খান সাহেব পর্ব ৮৩ (৩)
সুমাইয়া জাহান
রুমের পরিবেশ গুমোট হয়ে গেল। সুমু কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
“আপনি এত সবকিছু কীভাবে জানলেন?”
অন্ধকার ভেদ করেই যেন শেরাজের চোখ সুমুর ওপর গিয়ে আটকালো। সে দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আফগানিস্তান থেকে ওমানে স্থানান্তরিত হওয়ার পর যখন নতুন জীবনের সূচনায় এখানকার বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম—একজন নিতান্ত নীরব, আত্মমগ্ন ছেলেকে। সে কারও সঙ্গে কথোপকথনে জড়িত হতো না, সহপাঠীদের কোনো আড্ডায় নিজেকে মেলাতো না, বলতে গেলে একেবারে ‘অন্তর্মুখী স্বভাবের’ মানুষ। যাকে ইংরেজিতে বলে ‘ইনট্রোভার্ট’ টাইপের মানুষ। অথচ সেই নীরব ছেলেটিই ছিল আমাদের শ্রেণির সর্বোচ্চ মেধাবী, একেবারে ক্লাস-টপার।
যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী তার নীরবতাকে অহংকার ভেবে দূরে সরে যেত, সেখানে তার ব্যক্তিত্ব আমার কাছে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।
আমার পড়াশোনার প্রতি স্বভাবতই বিরাগ ছিল। পাঠ্যবইয়ের নাম শুনলেই মাথাব্যথা চেপে বসত। ফলে স্কুলজুড়ে সমস্ত দুষ্টুমির নেতৃত্ব আমাকেই নিতে হতো। তবে হ্যাঁ! আমি কিন্তু ক্রিকেট খুব ভালো খেলতাম। সবাই জানত ক্রিকেট আমার প্রিয় খেলা। ওদিক থেকে আমি আমার ক্লাসের সবার আগে ছিলাম। তখন আমার সাথে আমার টিম আইয়ুবরা তো ছিল-ই। তবুও—সেই ছেলেটা, অর্থাৎ আমাদের ক্লাস টপার রায়য়ান চৌধুরী—আমার কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রইল।
একদিন সাহস করে তার সঙ্গে আলাপ জমাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া তো দূরের কথা, তার অভিব্যক্তিতেও কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই সময়, একদিন আরিয়ান তার বাবার সাথে—অর্থাৎ আফতাব চৌধুরীর সঙ্গে—আমার সাথে দেখা করতে আমাদের স্কুলে এলো। রায়য়ান আগে থেকেই আফতাব চৌধুরীকে চিনত, কারণ মরিয়ম আন্টি তাকে তার অতীতের প্রতিটি করুণ অধ্যায় নিখুঁতভাবে জানিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন—রায়য়ান যেন নিজের ইতিহাস জেনে, নিজের ক্ষতচিহ্ন চিনে, নিজেকে আরও শক্ত, দৃঢ় ও যোগ্য করে তুলতে পারে।
সেদিন আফতাব মামু আর আরিয়ানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ শেষে যখন আমি পুনরায় ক্লাসরুমে ফিরে এলাম, তখন সেই নীরব, গম্ভীর, একঘেয়ে ছেলেটা—যে কখনও কারও সামনে দাঁড়াত না—সে ঠিক আমার সামনে এসে উপস্থিত হলো। সে এসেই আমার হাত ধরেই টেনে নিয়ে গেল ক্যান্টিনের ভেতর। আমিও বিনাবাক্যে চুপচাপ ছেলেটার সাথে চলে গেলাম।
ক্যান্টিনে ঢুকতেই কফির ঘ্রাণে হালকা ধোঁয়াটে একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। দু’জনে টেবিলে বসতেই ছেলেটা কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে দুইটা স্ট্রং কফির অর্ডার দিল। অর্ডার দিয়ে সে আমার দিকে ঘুরে তাকাল। আমি তখন চুপচাপ, ঠাণ্ডা চোখে তাকে দেখছিলাম। ছেলেটা গলা খাঁকারি দিয়ে খুব সোজাসুজি, কোনো ঘুরপথ ছাড়াই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘আফতাব চৌধুরী তোমার কে হয়?’
আমার আঙুলের গাঁট শক্ত হয়ে উঠল। আমি খুব ভয়ংকর স্থির গলায় বললাম, ‘ওটা যেন তোমার কী কাজ?’
ছেলেটা যেন আমার কথাটা গিলল। সে ঠাণ্ডা গলায় আবারও আমাকে বলল, ‘আমার কী কাজ তা জেনে তোমার কোনো লাভ নেই। তুমি শুধু বলো, তুমি ওই লোকটাকে কীভাবে জানো?’
আমি নিজেও কম বাঁকা-রগের নই—অতএব কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই ক্যান্টিনের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এসেছিলাম। এরপর বহুদিন ধরেই এই নীরব যুদ্ধ চলল।
রায়য়ান বহুবিধ কৌশল প্রয়োগ করেও আমার মুখ থেকে একটি শব্দও আদায় করতে পারল না। তার অস্থিরতা ক্রমে বিরক্তিতে পরিণত হলো, আর বিরক্তি একসময়ে তাকে বাধ্য করল আপসের পথে।
অবশেষে একদিন সে আমার সামনে এক অদ্ভুত শর্ত রাখল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সে কেন আফতাব চৌধুরীর পরিচয় জানতে উদগ্রীব, তার সম্পূর্ণ কারণ আমাকে খুলে বলবে, এর বিনিময়ে আমাকেও আফতাব চৌধুরী সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য নির্ভয়ে তার সামনে উন্মোচন করতে হবে।
অনেকক্ষণ নীরব চিন্তার পর আমি ওই প্রস্তাবে সম্মতি দিলাম। এরপর রায়য়ান তার অতীতের জটিলতম অধ্যায়গুলো একে একে আমার সামনে মেলে ধরল। অন্ধকার, তার জন্ম, জীবনের হিসেব-নিকেশ, এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সেই কষ্টে ভরা কাহিনি নিঃশব্দে শুনলাম আমি। তারপর আমিও আমার মামার সম্পর্কে যা যা জানি, কোনোকিছু না গোপন করে সমস্তটাই তাকে জানালাম। এভাবেই, সন্দেহ ও দূরত্বের অতল গহ্বর অতিক্রম করে ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে এক অদ্ভুত, দৃঢ় ও নীরব বন্ধুত্বের সূচনা হলো।
ছেলেরা হয়ত ভালোবাসা নিয়ে অভিনয় করতে পারে। কিন্তু ছেলেরা কখনও বন্ধুত্ব নিয়ে অভিনয় করে না। তাদের বন্ধুত্ব খুব স্ট্রং হয়। আমি আর রায়য়ানও ঠিক তেমন বন্ধুই হয়ে উঠলাম। একদম একে অপরের প্রাণ হয়ে গেলাম। আমাদের জীবন নারী ছাড়া চলেছিল, কিন্তু দুজন দুজনকে ছাড়া নয়।”
“হ্যাঁ এভাবেই শুরু হয়েছিল আমাদের বন্ধুত্ব, আর এখন আমরা একে অপরের প্রিয় শত্রু।” রায়য়ান তীক্ষ্ণ গলায় কথাটা বলে থামল।
পাশ থেকে আরিয়ান মাথা তুলে তাকাল তার দিকে। অন্ধকার ভেতর থেকে শেরাজের থেকে চোখ সরিয়ে রায়য়ানের দিকে চোখ রাখল সুমু। রায়য়ান রক্তে ভরা একদলা থুথু মেঝেতে ছুড়ে ফেলে বলল,
“আমার জীবনে একটাই লক্ষ্য ছিল— প্রতিশোধ। আমি ইচ্ছে করলে আরিয়ানকে, এমনকি আফতাব চৌধুরীকেও, এক মুহূর্তে পৃথিবীর পাতার ওপাশে পাঠিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ মৃত্যু তাদের প্রাপ্য শাস্তি নয়। মৃত্যু নামক অবসান তো এক অর্থে মুক্তি। আর আফতাব চৌধুরীর মতো পাপীকে মুক্তি দেওয়ার মতো মহত্ত্ব আমার ছিল না। আমি চেয়েছিলাম—তারা তিলে তিলে ক্ষয়ে যাক, ধ্বংস হোক তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি ভুলে, প্রতিটি অভিশাপে।
এস.কের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর যখন আরিয়ান মাঝে মাঝে কোরিয়া থেকে ওমানে আসত, তখন ধীরে ধীরে, হিসাবি ভঙ্গিতে আমি ওর কাছাকাছি যাওয়া শুরু করলাম। বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে ওকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিতে লাগলাম। অহংকার, ভোগবিলাস, বেপরোয়া সিদ্ধান্ত—সবকিছু দিয়ে ওকে বিগড়ে তুললাম এমনভাবে, যাতে আরিয়ান নিজেই নিজের অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আফতাব চৌধুরী চেয়েছিলেন উপযুক্ত একজন উত্তরাধিকার—যার হাতে তিনি হস্তান্তর করবেন তার সাম্রাজ্য, মর্যাদা, ক্ষমতার ভার। কিন্তু আমার অদৃশ্য ছুরির প্রথম আঘাত পড়ল সেখানেই। আরিয়ান যখন ধীরে ধীরে নষ্ট হতে লাগল, অসামঞ্জস্য আর অপচয়ে ডুবে যেতে লাগল, তখন দায়িত্ব তো দূরের কথা—আফতাব চৌধুরী তাকে নিজের সন্তান বলে পরিচয় দিতেই লজ্জা পেতেন। এটাই ছিল আমার প্রতিশোধের প্রথম অধ্যায়।
এরপর একদিন হঠাৎই খোঁজ পেলাম—ওমান শহরের গোপন তলানিতে লুকিয়ে থাকা সেই ভয়ঙ্কর আন্ডারওয়ার্ল্ডের। যার ছায়ামাত্র শুনলেই মানুষের রক্ত হিম হয়ে যেত। তার নাম—ইমরান আল-সাইফ। পুরো শহরের নীরব সন্ত্রাস। এস.কে ছিল আমার ছায়াসঙ্গী, আমার অপরাধী জীবনের সহযাত্রী। আমি, এস.কে আর আরিয়ান— তিনজন মিলে অবশেষে রওনা হলাম সেই অন্ধকার সাম্রাজ্যের সিংহাসনের দিকে। আমার উদ্দেশ্য ছিল একটাই— এই দুনিয়ার সর্বোচ্চ অপরাধ-শক্তির অংশ হয়ে ওঠা। দীর্ঘ আলোচনার পর, বহু পরীক্ষা আর সন্দেহের দেয়াল অতিক্রম করে আমি এস.কে আর আরিয়ানকে রাজি করালাম। আর তারপর আমাদের তিনজনকেই টেনে নিলো সেই ভয়াল সংগঠন। সেই দিনটাই ছিল আমাদের জীবনের অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমার আর এস.কের কাজের নিখুঁততা, বিশ্বাসযোগ্যতা, আর নির্ভুল নিষ্ঠুরতা আমাদের নিয়ে গেল সরাসরি মাফিয়া লিডারের বাঁ আর ডান হাতের আসনে। আমরা তখন তার চোখের মণি। তিনি যেমন বলতেন— আমরা তেমন করতাম। কিন্তু আরিয়ান? ও ছিল বেপরোয়া, অগোছালো,
নিজের খ্যাতি আর চলচ্চিত্রজগতের চাকচিক্যে ডুবে থাকা এক আত্মতৃপ্ত ছেলে। মাফিয়া টিমে ওর অংশগ্রহণ ছিল নিছক শখ, কোনো প্রতিশ্রুতি বা দায়বদ্ধতা নয়। আমাদের লিডার ছিল একেবারে নৃশংস। তার চোখে না ছিল দয়া, না ছিল মানবিকতার শিখা। কিন্তু তিনিও তো রক্ত-মাংসের মানুষই ছিলেন। বয়সের ভারে যখন শরীর ভেঙে এলো, তখন মৃত্যুর আগেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন—এই মহানগরের ক্ষমতার সাম্রাজ্য কোনো যোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দিবেন।
আমি ছিলাম বরাবরই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত আর নিষ্ঠুরতায় অভ্যস্ত। বার আর নাইট ক্লাব থেকে দেহ বিক্রিতে জড়ানো ছেলেমেয়েদের তুলে এনে আমি তাদের নির্মমভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতাম। কারণ নোংরামি আমার সহ্যের বাইরে ছিল। আমি ঘৃণা করি সেইসব মানুষকে যাদের নোংরামির কারণে জন্ম নেয় ‘অবৈধ সন্তান’। যাদের পৃথিবীতে আসা যেমন অনাহূত,
তাদের বেঁচে থাকাও সমাজের কাছে অপরাধ। সমাজ সেই শিশুকে স্বীকার করে না, মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দেয় অবিরত। আর তখন সেই ক্ষুধা, অবহেলা, অপমানের আগুনে শিশুরা আমার মতো অপরাধীতে পরিণত হয়ে বড় হয়ে উঠে।
কিন্তু এস.কে ছিল আলাদা। কঠোরতার মাঝেও ওর ভেতর ছিল এক প্রকার শৃঙ্খলা, এক প্রকার মানবিক নির্মোহতা। ওর কাজ, ওর পরিকল্পনা, ওর সিদ্ধান্ত— সবই ছিল পরিমিত, নিখুঁত, আর সেগুলো আমাদের লিডারের চোখে ছিল প্রশংসিত।
শেষমেশ লিডার তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। এস.কে হলো টিমের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী, ম্যাফস্টার—টিম লিডার। আমাকে করলেন তার আনুষ্ঠানিক মাফিয়া, শক্তি আর রক্তের দ্বিতীয় স্তম্ভ। আর আরিয়ানকে দিলেন ‘গ্যাংস্টার’ উপাধি। নামটুকু বড়, কিন্তু কাজের ভার তেমন নয়। এই তিনজন তখনও হয়ে উঠল একে অপরের পরিপূরক। এক মাফিয়া আর এক গ্যাংস্টার মিলে হলো, ম্যাফস্টার। এভাবেই আমরা তিনজন তিনটি অন্ধকার পরিচয়ে চলে গেলাম সেই অতল গভীরতার দিকে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।
ঘরের বাতাস যেন থমথমে। সুমুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। আজ যেন অনেক অজানাকে জানার পালা তার। রায়য়ান লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলতে শুরু করল,
“আফতাব চৌধুরী নিজের নাম, বংশমর্যাদা ও খ্যাতির মোহে এতটাই নিমজ্জিত ছিল, যে তার অতীত সম্পর্কে এস.কে প্রশ্ন তুলতেই তার মুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার ছায়াও ফুটে ওঠেনি। মানুষ যখন খ্যাতির অহংকারে অন্ধ হয়ে যায়, তখন তার বিবেক প্রথমেই মৃত্যুবরণ করে—আফতাব চৌধুরীর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছিল।
অন্যদিকে আরিয়ানের বেপরোয়া, দায়িত্বহীন স্বভাব ওকে দিয়ে ঘটিয়েছে একের পর এক নোংরা ভুল। অবশেষে সেই দিনটি এলো, যেদিন আরিয়ান সুহাসিনীকে চৌধুরী ম্যানশনে আটকে রেখে তার সম্মান হরণের মিথ্যা ভয় দেখাল। এই ঘটনা ঘটানোর কারণে এস.কে’র হাতে আরিয়ান প্রায় আধমরা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে আফতাব চৌধুরী ও মৌ সেন দুজনেই শেরাজের বিরুদ্ধে নীরব রইলেন। তাদের নীরবতা ছিল কাপুরুষের নীরবতা— ন্যায়ের ভয় নয়, সম্মান হারানোর ভয়। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানতেন, এস.কে যদি মুখ খুলে দেয় তাহলে তাদের অতি যত্নে লুকিয়ে রাখা অতীতের সবচেয়ে নোংরা অধ্যায়টি পুরো শহরের সামনে নগ্ন হয়ে যাবে। ইভেন, সবাই জেনে যাবে যে ওমানের কুখ্যাত মাফিয়া রায়য়ান চৌধুরী আফতাব চৌধুরীরই অবৈধ সন্তান। এই ছেলে সেই নারীর সন্তান, যাকে একসময় আফতাব চৌধুরী
বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা করেছিলেন, ধ্বংস করেছিলেন তার জীবন, আর শেষে তাকে সমাজের মুখোমুখি করে নিঃসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ সত্য ফাঁস হয়ে গেলে আফতাব চৌধুরীর গড়া ‘সম্মান’-এর প্রাসাদ এক রাতে ধুলোয় মিশে যেত। তাই তারা নীরব ছিল, কারণ ন্যায়বিচারের ভয় নয়, ভয় ছিল সত্যের সামনে দাঁড়ানোর।
এস.কের সাথে আমার বন্ধুত্বের ভাঙনটা শুরু হয়েছিল নিছক ব্যক্তিগত কারণে নয়—এর মূল ছিল বিজনেস, লোভ আর নীতির সংঘর্ষ। এস.কে—যে ছিল অন্ধকার দুনিয়ার ‘ম্যাফস্টার’, সে তার ব্যবসা পরিচালনা করত নিখাদ সততার ওপর দাঁড়িয়ে। ওর ব্যবসা ছিল ওর স্বপ্ন, ওর পরিচয়, ওর অহংকার। ও সেখানে কোনো অসৎ পথ, কোনো ফাঁকিবাজি, কোনো দূষিত লাভ চায়নি।
কিন্তু আমি? আমি চাইতাম অন্ধকারকে ব্যবহার করে আলোর পথকে কিনে নিতে। আমি ওকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম—বাজারে ডুপ্লিকেট মাল সাপ্লাই করার জন্য। কম খরচে বেশি মুনাফা করার জন্য। সততা আর নীতিকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার জন্য। প্রস্তাবটা আমি খোলাখুলিই দিয়েছিলাম— কিন্তু এস.কে সোজাসুজি, কোনো দ্বিধা ছাড়াই আমার মুখের ওপর ‘না’ বলে দিয়েছিল।
আমি রায়য়ান চৌধুরী—যার রক্তে আগুন, যে ‘না’ শব্দটাকে সহ্য করতে পারে না—সেদিন সেই প্রত্যাখ্যান আমার ভেতরে অগ্নিপিণ্ডের মতো ঘা তৈরি করে দিল। সেই ‘না’ আমাদের ভেতরে এক ভয়ংকর বিচ্ছেদ বপন করেছিল। ঝামেলাটা প্রথমে ছিল বিতর্ক, তারপর তর্ক, তারপর ক্রোধ, শেষমেশ বিষাক্ত শত্রুতায় রূপ নিল। এবং তার ছায়া গিয়ে পড়ল আমাদের বন্ধুত্বের ওপর—যে বন্ধুত্ব এতদিন রক্ত, আগুন আর মৃত্যুকে ছাপিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলাম এস.কের ওপর। ওর ব্যবসায়িক অহংকার, ওর সততা, ওর বিজনেসের দিক দিয়ে ‘সঠিক পথে চলার’ জেদ—সবকিছুই আমাকে আঘাত করছিল। আমি চাইলাম ওকে ভেঙে দিতে, ওর অহংকারকে মাটিতে নামাতে। ঠিক তখনই শুনলাম—এস.কে নাকি বিডিতে গিয়ে এক মেয়েকে পাগলের মতো ভালোবেসে বিয়ে করেছে। আর তখন তো আমি ওর দুর্বলতা, ওর কোমলতা—সেটাই খুঁজছিলাম। ওর মতো মানুষকে ভাঙতে তো ওর ওই হৃদয়টাই ওর সবচেয়ে নরম জায়গা।
আমি শিকারির মতো নজর বোলালাম সেই মেয়ের ওপর। তাকেই টার্গেট করলাম। তাকেই বানালাম আমার প্রতিশোধের কেন্দ্র। আরিয়ানদের বাড়িতে ‘সুমুরাজ ওয়েলকাম’ পার্টিতেই আমি সেই মেয়েকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। সেদিন এক ঝটকায় এস.কের পৃথিবী ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল আমার। কিন্তু এস.কে—যে আমাকে অস্বীকার করেছিল, যে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল— সেই এক সেকেন্ডেই আমার পুরো পরিকল্পনাটা নস্যাৎ করে দিল। আমার হাত থেকে টার্গেটকে ছিনিয়ে নিল। সেদিনই বুঝলাম—বন্ধুত্বের অবসান শেষ নয়, এর মূলে জন্ম নেয় এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা, যা মানুষকে মানুষ থেকে অমানুষে পরিণত করে।
এরপর আরও অসংখ্য পথ বেছে নিয়েছিলাম সেই মেয়েটিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। বিজনেস টকের নাম করে এস.কের অফিসে ঢুকলাম— একটি নিছক কথোপকথন নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত নৃশংসতার প্রথম ধাপ নিয়ে। ওর অফিসে যে স্টাফ প্রতিদিন সবাইকে চা, কফি দিত, তাকে ভয় আর টাকার মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অন্ধকারে বেঁধে ফেলেছিলাম আমি। লোকটা আমার জন্য বাধ্য হয়ে আর আর মানুষ ছিল না, হয়ে উঠেছিল আমার হাতের দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রমাত্র।
ওইদিন এস.কের কফিতে লোকটা আমার কথা মতো আমার দেওয়া ড্রাগ মিশিয়ে দিয়েছিল। এমন একটি ড্রাগ, যা রাগ উস্কে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমার অবধারিত হিসেব ছিল, অতল ক্ষোভে অন্ধ হয়ে বাড়ি ফিরে এস.কে নিজের হাতে তার প্রাণভ্রমরাকে, তার আলোকে বিদীর্ণ করে ফেলবে। কিন্তু মানুষ কখনো কখনো বীভৎসভাবে অনুমানভঙ্গ করে। আর হলোও তাই, ও মারল না ওর স্ত্রীকে।
কিন্তু ঘৃণায় অন্ধ হয়ে শূন্য হাতে সে তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তটার অপেক্ষাতেই ছিল আমার লোকেরা। পরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্দা নিখুঁতভাবে নেমে এলো। তারা তাকে ধরে নিয়ে গেল—এই ভূগর্ভস্থ অন্ধকারে জঙ্গলে। সেই রাতে হত্যা করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল, কিন্তু যখন মেয়েটি মাথা উঁচু জোর গলায় কথা বলল, তখন তার ভয় না-থাকা চোখে নির্মম আলো ঝলসে উঠল। আমি প্রথমবার কলে উপলব্ধি করলাম, মৃত্যু তাকে যতটা শেষ করবে, তার সাহস আমাকে ততটাই অসম্পূর্ণ রাখবে। তাই তাকে মরতে নয়—ভাঙতে হবে। এরজন্যই তাকে নিয়ে এসেছিলাম আমার এই পাতালপুরীতে, আমার নির্মম সাম্রাজ্যে। যেখানে আলো ঢোকে না, আর মানুষের আর্তনাদও দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে।
আমরা লোকেরা জানালো, সে প্রেগন্যান্ট। এস.কের সন্তানের মা হতে যাচ্ছে। ঠিক তখনই এস.কে’কে ধ্বংস করার নিখুঁত মুহূর্ত একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। একটি ইনজেকশনের নির্মম টোকায় আমি সেই অনাগত শিশুটাকে তার শরীর থেকে ছিঁড়ে নিতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু ভাগ্য… ভাগ্য নামক ওই নিষ্ঠুর, ব্যঙ্গাত্মক খেলোয়াড়—আমার জন্য অন্য এক অন্ধকার কাহিনি লিখে রেখেছিল। এক নারীর নোংরামি আমাকে এই পৃথিবীতে এনেছিল, আর সেই একই নারী আমাকে জন্ম দিয়ে এক নিঃশ্বাসে আমাকে এতিম করে দিয়ে চিরতরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। ওই এক নারীর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমি সমগ্র নারীগোষ্ঠীকে ঘৃণার আগুনে পুড়িয়েছিলাম।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে, পরিহাসের মতো, ওই তুলে আনা নারী আমার বরফজমা প্রাণে প্রথমবারের মতো এক বিন্দু মায়ার আলো জ্বালিয়ে দিল। ঠিক সেই মায়ার টানেই আমি ভাবলাম তাকে একান্তই নিজের করে রাখার জন্য তাকে নিয়ে ভারত চলে যাব। পৃথিবীর সকল বাঁধন, সকল ইতিহাস ছিঁড়ে গোপনে তাকে আমার জীবনের অংশ করে ফেলব।
কিন্তু যত গভীরেই আমি নেমেছি, ততই বুঝেছি, এভাবে তাকে নিয়ে গেলে সে আমাকে ভালোবাসবে না, বরং এক অসহ্য ঘৃণায় ভরে উঠবে তার চোখ। আর জীবনের প্রথম… হ্যাঁ, প্রথমবার কোনো নারীর প্রতি আমার হৃদয় নত হয়েছিল। আর তাই সেই নারীর চোখে নিজের জন্য ঘৃণা দেখার মতো সাহস আমার ছিল না। সেটা মৃত্যু থেকেও ভয়ংকর। তাই বুকের ওপর পাহাড়সম পাথর চাপা দিয়ে আমি প্ল্যান বদলে ফেললাম। আর তাকে তার ভালোবাসার মানুষের কাছেই ফিরিয়ে দিলাম একেবারে অক্ষত, একেবারে পূর্ণ অবস্থায়, যেন সে কখনো আমার অন্ধকার ছায়ার মধ্যে বন্দি হয়নি।”
সুমু অন্ধকার থেকে খুব মৃদুস্বরে বলল,
“চাইলেই কি পারতেন না অতীত ভুলে… নিজের জীবনটা নতুন করে সাজাতে? সুন্দর করে বাঁচতে?”
রায়য়ান দীর্ঘক্ষণ কণ্ঠস্বর ভেসে আসা সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। সুমুর কথাটা যেন তার বুকের গভীরে পুরোনো ক্ষতের ওপর লবণের মতো পড়ে জ্বালা ধরাল।
“কখনই না। অতীত ভুলে গেলে আমি আজ এই বিশাল সাম্রাজ্য তৈরি করতে পারতাম না। মানুষ বলে অতীত ভুলে নতুন করে শুরু করতে। কিন্তু আমি জানি, অতীত মনে রাখলেই আমি নতুন করে সবটা শুরু করতে পারব।
সে থামল। একটু দম নিয়ে আবারও বলল,
“মানুষ অতীত মনে না রাখলে আবারও সে একই ভুল করবে। আমি আমার অতীতের ভুলগুলো মনে রেখেছি বলেই আজ সে ভুলগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করিনি। অতীত ভুলে যাওয়া মানে নিজের সেই পুরোনো ক্ষতিকে আবার ডাক দিয়ে আনা—আর আমি সেটা করতে চাই না।”
সুমু যেন কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেল না। রায়য়ান আবারও বলল,
“ভুলে যাওয়া? সুহাসিনী, যে মানুষটা তার শৈশবই পায়নি, যে তার জন্মের দিনে পৃথিবীর কাছে ত্যাজ্য হয়ে গেছে, তার ভুলে যাওয়ার মতো আর কী আছে? আমি তো জীবনের শুরুটাই পাইনি। সাজাবার মতো ‘জীবন’ নামের কোনো রঙও ছিল না আমার কাছে। সৌন্দর্য আর জীবন সাজানো তাদেরই মানায়, যাদের হৃদয়ে আলো থাকে।
খান সাহেব পর্ব ৮৩ (২)
আমার ভেতরটা তো সেই আলো দেখেনি কোনোদিন। তুমি যদি ভাবো মানুষ সবসময়ই ফিরে আসতে পারে, সুন্দর হতে পারে— তবে জেনে রাখো, সব মানুষকে আল্লাহ সেই সুযোগ দেন না। কারও অতীত এতটাই ধারাল, এতটাই রক্তমাখা, যে সে ফিরে আসার পথেই হাঁটতে ভুলে যায়। আমিও পারিনি।”
সে শেরাজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“এস.কের জীবনের মতো তুমি আমার জীবনের আরও আগে এলে, আমি হয়তো মানুষ হয়ে উঠতে পারতাম। কিন্তু আমি তো তার বহু আগেই দানব হয়ে গেছি। আর তুমিও আমার জীবনে নিষিদ্ধ হয়ে এসেছ।”
