। শেরাজ তাকে আরোও শক্তভাবে মেঝের সাথে চেপে ধরল, যেন ভিক্টিমের কষ্ট তাকে আনন্দ দিচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি যখন পশুত্বের খেলায় মেতে উঠি, তখন সেই খেলা আমার নেশালো মনে হয়। আমি খুব আনন্দ পাই। তোর রক্ত, তোর ব্যথা সব কিছুই আমাকে আনন্দ দিচ্ছে।”
ঘুম ভাঙতেই আরিয়ান হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“এস,কে…”
বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল সে। শরীর কাঁপছে আনকন্ট্রোলেবল। ইসিজি মেশিনের শব্দ তীব্র হলো। রোজা ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠল।
“ব্রো? ব্রো? মম উঠো, ব্রো কেমন একটা করছে।”
মৌ সেন দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল।
“আরিয়ান বেটা, শান্ত হও। কিছু হয়নি। তুমি হসপিটালে আছো।”
আরিয়ান কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ও মেরেছে আমাকে, মম। ও আমাকে মানুষ ভেবে মারেনি। এ নিজে একটা পশু আর আমাকেও ঠিক পশুর মতো মেরেছে। আমি… আমি ছাড়াব না ওকে, মম। সব কেড়ে নিবো ওর জীবন থেকে।”
সে তীব্র হাইপার হয়ে উঠল। রোজা গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনলো। ডাক্তার ছুটে এলো। নার্স এসে সেডেটিভ দিল। ডাক্তার দ্রুত আরিয়ানের পালস চেক করল। হঠাৎ ধীরে ধীরে কাঁপতে কাঁপতে নিস্তেজ হয়ে গেল আরিয়ানের দেহ। চোখ ভারী হয়ে গেল। এখনও ঠোঁট কাঁপছে তার। মৌ সেন তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চেষ্টা করল।
সুন্দর একটা সকাল কেটে গেল ধীরে ধীরে। বাড়ির ভেতর এখন বেশ নিরবতা। সকালের ব্যস্ততা শেষে এখন যেনোম একটুকরো আরাম ছুঁয়ে আছে চারপাশে। বাড়ির সকল ছেলেরা অফিসে। সাহাবাজ খান, শেহেজাদ খান, সারবাজ, আরবাজ, শেরাজ সবাই যার যার কাজে বেরিয়ে গেছে। শাহরুখ গেছে একাডেমিতে, আর রিয়াজ স্কুলে। ফিরোজা চৌধুরী বাড়িতে। অনন্যা খাতুন সকালেই হসপিটালে চলে গেছেন। বাড়ি এখন অনেকটাই ফাঁকা। শুধু সুমু, ইশিতা আর আফিয়া খাতুন রয়েছেন বাড়িতে। ইশিতা দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমাচ্ছে। আফিয়া খাতুনও তাই।
সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে একা। ঠান্ডা হাওয়ায় তার চুল উড়ছে ধীরে। দূরের আকাশে সূর্যটা একটু একটু করে ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। তার চোখে এক ধরণের নিঃশব্দ চিন্তা, যেন মনটা কোথাও হারিয়ে গেছে। আরিয়ানের সেদিনের করা কাণ্ডগুলো বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে তার।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধীরে ধীরে ভেতরে এলো। দরজাটা টেনে বন্ধ করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে একটু সময় কাটাল। শরীরে পানি আর চোখের ভিতরের জল, কে জানে কোনটা বেশি উষ্ণ।
বিশ মিনিট পর, ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো সে। সারা শরীর ভিজে, এক টুকরো সাদা টাওয়েল পেঁচানো বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত। গালদুটো গরম জলে লাল হয়ে গেছে। চুলগুলো ভেজা, পিঠ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। হাঁটতে হাঁটতে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল সে। আয়নায় নিজের চোখে চোখ পড়তেই শেরাজের মুখটা মনে পড়ল তার। মনটাকে হালকা করার জন্য সুমু অডিও স্পিকারে “ডালিং ক্যান আই ইউ বি ফেভরেট” গানটা প্লে করল। প্রথমে ধীরে ধীরে মাথা দুলালো। তারপর হঠাৎ যেন আবেগের ঝড় উঠল তার ভেতরে। মুড সুইং হলো আচমকা। মনটা হঠাৎ করেই ভালো হয়ে গেল, যেন গানটা তার ভেতরের মেঘ কেটে রোদ এনে দিল।
সে বেডের উপর উঠে দাঁড়াল। টাওয়েলটা সামলে নিল, যেন ঠিকমতো গাঁট হয়ে থাকে। তারপর কোমরে হাত দিয়ে গানের তালে তালে নাচতে শুরু করল। একেকটা বিটে ছোট্ট ছোট্ট স্টেপ, একটু ঘুরে দাঁড়ান, একটু জাম্প, আবার হাসি।
রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করা। এইটা যেন তার নিজের একটা ছোট রাজ্য। যেখানে সে আবার বাচ্চা হয়ে যেতে পারে। কারও চোখের ভয় নেই, কারও বকা নেই।
কেবিনের ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটা। শেরাজ তার অফিস ডেস্কে বসে ফাইলের ভেতর মন গুঁজে রেখেছে। বাইরে রোদের উত্তাপ, আর ভেতরে এসির ঠান্ডা হাওয়া। আজ তার দু’শো কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট সাইন হবে। স্যান্ডিকে অনেকক্ষণ আগে ফাইল রেডি করে আনতে বলেছে। হঠাৎ তার চোখ পড়ে গেল রুমের কোণে রাখা মনিটরের দিকে। যেটা অফিসের ইন্টারনাল হোম সিকিউরিটি ফিড।
চোখটা আটকে গেল তার বেডরুমের লাইভ ফুটেজে। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে, সাদা তোয়ালে জড়ানো সুমু বিছানার উপর দাঁড়িয়ে নাচছে। কোমর দুলছে, মুখে পাগলামী হাসি, ভেজা চুল থেকে পানি টপটপ করে পড়ে যাচ্ছে ঘাড় বেয়ে পিঠে। হঠাৎ গানের তালে সে হাত ঘুরিয়ে একপাশে ঘুরল। আর তখনই সেই দৃশ্য যেন শেরাজের বুকে হাতুড়ি মারল। তার হাত থেকে পেন পড়ে গেল মেঝেতে। হঠাৎ কেমন ঘামতে শুরু করল। এসির রিমোট টিপে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিল, কিন্তু শরীর ঠান্ডা হলো না তার। গলার কাছটা অস্বস্তিকর মনে হলো। সে নিজের ব্লেজার খুলে ছুঁড়ে ফেলল চেয়ারে। ভেতরে থাকা সাদা শার্টের বোতাম একে একে খুলে ফেলল সব। গলায় নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সুমুর একান্ত শিশুসুলভ মুহূর্ত তাকে একদম অস্থির করে তুলেছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কেবিনের মধ্যে কিছুক্ষণ পায়চারী করল। আবারও তাকাল সিসিটিভি ফুটেজের দিকে। বিড়বিড় করে বলল,
“এইটা কী করলে তুমি, সুইটহার্ট? তুমি কি জানো না, তুমি এমন করলে আমি নিজেকে আটকে রাখতে পারব না? নাউ আই ব্যাডলি নিড ইউ, সুইটহার্ট।”
ফুটেজটি অফ করে দিল। এই মুহুর্তে সে বাড়িতে ফিরবে ভেবে হাঁটা ধরল। এই ফাইল, এই কাগজ, এই দুশো কোটি টাকার কন্ট্রাক্ট সব এখন মূল্যহীন তার কাছে। এখন তার দরকার তার স্ত্রীকে।
কেবিনের দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই স্যান্ডি ছুটে এলো। হাতে একগাদা কাগজ।
“স্যার! আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। গম্ভীর মুখে, দীর্ঘপদে হেঁটে চলল লিফটের দিকে।
“স্যার, আমাদের নিউ প্রোডাক্ট লঞ্চের কন্ট্রাক্ট পেপারে আপনাকে আজই সাইন করতে হবে। না করলে দু’শো কোটি টাকার প্রজেক্ট ক্যান্সেল হয়ে যাবে, প্লিজ স্যার।”
কিন্তু ততক্ষণে শেরাজ লিফটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফেলেছে।
স্যান্ডি হতবাক। এই সেই শেরাজ খান, যে কাজের সময় কাউকে এক চুল পর্যন্ত ছাড় দেয় না। যার কাছে সময় মানেই টাকা। আর আজ? সে ভাবুক হয়ে তাকিয়ে রইল।
লিফটের ভেতরে শেরাজ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। মনিটরের সেই দৃশ্য চোখে ভাসছে। বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি জানো না, তোমার একটা ভেজা চুল আমার গোটা দুনিয়া ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম।”
লিফট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল। ব্রেকে চাপ দিয়ে, গিয়ার বদলে দিল। তীব্র স্পিডে গাড়িটা ছুটে চলল। প্রতিটা ইট, রাস্তাঘাট, সিগন্যাল সব যেন ধোঁয়ায় মিশে যাচ্ছিল। কিন্তু অন্য কোনোদিকে নজর নেই তার। তার মনে তখন একটাই দৃশ্য, “একটা পাগলী মেয়ে তার বিছানার উপর দাঁড়িয়ে গান গাইছে, নাচছে।”
শেরাজ মুচকি হেসে বলল,
“তোমার খান সাহেব ছুটে আসছে তোমার কাছে। সবকিছু ফেলে, শুধু আমার পাগলীটাকে নিজের বুকে টেনে নিতে। এই ভালোবাসা? এটা আর কোনো কাজ, কন্ট্রাক্ট, টাকার ভাষায় মাপা যায় না। আমাকে এইভাবে ডিস্টার্ব করার মাশুল তোমার ভোগ করতে হবে, সুইটহার্ট।”
বিশ মিনিটের মধ্যেই শেরাজ বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল। গাড়ির দরজা খুলে সে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা হাঁটা দিল নিজের রুমের দিকে। প্রতিটি পা যেন ভারী। প্রতিটি নিঃশ্বাসে তীব্র এক অস্থিরতা তার। রুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থমকে গেল কিছুক্ষণ। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। শেরাজ গভীর দৃষ্টিতে একবার তাকাল রুমের দরজার দিকে। তারপর পকেট থেকে মাস্টার কি বের করল। চাবি দিয়ে দরজা আনলক করে সামনে তাকিয়ে রইল।
সুমু এখনো বাচ্চার মতো মজা করে নাচছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, হাতে কোলবালিশ নিয়ে একেকটা বিটে নাচের স্টেপ দিচ্ছে। তার চোখেমুখে আনন্দের আলো। হঠাৎ সুমুর চোখ গেল আয়নার দিকে। আয়নার প্রতিফলনে শেরাজ। সুমুর চোখ মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল। হাতের তালু মুঠো করে ফেলল, গলায় যেন কথা আটকে গেল। হাত থেকে কোলবালিশ ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। সে ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাল।
শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে দরজায় গা ঘেঁষে। চুল এলোমেলো, শার্টের বোতাম খোলা, চোখে ঘোর লাগা নেশা।
সুমু অবাক। সে নিজের দিকে তাকাল। টাওয়েলটা গায়ে, চুল অগোছালো, গালে লালচে আভা।
“হায় আল্লাহ!” মনে মনে বলে সে।
পেছন ঘুরেই দৌড় দিল ওয়াশরুমের দিকে। ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকলেও ওয়াশরুমের দরজা লাগতে পারল না সে। একটা শক্ত হাত এসে তার কবজি ধরে ফেলল। সুমু থমকে গেল।
“খান সাহেব! ছা…ছাড়ুন, আ… আমি ওয়াশরুমে যাচ্ছিলাম। খুব ইমার্জেন্সি।”
কিন্তু শেরাজ কিছু শুনল না। চোখে তার শুধু আগুন। কিন্তু সেই আগুনে কোনো রাগ নেই, আছে নেশা– গভীর, জ্বালাময়ী ভালোবাসার এক অদ্ভুত সুন্দর নেশা। সে সুমুকে টেনে ওয়াশরুমে থেকে বাইরে এনে দেয়ালে সাথে চেপে ধরল। সুমুর নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“আ…আপনি আমাকে ছাড়ুন।”
শেরাজ চুপচাপ তাকিয়ে রইল সুমুর খিঁচে বন্ধ করে রাখা চোখের দিকে। তারপর তার ঠোঁট নেমে এলো সুমুর কানের পাশে। নিঃশ্বাসে ভেসে এলো একগুচ্ছ নেশালো কথা,
“আস্ত একটা সুস্থ সবল হট একটা জামাই থাকতে কোলবালিশ কেনো?”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ আবারও বলল,
“তুমি জানো, কী করেছ তুমি আমার সাথে? তুমি আমায় বাঁচতেও দাও না, মরতেও না।”
সুমুর গলা শুকিয়ে এলো। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। সুমুর নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। সে ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি তো অফিসে ছিলেন। বাড়িতে কেনো…”
শেরাজ আরও মিশে দাঁড়াল তার সাথে। সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি ফাইল সাইন না করে বেরিয়ে এসেছি, বেইব? আসার সময় সান বলল, দুশো কোটির কন্ট্রাক্ট হাতছাড়া হবে। কিন্তু তখন আমার মন, মস্তিষ্ক সব তোমার হটনেসের মধ্যে গেঁথে বসে আছে। আমার মাথায় তখন শুধু তুমি, আর কিছু না। ইশ! আমার বউটা এতো হট কেনো? তখন মন, মস্তিষ্ক গেঁথে গিয়েছিল বলে, এখন শরীরটাকেও তোমার মধ্যে গেঁথে দেওয়ার জন্য চলে এসেছি।”
তার ঠোঁট সুমুর কানের আরও কাছে গিয়ে থামল।
“এই টাওয়েলটা যদি আরেক ইঞ্চি নিচে নামতো। আমি হয়তো কেবিন থেকে গাড়ি না, হেলিকপ্টারে উড়ে চলে আসতাম, এক মুহূর্ত দেরি না করে।”
সুমু কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল,
“খান সাহেব! বাজে কথা না বলে ছাড়ুন। আমার মনে ছিল না যে, রুমের মধ্যে ক্যামেরা আছে।”
“ভাগ্যিস মনে ছিল না। তোমার এই পাগলামো আমার শরীরের তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে, সুইটহার্ট। তুমি জানো না, তোমার একেকটা নাচের স্টেপে আমি কতবার মরেছি। বড্ড বেশি ডিস্টার্ব করে দিয়েছ আজ।”
“দয়া করে ছেড়ে দিন। একটু আগেই শাওয়ার নিয়ে এসেছি। আর আপনি এই অসময়ে কাজ ফেলে, কন্ট্রাক্ট ফেলে কেনো এসেছেন বাড়িতে? কতোগুলো টাকা লস হবে আপনার।”
“সান বলল, দুশো কোটির কন্ট্রাক্ট হাতছাড়া হয়ে যাবে, যদি আমি সাইন না করি। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, যদি আমি এখন বাসায় না যাই, তাহলে তার থেকেও বড় কিছু হাতছাড়া হয়ে যাবে। তুমি যদি স্লিপ করো, আর এই টাওয়েলটা হঠাৎ খুলে যায়, আর আমি যদি সেটা চোখের সামনে থেকে না দেখতে পায়। ওই চিন্তা আমার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল, সুইটহার্ট।”
সুমু চোখ খুলে তাকাল। রাগিস্বরে বলল,
“অসভ্য, র্নিলজ্জ, বেশরম, ঠোঁটকাটা, লাগামহীন পুরুষ।”
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হাসল।
“দু’শো কোটির লস দিয়ে বাড়িতে এসেছি। সেই দুঃখে এখন আমার কচু গাছের সাথে গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করছে। আর এখন যদি বাড়িতেও লস দেই, তাহলে তো আমি একদম শেষ। কেমন বউ তুমি? তোমার স্বামীর এতোবড় লস হয়ে যাচ্ছে। আর তুমি আটকাতে পারছ না? চলো, এখন তোমার স্বামীর এই লসটা আটকাও। কিছুতেই জানো এই কন্ট্রাক্টকে লস না খায় আমি।”
সুমু আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল। শেরাজ সুমুর ভেজা একগোছা চুল হাতে তুলে নিল। চুলের সাথে নাক ছুঁয়ে বুক ভরে চুলের ঘ্রাণ টেনে নিয়ে বলল,
“তোমার নাচ, তোমার পিঠে গড়িয়ে পড়া বিন্দু বিন্দু পানি, টাওয়েলের নিচে লুকানো তোমার উষ্ণ শরীর– সব মিলিয়ে তুমি একটা জ্বলন্ত অগ্নিয়গীরি। আর আমি…” সে ফিসফিসিয়ে ওঠে,
“আমি সেই আগুনের ঝলসে, আজ সব কিছু ফেলে ছুটে এসেছি। কন্ট্রাক্ট, টাকা, লাভ সাইন, সব একদিকে, আর তুমি একদিকে।”
একটু থামল সে। চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“তুমি জানো সুইটহার্ট, তোমার হট ডান্স দেখে আমি ঘেমে যাচ্ছিলাম? এসির টেম্প বাড়িয়ে দিয়েছি, ব্লেজার খুলেছি, তারপর শার্টের বোতাম একে খুলে ফেলেছি, তবুও আমি নিজেকে ঠান্ডা করতে পারিনি। দেন, কেবিনের মধ্যে পায়চারি করতে করতে মনে হলো, আমার আগুনের উৎস তো তুমি। তাই তোমাকে ছাড়া এই আগুন নেভানো সম্ভব না।”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“ড্যান্স উইথ মি, সুইটহার্ট?” (আমার সাথে একটা নাচ করবে, সুইটহার্ট?)
সুমু চোখ কুঁচকে তাকাল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“নাউ? ইন দিস টাওয়েল?” (এখন? এই টাওয়েল পরে?)
শেরাজ ঠোঁট কামড়ে মুচকি হেসে বলল,
“ইয়েস! নাউ, জাস্ট লাইক দিস। ইউ, মি, দিস রুম, অ্যান্ড আ রিদম দ্যাট অনলি আওয়ার হার্টস ক্যান হিয়ার।” (হ্যাঁ! এখনই, ঠিক যেমন আছো। তুমি, আমি, এই ঘরটা, আর এমন এক সুর, যেটা শুধু আমাদের হৃদয় দুটোই শুনতে পারে।)
সে আরও একধাপ এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠে চিরচেনা খুনসুটি আর কামনা মেশানো সুরে বলল,
“ট্রাস্ট মি, নো ওয়ান হ্যাজ এভার ড্যান্সড উইথ ফায়ার। বাট টুনাইট, আই উইল। বি কজ, ইউ, মাই ভলক্যানো, আর এরাপ্টিং অ্যান্ড আই’ম রেডি টু বার্ন।” (আমার কথা বিশ্বাস করো, আগুনের সাথে কেউ কোনোদিন নাচ করেনি। কিন্তু আজ আমি করব। কারণ, তুমি তো আমার আগুন, আমার আগ্নেয়গিরি। আর আমি তাতে পুড়ে যেতেও রাজি আছি।)
সুমু গাল আরও লাল হয়ে এলো। সে সরে যেতে চাইল। কিন্তু শেরাজ তার কোমরের চারপাশে হাত রেখে বলল,
“লেট মি হোল্ড ইউ, লেট মি লিড, অ্যান্ড আই প্রমিস বাই দি এন্ড অফ দিস ড্যান্স, ইভেন ইয়োর অ্যাঙ্গার উইল বি আউট অফ ব্রেথ।” (আমায় একটু জড়িয়ে থাকতে দাও, আমায় তোমার সাথী হতে দাও এই নাচে। কথা দিচ্ছি, এই নাচ শেষ হতে হতে তোমার রাগটাও হার মেনে যাবে।)
শেরাজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। তারপর হঠাৎ ঠোঁটে একরাশ পাগলামি ঝুলিয়ে বলল,
“তুমি জানো এই টাওয়েল পরে যেভাবে তুমি ড্যান্স করছিলে– মাই গড! ইট ওয়াজ ইলিগাল। ইট ওয়াজেন্ট আ ড্যান্স, ইট ওয়াজ আ ড্যাম অ্যাটমিক বম্ব।” (তুমি জানো, ওই টাওয়েল পরে যেভাবে তুমি নাচছিলে— হায় আল্লাহ! ওটা নাচ না, ওটা তো একেবারে বিধ্বংসী বোমা।)
সুমু থমকে গেল। চোখ কুঁচকে বলল,
“আপনি আসলে পুরোপুরি পাগল।”
শেরাজ হেসে বলল,
“পাগল তো হবোই। এত হট তুমি। আমি কেবিনে বসে শার্ট খুলে এসির নিচে দাঁড়িয়েও ঠান্ডা হতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, তুমি আমাকে পুড়িয়ে মারছো।”
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, সুমুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“দ্যাট টাওয়েল, দ্যাট ওয়েট হেয়ার, অ্যান্ড দ্যাট সিনফুল লিটল ড্যান্স ইউ শুড কাম উইথ আ ওয়ার্নিং লেবেল, সুইটহার্ট। ইউ’রে ডেঞ্জারাস।” (এই টাওয়েল, এই ভেজা চুল, আর তোমার ওই নাচ। এগুলোর জন্য একটা সাবধানবার্তা থাকা দরকার। কারণ তুমি একদম ভয়ংকর সুন্দর)
সুমু মুখ ঘুরিয়ে ফেলল লজ্জায়। শেরাজ হালকা গলায় বলল,
“সো নাউ, বিফোর আই ডাই অফ ডেজায়ার, উড ইউ প্লিজ ড্যান্স উইথ মি? জাস্ট ওয়ান প্রাইভেট, ফরবিডেন ড্যান্স অনলি ফর মি।” (তাই বলছি, একটুখানি নাচো আমার সঙ্গে? চুপিচুপি শুধু আমার জন্য, প্লিজ?)
সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। শেরাজ আলতো হাসল। সে সুমুকে ছেড়ে দিয়ে অডিও স্পিকারে গান প্লে করল।
“মেরি পেহেলি মহাব্বাত হে,
মেরি পেহেলি ইয়ে চাহাত হে,
মেরি ইতনি ছি হাছরাত হে,
গালে লাগ যা না যা…!
তেরি বাহো মে রাহাত হে,
তেরি জুলফো মে জান্নাত হে,
মেরি ইতনি ছি হাছরাত হে,
গালে লাগ যা না যা…!
ছুলকি, ছুলকি, বাদান হে,
উলঝে, উলঝে, সে মান হে,
বেহেতি, জাতি, হে তান কি পেয়াছ!
বেহেকি, বেহেকি, হে রাতে,
মেহেকি, মেহেকি, হে ছাছে,
রেহেনা, রেহেনা, তু দিলকে পাছ…!”
গান শেষ হতেই শেরাজ সুমুর দিকে একবার তাকাল। সেই চিরচেনা গভীর দৃষ্টিতে চোখে মায়া, ঠোঁটে এক দৃঢ়তা নিয়ে। অডিও স্পিকারে “অ্যালিবাই” গানটা বেজে উঠল। হঠাৎ সুমু নিজেকে শেরাজের বাহুর মাঝে আবিষ্কার করল।
“খান সাহেব!”
শেরাজ কোনো উত্তর দিল না। শুধু চোখের ইশারায় চুপ করিয়ে দিল তাকে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল রুমের ভিতরের থাকা জানালাবন্দি দিকে। সেখানে আছে একটা ইনডোর পুল, যার উপর ভেসে আছে শত শত আর্টিফিশিয়াল পদ্মফুল।
পুলের পাশে এসে শেরাজ সুমুকে ধীরে ধীরে নিচে নামিয়ে দিল। তারপর এক মুহূর্ত দেরি না করে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে রুমের সব আলো নিভিয়ে দিল। সে সেন্টার টেবিলের ওপর থেকে আরেকটা রিমোট তুলে নিয়ে চাপ দিল। মুহূর্তেই পুলের পানির নিচে থাকা এলইডি লাইটগুলো জ্বলে উঠল। পদ্মফুলগুলো এক এক করে যেন পাপড়ি মেলে ধরতে লাগল আলোর। লাল, গোলাপি, নীল, পার্পেল আরও বিভিন্ন রঙের আলো জ্বলে উঠল। সব কিছু যেন থমকে গেছে। সুমু হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল চারপাশে। এই ছোট ছোট ফুলের মাঝে আলো যেন ফেয়ারিটেলের মতো জ্বলছে। আর তাদের প্রতিফলন পানির ওপর নাচছে। শেরাজ এক’পা, দু’পা করে সুমুকে নিয়ে পানির ভেতরে নামল। পানি কোমর পর্যন্ত উষ্ণ আর আরামদায়ক। দুজনে ধীরে ধীরে সেই রঙিন আলোয় মেশা জলে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়াল। শেরাজ, সুমুর কপালের ওপর পরে থাকা ভেজা চুল সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি ভালোবাসা শুধু বলে নয়, অনুভব করিয়ে বোঝাই।”
পুলের পানি তখন আলোর প্রতিফলনে একেক সময় একেক মুহূর্তে রূপ নিচ্ছিল স্বর্গীয়। শেরাজ সুমুর কোমর জড়িয়ে রেখেছে। ভেজা শরীরে তার ছোঁয়া যেন আগুন ও জলের মিশ্রণে সুমুর দেহে পড়ছে। সুমু ঠোঁট কাঁপিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করল। কিন্তু শেরাজ তার আগেই সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“এখন শুধু অনুভব করার সময়, কথা বলার নয়।”
তার ঠোঁট নামল গাল বেয়ে গলায়। প্রতিটা ছোঁয়া যেন ধৈর্যের পরীক্ষার মতো দীর্ঘ, ধীর আর গভীর হয়ে উঠল। সুমুর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সে হাত শেরাজের বুকে ঠেকিয়ে রেখেছে। সেটা বাঁধা ছিল না, ছিল আত্মসমর্পণ। ভেজা চুল তার পিঠে আটকে আছে। শেরাজের হাত সেই ভিজে চুল বেয়ে কোমরের নিচে নামল। ঘোর লাগা কন্ঠে বলল,
“তোমার প্রতিটা গভীর নিঃশ্বাস আমার হৃদয়ের ঝড় তুলে দিচ্ছে।”
সুমু চোখ বন্ধ করল। তাকে আর কিছু বলতে হলো না। শেরাজ তার অধর সুমুর অধরে চেপে ধরল। একটু বেশি গভীরতায়, একটু বেশি দাবি নিয়ে গভীরভাবে চুমু এঁকে দিল। এই ছোঁয়া শুধু ঠোঁট ছোঁয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আত্মা ছুঁয়ে যাওয়াতে মরিয়া হয়ে উঠল।
পুলের পানি তাদের চারপাশে ঢেউ তুলে উঠছে। আর তারা ক্রমে ক্রমে একে অপরের শরীর জড়িয়ে ধরছে। পুলের চারপাশ নিঃস্তব্ধ। পুলের পানি গড়িয়ে পড়ছে সুমুর চুল বেয়ে বক্ষ ছুঁয়ে কোমরের কাছ অব্দি। শেরাজ হাত বাড়িয়ে তার ভেজা চুলগুলো আলতো করে পেছনে সরিয়ে দিল। সুমু শেরাজের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইল। কিন্তু শব্দ বের হলো না। শুধু শরীরটা এগিয়ে গেল শেরাজের বুকের দিকে। আর নিজেই যেন হারিয়ে গেল শেরাজের দু’হাতের বন্ধনে। শেরাজ তার দুই হাতে সুমুর মুখ ধরে কপাল, চোখ, ঠোঁট সবটুকুতে তার ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে নামল বিউটি বোনে। দু’জনে পরস্পরের ভিজে শরীরের মাঝে হারিয়ে যেতে লাগল। পানির নিচে তাদের পা একে অপরকে খুঁজে নিচ্ছিল। সুমুর উরুতে শেরাজের আঙুলের ছোঁয়ায়। সুমুর কোমরে নেমে আসা দৃষ্টি আর মৃদু স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠল সুমুর। সে আবারও চোখ বন্ধ করে এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
“খান সাহেব!”
শেরাজ থেমে গেল না, বরং ফিসফিস করে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“আজ আবার পুরো শেরাজ খানকে অবাধ্য, অসভ্য আর ব্যাডলি ভাবে উৎসর্গ করছি তোমার কাছে।”
সুমু কিছু বলল না। মূহুর্তে তারা দুজন যেন সময়ের বাইরে চলে গেল। নিরব পানিতে ধীরে ধীরে ভালোবাসা রূপ নিচ্ছিল মিলনের পূর্ণতায়। সুমুর পিঠে হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে সুমুকে নিজের শরীরে সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে নিল শেরাজ। পুলের পানির মধ্যে তারা হারিয়ে গেল এক আবরণহীন সত্যিকারের ভালোবাসায়। পুলের পানি দুলছে। পদ্মফুল গড়িয়ে যাচ্ছিল এক কোণে। রুমে থেকে ভেসে আসছে “অ্যালিবাই” গানের সুর। প্রেমের গভীরে দুটো শরীর যেন নিঃশব্দে পাগলামী করে যাচ্ছিল একে অপরের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পেতে।
প্রাইভেট হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে শুয়ে আছে আরিয়ান। মৌ সেন, রোজা, অনন্যা খাতুন বসে আছেন তার পাশে। কেউ চোখ মুছে, কেউ চুপচাপ। একজন নার্স এসে ধীরে বলল,
“একজন ভিজিটর এসেছেন। নাম রায়য়ান চৌধুরী, মানে মাফিয়া রায়য়ান চৌধুরী।”
রোজা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এখন?”
“তিনি বললেন, পেশেন্টের সঙ্গে তার কথা বলতেই হবে। খুব দরকার।”
হঠাৎ আরিয়ান চোখ মেলে তাকাল। কথা বলতে কষ্ট হয় তার। ফিসফিস করে বলল,
“ওকে আসতে দাও।”
মৌ সেন বললেন,
“কিন্তু বেটা, তোমার তো কথা বলা বারণ।”
আরিয়ান ব্যথায় ফিসফিস করে বলল,
“সবাই বাইরে যাও।”
“তুমি ঠিক বলছ তো?”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে বলল,
“প্লিজ, লিভ!”
সবাই বেরিয়ে গেল। কেবিনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকর রায়য়ান চৌধুরী। প্যান্টের পকেটে হাত, গলায় চেইন, চোখে বিদ্রুপ।
একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল আরিয়ানের পাশে। পা তুলে দিল বিছানার পাশে রাখা টুলে। ঠান্ডা গলায় বলল,
“এই তো আমার পুরনো বন্ধু। চোখ খুলেছিস দেখি। বাঁচলি? নট ব্যাড! তুই বেঁচে আছিস দেখে ভালো লাগল।”
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে রইল কিছুক্ষণ। সে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। অনেক কষ্টে ফিসফিস করে বলল,
“তুই আসবি জানতাম!”
রায়য়ান হেসে বলল,
“আমার নাম রায়য়ান চৌধুরী। ড্রামা মিস করি না। জানতাম তুই আমাকে ডাকবি। কারণ তুই তো জানিস, তোর সবচেয়ে খারাপ সময়েও আমি হাসি। দেখ আজও আমি হাসছি।”
“এস.কে আমাকে খুব বাজেভাবে মেরেছে।”
“সেটা নিয়ে কি করতে চাস? আবার সুস্থ হয়ে গিয়া সিনেমার মতো ডায়লগ দিবি, ‘আইল গেট হার ব্যাক’।”
আরিয়ান কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। সে ধীরে বলল,
“সুমু আমার। যা করা লাগে করব। তবুও ওই মেয়েকে আমি আমার করেই ছাড়ব।”
রায়য়ান চুপচাপ তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ঠোঁট চেপে হাসল সে।
“তুই জানিস, তোকে দেখে আমার এখন গা গুলাচ্ছে? একটা সময় তোকে ভাইয়ের মতো দেখতাম, আজ তোকে আমার লুজার মনে হচ্ছে। সুমুকে কি মনে করেছিলি? একটা নারী? একটা শরীর?”
আরিয়ান রেগে গিয়ে বলল,
“ভালোবাসি আমি ওকে। ছুঁতে চাইতেই পারি।”
রায়য়ান ঝুঁকে একটু সামনে এগিয়ে বলল,
“ভালোবাসিস তুই? তাহলে ওর সম্মানে হাত বাড়ালি কেনো, ডাফার? ওর চোখে ভয় না আনতি। ওর গলা দিয়ে কান্না না তুলতি। ওর সামনে কি একটু ভালো সেজে থাকতে পারলি না? তুই যেটা করতে যাচ্ছিলি, সেটা ভালোবাসা না, যৌন লালসার জঞ্জাল।”
থামল রায়য়ান। একটু সময় নিয়ে বলল,
“আর ভালোবাসা? এই অবস্থায়ও তুই সেই মেয়ের কথা ভাবছিস। আহারে, ট্রাজিক লাভার বয়।” সে কাঁদার অভিনয় করে বলল, “সে যদি তোর না হয় তাহলে তোর কি হবে, বন্ধু?”
এক সেকেন্ড চুপ করে হো হো করে হেসে উঠল সে। আরিয়ানের রাগে শরীর কাঁপছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুই এইটাকে মজা ভাবিস? তুই যদি কাউকে ভালোবাসতি, তাহলে বুঝতি।”
রায়য়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে উঠল।
“কি বললি? আমি আর ভালোবাসা?”
সে হেসে দু’হাত তুলে অভিনয় করে বলল,
“ওহ! একদিন এক মেয়ে এসে বলবে,
রায়য়ান তোমার চোখে আমি আমার পুরো দুনিয়া দেখি আর আমি বলব, ওরে মা আমি তো তোমার চোখে সাদা আর কালো দেখি। মেয়েমানুষ? ধুর, শুনতেও তো জোকস লাগে। ওরা চা বানায় বিষ দিয়ে, আর ভালোবাসা বানায় প্ল্যান করে। আমার তো মেয়েদের নাম শুনলেই এলার্জি হই।”
রায়য়ান চোখ গোল করে আবারও বলল,
“একটা মেয়ে আমায় বলেছিল, আপনি না খুব মিস্টিরিয়াস, ডেঞ্জারাস। আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি ঠিক ওই সাপটা, যে চার্ম করে তারপর কামড়ায়।”
একটু থেমে ব্যঙ্গ করে বলল,
“ভালোবাসা? মেয়েমানুষ? দুইটা শব্দ একসাথে শুনলে আমার পেট ব্যথা করে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকালো।
“তুই ও একদিন কাউকে ভালোবাসবি, রায়য়ান। তোর ভালোবাসা আমার ভালোবাসার থেকেও অনেক বেশি গভীর হবে। আর সেদিন আমিও হাসব এইভাবে।”
রায়য়ান চোখ কুঁচকে বলল,
“ওইটা তোর স্বপ্নই থেকে যাবে। রায়য়ান চৌধুরী আর ভালোবাসা? ধুর শালা! এর চেয়ে বল রায়য়ান চৌধুরী তার হাতে চুড়ি পড়বে, সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। কিন্তু ভালোবাসা? নো ওয়ে ডিয়ার।”
রায়ায়ান ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে আবারও বলল,
“ভালোবাসা আমার জীবনে আসবেনা। ওটা আমার দরজায় আসলে, আমি ভেতর থেকে দরজা লক করে দেই। মেয়েমানুষ মানে ছলনায় মোড়া একেকটা নাটকের কনটেইনার। ওদের ভালোবাসা মানে গোলাপ নয়, ওদের ভালোবাসা হলো বন্দুকের ট্রিগার। একবার টিপলে, কফিন রেডি।”
আরিয়ান হেসে বলল,
“তুই তো কোনদিনও ভালোবাসিস নি, তাহলে ভালোবাসা সম্পর্কে এতো কিছু জানিস কীভাবে?”
“জানতে হয়। কখনো কখনো লিমিটের বাহিরে গিয়েও আমাদের অনেক কিছু জানতে হয়। ইউ নো হোয়াট, একটা মেয়ে একদিন আমায় বলছিল, রায়য়ান চৌধুরী তুমি তো রাফ, বাট ইউ হ্যাভ অ্যা গুড হার্ট।”
হাসল রায়য়ান। ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
“আমি কি বলেছিলাম জানিস? আমি বলেছিলাম, সে হার্ট আমি ফেলে এসেছি। এখন কেবল লিভার আছে, তাও বিষে ভরা। রায়য়ান চৌধুরী হার্ট নামক জিনিসটা নিজের মধ্যে ক্যারি করে না।”
“রায়য়ান তুই কী এখানে আমার মাথা ব্যথা বানাতে এসেছিস?”
“না ব্রো! তোকে বোঝাতে এসেছি। ভালোবাসা হয় শুধু গল্পের শব্দ। বাস্তবে এর নাম হলো দুর্বলতা। আমি কাউকে কখনো ভালোবাসিনি। আর কোনোদিনও বাসবও না। কারণ আমি মানুষকে বিশ্বাস করি না। বিশেষ করে নারীদেরকে তো একদমই না।”
“এইটা কেমন বোঝানো রায়য়ান,?”
রায়য়ান হাসল।
“তোর সুমুকে চাই? তাহলে বুদ্ধি দিয়ে ছিনিয়ে নে। এই দুনিয়াতে আবেগে বা ভালোবাসা দিয়ে কিছু হয় না। জিতে নিতে হয়, ছিনিয়ে নিতে হয়। একদম নির্মম আর নিষ্ঠুরভাবে। যৌবন দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে খেল। ওই মেয়েকে পেতে চাইলে, দয়ালু না নির্মম হ। প্রতিশোধ এমনভাবে নে যেন কেউ বুঝতেই না পারে কখনো।”
রায়য়ান আরেকটু সামনে এগিয়ে এসে বলল,
“তুই চাইলে, আমি তোর পাশে আছি। না তোর প্রেমের জন্য। তোর প্রতিশোধ দেখার আনন্দের জন্য। কারণ আমার কাছে মানুষ শুধু এন্টারটেইনমেন্ট।”
আরিয়ান ফিসফিস করে বলল,
“তুই রাক্ষস!”
রায়য়ান হাসতে হাসতে বলল,
“না রে! আমি বাস্তব। রাক্ষস হলো তুই নিজে। ভালোবাসার নামে অন্যের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে চাওয়া, এটাই তো আসল পাপ। তুই চাইলে আমি শিখাব, কিভাবে নায়কের মুখোশ পরে খলনায়কের খেলাটা খেলা যায়।”
“ঠিক কী বলতে চাইছিস?”
রায়য়ান হাসতে হাসতে ঠোঁট চেপে ধরল। একদম নিস্তেজ গলায় বলল,
“শোন ভালোবাসা দিয়ে কিছু হয়না। মেয়েমানুষ? ওদের ভালোবাসা মানে শুরুর আদর, মাঝের চালাকি, শেষে বিশ্বাসঘাতকতা। আমি অন্ধ ছিলাম না, তাই কখনো পড়িনি এই প্রেম নামক ফাঁদে। নারীর চোখে পানি আসে, যখন দরকার হয়। ওদের গলা কাঁপে, যখন ফায়দা লাগে। ওরা ভালোবাসা দেয় না। ওরা ভালোবাসার মোড়কে নিজস্ব লাভ গুঁজে দেয়। প্রেম, ভালোবাসা, পুরুষকে জুতা বানায়, আর তার আত্মসম্মানকে মেঝেতে টেনে নেয়। তুই বললি, আমিও একদিন কাউকে ভালোবাসব? ধুর! ওই আবেগী বাজের গল্পের বয়স আমি পার করে এসেছি। ভালোবাসা একটা সফট কিল। আমি ওর চেয়ে গুলিই পছন্দ করি। কম কষ্ট দেয়। তুই যদি ওকে পেতে চাস? তোকে পাগলের মতো ভালোবাসতে হবে না। তোর শত্রুর মাথা ঠান্ডা করে, তার সবকিছু কেড়ে নিতে হবে। ভালোবাসা নয়, কৌশল, নির্মমতা, আর জিতে নেওয়ার সিস্টেম শিখে নে।”
“সব বুঝলাম। কিন্তু দেখিস, তুই সত্যি একদিন কাউকে না কাউকে ভালোবাসবি।”
“আরে না ভাই। ভালোবাসতে হার্ট লাগে। আমি তো হার্ট বহু আগেই আমার মার্সিডিজ করে সেই হার্ট দূরের একটা নোংরা নর্দমায় ফেলে এসেছি। এখন বুকের ভেতর শুধু একটা ফুসফুস আর কিছু বিষ জমা আছে।”
“মেয়ে মানুষ অনেক কিছু পারে, রায়য়ান। ওরা পারে একটা ছেলেকে নষ্ট বানাতে। আবার ওরাই পারে একটা ছেলেকে ভালো বানাতে।”
“মেয়ে মানুষ দেখলে আমার কিডনির রিডিং বেড়ে যায়। বিপি লাফায়।” সে একটু নিঁচু গলায় বলল,
“ভালোবাসা আমার দরজায় এসেছিল একদিন। আমি ভেতর থেকে দরজা লক করে বলেছিলাম, ভুল বাড়ি, বেইব। আমি মেয়ে মানুষকে বিশ্বাস করিনা। আমি ওদের অবজার্ভ করি। আর ভাবি, কীভাবে ওরা হাঁচির মতো আই লাভ ইউ বলে, আর কাশির মতো ব্রেকাপ করে। এই রায়য়ান চৌধুরী হৃদয়কে অর্গান ডোনেশন আর আবেগকে হরমোন ইমব্যালেন্স মনে করে।”
“সুমু ডিফারেন্ট, ব্রো!”
“হয়তো! কিন্তু, ভালোবাসা আমাকে দেখে রাস্তা বদলায়। হার্ট, লিভার, ফুসফুস সব ছেড়ে আমি কেবল মগজ দিয়ে চলি। কারণ, মেয়ে মানুষে ভরসা করাটা মানে ছাতা দিয়ে বজ্রপাত ঠেকানোর ট্রাই।”
“রায়য়ান! মেয়ে মানুষকে নিয়ে পিএইচডি করেছিস নাকি?”
“না! মেয়ে মানুষ আমার খেলার গুটি। মেয়ে মানুষের চোখে পানি দেখলেই আমার ইউরিন ট্র্যাক রিঅ্যাক্ট করে। ওরা কান্না করে পাবলিসিটি জন্য। তাই আমি হার্ট রাখি না। বডির মধ্যে একটা নো এন্ট্রি বোর্ড ঝুলিয়েছি।
আরিয়ান চুপ করে রইল। রায়য়ান তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে শেষ কিছু কথা বলি, আরিয়ান। নারীরা প্রেমে পড়ে না। ওরা হিসেব করে, কে কতটা দিতে পারবে। প্রেম, ভরসা, এসব শুধু মুখে বলে। হৃদয়ে রাখে লাভ-লোকসানের খাতা। ওরা সুযোগ পেলে পুরুষের বুকের রক্ত নিয়ে নিজেদের ঠোঁটে রাঙায়, নেইল পলিশ বানায়। তুই ভালোবাসা বলিস, আর আমি দেখি বিশ্বাসঘাতকতা। নারী জাতিকে আমি চিনি। ওরা কখনো ভাঙে না, ওরা ভাঙায়। ওরা কখনো কাঁদে না, ওরা কাঁদায়। আমি নারীদের ঘৃণা করি, কারণ ওরা দুর্বলতা খোঁজে। তুই যতই শক্ত হ, ওরা খুঁজবে তোর ভেতরের ফাটল। ভালোবাসা একটা অস্ত্র। আর নারী হলো সেই অস্ত্রের কুশলী ব্যবহারকারী। ভালোবাসা মানে পুরুষের জন্য বেঁচে থাকা আর নারীদের জন্য নতুন কাউকে বেছে নেওয়ার অজুহাত। ভালোবাসা হলো পুরুষের দুর্বলতা আর নারীর সুবিধা। দ্যাটস হোয়াই, সুমুকে পেতে চাইলে, লালসা আর কোমলতা ছেড়ে দে। নির্মম হ, র্নিদয় হ। কেড়ে নে, ধ্বংস কর।”
সন্ধ্যার আলোর রঙে সেজে উঠেছে চারদিক। আজ সুমুর পরনে অফ হোয়াইট রঙের এম্ব্রয়ডারির কাজ করা শাড়ি, ঠোঁটে ন্যুড শেড। শেরাজ পাশে দাঁড়িয়ে কালো শার্টে। দুজনেই নিচে নেমে এলো ধীর পায়ে।
ঠিক তখনই বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল রোজা আর অনন্যা খাতুন। রোজার চোখের নিচে স্পষ্ট ডার্ক সার্কেল, চেহারায় ক্লান্তি আর অস্থিরতা। এই তিনদিনে রোজা অবস্থা প্রায় নাজেহাল।
সুমু অবাক চোখে তাকাল রোজার দিকে। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। নীরব দৃষ্টিতে কিছু বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু শেরাজের উপস্থিতি তাকে বাঁধা দিল। রোজার চোখ একবার সুমুর দিকে পড়ল। অনন্যা খাতুন দাঁড়িয়ে রইলেন। এক পলক সুমুর দিকে তাকালেন, যেন কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেলেন। সুমু শান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল অনন্যা খাতুনের দিকে। মুখে কোমল আর ভদ্র হাসি নিয়ে বলল,
“আম্মু, আমরা একটু বাইরে যাচ্ছি। খান সাহেবের একটা শুট আছে আজ, সেই কাজেই।”
এক মুহূর্তের জন্য অনন্যা খাতুন তাকিয়ে রইলেন সুমুর দিকে, কিছু বললেন না। কিন্তু রোজা রাগে ফেটে পড়ল। সে ক্ষিপ্ত গলায় বলল,
“তুমি কী বললে? আমার ব্রো’য়ের অবস্থা খারাপ বানিয়ে, তাকে হসপিটালে শুইয়ে দিয়ে, তুমি তোমার হাজব্যান্ডের সাথে শুট করতে যাচ্ছ?”
সে সুমুকে ধাক্কা মারল। সুমু ব্যালান্স হারিয়ে ফেলল। সে পড়ে যাবার আগে শেরাজ এক হাত বাড়িয়ে টেনে ধরল তাকে। তার শক্ত বাহুতে জড়িয়ে বুকের ভেতর টেনে নিল। বজ্রের মতো গর্জন করে বলল,
“ডোন্ট! আর একবার যদি আমার ওয়াইফকে ছুঁয়ে দেখিস। রোজা, আই সুয়্যার, তুই নিজেও হসপিটালে যাবি।”
রোজা থমকে গেল। শেরাজের চোখে সে আগুন দেখল। সুমু মাথা নিচু করে রইল। শেরাজের বুক থেকে নিজেকে আলতোভাবে সরিয়ে নিল। চোখ নিচু, মুখের অর্ধেকটা চুলে ঢাকা। মেঝের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। রোজা তখনও দাঁড়িয়ে। ক্ষোভে ফেঁটে পড়ছে। সে এগিয়ে এলো। এবার আর রাগ নয়, কণ্ঠটা কোমল আর করুণ করে শেরাজের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,
“এস,কে…”
সুমু এগিয়ে এসে রোজার গলা চেপে ধরল। এখন তার শরীরে শক্তি যেন পাঁচজনের সমান। চোখ লাল রক্তজলের মতো টলমল করে। চোখের সাদা অংশ রক্ত বর্ণে ছেয়ে গেছে। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে কড়া গলায় বলল,
“ডোন্ট টাচ হিম।”
অনন্যা খাতুন চিৎকার দিয়ে এগিয়ে এলেন।
“ছাড়ো সুমু। তুমি কী পাগল হয়ে গেছ? ছেড়ে দাও, রোজাকে।”
তিনি সুমুর হাত ধরে টানলেন। কিন্তু হাত এক চুলও নাড়ল না। মেয়েটা যেন মুহূর্তে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে। অনন্যা খাতুনের মুখে আতঙ্ক। তার চোখ ছলছল করে উঠেছে। রোজা গলা দিয়ে শব্দ বের করার চেষ্টা করছে। সে সুমুর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। শেরাজ তখন হেঁটে গেল কিচেনের দিকে। একদম নির্লিপ্ত ভঙিতে, যেন কিছুই ঘটছে না এখানে। ফ্রিজ খুলে একটা রেড বুল ক্যান বের করল। ঢাকনাটা খুলে চুমুক বসাল। ফিরে এসে সোফার ওপর হাত মেলে দিয়ে হেলান দিয়ে বসল। ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি দিয়ে বলল,
“শি’জ নট উইক এনিমোর, রোজা। আমার সুইটহার্টকে আর কেউ ভাঙতে পারবে না।”
রোজার মুখ ফ্যাকাশে। হাত শিথিল হয়ে গেছে, চোখে ভয় জমেছে। তার মনে হলো, আজই তার শেষ দিন। সে রোজার গলা চেপে ধরা অবস্থায় তাকে নিয়ে সোফার কাছে গেল। এক ধাক্কায় রোজাকে সোফার ওপর ছুঁড়ে ফেলল। ছাড়া পেতেই রোজা কাশতে শুরু করল।
সুমু সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের ফুলদানিটা তুলে নিয়ে দেওয়ালের সাথে বারি মেরে ভেঙে ফেলল। হাতে থাকা ভাঙা অংশটুকু রোজার গলায় চেপে ধরে বলল,
“খান সাহেব, যদি ওনাকে আমি এই মুহূর্তে মেরে ফেলি, তাহলে আপনি কী লাশটা গুম করতে পারবেন?”
রোজার মুখে আতঙ্ক স্পষ্ট। অনন্যা খাতুন ছুটে এলেন। শেরাজ হালকা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“অফ কোরস, সুইটহার্ট। ইউ কিল হার।”
একটা ভয়ানক স্বস্তির ঢেউ ছড়িয়ে গেল সুমুর ঠোঁটে। সে একটু হেসে চোখ ফিরিয়ে নিল রোজার দিক থেকে। অনন্যা খাতুন সুমুর হাত ধরে টান দিয়ে সরিয়ে বললেন,
“শান্ত হও, মামনি। ও তোমার স্বামীকে আর ছুঁতে চাইবে না। তুমি শান্ত হও।”
সুমু ধীরে কাচের টুকরোটা ফেলে দিলো নিচে। তার শরীর কাঁপছে রাগে। বুক উঠা নামা করছে। তার ভেতরে আগুন জ্বলছে। শেরাজ এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়াল। সুমুর হাতে হাত রাখল সে। তার চোখে স্বস্তি নয়, বরং এক ধরনের অহংকার। এই রূপ, এই আগুন, এটাই তার সুইটহার্ট।
সুমু ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। কিন্তু চোখের রাগ এখনো ঝলসে উঠছে। শেরাজ নরম কন্ঠে বলল,
“মম! আমরা বেরোচ্ছি।”
সে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“চলো সুইটহার্ট!”
সুমু এক মুহূর্ত শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। কোনো কথা না বলে, সে নিঃশব্দে শেরাজের হাত মুঠো করে ধরল।
রোজা এখনো সোফায় বসে হাঁপাচ্ছে। শেরাজ দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে পেছনে না তাকিয়েই বলে উঠল,
“যতদিন পর্যন্ত আমি আছি, কেউ আমার স্ত্রীকে স্পর্শ করতে পারবেনা। আর যদি করে তাহলে পরিণাম এর চেয়েও ভয়ানক হবে।”
দরজাটা খুলে গেল ধীরে। সুমু শেরাজের পাশে, মাথা নিচু, চোখে যেন আগুনের ছায়া তার। দুজনে একসাথে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।
মেকআপ রুমে মেকআপ আর্টিস্ট চুপচাপ কাজ করছে। সুমু রোবটের মতো বসে আছে। সে আজ পরেছে এক লম্বা কালো লেহেঙ্গা। নিচে ভারী ঘের। উপরটা মেটালিক ব্ল্যাক এমব্রয়ডারি। ওড়নাটা পুরো জর্জেট, কিন্তু হালকা ঝিলমিল দেওয়া। একদম রুপকথার রাজকুমারীদের ড্রেসের মতো।
মেকআপ আর্টিস্ট ধীরে ধীরে সুমুর চুলগুলো খুলে কাঁধের এক পাশে নামিয়ে দিল। সুমু নিজের লেহেঙ্গার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই পোশাকে তো আরও ভয় লাগছে। এত ভারী।”
মেকআপ আর্টিস্ট হেসে বলল,
“ভয়ের কিছু নেই, ম্যাম। আপনি পারবেন।”
সুমু ওড়নাটা ঠিক করে চোখ তুলে আয়নাতে তাকাল। কালো চুল, কালো লেহেঙ্গা, কপালে স্টোনের ছোট্ট টিপ, ঠোঁটে হালকা মেটালিক রঙ। নিজেকে একদম অপরিচিত লাগছিল তার। সে নিচু গলায় বলল,
“আমাকে তো পুরোপুরি দেখবে না। তাহলে এত সাজ কেন?”
“আপনি স্যারের জন্য সাজছেন, ম্যাম। আপনার এই সাজ গোটা দুনিয়া না, শুধু একটা মানুষ দেখবে।”
সুমু লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। মেকআপ আবারও আর্টিস্ট তার কাজে মন দিল।
শেরাজ আজ পরেছে সম্পূর্ণ কালো ব্লেজার। ভিতরে সিল্কের শার্ট, হালকা ওপেন করা কলার, গলায় কোনো টাই নেই। আইয়ুব শেরাজের ব্লেজারটা ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“ভাই, তোকে তো কালোতে ভয়ানক সুদর্শন লাগছে। আজ কতোজন পাগল হবে খোদা মালুম। তুই শুধু একটু হেসে ফেললেই, ব্যস কাজ হয়ে যাবে।”
শেরাজ কিছু বলল না। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত ঘড়িটা বাঁধতে ব্যস্ত হলো। অমিত পেছন থেকে বলল,
“তোর এক্সপ্রেশনে আগুন, ভাই। কেবল ভাবিজির সামনে একটু কোমল হবি, ব্যস।”
রুমটা ফুল কালো, সাদা আর গোলাপি থিমে ডেকোরেটেড। দেয়ালের চারপাশে সিল্কের ব্ল্যাক কার্টেন, মাঝে ফ্যাব্রিকের লাইন দিয়ে বানানো ব্যাকড্রপ। ফ্লোরে লম্বা সাদা মোমবাতি জ্বলছে ধীরে ধীরে। রুমে উড়ছে বাবল। মেঝেতে গোলাপের পাপড়ির ছড়াছড়ি। ফগ মেশিন থেকে কৃত্রিম ধোয়া বেরোচ্ছে। হালকা হাওয়ায় পর্দাগুলো উড়ছে।
নিহাল আর রাহিন তখন ফাইনাল টাচ দিচ্ছে। সাউন্ড চেক, আলো চেক, ক্যামেরার লেন্স সব চেক করছে।
রিসান এসে বলল,
“বয়েস! আজ এমন কিছু করব, যেইটা ইউটিউব ছাড়লে কোটি কোটি ভিউ যাবে।”
আরবাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মোমবাতি কী একটু বেশি হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছেনা?”
নিহাল একবার চেক করে বলল,
“না, না! রুমে যতই আলো থাকুক না কেনো? শেরাজের চোখ ভাবিজিকে ছাড়া অন্ধকারই লাগবে।”
সকলে একসাথে হেসে উঠল। নিজেদের কাজ শেষ করে সকলে মিলে শেরাজের রুমের দরজার সামনে নিয়ে এলো। সারবাজ তখন একদম শুটের কমান্ডার। সে দুষ্টু হেসে বলল,
“এস.কে! তুই ক্যামেরার দিকে না তাকিয়ে, শুধু চিন্তা করবি সুমু সামনে, ব্যস।”
শেরাজ একটু হাসল। সকলে মিলে তাকে নিয়ে বাহিরে এলো।
সুমু একা দাঁড়িয়ে ছিল মেকআপ শেষ হবার পর। আয়নাতে তার মুখ পুরো দেখা যাচ্ছে। চোখে এক ধরনের অস্বস্তি। সে নিজের ওড়না ঠিক করতে করতে বলল,
“আমি পারব তো?”
ঠিক তখনই বাহির থেকে একটা মেয়ে এসে বলল,
“ম্যাম! সবকিছু সেটআপ করা হয়ে গেছে। স্যার ও রেডি। আপনার কি হয়ে গেছে, ম্যাম?”
“জি!”
“ওকে ম্যাম! আসুন আমার সাথে।”
সুমু বেরিয়ে গেল মেয়েটার সাথে। বাহিরে আসতেই সকলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। শেরাজ মাত্রই কফি মুখে দিতে যাচ্ছিল। সুমুকে দেখ হাত থেমে গেলে তার। সে কফির কাপ রাহিনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে এগিয়ে এলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুমুর পাশে দাঁড়াল। শেরাজকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সুমু চোখ নামিয়ে হাসল। তাদের দুজনের এমন সুন্দর মুহুর্ত সারবাজ ক্যামেরা বন্দি করল।
আইয়ুব সারবাজকে বলল,
“ভাই শুরু কর। এদের ধ্যান ভাঙার অপেক্ষায় থাকলে, আজ আর শুট করা লাগবেনা।”
আইয়ুব গিয়ে শেরাজের কানের কাছে জোরে চেঁচিয়ে উঠল। ধ্যান ভাঙাল শেরাজের। সকলে মিলে রেডি হলো শুটের জন্য। একে একে যার যার পজিশন নিয়ে নিল। ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা অন করল। রাহিন গিয়ে গান প্লে করল। শুরু হলো শুট,
“আগার জাগা মুজে,
আগার ছুলা মুজে!
আগার হাছা মুজে,
আগার রুলা মুজে!
আগার মিটা ভি তু, এ্যা খুদা মুজে,
তু উছকি হি, ইষ্ক মে!
আগার ওফা মিলে,
আগার দাগা মিলে!
আগার জাগা মিলে,
আগার সাজা মিলে!
আগার উঠা ভি তু, এ্যা খুদা মুজে,
তু উছকি হি, ইষ্ক মে..হে..হে!
খুদা তুজছে, দু’য়া হে ইয়ে,
মেরি কিছমাত তু লিখ এছে!
মে জি যায়ু, ও যাব চাহে,
মে মার যায়ু,ও যাব কেহে দে!”
শুট শেষ হতেই নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত পেল সকলে। ক্যামেরা বন্ধ হলো, লাইট নিভলো একে একে। একেবারে নিস্তব্ধতা নেমে এলো পুরো সেটজুড়ে। ঠিক তখনই একজন ক্রু সদস্য ঠান্ডা পানি আর দুটো চেয়ার এনে দিল।
সুমু একটু হাপিয়ে উঠেছে। পানির বোতলটা হাতে নিয়ে এক চুমুকে শেষ করতেই শেরাজ তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“কেমন লাগল, সুইটহার্ট?”
সুমু হেসে বলল,
“আপনি সাথে থাকলে সব অসুন্দর, অপ্রিয় জিনিসও সুন্দর লাগে।”
শেরাজ বোতলটা নামিয়ে মৃদু হেসে চোখ সরিয়ে নিল। এমন সময়েই রাহিন, ফাহিম আর সারবাজ একসাথে হাততালি দিয়ে বলল,
“আজকেরটা ছিল মাস্টারপিস। ফাটিয়ে দিয়ছিস এস.কে।”
অমিত এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলল,
“দুজনকে দেখলে মনে হয় যেন সিনেমার রোম্যান্স আসলেই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ওদের পুরো পারফরমেন্স জীবন্ত আর বাস্তব ছিল। এই শুটে কোনো অভিনয় নেই। পুরোটাই বাস্তব ভালোবাসার গল্প।”
শেরাজ সুমুর দিকে তাকাল। সুমু একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিল তার খান সাহেবকে। সেটের বাকি সকলে একে একে শুটিং স্পট গুছিয়ে নিতে লাগল। গাড়িগুলো প্রস্তুত হচ্ছিল বাড়ি ফেরার জন্য।
নিহাল বলল,
“ভাবিজি আসলে আগুন। আর ভাবিজির পাশে যে আছে, সে আগুনে প্রেমের বারুদ। একদম পারফেক্ট জুটি।”
সুমু লজ্জায় হেসে মুখ নামিয়ে ফেলল। শেরাজ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। নিহাল আবারও বলল,
“চল সবাই, আজ এতো ভালো শুট হয়েছে। এস.কে আমাদের সবাইকে বিরিয়ানির সাথে যে যা খেতে চাই সব খাওয়াবে। তারপর বাড়ি ফিরে রেস্ট দরকার, কাল আবার অফিসে আসতে হবে।”
সকলে উঠে দাঁড়াল। একে একে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়িগুলো একে একে রওনা দিল। শেষ গাড়িতে সুমু আর শেরাজ পাশাপাশি বসে আছে। গাড়ির কাচের বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা। সুমু জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে চুপচাপ। শেরাজ তার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে হাতটা এগিয়ে দিল।
খান সাহেব পর্ব ৪৪
“সারাজীবন পাশে থেকো এমন করে।”
সুমু কথা না বলে শুধু হাতটা ধরল। শেরাজ আলতো হাসল। সুমু, শেরাজের কাঁধে মাথা রাখল। গাড়ির ভিতর নেমে এলো এক অদ্ভুত নিঃশব্দ ভালোবাসা। গাড়ির ভিউ মিরর সাক্ষী রইল সুমুরাজের এই ভালোবাসার।
