খান সাহেব পর্ব ৭৮ (২)
সুমাইয়া জাহান
রাতটা যেন হিম হয়ে আছে। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়েছে কারাগারে। সাদা আলো, কিন্তু অদ্ভুত ঠান্ডা। ঘরের কোণে রাখা কাঠের বিছানাটার ওপর একটি খোলা কাগজ পড়ে আছে। তার ওপর কাঁপা হাতে লেখা কিছু শব্দ, শেষে থেমে গেছে এক অসমাপ্ত লাইনে —”আপনি বেঁচে থাকুন আপনার মতো করে, আমি আমার মতো মরে আছি।”
কাগজের পাশে একটা শুকনো গোলাপ, যার পাপড়ি শুকিয়ে ভেঙে ঝরে পড়েছে বিছানার উপর। রুমটার বাহিরে ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু সময়টা যেন থেমে গেছে। বাতাসের হালকা ঝাপটায় মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল। শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ঘরটা ডুবে গেল এক নিঃশেষ অন্ধকারে।
বিছানার কিনারায় বসে আছে সুমু। চুলগুলো ছড়িয়ে আছে কাঁধ জুড়ে, মুখটা অনড়। তার চোখ বন্ধ, ঠোঁটে কোনো শব্দ নেই। মনে হয় না ঘুমোচ্ছে— বরং মনে হয়, অনেক দিন আগেই জেগে থেকে ক্লান্ত হয়ে গেছে।
তার পাশে টেবিলে রাখা কাগজের কোণে লেখা—
“শেরাজ খানের নামে নীরবতা”
কলমটা হাত থেকে গড়িয়ে পড়েছে মেঝেতে,
কালি শুকিয়ে গেছে, কিন্তু শব্দগুলো এখনও তাজা।
জানালার বাইরের চাঁদটাও যেন তাকিয়ে আছে চুপচাপ, যেন বুঝে গেছে—এই চিঠিটা কখনো পৌঁছাবে না প্রাপকের কাছে।
শেরাজ খান হয়তো এখন ঘুমোচ্ছে, অথবা অন্য কোনো শহরে কোনো মদির সন্ধ্যায় হাসছে। কিন্তু এ ঘরের নীরবতায়, একটি নাম— একটি নারীর শেষ নিঃশ্বাস হয়ে গুঞ্জন তোলে বারবার, “শেরাজ”।
তারপর আর কিছুই থাকে না। শুধু ঘরের অন্ধকারে এক টুকরো চিঠি, আর শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের গন্ধ— যা মরে গেলেও ভালোবাসার মতো থেকে যায়, অদৃশ্য অথচ অমোচনীয়।
সুমু নড়ে উঠল। হাতড়ে লাইটার নিয়ে মোমবাতিটি পূনরায় জ্বালায়। কিছুক্ষণ মোমবাতির দিকে তাকিয়ে থেকে চিঠির টুকরোটা হাতে নেয়।
খান সাহেব,
“আপনি বলেছিলেন— ‘আপনি আমার জন্য বদলে যাবেন’। বদলে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু আরো নির্মম এক মানুষে। আপনি ছিলেন আমার পৃথিবী ধ্বংসের নকশা। আপনি আমাকে ভালোবাসেন নি, আপনি আমাকে ব্যবহার করেছেন— আপনার অহংকারকে প্রমাণ করার জন্য, আপনার পুরুষত্বের রক্তমাখা বিজয়পতাকা বানিয়ে। আমার থেকে আপনি যতটা ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছেন, তার এক বিন্দুও ফেরত দেননি কখনো। আপনি জানেন না, আমার মধ্যে সবসময় একটা ভয় কাজ করত। সেই ভয় আপনার জন্য নয় — আপনার ভেতরের শূন্যতার জন্য। একটা সময় আপনার হাত আমার শরীরের দিকে এলে আমার মনে হতো, যেন বিষমাখা ছুরি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আপনি আমাকে স্ত্রী বলেন, আমি বলি — বন্দি। আপনি বলেন, আমি আপনার সম্পত্তি, আমি বলি — আপনার অভিশাপ। আপনি পাশে থেকেও পাশে ছিলেন না, আমি প্রতিদিন একা একা বেঁচে গেছি। আপনার ঘরে ছিলাম, অথচ আপনি আমার জীবনের কোথাও ছিলেন না। আপনি আমার স্বামী, অথচ আমি কখনো আপনার স্ত্রী হতে পারিনি। কারণ আপনি শুধু আমার ধ্বংসকে চিনেছিলেন, আত্মাকে নয়। আমার চোখের নিচে যে কালো দাগ পড়েছিল ঘুমহীন রাতে, ওটা আপনার দেওয়া যন্ত্রণার ছায়া ছিল, আমার কোনো সাজগোজের ভুল নয়।
আপনি হয়তো ভাবেন, আমি এখনো আপনাকে ঘৃণা করি। না, খান সাহেব! আমি আপনাকে ঘৃণা করতে পারিনি। কারণ যে মানুষকে একদিন বুকের ভেতর ফেরেশতার মতো জায়গা দিয়েছিলাম, তাকে ঘৃণা করতে পারা মানে নিজেকেই মেরে ফেলা। তাই আমি বেঁচে আছি — ঘৃণা করিনি, ভালোবেসেও মরেছি।
আপনি বলেছিলেন — “আপনি ব্যস্ত”, “আপনি ক্লান্ত”, আর আমি আপনার কাছে এখন শুধুই “দায়িত্ব”। তখন আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষয়ণ হতো, আর আমি প্রতিবার চুপ করে থাকতাম, কারণ আমি ভাবতাম, একদিন আপনি হয়তো আমার চোখে একটু আলো খুঁজে দেখবেন। কিন্তু আপনি তো অন্ধই ছিলেন, খান সাহেব। অন্ধ — নিজের দোষে, নিজের অহংকারে, নিজের বর্বর পুরুষত্বে।
এখন আমার ভিতরটা শুধু এক রুক্ষ মরুভূমি, যেখানে নামাজের জায়নামাজেও কান্নার দাগ শুকিয়ে গেছে। আপনি যখন আমার চোখের দিকে তাকাতেন না, আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে ভয় পেতাম। আপনি যখন রাতে ঘরে ফিরতেন না, আমি চাঁদের আলো রুমে আসতে দিতাম না, কারণ সে যেন না দেখে আমার অপমানের মুখ। আপনি যখন পাপ করে এসে ঘরে ঢুকতেন, তখন আমি নিজের বুকের ভেতর একটা মৃত নদী বয়ে নিয়ে ঘুমানোর ভান করতাম।
আপনি বলেছিলেন— “আমি আপনার স্ত্রী, আপনার ঘরের মানুষ।” হ্যাঁ, ঘরে রেখেছিলেন, কিন্তু ঘরের দেয়ালটাই আমার কারাগার হয়ে গিয়েছিল। আমি কাঁদলে আপনি বলেছিলেন, “অভিনয় করো না।” আমি চুপ থাকলে বলেছিলেন, “নীরবতায় বিষ আছে।” আপনি যে সত্যিই বিষ, তা আমি প্রতিদিন বুঝেছি। আপনি আমাকে আপনার স্ত্রী বলেছিলেন, অথচ আমি ছিলাম আপনার বন্দি ছিলাম। আপনি বলেছিলেন, আমি আপনার ‘অধিকার’, অথচ আমি ছিলাম এক অজানা যুদ্ধের পুরস্কার, যেটা যুদ্ধ আপনি জিতেছিলেন রক্তের বিনিময়ে।
আমি জানি, আপনি ভাববেন, “সে নিশ্চয়ই আমাকে ক্ষমা করেছে।” না, খান সাহেব! ঘৃণা করতে পারিনি, তবে আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি। ক্ষমা করার মতো হৃদয় আমার নেই এখন। আপনি যে হৃদয় ভেঙেছিলেন, সেটাই তো ছিল আমার শেষ সম্পদ।
আপনি বলেছিলেন, ভালোবাসা সব ভুলিয়ে দেয়। আমি বলি, আপনার ভালোবাসায় ছিল বিষ। সেই বিষ ধীরে ধীরে আমার শরীরে ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমি মরিনি, কিন্তু বেঁচেও নেই। আপনি এক জীবন্ত মৃত্যুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন আমার জন্য। প্রতিটি রাতে যখন আপনি নিঃশব্দে আমার কাছে এগিয়ে আসতেন, আমি ভেতরে ভেতরে মরতাম। চিৎকার করতে পারিনি, কারণ আমার কণ্ঠও আপনার ভয়েই বন্দি হয়ে গিয়েছিল।
আপনি কি কখনও ভেবেছন, মানুষ জোর করে কাউকে ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে কিনা? না, আপনি ভাবেন নি। আপনি আমার শরীরে আপনার নাম লিখে গিয়েছেন, কিন্তু আমার রুহ্ সেই নাম প্রতিদিন মুছে দিয়েছে কান্নায়। আপনার স্পর্শ ছিল ছুরির মতো ধারালো, আর আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাসে রক্তের গন্ধ পেতাম আমি।
আপনি আমার আশ্রয় ভেঙে ধুলো করেছিলেন, অথচ আমি শিখে গিয়েছিলাম—ভালোবাসা মানে ধ্বংসের প্রশিক্ষণ। আপনি বলতেন, আমি আপনার পৃথিবী। অথচ সেই পৃথিবীটাকে আপনি প্রতিদিন রক্ত দিয়ে রাঙিয়েছেন। আমার চোখে যে আলো ছিল, সেটাকে ছিঁড়ে অন্ধকার বানিয়েছেন। আমি সত্যি ভেবেছিলাম—একদিন আপনি বুঝবেন, একদিন আপনি থামবেন। কিন্তু আপনি তো বুঝলেন না, থামলেনও না। আপনি শুধু ছিন্নবিচ্ছিন্ন করলেন—আমার বিশ্বাস, আমার শরীর, আমার হৃদয়ের প্রতিটি কোষ।
খান সাহেব, আপনি আমায় কবে ভালোবেসেছিলেন বলবেন? না, আপনি আমায় অধিকার করতে চেয়েছিলেন। ভালোবাসা যেখানে মুক্তি দেয়, আপনি সেখানে বন্দিত্ব লিখে দিয়েছেন আমার নামে। আপনার ভালোবাসা ছিল আগুন, যেখানে আমি প্রতিদিন পুড়েছি। আর আপনি ছিলেন সেই আগুনের মালিক, যে তাপ দেখে আনন্দ পেত।
আপনার প্রতিটি স্পর্শে আমি মৃত্যুর স্বাদ পেয়েছি। আপনি আমাকে হত্যা করেছেন, কিন্তু দেহটা কবর দিতে ভুলে গেছেন—সেজন্যই আমি আজো হেঁটে বেড়াই, আপনার অপরাধের জীবন্ত প্রমাণ হয়ে। আমি ভেবেছিলাম, একদিন হয়তো আপনি মানুষ হবেন—কিন্তু আপনি কেবল শিকারী হলেন, আর আমি হলাম সেই পাখি, যে নিজের ডানা ভেঙে ফেলেও উড়ে যেতে চেয়েছিল। আপনি আমার দেহে যে আগুন লাগিয়েছিলেন, তার ধোঁয়ায় আজও আমি দম নিতে পারি না। আপনি আমার জীবনের সেই অদেখা কারাগার, যার দেয়াল আমি যতই ছুঁতে চাই, ততই নিজেকে রক্তাক্ত পাই। আপনি আমার সন্তানদের বাবা হয়েছেন, অথচ কোনোদিন মানুষ হবার চেষ্টা করেননি। তাই তারপর আর সম্পর্কের কোনো নাম দিতে পারি না আমি। কি এমন ক্ষতি হত যদি সেদিন একটাবার আমার কথা শুনতেন? আপনি শুনলেন না। আপনার রাগ সব শেষ করে দিল। আমাদের সংসার শেষ করল। আমার বাচ্চাদের একা করে দিল।
আপনার দেওয়া প্রতিটি ছোঁয়া ছিল বিষমাখা সূচের মতো— যা শুধু শরীর নয়, আমার রুহ পর্যন্ত খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করেছে। আমার প্রতিটি রাত ছিল একেকটা জল্লাদের সময়, যেখানে আপনি ছিলেন বিচারক, আর আমি অভিযুক্ত। দোষ একটাই—আপনাকে ভালোবেসেছিলাম।
আপনি জানেন খান সাহেব, আপনার পাশে থাকা মানে ছিল ধীরে ধীরে মরতে থাকা। আপনার নিঃশ্বাসে আমি মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছি, আপনার চোখে দেখেছি শূন্যতা, যেখানে কোনো অনুতাপ ছিল না। আমি প্রতিরাতে চিৎকার করতাম নিঃশব্দে। কারণ শব্দ করলে, আপনি আরও নিষ্ঠুর হয়ে যেতেন। আমি এখনো শুনি, রাত গভীর হলে—আমার নিজের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর উঠে আসে, যেটা বলে—“তুমি তো মরে গিয়েছিলে সেইদিন, যেদিন সে তার পাপী হাত দিয়ে প্রথম তোমাকে স্পর্শ করেছিল।”
আপনি আমার সন্তানকে কেড়ে নিয়েছেন,
আমার মাতৃত্বের অধিকারটাও মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন নিজের অহংকারের বেদিতে। আপনার পাপ দিয়ে আপনি শুধু আমায় নয়— একটি নারীজাতির আত্মাকেই অপমান করেছেন। আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, আপনি বাঁচতে দিলেন না। আমি মরতে চেয়েছিলাম, তাও দিলেন না। আপনি আমাকে এমন এক অবস্থায় রেখে গেছেন, যেখানে মৃত্যু মানে মুক্তি, আর জীবন মানে শাস্তি। পরিশেষে বলব, “আপনি বেঁচে থাকুন আপনার মতো করে, আমি আমার মতো মরে আছি।”
কারাগারের দরজা ধীরে খুলে গেল। লোহার ঘষার শব্দে নিস্তব্ধ ঘরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। আলিয়া এলেন। সুমু চোখ তুলে একবার তাকাল। তারপর নিঃশব্দে দৃষ্টি নামিয়ে নিল মাটিতে। আলিয়া এগিয়ে এসে পাশে বসলেন। কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ করে রইলেন।
সুমু নিঃশব্দ ভাঙল ধীরে,
“আজ বাড়িতে যান নি?”
আলিয়া হালকা হাসলেন। সুমুর হাত নিজের হাতে নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললেন,
“স্মৃতির শেষ চারণে আছি আমরা, সুমু।
আর ক’টা দিন পরই তোমার মুক্তি। তারপর হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না। তাই ভেবেছি, এই অল্প সময়টা একটু তোমার সঙ্গে কাটাই।”
সুমু নিস্তরঙ্গ মুখে বলল,
“তো এখন কি গল্প শুনতে এসেছেন?”
আলিয়া হেসে বললেন,
“যদি তুমি শোনাও।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার আঙুলের ফাঁকে একটা কাগজ ধরা। আলিয়ার চোখ পড়ল সেটার দিকে।
“এইটা কি সুমু?”
সুমু কাগজটা বাড়িয়ে দিল ধীরে।
“পড়েই দেখুন। আজ থেকে পাঁচবছর আগে কারো ওপর অভিমান করে লিখেছিলাম। আজও অক্ষত রয়ে গেছে।”
আলিয়া কাগজটা হাতে নিলেন। পাতায় শুকনো কালি, তবু শব্দগুলো যেন তাজা রক্তের মতো লাল। চিঠির ওপরে লেখা—
“শেরাজ খানের নামে নীরবতা।”
আলিয়া চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। চিঠির ভাঁজে যেন লুকিয়ে ছিল বহুদিনের না বলা কথা। সময় বয়ে গেল। আলিয়া চিঠিটা পড়া শেষ করে সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ভাবলেন, এই চিঠি যে নারী লিখছেন, সে কোনো সাধারণ অভিমানী স্ত্রী নয়। সে এমন এক বন্দি আত্মা, যে ভালোবাসা ও কর্তব্য—দুটোর মাঝখানে থেঁতলে গেছে। তার স্বামী শেরাজ খান! শুধু একজন মানুষ নয়, যেন এক প্রেতাত্মা, যে তার জীবনের প্রতিটি শ্বাসে ছায়া ফেলে থেকেছে। আলিয়ার মনে হলো, সুমু যেন কাঁদছে না, বরং সুমুর লেখা প্রতিটি শব্দ সুমুর বুকের ভেতর রক্ত ঝরাচ্ছে। সে আর ভালোবাসা চায় না, সে চায় মুক্তি। চায় নিজের নামের পাশে “কারও স্ত্রী” নয়, “নিজের মুক্তি” লিখে রাখতে। এই চিঠির এক লাইনেই যেন পুরো সম্পর্কের শবযাত্রা শেষ। এই চিঠিটা একজন নারীর “শেষ কথা”। একজন নারীর বেঁচে ওঠার ঘোষণা, আর এক পুরুষের পতনের দলিল।
সুমুর কেবিনে এখন এক অদ্ভূত নিস্তব্ধতা। সকলে কেবিনে এসে তার ঘুমার ভাঙার অপেক্ষা করছে। কাল রাতে আর ঘুম ভাঙেনি সুমুর। কাচের জানালা দিয়ে হালকা সকালের রোদ এসে পড়েছে তার মুখে। এতেই তার ঘুমে বিঘন্ন ঘটল।
“কংগ্রাচুলেশন!”
সুমু যেন লাফিয়ে উঠল। একসাথে এতো মানুষের আওয়াজ পেয়ে সে চোখ মেলতেই দেখতে পেল, চারপাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে—অনন্যা খাতুন, আফিয়া খাতুন, সাহাবাজ খান, শেহেজাদ খান, আইয়ুব, সামিয়া, নাজমিন, রাহিন, সারবাজ, ইনায়া, ইতিশা, আরবাজ, ফিরোজা, রিয়াজ, নাতাশা, স্যান্ডি, আফতাব চৌধুরী, মৌ সেন, আদনান চৌধুরী, রুহি খাতুন, রোজা, আলিশা, মরিয়ম বেগম, নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম, রিসান, শাহরুখ—সবাই। আজ পুরো খান পরিবার আর চৌধুরী পরিবার একসাথে তাকে দেখতে এসেছে। কেবিনটা পুরো ভরে আছে। কারো চোখে ঘুম নেই। সবার মধ্যেই যেন আজ একটা অদ্ভূত ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির জায়গায় এক অদ্ভুত আনন্দের আলো। সে পুরো কেবিনে চোখ বোলাতেই দেখল, কেবিনটা অপূর্ব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বেলুন, আর তাজা লাল গোলাপ দিয়ে রুমটাকে স্বর্গের মতো বানানো হয়েছে।
শেরাজ বেডের পাশে চেয়ার টেনে বসে আছে। তার কাঁধে ব্যান্ডেজ বাঁধা, মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে শান্তি। সুমু তাকাতেই সে মৃদু হেসে উঠল। সেই হাসিতে যেন এক পৃথিবী ভালোবাসা মিশে আছে। অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুনের কোলে দু’টো ছোট্ট প্রাণ। তারা দুজনেই এগিয়ে এসে সুমুর কোলে বাচ্চা দুটিকে দিলেন। সুমু চোখ ভরে তার সন্তানদের দেখল। দুজনেই মায়ের বুকের কাছে ঘেঁষে ঘুমাচ্ছে। সুমু আলতো করে ওদের কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে শেরাজের দিকে তাকিয়ে ভেজা চোখে বলল,
“আমার বেবি, তাইনা খান সাহেব? ওরা আমার নাড়িছেঁড়া ধন। ”
শেরাজ মৃদু হেসে উত্তর দিল,
“না, বউ! আমাদের বেবি।”
সুমু ক্লান্ত হেসে তাকাল তার দিকে, চোখের কোণে পানি চিকচিক করছে। অনন্যা খাতুন এগিয়ে এসে বললেন,
“আমার মামনি, আল্লাহর অশেষ রহমত। তুমি আর আমার নাতি-নাতনি সবাই ঠিক আছো।”
সাহাবাজ সাহেব সুমুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“সুখী হও, মামনি। আল্লাহ তোমাদের সবসময় এমন হাসিখুশি রাখুক।”
সামিয়া এগিয়ে এসে বলল,
“আপু, ওদের নাম রাখবেনা?”
শেরাজ সোজা হয়ে বসল। সে ধীরে সুমুর কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুমি রাখবে নাম, সুইটহার্ট। আমি চাই ওদের নাম তোমার মুখ থেকেই শুনতে।”
সুমু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মৃদু স্বরে বলল,
“আমি চাই ওদের পাপা ওদের নাম রাখবে। তবে আজ না, তিনদিন পর।”
শেরাজ আলতো হেসে বাচ্চা দু’জনের কপালে একে একে চুমু খেয়ে বলল,
“তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকবে সবসময়। তোমাদের মাম্মা যেমন আমার দুনিয়া আলোকিত করেছে, তেমনই তোমরা আমাদের জীবন আলোকিত করবে।”
সুমু মৃদু হাসল। তার চোখে নিখাদ ভালোবাসা। কেবিনে উপস্থিত সবাই নীরবে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে দিল নাতাশা মৃদু হেসে বলল,
“ম্যাম! দুজনেই কিন্তু আপনাদের জেরক্স কপি হয়েছে।”
সুমু আলতো হাসল। মৌ সেন আর আফতাব চৌধুরী এগিয়ে এলেন। মৌ সেন মেয়ে বাচ্চাটার হাতে দুটো ডায়মন্ডের চুড়ি আর ছেলে বাচ্চার গলায় একটা সোনার চেন পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“আমি হয়তো তোমার সাথে কখনও ভালো ব্যবহার করিনি। কেন করিনি সেটা তুমি জানো। তাই আজ আর সেসব না-ই বা মনে করলাম। তবে এই যে তোমার কোলে দুটি বাচ্চা। এরা আমার শেরাজ বেটার সন্তান। তোমার সাথে আমার যাই থাক। এই বাচ্চা দুটি আমার প্রাণের একটা অংশ। ওদের খুব যত্নে বড় করবে। আমি দোয়া করি তোমাদের জন্য। সবসময় ভালো থাকো।”
সুমু আলতো হাসল। মৌ সেন আর আফতাব চৌধুরী তার কোল থেকে বাচ্চা দুটিকে কোলে নিল। রোজা ধীরে পায়ে হেঁটে এসে তার মা-বাবার কোল থেকে বাচ্চা দুটিকে আদর করল। সুমু অপলক তাকিয়ে রইল তাদের দিকে। শেরাজ মৃদু হেসে চাপাস্বরে বলল,
“এমন দৃশ্য হয়তো খুব ভাগ্য করে দেখা যায়।”
সুমু চোখ রাঙাল। কেবিনের সকলে আবারও বাচ্চা দুটিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একে একে আলিশা, মরিয়ম বেগম, নাতাশা, ইশিতা, ইনায়া সবাই তাদের কোলে নিতে লাগল।
সুমু শেরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাড়িতে ফিরব কবে?”
“কাল নিয়ে যাব।”
সুমু ধীরে মাথা নাড়ল। কেবিনে নার্স ঢুকলেন। চারপাশে এত মানুষকে একসাথে দেখে তিনি একটু কঠিন কণ্ঠে বললেন,
“একি, এতো মানুষ একসাথে কেবিনে? সবাই বাইরে যান।”
অনন্যা খাতুন ধীরে এগিয়ে এলেন। তিনি শেরাজের কোলে মেয়ে শিশুটিকে তুলে দিলেন। আফিয়া খাতুন সুমুর কোলে ছেলেকে দিলেন। আইয়ুব সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমাদের এখন বাহিরে যাওয়া উচিত। ওদের একটু একা থাকতে দেওয়া দরকার।”
সকলে সম্মতি জানাল। সবাই একে-একে সুমুদের জন্য শেষবার দোয়া করে বাহিরে চলে গেল। শেরাজ তার দু’সন্তানের সাথে খোশগল্পে মেতে উঠল। সুমু ঠোঁটে হাসি নিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল, বাবা-সন্তানের খুনশুটি।
পাতালপুরীর নিস্তব্ধ রুমে আরিয়ান আর রায়য়ান বসে আছে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা মৃদু আলোর বাতি মাথার ওপরে ঝুলছে, আলোটা কাঁপছে, যেন প্রতিবার বন্ধ হয়ে গিয়ে আবারও জ্বলে উঠছে।
আরিয়ান মাথা নিচু করে বসে আছে, সামনে ছড়ানো ওয়াইনের খালি বোতল। তার চোখে লালচে, কিন্তু ঠোঁটে এখনো একরকম শীতল হাসি। রায়য়ান হাতে সিগারেট নিয়ে বসে। সে ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে চোখ রেখে ধীরে বলল,
“তুই নিশ্চিত, ওরা দু’জনই নিরাপদে ফিরেছে?”
আরিয়ান ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যর হাসি এনে বলল,
“হ্যাঁ, নিরাপদে। খুবই সুখে আছে তারা। আজ সুমুর মুখে সেই শান্তির হাসি, যে হাসি আমি ওর ঠোঁটে আমার জন্য দেখতে চেয়েছিলাম।”
রায়য়ান চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
“ওদের টুইন বেবি হয়েছে?”
“হ্যাঁ!”
“তুই না বললি, সুহাসিনীকে ভুলে যাবি?”
আরিয়ান চোখ তুলে তাকাল। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো,
“সে ভুলে যাওয়ার মতো না, রায়য়ান। আমি শুধু দূরে সরে গেছি, কিন্তু মনটা রয়ে গেছে তার কাছে।”
রায়য়ান ঠোঁটের কোণে হালকা তিক্ত হাসি এনে বলল,
“ও আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। তুই জানিস না, এস.কে সবটা জানলে কি হবে। যে অতীতটা মরে গিয়েছিল, সেটাও হয়তো এবার জীবিত হয়ে উঠবে।”
আরিয়ান হালকা হাসল। আঙুলে লাইটার ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
“অতীত কখনো মরে না, রায়য়ান। শুধু রূপ বদলায়। কখনো ছায়া হয়ে পাশে হাঁটে, কখনো আগুন হয়ে ফিরে আসে।”
বাতির আলো আবার কেঁপে উঠল। দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। রায়য়ান তীক্ষ্ণ চোখে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে বলল,
“এবারও আমরা ব্যর্থ হলাম, আরিয়ান। বেঁচে গেল ওরা। ভেবেছিলাম, সুহাসিনীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়ে, আমরা দুজনও মরে যাব। কারণ, আমরা দুজনেই খুব ভালো করে জানি, তুই বা আমি— আমরা দুজনের কেউ সুমুকে কোনোদিনও পাব না।”
রায়য়ান এক নিঃশ্বাসে সিগারেট টেনে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“তুই কি আবারও কিছু করতে যাচ্ছিস? তোর চোখে আমি সেই পুরনো আগুনটা দেখছি।”
আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
“আগুন নিভে গেছে মনে করেছিস? না, ভাই! সেটা শুধু ছাইয়ের নিচে চাপা আছে। সুযোগ পেলেই জ্বলে উঠবে।”
“এবার হয়ত একটা শেষ খেলা হবে। আর এই খেলায় হয় আমি আর তুই বেঁচে থাকব। নয়তো এস.কে বেঁচে থাকবে।”
আরিয়ান কুটিল হাসল। সে একটু সময় নিয়ে ফোন থেকে সুমুর একটা ছবি বের করে ধীরে বলল,
“হায়রে নারী জাতি। সেলুট তোমাদের সিস্টারস। একটা পুরুষকে কি থেকে কি বানাতে পারো তোমরা।”
থামল আরিয়ান। সে ঘুরে রায়য়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই জানিস, রায়য়ান! ভালোবাসাটা যদি অন্য কারো হয়, তবুও তার দিকে তাকানোটা অপরাধ না। কিন্তু সুমুর দিকে তাকানো মানেই যেন নিজের ভেতরটা পুড়িয়ে ফেলা।”
রায়য়ান হালকা হাসল,
“আমরা দুজনেই তো ওর হাসিটা দেখে বাঁচতাম, আরিয়ান। পার্থক্য শুধু একটাই—তুই ওর হাসি চাইতিস নিজের জন্য, আর আমি চাইতাম ওর মুখে হাসিটা থাকুক, এমনকি সেটা যদি অন্য কারো জন্যও হয়।”
আরিয়ান হেসে মাথা নিচু করল।
“তুই বড় দার্শনিক হয়ে গেছিস রে, রায়য়ান। কিন্তু আমি পারি না। এখনো ওর নাম শুনলেই বুকের ভেতর কষ্টের আগুন জ্বলে ওঠে। বারবার এইটা মনে পড়ে যায়, সে আমার না, অন্য কারো।”
রায়য়ান মৃদু স্বরে বলল,
“ওর মধ্যে একটাই মানুষের বসবাস— ওর ভালোবাসা শেরাজ খান। আমরা দুজনই সেটা জানতাম, কিন্তু কেউই মানতে চাইনি।”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“শেরাজ! নামটা শুনলেই মনে হয় আমি হেরে গেছি।”
রায়য়ান এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“কিছু ভালোবাসা না পাওয়ার জন্যই তৈরি হয়, আরিয়ান। আমরা দুজনই তেমন এক ভালোবাসার বন্দি।”
আরিয়ান ঠোঁটে হালকা হাসি টানল,
“তাহলে বল, আমরা কি ভালোবাসাকে হারালাম?”
রায়য়ান ধীরে বলল,
“না, আমরা মুক্তি পেলাম। কারণ ভালোবাসা যখন কারো সুখের জন্য নিজেকে জ্বালিয়ে ফেলে, তখন সেটা পরাজয় না, ত্যাগ।”
“তুই জানিস, রায়য়ান! আমি প্রতিরাতে একটা কাজ করি। সুমুর ছবি খুলে রাখি সামনে। তারপর নিজেকে জোরে বলি, আজ থেকে ভুলে যাব। কিন্তু শেষমেশ দেখি, ওর চোখের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি আবার।”
“ওর সাথে দেখা হওয়াটা কি খুব দরকার ছিল?”
আরিয়ান মাথা নিচু করে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“তোর ভালোবাসাটা খুব পবিত্র, রায়য়ান। আমারটা শুধু আগুন।”
“আগুনও পবিত্র, যদি সেটা কাউকে পুড়িয়ে না ফেলে। তুই নিজেকে জ্বালাস, অন্য কাউকে না। তাই তোর আগুনটাও ভালোবাসা। আমাদের ভালোবাসাটা হলো একটা অদৃশ্য কবিতার মতো, যেটা কেউ পড়ে না, তবু কাগজে রক্তের মতো লেগে থাকে।”
আরিয়ান হেসে বলল,
“সেই যে তার মায়ায় পড়লাম, এখনো সেখানেই আটকে আছি। না পারলাম ছাড়তে, আর না পারলাম ধরতে।”
রায়য়ান ধীরে বলল,
“তুই জানিস, কিছু মানুষ শুধু ভাগ্যের নয়, সময়েরও বাইরে থাকে। সুমু ঠিক তেমনই। ওর চারপাশে একটা আলো আছে, যেটা ছুঁতে গেলেই নিজেকে অন্ধকার মনে হয়।”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো চেয়েছিলাম শুধু একবার—ওর মুখে ভালোবাসি কথাটা শুনতে। কিন্তু ভাগ্য এমন নিষ্ঠুর কেন রে, রায়য়ান? আমরা যারা সত্যি ভালোবাসি, তারাই কেন না পাবার যন্ত্রণায় পুড়ে মরি?”
“কারণ আমাদের ভালোবাসা কোনো গল্পের ‘শেষ দৃশ্য’ না, আরিয়ান। আমরা সেই মানুষ, যাদের ভালোবাসার কথা কেউ জানে না, যাদের ভালোবাসা অন্য কারো সুখের জন্য ভিত হয়ে থাকে।”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তুই জানিস, ও যখন কাঁদত, আমি দূর থেকে শুনতাম। ওর প্রতিটা কান্নার আওয়াজ আমার বুক ভেঙে দিত। কিন্তু গিয়ে কিছু বলতেও পারতাম না, কারণ ওর পাশে সবসময় এস.কে থাকত।”
রায়য়ান মৃদু স্বরে বলল,
“যখন ও আমার কাছে ছিল। রোজ রাতে পাগলের মতো এস.কের জন্য কাঁদত। ওর কান্না শুনে, কোনোদিনও নামাজ না পড়া আমিটাও ওর জন্য নামাজে বসে আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছিলাম। ওর কষ্ট দূর হয়ে যাবার জন্য প্রার্থনা করেছিলাম।”
আরিয়ান তাকাল রায়য়ানের দিকে,
“তুই সত্যিই ওর জন্য দোয়া করেছিলি?”
রায়য়ান মাথা নাড়ল,
“ভালোবাসা মানে তো শুধু পাওয়া না, আরিয়ান। কখনো কখনো প্রার্থনা করাটাও ভালোবাসা।”
আরিয়ান হাসল। রায়য়ান আবারও বলল,
খান সাহেব পর্ব ৭৮
“সুহাসিনীর প্রতি আমার ভালোবাসা কোনো শরীরের না, সেটা শুধু আত্মার।”
আরিয়ান আর কোনো কথা না বলে শুয়ে পড়ল। রায়য়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আরিয়ানের দিকে। তার আর কিছু বলার নেই। কি আর থাকতে পারে তার বলার। সে নিজেই তো ওই এক নারীকে ভালোবেসে প্রতিনিয়ত একতরফা ভালোবাসা দহনে পুড়ে মরছে।
