Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৪৬ (২)

খান সাহেব পর্ব ৪৬ (২)

খান সাহেব পর্ব ৪৬ (২)
সুমাইয়া জাহান

গাঢ় রঙের পর্দা টেনে দেওয়া রোদ ঠেকানো কাচের জানালায়। কেবিনের ভেতর নিঃশব্দে চাপা একটা উত্তেজনা। দুই পুরুষ মুখোমুখি। একজন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে, আরেকজন হালকা হেসে সামনের চেয়ারে বসে আছে। শেরাজ চোখ তুলে একবার তাকাল। শীতল কন্ঠে বলল,
“তোর তো ভূতের ঘরে থাকার কথা। হঠাৎ এখানে কী?”
রায়য়ান কাঁধ ঝাঁকিয়ে হেসে ফেলল। ঠোঁটে অদ্ভুত প্রশান্তি হাসি টেনে বলল,
“দেখা করতে এলাম তোর সাথে। অনেকদিন দেখা হয় না আমাদের। তুই তো খোঁজ রাখিস না আমার।”
শেরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,
“ভুল করে এসেছিস তাহলে। আমি পুরোনো কুকুরদের খোঁজ রাখি না।”
রায়য়ান সামান্য ঝুঁকে বলল,
“ভুল করিনি। ঠিক জায়গাতেই এসেছি। তুই ভুলে গেলেও, সময় ভুলে না, ব্রো।”
শেরাজ এবার একটু চেয়ারের হাতলে আঙুল ঠুকিয়ে বলল,
“সময় না ভুললেও, সময় অনেক কিছু বদলে দেয়।”
রায়য়ান হেসে বলল,

“বাদ দে সেসব। বিয়ে করছিস, ইনভাইট করলি না? খুব কষ্ট পেয়েছিলাম জানিস?”
শেরাজ ঠোঁট একটুখানি বেঁকিয়ে বলল,
“বেশি কথা না বলে, কাজে কথা বল। আমার হাতে বেশি সময় নেই।”
রায়য়ান হাত তুলল। ঠান্ডা ভঙ্গিতে বলল,
“কাজের কথা তো বলবোই। কিন্তু তার আগে, এতদিন পর তোর অফিসে এলাম, চা কফি কিছু বল। নাকি আপ‍্যায়ন করা ভুলে গেছিস?”
শেরাজ চুপচাপ ইন্টারকমের বাটন টিপে বলল,
“সান, কেবিন এক কাপ কফি আর এক কাপ চা পাঠাও।”
রায়য়ান ভ্রু কুঁচকে হালকা হেসে বলল,
“তুই আমাকে জিজ্ঞাসা করলি না যে, আমি চা নাকি কফি নিতে চাই?”
শেরাজ মুখ তুলে তাকাল না। শুধু ঠান্ডা গলায় বলল,
“কুকুররা সবকিছুই খায়। তাদের আলাদা চয়েজ থাকে না।”
এক মুহূর্ত থেমে গেল সব শব্দ। রায়য়ান থমকে গেলেও মুখে হাসি রেখে বলল,
“এতটা ঘৃণা এখনো বাঁচিয়ে রেখেছিস, ভালো লাগছে দেখে। মানে, তোর ভেতরে আমি এখনো জ্যান্ত আছি।”
শেরাজ এবার চোখ তুলে সোজা তাকাল রায়য়ানের দিকে।
“তুই কখনো মরিসনি আমার ভেতর। তুই শুধু পচে গেছিস।”
রায়য়ান মুখে হাসি ধরে রাখলেও আড়ালে চোখের পেছনে জমে উঠল অন্ধকার। সে কণ্ঠ এবার একটু ভারী করে বলল,

“এই পচনই হয়তো একদিন তোকেও ছুঁয়ে যাবে, এস.কে। সময় সবকিছুর হিসাব নেয়।”
শেরাজ হালকা ঝুঁকে সামনে এলো।
“যদি ছুঁয়েও যায়, আগে তোর গলা টিপে ধরব আমি নিজের হাতে। তুই এসেছিস ভুল দরজায়, ভুল সময়ে। এখন যা বলার বল।”
দরজার নক পড়ল। শেরাজ ভেতরে আসার পারমিশন দিল। একজন অফিস সার্ভেন্ট ভেতরে ঢুকল, হাতে একটা ট্রে নিয়ে। এক পাশে ধোঁয়া উঠছে কফির কাপ থেকে, অন্য পাশে চায়ের কাপ থেকে। ট্রেটা সামনে টেবিলে নামিয়ে সে বিনয়ের সঙ্গে নত হয়ে সরে গেল। কফির কাপ দেখে রায়য়ানের ঠোঁটে একটা রহস্যময় হাসি খেলে উঠল। চোখ দুটোয় যেন পুরোনো কোনো পাপের স্মৃতির গোপন জয়ের ছায়া। চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“চা আর কফি দুটোই এসেছে। বুঝলাম, কুকুরের জন্য যেমন খাবারই ফেলো, কুকুর খেয়ে নেয়। তোকে ধন্যবাদ! আজ এই কুকুরকে দুই ধরনের স্বাদ উপহার দিলি।”

শেহেরাজ ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর দেয়।
তোর মুখে বিষ ঢাললেও কিছু হবে না, কারণ বিষের সাথে শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেছে তোর।
রায়য়ান কফির কাপটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে বলল,
“তোর গলায়ও দড়ি পড়তে পারে।”
শেরাজ হাসল। তবে সেই হাসিতে ছিল গর্জে ওঠার আগমনী বার্তা।
“তুই আমাকে নিয়ে ভাবিস? যার ঘাড়ে শিকল, সে অন্যদের গলায় দড়ি কল্পনা করেই সুখ পায়।”
রায়য়ান হাসল। চায়ের কাপটার দিকে ইশারা করে বলল,
“চা তোর ফেভারিট। ওটা তুই খা।”
শেরাজ কড়া চোখে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“কুকুরের জন্য আনা জিনিস মানুষ খায় না।”
এক মুহূর্ত নিঃশব্দ। রায়য়ানের ঠোঁটের কোণে আবার সেই রহস্যময় হাসি। শেরাজ ইন্টারকমে আবার কল করল।
“সান, আমার জন্য এক কাপ কড়া ব্ল্যাক কফি পাঠাতে বলো। সুগার ছাড়া।”
সে ফোন নামিয়ে রেখে রায়য়ানের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল,

“কি বলতে এসেছিস, বল?”
রায়য়ান কফির কাপটা রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে এলো। গলার স্বর চাপা ভঙ্গিতে বলল,
“মিডল ইস্ট ফ‍্যাশন ডিস্ট্রিক্টে এ.কে লাক্স-এর নাম উঠেছে শুননাম। সাহস তো কম না তোর। জানিস, এক সময় আমি ওখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। নিজের আর.সি লাক্স-এর নাম ওই জায়গাটাতে নিতে চেয়েছিলাম। এখন শুনি, এস,কে কর্প সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে প্রজেক্ট সাইটে। ভাগ্য কি একেই বলে?”
শেরাজ নির্বিকার গলায় বলল,
“ভাগ্য তাদের পাশে থাকে, যারা ভাগ্যকে নিজের দিকে টেনে আনে। স্বপ্ন দেখেছিস বলেই, স্বপ্নেই রয়ে গেছে। তুই স্বপ্ন দেখিস আর আমি দখল করি। তুই কল্পনা করিস, আমি কনক্রিট বসাই।”
রায়য়ান হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“এই একটা জায়গায় আমি তোর সাথে পেরে উঠি না, ব্রো। বিজনেসের টেবিলে তুই যে খেলা খেলিস, তাতে আমি শুধু দর্শক হয়ে বসে থাকি। এইখানে তুই আমায় বার বার হারাস। তোর সামনে সব প্ল্যান, সব স্ট্র্যাটেজি যেন পানি হয়ে যায়। এস.কে কোর দিয়ে যেভাবে মিডল মার্কেটে ঢুকলি, ভাবতেও পারিনি তুই এতটা দূর যাবি। আমি প্ল্যান করি, তুই সেই প্ল্যানের ওপর রাজত্ব করিস।
শেরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টেনে বলল,
“খেলার মাঠে দাঁড়াতে হলে, আগে খেলতে শিখতে হয়। কীভাবে গোল দিতে হয়, সেটা জানতে হয়। খেলার মাঠে নামলেই খেলোয়াড় হওয়া যায় না। তুই এখনো বুঝিস না, খেলোয়াড় হতে হলে হৃদয়ে সাহস লাগে। কুকুরে সেই সাহস থাকে না।”
রায়য়ানের চোখে এক মুহূর্তের অন্ধকার নেমে এলো। কফির কাপটা হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল,
“তোর মধ্যে আগের সেই আগুন এখনো আছে। কিন্তু এখন সেটা হিসেব করে পোড়ায়।”
শেরাজ ধীরে বলল,

“আগুন আমি আগেও ছিলাম, এখনো আছি। পার্থক্য শুধু এটাই যে, এখন সেই আগুনটা নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু কেউ যদি চায় জোর করে ঘি ঢালতে, তখন সেই আগুন আবার জ্বলে উঠবে, আর পুড়িয়ে ছাঁই করে দিবে।”
রায়য়ান চুপ করে রইল। কোনো উত্তর নেই কিছুক্ষণ। সে একটু সময় নিয়ে ভেবে ঠান্ডা গলায় বলল,
“তোকে থামানো যাবে না আমি জানি। কিন্তু এই আগুনে তোর খুব আপন কেউ পুড়ে যাবে, এটা তুই জানিস?”
শেরাজ সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠে এবার গর্জনের রেশ।
“আমি আলোর মতো ছড়াই, আগুনের মতো পোড়াই। কার পুড়বে, কার জ্বলবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমার আছে। কে পুড়বে, কে জ্বলবে সেটা সময় বলে দিবে। আর সময় আমার ছায়ায় চলে। রঙ আমি বদলাই না, দরকার পড়লে পুরো ক্যানভাসটাই বদলে দিই। অ‍্যান্ড ইউ নো হোয়াট, তুই সেই ভাগ্যবান, যাকে এখনো আমি শুধু কথা দিয়ে জবাব দিচ্ছি।”
রায়য়ান ধীরে কফির কাপটা ঠোঁটের কাছে তুলে আবারও এক চুমুক দিয়ে বলল,
“বিজনেস ভালোই চলছে তাহলে দেখছি। এস.কে লাক্স-তো এখন প্রিমিয়াম মার্কেটে ট্রেন্ড গড়ছে। আর এস.কে কোর-তো রাস্তায় বের হলেই লোগো চোখে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা খুশি, মার্কেট প্রশান্ত। কিন্তু একটা জায়গা পড়ে আছে এখন, সেটা হলো লাক্স গ্রুপ।”

শেরাজ কফির কাপে ছোট করে চুমুক বসাল। রায়য়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। সে আবারও বলল,
“সেখানে ঢোকার অনুমতি কারো নেই এখনো। অথচ তুই যদি চাস, সেই দরজাটাও খুলে যেতে পারে।”
শেরাজ একদম নিরাবেগ মুখে তাকাল।
“তোর মতো নোংরা লোকদের দিয়ে দরজা খোলার শখ আমার নেই।”
রায়য়ান হেসে বলল,
“তুই যেমনই ভাবিস। কিন্তু মেনে নে, ওই জায়গায় তোকে লাগবে। কাউকে একটা গেটওয়ে, একটা কানেকশন,আমি সেটাই অফার দিতে এসেছি। বিনিময়ে…”
শেরাজ কথার মাঝখানে বাঁধা দিল।
“বিনিময়ে?”
রায়য়ান একটুখানি সামনে ঝুঁকে এলো, চোখে তার কৌশলের দীপ্তি।
“বিনিময়ে আমি চাই, তোরা কাতারে আমার একটা প্রজেক্টে সাপোর্ট দিস। ইনভেস্টমেন্ট নয়, শুধু রিকগনিশন। তোর কোম্পানির নাম থাকলেই বাকিটা আমি সামলে নেব।”
শেরাজ চেয়ারে একটু পিছনে হেলান দিল। এক চুমুক কড়া কফি খেয়ে বলল,
“তুই জানিস, আমার কোম্পানির নাম মানেই ট্রাস্ট। আমি আমার নাম বিক্রি করি না। আর যেই প্রজেক্ট নিয়ে তুই বলছিস, সেটা আমি আগেই রিজেক্ট করেছি। দুর্নীতির গন্ধ ছিল। আমার নাম বিক্রি করার জন্য না। এস.কে কোর মানেই হচ্ছে রেস্পন্সিবিলিটি। এটা নোংরামি করার জিনিস না।”
রায়য়ানের হাসি এবার একটু চাপা হয়ে গেল। সে শান্ত গলায় বলল,
“সব প্রজেক্টই শুরুতে কালো থাকে, ব্রো। মানুষই রঙ বদলায়। তুই যদি চাস, এটাও সাদা হয়ে যাবে।”
শেরাজ ঠান্ডা কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

“তুই যেটা ভুল বুঝেছিস সেটা হলো, আমি রঙ বদলাই না, আমি বদলে দেই।”
রায়য়ান এবার আর হাসল না। কণ্ঠটা নিচু, আর তীক্ষ্ণ করে বলল,
“ভেবে নিস! তোর বিরুদ্ধে এখনো মুখ খুলিনি আমি। কেউ চুপ থাকে মানে এই নয় যে, সে ভুলে গেছে।”
শেরাজ উঠে দাঁড়াল। তার কণ্ঠে গর্জন,
“তুই যা বলবি, সামনে বলবি। পেছনে কামড়ানো কুকুর আমি এক মুহূর্তে মেরে ফেলি। এই দরজায় দ্বিতীয়বার আর আসবি না।”
রায়য়ান উঠে দাঁড়িয়ে হালকা মাথা নুইয়ে বলল,
“বুঝলাম! তবে মনে রাখিস, সময়ের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে, সময় চলতে পারে। কিন্তু কেউ সময়ের বিরুদ্ধে হাঁটতে গেলে, সময় তাকে টেনে নামায়।”
শেরাজ তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে। রায়য়ান ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। বেরিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে সে পেছনে ফিরে বলল,
“সাবধানে থাকিস, এস.কে। শুধু ব্যবসা না, ভালোবাসাও কেউ কেউ ছিনিয়ে নিতে জানে।”
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে কেবিনে নেমে এলো আরও ঘন নিঃশব্দতা। শেরাজ দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে স্থির আগুন। সে কফির কাপে চুমুক দিয়ে নিচু গলায় নিজেকেই বলল,
“এসবের মধ্যে আমার সুমুকে টানলে, তোর জন‍্য দুনিয়াকে জাহান্নামে পরিনত করব আমি।”

রায়য়ান চলে গেছে প্রায় একঘণ্টা। শেরাজ এখনো কেবিনে একা। মাথা দু’হাতে চেপে ধরে বসে আছে সে। চোয়াল শক্ত, কপালের শিরাগুলো টানটান হয়ে আছে। বুকের ভেতর দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে তার। হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল সে। একটা কাচের জগ ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে কাচ ভেঙে টুকরো ছড়িয়ে পড়ল মার্বেলের মেঝেতে। এক ঝলকে টেবিলের উপর থেকে সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিল সে। ল্যাপটপ, ফাইল, কফির মগ সব। কাচ ভাঙার শব্দে বাইরে থাকা সকলে দৌড়ে এসে দাঁড়াল কেবিনের দরজায়। সারবাজ চিন্তিত কন্ঠে বলল,
“এস.কে, কি হয়েছে তোর?”
শেরাজ তাকাল না। ঠান্ডা গলায় বলল,

“সবাইকে বের করে দে। তোরাও চলে যা। আজ কেউ এখানে থাকবে না। কাউকে দেখতে চাই না।”
শেরাজের কণ্ঠ এমন এক গর্জন ছিল, যা কেউ অমান্য করার সাহস করবেনা। মুহূর্তেই পুরো ফ্লোর খালি হয়ে গেল। সারবাজরা দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ ধীরে হাঁটতে হাঁটতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সামনের শহর দেখা যাচ্ছে। এই শহরটা কতোটা নীরব, জ্বলজ্বলে, অথচ তার ভেতরে যেন এক অদৃশ্য অন্ধকার। সে গর্জন করে বলল,
“তোদের সবাইকেও যেতে বলেছি আমি।”
সারবাজরা ভেতরে আসতে নিলে শেরাজ রিমোট টিপ দিয়ে কেবিনের দরজা লক করে দিয়ে বলল,
“তোরা কি যাবি? নাকি আমি অফিসের মধ্যে ভাঙচুর করব?”

সারবাজরা কেউ আর দাঁড়িয়ে রইল না। সকলে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে। শেরাজ চোখ বন্ধ করে রাখল কিছুক্ষণ। ফোনটা হাতে তুলে একটা নামের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। তার ঠোঁট কেঁপে উঠল। মৃদুস্বরে বলল,
“হঠাৎ আমার কি হলো জানিনা। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। কেনো এমন হচ্ছে বুঝতে পারছিনা আমি। আজ আমি বাড়িতে ফিরব না। আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে, আমার এই রাগ তোমাকে আঘাত করতে আজ আমাকে বাধ‍্য করতে পারে। ভুল করেও যদি আমি তোমাকে আঘাত করে বসি, তাহলে আমি নিজেকে কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারব না। তুমি আমার রক্তে মিশে আছো, সুইটহার্ট। তোমাকে আঘাত করা মানে, নিজের কলিজা নিজের হাতে ছিঁড়ে বের করে আনা।”

রাত এগারোটা বাজে। ডাইনিং টেবিলের পাশে চুপচাপ বসে আছে সুমু। তার সামনে রাখা দুটো প্লেট। একটায় গরম খিচুড়ি, আরেকটায় রুই মাছ ভাজা। ঘড়ির কাঁটা তাকিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“খান সাহেব এখনো এলো না। সারাবাজ ভাইয়া, আরবাজ ভাইয়াও এখনো ফিরল না।”
ঘরভর্তি নীরবতা। বারান্দা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। পর্দাগুলো একটু একটু নড়ে উঠছে। সুমুর চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু তাতেও লুকিয়ে আছে একরাশ ভালোবাসা। তার হাতের ফোনে বারবার চোখ পড়ে, শেষবার সিন হয়েছে সন্ধ্যা ৭:৪৫। সেই থেকে আর না কোনো মেসেজ আর না কোনো কল। ভেতরে ভেতরে কেমন একটা অজানা ভয় চেপে বসেছে সুমুর বুকে। কিছু একটা ঠিক নেই। কিন্তু ঠিক কী, সেটা সে বুঝতে পারছেনা। উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। হঠাৎ গেটের বাইরে গাড়ির শব্দ। সুমুর বুকের ভেতর হঠাৎ করে ঝড় উঠল। সে ছুটে গেল গেটের কাছে। চোখে শুধু একটিই প্রত্যাশা,

‘খান সাহেব’!
কিন্তু গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল সারবাজ আর আরবাজ। গাড়ি থেকে নেমেই দু’জনের মুখ গম্ভীর, চোখে অস্বস্তির ছায়া। সুমু থমকে দাঁড়াল। দৃষ্টি ছলছল করে উঠল তার। সে কাঁপা গলায় বলল
“খান সাহেব কোথায়, ভাইয়া? উনি আসেনি?”
সারবাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“এস.কে অফিসে, সুমু। জানিনা হঠাৎ কি…”
আরবাজ চোখের ইশারায় থামিয়ে দিল তাকে। সুমু প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“হঠাৎ?”
সারবাজ একবার আরবাজের দিকে তাকাল। জোর করে হেসে বলল,

“আসলে অফিসে একটু কাজ আছে। এস.কে সেটা শেষ করেই ফিরবে। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, সুমু। ওর হয়তো ফিরতে লেট হবে।”
“আপনারা ওনাকে রেখে চলে এলেন?”
আরবাজ আলতো হেসে বলল,
“আমরা থাকতে চেয়েছিলাম, সুমু। কিন্তু তুমি তো জানো এস.কে কেমন। ও আমাদের কিছুতেই অফিসে থাকতে দিল না।”
সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। হাওয়ায় তার চুল উড়ছে, চোখে অজানা ভয়। সে আর দাঁড়িয়ে রইল না। আস্তে আস্তে ঘরে চলে এলো। ঘরজুড়ে নিস্তব্ধতা, তার মনটাও অশান্ত। সে ধীরে গিয়ে বেলকনির দরজাটা খুলে দাঁড়াল। হিমেল বাতাস চুল উড়িয়ে দিল তার। দূরে রাস্তার শেষ প্রান্তটা দেখতে দেখতে মনে মনে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি কোথায় খান সাহেব?”

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। ধীরে তার ডানটা হাতটা পেটের ওপর রাখল। নরম করে ছুঁয়ে রইল নিজের শরীরের ভেতর সদ‍্য বেড়ে উঠতে থাকা নতুন জীবনের অস্তিত্বকে। অন্য হাতে ধরে থাকা প্রেগনেন্সির কিটটায় চোখ পড়ল তার। হালকা গোলাপি দুটো লাইন। ফর্সা আঙুলের ভেতর ছোট্ট প্লাস্টিকের টুকরোটা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখের উত্তর। সুমু আলতো করে হাসল। একটা নিঃশব্দ ভালোবাসার হাসি তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল। নিচু হয়ে পেটের কাছাকাছি মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“জানো মাম্মা, তোমার পাপা খুব রাগী। সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে রাখে। কিন্তু তোমার নানু বলে, যার মনটা সবচেয়ে নরম, সেই রাগ করে বেশি। আর আমি তো জানি, আমার খান সাহেবের মনটা তুলোর মতো নরম।”
সে একটু থেমে চোখ মুছে আবারও বলল,

“তোমার পাপা আমার কথা ভাবলে নরম হয়ে যায়। সারাজীবন তাকে ভয় পেয়েছি, আবার তাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি। আর এখন? এখন তুমি আসবে। তোমার পাপা বাচ্চাদের খুব ভালোবাসে। তোমার পাপা যদি তোমার আসার কথা জানতে পারে, তাহলে দেখো সে কী কী করে।”
সুমুর গলা কেঁপে উঠল। তার কণ্ঠে ভালোবাসা, ভয়, আনন্দ আর অপেক্ষার মিশ্র আবেগ। সে আবারও বলল,
“আমি জানি না তুমি মেয়ে না ছেলে হবে। কিন্তু একটা কথা বলি, তুমি তোমার পাপার মতো চোখ পাবে, গভীর, রাগী, কিন্তু মায়ায় ভরা এক জোড়া চোখ।”
সে বসে পড়ল বেলকনিতে রাখা চেয়ারে। মেঘে ঢাকা চাঁদের হালকা আলো তার চুলে পড়ে যেন মোমের মতো নরম একটা আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সে কোলের ওপর রাখল প্রেগনেন্সির কিটটা। হালকা কাঁপা গলায় বলল,
“জানো, আমি অনেক ভয় পাই। এই নতুন জীবনের কথা ভাবলে বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে। আমি কী পারব সবকিছু আগলে রাখতে, মাম্মা? আমার যে ভয় করছে।”
মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“খান সাহেব তো জানেন-ই না, তার হৃদয়ের মধ্যে কতটা কোমলতা লুকানো আছে।”
সুমুর চোখে পানি চলে এলো। সে পেটের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
“তোমাকে যখন তোমার পাপা কোলে তুলে নিবে, তখন ওর মুখটা শক্ত হয়ে থাকবে, কিন্তু হাত কাঁপবে। চোখের কোণে একটু জল জমবে। আর সে আমাকে বলবে, ‘এতো ছোট? আমার ছেলে বা মেয়ে এতো ছোট’?”
সুমু হেসে উঠে আবারও বলল,
“একদিন তুমি বড় হবে। আমি তোমাকে শিখাবো কীভাবে ভালোবাসতে হয়। কীভাবে রাগিমুখের মধ্যে কোমলতা খুঁজে নিতে হয়। যেমন আমি খুঁজে নেই আমার খান সাহেবের মধ্যে।”
চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালের কিনারায়।
“আমি খুব একা অনুভব করছি আজ। খান সাহেব পাশে থাকলে হয়তো এই ভয়টা লাগতো না। তবে তুমি আছো আজ আমার ভেতর? তুমি তো এখন থেকেই তোমার মাম্মার সাহস, তাই না?”
সে ধীরে ধীরে হাতটা আবার পেটের ওপর রাখল। চোখ দুটো জলে টলমল করছে তার। নিঃশব্দে হেসে উঠর আবারও। সে একটানা বলে যেতে থাকে যেন তার শিশুটাও শুনতে পাচ্ছে।
“তুমি জানো মাম্মা? তুমি মাত্র দু’মাস ধরে আমার সঙ্গে আছো। তুমি তো এখনো তৈরি হওনি। কথা বলতে পারোনা, চোখ খুলতে পারোনা, হাসতেও পারোনা। তবু, আমি বুঝি তুমি আছো। আমি টের পাচ্ছি তোমার নিঃশব্দ উপস্থিতি।”

সে এক হাত দিয়ে চোখ মুছে নিল। অন্য হাতটা মুঠো করে বুকের কাছে রেখে বলল,
“তোমার মাম্মা, মানে আমি। এই খবরটা জেনেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। কিন্তু বিশ্বাস করো, এই অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তুমি আমার জীবনের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছো। তুমি হয়ে গেছো আমার আরেকটা জীবন, একটা আলাদা নিঃশ্বাস, একটা আলাদা সত্তা। যে সত্তা আমার আর আমার খান সাহেবের ভালোবাসা থেকে সৃষ্টি। তোমার পাপা, আমার খান সাহেব, তিনি হচ্ছেন আমার দুনিয়া। আমি চোখ বন্ধ করলেই ওনার মুখটা দেখি। কিন্তু তুমি? তুমি তো চোখ বন্ধ না করলেও আমার ভেতরেই আছো। তুমি আমার দেহে, রক্তে, নিঃশ্বাসে মিশে আছো। তোমার পাপা যখন জানতে পারবে তখন ওনার চোখের প্রথম চমকটা আমি দেখতে চাই। ওনার খুশিটা আমি দেখতে চাই।”
সুমু ফোনটা নিয়ে শেরাজকে টেক্সট করল,
“আমি অসুস্থ খান সাহেব? প্লিজ, তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরুন। আপনাকে কিছু বলতে চাই আমি।”
টেক্সট পাঠিয়ে সুমু হঠাৎ চুপ করে গেল। তার বুকের ভেতর একটা স্পন্দন অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে চলেছে। তার মনে হলো যেন সত্যিই ছোট্ট কোনো প্রাণ তার অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে।

রাত একটা পঁয়তাল্লিশ। অঝরে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে বাজ পড়ছে। ঠিক সেই সময় খান ম্যানশনের গেট দিয়ে ঢুকল একটি কালো রোলস-রয়েস বোট টেইল। হেডলাইট নিভে গেল। কিন্তু গাড়ির ইঞ্জিনের গম্ভীর গর্জন যেন জানিয়ে দিচ্ছে, গাড়ির মালিক ঠিক কতটা অস্থির। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল শেরাজ। সাদা শার্ট, হাতা গুটানো, টাই টানা হয়নি, চোখ লাল, কপালে ভাঁজ, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে যেন আগুনে ফুঁসতে থাকা আগ্নেয়গিরি। দারোয়ান দূর থেকে জিজ্ঞেস করতে চাইল, কিন্তু সে নিজেই চোখ নামিয়ে নিল, শেরাজের চেহারায় এমন অস্থিরতা দেখে।
বৃষ্টিতে ভিজে শেরাজ বাড়ির ভেতরে ঢুকল। সে চুপচাপ উঠে এলো দ্বিতীয় তলায়। রুমের দরজা জোরে ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল। ঠিক তখনই, সুমুর ঘুম ভাঙল। সে বেলকনিতে রাখা চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ডান হাতটা এখনো পেটে ওপর রাখা। চোখের কোণে শুকনো অশ্রু। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে ঘুমের ছাপ, কিন্তু মুখে খুশির ঝলক। ধীর পায়ে হেঁটে রুমে এলো। বাহিরে বিদ‍্যুতের আলোয় শেরাজের মুখটা চোখে পড়তে সুমু কিছুটা অবাক হলো। সে ধীরে বলল,

“খান সাহেব, কখন এলেন? এতো লেট করলেন কেনো? খেয়েছেন আপনি? আপনি জানেন, আমি আপনাকে কিছু একটা বলার জন‍্য…”
শেরাজ গর্জে উঠে বলল,
“না, এখন কিছু শুনতে চাই না আমি। বিরক্ত করোনা।”
সুমু থেমে গেল। পেটে হাত রাখল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। হাতে তখনো সেই প্রেগনেন্সি কিট। কিটটা মুঠোয় ধরে সে আবার বলল,
“আপনি শুধু একটু দেখুন তো।”
শেরাজ এক ঝটকায় টেবিলের ওপর রাখা জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দিল।
“তুমি এখন এসব নাটক নিয়ে এসেছো আমার সামনে? আমি আগে থেকেই ক্লান্ত, মাথা ধরেছে। আর তুমি শুধু নিজের কথা ভাবছো। প্লিজ, বেরিয়ে যাও।”
সুমু ভয়ে পিছিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল,
“খান সাহেব, কি হয়েছে আপনার?”

শেরাজ পাগলের মতো আচরণ করল। হঠাৎই সে পাশের শেলফে ধাক্কা মারল। ভেতরের কাচের জিনিসপত্র পড়ে ভেঙে গেল। একটা ভাঙা কাচের টুকরো ছিটকে গিয়ে পড়ল সুমুর পায়ের কাছে। সুমু পিছতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে গেল। একটুকরো কাচ ঢুকে গেল তার হাতে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। প্রেগনেন্সি কিটটা ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। শেরাজ দাঁড়িয়ে দেখল। সে মরিয়া হয়ে ‘সুমু’ বলে এগিয়ে আসতে গেলেই আবারও তার মাথা যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল। সে আর এগোলো না। মাথা দু’হাত দিয়ে চেপে ধরে মেঝের ওপর বসে পড়ল। মাথা যন্ত্রণায় গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উটল। তার চিৎকারের সাথে তাল মিলিয়ে আকাশটাও যেন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সুমু কাঁপতে কাঁপতে বলল,

“খান সাহেব!”
শেরাজ ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে সহ্য হচ্ছে না আমার। প্লিজ, চলে যাও। রিকোয়েস্ট করছি, সুমু। আপাতত যাও। আমি নিতে পারছিনা কাউকে। খারাপ কিছু করে ফেলার আগে চলে যাও, প্লিজ।”
“আপনার কি হয়েছে? কীসব বলছেন আপনি?”
শেরাজ সুমুর কাছে এলো। তার চোখে আগুন জ্বলছে। সে একধাপ এগিয়ে এসে গর্জে উঠে বলল,
“তোমার এতো বড় সাহস। কৈফিয়ত চাইছো তুমি শেরাজ খানের কাছে?”
“আমি শুধু জানতে চাই, আপনি কেন এমন করছেন আমার সঙ্গে?”
শেরাজ দুই হাতে মাথা চেপে ধরেল। উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালের ঘুষি মারল। একটা ফ্রেম পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। সুমু দৌড়ে গিয়ে শেরাজকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আপনার কি হয়েছে, খান সাহেব? কেনো এমন করছেন? প্লিজ, শান্ত হন।”
ক্ষণিকের জন‍্য অশান্ত শেরাজ শান্ত হল। সে পেছন ঘুরে দাঁড়াল। শক্ত করে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল তার প্রেয়সীকে। সুমু চোখ ভিজে, গলায় কাঁপন নিয়ে বলল,

“খান সাহেব, আপনি হুঁশে আসুন। এভাবে কথা বলছেন কেনো? কী হয়েছে বলুন আমায়? আমি আছি তো আপনার পাশে।”
শেরাজের আবারও অসহ‍্য লাগছে। সে সরিয়ে দিল সুমুকে। অন‍্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“তুমি থাকবে? সবাই মিলে আমাকে ভাঙার জন্য এক হয়েছ, তাই না?”
সুমু কাঁপা গলায় বলল,
“কী আজেবাজে কথা বলছেন আপনি?”
শরাজ টেবিলের ড্রয়ার খুলে পাসপোর্ট, একটা ব্যাগে রাখা টাকা বের করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল,
“এই নাও, যা লাগে সব নিয়ে যাও। তবুও, আমার জীবন থেকে বেরিয়ে যাও।”
সুমু চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল।
“না, আমি কোথাও যাব না। আপনি হুঁশে আসুন, প্লিজ। আপনি এখন যা বলছেন, তার একটা কথাও আপনি মন থেকে বলেননি। আপনার কী সমস্যা হচ্ছে আমাকে বলুন।”
শেরাজ সামনে এসে সুমুর হাত ধরে বলল,

“তুমি যাবেই। আমি যেভাবে বলছি সেভাবে যাবে। আমার রাগের পরিমাণ বাড়ছে, তুমি আমার চোখের সামনে থাকলে। আমি এখন এমন কোনো ভুল করে বসতে পারি, যে ভুলের মাশুল আমাকে হয়তো আমার জীবন দিয়ে দিতে হতে পারে। তাই প্লিজ, দয়া করে অন্তত এই রুম থেকে যাও।”
সুমু গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি কোথাও যাব না। আপনি এখন ঠিক নেই। আমি জানি খান সাহেব, আপনি আমাকে কখনো এভাবে ছাড়তে পারেন না।”
শেরাজ যেন পাগল হয়ে গেল। সে গর্জে উঠে বলল,
“তুমি কি বোঝো না আমি আর পারছি না। আমি তোমাকে সহ্য করতে পারছি না। বের হয়ে যাও।”
সুমু কাঁদছে। তর বুকের ভিতরটা কাঁপছে।
“আমি যাবো না। আমি কিছুতেই যাব না।”
শেরাজ আর নিজেকে থামাতে পারল না। জোর করে সুমুর হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে গেল দরজার দিকে। সুমু আর্তনাদ করে বলল,

“খান সাহেব, প্লিজ!”
শেরাজ শুনল না। সুমুকে সিঁড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে বাড়ির গেটের দিকে নিয়ে চলে গেল। বাড়ির দরজার বাহিরে সুমুকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
“বেরিয়ে যাও, এখান থেকে। চিরদিনের মতো বেরিয়ে যাও।”
সুমুর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে আর কথা বলার ভাষা খুঁজে পেল না। শেষবার চোখ তুলে তাকাল শেরাজের দিকে। কান্নাভেজা গলায় বলল,
“আমি জানি, আপনি একদিন এই রাতের কথা মনে করে নিজেকে ঘৃণা করবেন। আর আমি এটাও জানি, আপনি আমার সাথে ইচ্ছে করে কিছু করছেন না। এমন কিছু একটা হয়েছে আপনার, যার ফলে আপনি এমন করছেন। যখন আপনি সবটা বুঝে উঠবেন, তখন আপনি নিজেকে ঘৃণা করবেন। অনেক কষ্ট পাবেন। আমি দোয়া করি, আপনি হুঁশে আসার পর জানো, এই সময়টার কথা আপনার মনে না থাকে। কারণ এই সময়টা আপনার মনে থাকলে, আপনি এতোটাই কষ্ট পাবেন যে, আপনি নিজেকে শেষ করে দিতে চাইবেন। আর সুমু চায় না তার খান সাহেব এক বিন্দুও কষ্ট পাক।”

গেট বন্ধ হয়ে গেল। সুমু দাঁড়িয়ে রইলো খান ম‍্যানশনের বিশাল গেটের সামনে। বৃষ্টির তেজ বেড়েছে। সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছেনা, যে হাত ধরে তার খান সাহেব তাকে নিয়ে একদিন ঘর বানাতে চেয়েছিল, সেই হাতই আজ তাকে ঘরছাড়া করল। সুমুর চোখের কোণ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে, ঠোঁট দুটো শুকনো। সে ধীরে হাঁটতে লাগল গার্ডেনের দিকে। তার সাথে আজ আকাশটাও কাঁদছে।
গার্ডেনের কোণে রাখা কাঠের একটা চেয়ারে এসে বসে পড়ল সে। পেটের ওপর হাত রাখল। সে আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু আবার ভেতরে ভেতরে শক্ত হয়ে উঠছে। চোখের কোণে নোনতা পানি বৃষ্টির পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। ঠোঁটে হালকা একটুকরো ব্যথার হাসি। অপেক্ষা করতে থাকে সে তার খান সাহেবের জন্য। হঠাৎ তার চোখ যায় গার্ডেনের ঝোপের দিকে। তার মনে হলো কেউ তাকে দূর থেকে দেখছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
“কে? কে ওখানে?”

সে উঠে দাঁড়িয়ে দারোয়ানের ঘরের দিকে যাবার জন‍্য পা বাড়াতেই একটা ঠাণ্ডা, মোটা হাত পেছন থেকে এসে তার মুখ চেপে ধরল। আরেকটা শক্ত হাত তার হাতদুটো জোরে টেনে ধরে পেছনে নিয়ে গেল। সুমুর চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে ছটফট করল, মাথা নাড়াল, আওয়াজ করতে চাইল, কিন্তু কিছুই করতে পারল না। একটা মুখোশধারী হালকা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“চুপ, বেশি শব্দ করবিনা। এই ভারী বর্ষনে কেউ তোর ডাক শুনতে পাবেনা, তাই চেঁচানোর চেষ্টা করে নিজের এনার্জি নষ্ট করিস না। এই হাই-সিকিউরিটি জোনের চোখে ধুলো দিয়ে, সবগুলোকে ঘুমিয়ে মেডিসিন খাইয়ে এখানে ঢুকেছে। শব্দ করলে এখানেই মেরে দিবো।”
সুমুর চোখে পানি ছলছল করছে। সে বুঝতে পারছেনা এইসব কেনো হচ্ছে। তবে এটা বুঝতে পারছে খুব খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে।

ঘন গাঢ় রাত। মেঘ বার বার গর্জন করে উঠছে। গেটের সামনে থেকে মুখ চেপে ধরে সুমুকে জোর করে টেনে নিয়ে গেল মুখোশধারী কয়েকজন লোক। বৃষ্টি আর বাজ পারার আওয়াজ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। চারপাশে গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। তারা সুমুকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে এলো একটা ঘন জঙ্গলে। যেখানে মানুষ তো দূর, কোনো কুকুর বেড়ালও আসে না। সুমুর চোখে পানি, মুখে কাপড় গোঁজা, হাত-পা বাঁধা। সে কাঁপছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার ভয়ে।
সকলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। একজন লোক হাতে ছাতা নিয়ে তাদের লিডারের মাথার ওপর ধরল। সুমুকে দুজন লোক ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে লিডারের সামনে আনলো। ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে কোথাও একটা কল করল। তিনবার রিং হওয়ার পর ফোন রিসিভ হলো। মুখোশধারী লোকটা ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“বস, কাজ হয়ে গেছে। পাখি এখন আমাদের হাতে।” সুমুর দিকে তাকিয়ে হেসে ফিসফিস করে বলল, বড্ড ছটফট করছে। বলুন তো, মেরে দেই?”

ওপাশ থেকে ঠাণ্ডা আর হুঁশিয়ারি ভরা কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ওর হাজব‍্যান্ড ওকে মারেনি তো কি হয়েছে, আমরা ওকে মারব। তবে, এখন না। ও আমাদের টোপ। বেশি কিছু করার দরকার নেই। চোখের জল যত বের হবে, ততটাই মজা।”
সুমুর চোখ ভরে এলো পানিতে। সে মনে মনে শুধু একটা কথায় বলছে,
“খান সাহেব, আপনি কোথায়? আমাদের বাচ্চাটাকে বাঁচান।”
ফোনের অপর পাশের লোকটা আবারও বলল,
“এখনই না। আগে ওই মেয়ের মুখটা খোল। ওকে দিয়ে প্রাণ ভিক্ষা চাওয়ার। ওর স্বামীকে ডাকার করুণ গলা শুনতে চাই আমি।”
“ওকে, বস!”
সুমুর মুখ খুলে দেওয়া হলো। সে রাগিস্বরে বলল,

“কারা আপনারা? আর আমাকে এভাবে ধরে নিয়ে এসেছেন কেনো?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। শুধু মুখোশধারীরা হেসে উঠল। সুমুর রাগ ক্রমেই বেড়েই চলল। সে চেঁচিয়ে বলল,
“চুপ কেনো সকলে? আর মুখ ডেকে রেখেছেন কেনো? কাপুরুষের দল সব।”
তাদের হাসি আরও জোরালো হলো, যেন সুমুর রাগ তাদের জন্য আনন্দের কারণ। সুমু আবারও বলল,
“আমাকে ছেড়ে দিন। আমার খান সাহেব যদি জানতে পারে, তাহলে মেরে ফেলবে আপনাদের সবাইকে।”
সেই কথা শুনে মুখোশধারীরা হেসে উঠল। তবে সেই হাসিতে মুখে হাসির লুক নেই, বরং বিদ্রূপ। একজন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ওই স্বামী তোর, যে তোকে নিজে ঘর থেকে বের করে দিলো? সেই স্বামীকে নিয়ে এতো বড় কথা বলিস?”
সুমুর চোখ ঝলসে উঠল রাগে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, কিন্তু মন থেকে না। আর আপনারা কীভাবে জানলে এইসব?”
“নজর ছিলো তোদের ওপর। আমরা তো দেখলাম তোকে বের করে দিল।”
“আপনার আমাদের ওপর নজর কেনো রাখছিলেন? আর এইভাবে মুখ ডেকে আছেন কেনো? তাছাড়া ফোনে কে আছে? আপনাদের বস? বাহ, ভালোই! যেমন কাপুরুষ বস, তেমন তার পোষা কুকুরের দল। সাহস থাকলে আমার খান সাহেবের সামনে গিয়ে কথা বল। এইভাবে কাপুরুষের মতো আমাদের ওপর নজর রেখে লুকিয়ে কাজ করিস কেনো?”
ফোনের ওপাশের লোকটি রেগে গিয়ে গর্জন করে বলল,

“যেমন স্বামী, তেমন স্ত্রী। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও ভয় নেই? মুখে বড় কথা আর কলিজায় সাহস ভরপুর? মেরে দে ওকে। এস,কের বউয়ের মৃত্যুর আর্তনাদ আমি শুনতে চাই।”
“এক বাবার সন্তান হলে, গায়ে হাত লাগিয়ে দেখা। তোরা যতই আমাকে ভয় দেখাস, আমি তোদের ভয় পাইনা।”
ফোনের ওপর পাশ থেকে লোকটি বলল,
“আওয়াজ কমিয়ে কথা বলো, সোনা। এখন তুমি মরবে। কিছুদিন পর তোমার স্বামী মরবে।”
“কোন কাপুরুষ মারবে আমার খান সাহেবকে? আপনি? যারা একটা মেয়েকে ধরে আনতে চোরের মতো কতোগুলো কুত্তাকে পেছনে লাগাতে হয়, সে মারবে আমার খান সাহেবকে?”
লোকটি রেগে বলল,
“এখনো ওর মুখ বন্ধ করিসনি তোরা?”
মুখোশধারীর হাতে ছুরি ঝলমল করে উঠল। হঠাৎ সুমুর মনে পড়ল বাচ্চার কথা। তার শরীর কাঁপতে লাগল। বাচ্চার কথা মাথায় আসতেই সুমু ভেঙে পড়ল। চোখে অঝোর ধারায় পানি। গলায় জমে ওঠা কণ্ঠস্বর কাঁদতে কাঁদতেই ছিঁড়ে উঠল তার।

“আমাকে মারবেন না, প্লিজ। আমি…আমি প্রেগনেন্ট। আমার ছোট্ট বাচ্চাটা এখনো এই দুনিয়ার আলোতে আসেনি। তার শরীরের একটা অঙ্গও তৈরি হয়নি। ওর জন্য আমাকে ছেড়ে দিন।”
সে বাঁচার আকুতি জানিয়ে বলল,
“দয়া করুন! আমার বাচ্চার জন্য একটু দয়া করুন। ওর বাবা এখনো ওর কথা জানেন না। আমি বলতে পারিনি। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দিন।”
তার অসুস্থ লাগছে। সবাইকে অনেক অনুরোধ করল সে। কলে থাকা মানুষটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে সুমু জ্ঞান হারাল। মুখোশধারী ছেলেটা ফোনে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“জ্ঞান হারিয়েছে। তাছাড়া মেয়েটা প্রেগনেন্ট, বস। এখন কী করব?”
“তোরা কেউ ওকে মুখ দেখিয়েছিস?”
“না, আমরা মুখ দেখায়নি।”
“মারতে হলে জ্ঞান এনে মারব। মেয়েটাকে নিয়ে আয় আমার পাতালপুরীতে। ওকে এখনো ভালো করে দেখিনি আমি। এতো বড় বড় কথা কোন মুখ দিয়ে বলেছে, সেই মুখটা দেখতে চাই আমি।”
মুখোশধারীরা লোকগুলো সুমুকে গাড়িতে তুলে দিল। সবার মুখে অন্ধকার ভাব। তাদের উদ্দেশ্য একটাই, পাতালপুরীর অজানা অন্ধকারে যাওয়া। গাড়ির ইঞ্জিন গর্জন করে চলতে লাগল। বৃষ্টির মধ্যেই গাড়ি ছুটে চলল পাতালপুরীর উদ্দেশ্যে।

পাতালপুরীর রুমগুলো আজ যেন ঈদের রঙে সেজেছে। কিন্তু সেই রঙের মাঝে লুকিয়ে আছে অন্ধকারের ছায়া। রায়য়ান এক কোণে দাঁড়িয়ে, হাতে হুহস্কির বোতল। সে হঠাৎ উন্মাদের মতো হেসে উঠল। তার চোখে এক অশুভ মজা, যেন এই খুশি তার জন্য শুধু খুশি নয়, বরং এক নতুন ষড়যন্ত্রের সূচনা। তার হাসির প্রতিধ্বনি বাতাসে মিশে গেল, যেন এই পুরোনো শহরের ফাঁকে ফাঁকে বেজে উঠেছে কোনও বিপদের সুর। রায়য়ানের বা’হাতে একটা বোতল আর পেপার। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“ড্রাগের নাম নিউরোরেক্স-নাইন।। একবার পেটে গেলে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে কাজ শুরু হয়। এর ফলে একটা সুস্থ মানুষের হঠাৎ করে কন্ট্রোললেস রাগ চেপে বসে। নিজের প্রিয় মানুষদের প্রতিও ঘৃণা, হিংসাত্মক আচরণ, সন্দেহ, মানসিক বিভ্রান্তি, এবং নিজেকে বিপদে মনে হওয়া, অপর পাশের মানুষটি কথা না শুনলে ক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়া, শরীরের অ্যাড্রেনালিন লেভেল বেড়ে যায়, মানুষটিকে হিংস্র পশুর মতো করে তোলে। নিজেকে হাজার চেষ্টা করলেও কন্ট্রোল করতে পারেনা। নিজের আপন লোকদের তখন শত্রু মনে হয়। রাগ বেশি হলে তাদের খুন করে ফেলতে পারে। আর সবচেয়ে বড় মজা। চব্বিশ ঘণ্টা পরে স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়। সে বুঝতেও পারে না, সে কী করেছে, কাকে মেরেছে। একটা সুস্থ মানুষ হয়ে ওঠে পিশাচ। এমন রাগ, এমন ঘৃণা, যে নিজের প্রেমিকাকে পর্যন্ত খুন করে ফেলতে পারে।” তার ঠোঁটে বিদ্রূপ, “প্রিয়জন? হাস্যকর। ওই ড্রাগ খেলে মানুষ তার মায়ের পেটে ছুরি বসাতেও দ্বিধা করবে না। কেউ প্রশ্ন করলে, গলা চেপে ধরতে সময় নিবেনা।”
রায়য়ানের চুলগুলো এলোমেলো। চোখে ঘুম নেই, তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট, ঠোঁটে বাঁকা এক হাসি, হাতে এক টুকরো একটা ভাঙা গ্লাস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খেলছে সে। হঠাৎ হেসে আবারও বলল,

“ভেবেছিলাম বউটাকে নিজ হাতে খুন করবি। একবার ড্রাগটা তোর ভেতরে ঢুকলেই তুই হিংস্র জানোয়ার হয়ে যাবি। ওকে গলা টিপে শেষ করে দিবি। তোর বউয়ের চিৎকার শুনে আমি পাতালপুরী থেকে তোকে স্যালুট দিব। কিন্তু শালা, তাও পারলি না। ড্রাগ খাইয়ে দিলাম তোকে। ভেবেছিলাম আজই খেলা শেষ। কিন্তু ব্যর্থ আমি। তোর মতো হিংসাত্মক জানোয়ারের এই ড্রাগ হালকা খেলে ভয়ংকর হয়ে ওঠার কথা। তুই ভয়ংকর হয়েছিস ঠিকই। কিন্তু, তোর প্রেম… তোর প্রেম, তোর ভালোবাসা হয়তো তোর বউকে মারতে দেয়নি।”
সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুই মারিসনি ঠিকই, কিন্তু আরেকটা কাজ তো করে ফেলছিস। বউকে তুই নিজ হাতে তাড়িয়ে দিয়েছিস। তার ভরসার জায়গাটায় তো তুই নিজেই ছুরি চালিয়ে দিয়েছিস। অবিশ্বাস, এই শব্দটাই ছিল আমার অস্ত্র। তোর মস্তিষ্কে আমি শুধু একটু বিষ ঢুকিয়েছিলাম। বাকিটা তুই করেছিস নিজের হাতে। তোর অহংকার, তোর ইগো, তোর হিংসা এগুলোই আমার পা ছুঁয়ে সালাম দিচ্ছে আজ।”

খান সাহেব পর্ব ৪৬

রায়য়ান একটা গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলল দূরে। গ্লাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“তোর বউ আজ থেকে আমার বন্দি। তোদের প্রেমের গল্পের বইটা আমি পুড়িয়ে ছাই করব। তারপর, সেই ছাই দিয়ে লিখব তোদের শেষ অধ্যায়।”

খান সাহেব পর্ব ৪৭