Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫৩

খান সাহেব পর্ব ৫৩

খান সাহেব পর্ব ৫৩
সুমাইয়া জাহান

আজ সুমুর অপারেশন। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ নিয়ে চৌধুরী আর খান বাড়ির সকলে হাসপাতালে এসে পৌঁছেছে। হাসপাতালের নিরিবিলি করিডরে যেন নিঃশব্দ একটা যুদ্ধ চলছে সবার ভেতরে। সফেদ ওয়ার্ডের দরজার ওপাশে বিছানায় শুয়ে আছে সুমু। শেরাজ তার ডান হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে, যেন ছাড়লেই সে হারিয়ে যাবে। শেরাজের মুখটা ভয় আর অস্থিরতায় থমথমে হয়ে আছে।
সারবাজ, আরবাজ, শাহরুখ, আইয়ুব, রিয়াজ, রাহিনরা সকলে কেবিনের বাহিরে দাঁড়ানো। এরই মাঝে আরিয়ান আর রোজা এলো। দুজনেই এগিয়ে এসে কেবিনে ঢুকতে যাবার সময় স‍্যান্ডি হাত তুলে তাদের আটকে দিয়ে নির্বিকার কণ্ঠে বলল,

“আপনারা এখন ভেতরে যেতে পারবেন না।”
রোজার চোখে রাগ আর অপমানের ঝিলিক ফুটে উঠল। আরিয়ান থমকে গিয়ে একটু বিস্মিত ভঙ্গিতে তাকাল স‍্যান্ডির দিকে। ঠিক তখনই পেছন থেকে ধীরকণ্ঠে শোনা গেল ম‍ৌ সেনের গলা,
“অনন‍্যা, আমার সন্তানেরা কী এমন করেছে, যে এমন একটা দিনে, এমন একটা মুহূর্তেও ওদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে?”
সকলে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। করিডর জুড়ে এক ধরণের নিঃশব্দ অস্বস্তি বয়ে গেল। অনন‍্যা খাতুন ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। চোখেমুখে স্পষ্ট এক দ্বিধার ছাপ। তিনি ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললেন,
“স‍্যান্ডি, ওদের যেতে দাও। এখন সময় নয় ঝগড়ার, ওরা যাক।”
“কিন্তু আন্টি, স‍্যার…”
“শেরাজ কিছু বললে আমি বুঝে নিব। ওদের যেতে দাও।”

স‍্যান্ডি একবার অনন‍্যা খাতুনের দিকে তাকিয়ে সম্মানসূচকভাবে মাথা নুইয়ে সরে দাঁড়াল। রোজা আর আরিয়ান বিনা শব্দে ঢুকে পড়ল কেবিনে। ওদের পায়ের আওয়াজ যেন শেরাজের কানে গিয়েই শরীরটাকে আরেকটু সজাগ করে তুলল। সুমুর হাতটা সে আরও শক্ত করে ধরে রাখল। আরিয়ান চুপচাপ দাঁড়িয়ে দূর থেকে তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। রোজা একটু এগিয়ে শেরাজের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“তুমি ভয় পেয়ো না সুমু, তুমি ঠিক হয়ে যাবে। আমরা সবাই আছি।”
রোজার কথায় সুমু এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে গেল। রোজার কণ্ঠে সহানুভূতির ছোঁয়া থাকলেও, সুমুর মন বুঝতে পারল রোজা শুধু তার খান সাহেবকে দেখিয়ে এসব বলছে। রোজা কথার ফাঁকে হাত আস্তে করে শেরাজের কাঁধে রাখার চেষ্টা করা মাত্রই, শেরাজ যেন অদৃশ্য কোনো ইলেকট্রিক শকের মতো সরে গেল পাশের দিকে। সুমু ভ্রু কুঁচকে তাকাল রোজার দিকে। রোজা বিব্রত হয়ে হাত সরিয়ে নিল। শেরাজ এবার একবার তাকিয়ে দেখল আরিয়ানের দিকে। আরিয়ান তখনো পলকহীন চোখে শুধু তাকিয়ে আছে সুমুর দিকে, যেন চারপাশের কিছুই সে শুনছে না, দেখছে না। সে শুধু সুমুকে দেখছে।
শেরাজ ঠোঁটে অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণ হাসি টেনে বেডের একপাশে বসল। সে দু’হাত দুদিকে মেলে দিয়ে স্বর নরম করে বলল,

“বেবি, র‍্যাপ মে ইন ইয়োর আর্মস ডীপ অ্যান্ড স্ট্রং, লাইক ইউ উইল নেভার লেট গো।”
সুমু বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। শেরাজ সুমুর দিকে তাকাল। মুখ কিছুটা কঠিন করে বলল,
“কুইক!”
সুমু এবার ধীরে এগিয়ে গিয়ে শেরাজের গা ঘেঁষে বসল। তার এক হাত শেরাজের বুকের ওপর রাখতেই, শেরাজ আরেক হাত দিয়ে সুমুকে শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিল। রোজা থমকে গেল, আরিয়ান দৃষ্টি সরিয়ে নিল। সুমুর গাল লাল হয়ে উঠল লজ্জায়। কিন্তু শেরাজের চোখে চোখ রাখতেই সে বুঝল, সুমুরাজ শুধু একে অপরের, আর খান সাহেব এটা সবাইকে বুঝিয়ে দিচ্ছে সবাইকে।
শেরাজ কড়া কন্ঠে বলল,

“শশুরের মেয়ে, শক্ত করে ধর!”
সুমুর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শেরাজ ঠোঁটে এক বাঁকা হাসি টেনে ধীর স্বরে বলল,
“আরে দুই নষ্ট, অন‍্যের বউ আর হাজব‍্যান্ডের দিকে নজর না দিয়ে নিজের মতো ক‍্যারেক্টারের ছেলেমেয়ে খুঁজে বিয়ে করে ফেল। তোদের মতো মানুষদের সঙ্গে তো পর্ণ স্টারদের ভালো মানাবে”, সে সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার বউ একটাই। আর ওর দিকে কেউ তাকালে চোখ উপড়ে ফেলব, স্পষ্ট করে দিলাম। একদিন ছেড়েছি বলে বারবার ছেড়ে দিব, এমনটা ভুলেও ভাবিস না।”
আরিয়ান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। রোজা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ রোজার দিকে তাকিয়ে একদম শান্ত গলায় বলল,
“তুই কতো বড় নির্লজ্জ, রোজা। এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমাদের চুমু, আলিঙ্গন নাকি আরও ডীপ কিছু দেখার আশায়?”
রোজার মুখ থমকে গেল। সে আর না দাঁড়িয়ে বাহিরে চলে গেল। কেবিনে ঢুকে এলো একজন নার্স। সে হালকা হেসে বলল,

“ম‍্যাম, রেডি আপনি? সময় হয়ে গেছে।”
সুমু কিছু বলার আগেই শেরাজ গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“রেডি হতে হবে না। আমি আমার বউয়ের সাথে অপারেশন থিয়েটারে থাকব।”
নার্স কিছুটা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আপনি কি বলছেন, স‍্যার? অপারেশন থিয়েটারে থাকবেন মানে? এটা তো সম্ভব না।”
শেরাজ তার দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“সম্ভব করুন! আমার বউ ভয় পাচ্ছে। আমি থাকলে সাহস পাবে।”
নার্স তার জায়গায় দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“বাট স‍্যার, এটা রুল ভায়োলেশন। আমি ডাক্তারকে ডেকে আনছি।”
সে দ্রুত বেরিয়ে গেল। কেবিনে এক মুহূর্তের নীরবতা। শেরাজ সুমুর পাশে বসে তার ঠাণ্ডা হাত দুটো নিজের হাতে নিল। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আপনি আবার কি পাগলামি শুরু করলেন?”
শেরাজ হালকা হাসল। সুমুর কপালে একটা চুমু এঁকে দিয়ে বলল,
“যে পুরুষের এমন কাড়াক টাইপ বউ আছে, সে পুরুষ পাগলামি না করে কীভাবে পারে? আমার বউয়ের অপারেশন আর আমি থাকব না?”
তাদের কথার মাঝেই ডাক্তার ভেতরে এলেন নার্সের সঙ্গে। একটু রাগী ভঙ্গিতে বললেন,
“মি. খান, আমরা বুঝি আপনার অবস্থা। কিন্তু অপারেশন থিয়েটারে রোগীর সাথে ফ‍্যামিলির কেউ ঢুকতে পারেন না, এটা মেডিকেল রুলস।”
শেরাজ ঠাণ্ডা গলায় বলল,

“রুলস ভাঙার দরকার নেই। শুধু বলুন, গ্লাভস পরে মাস্ক পরে বউয়ের পাশে বসে থাকলে সমস্যা কোথায়? আমি চুপ থাকব। আমার বউ, আমার স্পর্শ না পেলে নার্ভাস হয়ে যাবে।”
ডাক্তার এবার একটু নরম হয়ে গেলেন। তিনি দ্বিধা নিয়ে বললেন,
“খুব কম কেসে আমরা এটা এক্সেপ্ট করি। এটা যেহেতু জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়াতে মেজর সার্জারি, তাই এক্সট্রা পার্সন এলাউ করাটা রুলস অনুযায়ী রিস্কি।”
শেরাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ডক্টর, আমার স্ত্রীর ভয় ভাঙানো আমার দায়িত্ব। ওর উপর একফোঁটা চাপও দেব না, শুধু পাশে থাকব ওর সাহস হিসেবে। আপনি চাইলে আপনার দায়মুক্তির পেপার আমি সাইন করে দেই?”
“আপনি অপারেশন থিয়েটারে থাকলে, আপনার শরীর থেকে পেশেন্টের ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমরা রিস্ক নিতে পারব না।”
শেরাজ মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ যেন পাথর হয়ে গেল। সে ধীরে বলে উঠল,

“কি বললেন, ডক্টর? আমার বউয়ের আমার থেকে ইনফেকশন হবে?”
“দেখুন মি. খান…”
“যার নিঃশ্বাসের শব্দ না শুনলে রাতে আমার ঘুম হয় না। যে মেয়েটা আমার বুকের ভেতর একটা আলাদা হৃদয়ের মতো ধকধক করে। তার আমার কাছ থেকে ইনফেকশন হবে? আরে ডক্টর আমি নিজেই তো একটা ইনফেকশন। এখানে যদি বিষও থাকে, সেটা ওর জন্য অমৃত। আমার অস্তিত্ব ওর রোগ নয় ডক্টর, আমার অস্তিত্বই ওর ওষুধ।”
বাহির থেকে সকলে কেবিনে এলো। অনন‍্যা খাতুন এসে বললেন,
“কি হয়েছে এখানে?”
ডাক্তার হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,
“মি. খান, পেশেন্টের সাথে অপারেশন থিয়েটার যেতে চাইছে।”
অনন‍্যা খাতুন আর কোনো কথা না বলে একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। স‍্যান্ডি আস্তে ধীরে শেরাজের কাছে গিয়ে বলল,
“স‍্যার, আপনি কি ডাক্তারি শিখতে চান?”
শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই স‍্যান্ডি মুখে আঙুল দিয়ে সাইডে সরে গেল। সুমু ধীরে ধীরে উঠে বসে বলল,
“খান সাহেব, আমি ভয় পাচ্ছি না তো। আমি তো স্ট্রং গার্ল।”

“তুমি চুপ থাকো, পিচ্চি বউ। কথা বলবা না একদম। এই ডক্টররা তোমাকে ব্যথা দেবে। ছুরি চালাবে তোমার নরম পেটের উপর। আর আমি যদি না থাকি পাশে, ওরা তোমার পেট বেশি কেটে ফেলবে। তারপর কিডনি, লিভার যদি বের করে নিয়ে যায়। না, না বউয়ের বেলার নিজেকে ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করিনা।”
ডাক্তার বিস্মিত হয়ে নার্সের দিকে তাকালেন। নার্স কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“স্যার, ম‍্যাম হয়তো সিকোলজিকালি স্টেবল থাকবেন, যদি উনি পাশে থাকেন। আমাদের হাতে সময়ও কম।”
ডাক্তার এক গহীন নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন,
“ঠিক আছে, অনুমতি দিলাম।”
সকলে একে একে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে। শেরাজ সুমুর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। ডক্টররা সকলে থতমত খেয়ে বেরিয়ে গেল কেবনি থেকে।

সুমুকে স্ট্রেচারে শুইয়ে ধীরে ধীরে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নেয়া হচ্ছে। শেরাজ সুমুর হাত শক্ত করে ধরে পাশে পাশে হাঁটছে গ্লাভস আর মাস্ক পরে। সুমু একটু ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“খান সাহেব!”
শেরাজ সাথে সাথেই নিচু হয়ে সুমুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
“বলো, সুইটহার্ট!”
“এই অপারেশনটা যদি…”
শেরাজ তার হাত চেপে ধরে বলল,
“তুমি চোখ বন্ধ করো, আমি এখানে আছি। তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে আমি আছি। সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই হবে।”
অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার মুখে এসে ডাক্তার বললেন,
“মি. খান, আপনাকে এক কোণে বসতে হবে। আপনি চুপ থাকবেন, শুধু রোগীর পাশে থাকবেন, এই শর্তে অনুমতি দিয়েছি।”
শেরাজ মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালো। অপারেশন টেবিলের পাশে বসে শেরাজ সুমুর ঠাণ্ডা হাত ধরে রাখল।
অপারেশনের প্রস্তুতি চলছে, চারপাশে মৃদু আলো আর যন্ত্রপাতির শব্দ। সুমুর চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, শেরাজ সেই অশ্রু গ্লাভস পরা আঙুলে মুছে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“এই চোখে কখনও কান্না মানায় না, সুইটহার্ট।”
ডাক্তার অ্যানেস্থেসিয়া ইনজেকশন প্রস্তুত করলেন। পাশ থেকে নার্স বলল,
“ম‍্যাম! একটু লাগবে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বেন।”
শেরাজ সুমুর কপালের উপর ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,
“ঘুমাও, আমার হৃদয়। আমি এখানেই আছি। তুমি উঠে আমাকেই দেখতে পাবে সবার আগে, এই চুক্তি রইল।”
সুমু চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। অবশেষে সে অ্যানেস্থেসিয়াতে ঘুমিয়ে পড়ল। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু যন্ত্রপাতির টুকটাক শব্দ। শেরাজ বসে রইল চুপচাপ। একটানা তাকিয়ে রইল তার বউয়ের দিকে, যেন তার চোখের দৃষ্টি দিয়েই পাহারা দিচ্ছে তার ভালোবাসাকে। অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে সময় যেন থমকে গেছে। ডাক্তাররা প্রস্তুত অপারেশনের জন‍্য। সুমু গভীর ঘুমে। শেরাজ পাশে বসে তার হাত ধরে রেখেছে। ডাক্তার কাচ দিয়ে পেটের জায়গাটা পরিষ্কার করে নিলেন। তারপর হালকা টোনে বললেন,

“স্কালপেল!”
একজন নার্স অস্ত্রটি এগিয়ে দিল। ডাক্তার ধীরে ধীরে ছুরি চালাতে গেলেন, ঠিক তখনই শেরাজ তাকাল ডাক্তারের হাতের দিকে। ভয় পেয়ে বলল,
“এই ডাক্তার, আস্তে।”
ঘরটা যেন থমকে গেল। ডাক্তার রীতিমতো চমকে উঠলেন। এক সেকেন্ডের নীরবতা। ডাক্তার ধীরে বললেন,
“আমি বুঝতে পারলাম না, মি. খান?”
শেরাজ চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আস্তে করুন!”
ডাক্তার হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে কাজে মন দিল। শেরাজ সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“আমি শেরাজ খান, যে মানুষ কেটেছি, ছিন্নভিন্ন করেছি শরীর, গুলি চালিয়েছি। আমি সেই পুরুষ, যার চোখের দিকে তাকাতে ভয় পায় দুর্ধর্ষ খুনিরা। আমার হাতে রক্ত লেগে আছে, অথচ এই হাত কখনও কাঁপেনি। অস্ত্র আমার খেলনা আর রক্ত আমার নেশা। ভয়? সে তো আমার সামনে হাঁটতেও সাহস পেত না। ভয় শব্দটা আমার অভিধানে ছিল না, আর না ছিল কোনো দুর্বলতা। কিন্তু আজ, আজ একটা ছুরি যখন আমার বউয়ের পেট ছুঁয়ে যাচ্ছে, আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। এই আমি, এই শেরাজ খান, এই পাথর হৃদয়ের পুরুষ, কেন আমার হাত-পা কাঁপছে আজ? কেন মনে হচ্ছে আমার পুরো পৃথিবী থেমে গেছে এই রুমে? এই নরম মেয়েটার ছোট্ট শরীরে ছুরি চালাচ্ছে, আর আমি চুপচাপ বসে আছি? আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন একটানা কাঁপুনি হচ্ছে, যেন কেউ আমার ভেতরটা ছিঁড়ে কাটার ছুঁচ ঢুকাচ্ছে। আমি জানতাম না, ভালোবাসা এমন অসহায় করে দেয়। আজ বুঝছি, যার প্রতিটা নিঃশ্বাসে আমি বেঁচে থাকি, তার একফোঁটা রক্ত আমার হৃদয়ের ওপর বজ্রপাতের মতো লাগছে। সুইটহার্ট! আমি শুধু চাই, তোমার এই শরীরে অন‍্য কিছুর নয়, কেবল আমার ভালোবাসার দাগ থাকুক।”
শেরাজ আবারও তাকাল ডাক্তারের দিকে। অনুরোধের স্বরে বলল,

“ডাক্তার, প্লিজ একটু আস্তে। আই নো, ও ব‍্যথা পাচ্ছেনা, কিন্তু আমি ব‍্যথা পাচ্ছি, ডাক্তার।”
“মি. খান, এমন করবেন না। আমাদের কাজটা করতে দিন।”
ডাক্তার আবারও অপারেশনে মন দিল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে কপালের কপাল ছুঁইয়ে বলল,
“একটা কাটা তোমার গায়ে মানে, যেন একটা ক্ষত আমার বুকে। আজ আমি আর শেরাজ খান নেই আর, আজ আমি কেবল একজন স্বামী। যার সমস্ত অস্তিত্ব কাঁপছে, কেবল তার স্ত্রীর ব্যথায়।”
ঘণ্টাখানেক পর, ডাক্তার হালকা হাসি নিয়ে বললেন,
“অপারেশন সাকসেসফুল, পেশেন্ট এখন রিকভার করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।”
“ধন্যবাদ ডাক্তার!”
ডাক্তার আলতো হাসল। শেরাজ ধীরে ধীরে সুমুর কপালে আবার ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
“ভালোবাসা শুধু অনুভব নয়, ভালোবাসা হলো দোয়ার মতো নিঃশব্দ, অথচ সৃষ্টিশক্তির মতো প্রবল।”
ডাক্তার আবারও বলল,

“এই দুঘন্টার অপারেশনে আপনি আপনার ওয়াইফের কপালে নাইন হান্ড্রেড নাইটি নাইন বার কিস করেছেন, আর আমাদের টু হান্ড্রেড টেন বার সাবধান করেছেন আপনার স্ত্রী ব‍্যথা পাবে বলে”
শেরাজ তাকাল ডাক্তারের দিকে। নার্স পাশ থেকে বলল,
“আমি গুনেছি স‍্যার। প্লিজ, কিছু মনে করবেন না। আপনার ওয়াইফের প্রতি আপনার ভালোবাসা দেখে আমরা সকলে মুগ্ধ।”
শেরাজ তাকাতে নার্সটি ভয় পেয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“স…সরি, স‍্যার!”
শেরাজ ঠোঁটে বাঁকিয়ে আলতো হেসে সুমুর কপালে আবারও ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“নাইন হান্ড্রেড নাইটি নাইনের সাথে প্লাস ওয়ান অ‍্যাড করুন।”
ডাক্তার হেসে ফেলল। নার্সটি আলতো হেসে বলল,
“ওয়ান থাউজ‍্যান্ড, স‍্যার।”
শেরাজ তাকাল সুমুর দিকে। ডাক্তার আলতো হেসে বললেন,
“মি. খান! আপনি হয়তো জানেন না, আজকে আমাদের ওটিতে আপনি একটা ইতিহাস লিখে গেলেন।”
শেরাজ মাথা ঘুরিয়ে একটুখানি হেসে বলল,
“ইতিহাস না, ভালোবাসার একটা চিহ্ন রেখে গেলাম। আমার বউয়ের পাশে থাকার নাম যদি ইতিহাস হয়, তবে আমি সেই ইতিহাস প্রতিদিন লিখতে রাজি।”
ডাক্তার মৃদু হেসে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শেরাজ সুমুর হাত ধরে বসে রইল, যেন ছেড়ে দিলেই সুমু কোথাও হারিয়ে যাবে।

সামিয়া আর নাজমিন আজ দুদিন ধরে পিয়াসদের বাড়িতে। সুমি বেগম আর মুস্তাক সিকদার বলেই দিয়েছেন, ‘তোমরা এখন কিছুদিন এ বাড়িতে থাকবে।’ সামিয়া প্রথমে মানতে পারেনি। অথচ এই দুদিনে পিয়াস যেন অদ্ভুত এক ম‍্যাজিকের মতো সামিয়ার মন ভালো করে দিয়েছে। খেয়াল রেখেছে সব কিছুর। কখন খেয়েছে, কখন ঘুমিয়েছে, এমনকি সকালে উঠে চায়ের কাপটা পর্যন্ত নিজে এগিয়ে দিয়েছে। পিয়াস মনে মনে শপথ করেছিল, সে তার সামুর মুখে আগের হাসিটা ফিরিয়ে আনবে, আর সে তার কথা রেখেছে।
এই মুহূর্তে সবাই ছাদে আড্ডা দিচ্ছে। শুধু ফারিয়া কলেজে গিয়েছে। পিয়াস, সামিয়া, ফারিন আর নাজমিন মিলে আড্ডা জমিয়েছে। নাজমিন হাসতে হাসতে বলল,
“ভাইয়া, আপনি তো দেখি এখন পুরা হাউজবয়। এই দুইদিন বাসা থেকেই বের হননি।”
পিয়াস হেসে বলল,
“তোমরা থাকলে ঘরই তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো জায়গা মনে হয়।”
সবাই হেসে উঠল, শুধু সামিয়া চুপচাপ বসে রইল। হঠাৎ পিয়াসের ফোনটা বেজে উঠল। সে একটু নিচে নেমে গেল রিসিভ করতে। ওর পেছনে তাকিয়ে ফারিন ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“এই দুদিন ভাইয়া একটুও বাড়ির বাইরে গেলনা রে। তোরা থাকলে আমাদেরও খুব ভালো লাগে। ভাইয়াটাও ঘরে থাকে, আমাদেরকে নিয়ে ঘুরে যায়।”
নাজমিন হেসে ফেলল। ফারিন, সামিয়ার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হেসে বলল,
“এই সামিয়ার জায়গায় আমি বা ফারিয়া আপু হলে ভাইয়া কী করতো জানিস?”
সামিয়া আর নাজমিন তাকাল ফারিনের দিকে। ফারিন তখন মজা করে গলা শক্ত করে পিয়াসের মতো করে বলল,
“একটা থাপ্পড় মেরে বলতো, মুখের জিওগ্রাফি বদলে দেবে। এমনিও বান্দরনীর মতো দেখতে, এখন আবার মুখটা শাকচুন্নির মতো করে রেখেছিস। হয় এই মুখের ধরন চেঞ্জ কর, নয়তো এই বাসা থেকে বেরিয়ে যা।”
নাজমিন আর সামিয়া হেসে উঠল। ফারিন আবার খুনশুটির ভঙ্গিতে বলল,
“এই সামিয়া! তুই আমার ভাইয়ার বউ হবি নাকি? ভাবি বানাবো তোকে। প্লিজ, রাজি হয়ে যা।”
নাজমিন হেসে ফেলল, কিন্তু সামিয়ার মুখটা এক মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। ঠোঁট শক্ত করে দাঁড়িয়ে গেল সে। চোখে তার স্পষ্ট রাগ আর অপমানের ছায়া। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“ফাজলামির একটা লিমিট থাকে। আমি এসব রসিকতায় কমফোর্টেবল না।”
ছাদ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ফারিন কিছুটা চুপসে গিয়ে বলল,

“আরে আমি মজা করছিলাম শুধু।”
সামিয়া আর কারও দিকে না তাকিয়ে নিচে নেমে গেল। নাজমিন ফারিনের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তোর কথাটা একটু বেশি হয়ে গেল রে।”
ফারিন আনমনে বলল,
“হয়তো! বাট, আমি মজা করে হলেও, সত্যিটাই বলেছি।”
নাজমিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
হুঁশে ফিরল ফারিন। থতমত খেয়ে বলল,
“কিছুনা! চল নিচে যাই।”
সামিয়া তখনই ছাদ থেকে চলে গেছে। ওরা দুজনেও একসাথে উঠে দাঁড়িয়ে ছাদ ত‍্যাগ করল।

বারে আরিয়ান আর রায়য়ান মুখোমুখি বসে আছে। আরিয়ানের চোখ লালচে, চোয়াল শক্ত করে ধরা। কিন্তু তার ভেতরে যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ছে বারবার। রায়য়ান ঠোঁটের কোণে সিগারেট রেখে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের কোনো অর্থহীন শূন্যতার দিকে। টেবিলের উপর রাখা একাধিক গ্লাসে এখনো আধা খালি হুইস্কি পড়ে আছে। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বোতলের ঢাকনা, লাইটার। রায়য়ান হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,
“এই দুনিয়ায় কেউ কারও হয় না, ভাই। কেবল সময়মতো অভিনয় করে।”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে মাথা নিচু করে এক ঢোক হুইস্কি গিলে ফেলল। তার চোখে কষ্টের ছাপ। হঠাৎ সোজা হয়ে বসে বলল,
“আমার চোখের সামনে ওকে হাগ করল এস.কে। আর আমি?”, এক চুমুক হুইস্কি গিলে নিঃশ্বাস চেপে বলল, “আমি শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম।”
রায়য়ান আরিয়ানের কথা শুনে চুপচাপ করে রইশ। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। হঠাৎই দাঁত চেপে মুষ্টিবদ্ধ করল হাত। সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে টেবিলের ওপরের থেতলে দিল। ওদের দুজনের দিকে এগিয়ে এলো মাহিন।

“বস!”
রায়য়ান তাকাল। মাহিন, রায়য়ানের দিকে এক পা এগিয়ে এসে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,
“আপনাকে ইন্ডিয়া ফিরতে হবে। খবর এসেছে আপনার কলকাতার বিজনেসে বিশাল সমস্যা হয়েছে। কিছু ভয়ঙ্কর তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করছে।”
রায়য়ান কপাল কুঁচকে তাকাল মাহিনের দিকে। মাহিন আবারও বলল,
“নেক্সট উইকের মধ্যে ফিরতে না পারলে লোকসান কেবল কোটির অঙ্কে নয়, প্রভাব পড়বে আপনার এই মাফিয়ার প্রফেশনেও।”
রায়য়ান মৃদু হাসল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল চিন্তার গাঢ় ছায়া। আড়চোখে একবার তাকাল আরিয়ানের দিকে। মনে মনে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৫২

“তুই এখনো বুঝলি না, আরিয়ান। এই খেলাটা কেবল তোকে না, আমাকেও জড়িয়ে ফেলেছে।”
আরিয়ান ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে জেদ আর কষ্ট একসাথে জ্বলে উঠেছে। গম্ভীর গলায় বলল,
“যদি তুই ফিরে যাস রায়য়ান, তাহলে আমি একা হয়ে যাব।”

খান সাহেব পর্ব ৫৪