Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৬০

খান সাহেব পর্ব ৬০

খান সাহেব পর্ব ৬০
সুমাইয়া জাহান

আজ আবারও আলিয়া এলেন। কারাগারের সেই চিরচেনা নীরব প্রহর। দুপুর তিনটা বাজতে না বাজতেই নির্ধারিত কাচঘরের দিকে পা বাড়ালেন তিনি। সুমু দেওয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। এলোমেলো চুলগুলো ঘাড় ছুঁয়ে নামছে, চোখে সেই একই নিষ্প্রভ আলো। ঠোঁটে কোনও শব্দ নেই, কিন্তু ডান হাতটা দিয়ে কিছু একটা আঁকছে পুরনো ডায়েরির পাতায়। আলিয়া চুপচাপ এসে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে বললেন,
“আজকে একটু অন্যরকম লাগছে তোমাকে। কেমন যেন গা ছমছমে নিস্তব্ধতা। সব ঠিক তো?”
সুমু চুপ করে রইল। তার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

“আজকে সকালে একটা চিঠি পেয়েছি। ওমানের কেন্দ্রীয় আপিল কোর্ট থেকে,” একটু থেমে আবারও বলল, “আমার মুক্তির দিন এগিয়ে এসেছে। নতুন তারিখ ঠিক হয়েছে। মাত্র বিশ দিন বাকি।”
আলিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল,
“তুমি চলে গেলে আমি তো একা হয়ে যাব, সুমু।”
“আমার চলে যাওয়াটা কোনো শেষ নয়, বরং শুরু। আমি চাই, আপনি এই গল্পটাকে নিজের করে নিন। পৃথিবী জানুক— কেউ একজন ভালোবেসেছিল এমনভাবে, যে কারাবাসও তাকে থামাতে পারেনি।”
আলিয়া চুপ করে রইল। সুমু উঠে দাঁড়াল। পেছনে রাখা চাদরের নিচ থেকে একটা পোটলা বের করে আনলো। সেটা খুলে ছোট একটা কাঠের বাক্স দেখাল। বাক্সের গায়ে লেখা,
“সুমুরাজ!”
“এই বাক্সে আছে আমাদের সেইসব মুহূর্ত— কিছু চিঠি আর খান সাহেবের কিছু জিনিস। এগুলো আমি ওনার অজান্তে রেখে দিয়েছিলাম আমার কাছে।”
আলিয়ার চোখে বিস্ময়,
“তুমি এসব কারাগারে এনে রাখলে কীভাবে?”
সুমু চোখ বন্ধ করে বলল,
“ভালোবাসার জায়গায় আইন সবসময় পৌঁছাতে পারে না। কিছু স্মৃতি থাকুক না শুধু হৃদয়ের আদালতেই বন্দি হয়ে।”

আলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে আজ অন্যরকম একটা তীব্রতা, যেন বহুদিনের সংযত এক সত্যি আজ আর আটকে রাখতে পারছে না। আলিয়া নিচু গলায় বললেন,
“কখনো তোমাকে কথাটা বলিনি, সুমু। কিন্তু আজ আর চুপ থাকতে পারছি না। তুমি অসম্ভব সুন্দরী একজন নারী। সত্যি বলছি, পাঁচটা বছর এই নোংরা, স্যাঁতস‍্যাঁতে দেয়ালের মাঝে কাটিয়ে দেওয়ার পরেও তোমার রূপের একটুও ঘাটতি পড়েনি, বরং আগের থেকেও তুমি অনেক বেশি দীপ্তিময় হয়েছ, যেন সব ব্যথা, সব চেপে রাখা কষ্ট তোমাকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। তুমি যেমন সুন্দরী, তেমনই ভাগ্যবতী। আমি নিশ্চিত, সৃষ্টিকর্তা তোমাকে গড়েছেন প্রচন্ড ধৈর্য আর সহ্যের এক ছাঁচে। এতটা ধৈর্য আমি আর কারো মধ্যে দেখিনি। আর না তোমার মতো এতো সুন্দরী মেয়ে দেখেছি।”
সুমু হালকা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“আমি ভাগ্যবতী, এইটা মেনে নিলাম। কিন্তু আমি সুন্দরী, এটা আপনি কীভাবে বললেন?”
আলিয়া একটু চমকে তাকাল তার দিকে।
“তাহলে কী তুমি বলছ, তুমি সুন্দরী নও?”

সুমু এবার চুপ করে রইল। একটাও শব্দ করে না। চোখ দুটো ঘরের এক কোনায় আটকে রাখল যেন ওখানেই সমস্ত উত্তর লুকিয়ে আছে। আলিয়া গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বললেন,
“এক পাপিষ্ঠ পুরুষ, যিনি জীবনের কোনো নিয়ম মানতেন না। এক কথার মানুষ ছিলেন। কঠিন হৃদয়, হিম শীতল চোখ, বিষাক্ত রাগ যার প্রতিটা আচরণে ফুটে উঠতো। নারীর দিকে তাকানো দূরে থাক, তাদের উপস্থিতিও সে সহ্য করতে পারতো না। নারীকে সে ভাবতো দুর্বল, আবেগপ্রবণ, এমন কিছু, যাদের জন্য হৃদয়ে জায়গা রাখা বৃথা। কত শত মেয়ে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, সে চোখ তুলে তাকায়নি। কিন্তু তোমার সামনে এসে, তার সেই রাগ, সেই কঠোরতা গলে গিয়েছিল। তোমার চোখে সে খুঁজে পেত একধরনের নিশ্চিন্ত ঘর, একটা নিরাপত্তা। সে তোমায় দেখে থেমে যেত, তার কণ্ঠ আটকে যেত। এক কঠিন পুরুষ, যার হৃদয়ে আগুন ছিল। সে তোমার ভালোবাসায় নরম হয়ে গিয়েছিল।”
সুমু তাকিয়ে রইল আলিয়ার দিকে। আলিয়া মৃদু গলায় আবারও বললেন,

“দ্বিতীয়জন ছিল নারী-বিদ্বেষী, আত্মঘৃণায় পোড়া এক আত্মা। সে মেয়েদের ঘৃণা করত। সে এক রকম ভীষণ ঘৃণা, যে ঘৃণা তার চোখে ফুটে উঠত। তার জীবনে নারীর জায়গা ছিল না, বরং ঘৃণার চিহ্ন ছিল প্রতিটি পদক্ষেপে। সে বিশ্বাস করত, নারী মানেই দুর্বলতা, প্রতারণা, এক ধরণের বিষ। সে মেয়ে মানুষ দেখলে চোখ ফিরিয়ে নিত। ছোঁয়া তো দূরের কথা, তার বুক জুড়ে জমে ছিল অপমান, অভিমান, একরাশ অসহিষ্ণুতা। তবুও সেই মানুষটাই একদিন তোমার সামনে প্রথমবার তার সেই বিষাক্ত দেয়ালের ফাঁকে তোমাকে জায়গা দিয়েছিল। সে তোমার স্পর্শ চায়নি, চেয়েছিল তোমার পাশে থাকতে। তুমি তাকে পাল্টে দিতে শুরু করেছিলে।”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হাসল। আলিয়া সেই হাসি সরু চোখে লক্ষ্য করে বললেন,

“তৃতীয়জন ছিল নেশাগ্রস্ত, লোভী, নারী-ভোগী, এক প্লে-বয়। নারী ছিল তার খেলনা। তার চোখে নারী মানেই এক রাতের শয্যাসঙ্গী। সে নারীদের কাছে যেত, ভোগ করত, তাদের চোখে প্রেম দেখিয়ে তারপর ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিত টিস্যুর মতো। তার চারপাশে মেয়েরা ভিড় করত। কেউ তাকে ছোঁয়ার আশায় মরত, আবার কেউ একরাতের জন্য অপেক্ষা করত। সে কারও চোখে প্রেম খুঁজত না। কিন্তু সেই মানুষটাও তোমার কাছে থেমে গিয়েছিল। তোমাকে দেখে তার চোখে ভয় চলে এসেছিল। সেই মানুষটাও তোমার স্পর্শ চায়নি, চেয়েছিল তোমার কাছে ক্ষমা। তুমি তাকে ভেঙে দিয়েছিলে। ভালোবাসার সামনে তাকে নগ্ন করে দিয়েছিলে। তাহলে তুমি বলো, এতগুলো পুরুষ, যাদের একেকজনের জীবন ছিল ভয়ানক এবং মেয়েদের থেকে শত যোজন দূরে— তারা সবাই যদি তোমাকে এভাবে ভালোবেসে ফেলে, তাহলে কী তুমি সত্যিই বলবে, তুমি সুন্দরী নও?”

সুমু এক চিলতে হাসল। সেই হাসি বিষণ্ণ। সে যেনএক কৌতুক শুনলো নিজের ভাগ্য নিয়ে। শান্ত গলায় বলল,
“আপনি কী জানেন, নারীর সৌন্দর্য একটা অভিশাপ? যদি নারী দেখতে সুন্দরী না হয়, তাহলে সমাজ তার অস্তিত্বই মানতে চায় না। আর যদি নারী রূপবতী হয়, তাহলে সে শিকার হয়ে যায় জানোয়ারদের নজরে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, নারীর রূপ তার অস্ত্র নয়, বরং তার শাস্তি হয়ে দাঁড়ায় এই সমাজে। এই রূপ, এই মুখ, এই চুল, এই চোখ, এগুলোর কারণেই তো আমি আজ এখানে। এই সৌন্দর্যের কারণেই আমাকে টার্গেট করা হয়েছিল। ভালোবাসার মুখোশ পরে তারা একজন একজন করে আমার সর্বনাশ করেছে। এই রূপই আমার দুর্ভাগ্য। এই চোখ, এই চুল, এই ঠোঁট, এগুলোই আমাকে ধ্বংস করেছে। আমি যদি সাধারণ একটা মেয়ে হতাম, দেখতে কুৎসিত হতাম, তবে আজ হয়ত এই কারাগারের ভেতর বসে গল্প বলতাম না।”
আলিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে শুনছে সব। সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলল,

“আপনারা সবাই শুধু সেই তিনজন পুরুষের প্রেমের গল্প শুনেছেন। কেউ কখনও ভাবেননি, এই মেয়েটা ঠিক কতবার মরেছে ভিতরে ভিতরে। কতবার ভেঙেছে নিজেকে আবার জোড়া লাগিয়েছে।”
আলিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখে এবার শুধু বিস্ময় নয়, অশ্রু এসে জমেছে। এক নারী হয়ে আরেক নারীর আর্তি বুঝে নিল। আলিয়া ধীরে বললেন,
“তোমার গল্পটা শুধু এক ভালোবাসার গল্প নয়, সুমু। এটা এক যুদ্ধের দলিল। এক নারীর গল্প, যে শুধু ভালোবেসে হারায়নি, প্রতিদিন নিজেকে খুন করেছে, আবার জোড়া লাগিয়েছে। তুমি শুধু সুন্দরী নও, তুমি ভয়ঙ্কর রকমের শক্তিশালী।
সুমু হালকা মাথা নেড়ে বলল,

“ভালোবাসা যদি মানুষকে শক্তি দেয়, তবে সেই শক্তি দিয়ে আমি নিজেকে গড়েছি। কিন্তু সবাই জানে না, এই গড়ার পেছনে কতটা ধ্বংস লুকানো আছে।”
আলিয়া উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে হেঁটে যায় কিছুটা। তার চোখের জল মুছতে চায়, কিন্তু পারে না। সে জানে, এই ঘরের মেয়েটা, যাকে সে এতদিন শুধু এক কয়েদি ভেবেছিল, সে আসলে এক মহাকাব্য। এক ‘সুমুরাজ’ নামক ভালোবাসার গল্প, যার ভিতরে লুকিয়ে আছে ভাঙা হৃদয়, ছেঁড়া চিঠি, গলিত কান্না আর ভয়ঙ্কর শূন্যতা। পেছন থেকে সুমু নিজের পুরনো ডায়েরি থেকে একটা পৃষ্ঠা বের করে বলন,
“একটা পৃষ্ঠা পড়বেন?”

আলিয়া ফিরে এসে বসল। সুমু একটা পাতলা, হলদেটে পৃষ্ঠা এগিয়ে দিল। ডায়েরির পাতার কোণায় আঁকা খান সাহেবের মুখ। সুমু সেই চিত্রটা লুকিয়ে রাখল। আলিয়া পড়তে শুরু করল,
“আপনার চোখে একটুখানি কোমলতা দেখলেই আমি বাঁচতে চাইতাম। আপনি যখন রাগ করতেন, তখন আমি ভয় পেতাম না, বরং ভালোবাসতাম সেই আগুনটাকেও। কারণ আমি জানতাম, সেই আগুনের মাঝে কোথাও আমার নাম লেখা। সেই রাতে, আপনি যখন প্রথম বললেন, ‘তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ সুমু’। তখন থেকেই আমার সমস্ত অপূর্ণতা ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। আমি তখন থেকেই জানতাম, মৃত্যুর পরও আমি শুধু আপনার হবো, শুধু আপনার।”

আলিয়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল। সে পাতাটা বুকে চেপে রাখল। সুমু একটু হাসল। আলিয়া ধীরে বললেন,
“তোমার খান সাহেবের অনেক ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে আছে। আমি কখনো দেখেনি। আমি চেয়েছি তোমার মুখ থেকে তার বর্ণনা শুনব। কিন্তু তুমি কখনো বলোনি তো সুমু, তোমার খান সাহেব দেখতে কেমন ছিল?”
“আমার খান সাহেবকে নিয়ে কী বলব। তিনি ছিলেন ঠিক যেন কোনো আফগান পাহাড়ি রাজপুত্র। চোখে আগুন, চাহনিতে সম্মোহন, আর ব্যক্তিত্বে এক অদম্য ঠাণ্ডা ঝড়। তার চোখদুটো ছিল গভীর, যেন হাজার বছরের গল্প লুকিয়ে আছে সেখানে। ভ্রু’র কোণায় এক অভিমানী ভাঁজ, ঠোঁটে কঠিন নিরাসক্তি— কিন্তু সেই কঠিন মুখের আড়ালে আমি দেখতাম এক অদ্ভুত কোমলতা, যা কেবল আমার জন্যই বরাদ্দ ছিল। আমার খান সাহেব যখন সাদা শার্টে, হাতার গোটানো ভাঁজে, নীরবে হেঁটে যেতেন কোনো জায়গা দিয়ে— নারীদের চোখ যেন স্বাভাবিকভাবে তার দিকেই আটকে যেত। একবার যে তাকে দেখেছে, সে যেন আর নিজেকে ফেরাতে পারেনি। আমি ছিলাম সেই নারী, যার হাতে হাত রেখে হাঁটতেন তিনি। আমি ছিলাম সেই ভাগ্যবতী, যার দিকে তাকিয়ে শত নারী হাহাকার করে বলত— ‘কীভাবে পেল মেয়েটা এমন পুরুষকে?’ আর হ্যাঁ, আমার খান সাহেব ছিলেন সেই পুরুষ, যাকে ভালোবাসা মানেই ছিল গর্ব, ঈর্ষা আর অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ। আমি তার চোখে দেখেছিলাম ভালোবাসার শুদ্ধ ভাষা, আর সেখানেই আমার সমস্ত জয়ের গল্প লেখা ছিল।”
আলিয়া তাকিয়ে রইল অপলক। তার সামনে বসে আছে এমন এক নারী, যার মুখে আজ কেবল প্রেম নয় — আছে এক রাজকীয় বিষাদ, এক আভিজাত্যপূর্ণ ব্যথা, আর নিঃসঙ্গ জয়ের গল্প।
হঠাৎ ঘরের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকল। ডায়েরির পাতাগুলো উড়তে শুরু করল। সুমু ডায়েরিটা বন্ধ করে বলল,

“কারাগারের পাঁচটা বছর আমি প্রতিদিন নিজেকে একটা করে চিঠি লিখেছি, যেন আমার স্মৃতি মরে না যায়।”
আলিয়া উঠে এসে সুমুর হাতটা ধরল। এই প্রথম তারা দুই নারী — একে অপরের চোখে নিজেদের প্রতিবিম্ব খুঁজে পেল। আলিয়া কাঁপা গলায় বলল,
‘তুমি কোনো কয়েদি নও, সুমু। তুমি এক পুরোনো ইতিহাস। এক অমর প্রেম। যে গল্প যুগ পেরিয়ে চললেও মানুষ শুনবে, কাঁদবে, আর বলবে, এমন ভালোবাসা কি সত্যি হয়?”
সুমু মাথা নিচু করে হাসল। চোখ তুলে বলল,
“হুম! হাজার জন প্রেম পায়, তাদের মধ্যে একশো জন সত্যিকারের ভালোবাসা পায়, আর সেই একশো জনের মধ্যে এক জন সেই ভালোবাসা ধরে রাখতে পারে। আমি সেই এক জনের একজন হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। কিন্তু ভালোবাসাটা আমার ছিল। আমারই থাকবে, মৃত্যুর পরেও।”
ঘরটা আবারও কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে গেল। বাইরের পাখিরা যেন এই নীরবতাকে সম্মান জানালো। বাতাসটা ধীরে আসে, আবার থেমে যায়। সুমু তখন ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠাটা খুলে আলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। আলিয়া আবারও পড়তে শুরু করল,
“যদি কোনোদিন এই চিঠিগুলো কেউ পড়ে। তাকে বোলো, আমার জীবনটা কোনো নাটক ছিল না। এটা ছিল এক ভালোবাসার মহাকাব্য। আমার নাম ছিল ‘সুমাইয়া জাহান’। আর তার নাম— ‘শেরাজ খান’। সে ছিল শুধু সুমুর খান সাহেব।”
আলিয়ার পড়া শেষ হতেই সুমু একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“আজকে গল্প শুনবেন না?”
আলিয়া চোখের পানি মুছে তাকাল। সুমু মৃদু হেসে আবারও সেই পুরানো স্মৃতিচারণ করতে শুরু করল।

অন্ধকার রাস্তায় চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝেমাঝে কুকুরের ডাকে রাতের নিস্তব্ধতা চিড় ধরছে। ল‍্যাম্পপোস্টের আলোয় রাস্তা পুরো আলোকিত। তার নিচে দিয়ে নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সুমু। মাথায় ওড়না, মুখটা হালকা ঢাকা। শীতল বাতাস তার মুখের চারপাশে চুল উড়িয়ে নিচ্ছে। সে জানে না কোথায় যাচ্ছে। পা যেন নিজে থেকেই চলতে শুরু করেছে। বুকের ভেতর হাহাকার, নিঃশ্বাস ভারী তার। প্রতিটি পা ফেলার সাথে সাথে খান সাহেবের মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

হঠাৎ সামনের দিক থেকে একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করল। ল‍্যাম্পপোস্টের নরম আলোর ওপর রাস্তার ওপর আচমকা উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল সুমুর। সে নিজের দু’হাত দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলল। মনে হলো, এবার বুঝি সব শেষ। তার চারপাশে যেন সময় থেমে গেছে। কিন্তু গাড়িটা ঠিক তার সামনে এসে থেমে গেল না, বরং একটু দূরে থামল। কোনো শব্দ নেই, ইঞ্জিনের গর্জন নেই। সুমু দু’হাতে ফাঁকা দিয়ে সামনে দেখার চেষ্টা করল। প্রথমে কিছু দেখতে না পেলেও ধীরে ধীরে তার সামনে ভেসে উঠল একজন ছায়ামানবের প্রতিচ্ছবি। সেই হেডলাইটের ভেতর দিয়ে কেউ এগিয়ে আসছে সে মানব। লোকটির গায়ে ওভারসাইজ হুডি জ্যাকেট, হুডি দিয়ে পুরো মাথা, মুখ সব ঢেকে রাখা। হাত দুটো পকেটে ঢোকানো, পায়ে ভারী বুটজুতো। পুরো শরীরটাই অচেনা, রহস্যে মোড়া, যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য।
সুমুর হৃদস্পন্দন মুহূর্তে থেমে যাওয়ার উপক্রম। সে ভয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। কিন্তু লোকটা থামল না। ঠিক তখনই, ভয় পেয়ে পেছন ফিরে সুমু দৌড়াতে শুরু করল। পায়ের নিচে রাস্তাটাও যেন পিছলে যাচ্ছিল। সুমু দৌড়াতে দৌড়াতে একবার পেছনে তাকাল। কেউ নেই। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সামনে তাকাতেই বুকটা কেঁপে উঠল তার। লোকটা ঠিক তার থেকে কিছুটা দূরে সামনে দাঁড়িয়ে।

“সে কীভাবে এখানে এলো?”
সুমু আর কোনো চিন্তা না করে আবারও দৌড়াতে লাগল। এবার যেন জীবন বাঁচানোর দৌড়। পেছনে তাকিয়ে দেখল, লোকটা তার পেছন পেছন আসছে। কোনো শব্দ নেই, শুধু ছায়ার মতো ধেয়ে আসছে। হঠাৎ রাস্তায় একটা উঁচু অংশে হোচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল সুমু। মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো—’আহ’ শব্দটা। হাত আর হাঁটুতে চোট পেলে সে। কিন্তু সে নিজেকে তুলতে গিয়েই অনুভব করলো—কেউ একজন তার পা চেপে ধরেছে।
সুমু চমকে পেছনে তাকাল। সেই ছায়ার মানুষটা। মুখ ঢাকা, হাতে গ্লাভস, একহাতে সুমুর পা চেপে ধরেছে, অন‍্যহাত জ্যাকেটের পকেটে ঢোকানো। হিমশীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে যেন তার চারপাশ দিয়ে। লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পায়ের ওপর থেকে চাপ সরিয়ে নিল, কিন্তু সামনে এগিয়ে এলো আরও। সুমু বসা অবস্থায় পেছাতে লাগল। ধুলো মেখে যাচ্ছে তার ওড়না, হাতে, মুখে। সুমু গলা কেঁপে উঠল। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
“কে… কে আপনি?”

কোনো উত্তর নেই। লোকটা এবার পকেট থেকে আস্তে করে হাত বের করল। সুমু ভয়ে নিঃশ্বাস ফেলতেও ভুলে গেল। তার চোখ কুঁচকে উঠছে, মুখ শুকিয়ে আসছে। গলার ভেতর আটকে থাকা প্রশ্নটা আবার বেরিয়ে আসার আগেই লোকটা এক ধাপ এগিয়ে এসে সামনের বাতাসে কিছু একটা স্প্রে করে দিল। সুমুর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার মুখের সামনে ধোঁয়ার মতো ঘোর লেগে গেল। সে হাত উঁচিয়ে কিছু একটা ঠেকাতে চাইল, কিন্তু শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল তার। চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো, বুক ধড়ফড় করতে থাকল। তারপর ধপ করে শরীরটা রাস্তার ওপর পড়ে যেতে লাগল, কিন্তু লোকটা ঝাঁপিয়ে গিয়ে সুমুকে ধরে ফেলল। তার বুকের মধ্যে সুমুর মাথা এসে ঠেকল, যেন ক্ষণিকের জন্য সব থেমে গেল। সুমুকে জড়িয়ে ধরে লোকটা পকেট থেকে ফোন বের করল। দ্রুত কোনো একটা নাম্বারে কল করে আদেশের স্বরে বলল,

“ফাইভ মিনিট। এখুনি এখানে গাড়ি নিয়ে পৌঁছা।”
ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় কালো রঙের একটা গাড়ি এসে থামল রাস্তার ধারে। গাড়ির জানালায় ঝুঁকে কেউ কিছু বলল না, শুধু দরজা খুলে দিল। লোকটা সুমুর নিথর শরীরটা সাবধানে তুলে নিল। বুকের ভেতরে জড়িয়ে নিল এমনভাবে যেন সুমু কোনো কাচের পুতুল—ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগবে না। সে গাড়ির পেছনের সিটে সুমুকে শুইয়ে দিল। একবার নিচু হয়ে সুমুর মুখের দিকে তাকাল। আলোর রেখা পড়ে সুমুর মুখটা স্পষ্ট দেখা গেল। এলোমেলো চুল, মুখে ধুলো-মাখানো ক্লান্তি, ঠোঁটে অনুচ্চারিত ব্যথা। লোকটা হুডি টেনে মুখটা আরও ঢাকা নিল। নিজের গ্লাভস পরা হাত দিয়ে সুমুর গাল ছুঁয়ে সুমুর কপালের ওপর ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজের লোকদের উদ্দেশ্যে বলল,
“খুব সাবধানে নিয়ে যাবি। ওর কিছু হলে, তোদের সাথে খুব ভালো কিছু হবে না।”
গাড়ির দরজা বন্ধ হলো। গাড়িটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রাস্তায় আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। লোকটাও নিজের আনা গাড়িতে উঠে চলে গেল। শুধু বাতাসে রয়ে গেল সুমুর পারফিউমের হালকা গন্ধ, আর কোনো এক অজানা গল্পের শুরু।

ঘড়ির কাঁটায় সময় রাত তিনটা। বাড়ি নিঃশব্দ। চারদিকে নিস্তব্ধতা এমন যেন নিজের নিঃশ্বাসও ভারি মনে হয়। মেইন গেটের বাইরে গাড়ি থামার শব্দ হলো। শেরাজ ফিরেছে। পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে এলো সে। হাত বাড়িয়ে দরজার হ্যান্ডেল চেপে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। রুমটা অন্ধকার। রুমের লাইট অন করতেই প্রথমেই চোখে পড়ল টেবিলের উপরে একটা কাগজ। তার উপর রাখা সুমুর পরিচিত সেই ছোট্ট পেন্ডেন্টটা, যেটা ওর মা দিয়েছিলেন। শেরাজ এগিয়ে গেল কাগজটার কাছে। পেন্ডেন্টটা সরিয়ে কাগজটা খুলে পড়ল সে। তার প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। পকেট থেকে ফোনটা বের করে রাহিনের নাম্বার ডায়াল করল। কিছুক্ষণ রিং হতেই রাহিন কল রিসিভ করল। রাহিন কল রিসিভ করতেই শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“তোর বোন পালিয়েছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে বোঝা গেল ঘুমন্ত রাহিনের ঘুম ছুটে গেছে।
“কী? কী বললি তুই? পালিয়েছে মানে?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে উত্তর দিল,
“আমি ঘরে ফিরেছি মাত্র। টেবিলের ওপর চিঠি রেখে গেছে তোর বোন। পেন্ডেন্ট খুলে রেখেছে। আর ফোনের সিমগুলো খুলে ফেলে দিয়ে গেছে। যেগুলো এখন আমার চোখের সামনে পড়ে আছে।”
রাহিন এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
“ও কেনো পালাবে এস.কে?”
শেরাজ রাহিনের প্রশ্নটা উপেক্ষা করে বলল,

“বউ দেখি আমার পুরাই একটা কলিজা। কী সাহস আমার বউয়ের, হ‍্যাঁ। আমার বউয়ের সাহস দেখার পর আমি মুগ্ধ, শিহরিত, আহত, ব্যাহত, গর্বিত, অনুপ্রাণিত, ব্যথিত, মর্মাহত, শোকাহত, বিমোহিত, আনন্দিত, রাগান্বিত, আতঙ্কিত, রোমাঞ্চিত, ক্রন্দনরত, বেদনাদৃত, চিন্তিত, বিভোরিত, মোহিত, কম্পিত, সুরক্ষিত, কলংকিত, হাস্যরত, ক্রন্দিত, আরও কতিপয় কিছু বলার ছিলো। কিন্তু আমার মুখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আমি দুঃখিত। সর্বোপরি নিহত।”
রাহিনের ঘুম কেটে গিয়ে এখন মাথা ঝিমঝিম করছে। শেরাজের কথাগুলো শুনে সে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“তুই কী কবিতা পড়ছিস, না মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিস, সেটা বুঝতে পারছি না। তোর মাথা ঠিক আছে এস.কে?”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,
“তুই এখনো বুঝিসনি, রাহিন। তোর বোন আমাকে মেরে ফেলেছে। পেন্ডেন্টটা খুলে রেখে গেছে, ফোনের সিম ফেলে গেছে, কাগজে একটা চিঠি লিখে গেছে। তুই চাইলে তোকে কিছুটা পড়ে শোনাই।”
সেপকেট থেকে চিঠিটা বের করে পড়তে লাগল,

‘খান সাহেব’
“আমি পালাচ্ছি না। আমি হারিয়ে যাচ্ছি না। আমি শুধু একটু নিঃশ্বাস নিতে চাই। এই সম্পর্কের ভেতর আপনার রাগ, আপনার ভয়, আপনার ভালোবাসা সবকিছুই আমার নিজের মতো করে বোঝার প্রয়োজন ছিল। প্লিজ, খুঁজতে বের হবেন না। ভালো থাকবেন।”
‘সুমু’
সে উল্টাপাল্টা নিজের মনের মতো করে বানিয়ে পড়ে শোনাল। রাহিন চুপ করে রইল। শেরাজ বেলকনির দিকে হেঁটে গেল। চোখ তার দূরের অন্ধকারে আটকে।
“তোর বোনটা আসলেই সাহসী। এতটাই সাহসী যে আমার চোখে চোখ রেখে আমাকে যেমন ভালোবাসতে পারে, আবার পালিয়েও যেতে পারে একটুও পিছনে না তাকিয়ে।”
সে হঠাৎ করেই আবার হাসল। তীক্ষ্ণ সেই হাসিতে যেন বেদনাও বিদ্রূপ করে উঠল,
“একটা মেয়ে, যে নিজের সবকিছু আমার কাছে সমর্পণ করেছিল, আজ সেই মেয়ে আমাকেই রেখে নিজের স্বাধীনতা খুঁজতে গেছে। আমি তো ভেবেছিলাম, আমি তাকে আগলে রাখছি, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছি। এখন বুঝেছি, আমি তাকে শ্বাসরোধ করে ফেলছিলাম।”

রাহিন চুপ করে ছিল কিছুক্ষণ। সে নিচু গলায় বলল,
“ভাই, তুই যদি ভাবিস তুই শ্বাসরোধ করছিলি, তাহলে তো ওর নিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাও তোর দায়িত্ব।”
শেরাজ গলায় বিষাদ মিশিয়ে বলল,
“আমি জানি রাহিন, আমার ভয়ানক রাগ, নিয়ন্ত্রণহীন ভয় আর অতিরিক্ত ভালোবাসা মিশে একটা চাপে পরিণত হয়েছিল। আমি ভাবিনি সেই চাপটা একদিন ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে,” একটু থেমে আবারও বলল, “কিন্তু ও কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? কিছুই তো নেয়নি সাথে। এই শহরে কাকে চিনে তোর বোন?”
রাহিন গলার স্বর শক্ত করে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৫৯

“তাহলে তোকে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না, এস.কে। ওর সীমানা আমি জানি না। কিন্তু ওর না বলা কথাগুলো আমি শুনতে পারি। এখনই বের হতে হবে।”
শেরাজ ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“সবগুলোকে ঘুম থেকে তোল। এক্ষুনি সবাইকে নিয়ে বের হ। আমার বউকে খুঁজে আনতে হবে। বেঁচে থাকতে হলে, ওকে আমার দরকার।”
শেরাজ কল কেটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। এদিকে রাহিনও সবাইকে ঘুম থেকে টেনে তুলে বেরিয়ে পড়ল।

খান সাহেব পর্ব ৬০ (২)