খান সাহেব পর্ব ৭৮
সুমাইয়া জাহান
গাড়ি হসপিটালের সামনে এসে থেমে গেল। শেরাজ নিজের কাঁধ আর হাতে লেগে থাকা ক্ষতের ব্যথা উপেক্ষা করে সুমুকে কোলে তুলে নিল। সুমু চিৎকার করছে, তার পেটের মধ্যে লেবার পেইন বেড়েই চলেছে। শেরাজ এক হাত দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে তাকে সর্তকভাবে বাহিরে নিয়ে এলো।
“সুইটহার্ট, অনেক কষ্ট হচ্ছে, তাই না তোমার? কিছু হবে না, জান। সব ঠিক হয়ে যাবে। এই দেখো, আমরা হসপিটালে চলে এসেছি। একটু পরে তোমার সব কষ্ট চলে যাবে। জান আমার, আমার দিকে তাকাও। কলিজা, একবার তাকাও।”
সুমু কাঁপতে কাঁপতে শেরাজের বুকের ওপর মাথা হেলিয়ে দিল। তার শরীর থেকে ঘাম ঝরে পড়ছে, ব্যথায় শরীর ভেঙে আসছে।
শেরাজ ধীর ধাপে তাড়াহুড়া না করে, সুমুকে আঁকড়ে ধরে হসপিটালের দিকে এগোতে লাগল। তার তাজা ক্ষতগুলো দিয়ে এখনো রক্ত ঝরছে, মুখে কষ্টের ছাপ, কিন্তু মনের ভেতর প্রবল দৃঢ়তা। প্রতিটি পদক্ষেপে শেরাজ নিজেকে যন্ত্রণার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে রাখল।
হসপিটালের প্রবেশদ্বার কাছে পৌঁছতেই নার্সরা ছুটে এলো। শেরাজ তৎপর হয়ে বলল,
“আমার ওয়াইফের লেবার পেইন শুরু হয়েছে। ওকে দেখুন।”
ওয়াডবয়রা সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রেচার নিয়ে এসে দাঁড়ালো। শেরাজ সতর্ক হাতে সুমুকে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল। ডাক্তাররা ছুটে এলো।
ডাক্তার শারমিন, সুমুকে হালকা পরিক্ষা করে দ্রুত বললেন,
“পেশেন্টের অবস্থা ক্রিটিকাল। আজই হয়ত ডেলিভারি করাতে হবে। ওনাকে ডেলিভারি রুমে নিয়ে যান।”
ওয়াডবয়রা স্ট্রেচার ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ডেলিভারি রুমের দিকে এগোতে লাগল। সুমুর চিৎকার মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে, আবার শুরু হচ্ছে। শেরাজ নিজের কাঁধের ক্ষত উপেক্ষা করে সুমু হাত ধরে ডেলিভারি রুমের দরজা পযর্ন্ত গেল।
ডেলিভারি রুমে ঢুকে ডাক্তাররা সরঞ্জাম প্রস্তুত করল। একজন ডাক্তার ডেলিভারি রুমে ঢোকার সময় শেরাজের অবস্থা দেখে আতঙ্কিত কন্ঠে বললেন,
“মিস্টার খান! আপনার অবস্থাও তো খুব একটা ভালো না। প্রচন্ড ব্লাড লস হচ্ছে আপনার। আপনিও চলুন। আপনার এখনই ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন।”
শেরাজ চোখ বন্ধ করে একবার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“যতক্ষণ না পযর্ন্ত আমার স্ত্রী, সন্তানের ঠিক থাকার খবর পাচ্ছি, ততক্ষণ পযর্ন্ত আমি ট্রিটমেন্ট করাব না। আপনারা আগে আমার ওয়াইফের দিকে মন দিন। আগে ওর আর আমার সন্তানের সুস্থতার খবর দিন। ওরা ঠিক থাকলে আমিও ঠিক হয়ে যাব।”
“পাগলামি করবেন না, মিস্টার খান। আমি একজন নার্সকে ডেকে দিচ্ছি, আপনি প্লিজ ট্রিটমেন্টটা করিয়ে নিন।”
এই পর্যায়ে এসে শেরাজ গর্জে উঠল। মাথা ঠিক নেই তার। সুমুর চিৎকার তাকে মরণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। সে উচ্চস্বরে বলল,
“আরে রাখুন আপনার ট্রিটমেন্ট। ওদিকে আমার কলিজা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে আর আপনি আমাকে ট্রিটমেন্ট করাতে বলছেন? বললাম না আমি ট্রিটমেন্ট করাব না। যান চোখের সামনে থেকে।”
ডাক্তার আর কিছু না বলে চুপচাপ ফিরে গেলেন। শেরাজ কাচের ভেতর দিয়ে সুমুর দিকে তাকিয়ে থাকল। সে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শান্ত হও, জান। আমি এখানেই আছি। আমাদের লিটল চ্যাম্পরা আসছে। আরেকটু সহ্য করো।”
কেবিনের ভেতর সিজার শুরু হলো। অ্যানেস্থেসিয়ার মাধ্যমে সুমু শিথিল হতে শুরু করল। ডাক্তাররা সুমুর পেট জীবাণুমুক্ত করে সিজারের জন্য প্রস্তুত করল। শেরাজ বাহির থেকে তাকিয়ে রইল। তার মধ্যে যেন প্রাণ নেই। সে অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। একটা শক্তপোক্ত মানুষ যেন আজ একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এরই মধ্যে হসপিটালে অনন্যা খাতুনরা সকলে ছুটে এলেন।
অনন্যা খাতুন এসে শেরাজকে টেনে বললেন,
“আমার মামনি কই?”
শেরাজ ধীরে তাকাল তার মায়ের দিকে। সামিয়া আর নাজমিন উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে রইল। সকলের চোখেই চিন্তার ছাপ। সকলে যেন উত্তরের আশায় তাকিয়ে। শেরাজ কোনো কথা না বলে কেবিনের দিকে হাত দিয়ে ইশারা করল।
অনন্যা খাতুন কণ্ঠ কমিয়ে বললেন,
“সব ঠিক আছে তো, বেটা?”
শেরাজ কিছু বলল না। তার চোখ কেবিনের দরজার দিকে অটল। সাহাবাজ খান এগিয়ে এসে বললেন,
“তোমার অবস্থা খুব খারাপ। তুমি এখনো এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
“সুমু আর বাচ্চার সুস্থ মুখ দেখার পর আমি আমার ট্রিটমেন্ট করাব।”
অনন্যা খাতুন ঘুরে শেরাজের পিছন গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি ছেলের অবস্থা দেখে আঁতকে উঠে বললেন,
“পাগল হয়ে গেছ তুমি? তুমি এক্ষুনি ট্রিটমেন্ট করাবে।”
শেরাজের কানে যেন কথা গেল না। আইয়ুব, রাহিনরা এসে তাকে বোঝাতে লাগল। কিন্তু সে কারো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করল না। সামিয়ারা নিঃশব্দে চোখে পানি ফেলে এককোণে দাঁড়িয়ে রইল। ইশিতা আর ইনায়া অনন্যা খাতুনকে বেঞ্চে বসল। নাতাশা কেবিনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। সকলেই ভালো একটা খবরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইল।
শেরাজ স্থির চোখে মেঝের দিকে তাকিয়ে। আইয়ুবরা আবারও তার কাছে এসে দাঁড়াল। সারবাজ একটু সময় নিয়ে ধীরে বলল,
“এসব কীভাবে হলো?”
শেরাজ চুপ করে রইল। তার মধ্যে এখন কথার বলার মতো শক্তিটুকুও যেন নেই। রাহিন চোখের ইশারাতে সারবাজকে চুপ থাকতে বলল। সারবাজও আর প্রশ্ন না করে চুপ করে রইল।
পেরিয়ে গেল অনেকটা সময়। হঠাৎ কেবিনের দরজা খুলে গেল। একজন নার্স কোলে তোয়ালে মোড়ানো ফুটফুটে ছেলে সন্তান নিয়ে বেরিয়ে এলেন।
শেরাজ হন্তদন্ত হয়ে নার্সের কাছে এগোল। তার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবাই ছুটে এলো। সকলে বাচ্চাটিকে কোলে নেবার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। নার্সটি শিশুটিকে আলতো করে দেখালেন। শেরাজ সেদিকে না তাকিয়ে কণ্ঠ কমিয়ে বলল,
“আমার ওয়াইফ কেমন আছে?”
নার্সটি আলতো হেসে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ্! তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন। আপাতত ঘুমিয়ে আছেন। আপনারা পরে গিয়ে দেখা করতে পারবেন। মাত্রই তো অপারেশন শেষ হলো। আপাতত তার কাছে কারো না যাওয়াটাই ভালো।”
শেরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নার্সটি তার দিকে শিশুটিকে এগিয়ে দিল। শেরাজ তাকাল শিশুটির দিকে। এ যেন একদম অবিকল সুমুর প্রতিচ্ছবি। শেরাজ তাকিয়ে রইল। তার হাত আর উঠল না শিশুটিকে কোলে নেওয়ার জন্য। পাশ থেকে আইয়ুব ধাক্কা মেরে বলল,
“কিরে এস.কে? কোলে নে আমাদের চ্যাম্পকে।”
শেরাজের হুঁশ ফিরল। সে হাত বাড়ালো শিশুটির দিকে। তার হাত কাঁপছে। হৃদয় অস্বাভাবিক মাত্রায় জোরে ছুটছে। সে ধীরে হাত এগিয়ে কোলে নিতে গেলেই নার্সটি বাচ্চাটিকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল,
“আগে আমাদের পাওনা পরিশোধ করুন, স্যার।”
শেরাজ পকেট থেকে ওয়ালেট বের করল। তার কাছে ক্যাশ নেই। সে কার্ডটি নার্সের দিকে এগিয়ে দিল। রাহিন হেসে বলল,
“এস.কে খুশিতে পাগল হয়ে গেছে।”
সে শেরাজের হাত থেকে কার্ডটি নিয়ে নিজের ওয়ালেট থেকে টাকা বের করে নার্সের হাতে দিতে গেলে, শেরাজ তাকে বাধা দিয়ে বলল,
“আমার কার্ড থেকে টাকা তুলে আন। আর শোন! একশো কেজি মিষ্টি কিনে আন। পুরো হসপিটালের সবাইকে মিষ্টিমুখ করাব।”
নার্সটি আলতো হেসে শেরাজের দিকে বাচ্চাটিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“একশো কেজিতে হবেনা, স্যার।”
শেরাজ তাকাল নার্সটির দিকে। নার্সটি আবারও হেসে কেবিনের দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কই? নিয়ে এসো!”
সকলে তাকাল কেবিনের দরজার দিকে। কোলে তোয়ালে মোড়ানো একটি কন্যা সন্তান নিয়ে আরও একজন নার্স বেরিয়ে এলো। নার্সটি এসে শেরাজের দিকে মেয়েটিকে বাড়িয়ে দিল। পাশে দাঁড়ানো নার্সটি বলল,
“এই হলো আপনার মেয়ে। আর আমার কোলে আপনার ছেলে।”
নার্সটি এগিয়ে দিলে ছেলেটিকে। শেরাজের চোখের কোণ দিয়ে আজ প্রথমবার যেন দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে একসাথে দুজনকেই কোলে তুলে নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দুজনেই যেন সুমুরাজের প্রতিচ্ছবি। ছেলেটি দেখতে যেমন হুবহু সুমুর মতো হয়েছে, মেয়েটি দেখতে তেমন হুবহু শেরাজের মতো হয়েছে। শেরাজ আজ যেন কথা বলতে প্রায় ভুলেই গেছে। সে ধীরে বলল,
“আর দুজন কই?”
নার্সটি অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
“আর দুজন মানে?”
“আমার চারটা চ্যাম্প আসার কথা। তবে কি আমার সুইটহার্ট আমাকে ধোঁকা দিল।”
সকলে হেসে উঠল। তার পাশ থেকে সাহাবাজ সাহেব বললেন,
“রাহিন! দুশো কেজি মিষ্টি আনো।”
অনন্যা খাতুন বাধা দিয়ে বললেন,
“দুশো না হাজার। আমার নাতি-নাতনিরা এসেছে। এক হাজার কেজি মিষ্টি আনো। সবাইকে মিষ্টিমুখ করাও।”
সকলে হাসল। রাহিন চলে গেল মিষ্টি কিনতে। শেহেজাদ সাহেব আলতো হেসে বললেন,
“শেরাজ বেটা! ওদের আলাদা আলাদা কোলে নিয়ে ডান কানে আযান দিয়ে শোনাও আর বাম কানে কুযাম পড়ে শোনাও।”
শেরাজ মাথা নাড়ল। সে বাচ্চাদের অনন্যা খাতুন আর আফিয়া খাতুনের কোলে তুলে দিল। সামিয়ারা সকলে তাদের ঘিরে ধরে বাচ্চাদের সাথে কথা বলতে লাগল।
শেরাজ আইয়ুবের কাছে এসে বলল,
“পাশের শপ থেকে আমার জন্য পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে আয়। ততক্ষণে আমি ট্রিটমেন্ট করিয়ে নিচ্ছি।”
আইয়ুব চলে গেল পাঞ্জাবি কিনতে। শেরাজ চলে গেল নিজের ট্রিটমেন্ট করাতে। বিশ মিনিটের মধ্যে শেরাজ নিজের ট্রিটমেন্ট করিয়ে ফিরে এলো। আইয়ুব ফিরে এসেছে আরও দশমিনিট আগে। শেরাজ তার হাত থেকে পাঞ্জাবি নিয়ে একেবারে চেঞ্জ করে ওযু করে পবিত্র হয়ে এলো। সে অনুভব করল, আজ সময় থেমে গেছে। তার চোখ এখন শুধু ছোট্ট দুটি প্রাণের দিকে। মেয়ের বুকের কাছে হাত রেখে, সে নিজের ডান কানের কাছে হাত রেখে ধীরে আযান উচ্চারণ করল। তার কণ্ঠে আজ এক অদ্ভুত কোমলতা, যা হয়ত একজন বাবার কন্ঠেই শোনা যায়।
মেয়ের কানে আযান শেষ হলে সে বাম কানে কুযাম পড়ল। শিশুটি মৃদু চোখ খুলে দেখল, যেন বুঝতে চাইছে চারপাশের এই নতুন শব্দগুলো কীসের। শেরাজ কুযাম শেষ করার পর মেয়েটির কপালে চুমু খেয়ে তাকে আবার অনন্যা খাতুনের কোলে দিল।
খান সাহেব পর্ব ৭৭
এরপর সে ছেলে শিশুটিকে কোলে নিয়ে ডান কানে আযান দিতে লাগল। তার কণ্ঠে হালকা কম্পন। ছেলে শিশুটি ছোট্ট কান যেন শব্দগুলো শোনার জন্য ফুঁড়ফুঁড় করছে। শেরাজ কূপমনে হাসল। শিশুটির মুখের মৃদু প্রতিক্রিয়া দেখে তার মন শান্ত হলো। আযান শেষে সে বাম কানে কুযামও পড়ল। শিশুটি হালকা কেঁপে উঠল। শেরাজ আলতো হেসে ছেলের কাপালে চুমুকে খেয়ে দুজনকে একসাথে আলতো করে কোলে নিল। আফিয়া খাতুন, শেহেজাদ খান আর সাহাবাজ খান মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে এলেন। আইয়ুবরা সকলে থেকে একে একে বাচ্চা দুটিকে কোলে নিতে লাগল। সকলের মাঝে আজ আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল।
