খান সাহেব পর্ব ৬২
সুমাইয়া জাহান
সময়ের পাতা যেন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। এইতো সেদিন সুমু ইন্ডিয়াতে এসেছিল, সেদিনের পর দেখতে দেখতে আজ তিনটা বছর কেটে গেল। আজ সকালটা যেন হঠাৎ করেই শুরু হয়নি, বরং ধীরে ধীরে সরে আসছে রাতের আঁধার। জানালার ফাঁক গলে সূর্যের হালকা কিরণ চুপিচুপি ঘরে ঢুকে পড়েছে। সেই কিরণের এক সরল রেখা এসে সুমুর চোখে পড়ল। চাদরের নিচে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটা অস্থির হয়ে উঠল একটুখানি। কপালের ওপর এলোমেলো চুলগুলোকে সরিয়ে নিয়ে তার চোখ একটু কুঁচকে গেল। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল জানালার দিকে।
ঘরটা একেবারেই নিঃশব্দ, যেন নিঃশ্বাস ফেলার শব্দটাও কানে লাগে। সুমু উঠে বসল বিছানায়। চারদিকে চোখ ঘোরালো। ঘরটা একই রকম। সবকিছু একই জায়গায়। তবু কী এক অজানা শূন্যতা যেন জমে আছে তার মনে। সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল। মেঝেতে পা ছোঁয়াতেই ঠাণ্ডা একটা শিহরণ বয়ে গেল তার শরীর জুড়ে, যেন এই নীরবতা আর ঠাণ্ডা মেঝেটাও তার যন্ত্রণার একটা নীরব সাক্ষী।
সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে খানিকক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে দেখার মাঝে যেন এখন আর আগের মতো আগ্রহ খুঁজে পায় না। চোখে বিষণ্নতা, ত্বকে ক্লান্তির ছাপ—তবু সবচেয়ে স্পষ্ট যে জিনিসটা দেখা যায়, সেটা সেই চিহ্ন। গলা আর বুকের ঠিক ওপরের সেই ক্ষতচিহ্ন। সে হাত বাড়িয়ে ধীরে ছুঁয়ে দেখল সেগুলো। আঙুলের স্পর্শে যেন কেঁপে উঠল সেই জায়গাটা। না, এটা শুকায়নি। তিন বছর কেটে গেছে—তবু এটা তাজা। ঠিক যেমন ছিল সেই প্রথম দিন। এমনও হয়নি যে সে চেষ্টার ত্রুটি রেখেছে। কত ডাক্তার, কত থেরাপি, কত ওষুধ—সবই যেন ব্যর্থ। ক্ষতটা যেমন ছিল, তেমনই আছে। শুধু সুমুর বিশ্বাস বেড়েছে, প্রতিদিন রাতে কেউ না কেউ এই ক্ষতের উপর আবারও কিছু একটা করে যায়। হয়তো স্প্রে, নয়তো ইনজেকশন। লোকাল কোনো ওষুধ ব্যবহার করা হয় যাতে সে ব্যথা না পায়, টের না পায়। আর ইনজেকশনটা হয়তো ঘুমের, যাতে সে গভীর ঘুমে থাকে, অচেতন হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন? সুমু চেষ্টার তো কমতি রাখেনি এই দাগের উৎস বের করার। রুমে ক্যামেরা পর্যন্ত লাগিয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। পুরো রাতে ফুটেজের মধ্যে রাত দুটো থেকে তিনটার মধ্যে কোনো ফুটেজ দেখা যায় না। সুমুর মনে প্রশ্ন জাগে, এটা কি কেবল একটা দাগ? নাকি এই দাগের ভেতরে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর রহস্য। আয়নার দিকে তাকিয়ে হালকা ফিসফিস করে বলল,
“এই ক্ষতটা শুধু শরীরের না, এটা আমার জীবনের সাথে মিশে গেছে।”
তার চোখে পানি আসেনি আজ। কারণ তিন বছরে সে শিখে গেছে—সব কষ্টে কাঁদা যায় না। কিছু কষ্টকে শুধু বয়ে বেড়াতে হয়। সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাথা ঝাঁকিয়ে ভাবনাগুলো সরিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
কিছু সময় পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে একটা নাম টাচ করতেই ফোন রিং হতে থাকল। ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই সুমু ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“আমার রুমে এসো, নাতাশা।
নাতাশা—সুমুর পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তিন বছর আগে যার কিছুই ছিল না, সেই সুমু এখন এক বিশাল নাম। নিজের তৈরি ব্র্যান্ড, নিজের অফিস, নিজের বিল্ডিং—সবই অর্জন করেছে নিজের যোগ্যতায়। সাহস আর যন্ত্রণাকে পুঁজি করে সে হয়ে উঠেছে একজন সফল বিজনেস ওম্যান। আর আজকের দিনটা তার জীবনের আরেকটা মাইলফলক। আজ সে মিসেস ইন্ডিয়া অ্যাওয়ার্ড পেতে চলেছে। নিজের মতো করে গড়া একটা জীবন, অথচ সেই জীবনের গভীরে লুকিয়ে আছে এমন একটা ক্ষত, যা কেউ দেখতে পায় না।
নাতাশা দরজায় নক করেই রুমে ঢুকল। তার হাতে আজকের শিডিউলের ফাইল, আর চোখেমুখে চিরচেনা সেই পেশাদার গম্ভীরতা।
“গুড মর্নিং ম্যাম! আজকের ইভেন্ট সাতটা থেকে শুরু। ততক্ষণে আপনাকে ভেন্যুতে রেডি থাকতে হবে। মিডিয়া ব্রিফিং আছে পাঁচটা পাঁয়তাল্লিশ-এ। তার আগে মেকআপ টিম এসে যাবে ঠিক দুটোর মধ্যে। আর হ্যাঁ, সুমুরাজ-এর নতুন কালেকশনের প্রেজেন্টেশনটা আপনি কি আজ শো-তে আনবেন?”
সুমু আয়নার সামনে বসে চুলে চিরুনি করতে করতে এক ঝলক তাকাল নাতাশার দিকে।
“না! আজ আমি এসব কিছুই আনব না।”
নাতাশা কিছু বলল না। শুধু এক মুহূর্ত থমকে সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ সে নিচু গলায় বলল,
“আপনি কী তার খবর পেয়েছেন?”
সুমুর হাত থেমে গেল। তার মুখে হালকা এক টান পড়ল। সে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,
“শুনলাম ইউএসএ-তেই আছে।”
একটা থমথমে নিঃশব্দতা নেমে এলো রুমে। নাতাশা মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আপনার গলায়, বুকে যেই ক্ষতটা— সেটা কি এখনও…”
“হ্যাঁ! রোজ রাতেই সেটা নতুন হয়ে ওঠে। আমি বুঝি না কে করে এটা। কিন্তু আমি জানি—আমার শরীর ভুল বলে না— কেউ আমাকে গভীর ঘুমে রেখে এসব করে।”
নাতাশা ধীরে কাছে এসে একটা ওষুধের পাতা এগিয়ে দিল।
“আপনি কাল রাতে ঘুমের ইনজেকশন, আপনি নিজে চেয়ে নিয়েছেন।”
সুমু কিছু বলল না। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। দূরে, শহরের বিলবোর্ডে তার নিজের হাসিমাখা মুখ ভেসে উঠছে, সুমাইয়া জাহান — দ্যা কুইন অফ সুমরাজ। কিন্তু তার ভেতরে ঠিক সেই জায়গায়, যেখান থেকে স্বপ্ন তৈরি হয়—সেখানে এখনও এক নির্লিপ্ত আঁধার আছে।
“ম্যাম! আজ কী রায়য়ান স্যারের বাসায় যাবেন?”
সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“না!”
নাতাশা একটু দ্বিধা নিয়ে বলল,
“স্যার আপনাকে ইনভাইট করেছিলেন।”
“আজ শো’র পর ডিরেক্ট বাসায় ফিরব। কাল যাবো। তাছাড়া আলিশা আর আন্টিকে খুব মিস করছি, ওদের জন্যই যাব।”
নাতাশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে নিজের কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল;
“আলিশা ম্যাম, রায়য়ান স্যারকে খুব ভালোবাসে, তাই না ম্যাম?”
সুমু আয়নার দিকে তাকিয়েই মাথা নাড়ল,
“হুম, বাসে!”
নাতাশা নিচু গলায় বলল,
“কিন্তু, স্যার তো আপনাকে…”
সে কথা শেষ করার আগেই সুমু ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ কুচকে ধমক দিয়ে বলল,
“নাতাশা, স্টপ ইট! সে তোমাকে বলেছে এসব? আজেবাজে কথা বলা বন্ধ করো।”
নাতাশা একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল,
“সরি ম্যাম! কিন্তু নারী তো পুরুষের চোখের ভাষা বুঝতে পারে। আপনিও জানেন, রায়য়ান স্যার আপনাকে…”
সুমু এবার কঠিন গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“খান সাহেবকে ভালোবাসার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো পুরুষের দিকে ঠিকভাবে তাকিয়ে দেখিনি, আর না কোনোদিনও দেখব। সুমুর, শেরাজ খান ছাড়া অন্য কারো চোখের ভাষা বোঝা পাপ। ওসব জাস্ট ইগনোর করো।”
এক মুহূর্ত নীরবতা। নাতাশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সুমু আবার আয়নার সামনে ফিরে এসে নিজের ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক লাগিয়ে বলল,
“আর হ্যাঁ, সন্ধ্যার শো’র জন্য ড্রেসটা রেডি রাখো সাথে আর্নামেন্টসও।”
নাতাশা দ্রুত মাথা নাড়ল,
“ওকে, ম্যাম!
নাতাশা বেরিয়ে গেলে। সুমু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে নিজের চোখে তাকিয়ে রইল। সে ধীরে ড্রেসিং টেবিল থেকে একটা ছোট গোল্ডেন বাক্স বের করল। বাক্সটা খুলতেই ঝকঝকে একটা চেইন বেরিয়ে এলো। খুব সাধারণ, কিন্তু সুমুর চোখে অমূল্য। চেইনটা গলায় পরে সে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কাবার্ডের দিকে ফিরে এলো। ওয়াক-ইন ক্লোজেটের দিকে যেতে যেতে নিজেই নিজের সঙ্গে বলল,
“আজ আমার জীবনের একটা বড় দিন। হাজার ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, লাখো মানুষের করতালি, কিন্তু মনের ভিতরে তো এখনো একটা শূন্যতা। শুধু একটা মানুষই জানে আমার আসল স্বপ্নটা কী ছিল।”
ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, ‘রায়য়ান চৌধুরী কলিং…’ সুমু কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। সে কল রিসিভ করল না, বরং ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে নিজের ব্ল্যাক সিল্ক গাউনটা বের করে বিছানার ওপর রাখল। হঠাৎ পাশের দরজায় টোকা পড়ল। নাতাশার গলা রুমের ভেতর ভেসে এলো,
“ম্যাম, ফটোগ্রাফার আর মেকআপ টিম চলে এসেছে। তারা আপনাকে রেডি করতে চাইচ্ছে।”
“ওদের তো বিকালে আসার কথা ছিল। তাহলে এখন কেনো?”
“ম্যাম! ওরা জানে আপনি লেট কাজ একদম পছন্দ করেন না। আপনাকে খুব ভয় পায় সকলে। এরজন্যই সকালবেলায় এসেই হাজির হয়েছে।”
“ওকে, ওদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করো।”
“আমি সব করে এসেছি, ম্যাম। বিকাল পর্যন্ত ওরা এখানেই থাকবে।”
সুমু আর কিছু বলল না। ড্রেসিং টেবিল থেকে ব্রাশটা তুলে চুলটা আবারও কয়েকবার চিরুনি করে নিল। তার চোখে দৃঢ়তা, তবু কোথাও এক চিলতে বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে। আয়নায় নিজেকে শেষবারের মতো দেখে নিল। বিছানায় রাখা ব্ল্যাক সিল্ক গাউনটা হাতে তুলে নিয়ে ওয়াক-ইন ক্লোজেটের দিকে গেল।
দশ মিনিট পর, সুমু বেরিয়ে এলো একেবারে নতুন অবতারে। পরিপাটি করে রাখা খোলা চুল, ব্ল্যাক সিল্ক গাউন, হালকা গোল্ড হুপ কানের দুল, আর ঠোঁটে রেট্রো মেটালিক ব্রাউন লিপস্টিক। তাকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য যে কেউ থমকে যেতে বাধ্য। নাতাশা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“ম্যাম, আপনি তো একেবারে ওয়াও।”
সুমু হালকা হেসে বলল,
“চলো, দেরি করা যাবে না। মিটিংয়ে যেতে হবে।”
নাতাশা ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এসে বলল,
“গাড়ি রেডি আছে ম্যাম, আমি সিকিউরিটিদের জানিয়ে দিচ্ছি।”
সুমু মাথা নাড়ল। তারা দুজনে ধীরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। করিডরে হাঁটতে হাঁটতে সুমু আবারও নিজের মনেই বলল,
“আমি জানি, আজকের সন্ধ্যায় ক্যামেরাগুলো শুধুই আমার সাফল্য দেখবে। কিন্তু আমি খুঁজি সেই চোখ, যে শুধুই আমাকে দ্যাখে।”
ফাইভ-স্টার হোটেলের প্রাইভেট কনফারেন্স রুম। রুমে আলো কম, কিন্তু স্পটলাইট ঠিক সেন্টার টেবিলটায়। গ্লাস টেবিলের চারপাশে বসে আছেন মিডিয়ার বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্ব, স্পনসর, ফ্যাশন হাউসের হেডস, আর দুই পাশে পি.আর টিম।
সুমু প্রবেশ করল ধীরে। ব্ল্যাক সিল্ক গাউনে তার উপস্থিতি এক ধরণের সম্মোহনী ক্ষমতা নিয়ে এলো রুমে। সবাই এক মুহূর্তের জন্য থেমে তাকাল তার দিকে। পি.আর টিমের একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“লেডিজ অ্যান্ড জেন্টলম্যান, প্লিজ ওয়েলকাম দ্য ফেইস বিহাইন্ড সুমুরাজ—সুমাইয়া জাহান।”
সুমু হালকা হাসল। তার চোখে আত্মবিশ্বাস। সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিল। সে বসে পড়ল কনফারেন্স টেবিলের ঠিক একেবারে ফ্রন্ট সেন্টারে। নাতাশা পাশে ফাইলগুলো ঠিক করে দিল।
প্রথম স্পনসর প্রশ্ন করল,
“ম্যাম, দিস ইয়ার সুমুরাজ ইজ হিটিং ইন্টারন্যাশনাল রানওয়েজ। হোয়াট সেটস ইয়োর ব্র্যান্ড অ্যাপার্ট ইন দিস ক্যাওটিক মার্কেট?”
সুমু শান্ত গলায় উত্তর দিল
“ক্যাওস ইজ টেম্পোরারি। ক্লাস ইজ টাইমলেস। সুমুরাজ ডাজন’ট ফলো ট্রেন্ডস, উই সেট ইমোশনস ইন ফ্যাব্রিক। দ্যাটস আওয়ার পাওয়ার।”
সবার মুখে প্রশংসা। মিটিং এগোতে থাকল। কেউ প্রেজেন্টেশন দেখাল। কেউ চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে কথা বলল। সুমু মাথা নাড়ায়। মাঝে মাঝে কফির কাপ হাতে তুলে নেয়—ঠোঁটের মেটালিক লিপস্টিক কাপের রিমে হালকা ছাপ রেখে যায়। সে আবার একটুখানি ঘরের কাচের দেয়ালের ওপারে শহরের আলোয় চোখ রাখে। আবার মনে মনে ভাবে,
“সাফল্যের আলোতে মুখ স্পষ্ট হয়, কিন্তু ভালোবাসার আলোতে চোখ টিকে থাকে।”
মিটিং শেষ হওয়ার পথে, একজন পি.আর হেড বলল,
“ম্যাম, মিস্টার রায়য়ান চৌধুরী পার্সোনালি ইনভাইটেড ইউ টু দ্য আফটার-ডিনার রুফটপ সেশন টুনাইট। উইল ইউ জয়েন?”
সুমু এক মুহূর্ত থেমে বলল,
“নট টুনাইট! আফটার দ্য শো, আই জাস্ট ওয়ান্ট টু রিল্যাক্স অ্যা বিট। আই’ভ অলরেডি কমিটেড মাইসেল্ফ টু পিস, নট পার্টিজ।”
পি.আর হেড একটু থমকে গিয়ে মাথা নাড়াল। সবাই উঠে দাঁড়াল। মিটিং শেষ। রুম ফাঁকা হতে শুরু করল। নাতাশা নিচু গলায় বলল,
“আপনি দারুণ, ম্যাম। সবাই অভিভূত।”
সুমু হালকা মাথা নাড়াল।
“ওরা চেয়েছিল গ্ল্যামার, আর আমি দিয়েছি গল্প।”
নাতাশা মুচকি হেসে পেছনের ফাইলগুলো গুছাতে থাকল। সুমু জানালার কাছে দাঁড়াল। তার চোখে এই ব্যস্ত শহর থেকে একটু দূরে। নাতাশা এসে সুমুর পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ম্যাম, আজ আপনার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে কী রেসপন্স দেবেন সাংবাদিকদের?”
সুমু হালকা হেসে বলল,
“বলব, আমি প্রেমে পড়েছি আমার কাজের।”
নাতাশা মুচকি হাসল।
“ঠিক আছে, ম্যাম। আপনার স্টেটমেন্ট সবসময় হেডলাইন হয়ে যায় জানেন তো?”
সুমু ধীরে পেছন ফিরল। আলতো হেসে বলল,
“বাসায় ফেরা যাক?”
“ইয়েস ম্যাম!”
ঘড়ির কাঁটা তখন বিকাল তিনটা বিশ ছুঁই ছুঁই। স্টুডিওর কাচঘেরা জানালায় সূর্যের আলো এখন একটু একটু করে ঝিমিয়ে পড়ছে। বাইরে বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস। সুমু আয়নার সামনে বসে। সে চুপচাপ তাকিয়ে আছে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে। আজ তাকে অসম্ভব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আজকের দিনের তাড়াহুড়া, মিডিয়া, লাইভ ব্রডকাস্ট—সব কিছুর মাঝখানে একটা স্তব্ধ মুহূর্ত, যেন নিজেকে একটু খুঁজে পাওয়া। ঘরের বাতাসে হালকা ভ্যানিলা পারফিউমের সুবাস। মেকআপ টিমের একজন আলতো হাতে সুমুর চুলে শেষ টাচ দিচ্ছে, কেউ গলার গয়না ঠিক করছে।
আয়নার সামনে বসে থাকা সুমু যেন আজ এক নীরব রাজকন্যা। তার যার চোখে গভীরতা আর ঠোঁটে শান্তির ছায়া। তার পরনে একটি অফ-হোয়াইট হানফু-স্টাইল গাউন, যাতে সূক্ষ্ম জরির কাজ। বুক অবধি ঢেকে রাখা পোশাকের কাট একেবারে শালীন, অথচ নৈপুণ্যে ঠাসা। কোমরে হালকা বেল্টের মতো সিল্কের বাউ লাগানো, যা তার শরীরের সৌন্দর্য ঢেকে রেখেও যেন নতুন মাত্রা দিচ্ছে। তার চুল কোমর ছাড়িয়ে নিচে নেমে এসেছে ঢেউ খেলানো কার্লে। কপালের সাদা স্টোনের টিপ। চোখে হালকা স্মোকি শেড, ঠোঁটে ন্যুড পিঙ্ক লিপশেড। পুরো সাজটা এমনভাবে করা, যেন রাজসিকতা আর নম্রতা মিশে আছে।
স্টুডিওতে উপস্থিত সকলেই একবার তাকিয়ে দ্বিতীয়বার চোখ ফেরাতে পারছে না। একজন মেকআপ আর্টিস্ট হঠাৎ বলল,
“আনবিলিভেবল! শি লুকস লাইক শি জাস্ট ওয়াক্ট আউট অফ আ মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং।”
পাশ থেকে অন্য একজন বলল,
“মিসেস ইন্ডিয়া হয়েও এমন পোশাকে এমন গ্রেস, রেয়ার কম্বিনেশন।”
সুমু চোখ নামিয়ে হালকা হাসল। তার ভেতরে আজ শুধু সৌন্দর্য নয়, আছে এক পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস। আর আজকের সাজ? তা যেন শুধু শরীরের জন্য নয়—তার চরিত্র, তার আদর্শ, তার শক্তির প্রতিচ্ছবি।
পেছন থেকে একজন হেয়ার স্টাইলিস্ট বলল,
“ম্যাম, আপনি রেডি তো? পাঁচ মিনিটের মধ্যেই মিডিয়া ব্রিফিং রিহার্সাল শুরু হবে।”
সুমু চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। হালকা গলায় বলল,
“হুম, রেডি! নাতাশা?”
নাতাশা পাশে এসে দাঁড়াল।
“ইয়েস, ম্যাম!”
“শো’য়ের আগে একটা পাঁচ মিনিটের সাইলেন্স দরকার আমার। একদম নো সাউন্ড, নো ওয়ার্ডস।”
নাতাশা মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক আছে, ম্যাম। দরজা আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। এই সকলে বাহিরে চলো।”
সকলে বাহিরে চলে গেল। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে এলো। সুমু চোখ মেলে তাকাল আয়নার দিকে। সেই পুরোনো সুমু আজকের আলো, ক্যামেরা, নামের ঝলকানির নিচে কিছুটা যেন হারিয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা আগুন জ্বলছে তার, যেন সময় কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে। সুমু আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের চোখে প্রশ্ন খুঁজল। আজকের এই পরিপূর্ণতা, এই সাজ, এই প্রশংসা—সবকিছুর মাঝেও কোথায় যেন একটা ফাঁকা জায়গা থেকে গেছে। অনেক অর্জনের মাঝখানে, বড় কিছু না পাওয়ার হালকা দাগ স্পষ্ট তার চোখে।
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল। জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকাল। শহরের আকাশ এখন মেঘে ছেয়ে গেছে। দূরে বজ্রপাতের হালকা শব্দ শোনা যাচ্ছে, বাতাসে ধুলোমাখা গন্ধ—যেটা হয় বৃষ্টির ঠিক আগে। নিচের রাস্তায় গাড়ির ভিড়, মানুষ, হর্ন, গাড়ি ছুটে চলা। কিন্তু তার দৃষ্টি এই শহরের গায়ে নয়, বরং শহরের ওপারে কোনো অদৃশ্য অনুভূতির দিকে।
ফোনটা ধীর ভাইব্রেট করে উঠল। সে পেছনে ফিরে তাকাল না। জানালার দিকে তাকিয়েই নিজের মনে বলল,
“আমি আজ মিসেস ইন্ডিয়া, হ্যাঁ? কিন্তু কোনো এক বিকেলের অপেক্ষা এখনো রয়ে গেছে আমার ভিতরে।”
আবার ফোনটা ভাইব্রেট করল। এবার সে ধীরে পেছনে ঘুরে এসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, ‘রায়য়ান চৌধুরী কলিং…’ একটু থেমে সে রিসিভ করল।
“হ্যালো!”
ওপাশ থেকে রায়য়ানের গলা ভেসে এলো,
“তুমি জানো, আজকের সন্ধ্যাটা শুধু তোমার না, আমারও। আমি অপেক্ষা করব, যতোক্ষণ তোমার সময় লাগে। তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
সুমু কিছু বলল না। ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি খেলে গেল তার। সে আবার জানালার দিকে ফিরে তাকাল। তখনই ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। নাতাশার গলা ভেসে এলো,
“ম্যাম, টাইম ওভার! ইউ হ্যাভ টু লিভ ফর দ্য মিডিয়া ব্রিফিং।”
সুমু একটা গভীর শ্বাস নিল। গলার গয়নাটা একটু ঠিক করে, মুখে হালকা দৃঢ়তা এনে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল। সামনের করিডরে আলো, ক্যামেরা, সিকিউরিটির ব্যস্ততা। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেও আজকের সুমুর পায়ের শব্দ যেন এক অদৃশ্য আত্মবিশ্বাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে হাঁটতে থাকল, সামনে এক নতুন সন্ধ্যার দিকে।
ভেন্যুটা গ্ল্যামার আর রাজকীয়তায় ঠাসা। চারপাশে ঝলমলে লাইটিং, মঞ্চের ব্যানারে লেখা, ‘মিসেস ইন্ডিয়া গ্রান্ড ফিনালে’। পেছনে ব্যস্ত মিডিয়া কর্মীরা, সামনের সারিতে চেয়ারে বসে আছে সাংবাদিকরা। ক্যামেরা রেডি, লাইভ স্ট্রিম অন, দর্শকেরা অপেক্ষায়।
সুমুকে স্পেশাল গেস্ট রুমে রাখা হয়েছে। সেখানে ছোট একটা প্রেস কনফারেন্স হবে। এই কনফারেন্সের আজকের অ্যাওয়ার্ড শো’র আগে পাবলিক করা হবেনা। সুমু চুপচাপ মিডিয়ায় সামনে বসে আছে, পাশে দাঁড়িয়ে আছে নাতাশা।
একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করল,
“ম্যাম, ইউ আর ট্রেন্ডিং অল ওভার দ্য কান্ট্রি রাইট নাও। ইউ আর গোইং টু উইন দা মিসেস ইন্ডিয়া ক্রাউন টুডে। হাউ ডাজ ইট ফিল?” (ম্যাম, আপনি এই মুহূর্তে সারা দেশে ট্রেন্ডিং। আপনি আজ মিসেস ইন্ডিয়ার মুকুট জিতবেন। এরজন্য কেমন অনুভব হচ্ছে আপনার?)
সুমু মৃদু হেসে বলল,
“ইট ফিলস রিয়েলি গুড। লাইক আ ড্রিম টার্নিং ইনটু রিয়ালিটি। আই অ্যাম ট্রুলি গ্রেটফুল।” (ভালো লাগছে, অবশ্যই। এটা তো একটা স্বপ্ন, আর সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব হয়েছে।)
অন্য একজন সাংবাদিক বলল,
“ইওর লুক টুনাইট ইজ বিইং কমপেয়ার্ড টু আ মুঘল মিনিয়েচার পেইন্টিং। আনবিলিভেবল এলিগেন্স। হোয়াট ওয়াজ দা ইনস্পিরেশন?” (আপনার আজকের সাজকে মুঘল মিনিয়েচার চিত্রকলার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। অবিশ্বাস্য এক এলিগ্যান্স। এর পেছনে অনুপ্রেরণা কী ছিল?)
সুমু একটু ভেবে বলল,
“মেবি ইট ওয়াজ আ ডিজায়ার টু গো ব্যাক টু মাই রুটস। ইন মাই ড্রেস, মাই স্টাইলI ট্রাইড টু কেরি আ বিট অফ মাই কালচার।” (সম্ভবত শিকড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার একটা চেষ্টাই ছিল। আমার পোশাক, সাজ, সবকিছুতেই আমি আমার সংস্কৃতির ছায়া রাখতে চেয়েছিলাম।)
“ইউ ওয়ার অলওয়েজ আ মিডিয়া-শাই পার্সন। হাউ ডিড ইউ ব্রিং দিস কনফিডেন্স?” (আপনি তো একজন মিডিয়া শাই পার্সন ছিলেন। কীভাবে নিজেকে এমন আত্মবিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে এলেন?)
“আই অ্যাম স্টিল মিডিয়া-শাই, বাট টুডে আই স্টুড ফর মাইসেলফ। অ্যান্ড দা কারেজ কেম ফ্রম এভরি নো আই হ্যাড টু ফেস ইন মাই পাস্ট।” (আমি তো এখনো মিডিয়া শাই, তবে আজ আমি নিজের হয়ে দাঁড়াতে এসেছি। সেটা করার সাহস এলো আমার বিগত জীবনের প্রতিটি না থেকে।), সে একটু থেমে আবারও বলল, “ইয়েস, আই অ্যাম মিসেস ইন্ডিয়া টুডে। বাট দিস ক্রাউন উইল অলওয়েজ রিমাইন্ড মি দ্যাট সামটাইমস, ইভেন আফটার গেইনিং এভরিথিং সামথিং স্টেইস আনফিল্ড।” (হ্যাঁ, আমি আজকের মিসেস ইন্ডিয়া। কিন্তু এই মুকুটের ওজন আমাকে প্রতিদিন মনে করিয়ে দেবে, সবকিছু পাওয়ার পরেও কোথাও কোথাও না পাওয়ার রেশ থেকে যায়।)
সাংবাদিকরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কেউ কেউ মুগ্ধ। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ চলতেই থাকল। হঠাৎ একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করে বসল,
“রিউমার্স আর রায়য়ান চৌধুরী ইজ হিয়ার টুনাইট। এনি স্পেশাল কানেকশন?” (গুঞ্জন আছে, রায়য়ান চৌধুরী আজ এখানে আছেন। কী কোনো বিশেষ সম্পর্ক আছে?)
সুমু একটু অস্বস্তি পড়ল। তবুও সে ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল,
“রায়য়ান ইজ অ্যা ফ্রেন্ড। আ ভেরি গুড ফ্রেন্ড। আই হ্যাড সাপোর্ট ফ্রম সো মেনি পিপল ইন মাই জার্নি। হি ইজ ওয়ান অফ দেম। মেবি অ্যা লিটল স্পেশাল, বিকজ হি নেভার লেফট, নট ইভেন ফর আ সেকেন্ড।” (রায়য়ান চৌধুরী আমার বন্ধু। একজন ভালো বন্ধু। আমি যতোদূর এসেছি, সেই পথচলায় অনেক মানুষ পাশে ছিলেন। ও তাদের একজন। তবে একটু স্পেশাল বলা চলে। কারণ, সে আমাকে প্রতিটা সেকেন্ডে সাহায্য করেছে।)
“বাট দ্য ওয়ে হি লুকস অ্যাট ইউ, ইট লুকস মোর দ্যান জাস্ট ফ্রেন্ডশিপ, রাইট?” (তবে সে যেভাবে আপনার দিকে তাকায়, সেটা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু মনে হয়।)
সুমু এবার একটু থামল, গলা শক্ত করে বলল,
“নট এভরিথিং ইউ সি ফ্রম দ্য আউটসাইড ইজ হাউ ইট রিয়ালি ইজ। হু আই অ্যাম টুডে, ইজ বিকজ অফ মাই ওন জার্নি, নট সামওয়ান এলস’স শ্যাডো।” (অনেক কিছু থাকে যা বাইরে থেকে যেভাবে দেখা যায়, বাস্তবে তা ঠিক সেভাবে হয় না। আমি আজ যা হয়েছি, সেটা আমার নিজের জার্নি। কারো ছায়ায় নয়।)
এরমধ্যেই একজন সাংবাদিক বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ, সুমাইয়া জাহান। উই আর প্রাউড টু হ্যাভ ইউ অ্যাজ দ্য ফেইস অফ মিসেস ইন্ডিয়া।” (ধন্যবাদ, সুমাইয়া জাহান। মিসেস ইন্ডিয়া-এর মুখ হিসেবে আপনাকে পেয়ে আমরা গর্বিত।)
সুমু ধীরে মাথা নিচু করে নম্র অভিবাদন জানালো। আবারও একজন সাংবাদিক কৌতুহলবশত প্রশ্ন করল,
“ইউ নেভার টক্ড অ্যাবাউট ইওর পার্সোনাল লাইফ। রায়য়ান ইজ ইয়োর ফ্রেন্ড, বাট ইন ফিউচার, উইল ইউ টু বি ইন আ রিলেশনশিপ?” (আপনি কখনও আপনার পার্সোনাল লাইফ সম্পর্কে মুখ খোলেন নি। রায়য়ান চৌধুরী আপনার ফ্রেন্ড। কিন্তু ফিউচারে কি আপনারা অন্য কোনো সম্পর্কে জড়াবেন?)
“অ্যাবসোলিউটলি নট। হি’স জাস্ট আ ভেরি গুড ফ্রেন্ড অব মাইন, সো দেয়ার’স নো কোয়েশচন অব থিংকিং এনিথিং বিয়ন্ড দ্যাট ইন দ্য ফিউচার।” (অবশ্যই না। সে শুধুই আমার খুব ভালো বন্ধু। তাই ফিউচারে এর বাহিরে কিছু ভাবার প্রশ্নই আসেনা।)
“দেন হু ইজ বিহাইন্ড ইয়োর সাকসেস? হু ইজ দ্যাট স্পেশাল পার্সন?” (আজকের আপনার এই সাফল্যতার পেছনে কে কে আছে?)
সুমু আলতো হেসে বলল,
“দেয়ার আর মেনি, বাট দেয়ার ইজ ওয়ান স্পেশাল পার্সন। ইফ হি ডিডন্ট কাম ইনটু মাই লাইফ, আই উডন্ট হ্যাভ বিন হিয়ার টুডে।” (অনেকেই আছে। তবে স্পেশাল একজন আছে। যে আমার জীবনে না আসলে আমি আজ এই সাফ্যলতার মুখ দেখতাম না।)
“ম্যাম! ইফ ইটস নট রায়য়ান, আর ইউ ইন আ রিলেশনশিপ উইথ সামওয়ান এলস?” (ম্যাম! যেহেতু আপনি বললেন রায়য়ান চৌধুরী আপনার শুধু ভালো বন্ধু। তাহলে আপনি কি অন্য কারো সাথে রিলেশনশীপে আছেন?)
“নো!”
“দেন হু ইজ দ্যাট স্পেশাল ওয়ান, ম্যাম?” (তাহলে আপনার সেই স্পেশাল মানুষটা কে ম্যাম?)
সুমু চুপ করে রইল। নাতাশা তার ম্যামের অস্বস্তি বুঝতে পেরে গার্ড ডেকে সকলকে বাহিরে নিয়ে যেতে বলল।
অ্যাওয়ার্ড শোর স্টেজে সবকিছু রেডি। সোনালি আলোর ঝলকানিতে ঝলমল করছে পুরো মঞ্চ। ক্যামেরার লেন্স ঘুরছে এক কোণ থেকে আরেক কোণে। সাংবাদিকরা একের পর এক ক্লিক করে যাচ্ছে ছবি। সঞ্চালক একবার ঘড়ির দিকে তাকায়, আরেকবার আয়োজকদের দিকে। আজকের স্পেশাল গেস্ট নাকি আদারস কান্ট্রির কোনো নাম্বার ওয়ান নাম করা হিরো। কিন্তু কেউ তার নাম এখন পর্যন্ত জানে না। চারপাশে গুঞ্জন—কে হতে পারে? পেছনের গসিপ কনফার্ম করছে, প্রথমে একজন নামী বিজনেসম্যানে নাম ঠিক হয়েছিল, সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি নিজেই নাকি আয়োজকদের আগেই হ্যাঁ বলেছিল। অথচ গত রাতেই ইনভিটেশন ক্যান্সেল করে দেন তিনি। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো কারণ নেই। তারপর থেকেই শুরু হয় বিকল্প স্পেশাল গেস্ট খোঁজার। তড়িঘড়ি করে আয়োজক কমিটি কাউকে হায়ার করে, যিনি হতে চলেছেন আজকের রাতের সবচেয়ে বড় চমক। তবে তার পরিচয় রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ গোপন।
একজন সাংবাদিক তার ক্যামেরাম্যানকে বলল,
“শোনা যাচ্ছে, আজকের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আসছেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সেলিব্রিটি। কিন্তু অবাক করা বিষয়—তার পরিচয় এখনো পর্যন্ত মিডিয়ার কাছে প্রকাশ করা হয়নি। কেউ বলছে, তিনি একজন সাউথ কোরিয়ান সুপারস্টার। আবার কেউ গুজব ছড়াচ্ছে, মিডল ইস্টের এক রহস্যময় বিজনেস আইকন আজ সবার সামনে আসবেন।”
স্টেজের ঠিক পাশের ডান কোণটায় বসে আছেন রায়য়ান চৌধুরী। কালো ভেলভেট ব্লেজার, ভেতরে সাদা হাফ কলার শার্ট। মুখে চাপা গম্ভীরতা। ক্যামেরা তার দিকেও ঘুরে যাচ্ছে বারবার। তবুও তার দৃষ্টি বারবার গিয়েই পড়ে হলরুমের দরজার দিকে— যেখান দিয়ে আজ আসবে সেই মানুষটা, যার জন্য হয়তো আজকের পুরো আয়োজন।
হঠাৎ মাইক্রোফোনে ঘোষণা দিল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান! দি মোমেন্ট ইউ অল হ্যাভ বিন ওয়েইটিং ফর, দি গ্রান্ড রিভিল অফ আওয়ার স্পেশাল গেস্ট।
হল অন্ধকার হলো। স্টেজে কালো পর্দার ওপাশে একটা ছায়া দেখা যাচ্ছে। রায়য়ানের সেদিকে কোনো মন নেই। সে অপেক্ষা করছে তার ভালোবাসার মানুষটির। স্টেজের আলো ধীরে ধীরে ফিরে এলো। কালো ছায়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো স্লিম, হাইটেড, আত্মবিশ্বাসী একজন পুরুষ— আরিয়ান চৌধুরী। পরনে ক্লাসি ব্ল্যাক ডাবল-ব্রেস্টেড টেইলারড স্যুট। ভেতরে হালকা গ্রে সাটিন শার্ট, কলার খোলা। স্যুটের কাঁধে গোল্ড অ্যাকসেন্ট, হাতে একটি ক্রিস্টাল স্টোন ব্রোচ। চোখে পড়ার মতো সিল্কি ব্রাউন হেয়ার, সেগুলো সামনে সামান্য পড়ে আছে। হালকা জেল দিয়ে স্লিক করা সাইড, কিন্তু একেবারেই ন্যাচারাল ফ্লো। ফর্সা ত্বক, নাকটা শার্প, ঠোঁটে লিপটিন্টের মতো গাঢ় পিংক শেড। চোখে হালকা ব্রাউন আইশ্যাডো আর লেন্স।
উপস্থিত প্রতিটা মেয়ের দৃষ্টি একবার আরিয়ান তো একবার রায়য়ানের দিকে। কাকে ছেড়ে কাকে দেখবে তারা। মাইক্রোফোন হাতে একজন বলল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, প্লিজ ওয়েলকাম মিস্টার আরিয়ান চৌধুরী! অ্যান্ড টু আওয়ার অ্যাওয়ার্ড শো, কামিং অল দ্য ওয়ে ফ্রম ওভারসিজ!”
রায়য়ানের টোনক নড়ল। সে ফোন থেকে মাথা তুলে স্টেজের দিকে তাকাল। স্টেজের ওপর আরিয়ানকে দেখে রায়য়ান কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। এই তিন বছরে হয়তো সে সুমুকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে সাহস করে সুমুকে নিজের মনের কথা বলতে পারেনি। কিন্তু সুমু তার কাছে আছে ভেবে সে মানসিক শান্তি পেত। কিন্তু আজ সুমুর সব অতীত আবারও সুমুর সামনে আসতে চলেছে। রায়য়ান কি করবে বুঝতে পারল না।
আরিয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি আবারও মাইক্রোফোনে বলল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, প্লিজ পুট ইউর হ্যান্ডস টুগেদার ফর দ্য ওনলি, দ্য গ্রেসফুল, সুমাইয়া জাহান।”
স্টেজের হঠাৎ আলো নিভে গেল। পুরো হল আবারও অন্ধকার হলো। হলজুড়ে করতালির ঝড়। কিন্তু সেই শব্দের মাঝেও যেন সময় থমকে গেল আরিয়ান চৌধুরীর জন্য। তার ঠোঁটের কোনে জমে থাকা হাসিটা যেন মুহূর্তেই নিভে গেল। অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল নরম একটা সোনালি স্পটলাইট। স্টেজের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সুমু। সমস্ত ক্যামেরা সুমুর দিকে ফোকাস করা হলো। সকলে আজকের সুমুকে দেখে আবাক হয়ে গেল। মুখে হেবি মেকআপ নেই। সে প্রথম থেকে এই নারী নিজেকে ন্যাচরাল আর শালীন লুক দিয়ে সকলের সামনে এসেছে। কি অপরূপ সৌন্দর্য এই নারীর। সকলে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে। আরিয়ান এখন নিজের মধ্যে নেই। তেমনই থমকে গেছে রায়য়ানের হৃদয়।
রায়য়ান তাকিয়ে রইল সুমুর দিকে। আরিয়ান ধীরে ধীরে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। মাইক্রোফোন এখন তার হাতে। তার চোখের পাতা কাঁপছে।
সুমু উঠে এলো স্টেজের মাঝখানে। স্টেজে বসানো শৌখিন সিংহাসনের চেয়ারটিতে তাকে বসতে বলা হলো। তবে সে না বসে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি গিয়েই পড়ল আরিয়ানের দিকে। ঘোষক আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলল,
“মিস্টার আরিয়ান চৌধুরী, উইল নাউ হ্যান্ড ওভার দ্য ক্রাউন টু আওয়ার প্রেশিয়াস উইনার, মিসেস ইন্ডিয়া—সুমাইয়া জাহান।”
পুরো হল জুড়ে নিস্তব্ধতা। আরিয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সুমুর দিকে। সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ান তার খুব কাছে এসে থামল। হাতে ধরা মুকুটটা সে ধীরে ধীরে সুমুর মাথায় পড়িয়ে দিল। কিন্তু সুমু একটুও নড়ল না। সে হাসল না। আরিয়ান সুমুর দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো হাজারো কথা জমে আছে তার মধ্যে। ঘোষক আবার বলল,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, গিভ ইট আপ ফর আওয়ার প্রেশিয়াস উইনার, মিসেস ইন্ডিয়া—সুমাইয়া জাহান।”
হলজুড়ে করতালির শব্দ উঠল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ছুটলো একের পর এক। ঠিক তখনই হলরুমের সামনের দরজায় বিকট এক শব্দ হলো। সকলের মাথা ঘুরে গেল সেই দিকে। ক্যামেরার লেন্স তৎক্ষণাৎ সেদিকে ঘুরে গেল। সুমু আর আরিয়ানও তাকাল।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে দশ-বারো জন লোক। তাদের পেছনে আলোর ফলে শুধু ছায়াগুলো দেখা যাচ্ছে। তাদের ঠিক সামনে একজন পুরুষ পকেটে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার মুখ স্পষ্ট নয়—তবে তার ভঙ্গিতে ছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
সুমুর বুক ধড়ফড় করে উঠল। এই অভয় সে চেনে, খুব ভালো করেই চেনে। ঠিক তখনই অন্ধকারের ফাঁক দিয়ে সুরের মতো লম্বা করে টেনে ভেসে এলো একটা ডাক,
“সুইটহার্টটটটটট!”
নামটা টেনে যেন সূরের মতো করে উচ্চারণ করা হলো। সুমু আতঙ্কে দু’পা পিছিয়ে গেল। লোকটা ধীরে ধীরে আলোয় এগিয়ে এলো। হলজুড়ে ফিসফাস, ক্যামেরার শাটার চলতে থাকল। লোকটির মুখ স্পষ্ট হলো— শেরাজ খান। ওমানের নাম্বার ওয়ান বিজনেস টাইকুন। তার সাথেই আজ মঞ্চে ঢুকেছে আলোড়ন। মিডিয়া তৎক্ষণাৎ তাকে ঘিরে ধরেছে। মেয়েরা তাকিয়ে আছে তার দিকে মন্ত্রমুগ্ধ চোখে। কিন্তু শেরাজ কারো দিকে তাকাল না। সে সোজা হেঁটে এলো সুমুর দিকে।
রায়য়ান উঠে এলো স্টেজের ওপর। আরিয়ান রায়য়ানকে দেখে আরও একধাপ আবাক হয়ে তাকাল। শেরাজ এসে সুমুর সামনে দাঁড়াল। কোনো কথা না বলে, কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে সে সুমুর হাতটা ধরে বলল,
“অনেক উড়েছো সোনা, এবার চলো!”
মিডিয়ার মধ্যে হুলস্থুল পড়ে গেল। সবার একটাই প্রশ্ন,
“মিস্টার শেরাজ খান, আপনি কি সুমাইয়া জাহানের পরিচিত? তিনি কী আপনার স্ত্রী? উনি তো কখনো তার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে কিছু বলেননি। আপনি হঠাৎ তাকে নিয়ে যাচ্ছেন কেন?”
শেরাজ চুপ। মিডিয়া এগিয়ে এলো, মাইক্রোফোন ঠেলে দিল তার মুখের সামনে। সে হাসল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা একটা দৃঢ় হাসি তার। হঠাৎ, সে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, সুমুকে কাছে টেনে আনলো। সবার সামনে তার ঠোঁট গভীরভাবে ছুঁয়ে গেল সুমুর ঠোঁটে। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড—তারপর সে নিজের হাত তুলল। তার আঙুলে এক চকচকে সাদা রত্নজড়িত আংটি। একই রকমের আংটি সুমুর হাতেও। ভরা হলরুমে, লাইভ ক্যামেরার সামনে—শেরাজ ঘোষণা না করেও বুঝিয়ে দিল, এই নারী তার স্ত্রী।
রায়য়ান মুষ্টিবদ্ধ হাতে দাঁড়িয়ে রইল। আরিয়ান অস্পষ্ট চোখে তাকিয়ে রইল সেই দৃশ্যের দিকে। হলজুড়ে যেন এখন নিঃশ্বাস ফেলারও শব্দ নেই। শেরাজ সুমুকে কাঁধে তুলে নিল। সবার চোখের সামনে, লাইভ ক্যামেরার মধ্য দিয়ে— শেরাজ সুমুকে নিয়ে হলরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রায়য়ান এগিয়ে যেতে গেলেই, শেরাজের গার্ডরা তাকে আটকে দিল।
শুনশান রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলছে। সুমু চুপ করে বসে আছে। হঠাৎ একটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে গাড়ি দাঁড় করানো হলো। শেরাজ নামার আগে সুমু গাড়ি থেকে নেমে ছুটটে শুরু করল। শেরাজ ধীরে গাড়ি থেকে নামল। সুমু কিছু দূর যেতেই কিছুতে বেঁধে পড়ে গেল। শেরাজ আস্তে ধীরে এগিয়ে এলো। সুমু পেছন ঘুরে তাকাল। শেরাজ মাঠের ওপর বসে ঝুঁকে পড়ল সুমুর ওপর। সুমু দূরে সরতে গেলে, শেরাজ তার পা ধরে টান দিল। সুমু পুরোপুরি শুয়ে পড়ল ঘাসের ওপর। শেরাজ তার দু’পাশে হাত দিয়ে সুমুকে ঘিরে রেখে বলল,
“কি চাইছো, তিনবছরের খিদে এই খোলা আকাশের নিচে মিটিয়ে নেই?”
সুমু কোন কথা না বলে তাকিয়ে রইল শেরাজের দিকে। সে শেরাজকে ঠেলে উঠে দাঁড়াল। দূরে সরতে গেলে শেরাজ আবারও তাকে কাছে টেনে নিল। সুমুর হাত শেরাজের কোমর ছুঁতেই সে শেরাজের কোমরের পেছন থেকে গান বের করে শেরাজের বুকে তাক করল। এই অবস্থায় শেরাজ আলতো হেসে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সুমুকে।
“কারো কাছে আমি গ্যাংস্টার, কারো কাছে আমি সিক্রেট মাফিয়া, কারো কাছে আমি বিজনসম্যান। কিন্তু আমার বউয়ের কাছে আমি একজন অসভ্য, র্নিলজ্জ, ঠোঁটকাটা, লাগামহীন পুরুষ, তাই না বউ?
সুমু দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কারো কাছে আমি লেডি কিলার, কারো কাছে মাফিয়া কুইন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, রিয়েলে আমি একজন বিজনেস ওম্যান। আমার রাগের জন্য আমাকে বাকি দু’টো নামে ডাকা হয়। আমি কিন্তু আপনার মতো রক্তে হাত ভিজায়নি।”
“তাহলে আজ ভিজিয়ে ফেলো।”
সুমু ছটফট করতে করতে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে! আমি বাসায় ফিরব।”
সুমুর ছটফট করা দেখে শেরাজ হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“সুমু, শান্ত হয়ে দাঁড়াও!”
শেরাজের বারণ শুনে সুমু আরও ছটফট করা শুরু করল। এতোদিন পর বউকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেয়ে বউয়ের এমন ছটফটানি সহ্য হলো না শেরাজের। সে ধমকে বলল,
“সুমু, স্টপ!”
সুমু ঠেলে দিয়ে গর্জে উঠে বলল,
“আমাকে ছাড়ুন মিস্টার খান! আমি আপনাকে আর আপনার এই সো কলড রাগকে ভয় পাই না।”
শেরাজ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে সুমুকে আরও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“মিস্টার খান? ওপস্! কল মি ড্যাডি প্রিন্সেস। আর তোমাকে কে বলেছে, আমাকে বা আমার রাগকে ভয় পেতে? আমি তো চাই তুমি ভয় পাও আমার স্পর্শকে, আমার আদরকে, আমার ধীরে ধীরে কাছে আসাকে। এমনভাবে, যেভাবে একজন নারী কাঁপে একমাত্র তার পুরুষের ভালোবাসায়। ভয় নয় প্রিন্সেস! আমি চাই তুমি আসক্ত হও— আমার এই পাগলামিতে, আমার তোমাকে কাছে পাবার নেশায়, আমার তোমাকে ব্যাড টাচ করায় আর আমার পাপী আদরে।”
সুমু শেরাজকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার আগেই শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেয়ে সুমু নাতাশাকে কল করল। নাতাশা কল রিসিভ করতেই সুমু বলল,
“নাতাশা, তুমি আমার লোকেশন দেখে একটা গাড়ি পাঠাও, প্লিজ।”
শেরাজ আর কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে আপাতত যেতে দিল তার প্রেয়সীকে। ব্যাড মিটতো গভীর রাতে করতে সে। আপাতত তার বউয়ের মেন্টালি পিপারেশন দরকার।
রাত বেশ গভীর। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। আকাশের গর্জনে বারবার ঘর কেঁপে উঠছে। বাড়ি নিঃস্তব্ধ। আজ সবাই চলে গেছে সুমুর ইচ্ছেতেই। সে চেয়েছিল একটু নিজের মতো সময় কাটাতে। বিছানায় ঘুমিয়ে সে। হঠাৎ এক বিকট বজ্রধ্বনিতে লাফিয়ে উঠে বসল। শরীর ঘামে ভেজা, শ্বাস অস্থির। বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাস হাতে নিতে গিয়ে দেখল, গ্লাসটা খালি। বৃষ্টির শব্দে পুরো ঘর কেমন শূন্য আর সজাগ মনে হচ্ছে।
সে ধীরে বিছানা ছেড়ে নীচে নামল পানির জন্য। নিচে এসে রান্নাঘরের দিকে যেতে না যেতেই কোনো কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ পেল। সে থমকে দাঁড়াল। তার শরীরে হিম ঠাণ্ডা একটা স্রোত নেমে এলো। ধীরে ধীরে শব্দের উৎসের দিকে এগোতে লাগল। দেয়ালের কোণ ঘেঁষে এক ছায়া নড়ে উঠল। ভেজা জানালার কাচে সেই ছায়ার প্রতিবিম্ব স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে পেছন ঘুরতেই সেই মুখোশ পরা লোকটা সোজা তার সামনে এসে দাঁড়াল। ভয়ে পিছতে গিয়ে মেঝেতে পড়ে গেল সে। তবুও বসা অবস্থায় সে পিছিয়ে যেতে লাগল। লোকটি ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। সুমুর চোখ বড় হয়ে গেল।
“কে… কে আপনি?”
কোনো উত্তর এলো না। সে সুমুর সামনে বসে ঝুঁকে পড়ল সুমুর মুখের সামনে। হঠাৎ করে সে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল। সুমুর একগোছা চুলে ছুঁয়ে দিল তার আঙুল। সুমু কেঁপে উঠল, শ্বাস আটকে এলো গলায়। সে দুহাত জড়ো করে অনুরোধ করে বলল,
“আপনি কে? আমাকে ছেড়ে দিন। কেনো এভাবে আমার পেছনে পড়ে আছেন?”
লোকটি ফিসফিস করে বলল,
“তিনবছর পর কাছে এলাম। এতো তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেই কীভাবে, সুইটহার্ট?”
সুমুর মুখ হাঁ হয়ে গেল।
“আপনি?”
শেরাজ মুখোশ খুলে ফেলল। সুমু রাগ দেখিয়ে বলল,
“তিন বছর পর কী শুরু করেছেন আপনি?”
“তিনবছর? কীসের তিনবছর?”
“কীসের তিনবছর মানে? আমরা আলাদা ছিলাম তিনবছর। আমাদের দেখা হয় না তিন বছর।”
“সেটা হয়ত তোমাকে ক্ষেত্রে। বাট আমার ক্ষেত্রে না।”
“মানে?”
“মানেটা তোমার গলার আর বুকের ওপরের চিহ্নটা বলে দিবে।”
সুমু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“এগুলো আপনি করেছেন?”
“হুম!”
“কেনো?”
“আমরা যে তিনবছর আলাদা ছিলাম না, তার প্রমাণ হিসাবে এগুলো।”
“আপনি আমাকে চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে খুঁজে বের করেছিলেন?”
“নিজেই তো ইন্ডিয়াতে পাঠালাম। তাহলে খোঁজার প্রশ্ন আসছে কেনো?”
সুমুর মনে পড়ল সেইরাতের সেই লোকটার কথা। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সেদিন রাতে আপনি ছিলেন?”
“হুম!”
“এসবের মানে কি?”
“তুমি উড়তে চাইলে, আমি উড়তে দিলাম।”
সুমু আর কিছু বলার ভাষা পেল না। এই মুহুর্তে সে আর প্রশ্ন করতেও চাইছেনা। তার মাথা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যেতে চাইছে। সে চুপচাপ উঠে রুমে এলো। শেরাজও এলো তার পিছু পিছু। সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কাল সব প্রশ্নের উত্তর নিব, এখন যান।”
শেরাজ তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে বলল,
“যাব মানে?”
“তো কি এখানে থাকবেন?”
“অবশ্যই!”
“আমি আপনার সাথে বেড শেয়ার করব না।”
“তাহলে নিজেকে শেয়ার করে নাও।”
“এই আপনি যান তো।”
“আর একবার যেতে বললে, আজ ফুল নাইট ভয়ংকর কিছু ঘটবে তোমার সাথে।”
সুমু শেরাজকে সরিয়ে দিতে গেলে শেরাজ সুমুর গলা ধরে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট মিশিয়ে দিল—তা হঠাৎ নয়, বরং যেন বছরের পর বছরের অদম্য যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। সেই চুমুটা ছিল দীর্ঘ, গাঢ় আর যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি। গলা থেকে আস্তে করে হাত সরিয়ে সুমুর ঘাড় আর কোমর আকঁড়ে ধরল সে, যেন সে এক ইঞ্চিও সরে যেতে দিলে সব ভেঙে যাবে, সুমু দূরে সরে যাবে। সুমু প্রথমে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করল। সে হাত দিয়ে শেরাজকে ঠেলে দিতে চাইল, কিন্তু শেরাজ তাকে বন্দি করে রাখল নিজের বাহুতে। ঠোঁটের আর দাঁতের ঘর্ষণে ধীরে ধীরে কেটে গেল সুমুর নিচের ঠোঁট। নরম ঠোঁট ছিঁড়ে একফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এলো। সুমুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে ধাক্কা দিতে চাইল, কিন্তু শেরাজ তার ঠোঁট থেকে মুখ না সরিয়ে বরং আরও গভীর চুমুতে ডুবে গেল—ঠিক যেমন কেউ নোনাজলে ডুব দিচ্ছে, তবুও উঠছে না, যেন তলিয়ে যেতেই চায়। শেরাজের নিঃশ্বাস গরম হয়ে ঘন ঘন পড়ছে সুমুর গালে, গলায়। সুমুর বুকের ধকধকানি যেন বাতাসে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। চুমু শেষে শেরাজ আস্তে করে সরে গিয়ে সুমুর কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“তিনটা বছর আমার ঠোঁটে তোমার ছোঁয়া লাগেনি। তুমি যেদিন চলে গেলে, আমার প্রতিটা রাত এই রকম তৃষ্ণায় পুড়েছে, সুইটহার্ট। আজ শুধু প্রমাণ দিলাম—তুমি আমার, সবসময় ছিলে, আছো, আর থাকবে।”
সুমু কিছু বলতে চাইলেও গলার কাছে এসে আটকে গেল। ঠোঁটে কাঁপুনি, রক্তের হালকা ধারা তার চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে নামছে। শেরাজ রক্তের ফোঁটাটা আঙুল দিয়ে তুলে দেখল। তারপর তা নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে বলল,
“আমি পুরোটায় আজ তৃষ্ণার্ত।”
সুমু অবাক, হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। সে জানে—এই পুরুষটা তাকে ভালোবাসে, কিন্তু তার ভালোবাসার ভাষা এতটা অগ্নিময় যে তা কোনো নিয়ম মানে না। হঠাৎ তার মাথায় মধ্যে পুরানো ভাবনা চড়া দিয়ে উঠল। সে রাগ দেখিয়ে বলল,
“ছাড়ুন আমাকে! আপনি ভাবলেন কীভাবে, আপনার এই সামান্য কিসে আমি ভয় পেয়ে যাব?”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“তুমি ভাবলে কীভাবে, আমি তোমাকে শুধু সামান্য কিস করেই ছেড়ে দেব? আজ রাতটা তোমার সহ্যশক্তির পরীক্ষা। লং টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হবে আজ। আজ ইনিংস ডেক্লেয়ার করব না, যতক্ষণ না তুমি হাঁপাতে হাঁপাতে বলো, খান সাহেব! আর না, প্লিজ। তুমি কাঁদবে, কিন্তু সেটা হবে খুশির কান্না। তোমার নখ আমার পিঠে আঁচড় কাটবে। আর আমি সে আঁচড়ের সামান্যতম ব্যথাকে অনুভব করে গুনব সেই দাগগুলো। একটা, দুটো যতক্ষণ না রাত ফুরায়। নাউ, দশ সেকেন্ড সময় দিলাম। তোমার হাত, মন আর শরীর—তিনটাকেই প্রস্তুত করো বেইব।”
বাহিরে বৃষ্টির বেড়েই চলেছে। সুমুর বুকের ভেতর যেন বাজ পড়ল। সে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ সরাতে পারল না শেরাজের চোখ থেকে। ওই চোখ থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে দাবানলের মত এক দৃষ্টি—যার মাঝে ভালোবাসা আছে, অভিমান আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে মালিকানা। শেরাজ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। হাঁটার শব্দটা এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হলো, যেন কোনো শিকারি তার নিশানা ধরেছে। সুমু পিছু হটতে থাকল এক পা দুই পা করে। তার পিঠ গিয়ে আবারও ঠেকল দেওয়ালের সাথে। শেরাজ তার দুই হাত দিয়ে সুমুকে বন্দি করে ফেলল। এক হাত দেয়ালে, এক হাত সুমুর কোমরে রাখল। তার মুখ একেবারে সুমুর মুখের কাছে। নিঃশ্বাসে লেগে আছে তাপ।
“পাঁচ সেকেন্ড বাকি!”
সুমুর ঠোঁট কাঁপছে, চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে জানে, এই রাতে এই মানুষটাকে থামানো সম্ভব না।
“চার!”
শেরাজ তার আঙুল চালালো সুমুর কপাল থেকে গাল বরাবর, তারপর গলায়।
“তিন!”
সে নিজের নাক ছুঁইয়ে দিল সুমুর নাকে। ঠোঁট সুমুর গালের পাশ দিয়ে স্লাইড করে কানের কাছে গিয়ে পৌঁছাল।
“দুই!”
সুমু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ ফিসফিস করে বলল,
“তোমার শ্বাস কাঁপছে, সুইটহার্ট। শরীরও তোমার আগে অনুমতি দিয়েছে, তুমি শুধু এখন মেনে নাও।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ সুমুর ডাল গালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এক!”
সুমুর কাঁধে থাকা ওড়নাটা শেরাজ ধীরে টেনে নামিয়ে নিল। সে থামে না, বরং চুলের গোড়া বরাবর আঙুল চালিয়ে দিল। তারপর চুপচাপ সুমুর কপালে ঠোঁট রাখল। তারপর চোখে, তারপর গালে, শেষে আবার ঠোঁটে। কিন্তু এবার কোনো আগ্রাসন নেই, এবার যেন চুমুটায় অনুতাপ, শান্তি আর দীর্ঘ অপেক্ষার এক ধ্বনি মিশে আছে। সুমু চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার ঠোঁটের রক্ত শুকিয়ে গিয়েছে, কিন্তু সেই পুরোনো দাগটা যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। সুমুর ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে সে সুমুকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। বাইরে বৃষ্টির গর্জন আরও বেড়েই চলেছে। শেরাজ সুমুকে শুইয়ে দিয়ে, তার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চোখে এক অদ্ভুত নীরবতা, যেন এই মুহূর্তে তার ভেতরের সব ক্ষুধা, অভিমান, মায়া—সবকিছু মিলে এক বিভীষিকাময় গভীরতা তৈরি করেছে। তার ঠোঁট ধীরে ধীরে নিচু হয়ে এলো সুমুর কপালের ওপর, তারপর চোখের পাতায়। তার হাত উঠে এলো সুমুর গলার কাছে। প্রথমে কোমল, তারপর ধীরে ধীরে তার আঙুলের চাপ বেড়ে গিয়ে গলার ত্বকে আঁচড়ে ফেলল। হাত নামিয়ে সুমুর মেদহীন পেটের উপর হাত রাখল সে। তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারি হয়ে আসছে।
“আজ আমার কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু উত্তর চাই—তোমার শরীরের প্রতিটা ভাঁজ থেকে।”
তার আঙুল চুলের গোড়া থেকে ঘাড় বরাবর নামতে নামতে পৌঁছে গেল কাঁধে। সুমুর পরনের টি-শার্ট একটানে নামিয়ে দিল সে। তবে হিংস্রভাবে নয়, বরং এমনভাবে, যেন নিজের প্রতিটা অধিকার একে একে ফিরিয়ে নিচ্ছে। বিছানার চাদরের ভাঁজে ভাঁজে বাজের আলোর ঝলকে এক মুহূর্তের জন্য সুমুর চোখে আতঙ্কের ছায়া জেগে উঠল, আর তাতেই শেরাজ আরও গভীর হয়ে উঠল।
“আমি আজ থামব না, সুইটহার্ট। তোমার শরীর আজ কান্না করুক, আমার নাম ধরে ডাকুক।”
তার ঠোঁট নামতে থাকল গলা থেকে বুকের মাঝখানে। চুমুগুলো প্রথমে ধীরে, তারপর ছিন্নভিন্ন। আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরল সুমুর কোমর, তারপর পেটের চারপাশে ঘুরে বেড়াল। সুমুর শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে। বৃষ্টির শব্দ যেন মিশে গেছে তার ধুকপুক ধুকপুক হৃদস্পন্দনের সাথে। হঠাৎ সুমুর গলায় এক কামড় বসাল সে। সেই কামড়টা ভালোবাসার না, মালিকানার। সুমুর মুখ দিয়ে এক অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো।
“ব্যথা লাগছে?”
কাঁপা কণ্ঠে জবাব দিল সুমু,
“হুম!”
শেরাজ চোখে পাথরের মতো এক গম্ভীরতা নিয়ে বলল,
“এটা তো সবে শুরু, সুইটহার্ট। আজ তোমার প্রতিটা লোমকূপের গোড়ায় আমার ছাপ থাকবে।”
শেরাজ হারিয়ে গেল সুমুর মধ্যে। সেই রাত যেন এক যুদ্ধ, ভালোবাসা আর প্রতিশোধের মাঝে এক বেপরোয়া টান। সুমুর নখের আঁচড় দাগ ফেলল শেরাজের পিঠে। শেরাজ প্রতিটা দাগ গুনতে গুনতে চুমুতে চুমুতে খুঁজে নিল তার মালিকানায়। আজ শরীর কথা বলে, শরীর কাঁদে, শরীর শিহরিত হয়। কিন্তু বৃষ্টির শব্দ থামে না। আজ শেরাজের প্রতিটা ছোঁয়া সুমুকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। একটানে বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা ছিঁড়ে আনার সমান যন্ত্রণা দিচ্ছে। তবুও সুমু আজ চুপচাপ। বাঁধা দেবার ক্ষমতা নেই তার। আর না চাইলেই সে বাঁধা দিয়ে থামাতে পারবে। আজ শুধু নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছু করার নেই তার।
শেষরাত। ঘরের ভেতর বাতি নিভে আছে, শুধু বাইরের বাজ আর বৃষ্টির শব্দ মাঝে মাঝে আলোর ঝলকানির মতো জানালায় আঁচড় কাটছে। ঘড়ির কাঁটা রাত চারটা ছুঁই ছুঁই। শেরাজ এখনো সুমুতে মগ্ন। তার মুখে, হাতে, শ্বাসে কোনো বিশ্রাম নেই। তার মন ও শরীর যেন একটা ক্ষুধার্ত উল্কা—যা থামতে জানে না, শুধুই ধ্বংস করে দিতে চায় সমস্ত দেয়াল, সমস্ত প্রতিবন্ধকতা, সমস্ত অতীত।
সুমু নিঃশব্দ। তার চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টিশূন্য। তার বুক ওঠানামা করে বিক্ষিপ্তভাবে, যেন সে কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছে। তার ঠোঁট ফেটে গেছে, গলা শুকিয়ে কাঠ, শরীর ব্যথায় ঝিম ধরে আছে। শেরাজের ছোঁয়া যতবার পড়ছে, আর শরীর কেঁপে উঠছে—তবে শিহরণে না, জ্বালায়। তবুও সে চুপ। কারণ সে জানে—এটা শুধু একটি রাত নয়, এটা তিন বছরের নীরব অভিমান আর না বলা কথার নিরবিচার প্রতিশোধ। শেরাজ থামে না আজ। সুমুর শরীরে আজ নেমে যাচ্ছে নখের আঁচড়, লাল দাগের মতো ছাপ, ঠোঁটে জ্বালাময়ী কামড়ের দাগ। তবুও সুমু বাঁধা দেয় না। কারণ সে জানে—যে ভালোবাসা তিন বছর ধরে সাগরের নিচে আগ্নেয়গিরির মতো পুড়েছে, তা একরাতেই নিঃশেষ হবে না। তার চোখের পাশে জমে থাকা সমুদ্রের মতো জলগুলো টুপ করে পড়ছে বালিশে। বালিশটা ভিজে গেছে, যেমন বাইরে ভিজছে পৃথিবী। শেরাজ একবার তার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। তারপর কানে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“এই কষ্টটা আমি দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু এই শরীরটা তো তুমি আমায় ফিরিয়ে দিয়েছো আজ।”
সুমুর কোনো সাড়া নেই। সে যেন আজ বোবা। বিছানার চাদরে ছোপ ছোপ দাগ। শরীরের ঘর্মাক্ত গন্ধ আর দীর্ঘ রাতের নীরব আর্তনাদ যেন এক অদৃশ্য ধোঁয়ার মতো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। শেরাজ ধীরে ধীরে একদিকে সরে এলো। সুমুর গলায় মুখ রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল সে। তার নিঃশ্বাস এখন ধীর, ভারী, আর তৃপ্ত। আর সুমু? সে তাকিয়ে রইল জানালার কাচের দিকে। বাইরের অন্ধকারে যেন নিজেকেই খুঁজে ফিরছে সে। হঠাৎ বাইরে বজ্রপাতের এক প্রবল শব্দে জানালার কাচ কেঁপে উঠল। সুমুর চোখ কাঁপল না। সে ঠিক আগের মতোই তাকিয়ে রইল অন্ধকারে। আজ কোনো অনুভূতি নেই তার মধ্যে। ধীরে সে চোখ বন্ধ করল। শরীরের যন্ত্রণা, ঠোঁটের জ্বালা, বুকের ভার—সবকিছু যেন একসাথে আটকে আছে কোথাও। নিঃশব্দে গভীর একটা শ্বাস নিল। তারপর হাত বাড়িয়ে নিজের শরীরের ওপর পড়ে থাকা তার ভালোবাসার মানুষটিকে আস্তে করে সরিয়ে নিল।
শেরাজ তখন গভীর ঘুমে। হয়ত স্বস্তিতে, নয়ত একরাশ ক্লান্তিতে। সুমু উঠে পড়ল। শরীরের ব্যথায় দাঁড়াতে খুব কষ্ট হলো তার। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নিল। হেঁটে যাবার ক্ষমতা না থাকলেও অনেক কষ্টে আস্তে হেঁটে ওয়াশরুমে চলে গেল। দরজা বন্ধ করে না, শুধু হালকা ঠেলে রাখল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। নিজের চোখের দিকে তাকাল। শুকনো রক্তাক্ত ঠোঁট, লাল গাল, ঘাম আর অশ্রুজলের দাগে ভেজা মুখ—সব দেখে কিছু না বলে পানির কল খুলে দিল। পানির আওয়াজে আড়াল হয়ে গেল বাইরের ঝড়। সে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। পানির স্পর্শে পেতেই ঠোঁট জ্বলে উঠল তার। আয়নার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমি কী নিজেকে ভালোবাসি?”
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর সে পেল না। হঠাৎ দরজার ফাঁক গলে আলতো করে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
“সুইটহার্ট!”
সুমু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল না। সে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেরাজ কণ্ঠে একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বলল,
“তোমাকে আজ খুব কষ্ট দিয়েছি জানি, কিন্তু ভালোবেসেছি বলেই দিয়েছি। এতদিনের ঘুম ভাঙাতে হলে, এমন একটা ঝড় দরকার ছিল।”
সুমু ধীরে এগিয়ে আসতে গেল শেরাজের দিকে। কিন্তু হেঁটে আসার পরিপূর্ণ জোরটুকু না থাকায় পড়ে যেতে নিল সে। শেরাজ এসে ধরে ফেলে তাকে। সুমু কিছু বলল না। তার চোখে তখন একরাশ গভীরতা। সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে শেরাজ হেসে ফেলল ম্লানভাবে। মৃদুস্বরে বলল,
খান সাহেব পর্ব ৬১
“তোমার চোখ এখনও আগের মতোই গভীর।”
সুমুর ঠোঁটের কোণে এক বিন্দু তাচ্ছিল্যের হাসি, আর চোখে এক বিন্দু জল।
“ব্যথা তো আগে থেকেই ছিল, আপনি শুধু সেটা জাগিয়ে দিয়েছেন।”
আবার ঝড়ের গর্জন হলো। দু’জনেই চুপ। শেরাজ সুমুকে কোলে তুলে বেডে এনে শুইয়ে দিল। সুমুর পাশে শুয়ে সুমুকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।
