Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৪৮

খান সাহেব পর্ব ৪৮

খান সাহেব পর্ব ৪৮
সুমাইয়া জাহান

রাত নেমে এসেছে শহরের ওপর, যেন অন্ধকারের এক রাজত্ব বিস্তার করেছে চারপাশে। আকাশে চাঁদ নেই। শুধু মেঘে ঢাকা এক নিঃস্তব্ধ শূন্যতা, যেন কিছুক্ষণ পরেই কেঁদে উঠবে আকাশ। রাস্তার বাতিগুলো দূরে দূরে টিমটিম করে জ্বলছে। তাদের আলো গিলে নিচ্ছে চারপাশের ছায়া। শুনশান রাস্তা কেঁপে উঠল দশটা রোলস-রয়েসের ছুটে চলার শব্দে। কালো গাড়িগুলোর কাচ ও কালো। ইঞ্জিনের গর্জন যেন রাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে দিচ্ছে। তারা ছুটে যাচ্ছে কোনো এক অজানা গন্তব্যে। জানালার পাশে বসে থাকা মানুষটার চোখে ভয় আর রাগের ছায়া। গাড়িগুলোর হেডলাইটে রাস্তার ছায়াগুলো আরও দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। এইটা কি শুধুই একটা নিস্তব্ধ রাত? না! এই রাত শুধু নিস্তব্ধ রাত নয়, এই রাত সাক্ষী হবে কারো জয়ের, কারো পরাজয়ের। আজ কারো ভালোবাসা পাবে নিজের আলো, আর কারো হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে জেগে থাকবে অন্ধকারের ছায়া।

নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে এক বিলাসবহুল প্রাইভেট জেট। নদীর বুক চিরে হেলিপ্যাডের মতো করে বানানো এক অস্থায়ী রানওয়ের পাশে। প্রাইভেট জেটের গায়ে কোনো চিহ্ন নেই, নেই কোনো দেশের পতাকা। জেটের ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে মুখোশধারী একদল মানুষ। সবাই একরঙা কালো পোশাকে, মুখে ধাতব মুখোশ, যার ফাঁকা দিয়ে শুধু চোখ জ্বলছে। তাদের চোখে অদ্ভুত এক সতর্কতা, যেন অপেক্ষা করছে কোনো সংকেতের জন্য। জেটের পাশে দাঁড়িয়ে এক ছেলে কানে ওয়্যারপডস লাগিয়ে গলা নিচু করে তীব্র ভাষায় কথা বলছে। হঠাৎ করেই রাতের নিস্তব্ধতায় চেঁচিয়ে উঠল বিলাসবহুল গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ। জেটের সামনে এসে থেমে গেল একটি চকচকে সাদা গাড়ি। গাড়ির দরজা খুলতেই বেরিয়ে এলো রায়য়ান। চোখ-মুখের ভাবনা গভীর, যেন সে জীবনের হাজারো রহস্য নিজের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে। তার নকশাকাটা লম্বা কোটের নিচ থেকে ঝলমল করছে একটা দামী রিং।
রায়য়ান নামতেই, সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে এগিয়ে এলো সেই ছেলেটি, যার কানে ওয়ারপড লাগানো ছিল, এবং সে মনোযোগ দিয়ে তার এই বসের কথাগুলো শুনছিল এতক্ষণ। রায়য়ান তাকে দেখে গম্ভীর গলায় বলল,

“সাবধানে নামাবি। আর সামান্যতম টাচ করবি না ওর শরীরে।”
শব্দগুলো গর্জনের মতো, কিন্তু গভীর সম্মানের আভা মেখে কথাটা বলল সে। ছেলেটি তার বসের কথামতো মাথা নাড়াল। বসের আদেশ পেয়ে তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করল। তার সঙ্গে আরও দুজন লোক বেরিয়ে এলো। সবাই মুখোশধারী। তারা দ্রুত একসাথে অচেতন সুমুকে স্ট্রাকচারে করে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামাল। তাদের হাতে সুমু যেন এক নিঃশব্দ পাখি। যার শরীর ঝিমধরা ও অসহায়। গাড়ি থেকে নামিয়ে, তারা ধীরে ধীরে জেটের সামনে নিয়ে গেল সুমুকে।
সুমুকে রেখে ছেলেটি আবারও তার বসের সামনে এলো। চোখের ইশারায় হাসল রায়য়ান। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। সুমুর মাথাটা কাত হয়ে পড়ে আছে। মুখের ওপর চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। রায়য়ান হাঁটুমুড়ে বসল সুমুর পাশে। ফুঁ দিয়ে সুমুর অচেতন মুখ থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিল। কিছুক্ষণ স্থির চোখে সুমুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“ওরা এখনো এসে পৌঁছায়নি। যা করার, এখনই করতে হবে। আমার প্ল্যান তো তোমরা সবাই জানো।”
হঠাৎ করেই একটু দূর থেকে গাড়ির শব্দ ভেসে এলো। রায়য়ান বাঁকা হেসে নিজের গাড়ি নিয়ে স্পট ছেড়ে অন‍্য রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রায়য়ানের টিমের পাঁচজন বাদে বাকি সকলে গাড়ি নিয়ে চলে গেল রায়য়ানের পিছু পিছু।
আকাশটা যেন হঠাৎই ফেটে পড়ল বাজের গর্জনে। শেরাজদের গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে পুরো নদীর পাড় যেন দুলে উঠল। একে একে থামল কালো রঙের সব রোলস-রয়েস। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো শেরাজ খান। তার চোখে আগুন, রাগে ভ্রু কুঁচকে আছে, চোয়ালে স্পষ্ট টান টান রাগ। শেরাজ গাড়ি থেকে নামতেই আইয়ুবরা সকলে গাড়ি থেকে নেমে এসে শেরাজের পাশে দাঁড়াল। শেরাজ হেঁটে গেল সামনে মুখোশধারীদের দিকে। তার পায়ের শব্দ যেন ঠকঠক করে প্রতিধ্বনি তুলছে নদীর পাড়ে। একটা নিঃশব্দ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। রায়য়ানের লোকদের একজন ফিসফিস করে বলল,

“কাজ শুধু করা যাক।”
শেরাজকে এগিয়ে আসতে দেখে রায়য়ানের লোকেরা সুমুকে জেটে তুলতে গেল। ঠিক সেই মুহুর্তে একটা গুলি তীব্র গতিতে ছুটে এসে লাগল রায়য়ানের একটা লোকের হাতে। রায়য়ানের টিমের বাকি চারজন আহত লোকটিকে নিয়ে জেটে উঠে পড়ল।
শেরাজ এসে থামল ঠিক জেটের সামনে, যেখানে সুমুকে রাখা ছিল স্ট্রাকচারে। সুমুর মুখটা দেখে মুহূর্তেই শেরাজের চোখ নরম হয়ে এলো। সে হাঁটুমুড়ে বসল সুমুর পাশে। দু’হাত দিয়ে সুমুর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“সুইটহার্ট, আমি এসেছি!”
সে আলতো করে সুমুর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। পেছন থেকে আইয়ুব বলল,
“এস.কে, ওরা আবারও মুভ করছে।”
শেরাজ ধীরে উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“জেট ঘিরে ফেল।”

আকাশ কেঁপে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। শেরাজের কথা শুনতেই জেটে নিয়ে পালিয়ে গেল রায়য়ানের পাঁচজন মুখোশধারী। জেটের গর্জন মিলিয়ে গেল আকাশের গর্জনের সঙ্গে। শেরাজ সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে, বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে অচেতন সুমুকে। বৃষ্টির ভারী ফোঁটাগুলো তাদের পুরোপুরি ভিজিয়ে দিচ্ছে। সুমুর ভেজা চুল তার গালের পাশে লেপ্টে আছে। সুমুকে বুকের মধ্যে পেয়ে শেরাজের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা দাবানল কিছুটা ঠান্ডা হলো। ঠিক সেই সময় কাচভাঙা শব্দ করে আরও চারটি গাড়ি এসে থামল স্পটের ধারে। সাদা আলো ছিটকে পড়ল অন্ধকারের ওপর। গাড়ির দরজা খুলে নামল আরিয়ান চৌধুরী। পেছনে তার বডিগার্ডরা, আর রায়য়ানের বিশেষ টিমের কয়েকজন লোক।
শেরাজ একবার তাকাল আরিয়ানের দিকে। তার চোখে শীতলতা আর ঠোঁটের কোণে টেনে নেওয়া এক বাঁকা ধ্বংসাত্মক হাসি। সে মুখে কিছু বলল না, তবে তার চোখ স্পষ্ট আরিয়ানকে বলছিল,

“তুই হেরেছিস, আরিয়ান। শুধু এই রাতেই না, সুমুর কাছেও তুই আজ হারলি। আমার সামনে তোর অস্তিত্ব অর্থহীন।”
আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইল। চোয়াল শক্ত করে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাখল রাগে, অপমানে, আর নিজেকে ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টায়। সে আসার ঠিক মিনিট খানেক পরেই, গর্জন তুলে আরও কয়েকটি কালো গাড়ি এসে থামল স্পটে। বৃষ্টির ফলে মাটির ভেজা গন্ধ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল ভয় আর আধিপত্যের ঘ্রাণ। সবার দৃষ্টি এবার ফিরল নতুন আগন্তুকের দিকে। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নামল রায়য়ান চৌধুরী। হাতে ওয়াইনের বোতল। সে এক মুহূর্ত থেমে দাঁড়াল। বৃষ্টির ফোঁটা টুপটুপ করে পড়ছে তার সিল্ক ব্লেজারের ওপর। ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই। চোখে শুধু হিমশীতল দৃষ্টি।
একজন বডিগার্ড তৎপর হয়ে ছুটে এসে রায়য়ানের মাথার ওপর ছাতা ধরতে গেল, কিন্তু রায়য়ান হঠাৎ চোখ রাঙিয়ে তাকাল তার দিকে। চোখের সেই হুঁশিয়ারি এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে, লোকটি এক পা পিছিয়ে গেল। ছাতা নিচে নামিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল সে। রায়য়ান তাকিয়ে রইল সুমুকে জড়িয়ে রাখা শেরাজের দিকে। ধীরে ধীরে রায়ানের ঠোঁটে এক ম্লান, তুচ্ছ হাসি ফুটে উঠল। সে হাঁটা ধরল শেরাজের দিকে, কিন্তু কি জানি মনে করে আবারও দাঁড়িয়ে পড়ল।
আরিয়ান, রেগে রায়য়ানের উদ্দেশ্যে বলল,

“তুই যদি আর কিছুক্ষণ আগে সুমু কোথায় আছে সেই খবরটা পেতিস, তাহলে আজ এস.কের জায়গায় আমি থাকতাম।”
রায়য়ানে কর্ণ পযর্ন্ত হয়তো পৌছাল না আরিয়ানের কথা। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সুমুদের দিকে। পুরো স্পট কাঁপছে গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জনে। বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ছে সকলর ওপর। শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে সবার মাঝখানে। বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে সুমুকে। সে এখন শুধু একজন প্রেমিক নয়, একজন রক্ষক। চারপাশে ঘিরে আছে রায়য়ান, আরিয়ান আর শেরাজের লোকজন। রায়য়ানকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরিয়ান গর্জন করে শেরাজের উদ্দেশ্যে বলল,

“মানছি সুমু তোর বিয়ে করা বউ, তাই বলে ওভাবে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে? তুই ওকে টাচ করেছিস বলে, আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে। ছেড়ে দে সুমুকে।”
সেই মুহূর্তে শেরাজের চোখদুটো জ্বলে উঠল, যেন বৃষ্টির মধ্যেও দাবানলের ঝলক। তার কপালের রগগুলো টনটন করে উঠল। সে সুমুকে বুকের সঙ্গে আগের থেকেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাগি কন্ঠে বলল,
“তোর বুক পুড়ুক, সেটা আমার সমস্যা না। এই মেয়ে আমার স্ত্রী, আমার সম্মান, আমার জীবন। তোকে সেদিন প্রাণ ভিক্ষা দিয়েছিলাম বলে, বার বার দিব, এমনটা ভুলেও ভাবিস না।”
রায়য়ান নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে। কে জানে, তার মনের গভীরে এখন কোন ঝড় চলছে। চোখে একধরনের নিস্তব্ধ আগুন তার। আরিয়ান আবারও বলল,

“ওইটাই তোর ভুল ছিল। তোর চোখের সামনে থেকে সুমুকে কেড়ে নিব, দেখিস।”
আরিয়ানের কথা শোনামাত্রই শেরাজ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে এক কাণ্ড করে বসল। সকলের সামনে, স্পটলাইটের নিচে, অচেতন সুমুর অধরে অধর মিশিয়ে দিল সে। নিজের চোখ বন্ধ করে, সকলের বুকের ভেতর একটা কথা জ্বালিয়ে দিল সে, এটা যেন ভালোবাসার নয়, এটা তার দাবির ছোঁয়া।
চারপাশ স্তব্ধ। সবার চোখ স্থির হয়ে গেছে এই দৃশ্যটায়। রায়য়ান, আরিয়ান, এমনকি শেরাজের লোকেরাও মাথা নিচু করে ফেলল। কেউ মুখ তুলে তাকাল না, কেউ কিছু বলল না। সবাই যেন একেকটা রোবট, দৃষ্টি নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যন্ত্রমানব। আইয়ুব, ফাহিম, রিয়াদরা সবাই হা করে তাকিয়ে রইল। তাদের চোখে বিস্ময়ের ঝড়। রাহিন ঠোঁট দিয়ে বাঁশির সুরে তুলতে তুলতে একটু দূরে সরে গেল। আরিয়ান রাগে দাঁতে দাঁত চেপে ফুঁসতে লাগল। তার চোখ টকটকে লাল হয়ে উঠল। রায়য়ান নিজের হাতে ধরা ওয়াইনের কাচের বোতলটা শক্ত করে চেপে ধরল। মুঠোর ভেতরে ক্রমশ কাচ ফেটে উঠল। একটা জোরালো শব্দে বোতলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বৃষ্টির শব্দের ফলে কেউ শুনতে পেল না সেই শব্দ। তার আঙুলে কাচ ঢুকে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু সে নড়ল না। এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল, যেন সে এখন একটা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
শেরাজ মিনিট খানেক পর সুমুর ওষ্ঠের ওপর থেকে নিজের ওষ্ঠ সরিয়ে বলল,

“এই মেয়েটা আমার বউ। শুধু কাগজে-কলমে নয়, রক্তে, আত্মায়, ভালোবাসায়। এই মেয়টার নামের শেষে আমার পদবি, এই মেয়ের শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে আমার গভীর ছোঁয়া। যে চোখ ওর দিকে উঠবে, সে চোখ খুলে আমি মারবেল খেলব।”
সে অচেতন সুমুকে দুই হাতে কোলে তুলে নিল। চলে যাবার আগে আবারও বলল,
“বউ আমার পবিত্র। তাই ওকে সাথে নিয়ে কোনো রক্তের খেলা খেলতে চাইনা আমি। তবে তোদের সাথে আমার অন‍্য কোথাও অন‍্যরূপে দেখা হবে।”

কথাগুলো বলে ধীরে ধীরে দৃঢ় পায়ে বুক সোজা করে হাঁটতে লাগল গাড়ির দিকে। চারপাশের কেউ কথা বলছে না। কেউ সাহসও করছে না কিছু বলতে। শুধু গাড়ির হেডলাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছে একটা পুরুষ কীভাবে তার ভালোবাসাকে গোটা দুনিয়ার সামনে দাবি করে নিয়ে যাচ্ছে। আইয়ুব, রাহিন, ফাহিমরা সবাই ছুটে গিয়ে উঠল অন্য গাড়িতে। বৃষ্টিতে ভেজা, টানটান উত্তেজনায় জমে থাকা সেই স্পট যেন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
শেরাজ সুমুকে বুকের মাঝে আগলে ধরে নিজের গাড়ির পেছনের সিটে বসল। সারবাজ দ্রুত ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল। গাড়ির হেডলাইট বৃষ্টির ফোঁটার ভিতর দিয়ে পথ কেটে এগিয়ে গেল সামনে। এক এক করে শেরাজের সবগুলো গাড়ি স্পট ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
পেছনে রয়ে গেল দুই পুরুষ। একজন দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে, আরেকজন রক্তাক্ত হাতে নীরবে দাঁড়িয়ে। তাদের চোখে একটাই প্রশ্ন, “আজ হেরে গেলাম? নাকি, আজ যুদ্ধটা শুরু হলো?”

বৃষ্টি ভেজা রাত। চারদিকে অন্ধকার আর আলো মিশে তৈরি করেছে এক রহস্যময় সময়। শেরাজ সুমুকে বুকে জড়িয়ে রোলস-রয়েসে উঠেছে। গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর শেরাজ শীতল কণ্ঠে বলল,
“গাড়ি থামা, সারবাজ।”
সারবাজ চোখ বুলিয়ে নিল রিয়ার ভিউ মিররে। শেরাজের চোখে ঝড়। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ব্রেক কষল সে। গাড়ি থামতেই শেরাজ বলল,
“গাড়ির সেন্টার কনসোলের ড্রয়ারে আমার চেঞ্জ আছে, বের কর।”
সারবাজ হাত বাড়িয়ে খুলে ফেলল রোলস রয়েসের লুকোনো চেম্বার। সেখানে নিখুঁতভাবে গুটিয়ে রাখা আছে একটা কালো শার্ট, ব্ল্যাক ট্রাউজার, একটা ঘড়ি আর পকেট পারফিউম। জিনিসগুলো শেরাজের হাতে দিয়ে আর কোনো কথা ছাড়াই সারবাজ গাড়ি থেকে নেমে গেল।

শেরাজ চারদিক দেখল একবার। সে একে একে রোলস-রয়েসের সব জানালা, দরজা লক করে দিল। তারপর ধীরে লাইট অন করল। ভেতরের সাদা আলোর নিচে সুমুর মুখ যেন আরও ফ্যাকাসে লাগছিল। শেরাজ এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তার ভালোবাসার নারীর দিকে। সুমুর ভেজা কপাল, কাঁপা ঠোঁট, অবচেতন চোখ শেরাজকে পাগল করে দিচ্ছিল। কিছু না বলেই সে ঝুঁকে একটা নীরব ঠোঁটের ছোঁয়া রাখল সুমুর কপালে। নিজের সামনে রাখা কাপড়ের ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে একটা ঢিলেঢালা শার্ট আর কালো ট্রাউজার বের করল। এগুলো শেরাজের নিজের। বরাবরই তার গাড়িতে নিজের জন‍্য চেঞ্জ থাকে, যেগুলো আজ সুমুর জন্য ছিল।

সে সুমুর ভেজা কাপড়গুলো খুলল। তোয়ালে দিয়ে গা শুকিয়ে, পরিয়ে দিল বড় মাপের সেই শার্ট। সুমুকে চেঞ্জ করিয়ে দিয়ে সুমুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। নিজের শরীরের ভেজা শার্টটা খুলে ফেলল। শার্টটা সাইডে রেখে ধীরে সুমুর দিকে তাকাল। শেরাজের বুকে তখনও ভেজা শার্টের ছাপ। সেই ভেজা শরীরেই সে সুমুর ঠাণ্ডা হাতদুটো নিজের উষ্ণ হাতে তুলে নিল। ধীরে ধীরে সে নিজের উন্মুক্ত বুকের সঙ্গে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। সুমুর মাথাটা শেরাজের কলারের হাড়ে গিয়ে ঠেকল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
“এভাবেই রাখব তোমাকে সারাজীবন।”

খান সাহেব পর্ব ৪৭ (২)

গাড়ির লাইট অফ করে দিল সে। গাড়ির কাচ নামিয়ে জোর গলায় ডাক দিল সারবাজকে। সারবাজ উঠে এলো গাড়িতে। শেরাজ গম্ভীর মুখে বলল,
“গাড়ি স্টার্ট দে!”
সারবাজ চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি চালু করল। ইঞ্জিন গর্জন করে ছুটল খান ম‍্যানশনের উদ্দেশ্যে।

খান সাহেব পর্ব ৪৯