খান সাহেব পর্ব ৮৮ (২)
সুমাইয়া জাহান
ভোরের মিষ্টি রোদ বাড়ির জানালার কাচ ছুঁয়ে সুমুর মুখে এসে পড়তেই এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে তার ঘুম ভাঙল। শেরাজের বাংলো থেকে ফিরে এসে তার শরীর ক্লান্তি আর মনের জেদের কাছে নতি স্বীকার করেছিল।
আজ বাড়িটার মেজাজ একদম আলাদা। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পিঠার সুঘ্রাণ আর বারান্দায় বাচ্চাদের ছুটোছুটির শব্দে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে দীর্ঘদিনের নিঝুম এ বাড়িটি। খবর এসেছে, বিকেলে ইফতিয়ারা আর রাইশারাও এখানে পৌঁছাবে। পুরো পরিবার যেন এক বিশাল মিলনমেলার অপেক্ষায় অধীর হয়ে আছে।
সুমু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসছিল, তার পরনে সাধারণ এক সুতির সালোয়ার কামিজ। ড্রয়িংরুমে পৌঁছাতেই সারবাজ আর আইয়ুব তাকে দেখে প্রায় দৌড়ে এলো। সুমু কিছু বোঝার আগেই তারা তাকে ঘিরে ধরল। সুমু কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাসল।
সারবাজ অস্থির হয়ে আইয়ুবের দিকে তাকাল, তারপর সরাসরি সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু উৎসুক কণ্ঠে বলল,
“কাল রাতে কী হলো সুমু? দেখা হয়েছিল এস.কে-র সাথে?” সে ঠোঁট টিপে হেসে বলল, “ডিলটা কি সত্যিই এগোলো নাকি শুধুই ছাইপাঁশ আলাপ হলো?”
আইয়ুবও পাশ থেকে চোখ বড় বড় করে বলল,
“আরে রাখ তো ডিল! শেরাজার রিয়্যাকশন কী ছিল, ভাবিজি? ও কি একবারও আপনার খান সাহেব হয়ে উঠেছিল নাকি এখনো সেই কাঠখোট্টা এস.কে হয়েই বসে আছে?”
সুমুর চোখের সামনে কাল রাতের সেই কনফারেন্স রুমের দৃশ্যগুলো চলচ্চিত্রের মতো ভেসে উঠল—শেরাজের সেই চুলের ঘ্রাণ নেওয়া, রেজিস্ট্রি পেপারের কথা শুনে থমকে যাওয়া, আর তাকে অসভ্য বলা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
“খান সাহেবের মস্তিস্ক এখনো স্মৃতিদের সাথে আড়ি করে বসে আছে, ভাইয়া। কিন্তু ওনার আত্মা আর শরীরের কোষগুলো ঠিকই আমাকে চিনে নিতে শুরু করেছে। উনি আমাকে অসভ্য বলেছেন, পাগল বলেছেন, এমনকি পুলিশের ভয়ও দেখিয়েছেন—কিন্তু দিনশেষে আমার মায়া থেকে নিজেকে সরাতে পারেননি।”
সারবাজ আর আইয়ুব একে অপরের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকাল। সুমু আলতো করে হেসে বলল,
“আজ সকালে ঝড়টা আরও জোরালো হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সিমরান আর শেরানকে আজ ওনার সামনে নিয়ে যাব। ওনার সেই পাষাণ হৃদয়ের দেয়াল ভাঙার জন্য আমার এই দুই সৈন্যই যথেষ্ট।”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে বাচ্চাদের নামার শব্দ পাওয়া গেল। সিমরান আর শেরানকে আজ খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সিমরানকে আজ একটি আফগান পশতুন ফ্রক পরানো হয়েছে। ফ্রকটি লাল আর গোলাপি রঙের মিশেলে তৈরি, যার হাতাগুলো অনেক ঘেরওয়ালা এবং ঝুলের অংশে সুন্দর এমব্রয়ডারি করা। ড্রেসটির বুকের অংশে নীল, সবুজ আর হলুদ সুতোর কাজ করা। তার লম্বা সিল্কি চুলগুলো আধখোলা অবস্থায় পিঠের ওপর ঢেউ খেলছে, আর কপালে পরেছে একটি সুন্দর নকশা করা টিকলি। ঠিক যেন ছোট এক রাজকুমারী, যার প্রতিটি চাহনিতে তার বাবা শেরাজ খানের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ছোঁয়া।
সুমু নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলল,
“স্মৃতির দুয়ার যদি বন্ধই থাকে খান সাহেব, তবে আজ রক্তের টান সেই দুয়ারে কড়া নাড়বে। দেখা যাক, নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখেও আপনি নিজেকে অস্বীকার করতে পারেন কি না।”
বাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলটা আজ যেন কানায় কানায় পূর্ণ। অনেক বছর পর এই বাড়িতে এত মানুষের সমাগম। হাসি বেগম, সুমি বেগম আর রুমা বেগম ব্যস্ত হাতে গরম গরম পরোটা আর ভুনা মাংস টেবিলে সাজাচ্ছেন।
ব্রেকফাস্টের এই সময়ে সবাই যখন টেবিলে বসল, সুমু দেখল পুরো পরিবারটা যেন এক সুতোয় বাঁধা। মাঝখানে বসেছেন শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব আর মুক্তাক সিকদার। তাদের চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ, যদিও সুমুর জন্য সকলের মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার এখনো রয়ে গেছে।
সিমরান আর শেরানকে ঘিরে বসেছে হাসফা, আহিয়া আর রুহি। ছোটদের এই আলাদা এক জগত। শেরান খুব গম্ভীর মুখে পরোটার টুকরো মুখে দিচ্ছে, ঠিক যেভাবে শেরাজ খান খুব ডিসিপ্লিন মেনে খাবার খেত। শামীম সাহেব অপলক চোখে নাতির খাওয়া দেখছেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাখাওয়াত সাহেবকে বললেন,
“দেখছ বড় ভাই, মেয়েটা বাবার চেহারা পেয়েছে আর ছেলেটা স্বভাব।”
অন্যদিকে পিয়াস এক কোণায় বসে নিরবে খাবার নাড়াচাড়া করছে। তার চোখ মাঝে মাঝেই চলে যাচ্ছে টেবিলের ওপাশে থাকা সামিয়ার দিকে, যে পরম মমতায় হাসফাকে খাইয়ে দিচ্ছে। পিয়াসের খাওয়া যেন গলায় আটকে যাচ্ছে। সামিয়ার এই মাতৃত্বপূর্ণ রূপ তাকে এক লহমায় আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, আবার এক অদ্ভুত মায়ায় বেঁধেও ফেলছে।
সারবাজ সুমুর পাশে বসে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“সুমু, তুমি কি সত্যিই আজ সিমরান আর শেরানকে নিয়ে যাবে? এস.কে যদি হিতে বিপরীত কিছু করে ফেলে?”
সুমু ধীরস্থিরভাবে কফির কাপে চুমুক দিল। তার চাহনি এখন অনেক বেশি স্থির। সে শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“হৃদপিণ্ডের সাথে যুদ্ধ করা যায় ভাইয়া, কিন্তু নিজের প্রতিবিম্বের সাথে নয়। সিমরান যখন ওনার সামনে দাঁড়াবে, তখন মিস্টার এস.কে তার নিজের অতীতকে অস্বীকার করার শক্তি হারিয়ে ফেলবেন। আমি তো যাবই, স্যান্ডি ভাইয়াকেও রেডি থাকতে বলেছি।”
ঠিক তখনই নাতাশা এক বাটি মিষ্টি নিয়ে সুমুর পাশে এসে বসল।
“ম্যাম, আপনি ফিরে এসেছেন এটাই আমাদের কাছে ঈদ। এখন থেকে শুধু আনন্দ করার দিন”
সুমু হাসল। ব্রেকফাস্ট শেষ হতেই বাড়ির বড়রা চা নিয়ে আড্ডায় মজে উঠলেন। বাচ্চারা আবারও ড্রয়িংরুমের সেই বলটা নিয়ে খেলতে লাগল।
সুমু উঠে দাঁড়িয়ে সিমরান আর শেরানের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসল। পরম মমতায় তাদের চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলল,
“আমার মাম্মারা, আজ আমরা একটা বিশেষ মানুষের কাছে যাব। তোমরা কি তৈরি?”
সিমরান তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সুমুর চোখে রেখে বলল,
“মাম্মা, আমলা তি আমাদেল হিনো পাপার তাতে যাত্তি?”
সুমু এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বাচ্চাদের এই সহজ প্রশ্নটি তার কলিজায় গিয়ে বিঁধল। সে চোখের জল সামলে নিয়ে শুধু মাথা নাড়ল।
শহরের নির্জন এক প্রান্তে শেরাজ খানের শুভ্র বাংলোটি সকালের শান্ত রোদে স্নান করছে। বাড়ির চারপাশ ঘিরে থাকা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছগুলো যেন বাড়িটিকে পাহারা দিচ্ছে।
শেরাজ আজ খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেছে। কাল সারা রাত সে ঠিক করে ঘুমাতেই পারেনি। বারবার সেই কালো শাড়ি পরা মেয়েটির কণ্ঠস্বর—‘আমরা দুজনেই একই মানুষকে ভালোবাসি’—তার কানের কাছে ভ্রমরের মতো গুঞ্জন করেছে। অস্থিরতা কাটাতে সে সকালেই নিজের ব্যক্তিগত জিমে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরিয়েছে। সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশী আজ যেন বিদ্রোহ করছে।
জিম শেষে শাওয়ার নিয়ে শেরাজ আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। ভেজা চুলগুলো কপালে অবাধ্য হয়ে লেপ্টে আছে। চুলগুলো আগের থেকে এখন অনেকটা ছোট করে ফেলেছে। সে হেয়ার ড্রায়ার নিয়ে চুলগুলো বেশ কিছুটা সময় নিয়ে শুকিয়ে নিল। চুল শুকানো শেষ হতেই একটি লাল-কালো প্রিন্টেড শার্ট পরে নিল, যার বোতামগুলো আলগা হয়ে তার সুঠাম বক্ষ কিছুটা উন্মুক্ত। মাথায় সে একটি গাঢ় কালো ও সবুজ নকশা করা ব্যান্ডানা শক্ত করে বেঁধে নিল। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি নিয়ে সে তার স্টুডিও রুমে প্রবেশ করল। বিজনেস জগতের বাইরে শেরাজের এক নিভৃত জগত আছে—তা হলো পেইন্টিং। ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ালে সে নিজেকে ফিরে পায়, যদিও সেই নিজে আসলে কে, তা সে নিজেও জানে না।
স্টুডিওর জানালা দিয়ে আসা উত্তরের আলোয় শেরাজ ক্যানভাসটা সাজাল। প্যালেটে রঙ মেশাতে মেশাতে তার মনটা অবাধ্যভাবে কালরাতের সেই কনফারেন্স রুমে চলে গেল। কফি কাপে শেষ চুমুক দিয়ে সে তুলি হাতে নিল। আজ তার কোনো ল্যান্ডস্কেপ বা বিমূর্ত ছবি আঁকার কথা ছিল। কিন্তু তুলি যখন ক্যানভাসে আঁচড় কাটতে শুরু করল, শেরাজ খেয়াল করল তার হাত দুটো যেন অন্য কারো ইশারায় চলছে।
সে আঁকতে শুরু করল দুটো গভীর চোখ। যে চোখ দুটোতে মাশকারার গাঢ় প্রলেপ থাকলেও তার আড়ালে এক সমুদ্র বিষাদ আর অতল মায়া লুকিয়ে আছে। শেরাজ খুব সচেতনভাবে সেই চোখের মণিগুলোর ওপর আলো-ছায়ার কাজ করল। আঁকতে আঁকতে সে এক সময় এতটাই ডুবে গেল যে, তার ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল।
তুলির শেষ টানে যখন ক্যানভাসে ফুটে উঠল সেই চিরচেনা মায়াবী চাহনি, শেরাজ নিজেই শিউরে উঠল। সে তুলিটা সরিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“এই চোখ দুটো আমাকে এত অস্থির করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে আমি এই দৃষ্টির কাছে হাজার বছর ধরে বন্দী?”
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। স্যান্ডি ঘরে প্রবেশ করল। স্যান্ডির দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল ক্যানভাসের ওপর। সুমুর সেই নিখুঁত চোখ দুটো দেখে স্যান্ডি কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“স্যার, আপনি কি আজ সকালে স্বপ্ন দেখেছেন, নাকি কাল রাতের সেই ব্যবসায়ী ম্যাম আপনার হৃদয়ে পুরোপুরি জায়গা করে নিয়েছেন?”
শেরাজ অপ্রস্তুত হয়ে ক্যানভাসটা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করল। তার গলার স্বর কিছুটা গম্ভীর করে বলল,
“বাজে কথা রাখো, স্যান্ডি। এটা স্রেফ একটা অবয়ব। কাজের কথা বলো।”
স্যান্ডিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে ক্যানভাসে সুমুর সেই মায়াবী চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। ওই দৃষ্টির সম্মোহন থেকে বাঁচতে সে তুলি নামিয়ে রেখে গিটার নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে বসল। বাইরের রোদ এসে সরাসরি তার মুখের ওপর পড়ল, যার তেজে তার গায়ের রং যেন তপ্ত সোনার মতো উজ্জ্বল দেখাল। নিজের অস্থিরতাকে দমানোর চেষ্টায় শেরাজ আপনমনেই গুনগুন করে একটি সুর ধরল,
“চাহে দুঃখ হো, চাহে সুখ হো,
দিল নে তুঝকো হি পুকারা!
তু নে হামকো হ্যায় বানায়া,
তু নে হামকো হ্যায় সাঁওয়ারা!
জাহাঁ কো তো রাব কা হ্যায়,
হমে তেরা হ্যায় সহারা!
বাস তেরা সাথ হো,
চাহে জো বাত হো!
তেরে কহনে সে কর জায়েঙ্গে,
হম মর জায়েঙ্গে হো!”
গান থামিয়ে সে বাইরের শূন্যতায় দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে হাজারো উত্তরহীন প্রশ্ন। রোদ আর ছায়ার এই লুকোচুরিতে তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক পরাজিত সম্রাট, যে নিজের অজান্তেই তার রানির মায়ার জালে পুনরায় আটকা পড়েছে।
হঠাৎ স্যান্ডি একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,
“কাজের কথা তো ম্যাম নিজেই বলতে আসছেন। একটু আগেই গেট থেকে ফোন এলো—সুমু ম্যাম এসেছেন। তবে তিনি একা নন, তার সাথে নাকি সেই বোনাস, সরি… গিফট দুটোও আছে।”
শেরাজ হাতের গিটার’টা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। সে শক্ত গলায় বলল,
“উনি কি সত্যিই চলে এসেছেন? উনি কি সত্যিই বাচ্চাদের নিয়ে এখানে ঢুকে পড়েছেন?”
স্যান্ডি মাথা নাড়ল। শেরাজ জানালা দিয়ে নিচের গেটের দিকে তাকাল। একটি কালো এসইউভি এসে থেমেছে। দরজা খুলতেই সুমু নামল—আজ তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের শাড়ি। তার দুপাশ থেকে নেমে এলো দুটি ছোট শিশু।
শেরাজ কাচের আড়াল থেকে ছোট মেয়েটিকে আর ছেলেটিকে দেখল—ছেলেটি ঠিক তার নিজের মতো করে কলার ঠিক করছে। শেরাজের মস্তিস্কে এক তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো। সে নিজের কপাল চেপে ধরল।
বাংলোর ড্রয়িংরুমে এক ভারী নিস্তব্ধতা। শেরাজ ওপর থেকে ধীর পায়ে নিচে নেমে এলো। তার পরনে এখনো সেই শার্ট, চুলগুলো কিছুটা অবিন্যস্ত। সিঁড়ির শেষ ধাপে আসতেই তার চোখ আবারও আটকে গেল সোফায় বসে থাকা দুটো ছোট্ট শিশুর ওপর।
সুমু শান্ত ভঙ্গিতে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। শেরাজকে দেখেই সিমরান এক লাফে সোফা থেকে নেমে পড়ল। তার ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে গিয়ে শেরাজকে জড়িয়ে ধরল। মুখ তুলে বড় বড় চোখে তাকিয়ে আধো আধো গলায় বলল,
“পাপা! তুমি এতো বলো বালিতে এতা এতা থাতো তেনো? আমাদেল তাতে চনো তুমি।”
শেরাজের শরীরটা মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। এই ‘পাপা’ ডাকটা তার কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। সে খুব রুক্ষভাবে সিমরানের হাতটা সরিয়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। সুমুর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“ম্যাম, আপনি কি সত্যিই পাগল হয়ে গেছেন? এই বাচ্চাদের শিখিয়ে এনেছেন আমাকে ‘পাপা’ ডাকতে? আমি বলেছি না, আমি এসব সস্তা ড্রামা পছন্দ করি না। ওদের সরিয়ে নিন আমার সামনে থেকে।”
সুমু কিছু বলল না, সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ধরে রাখল। ঠিক তখনই শেরান এগিয়ে এলো। সে সিমরানের মতো চঞ্চল নয়, বরং অনেক বেশি ধীরস্থির। সে শেরাজের একদম সামনে গিয়ে দাঁড়াল। শেরানকে দেখা মাত্রই শেরাজের মস্তিস্কের কোণে কে যেন হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করল। ছেলেটার চোখের চাহনি, দাঁড়ানোর ভঙ্গি—সবই যেন শেরাজের নিজের আয়না।
শেরাজ না চাইতেও শেরান আর সিমরানের গালের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও মাঝপথে থেমে গেল। তার ভেতরে এক প্রবল যুদ্ধ চলছে। একদিকে চরম বিরক্তি—কেন এই অচেনা বাচ্চারা তাকে ঘিরে ধরছে, অন্যদিকে এক অমোঘ টান—যা তাকে বারবার বাধ্য করছে ওদের দিকে তাকাতে।
শেরান খুব শান্ত গলায় বলল,
“পাপা, তুমি তো অনেত হ্যানতাম।”
শেরাজ এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“স্যান্ডি! ওদের নিয়ে যাও এখান থেকে। আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে।”
তার চিৎকার শুনে সিমরান আর শেরান ভয়ার্ত চোখে শেরাজের দিকে তাকাল, শেরাজের ভেতরের সেই কাঠখোট্টা মানুষটা হঠাৎ যেন মোমের মতো গলে গেল। সে নিজের অজান্তেই নিচু হয়ে সিমরান আর শেরানের কাঁধে হাত রাখল। পরক্ষণেই আবার কী ভেবে হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিল। সে বুঝতে পারছে না, কেনো এই ছোট্ট স্পর্শে তার হৃৎপিণ্ডটা এতো জোরে ধুকপুক করছে। সে সুমুর দিকে তাকিয়ে অস্থিরভাবে বলল,
“আপনি কী চাইছেন আমার কাছে? টাকা? ক্ষমতা? নাকি আমাকে পাগল প্রমাণ করতে চাইছেন?”
সুমু ধীর পায়ে শেরাজের কাছে এগিয়ে এলো। শেরাজের খুব কাছে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আপনার আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে? আমার কি টাকা বা ক্ষমতার অভাব পড়েছে? লিসেন মিস্টার, টাকা বা ক্ষমতা আমার অনেক আছে। আমি তো এসেছি আপনাকে আপনার আয়না দেখাতে। আপনি ওদের সরিয়ে দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু আপনার হাত দুটো কেন কাঁপছে? আপনার চোখ কেন বারবার এই দুটো ছোট্ট শিশুর মাঝে নিজেকে খুঁজছে?”
শেরাজ কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে দেখল সিমরান আবারও তার কাছে আসার চেষ্টা করছে। সে বিরক্তি আর মায়ার এক অদ্ভুত দোলাচলে পড়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে বাগানের দিকে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু বাগানে গিয়েও সে শান্তি পেল না। তার কানে এখনো বাজছে সেই আধো আধো ডাক—‘পাপা’।
স্যান্ডি এক কোণায় দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, তার স্যারের মস্তিস্ক হয়তো স্মৃতিগুলো অস্বীকার করছে, কিন্তু তার রক্ত কোনোভাবেই এই দুই উত্তরাধিকারীকে অস্বীকার করতে পারছে না।
সুমু ড্রয়িংরুমে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল শেরাজ কীভাবে ঝড়ের বেগে বাগানের দিকে চলে গেল। সে জানে, এই মুহূর্তে শেরাজের ভেতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি বইছে। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। স্যান্ডিও অবাক হয়ে দেখছে তার কঠোর স্যারকে এই দুই খুদে জাদুকর কীভাবে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে।
সুমু স্যান্ডিকে কাছে ডেকে বলল,
“সান ভাইয়া, সিমরান আর শেরানকে একটু বাংলোর আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখান। ওনাকে এখন একটু সময় দেওয়া দরকার। আমি ওনার কাছে যাচ্ছি।”
স্যান্ডি মাথা নেড়ে সায় দিল। সে বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে বলল,
“চলো তো লিটল চ্যাম্পস! তোমাদের পাপার এই সুন্দর বাগানে অনেক রঙিন প্রজাপতি আছে, দেখবে?”
সিমরান আর শেরান উৎসুক হয়ে স্যান্ডির হাত ধরল। সুমু একবার বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হলো, তারপর ধীর পায়ে বাগানের দিকে পা বাড়াল।
বাগানের এক কোণায় থাকা একটি পুরোনো মেহগনি গাছের নিচে শেরাজ দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠ সুমুর দিকে। দুপুরের রোদ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এসে তার লাল-কালো শার্টের ওপর এক অদ্ভুত নকশা তৈরি করেছে। শেরাজের এক হাত গাছের কাণ্ডে, অন্য হাতে সে নিজের কপাল চেপে ধরে আছে। তার নিঃশ্বাস এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
সুমু কোনো শব্দ না করে তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছু সময় নিস্তব্ধতায় কেটে গেল। সুমু শান্ত স্বরে বলল,
“স্মৃতিরা মাঝে মাঝে খুব বেইমানি করে, তাই না খান সাহেব? কিন্তু রক্ত আর স্পর্শ কি কখনো বেইমানি করে?”
শেরাজ ঝট করে পেছনে ফিরল। তার চোখ দুটো অস্থির। সে সুমুর খুব কাছে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী জাদু করেছেন আপনি আমার ওপর? কেন ওই বাচ্চাদের দেখলে আমার মনে হচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ডটা কেউ ছিঁড়ে ফেলছে? কেন মনে হচ্ছে আমি আপনাকে হাজার বছর ধরে চিনি? কে আপনি? সত্যি কি আপনি আমার বিজনেস পার্টনার নাকি আমার ধ্বংসের কোনো নীল নকশা?”
সুমু পিছু হঠল না। সে শেরাজের একদম কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি আপনার ধ্বংস নই, মিস্টার এস.কে। আমি আপনার সেই অর্ধেকটা, যেটা ছাড়া আপনি অপূর্ণ। আপনি স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন মস্তিস্কে, অথচ আপনার উত্তর লুকিয়ে আছে আপনার বুকের এই ধুকপুকানির ভেতরে। আপনি ওদের সরিয়ে দিলেন, কিন্তু একবারও কি পেরেছেন নিজের সত্তাকে ওদের কাছ থেকে সরাতে?”
শেরাজ সুমুর দু’কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরল। তার স্পর্শে এক তীব্র টান আর রাগ মিশে আছে। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“আপনি আমাকে পাগল করে দেবেন। ওই ছেলেটা… ওর নাম কী বললেন? শেরান? ও কেন হুবহু আমার মতো করে কলার ঠিক করে? কেন মেয়েটার চোখগুলো আমার মতো তীক্ষ্ণ?”
সুমু শেরাজের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। খুব মোলায়েম সুরে বলল,
“কারণ ওরা আপনার বোনাস নয় খান সাহেব, ওরা আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ ডিল। ওরা আপনার রক্ত। আপনি যতই অস্বীকার করুন, আপনি তো ওদের পাপাই।”
শেরাজ সুমুকে ছেড়ে দিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল। সে ভেঙে পড়ল। ঘাসের ওপর বসে পড়ে সে নিজের মাথা নিচু করে রাখল। তার অবস্থা দেখে সুমুর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। শেরাজ যেভাবে কপাল চেপে ধরে ঘাসের ওপর বসে পড়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে তার মস্তিস্ক আর হৃদয়ের এই দ্বন্দ্বে সে ভীষণ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুমু মুহূর্তেই বুঝতে পারল, সে একটু বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে। স্মৃতি পুনরুদ্ধারের এই ধাক্কা শেরাজের মস্তিস্ক হয়তো নিতে পারছে না।
সুমু দ্রুত নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে নিল। তাকে এখন পরিস্থিতি হালকা করতে হবে, নয়তো শেরাজ অসুস্থ হয়ে পড়বে। সে নিজের গলার স্বরে একটা আলগা চপলতা এনে একটু বাঁকা হেসে বলল,
“ওমা! মিস্টার এস.কে, আপনি তো দেখছি বড্ড ভীতু। বড় বড় বিজনেস ডিল সামলানো বিজনেস টাইকুন দেখি এইটুকু রসিকতাতেই দমে গেল? আমি তো আপনার সাথে একটু মজা করছিলাম, আর আপনি তো দেখি একদম সিরিয়াস হয়ে গেছেন।”
সুমুর এই আকস্মিক ভঙ্গি বদল দেখে শেরাজ স্তম্ভিত হয়ে মাথা তুলল। তার চোখে এখনো যন্ত্রণার রেশ, কিন্তু সুমুর মুখে ওই তাচ্ছিল্যভরা হাসি দেখে তার পৌরুষে বড়সড় একটা চোট লাগল। সে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। রাগে তার ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। সে সুমুর খুব কাছে এসে এক হাত উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“মজা? আপনি আমার সাথে মজা করছিলেন? লিসেন, আপনি জানেন না আমি কে? আমার বাড়ির ভেতরে ঢুকে আমার ইমোশন নিয়ে খেলা করার সাহস আপনাকে কে দিল?”
সুমু ভয় পাওয়া তো দূরে থাক, উল্টো এক পা এগিয়ে শেরাজের একদম বুকের কাছাকাছি চলে এলো। সে তার কাজল মাখা চোখের পাতাগুলো খুব দ্রুত কয়েকবার ঝাপটানি দিয়ে মায়াবী স্বরে বলল,
“ইমোশন? আপনি কি নিশ্চিত যে ওটা ইমোশন ছিল? আমার তো মনে হয় ওটা ছিল আমার মতো সুন্দরী আর গর্জিয়াস নারীর প্রতি আপনার একধরণের দুর্বলতা। আর সাহস? সাহস তো আপনি নিজেই আমাকে দিচ্ছেন আপনার ওই রাগী-রাগী চোখ দিয়ে তাকিয়ে থেকে।”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ইউ… আপনি কি জানেন আপনি কি বলছেন?”
সুমু শেরাজের শার্টের কলারটা খুব আলতো করে একটু ঠিক করে দিল। শেরাজ থতমত খেয়ে পিছিয়ে যেতে চাইলে সুমু তার চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“জানেন মিস্টার এস.কে, আপনি যখন রেগে যান তখন আপনাকে আরও বেশি হট লাগে। ওই যে কপালে কয়েকটা শিরা জেগে ওঠে না? ওগুলো দেখলে আমার ডিল-ফিল সব মাথা থেকে উবে যায়। আর এই যে ব্যান্ডানাটা পরেছেন, আপনাকে একদম সেই দুর্ধর্ষ দস্যুর মতো লাগছে যে আমাকে চুরি করতে এসেছে।”
শেরাজ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। কাল রাতেও এই মেয়েটা এমন অসভ্যতা করেছিল, আর আজও সে একই কাজ করছে। সে ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“আপনি… আপনি কি সব সময় এভাবে পুরুষদের সাথে ফ্লার্ট করেন? একজন মেয়ে এসব করতে আপনার লজ্জা করে না?”
সুমু খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে বাগানের নিস্তব্ধতা যেন ভেঙে গেল। সে হাসতে হাসতে বলল,
“লজ্জা? ওটা তো আমি অনেক আগেই ওমানের মরুভূমিতে ফেলে এসেছি। আর সব পুরুষের সাথে ফ্লার্ট করার সময় কই আমার? আমি তো শুধু আপনার মতো এই জেদি আর কিউট বাঘটার সাথেই একটু দুষ্টুমি করছি। আপনি চাইলে পুলিশ ডাকতে পারেন, কিন্তু পুলিশ এসে দেখবে—আপনি নিজেই আমাকে একদৃষ্টিতে পরখ করছেন।”
শেরাজ রাগে কথা খুঁজে পাচ্ছে না। সে শুধু অনুভব করছে, সুমুর ঠোঁটের সেই মায়াবী হাসি আর তার গায়ের মিষ্টি পারফিউম তাকে আবারও এক অদৃশ্য জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। সে বুঝতে পারছে না—এই মেয়েটা কি সত্যিই কোনো ব্যবসায়িক পার্টনার, নাকি তার জীবনে আসা এক অদ্ভুত কালবৈশাখী ঝড়।
সুমু তার পিঠে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“কী হলো? পুলিশ ডাকবেন? নাকি আপনার ওই স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে আমার আরও একটা পেইন্টিং করবেন? এবারেরটা না হয় একটু বোল্ড হোক?”
শেরাজ চোখ বড় বড় করে তাকাল। সে ভাবছে, এই মেয়েটা কি তবে জেনে গেছে সে তার চোখ এঁকেছে? তার বুকটা আবারও ধক করে উঠল। তার মনে হলো কেউ যেন তার ব্যক্তিগত ডায়েরির সবচেয়ে গোপন পাতাটি ছিঁড়ে ফেলেছে। সে বড় বড় পা ফেলে সুমুর আরও সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে এখন রাগের চেয়েও বিস্ময় বেশি। অত্যন্ত নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কীভাবে জানলেন আমি পেইন্টিং করেছি? আমি তো আমার স্টুডিওর দরজা সবসময় লক করে রাখি। আর ওই পেইন্টিং’টার কথা স্যান্ডি ছাড়া আর কেউ জানে না। আপনি কি আমার বাড়িতে স্পাই বা সিসিটিভি লাগিয়েছেন?”
সুমু একটুও ঘাবড়াল না। সে খুব আয়েশ করে বাগানের একটি বেঞ্চে গিয়ে বসল। সে জানত শেরাজ এই প্রশ্নটি করবেই। সুমু তার ঠোঁটের বাঁকা হাসির রেশটুকু ধরে রেখেই বলল,
“স্পাই? সিসিটিভি? মিস্টার এস.কে, আপনি আমাকে বড্ড ছোট ভাবছেন। একজন মানুষের চোখ দেখলেই বলে দেওয়া যায় সে সারা সকাল কী করেছে। আপনার ওই আঙুলের ডগায় রঙের একটুখানি দাগ লেগে আছে, আর আপনার চোখে আছে কোনো কিছু সৃষ্টি করার সেই গভীর আচ্ছন্নতা। একজন শিল্পী যখন তার সবচেয়ে প্রিয় কোনো কিছু ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে, তার সারা শরীরে সেই সৃষ্টির ঘ্রাণ থেকে যায়।”
শেরাজ নিজের আঙুলের দিকে তাকাল। সত্যিই, প্যালেটে রঙ মেশানোর সময় অজান্তেই একটুখানি রঙ তার কড়ে আঙুলের নখে লেগে ছিল। সে দ্রুত হাতটা মুঠো করে পেছনে নিয়ে গেল।
সুমু আবারও উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো,
“তাছাড়া, আমি তো জানি—এখন আপনি যখন খুব অস্থির থাকেন, তখন ছবি আঁকা ছাড়া আপনার আর কোনো গতি থাকে না। আর কাল রাতে আমি আপনাকে যে অস্থিরতা উপহার দিয়ে গিয়েছি, তাতে আপনি ল্যান্ডস্কেপ আঁকবেন না সেটা আমি নিশ্চিত ছিলাম। নিশ্চয়ই আমার এই মায়াবী চোখ দুটোই আঁকছিলেন, তাই না?”
শেরাজ এবার পুরোপুরি দিশেহারা। সে বিরক্তি লুকিয়ে ফুঁসে উঠে বলল,
“আপনার আত্মবিশ্বাস তো আকাশছোঁয়া! আমি কার ছবি আঁকব না আঁকব সেটা আমার ব্যাপার। আপনি এখানে বিজনেস ডিল করতে এসেছেন, তো ডিল নিয়েই কথা বলুন। পার্সোনাল স্পেসে ঢোকার চেষ্টা করবেন না।”
সুমু হাসতে হাসতে বলল,
“বিজনেস টাইকুন যখন ঘাবড়ে যায়, তখন সে এমনই পার্সোনাল স্পেস-এর অজুহাত দেয়। ঠিক আছে, পেইন্টিংয়ের কথা বাদ দিলাম। কিন্তু ক্যানভাসে আমার চোখগুলো ঠিকঠাকভাবে এঁকেছেন তো? নাকি সব ভুলে গেছেন?”
শেরাজ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। সে মনে মনে ভাবল, “আমি কি সত্যিই ঠিকঠাক এঁকেছিলাম? আর এই মেয়েটি কি কোনো জাদুকরী? নাকি ও আসলেই আমার আত্মার খবর রাখে?”
ঠিক তখনই দূর থেকে স্যান্ডির গলা শোনা গেল। সে সিমরান আর শেরানকে নিয়ে বাগানের এদিকটাতেই আসছে। বাচ্চাদের হাসির শব্দ শুনে শেরাজ আবারও সচেতন হয়ে উঠল, কিন্তু সুমুর সেই মায়াবী রহস্যময় চাহনি থেকে সে কিছুতেই নিজের দৃষ্টি সরাতে পারল না।
স্যান্ডি সিমরান আর শেরানকে নিয়ে শেরাজদের কাছে এসে পৌঁছাল, সে দেখল শেরাজ আর সুমুর মধ্যে এক অদ্ভুত তপ্ত বাক্যবিনিময় চলছে। শেরাজ তপ্ত রাগে ফুটছে, আর সুমু ঠিক তার উল্টো—একদম শান্ত এবং বিজয়ীর মতো হাসছে।
সুমু স্যান্ডিকে দেখে তার দিকে তাকিয়ে বেশ জোর গলায় বলল,
“সান ভাইয়া, আপনি আপনার স্যারকে একটু বোঝান তো! উনি কি পেইন্টিং করতে গিয়ে আমার চোখগুলো ঠিকঠাকভাবে এঁকেছেন? একজন ইনভেস্টরের প্রতি এমন অবহেলা কি বিজনেসের জন্য ভালো?”
স্যান্ডি মুহূর্তেই বুঝতে পারল সুমু ডিরেক্ট হিট করেছে। সে মনে মনে হাসল এবং শেরাজের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
“বলেন কী ম্যাম! স্যার ঠিকঠাকভাবে আঁকেননি নাকি? এটা তো অসম্ভব! স্যার তো কাল রাত থেকে ওই চোখজোড়া ছাড়া আর কিছু চোখেই দেখছেন না। আমি তো দেখলাম স্যার ড্রয়িংটা করার সময় মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাসও ফেলছিলেন।”
শেরাজ রাগে ফেটে পড়ল। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“স্যান্ডি! অনেক হয়েছে। তুমি আমার কর্মচারী নাকি এই মহিলার বেতনভুক্ত স্পাই? তোমার কাজ হলো ফাইল রেডি রাখা, আমার দীর্ঘশ্বাসের হিসেব রাখা নয়। আর এক মুহূর্তও যদি তুমি এই ফালতু আলাপে যোগ দাও, তবে কাল থেকে তোমার এই বাংলোতে ঢোকা তো দূরের কথা, এই জেলাতেই কোনো চাকরি জুটবে না। ইউ আর ফায়ারড!”
স্যান্ডি এবার সত্যি সত্যি বিষম খেল। সে জানত তার স্যার রাগলে বাঘ হয়ে যায়, কিন্তু আজ তো দেখছে তিনি একদম আহত বাঘ। সে বুঝতে পারল পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে তৎক্ষণাৎ দুই কানে হাত দিয়ে জিভ কামড়ে ধরল। একদম অসহায় একটা চেহারা বানিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
“আরে না না স্যার! আমি… আমি তো জাস্ট… মানে… ম্যাম বলছিলেন তো তাই… চাকরি খাবেন না স্যার! আমার ওই বৃদ্ধ মা আর তিনটে অবিবাহিত বোন… মানে নেই, কোনো মা-বোন নেই, কিন্তু থাকতে তো পারত! আমি তো আসলে বলতে চাইছিলাম যে, স্যার ইচ্ছা করেই হয়তো পেইন্টিং’টা ঠিকঠাকভাবে করেননি, যাতে ম্যামকে আবারও সামনাসামনি থেকে দেখতে পারেন। আই মিন… মাফ করে দেন স্যার! আমার মুখটা না আসলে একদম অসভ্যের মতো, কিছুই আটকায় না।”
শেরাজ ধমক দিয়ে বলল,
“স্টপ ইট! একদম চুপ!”
স্যান্ডি দ্রুত সিমরান আর শেরানের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল এবং নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“আমি তো স্যারের ভালোর জন্যই বলছিলাম। সুন্দরী বউ আর দুটো রেডিমেড কিউট বাচ্চা—এমন অফার তো টাটা-আম্বানিরাও পায় না। স্যার তো দেখি সব লাথি দিয়ে ফেলছেন।”
সুমু স্যান্ডির কাণ্ড দেখে হেসে উঠল। সে শেরাজের খুব কাছে গিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বেচারা সান ভাইয়াকে বকছেন কেন? উনি তো শুধু সত্যিটাই বলছিলেন। আপনার ওই ক্যানভাসটা কিন্তু আমি আজ দেখেই ছাড়ব মিস্টার এস.কে। দেখি, আপনি আমাকে কতটুকু মনে রেখেছেন।”
শেরাজ অসহায়ভাবে সুমুর দিকে তাকাল। তার রাগের পাহাড় যেন এই অদ্ভুত নারীর হাসির কাছে বারবার বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না—সে কি এই পাগল মহিলাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে, নাকি তার হাত ধরে বলবে, “আমি সত্যিই তোমাকে চিনি কি না সেটার প্রমাণ আমাকে দাও।” তার মেজাজ এখন সপ্তমে। সুমুর ফ্লার্টিং আর স্যান্ডির রসিকতা—সব মিলিয়ে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সে স্যান্ডির দিকে আঙুল উঁচিয়ে একদম চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার মতো করে বলল,
“অনেক হয়েছে, স্যান্ডি! তুমি আমার উদারতার সুযোগ নিচ্ছ। আজ থেকে তোমার আর আমার কোনো সম্পর্ক নেই। গেট আউট ফ্রম হেয়ার! কাল থেকে এই বাংলোর আশেপাশেও যেন তোমাকে না দেখি। ইউ আর পার্মানেন্টলি ডিসচার্জড!”
স্যান্ডি এবার বুঝতে পারল তার স্যার আসলেই ফুঁসছেন। সে দুই সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল, তারপর হঠাৎ করে একদম কান্নার মতো মুখ করে ফেলল। সে শেরাজের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে হাত জোড় করে বলতে শুরু করল,
“না স্যার, এটা করবেন না! আমাকে এভাবে মাঝপথে ফেলে দেবেন না। আপনি কি জানেন না স্যার, আমার এই দুনিয়াতে কেউ নেই? আমার কোনো বউ নেই যে রাতে আমার জন্য অপেক্ষা করবে, কোনো বাচ্চাকাচ্চা নেই যারা আমাকে পাপা বলে ডাকবে” সে একবার সুমুর বাচ্চাদের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে নিল “ আমি একদম একা স্যার, এই দুনিয়ায় আমার একটা সংসারও নেই।”
শেরাজ ধমক দিয়ে উঠল,
“তাতে আমার কী?”
“আরে স্যার, এই বাংলোটাই তো আমার সংসার! এই চাকরিটাই আমার মা-বাবা, আমার ভাই-বোন আর আমার বউ। আপনি এই চাকরিটা খেয়ে নিলে আমি তো আবার এতিম হয়ে যাব, স্যার! আমাকে এভাবে দ্বিতীয়বার এতিম করবেন না। দরকার হলে আপনি আমার বেতন কেটে নিন, আমাকে দিয়ে বাগান পরিষ্কার করান, এমনকি ওই ড্রয়িংরুমে ঝাড়ু দেওয়াতেও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই এতিম স্যান্ডিটাকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলবেন না, স্যার!”
সুমু ঠোঁট টিপে হাসি চেপে শেরাজকে বলল,
“দেখুন মিস্টার এস.কে, বেচারা কত অসহায়! আপনি কি আসলেই একজন এতিম মানুষের পেটে লাথি মারবেন? আপনার কি একটুও মায়া নেই?”
শেরাজ দাঁতে দাঁত চেপে স্যান্ডিকে বলল,
“তুমি এতিম? গত মাসেই তো বললে তোমার দাদি মারা গেছে বলে তিন দিনের ছুটি চাই। আর এখন বলছ তোমার কেউ নেই?”
স্যান্ডি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, সে সাথে সাথেই পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্য বলল,
“স্যার, ওটা তো ছিল আমার কাল্পনিক দাদি। মনের দুঃখে বলে ফেলেছিলাম। আসলে আমার সত্যি কেউ নেই স্যার! বিশ্বাস করুন, আপনি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।”
শেরাজ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ওপরের দিকে তাকাল। স্যান্ডির এই পাগলামি আর সুমুর রহস্যময় চাহনির মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছে সে কোনো এক পাগলাগারদে ঢুকে পড়েছে। সে রাগ সামলাতে না পেরে বলল,
“স্টপ ইট, স্যান্ডি! যদি আর একটাও বাড়তি কথা মুখ থেকে বের করেছ, তবে চাকরি তো যাবেই, সাথে ওই কান্নার জন্য জেলখানাও রেডি রাখব। এখন চোখের সামনে থেকে দূর হও।”
স্যান্ডি বুঝল চাকরিটা আপাতত বেঁচে গেছে। সে দ্রুত দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরল এবং সুমুর দিকে তাকিয়ে একটা চোখ টিপে সঙ্কেত দিল—যার অর্থ মিশন সাকসেসফুল।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে এক নিঝুম ঘরের ভেতর থেকে গোঙানির শব্দ ভেসে আসছে। শহরের এক পরিত্যক্ত গুদামঘরের অন্ধকার ঘরটিতে ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ঘরের মাঝখানে তিনটে চেয়ারে তিনজন লোককে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের মুখে টেপ আঁটা, চোখেমুখে আতঙ্ক।
হঠাৎ ঘরের ভারী লোহার দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে গেল। বাইরের চাঁদের আলোতে দরজার সামনে একটি অবয়ব ফুটে উঠল। লম্বা ছিপছিপে শরীরের ওপর একটি ব্লেক লেদার জ্যাকেট, কালো জিন্স আর পায়ে হাই-হিল বুট। নারীটি ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই বুটের খটখট শব্দ পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
নারীটি আর কেউ নয়— সেই হাসিখুশি, চঞ্চল সুমু। কিন্তু এই সুমু সেই সুমু নয়। আজ তার চোখে আগ্নেয়গিরির লাভা। তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে স্যান্ডি, তার হাতে একটা রিভলভার। স্যান্ডির চেহারাও এখন পাথরের মতো কঠিন।
সুমু লোকগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে একটি চকচকে ধারালো ছুরি, যা অন্ধকারের মধ্যেও চাঁদের আলোতে ঝিকমিক করে উঠছে। সে অত্যন্ত শীতল গলায় বলল,
“ওমান থেকে এই শহর পর্যন্ত আসতে অনেক কষ্ট হয়েছে, তাই না? কিন্তু বাংলাদেশে ঢোকার আগে তোরা হয়তো ভুলে গেয়েছিলি—শেরাজ খানের সীমানায় পা রাখলে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা খুব সরু হয়ে যায়।”
লোকগুলো গোঙাতে লাগল। স্যান্ডি একজনের মুখের টেপটা একটানে ছিঁড়ে ফেলল। লোকটা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে ওমানি উচ্চারণে আরবি আর ভাঙা ইংলিশে বলল,
“আমাদের ছেড়ে দিন! আমরা শুধু খবর নিতে এসেছি এস.কে সত্যি বেঁচে আছে কি না।”
সুমু ছুরির ডগাটা লোকটার চিবুকের নিচে চেপে ধরল। লোকটি চিৎকার করে উঠল। সুমুর ঠোঁটের কোণে সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর হাসিটা ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,
“খবর তো তোরা পেয়েই গেছিস—বাঘ এখনো বেঁচে আছে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, এই খবরটা ওমানে তোদের বস পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য তোরা আর সুস্থ থাকবি না। তোদের বস কি ভেবেছে, শেরাজকে একবার মারতে পারলেই কেল্লা ফতে? সে জানে না, শেরাজের আগে তাকে এই সুমুর মুখোমুখি হতে হবে।”
স্যান্ডি পাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলল,
“ম্যাম, এরা আজ বিকেলেও বাংলোর আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল। ওদের কাছে স্যারের লেটেস্ট ফটো আর লোকেশন পাওয়া গেছে। ওদের বসের অর্ডার ছিল—খবর কনফার্ম হলেই আজ রাতে কাজ শেষ করে দেওয়া।”
সুমু ফিসফিস করে বলল,
“তোরা ভেবেছিলি শেরাজ স্মৃতি হারিয়েছে মানে সে অরক্ষিত? ভুল! শেরাজ খানের জন্য এই সুমু ধ্বংসীনি হতে পারে।”
লোকগুলো আর্তনাদ করে উঠল,
“প্লিজ! আমাদের মারবেন না।”
সুমু ঘাড়টা সামান্য কাত করে লোকগুলোর দিকে না তাকিয়েই বরফশীতল গলায় বলল,
“তোদের সাহস তো কম না! শেরাজ খান বেঁচে আছে কি না—এই খবরটা কনফার্ম করার জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছিস? কিন্তু তোরা একটা হিসাব করতে বড্ড ভুল করে ফেলেছিস রে। শেরাজ খান মরে গিয়েও বেঁচে আছে কি না সেটা জানার জন্য তোরা জান বাজি রেখেছিস, অথচ শেরাজ খানের বউ যে এখনো জ্যান্ত আছে—এই খবরটা তোরা জানতি না?”
একটু থেমে সে আবারও বলল,
“ওমানের অন্ধকার জগতটা যদি শেরাজ খানের রাজত্ব হয়, তবে মনে রাখিস—সেই রাজত্বের সিংহাসনটা আজও এই সুমু আগলে বসে আছে। আজকের পর তোদের এই নরক যন্ত্রণা দেখে ওমানের প্রতিটি শত্রু যেন বুঝতে পারে, বাঘ স্মৃতি হারিয়েছে বলে জঙ্গলটা এতিম হয়ে যায়নি। শেরাজ খানের দিকে তাকানোর আগে তোদের এই সুমুর সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখতে হবে।”
সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লেদার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটি টিস্যু বের করে ছুরির রক্ত মুছতে মুছতে বলল,
“তোরা জানিস, দীর্ঘ পাঁচটি বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি? প্রতিটা সেকেন্ড লড়েছি শুধুমাত্র আমার সন্তানের বাবাকে আর আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় স্বামীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। নিজের সুখ, শান্তি, ঘুম—সব বিসর্জন দিয়েছি যাতে আমার খান সাহেবের গায়ে একটা ফুলের টোকাও না লাগে। জেলের অন্ধকূটে থেকেও আমি শুধু ওনার নিঃশ্বাসটুকু বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখেছি। আর তোরা… তোরা এসেছিস ওমানের কোন এক নর্দমার কীটের নির্দেশে আমার সাজানো বাগান জ্বালিয়ে দিতে? আমার খান সাহেবকে শেষ করতে?”
সুমু হঠাৎ লোকটার চুলের মুঠি ধরে মাথাটা পেছনের দিকে হেঁচকা টান দিয়ে ধরল।
“একেবারে মেরে ফেললে তো তোরা মুক্তি পেয়ে যাবি। এতো সহজ মুক্তি সুমু কাউকে দেয় না। তোদের আমি এমনভাবে বাঁচিয়ে রাখব যে, মৃত্যু তোদের জন্য বিলাসিতা মনে হবে। তোরা এস.কে-কে দেখেছিস, কিন্তু এই খবর ওমানের কাছে কাছে পৌঁছে দিতে পারবি না।”
সুমু স্যান্ডির দিকে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে দিল।
“স্যান্ডি ভাইয়া, আমার টুলবক্সটা দিন।”
স্যান্ডি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে ব্যাগটা এগিয়ে দিল। সুমু অত্যন্ত দক্ষ হাতে একের পর এক কাজ সারতে লাগল। তার প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল একজন সার্জনের মতো নিখুঁত কিন্তু নিষ্ঠুর। প্রথমে সে লোকগুলোর কণ্ঠনালীতে এমনভাবে আঘাত করল যে তাদের চিৎকার করার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে গেল। এরপর তীক্ষ্ণ সুঁচালো অস্ত্র দিয়ে তাদের শ্রবণশক্তি আর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিল। শেষে খুব ঠাণ্ডা মাথায় তাদের হাতের কবজি আর পায়ের রগ কেটে দিল।
পুরো ঘরটা রক্তে ভেসে গেল, কিন্তু সুমুর সাদাটে মুখটাতে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। সে লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল,
“এখন তোরা না পারবি কাউকে দেখতে, না পারবি কারো কথা শুনতে। তোদের এই অবশ হাত কোনোদিন কলম ধরতে পারবে না, আর এই স্তব্ধ কণ্ঠ কোনোদিন কারও কানে খবর পৌঁছাতে পারবে না যে—শেরাজ খান বেঁচে আছে। বেঁচে থাক তোরা, নিজের শরীরের এই অন্ধকার কবরে আজীবন বন্দী হয়ে।”
সুমু হাতের রক্তটুকু টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে স্যান্ডি এই পুরো দৃশ্যটা দেখে শিউরে উঠল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“ওহ গড! যেমন স্বামী, ঠিক তেমন তার স্ত্রী। দুজনেই সমান ভয়ঙ্কর। শেরাজ খান যখন বাঘ হয়ে গর্জে ওঠে তখন বড় বড় মাফিয়ারাও কাঁপে, আর সুমু ম্যাম যখন দংশন করেন তখন শত্রুরা পালালোর পথ খুঁজে পায় না। এই জুটির মাঝখানে আসা মানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা।”
সুমু দরজার কাছে গিয়ে থেমে গেল। পেছনে না তাকিয়েই শীতল কণ্ঠে বলল,
“সান ভাইয়া, এদের শহরের বাইরে কোনো ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে আসুন। আর হ্যাঁ! শত্রু ঘরের হোক বা বাইরের—খান সাহেবের দিকে হাত বাড়ালে সেই হাত আমি এভাবেই উপড়ে নেব।”
সে দরজার হাতলে হাত লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাঘ স্মৃতি ভুলে গেছে বলে তোরা বড্ড হালকা চাল চেলে চলে এসেছিস, তাই না? ভেবেছিস সে এখন শুধু রং-তুলি আর গিটার চেনে? মনে রাখিস—শেরাজ খান তার অতীত ভুলতে পারে, কিন্তু তার কিলিং স্কিল আজও তার আঙুলের ডগায় জ্যান্ত হয়ে আছে। ঘুমন্ত বাঘকে ঘুমিয়েই থাকতে দে। কারণ সে যদি একবার জেগে ওঠে, তবে ওমানের বালুচর তোদের রক্তে লাল হয়ে যাবে।”
সে এগিয়ে এসে স্যান্ডির হাত থেকে লোকগুলোর ওমানি বসের পাঠানো সেই ছবিটা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলল। ছেঁড়া কাগজগুলো লোকগুলোর রক্তাক্ত শরীরের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে সে শেষবারের মতো গর্জে উঠল,
“তোদের নরকের এই যাত্রায় একটা মেসেজ সাথে নিয়ে যা। যদি কোনোদিন কারো ইশারায় আবার কথা বলতে পারিস, তবে তোদের বসকে গিয়ে বলিস—টাইগার জিন্দা হ্যায়! আর টাইগারের পাশে তার বাঘিনী এখন শুধু রক্ষক নয়, আজরাইল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”
খান সাহেব পর্ব ৮৮
কথাটা শেষ করে সুমু নিজের লেদার জ্যাকেটের জিপারটা টেনে এক ঝটকায় দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। স্যান্ডি পেছন থেকে সুমুর এই রূপ দেখে আবারও মনে মনে বিড়বিড় করল,
“স্যার তো স্মৃতি হারিয়ে শুধু একজন শান্তশিষ্ট মানুষ হয়েছেন, কিন্তু ম্যাম তো দেখছি স্মৃতি আগলে রেখে আস্ত একটা ডাইনামাইট হয়ে গেছেন।”
