খান সাহেব পর্ব ৮৭
সুমাইয়া জাহান
গাড়ির চাকা খান ম্যানশনের নুড়ি বিছানো পথে এসে থামল, সুমুর মনে হলো হৃদস্পন্দন বুঝি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেছে। পাঁচটি বছর! এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সে আবারও সেই রাজপ্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমবার যখন এই বাড়িতে পা রেখেছিল, তখন তার হাতে ছিল শেরাজ খানের বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ। আজ সেই হাত দুটো খালি, কেবল দুই পাশে দুই সন্তানের ছোট ছোট হাতের মুঠোয় ধরা তার অস্তিত্ব।
গাড়ি থেকে নামতেই এক বিশাল স্তব্ধতা তাকে অভ্যর্থনা জানাল। তবে এ স্তব্ধতা অবহেলার নয়, বরং পরম শ্রদ্ধার। ফটকের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন অনন্যা খাতুন আর সাহাবাজ খান। সাহাবাজ সাহেবকে দেখে সুমুর বুকটা ফেটে গেল—একসময়ের সেই হাসিখুশি, প্রতাবশালী লোকটা আজ যেন বয়সের ভারে নয়, বরং অনুশোচনা আর পুত্রশোকের ভারে নুয়ে পড়েছেন। অনন্যা খাতুন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু সুমুকে দেখা মাত্রই তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল।
সুমুর একটু পেছনেই সবাইকে নিয়ে ধীর পায়ে এগোচ্ছিল সারবাজ আর আরবাজ। সুমু দরজার কাছে আসতেই দেখল শেহেজাদ খান আর আফিয়া খাতুন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। আফিয়া খাতুন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, তিনি সুমুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার কান্নায় মিশে আছে হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলোর হাহাকার। পাশে রুহি খাতুন আর আদনান চৌধুরী দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখের জল মুছছেন।
সুমু ধীর পায়ে সাহাবাজ সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সাহাবাজ সাহেব কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে সুমুর মাথায় রাখলেন। তার গলার কোনো শব্দ বের হলো না, কেবল এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। সুমু নিচু স্বরে বলল,
“আব্বু, আমি ফিরেছি। আপনার আমানত আপনাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে এসেছি।”
অনন্যা খাতুন এগিয়ে এলেন। তিনি কোনো কথা না বলে সুমুর দুই হাত নিজের হাতের ভেতর নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলেন। সেই স্পর্শে ছিল ক্ষমা চাওয়ার আকুতি আর হারানো সন্তানকে ফিরে পাওয়ার এক অদ্ভুত আর্তি। তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না।
সুমু অনুভব করল, এই বাড়ির প্রতিটি ইটে শেরাজ খানের উপস্থিতি আজও অমলিন। ইশিতা আর ইনায়া মিলে সুমুকে তার সেই পুরোনো ঘরের দিকে নিয়ে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সুমুর মনে হলো, পেছন থেকে কেউ বুঝি ডাকছে— ‘সুইটহার্ট!’ সে থমকে দাঁড়াল, কিন্তু না, এ কেবল মনের ভুল। স্মৃতির ঘর থেকে বেরিয়ে আসা এক অবাধ্য শব্দ। আজ বিচার শেষ হয়েছে, দণ্ড ভোগ করাও সারা, এখন তার শুরু হলো এক নিঃসঙ্গ রাজপ্রাসাদে মাতৃত্ব আর বৈধব্যের এক নতুন লড়াই। প্রতিটি ধাপে সুমুর মনে হচ্ছিল, সে যেন বর্তমান থেকে অতীতে হেঁটে যাচ্ছে। দরজার কাছে পৌঁছাতেই ইনায়া ধীরহস্তে পাল্লা দুটো সরিয়ে দিল। সুমু এক পা ভেতরে বাড়াতেই তার নাসারন্ধ্রে এসে লাগল সেই অতি পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ। পাঁচটা বছর ঘরটা তালাবদ্ধ ছিল, কিন্তু সুমুর মনে হলো তার খান সাহেব বুঝি এইমাত্র ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
বিশালাকার কিং সাইজ বেডটা আগের মতোই টানটান চাদরে ঢাকা। ড্রয়ারের ওপর শেরাজের সেই দামী হাতঘড়িটা স্থির হয়ে আছে, যেন মালিকের ফেরার অপেক্ষায় সময়কেও সে থামিয়ে দিয়েছে। সুমু ধীর পায়ে খাটের কিনারায় গিয়ে বসল। ইনায়া আর নাজমিন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাকে কিছুটা একান্ত সময় দিতে চাইল। সিমরান আর শেরান তখন বাইরে রুহি আর নিশানের সাথে খেলাধুলায় মেতেছে।
হঠাৎ অনন্যা খাতুন ঘরে প্রবেশ করলেন। তার পদশব্দে কোনো দম্ভ নেই, বরং এক ধরণের কুণ্ঠা আছে। তিনি সুমুর পাশে এসে বসলেন। দীর্ঘ সময় কেউ কোনো কথা বললেন না। সাহাবাজ সাহেবও এসে দাঁড়ালেন। অনন্যা খাতুন সুমুর একটা হাত নিজের কোলের ওপর নিয়ে বললেন,
“মামনি, তুই এই বাড়িতে পা দেওয়ার পর আজ সত্যি মনে হচ্ছে এই বাড়িতে প্রাণ ফিরে এসেছে। শেরাজ যাওয়ার পর আমি প্রতিদিন এই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতাম, কিন্তু ভেতরে ঢোকার সাহস পাইনি। মনে হতো, ভেতরে ঢুকলেই হয়তো দেখব আমার ছেলেটা নেই।”
সুমু জানালার ওপারে সমুদ্রটার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“এই ঘরটা আমার কাছে কোনোদিনও কেবল একটা ঘর ছিল না, আম্মু। এটা ছিল একটা রণক্ষেত্র, যেখানে প্রতিদিন আমি খান সাহেবের ভালোবাসার কাছে হারতাম, আর উনার পৈশাচিকতার কাছে নিজেকে বিলিয়ে দিতাম। আজ এই ঘরটা বড্ড শান্ত, এমনটা উনি কোনদিনও চাননি। উনি সবসময় চেয়েছিলেন, এই ঘরটা হাসি আর আনন্দে ভরে থাকুক।”
অনন্যা খাতুন সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বললেন,
“আমায় কি তুই কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবি রে, মা? আমি জানি, সেদিন আমি অনেক বড় ভুল করেছি। ছেলেকে হারানোর শোকে ছেলের অন্যায়গুলোকে বিচার না করে তোকে কতো বাজে কথা শুনিয়েছি। আমি জানি একদিন তুই সব ঠিক করে দিবি। কিন্তু দেখ, আজ আমার ছেলে আমার পাশে নেই, ঐশ্বর্য আছে কিন্তু শান্তি নেই। এই শেষ বয়সে শুধু তোর ক্ষমাটুকু নিয়ে মরতে চাই।”
সুমু ম্লান হাসল। সেই হাসিতে কোনো তিক্ততা নেই, আছে এক অসীম ক্লান্তি। সে মৃদু গলায় বলল,
“ক্ষমা করার প্রশ্ন এখানে কেন আসছে, আম্মু? সন্তান হারানোর শোকে আপনি আমাকে ওসব কথা বলেছিলেন। এখানে আপনার কোনো ভুল নেই। আপনার জায়গায় যেকোনো মা-ই ওই অবস্থায় এমন করত। আর আপনি জানেন, ওমানের ওই জেলখানার চার দেয়াল আমাকে শিখিয়েছে যে, ঘৃণা পুষে রাখলে নিজের আত্মাটাই আগে দগ্ধ হয়।”
অনন্যা খাতুন সুমুর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। পাশেই দাঁড়িয়ে সাহাবাজ খান, যার চোখে আজ অনুশোচনার নোনা জল। একসময়ের সেই সেনাবাহিনীর কঠোর শাসক আজ সুমুর সামনে নতজানু। তিনি ধরা গলায় বললেন,
“আমাদের মাফ করে দিস রে, মা। সেদিন যখন পুলিশ তোকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, আমরা শুধু ভেবেছিলাম তুই প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়ে আমাদের কোল খালি করেছিস। আমাদের ছেলেকে তুই নিজ হাতে শেষ করে দিলি—এই রাগে আমরা তোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই পাঁচ বছরে আমরা বুঝেছি, তুই আসলে ওকে মারিসনি, বরং ওকে এক অসহ্য দহন আর অপরাধবোধের নরক থেকে মুক্তি দিয়েছিস। নিজের জীবন উৎসর্গ করে তুই ওকে শান্তি দিয়েছিস, আর আমরা অপরাধীর মতো তোকে ঘৃণা করেছি।”
অনন্যা খাতুন ডুকরে উঠে বললেন,
“তুই নিজের সাজা ভোগ করলি শুধু ওকে বাঁচাতে। এমন আত্মত্যাগ কোনো সাধারণ মেয়ে করতে পারে না রে, মা। আমরা অন্ধ ছিলাম, তোর ভেতরের ওই এক সমুদ্র সমান ভালোবাসাটা আমরা কেউ সেদিন দেখতে পাইনি।”
সুমু খুব ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“জানেন আম্মু, বারবার আপনার ছেলে আমাকে ভালোবেসে জিতে যায়। উনি চেয়েছিল আমার হাতে মরতে, চেয়েছিল মৃত্যুর ওপাড়ে গিয়েও আমার স্মৃতিতে একচ্ছত্র রাজত্ব করতে। সেদিন আপনার ছেলেকে হারানোর মতো এতো সুন্দর সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। সবাই জানত শেরাজ খান এক নিষ্ঠুর প্রেমিক, কিন্তু সেদিন আমি প্রমাণ করেছি আপনার ছেলে আমাকে যতটা ভালোবাসে, আমি তাকে তার থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি চাইনি লোকে বলুক শেরাজ খান আত্মহত্যা করেছে, কিংবা তার বন্ধুরা তাকে মেরেছে।”
সুমুর কথাগুলো শুনে অনন্যা খাতুন আর সাহাবাজ খানের মধ্যে এক জমাট বাঁধা নীরবতা নেমে এলো। অনন্যা খাতুন সুমুর মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। একজন মা হিসেবে তার নাড়িছেঁড়া ধনকে ফিরে পাওয়ার আকুতি উপচে পড়ল। তিনি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আমি কি আমার সন্তানকে আর কোনোদিনও দেখতে পাব না, মামনি? আমার শেরাজ কি কোনোদিনও ফিরে আসবে না এই শূন্য ঘরে?”
সুমু, অনন্যা খাতুনের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে অনন্যা খাতুনের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল,
“অবশ্যই পারবেন, আম্মু। আপনার সন্তান কোথাও যায়নি। সে এই ঘরের প্রতিটা কোণায় মিশে আছে, আর সবচেয়ে বেশি আছে সিমরান আর শেরানের মাঝে। ওই দুটো শিশুর চোখের দিকে তাকালেই আপনি আপনার সেই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শেরাজকে খুঁজে পাবেন। কিন্তু আম্মু, আপনি যদি সেই রক্তমাংসের শেরাজকে খুঁজতে চান, তবে ধৈর্য ধরুন। আপনারা তাকে চোখের সামনে সুস্থ অবস্থাতেই দেখতে পারবেন।”
ঘরের দরজায় সজোরে করাঘাত হলো। সুমু দরজা খুলতেই দেখল সারবাজ দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। কপালে জমে থাকা ঘামগুলো মুছে নিয়ে সারবাজ অস্থির গলায় বলল,
“সুমু, হাতে একদম সময় নেই। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে যেতে হবে।”
সুমু তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“কেন ভাইয়া? কী হয়েছে? খান সাহেবের কোনো বিপদ হয়নি তো?”
সাহাবাজ খান আর অনন্যা খাতুনও আর্তনাদ করে উঠলেন। সারবাজ ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজাটা আবার সশব্দে আটকে দিয়ে বলল,
“না, এস.কে ঠিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশে আমাদের যে লোকগুলো ওকে পাহারা দিচ্ছে, তারা খবর পাঠিয়েছে যে ওমানের কোনো এক শত্রু পক্ষ এস.কের খোঁজ পেয়ে গেছে। গত রাতে এস.কের বাড়ির আশেপাশে কিছু অচেনা মানুষকে সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখা গেছে। স্যান্ডি মনে করছে, যে কোনো মুহূর্তে ওরা এস.কের ওপর হামলা করতে পারে। আমাদের খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশে পৌঁছাতে হবে।”
সুমুর চোখের মণি মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল, পরক্ষণেই সেখানে এক বিধ্বংসী আগুনের ঝিলিক দেখা দিল। সে আর সেই আগের শান্ত সুমু রইল না। সে সাহাবাজ খানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আব্বু, আমি বলেছিলাম না ওনাকে আমি আপনাদের চোখের সামনে সুস্থ অবস্থায় আনব? সময় এসে গেছে। কাল সকালেই আমরা বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেব।”
অনন্যা খাতুন ভয়ে কাঁপছেন, সুমু তার হাত ধরে আশ্বস্ত করে বলল,
“আম্মু, আপনি শক্ত হন। আপনার ছেলে বিপদসীমার বাইরে নেই ঠিকই, কিন্তু ওর চারপাশে যে ঢাল আছে, তা ভেদ করার ক্ষমতা ওমানের কোনো মাফিয়ার নেই। আমি যাব আমার খান সাহেবকে রক্ষা করতে।”
সারবাজ মাথা নেড়ে সায় দিল,
“আমি সব ব্যবস্থা করছি, সুমু। আইয়ুব আর নিহালরা অলরেডি রেডি হয়ে গেছে। সবাই এখন শুধু কাল সকালের অপেক্ষায়।”
সুমু দ্রুত পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। আলমারি খুলে সে বের করে আনল তার পুরোনো সেই কালো লেদার জ্যাকেট আর তার পার্সোনাল পিস্তলটা, যেটা সে গত পাঁচ বছর সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল। আজ আর সে কয়েদি নয়, আজ সে এক বাঘিনী, যে তার আহত সঙ্গীকে বাঁচাতে সমুদ্র পাড়ি দিতেও দ্বিধা করবে না।
বুরাইমির আকাশ আজ মেঘলা, যেন প্রকৃতিও কোনো এক গূঢ় শোকের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সুমু গোরস্থানে এসে দাঁড়াল। মরুভূমির বাতাস এখানে এলে যেন থমকে যায় আর ধুলোগুলো কবরের এপিটাফগুলোকে পরম মমতায় ছুঁয়ে থাকে।
সুমু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। তার পরনে আজ একটা শুভ্র পোশাক, যা শোক আর শান্তির প্রতীক। পায়ের তলায় শুকনো পাতার মচমচে শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সামনেই সারিবদ্ধ কয়েকটি কবর। প্রথমে সে দাঁড়াল আলিশার কবরের সামনে। সেই মেয়েটি, যে একটা লাল শাড়ির স্বপ্নে নিজেকে পুড়িয়ে ছাই করেছিল। সুমু নিচু হয়ে কবরের ওপর থেকে কিছু ধুলো পরিষ্কার করল। তার মনে পড়ে গেল আলিশার সেই আর্তনাদ—‘আমি আমার আর.সি-র জন্য সেজে এসেছি, সুমু!’ আজ আলিশা হয়তো তার সেই অধরা প্রিয়তমের খুব কাছেই ঘুমিয়ে আছে। পাশেই মরিয়ম বিবির কবর। সন্তানহারা এক মায়ের দীর্ঘশ্বাসের সমাপ্তি ঘটেছে এই সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে।
সুমু কিছুক্ষণ চোখ বুজে মোনাজাত করল। তারপর আরও কয়েক পা এগিয়ে যেতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। পাশাপাশি দুটো বড় কবর। ওমানের রুক্ষ পাথরে খোদাই করা নাম দুটো রোদের ঝিলিক আর ধুলোর আস্তরণের মাঝেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
একটিতে লেখা— “কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত” (প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে)।
স্মরণে: মরহুম রায়য়ান চৌধুরী!
অন্যটিতে লেখা— “কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত” (প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে)।
স্মরণে: মরহুম আরিয়ান চৌধুরী!
সুমু পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। যে মানুষগুলো একসময় শহর কাঁপিয়ে বেড়াত, যাদের হাতের ইশারায় রক্তের খেলা চলত, তারা আজ পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত। ক্ষমতার দম্ভ, প্রতিশোধের নেশা আর না পাওয়ার হাহাকার— সব আজ এই নিস্তব্ধ ধূসর বালুর নিচে বিলীন।
সে রায়য়ানের কবরের গায়ে হাত রাখল। পাথরটা ঠাণ্ডা, ঠিক রায়য়ানের সেই চাউনিটার মতো। সুমুর মনে পড়ল ব্যাগের ভেতরের সেই চিঠিটার কথা—‘আপনার মায়ায় আজীবন কারাবন্দি এক অপরাধী’। সুমু অস্ফুট স্বরে বলল,
“রায়য়ান… আজ আপনি মুক্ত। এক নিষিদ্ধ নারীর মায়া থেকে, এই নশ্বর পৃথিবী থেকে। আমাকে ভালোবাসার অপরাধে আমি আপনাকে ক্ষমা করিনি, কিন্তু ঘৃণা করার শক্তিটুকুও আজ হারিয়ে ফেলেছি।”
এরপর সে আরিয়ানের কবরের দিকে তাকাল। সেই অবুঝ ‘অতিথি পাখি’ ডাকটা আজ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সুমু অনুভব করল, মানুষগুলো খারাপ ছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের ভালোবাসাগুলো ছিল বড্ড বেশি নিখাদ আর বিধ্বংসী। তারা জানত না কীভাবে ভালোবাসতে হয়, তাই নিজেদের ধ্বংস করেই তারা সেই ভালোবাসার প্রমাণ রেখে গেছে।
সুমু এক মুঠো বুনো ফুলের পাপড়ি বের করে দুই কবরের মাঝে ছড়িয়ে দিল। কবরের গায়ের ফলক দুটো যেন আজ সাক্ষী দিচ্ছে—অপরাধের চেয়েও বড় সত্য হলো মৃত্যু, আর প্রতিহিংসার চেয়েও দামী হলো বিদেহী আত্মার শান্তি।
জিয়ারত শেষ করে সুমু পেছন ফিরল, তার দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। এই জল শোকের নয়, বরং এক ভারমুক্তির। সে বিড়বিড় করে বলল,
“আমি আপনাদের ফেলে রেখে যাচ্ছি না, বরং আপনাদের এই স্মৃতিগুলোকেই আমার জীবনের শিক্ষার অংশ করে নিলাম। আজ থেকে আপনাদের সাথে আমার আর কোনো দেনা-পাওনা রইল না।”
সে শেষবারের জন্য একবার পেছন ফিরে তাকাল। হঠাৎ তার পেছনে একে একে এসে দাঁড়াল একঝাঁক দীর্ঘদেহী যুবক—সারবাজ, আইয়ুব, আরবাজ, সাইফ, অমিত, রিসান, নিহাল, রিয়াদ, শাহরুখ, রিয়াজ আর ফাহিম। একসময় সারাদিন আনন্দ ফুর্তিতে মেতে থাকা এই দামাল ছেলেগুলোর চোখে আজ কোনো তেজ নেই, আছে শুধু পাহাড়সম বিষাদ।
পাশাপাশি চারটা কবর। আলিশা, মরিয়ম বেগম এবং সবার শেষে আরিয়ান ও রায়য়ান। নিথর মাটির বুকে খোদাই করা নামগুলো দেখে সারবাজ আর আরবাজ পাথরের মতো জমে গেল। আইয়ুব আর নিহাল একে অপরের কাঁধ ধরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। যে মানুষগুলোর সাথে তারা শৈশব থেকে যৌবন পর্যন্ত অজস্র স্মৃতি বুনেছে, যারা ছিল তাদের খেলার সাথী, আবার কখনওবা চরম শত্রু—আজ তারা সবাই এক সারিতে নিস্তব্ধ।
সারবাজ ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে আরিয়ানের কবরের শিয়রে হাত রাখল। গলার স্বর বুজে আসলেও সে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আরিয়ান… বন্ধু হিসেবে হয়তো অনেক না-বলা কথা থেকে গেছে আমাদের। কিন্তু আজ সব হিসাব চুকে গেল।”
রিয়াজ এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আরিয়ান আর রায়য়ানের নামফলক দেখা মাত্রই তার কিশোর মনটা হু হু করে কেঁপে উঠল। সম্পর্কে তারা তার মামাতো ভাই। যে রায়য়ানকে শুধুমাত্র সে তার ভাইয়ের বন্ধু হিসেবেই জানত, আর যে আরিয়ান তাকে রাজপুত্রের মতো থাকতে বলত—তারা আজ নেই। রিয়াজ কবরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নার শব্দে গোরস্থানের গাম্ভীর্য যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিহাল আর ফাহিম এগিয়ে এসে রিয়াজকে জাপটে ধরল, কিন্তু তাদের নিজেদের চোখ দিয়েও অশ্রু ঝরছে।
এরপর শুরু হলো সম্মিলিত মোনাজাত। মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ল এগারো জন যুবক। তাদের ঠোঁট কাঁপছে দোয়ার কলিতে। ফাহিম কোরআন তেলাওয়াত করল অত্যন্ত করুণ সুরে। তারা সবাই প্রাণভরে দোয়া করল—হয়তো এই দোয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে তাদের আজীবনের ক্ষমা আর বন্ধুত্বের শেষ নিবেদন। রায়য়ান আর আরিয়ানের প্রতি সব ঘৃণা আজ এই মোনাজাতের পবিত্রতায় ধুয়ে মুছে গেল।
মোনাজাত শেষ হতেই আইয়ুব একপাশে রাখা একটা বড় ব্যাগ থেকে যত্ন করে আনা চারটা লাল গোলাপের চারা বের করল। সে চারাগুলো সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ভেজা গলায় বলল,
“ভাবিজি, আপনি নিজ হাতে এগুলোকে ওদের কবরের পাশে ঠাঁই দিন। হয়তো এই ফুলগুলোর সুবাসে ওদের বিদেহী আত্মা একটু শান্তি পাবে।”
সুমু ধীর হাতে চারাগুলো নিল। সে প্রথমে আলিশার কবরের কোণায় একটি গর্ত খুঁড়ে চারাটি রোপণ করল। তারপর একে একে মরিয়ম বেগম, আরিয়ান আর সবশেষে রায়য়ানের কবরের পাশে গোলাপ গাছগুলো লাগালো। তার সাদা শাড়ির আঁচল ধুলোয় মাখামাখি, কপালে ঘাম আর চোখের কোণে অশ্রু—তবুও গাছগুলো রোপণ করার সময় তার হাতে ছিল এক অদ্ভুত মমতা।
গাছগুলো লাগানো শেষ হতেই সুমু সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে দেখল, এগারো জন যুবক তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু শান্ত স্বরে বলল,
“ওরা আমাদের জীবনের অন্ধকার অধ্যায় ছিল ঠিকই, কিন্তু গোলাপের কাঁটার মতো হৃদয়ে ক্ষত দিয়েও ওরা আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছে। আজ থেকে এই গোলাপ গাছগুলোই হবে ওদের স্মৃতির প্রহরী।”
আইয়ুব আর সারবাজ গাছগুলোতে পানি ঢেলে দিল। ভেজা মাটির সেই সোঁদা গন্ধ আর গোলাপের চারাগুলোর সজীবতা এক লহমায় গোরস্থানের বিভীষিকা কমিয়ে আনল। সব শেষে সুমু কবরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“আজ আমি নিজেকে সবকিছু থেকে মুক্ত করলাম। এবার আমার ফেরার পালা।”
গোরস্থানের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে সকলে আবারও শেষবারের মতো পেছনে তাকাল। ধূসর মরুভূমির বুকে ওই চারটি কবর আজ একেকটি বিফল স্বপ্নের স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু জানে, তাকে এখন ফিরতে হবে। বাংলাদেশে তার ‘খান সাহেব’ তার অপেক্ষায় আছে। যে জীবনের শুরুটা হয়েছিল রক্ত আর আগুনে, তার শেষটা অন্তত হোক এক শান্ত ভোরের মতো।
সে গাড়িতে উঠে বসল। তার মনে হলো পেছনে ফেলে আসা চারটি কবর থেকে এক অদৃশ্য প্রশান্তি তাকে বিদায় জানাচ্ছে। কিন্তু গন্তব্য এবার সুদূর বাংলাদেশ—যেখানে তার সব হারানোর ভিড়ে শেষ সম্বলটুকু লুকিয়ে রাখা আছে।
ভোরের কুয়াশা তখনো খান ম্যানশনের বাগানবিলাস আর গাছের পাতায় আলসেমি করে লেগে আছে। ওমানের আকাশের সেই ধূসর আভা আজ যেন বিদায়ের করুণ সুর বাজিয়ে তুলছে। সদর দরজার সামনে গাড়িগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, স্টার্ট দেওয়ার অপেক্ষায় গোঙাচ্ছে। কিন্তু খান ম্যানশনের ভেতরে সময় যেন পাথর হয়ে গেছে।
অনন্যা খাতুন আর সাহাবাজ খান দাঁড়িয়ে আছেন মূল ফটকের কাছে। সাহাবাজ সাহেবের গম্ভীর চেহারা শোকাতুর। অনন্যা খাতুন একে একে নাতি-নাতনিদের কাছে টেনে নিলেন। প্রথমে চার বছরের নিশান আর রুহিকে বুকে চেপে ধরলেন। নিশান তার ছোট ছোট হাত দিয়ে অনন্যা খাতুনের চোখের পানি মুছে দিয়ে আধো আধো কণ্ঠে বলল,
“গ্র্যান্ডমম, তুমি তেঁদো না। আমলা তো আবাল আতব।”
অনন্যা খাতুন ম্লান হাসলেন, কিন্তু বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। এরপর তিনি সিমরান আর শেরানের দিকে ফিরলেন। এই দুটি শিশু কেবল তার নাতি নয়, তার মৃতপ্রায় অস্তিত্বের একমাত্র সঞ্জিবনী। তিনি দুই হাতে সিমরান আর শেরানকে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। পাঁচ বছর ধরে কাছে থাকা এই কলিজার টুকরোগুলোকে আজ চোখের আড়াল করতে তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে।
শেরান ছোট হাতে তার দাদির গাল ছুঁয়ে বলল,
“গ্র্যান্ডমম, আমলা তি আমাদেল পাপা-তে নিয়ে আতব?”
এই একটি কথায় অনন্যা খাতুন ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তার কান্নায় পুরো বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। আফিয়া খাতুন আর রুহি খাতুনও আড়ালে গিয়ে চোখ মুছছেন। সাহাবাজ খান সুমুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার সেই বজ্রকণ্ঠ আজ বড়ই কোমল, বড়ই অসহায়। তিনি সুমুর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“যাও মা, নিজের স্বামীর কাছে ফিরে যাও। আমি জানি, যে মেয়ে পাঁচ বছর নিজের যন্ত্রণাকে আড়াল করে আমার ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, তার জয় সুনিশ্চিত। আমি আমার কলিজার টুকরোগুলোকে তোমার হাতে তুলে দিলাম।”
আইয়ুব আর সারবাজ ব্যাগগুলো গাড়িতে তুলছে। আইয়ুব নাজমিনকে ইশারা করল ওঠার জন্য। সুমু ধীর পায়ে অনন্যা খাতুনের সামনে গিয়ে বসল। সে অনন্যা খাতুনকে সালাম করে বলল,
“দোয়া করবেন, আম্মু। কথা দিচ্ছি, আপনাদের ছেলেকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করব।”
অনন্যা খাতুন চোখ মুছে সুমুকে জড়িয়ে ধরলেন। ফিরোজা, সিমরান আর শেরানের হাত ধরে গাড়ির কাছে এগিয়ে গেল। সাহাবাজ খান আর অনন্যা খাতুনের চাপা হাহাকারের মাঝেই এগিয়ে এলেন শেহেজাদ খান আর আফিয়া খাতুন। আফিয়া খাতুন সুমুকে জড়িয়ে ধরে তার মাতৃত্বের সমস্ত আবেগ দিয়ে কপালে একটি চুমু খেয়ে কাঁপাকাঁপা স্বরে বললেন,
“মামনি, তুমি শুধু আমাদের ঘরের বউ নও, তুমি আমাদের শক্তি। আমার শেরাজকে দেখে রেখো মামনি, ও বড্ড জেদি আর অভিমানী।”
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেহেজাদ খান সুমুর মাথায় হাত রেখে এক পরম আশ্বাসের স্বরে বললেন,
“সাবধানে যেও, মামনি। ভয় পেয়ো না। আমাদের দোয়া সবসময় তোমাদের সাথে আছে।”
রুহি খাতুন আর আদনান চৌধুরী এগিয়ে এলেন। রুহি খাতুন সুমুর দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তার চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর সুমুর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। তিনি ধীর কণ্ঠে বললেন,
“সুমু, সাবধানে যাবে। এদিকের চিন্তা কোরো না। তোমার শশুর-শাশুড়িকে দেখে রাখার জন্য আমরা আছি।”
আদনান চৌধুরী সুমুর মাথায় হাত রাখলেন। তারপর আরবাজ আর সারবাজের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,
“শেরাজের অর্ধাঙ্গিনীকে নিয়ে যাচ্ছো তোমরা। মনে রাখবে, সুমুর প্রতিটি নির্দেশ তোমাদের কাছে আদেশ।”
আরবাজ মাথা নাড়ল। সকলে একে একে বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে অবশেষে সবাই গাড়িতে গিয়ে বসল। ইশিতা আর ইনায়া শেষবারের মতো জানালা দিয়ে বড়দের দিকে তাকাল। গাড়িগুলো যখন স্টার্ট নিল, সুমু একবার পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল—ফটকের সামনে আদনান চৌধুরী, শেহেজাদ খান, সাহাবাজ খান, অনন্যা খাতুন, আফিয়া খাতুন আর রুহি খাতুন একসাথে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।
গাড়িগুলো ম্যানশনের নুড়ি বিছানো পথ ছেড়ে মেইন রোডে উঠে খান ম্যানশনকে পেছনে ফেলে দ্রুতবেগে অগ্রসর হলো মাস্কাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে। সুমুর মনে হলো, ওমানের ধুলোবালি কাটিয়ে সে আজ বাংলার সোঁদা মাটির ঘ্রাণ নিতে যাচ্ছে, যেখানে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ শেরাজ খান তার অপেক্ষায় আছে।
মাস্কাট বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে তখন প্রস্থানের শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়। সারবাজ আর আইয়ুব সন্তানদের সামলাতে ব্যস্ত, আর নিহাল-শাহরুখরা চারপাশটা কড়া নজরে রাখছে। সুমু একটু আলাদা গিয়ে একটি নিভৃত সোফায় বসল। ঠিক তখনই অফিসার আলিয়া এসে সামনে দাঁড়ালেন। সুমু আলতো হেসে তাকে ইশারা করে পাশের সিটে বসতে বলল। আলিয়া বিনাবাক্যে বসে পড়ল।
সুমু তার ব্যাগ থেকে চামড়ায় বাঁধানো একটি কালো রঙের ডায়েরি বের করল। ডায়েরিটা আলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে মৃদু অথচ রহস্যময় এক হাসি হাসল। ডায়েরিটির জীর্ণ পাতাগুলোয় গত পাঁচটি বছরের রক্ত, অশ্রু আর হাহাকার জমাট বেঁধে আছে।
সুমু আলিয়ার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“অফিসার, এই পাঁচটা বছর আপনি জেলের ভেতর আমার এই অসমাপ্ত গল্পের অনেক ভাঙাচোরা অংশ শুনেছেন। আজ বিদায়বেলায় আমার এই ডায়েরিটা আপনার হাতে আমানত হিসেবে তুলে দিলাম। আমাদের ফ্লাইটটা টেক-অফ করার ঠিক পাঁচ মিনিট পর আপনি এই ডায়েরির একেবারে শেষ পাতাটা খুলে দেখবেন। আমি কথা দিচ্ছি, পাতাটা পড়ার পর আপনি আপনার অস্তিত্বে এক প্রবল কম্পন অনুভব করবেন। আপনার মস্তিস্কে সহস্র প্রশ্ন ভিড় করবে, আর আপনি থম মেরে অন্তত দুই মিনিট পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবেন।”
আলিয়া ভ্রু কুঁচকে ডায়েরিটা হাতে নিলেন। তিনি সুমুর এই কথার অর্থ বুঝতে পারছেন না। সুমু সিট থেকে উঠে দাঁড়াল, তার চোখে এখন এক বিজয়ী বাঘিনীর মতো তেজ। সে আবারও বলল,
“আমি নিশ্চিত, ডায়েরিটা দেখার ঠিক পাঁচ মিনিটের মাথায় আপনি আমাকে কল করবেন। তবে মনে রাখবেন অফিসার, তখন আমি মেঘের ওপর দিয়ে উড়ছি। আপনার সেই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজ আমি দেব না, কিন্তু ওই ডায়েরির শেষ লাইনগুলোই আপনার জীবনের সব গোয়েন্দা রিপোর্টকে ভুল প্রমাণ করে দেবে।”
আলিয়া ডায়েরিটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। সুমু আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ধীর পায়ে সেই তার বিশাল দলের কাছে ফিরে গেল। আলিয়া তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিমানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় সুমু একবার পেছন ফিরে দেখল, আলিয়া ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ডায়েরিটা হাতে নিয়ে। সুমুর মনে হলো, ওমানের এই ধুলোবালি আর রুক্ষ মরুভূমির অধ্যায় সে আজ চিরতরে বন্ধ করে দিচ্ছে।
লাউঞ্জের লাউডস্পিকারে শেষ কল ঘোষিত হলো। বিমানে ওঠার পর সুমু তার সিটবেল্ট বেঁধে নিল। জানালা দিয়ে বাইরের রানওয়ের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল,
“অফিসার আলিয়া, আজ আপনি জানবেন যে মৃত্যু দিয়ে সব শেষ হয় না। কিছু কিছু মৃত্যু আসলে পুনর্জন্মের ছদ্মবেশ মাত্র।”
বিমানটা মাটি ছেড়ে শূন্যে ডানা মেলল, সুমু ঘড়ির দিকে তাকাল। আর মাত্র কয়েক মিনিট, তারপরই ওমানের পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সবচেয়ে চৌকস লেডি অফিসারের পায়ের তলার মাটি সরে যাবে।
বিমানের চাকা মাটি ছাড়ার ঠিক পাঁচ মিনিট পর, ওমান এয়ারপোর্টের ভিআইপি লাউঞ্জের একটি নির্জন সোফায় বসে অফিসার আলিয়া ডায়েরিটা খুললেন। সুমুর দেওয়া সেই চ্যালেঞ্জ তার মনের ভেতর অনবরত হাতুড়ি পেটাচ্ছে। তিনি সরাসরি শেষ পাতায় চলে গেলেন।
পাতাটি উল্টাতেই আলিয়ার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য তার হৃৎস্পন্দন যেন থমকে দাঁড়াল। নীল কালিতে বোল্ড অক্ষরে সেখানে মাত্র দুটি লাইন লেখা:
“শেরাজ খান মরেনি। রায়য়ানের সেই পাতালপুরী থেকে যার পোড়া লাশ আপনারা শেরাজ খান ভেবে তুলেছিলেন, তিনি শেরাজ খান ছিলেন না। আমার খান সাহেব আজ বাংলাদেশের মাটিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আর আমি তার কাছেই ফিরে যাচ্ছি।”
আলিয়ার হাতে ডায়েরিটা কাঁপতে লাগল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। একজন কঠোর অফিসার হিসেবে নিজের বুদ্ধির ওপর যে দম্ভ তার ছিল, তা আজ এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল। তিনি পাথরের মতো দুই মিনিট বসে রইলেন। মাথায় হাজারটা প্রশ্ন—শেরাজ খান নামে কাকে তবে সেদিন পুলিশ উদ্ধার করেছিল? পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কীভাবে ভুল হলো? সুমু কি তবে পাঁচ বছর ধরে ওমানের পুরো পুলিশ প্রশাসনকে নিজের আঙুলের ডগায় নাচিয়েছে?
ডায়েরি খোলার ঠিক পাঁচ মিনিট পর, সম্বিত ফিরে পেতেই আলিয়া পাগলের মতো সুমুর নাম্বারে কল দিলেন। কিন্তু ওপাশ থেকে যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো:
“দ্য নাম্বার ইউ আর কলিং ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ!”
আলিয়া ফোনটা নামিয়ে রাখলেন। তার মনে পড়ল সুমুর সেই শেষ কথাগুলো—“আমি গ্যারান্টি দিলাম, আপনি থম মেরে থাকবেন।”
আলিয়া একাই তপ্ত হাসলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, সুমু তাকে কল করতে বলেছিল শুধু তার অসহায়ত্ব আর বিস্ময়টুকু অনুভব করানোর জন্য। ততক্ষণে সুমু মেঘের ওপারে, হাজার হাজার ফিট উঁচুতে। আলিয়ার আর কিছু করার নেই। তিনি জানালার ওপারে উড়ে যাওয়া সেই বিমানের সাদা রেখাটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন,
“শেরাজ খান… আপনি শুধু একাই বাজিগর নও, আপনি এমন একজন নারীকে নিজের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচন করেছেন , যে জেলের অন্ধকারে বসেও পুরো পৃথিবীকে বোকা বানাতে পারে।”
ওদিকে বিমানের কেবিনে সুমু তার ফোনটা বন্ধ করে মৃদু হাসল। সে জানে আলিয়ার এখনকার মানসিক অবস্থা। সে পাশের সিটে বসা সারবাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অফিসার আলিয়াকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাঁধাটা দিয়ে এলাম। এবার আমাদের লক্ষ্য স্যান্ডি আর বাংলাদেশ।”
বিমানের জানালার ওপারে তখন নীল আকাশের নিচে মেঘের সমুদ্র। সুমু চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করল সেই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ, যেখানে তার খান সাহেব আছে।
লাউঞ্জের কোলাহল ছাপিয়ে আলিয়ার কানে তখনো নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ বাজছে। ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরে তিনি বিমর্ষ ভঙ্গিতে ধীর পায়ে জানালার কাচের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে একা একা বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন,
“কী মারাত্মক খেললে, সুমু! পাঁচটা বছর আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করেছি, তোমার চোখের প্রতিটি পলক পড়েছি, অথচ একবারও টের পেতে দিলে না যে তুমি জেলের চার দেয়ালের ভেতর বসে সকলের কাছে মৃত হিসাবে থাকা একটি মানুষকে বাঁচিয়ে রেখেছ? আমি তোমাকে মায়াবী ভেবেছিলাম, কিন্তু তুমি তো এক বিশাল ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি।”
আলিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার মনে পড়ে গেল সুমুর সেই শান্ত শীতল মুখচ্ছবি। তিনি আবার বললেন,
“আমি আজ নিজের কাছেই নিজে হেরে গেলাম। সারাটা জীবন অপরাধীদের হাড়গোড় ভাঙার শব্দ শুনেছি, কিন্তু এমন নিখুঁত কোনো চিত্রনাট্য কোনো অপরাধীর ফাইলে দেখিনি। যাকে আমি স্রেফ এক শোকাতুর বিধবা ভেবে তার মায়ায় জড়িয়েছি, সেই নারী আসলে পুরো ওমানের পুলিশকে একটা বিশাল অন্ধগলি দিয়ে হাঁটিয়েছে। শেরাজ খান বেঁচে আছে—এই একটা খবর যদি আজ ওমানের আন্ডারওয়ার্ল্ডে জানাজানি হয়, তবে রক্তের বন্যা বয়ে যাবে।” তিনি ডায়েরির জীর্ণ পাতাগুলোতে হাত বুলিয়ে মৃদু হাসলেন, “শেরাজ খান, আপনি সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ আপনার পতন হলেও আপনার ধ্বংসাবশেষ থেকে এমন এক শক্তি জন্ম নিয়েছে, যা বাকিসব শক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আপনাকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আজ থেকে আমার ডায়েরিতে সবচেয়ে রহস্যময় আসামি হিসেবে আপনার নাম নয়, আপনার অর্ধাঙ্গিনীর নামটা বড় করে লেখা থাকবে।”
আলিয়া দেখলেন, সুমুদের বহনকারী বিমানটি আকাশের এক বিন্দুতে মিলিয়ে গেছে। তিনি ফোনটা পকেটে ঢোকালেন।
“যাও সুমু, ফিরে যাও তোমার সেই হারানো সাম্রাজ্যে। আইন হয়তো তোমাকে ধরতে পারল না, কিন্তু আমার অফিসার সত্তা আজ তোমার সেই অজেয় ভালোবাসার কাছে স্যালুট দিচ্ছে। আজ থেকে আমি আর তোমার কাছে শুধু একজন আইনের রক্ষক নই, আজ থেকে আমি তোমার সেই অসমাপ্ত গল্পের শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকা একজন কৌতূহলী পাঠকও।”
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিমানের চাকা সশব্দে মাটি ছুঁল, সুমুর মনে হলো তার বুকের ভেতর হাজারটা শঙ্খধ্বনি বেজে উঠেছে। কতগুলো বছর পর সে নিজের দেশের মাটির স্পর্শ পেল। ওমানের সেই তপ্ত মরুভূমি আর কারাগারের পাথুরে দেয়ালগুলো পেছনে ফেলে সে এখন এমন এক জনপদে, যার ঘ্রাণে মিশে আছে তার কৈশোর আর তার জীবনের সেই নিষিদ্ধ প্রেমের শুরুর দিনগুলো।
ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা অ্যারাইভাল লাউঞ্জের বিশাল কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরোল। বাইরের ভ্যাপসা গরম আর মানুষের কোলাহল সুমুকে যেন নতুন করে স্বাগত জানাল। ভিড়ের একদম সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিল সামিয়া আর রাহিন। সামিয়াকে দেখা মাত্রই সুমুর দুই চোখের বাঁধ ভেঙে গেল।
সামিয়া তো তার বড় বোনকে চেনারই উপায় পাচ্ছিল না। সেই সুদীপ্ত সুমু আজ এক বিষাদময়ী নারীতে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তার চোখের সেই চেনা তেজটুকু এখনো অমলিন। সামিয়া দৌড়ে এসে সুমুকে জড়িয়ে ধরল। দুই বোনের কান্নায় যেন লাউঞ্জের কোলাহল মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সামিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,
“আপু! তুমি আসবে আমি জানতাম, কিন্তু এতগুলো বছর তুমি একা কীভাবে কারাগারের ওই অন্ধকারে বসে পাড় করলে? আমাদের কেন একবারও নিজের যন্ত্রণার ভাগ দিলে না?”
সুমু কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু সামিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বোনকে আগলে রাখল। সামিয়া নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নিচে তাকাল, হঠাৎ সে থমকে গেল। সুমুর দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সিমরান আর শেরান—ঠিক যেন শেরাজ খানের দুটো ছোট সংস্করণ। সামিয়া হাঁটু গেড়ে বসে বাচ্চাদের টেনে নিল নিজের বুকে। তাদের কপালে অসংখ্য চুমু খেতে খেতে সে বলতে লাগল,
“এরা তো শেরাজ ভাইয়ার রক্ত। আপু, এদের চোখে তো আমি ভাইয়াকেই দেখতে পাচ্ছি। হুবহু শেরাজ ভাইয়ার মতো দেখতে হয়েছে।”
শেরান আর সিমরান অবাক হয়ে তাদের এই নতুন খালামণিকে দেখছিল। শেরান তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে সামিয়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল,
“তুমি তি আমাল মাম্মার ফ্রেন্ড? আমলা তিন্তু আমাদেল পাপাতে নিতে এতেছি।”
সামিয়া আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। রাহিন এগিয়ে এসে সুমুর মাথায় হাত রাখল। তার চোখেও অশ্রু। সে ভারী গলায় বলল,
“সুমু, তোর এই ফিরে আসাটা কেবল এক বোন বা কারো মেয়ের ফিরে আসা নয়, এটা একটা হারানো ইতিহাসের পুনর্জন্ম। স্যান্ডি সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। এই শহর আজ তোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।”
সুমু আলতো করে মাথা নাড়ল। আইয়ুব, সারবাজ আর আরবাজরা মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে রাহিনের সাথে কুশল বিনিময় করল। নিশান আর রুহিকেও সামিয়া আদরে ভরিয়ে দিল।
সুমু আকাশের দিকে একবার তাকাল। বাংলাদেশের এই মেঘলা আকাশ যেন আজ তার মনের প্রতিচ্ছবি। সে ধীর পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বলল,
‘শুনুন খান সাহেব, আপনার শহরকে ছেড়ে এবার আমি এসেছি আমার সেই বাজিগরকে আমার মনের রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে নিতে।’
সকলে একে একে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়িগুলো বিমানবন্দরের ভিড় ঠেলে ঢাকার পিচঢালা রাজপথ ধরে ছুটতে শুরু করল, সুমু জানালার কাচ নামিয়ে দিল। বাংলার এই সোঁদা মাটির ঘ্রাণ তার ফুসফুসে এক নতুন প্রাণশক্তি ভরে দিল। হঠাৎ পেছনের সিট থেকে সারবাজ তার হাতের আইফোনটা সুমুর চোখের সামনে তুলে ধরল।
“সুমু, এটা দেখো! স্যান্ডি এখনই লিংকটা পাঠাল।”
সুমু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল একটি ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল— নতুন, তবে অনেক অনুসারী। সেখানে একটা লাইভ চলছে। ভিডিওর ফ্রেমে দেখা যাচ্ছে একটি অত্যাধুনিক জিম সেন্টার। ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা মিউজিক বাজছে। আর ক্যামেরার একদম সামনে, ঘামে ভেজা টি-শার্টে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে সুমুর হাত মুহূর্তেই বরফ হয়ে গেল। তার খান সাহেব। সেই চেনা নাক, চওড়া কাঁধ আর গভীর চোখজোড়া। কিন্তু সেই চোখে আজ ওমানের সেই দোর্দণ্ড প্রতাপ নেই, নেই কোনো জটিল কূটচালের ছায়া। বরং সেখানে এক অদ্ভুত শিশুসুলভ সারল্য। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে শেরাজ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে তার নতুন বন্ধুদের সাথে। সে বলছে,
“আজকের ওয়ার্কআউটটা খুব ভালো হলো। নেক্সট সেশনে আপনাদের আরও কিছু নতুন টিপস দেব।”
শেরাজ হাসছে। প্রাণখোলা সেই হাসি। ভিডিওর নিচে নাম লেখা—এস.কে। সুমুর কলিজাটা যেন কেউ খামচে ধরল। তার খান সাহেব এখন জানে না সে আসলে কে। সে জানে না ওই ওমান থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত তার জন্য কত রক্ত ঝরেছে, কতগুলো জীবন ধ্বংস হয়েছে।
সুমু অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল,
“ওনাকে তো একদম অন্যরকম লাগছে, ভাইয়া। এই চোখে কোনো বিষাদ নেই।”
সারবাজ মাথা নিচু করে বলল,
“স্যান্ডি বলেছে ওর মেমোরি লসটা খুব গভীর। যেই মেডিসিন ওকে দেওয়া হয়েছে, তাতে ওর মেমোরি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তবে মেমোরি যে আর ফির আসবে না, এমনটা নয়। ঠিকমতো ট্রিটমেন্ট হলে আর সকলে মিলে চেষ্টা করলে অবশ্যই মেমোরি আবারও ফিরে আসবে। কিন্তু এখন ও শুধু জানে ও একজন বাংলাদেশী বিজনেসম্যান, ওর নাম শুধু এস.কে। ওর অতীত বলতে কিছু নেই। স্যান্ডি ওকে সযত্নে আগলে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু ওর মেমোরি থেকে ‘শেরাজ খান বাহাদুরখেল’ নামটা পুরোপুরি মুছে গেছে।”
সুমু স্ক্রিনটার ওপর হাত রাখল। কাচের ওপারে থাকা মানুষটাকে ছুঁতে চাইল সে। সামিয়া আর নাজমিন পাশ থেকে ভিডিওটা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠল। বাচ্চাদের ছোট ছোট মুখগুলো তখন জানালার বাইরে ব্যস্ত শহর দেখছে, তারা জানেই না তাদের পাপা এখন মোবাইল স্ক্রিনের ওপারে এক অচেনা মানুষ হয়ে কথা বলছে।
সুমুর ভেতরের বাঘিনীটা মুহূর্তেই যেন এক অসহায় বালিকা হয়ে গেল। সে কান্নারত গলায় বলল,
“উনি আমাকে চিনবেন তো, সারবাজ ভাইয়া? আমাকে দেখে কি ওনার ভেতরের সেই খান সাহেবটা জেগে উঠবে না? আমি তো উনার খুনি সেজে পাঁচটা বছর পার করলাম শুধু এই দিনটার জন্য।”
সারবাজ আশ্বস্ত করে বলল,
“ভালোবাসা হারায় না, সুমু। মস্তিষ্ক ভুলে যেতে পারে, কিন্তু আত্মা কখনও ভালোবাসাকে ভুলতে পারেনা।”
সুমু ফোনের স্ক্রিনটা অফ করে দিল। তার চোখ এখন পাথরের মতো শক্ত। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
“ওনার স্মৃতি নেই, সেটাই ওনার জন্য ভালো হয়েছে। ওনার পাপের বোঝাগুলো ওমানেই রয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো আছি। আমি ওনাকে মনে করিয়ে দেব—উনি কোনো সাধারণ মানুষ নয়, উনি আমার সেই সর্বস্বান্ত করা প্রিয়তম পুরুষ, শেরাজ খান।”
গাড়ির ভেতরে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। সুমু আবারও অপলক দৃষ্টিতে আইফোনের কালো হয়ে যাওয়া স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটুকু শুকিয়ে সেখানে এখন এক অদ্ভুত বিস্ময় ফুটে উঠেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারবাজের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।
“দেখেছন সারবাজ ভাইয়া? মানুষ তার নাম ভুলতে পারে, নিজের পরিচয় ভুলতে পারে, কিন্তু তার মজ্জাগত স্বভাব কোনোদিনও ভুলতে পারে না। ওমান থেকে নিঃস্ব হয়ে বাংলাদেশে এসেও উনি মাত্র পাঁচ বছরে নিজেকে আবার শূন্য থেকে শিখরে নিয়ে গেছে। নিজের রক্তের সাথে মিশে থাকা ওই রাজকীয় বিজনেস সেন্সটা উনি ভুলতে পারেনি।”
সুমু জানালার ওপারে ছুটে চলা ঢাকার ব্যস্ত দালানকোঠাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
“সবাইকে ভুলে গেছে, সব স্মৃতি মুছে গেছে, অথচ নিজের অবচেতন মনে উনি ঠিকই সেই বিজনেস টাইকুন হয়ে উঠেছে। আর দেখুন, ভাগ্যের কী বিচিত্র খেলা! সেই সান ভাইয়াকেই উনি আবারও নিজের পিএ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ঠিক যেমনটা ওমানে থাকাকালীন সান ভাইয়া ছিল ওনার ছায়া, এখানেও ওমান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিচয়ে উনি স্যান্ডি ভাইয়াকেই নিজের ডান হাত বানিয়ে নিয়েছে।”
সারবাজ অবাক হয়ে বলল,
“তার মানে তুমি বলতে চাইছ ও সচেতনভাবে কিছু না জানলেও ওর ভেতরে থাকা শেরাজ খান ঠিকই নিজের রাজত্ব সাজিয়ে বসে আছে?”
সুমু মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ!”
সে এবার সিটে হেলান দিয়ে চোখ বুজল। তার মনে পড়ে গেল ওমানের সেই দিনগুলোর কথা, যেখানে শেরাজ এক ইশারায় সবটা নিয়ন্ত্রণ করত। সে বিড়বিড় করে বলল,
“সবাইকে ভুলে গিয়েও উনি ঠিকই তার শেকড় খুঁজে নিয়েছে। সান ভাইয়াকে ছাড়া উনি এক পা-ও নড়তে পারে না, আজও যেমন পারছে না। এটাই তো আত্মার টান। মস্তিষ্ক প্রতারণা করলেও আত্মা চিনে নেয় তার বিশ্বস্ত মানুষকে।” সে ধীরস্থির কণ্ঠে সারবাজের দিকে ফিরে বলল, “সারবাজ ভাইয়া, এখনই সান ভাইয়াকে কল করুন। ওনাকে বলুন, আজ মিডনাইটে তার স্যারের সাথে একটা আর্জেন্ট বিজনেস মিটিং রাখতে। সান ভাইয়াকে যেন ওনাকে বলে, ওমান থেকে একজন বড় বিজনেসওমেন এসেছে—যিনি এস.কের সাথে একটা বিশাল ডিলের কনট্রাক্ট সাইন করতে চান।”
সারবাজ কিছুটা অবাক হয়ে সুমুর দিকে তাকাল। সুমুর মুখে এক রহস্যময় হাসি। সে আবারও বলল,
“আমি চাই না ও আমাকে চেনা পরিবেশে বা আবেগপ্রবণ কোনো জায়গায় উনি দেখুক। আমি চাই উনি আমাকে দেখুক একজন পাওয়ারফুল বিজনেস পার্টনার হিসেবে”
খান সাহেব পর্ব ৮৬ (২)
সারবাজ মাথা নেড়ে পকেট থেকে ফোন বের করল। সে স্যান্ডিকে কল করে ফোন কানে দিয়ে কথা বলতে শুরু করল। ওদিকে সুমু মনে মনে নিজের যুদ্ধের নীল নকশা তৈরি করে ফেলেছে। সে জানে, সরাসরি সামনে গিয়ে ‘আমি আপনার স্ত্রী’ বলে কান্নাকাটি করলে হয়তো শেরাজ তাকে পাগল ভেবে দূরে সরিয়ে দিবে। কিন্তু বিজনেসের টেবিলে মুখোমুখি বসলে, তার সেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর কথা বলার ধরন শেরাজ খানের সেই পুরনো সত্তাকে নাড়া দিতে বাধ্য।
গাড়ির ভেতরে সবাই তখন নিঃশব্দ। সুমুর এই নতুন রণকৌশল দেখে আইয়ুব আর আরবাজও মনে মনে তাকে বাহবা দিল। তারা বুঝল, সুমু কেবল ঘর সামলানোর মেয়ে নয়, সে শেরাজ খানের সেই উপযুক্ত অর্ধাঙ্গিনী, যে দাবার চাল দিতে জানে।
