Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৯২

খান সাহেব পর্ব ৯২

খান সাহেব পর্ব ৯২
সুমাইয়া জাহান

সুমু আয়নার সামনে বসে নিজেকে সাজিয়ে তুলছিল। ​ঠিক সেই মুহূর্তে, কোনো আগাম বার্তা না দিয়েই ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেখানে উপস্থিত হলো শেরাজ। তার পায়ের শব্দ পাওয়া গেল না, কিন্তু তার অস্তিত্বের সেই চিরচেনা তীব্রতা সুমু অনুভব করতে পারল। শেরাজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল। গভীর এক তৃপ্তি নিয়ে সে সুমুর চুলের ভাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে বুকভরে শ্বাস নিল।
​“আপনার কাছে এতো দারুণ দারুণ স্মেলের ব্র্যান্ডেড পারফিউম থাকতে, সবসময় আমার চুলের ঘ্রাণ-ই কেন বুক ভরে টেনে নেন আপনি?”
​শেরাজ মুহূর্তকাল থামল। সুমুর কাঁধে চিবুক রেখে খুব শান্ত কণ্ঠে সে উত্তর দিল,

​​“আমি যত পারফিউম-ই কিনি না কেন, তোমার চুলের সুগন্ধ সেই সব কিছুকে হার মানায়!”
“হঠাৎ আপনার হৃদয়ে এতোটা রোমান্টিকতার জোয়ার কেন? পাষাণ হৃদয়ে বসন্তের এমন অকাল আগমন কি কেবলই মায়া, নাকি এর পেছনে লুক্কায়িত আছে অন্য কোনো নিগূঢ় বাসনা? সত্যি করে বলুন তো, আজ আমার কাছে আপনার এই নিভৃত আর্তি ঠিক কী? কি চাই আপনার?”
​শেরাজ এক ঘোরের বশবর্তী হয়ে ধীর লয়ে গুঞ্জরণ করে আবদারের সুরে বলল,

“হো… ও… ও…
হো… ও…
আমায় আদর করো!
হো… ও… ও…
হো… ও…
উড়িয়ে সুখের ঝড়!”
​শেরাজের ঘনিষ্ঠতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সুমু এক মৃদু ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। কিন্তু শেরাজ তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে তার পকেট থেকে অতি সংগোপনে একটি মখমলের ছোট বাক্স বের করল। ঢাকনা খুলতেই ভেতর থেকে একটি হীরের নোজ রিং ঝিলিক দিয়ে উঠল।

সুমু কিছু বুঝে ওঠার আগেই শেরাজ পরম মমতায়, অতি সাবধানে তার নাসিকায় রিং’টি পরিয়ে দিয়ে তার বিমুগ্ধ চোখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে গম্ভীর স্বরে বলল,
​ “পৃথিবীর সমস্ত অলঙ্কারই হয়তো নিজস্ব মহিমায় সমুজ্জ্বল, কিন্তু আমার হৃদয়েশ্বরীর নাসিকায় শোভা পাওয়া এই নোলকটির আবেদন এক অনন্য উচ্চতায় আসীন।” সে আবারও বলল, “অল রিং আর ওকে বাট… আমার সুইটহার্টের পরা নোজ রিং হিটস ডিফারেন্ট। এই ক্ষুদ্র হীরের দ্যুতি তোমার সৌন্দর্যের কাছে হার মেনেছে সুমু, কারণ তোমার ওই নোলক পরিহিত মুখচ্ছবি আমার পুরো পৃথিবীটাকে এক মুহূর্তেই ওলটপালট করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”
​শেরাজের কণ্ঠে নোলকের মুগ্ধতা মেশানো স্তুতি শুনে সুমু আর নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। ​তার প্রাণোচ্ছল হাসির বিপরীতে শেরাজ মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের বুকের বাম পাশে হাত রেখে কিছুটা আর্তনাদ আর কিছুটা আর্তি নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,

​ “দোহাই তোমার সুইটহার্ট, তোমার এই সম্মোহনী হাসি থামাও! তোমার এই অমলিন হাসির প্রাবল্যে আমার পাষাণ হৃদয়ে যেন এক প্রলয়ংকরী তোলপাড় শুরু হয়েছে। আমার এই জীর্ণ বুকে বড় তীব্র ব্যথার উদ্রেক হচ্ছে—এ যেন এক মধুর যন্ত্রণা, যা সহ্য করাও কঠিন আবার বিসর্জন দেওয়াও অসম্ভব।”
​ “হঠাৎ এতো প্রেমের প্লাবন কেন? আপনার এই অতিভক্তির নিগূঢ় রহস্যটা ঠিক বুঝলাম না। হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট? স্পষ্ট করে বলুন তো, ঠিক কী চাই আপনার?”
শেরাজ ধীর পায়ে সুমুর আরও কিছুটা কাছে এগিয়ে এলো। সে খুব নিচু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলে উঠল,
​ “আই নিড ইয়োর ফিট অন মাই শোল্ডার…”
​কথাটা কানে পৌঁছানো মাত্রই সুমুর দুই ভ্রু আরও বেশি কুঁচকে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তার ফর্সা মুখাবয়বে লজ্জার এক আরক্ত আভা ফুটে উঠল, যা পরক্ষণেই রাগের ছদ্মবেশ নিল। সে দ্রুত এক পা পিছিয়ে গিয়ে কৃত্রিম রাগে ফেটে পড়ে বলল,

“ছিঃ! কী বাজে আর অসভ্য একটা লোক আপনি! আপনার এই ধৃষ্টতা আর অসংলগ্ন আবদার দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে মঙ্গল গ্রহে চলে যাচ্ছে।”
রাত আটটা। শেখ বাড়ির বিশাল আঙিনা আজ ভরপুর। চারদিকে কাঁচা গাঁদা ফুলের সুঘ্রাণ আর হলদে আলোর রোশনাই। আজ পিয়াস-ইফতিয়া আর স্যান্ডি-নাতাশার গায়ে হলুদ আর মেহেন্দী। পুরো বাড়ি আত্মীয়-স্বজনে ঠাসা। একপাশে সিনিয়রদের গোল বৈঠক বসেছে। শামীম সাহেব, সাখাওয়াত সাহেব, সাহাবাজ খান, শেহেজাদ খান, আদনান চৌধুরী, মুস্তাক সিকদার, ইফতিয়াক সাহেব আর আনোয়ার সিকদাররা মিলে বিয়ের আলোচনার সাথে সাথে খোশগল্পে মগ্ন। মাজেরা বেগম আর আশাবানু—দুই বৃদ্ধা পাশাপাশি বসে পান চিবোতে চিবোতে পুরনো দিনের বিয়ের গল্প শোনাচ্ছেন হাসি বেগম, অনন্যা খাতুন, রুহি খাতুন, আফিয়া খাতুন আর রুমা বেগমকে। মিনা বেগম, সুমি বেগম আর খুশি বেগমও সেই আলোচনায় যোগ দিয়ে মাঝে মাঝে আড়চোখে হবু বর-কনের দিকে তাকাচ্ছেন।
হলুদের মঞ্চে দুই জোড়া বর-কনে। পিয়াস আর ইফতিয়া পাশাপাশি বসে থাকলেও কেউ কারো দিকে তাকাতে পারছেনা। ওদিকে স্যান্ডি আর নাতাশার কাণ্ড আরও অদ্ভুত। নাতাশা যখনই আড়চোখে স্যান্ডির দিকে তাকাচ্ছে, স্যান্ডি তখনই বেকুবের মতো হাসি দিয়ে ইশারা করছে।
তরুণদের আড্ডায় রিয়াদ, নিহাল, রিসান, অমিত, সাইফ আর ফাহিমরা মিলে স্যান্ডিকে খেপাতে ব্যস্ত। সারবাজ ক্যামেরা হাতে ছোটাছুটি করছে, তার ভাই শাহরুখ তাকে সাহায্য করছে, আর ইনায়া তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যেন শটগুলো নিখুঁত হয়।

শেরাজ আর সুমু এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ শেরাজ চুপিচুপি সুমুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ওদের হলুদ মাখতে দেখে, আমারও ইচ্ছা করছে।”
সুমু শাসনের সুরে বলল,
“চুপ থাকুন, খান সাহেব!”
রাহিন আর সামিয়া একপাশে দাঁড়িয়ে হাফসার দুষ্টুমি দেখছে। নয়ন আর মাইশা ব্যস্ত নাহিয়ানকে সামলাতে। নাজমিন আর আইয়ুবের খুনশুটি চিরকালীন। আইয়ুব নাজমিনের গালে একটু হলুদ ছুঁইয়ে দিয়ে কানে কানে কিছু বলতেই নাজমিন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। রিফাত আর অজান্তা এক জায়গায় বসে আয়াসের দুষ্টুমি উপভোগ করছে। আরবাজ আর ইশিতা, নাতাশা আর স‍্যান্ডির কাছে বসে আছে আর শাহরুখ আর ফারিয়া, পিয়াস আর ইফতিয়ার কাছে বসে আছে।
বাচ্চাদের মধ্যে আজ বিশাল যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সিমরানকে আজ হলুদ রঙের ছোট্ট লেহেঙ্গায় একদম পরীর মতো লাগছে। তাকে দেখেই রিফাতের ছেলে আয়াস আর নয়নের ছেলে নাহিয়ান—মিলে পেছনে পেছনে ঘুরছে ফ্রেন্ডশিপ করার জন্য। কিন্তু সিমরান তো শেরাজ খানের রাজকন্যা, কেউ চাইলেই তো আর সে পাত্তা দেবে না। ওদিকে সিমরানকে প্রটেক্ট করার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ‘বডিগার্ড’ বাহিনী—নিশান, রুহি, হাফসা আর আহিয়া। নিশান গম্ভীর মুখে নাহিয়ানকে বলল,

“আমাল সিসতে ডিস্টার্ব তরলে তিন্তু থবল আতে!”
রুহি আর হাফসাও কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছে সিমরানের সামনে। একটু দূরেই শুরু হয়েছে অন‍্যদের ঝগড়া। আশিক হলুদের বাটিটা সরাতে গিয়ে ফারিনকে একটু রং লাগিয়ে দিয়েছে। ফারিন চিৎকার করে বলল,
“আশিক ভাইয়া! তুমি কি চোখে দেখো না? আমার ড্রেসটা নষ্ট করে দিলে।”
আশিক টিটকারি মেরে বলল,
“এমনিতেও তো তোকে পেতনির মতোই লাগছে, এই হলুদ লেগে গিয়ে এখন একটু দেখতে ভালো লাগছে।”
রিয়াজ বারবার ফিরোজার দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু ফিরোজা তাকালেই সে নজর ঘুরিয়ে ফেলছে। ফিরোজা শরবতের গ্লাস নিয়ে রিয়াজের পাশ দিয়ে যেতেই, রিয়াজ খুব নিচু স্বরে বলল,
“হলুদ শাড়িতে তোকে খুব মানিয়েছে।”

ফিরোজা চমকে গিয়ে একটু হাসল, সেই হাসিতে যেন রিয়াজের হৃদস্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। অন‍্যদিকে, তিশা, রাইফ আর রাইশারা মিলে হলুদের থালা সাজাতে ব্যস্ত। সজীব খাবারের জায়গাটা দেখছে। শাহরুখ আর ফারিয়া পাশাপাশি বসে কথা বলছে। আইয়ুব হঠাৎ গান ছাড়ল, আর অমনি বাচ্চারা চিৎকার করে নাচতে শুরু করল। শেরাজ আর সুমু একে অপরের হাত শক্ত করে ধরল—এই পূর্ণতাটুকুই তো তারা চেয়েছিল।
একে একে মুরুব্বিরা এসে পিয়াস-ইফতিয়া আর স্যান্ডি-নাতাশার কপালে হলুদ ছোঁয়াতে লাগলেন। পিয়াস লাজুক মুখে বসে থাকলেও ইফতিয়া যেন লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ওদিকে স্যান্ডি আর নাতাশার হলুদ মাখানোর পর্বটা মহোৎসবের মতো। আইয়ুব আর সারবাজরা মিলে স্যান্ডিকে হলুদে এমনভাবে চুবিয়ে দিল যে তাকে চেনা দায়।
হলুদ মাখানো পর্বের মাঝেই একপাশে শুরু হলো মেহেদীর আসর। নাতাশা আর ইফতিয়াকে ঘিরে গোল হয়ে বসেছে ইনায়া, ইশিতা, নাজমিন আর ফিরোজা। দুই কনের দুই হাত জুড়ে আলপনা আঁকা হচ্ছে। ইফতিয়া বেশ শান্ত হয়ে বসে থাকলেও তার চোখের কোণে আনন্দের চিকচিকানি। সে বারবার আড়চোখে পিয়াসকে দেখার চেষ্টা করছে, যার নামটা সে নিজের মেহেন্দির নকশার গভীরে অতি সংগোপনে লুকিয়ে রেখেছে।
নাতাশা অবশ্য বেশ চঞ্চল। সে তার মেহেদী রাঙানো হাত স্যান্ডিকে দেখিয়ে বলল,

“দেখুন তো স্যান্ডি সাহেব, আপনার নামটা কোথায় লিখেছি? খুঁজে বের করতে না পারলে কাল কিন্তু গিফট দিতে হবে।”
স্যান্ডি অসহায়ের মতো তাকিয়ে থেকে বলল,
“এতো সূক্ষ্ম নকশার মাঝে নাম খোঁজা তো খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো। আমি বরং কাল একটা গিফট দিয়ে হার মেনে নেব।”
সিমরান, হাফসা, আহিয়া আর রুহিও বাদ গেল না। তারা বায়না ধরল—তাদের হাতেও মেহেন্দি দিতে হবে। সুমু সিমরানের পিচ্চি হাতে সুন্দর করে নকশা এঁকে দিতেই সে খুশিতে বাগানে দৌড়াতে লাগল। সে গিয়ে শেরাজকে হাত দেখিয়ে বলল,
“পাপা দেথো! আমাল হাতেও মেহেন্দি। এথন আমি বনো হয়ে গেতি।”
শেরাজ মেয়ের হাতদুটো পরম মমতায় হাতে নিয়ে বলল,

“আমার রাজকন্যা তো এমনিতেই বড়, মেহেন্দি দিয়ে তো এখন পরীর থেকেও বেশি সুন্দর লাগছে।”
বড়দের আড্ডায় মেহেন্দির রঙ নিয়ে কথা উঠল। হাসি বেগম অনন্যা খাতুনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“জানেন তো বিয়াইন, আমাদের সময় মেহেন্দি বাটা হতো শিল-পাটায়। আর এখন সব টিউব মেহেন্দি। তবে ভালোবাসাটা কিন্তু একই আছে।”
“ঠিকই বলেছেন! কথায় আছে, মেয়েদের মেহেন্দির রঙ যত গাঢ় হবে, তাদের স্বামী তাদের তত বেশি ভালোবাসবে।”
হলুদ আর মেহেন্দির পর্ব শেষ হতেই শুরু হলো সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। বক্স থেকে বেজে উঠল ‘বোলে চুড়িয়ান’ গানের সুর। শেরাজ আজ কালো পাঞ্জাবী পরেছে। সে আর সুমু ড‍্যান্স ফ্লোরে এসে দাঁড়াতেই, পুরো শেখ বাড়ির আঙিনা করতালিতে ফেটে পড়ল। তাদের সাথে যোগ দিল বাকিসব কাপলরা আর শেরাজের সমস্ত বন্ধুরা। প্রতিটি জোড়ার চোখেমুখে তখন অদ্ভুত পূর্ণতা।
নাচ-গান শেষে সবাই যখন একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, তখন গার্ডেনের এক কোণে শুরু হলো বাচ্চাদের খেলাধুলা। সিমরান আর হাফসা মিলে খেলছিল, হঠাৎ করেই তাদের সামনে হিরো স্টাইলে এসে দাঁড়াল নাহিয়ান। নাহিয়ানকে দেখেই সিমরান বেশ নাখরে দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু নাহিয়ান দমবার পাত্র নয়। সে ঝটপট সিমরানের পথ আটকে দাঁড়িয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“তোমার প্রবলেম কী প্রিটি লেডি? আমাকে দেখে এভাবে চলে যাচ্ছ কেন? আমি তো জাস্ট তোমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাই।”
সিমরান থেমে গেল। কোমরে দু’হাত রেখে ভ্রু কুঁচকে সে এমন এক চাউনি দিল যেন কোনো হিন্দি মুভির হিরোইন। বেশ তেজ নিয়ে বলল,
“তুমি আমাল থাতে লাইন মালাল তেষ্টা তলছ, তাই না? তোনো, এথব আমি মুভিতে দেতেছি। আমাল থেতে দূরে থাতো। নয়তো তোমাতে মেলে দুম তরে দিবো।”
সিমরানের এই মেরে গুম করে দেওয়ার হুমকি শুনে নাহিয়ান ভড়কানোর বদলে হেসে ফেলল। সে বলল,
“হেই! আমি শুধু বন্ধু হতে চাইছি। এতো ভয় পেও না। আমি তো শুধুমাত্র তোমার বন্ধু হতে চাই।”
সিমরান রাগ দেখিয়ে নাক সিঁটকে বলল,

“মজা? তুমি তি ভাবত আমি এতো সহজে তোমাল ফেনেড হবো? তোনো! আমাতে পতানো এতো তহজ না।”
“আরে চল না, একসাথে খেলা করি। দেখবে আমি মোটেও খারাপ নই। আমরা শুধু খুব ভালো বন্ধু হবো।”
সিমরান দুই পা পিছিয়ে গেল। তার চোখেমুখে রাগ। দূর থেকে মেয়ের এই অভাবনীয় রণমূর্তি দেখে মুচকি হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো শেরাজ। সিমরান শেরাজকে দেখে হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“পাপা! তুমি যাও। আমি থামলে নিতে পালবো।”
শেরাজ, সিমরানকে চট করে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“কী হয়েছে, মাম্মা? কী সামলে নিবেন আপনি?”
সিমরান তর্জনী উঁচিয়ে নাহিয়ানের দিকে তাক করে অভিযোগের সুরে বলল,
“এই ভাইয়াতা আর আয়াত ভাইয়া, আমাতে পতানোর তেষ্টা তরছে।”
“আপনি পটানো মানে বোঝেন, মাম্মা?”
সিমরান মাথা ঝাকিয়ে বলল,

“হ‍্যাঁ! আমি মুভিতে দেথেছি।”
“তা, কী কী দেখেছেন আপনি?”
“অনেত তিছু। এমন তাইপ বাজে
ছেনেনা মেয়েদের পতানোল দন‍্য এমন পিতু
পিতু ঘুনে।”
শেরাজ এবার নাহিয়ানের দিকে তাকাল। নাহিয়ান তখন থতমত খেয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শেরাজ গম্ভীর মুখে বলল,
“তুমি আমার প্রিন্সেসকে পটানোর চেষ্টা করছ?”
নাহিয়ান কাঁচুমাচু হয়ে বলল,
“আঙ্কেল! আমি শুধু ওর সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চেয়েছিলাম।”
“কিন্তু বেটা, আমার প্রিন্সেস তো এভাবে কারো সাথে ফ্রেন্ডশিপ করে না।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে হাজির হলো আয়াস। সে এসেই সাহসের সাথে বলল,
“তাহলে কীভাবে করে, আঙ্কেল?”
শেরাজ এবার আয়াসের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তুমিও কি ফ্রেন্ডশিপ করতে চাও?”
“হুম, আঙ্কেল! কিন্তু সিমরান পাত্তা দিচ্ছে না। বলুন না, কী করলে ও আমার সাথেও ফ্রেন্ডশিপ করবে?”
“ওইটা আমার প্রিন্সেসই ভালো বলতে পারবে। তবে ওকে পটানো কিন্তু পাহাড় ডিঙানোর চেয়েও কঠিন কাজ।”
শেরাজ হাফসা আর সিমরানকে নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো। পেছনে পড়ে রইল দুই ক্ষুদে রোমিও নাহিয়ান আর আয়াস। তারা একে অপরের দিকে একবার টেক্কা দেওয়ার মতো করে তাকাল, যেন কার আগে কে সিমরানের মন জয় করতে পারে—তা নিয়ে এক অদৃশ্য নীরব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান বেশ গভীর রাতেই শেষ হলো। ডিনার পর্ব চুকিয়ে মুরুব্বিরা সবাই বিশ্রামে গেছেন, বাড়ির অধিকাংশ সদস‍্যও ঘুমে ডুবে গেছে। কিন্তু শেখ বাড়ির তরুণ ব্রিগেডের চোখ থেকে ঘুম উধাও। আইয়ুব, শাহরুখরা মিলে ড্রয়িংরুমের এক কোণে একটা গোপন বৈঠক বসাল। উদ্দেশ্য— ‘ব্যাচেলর ট্র্যাপ’। কাল বিয়ে, তাই আজ রাতে পিয়াস আর স্যান্ডিকে একটু নাজেহাল না করলে যেন বন্ধুদের পেটের ভাত হজম হবে না।
আইয়ুব ফিসফিস করে বলল,

“শোন সবাই! পিয়াস তো সবসময় গম্ভীর থাকে, আর স্যান্ডি হলো ভীতুর ডিম। এই দুজনকে আজ রাতে এমন এক ফাঁদে ফেলব, যে ওরা বিয়ের কথা ভুলে পালানোর পথ খুঁজবে।”
শেরাজ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল,
“বেশি বাড়াবাড়ি করিস না আবার, কাল কিন্তু ওদের বিয়েতে বসতে হবে।”
রাহিন হাত নেড়ে বলল,
“আরে এস.কে, তুই শুধু দেখতে থাক।”
পরিকল্পনা মাফিক শাহরুখকে দিয়ে পিয়াস আর স্যান্ডিকে বাগানের নির্জন কোণে ডেকে আনা হলো, বলা হলো যে শেরাজ ভাইয়া ওখানে জরুরি কাজে ডেকেছে। পিয়াস আর স্যান্ডি যখন সেখানে পৌঁছাল, চারপাশ একদম অন্ধকার। হঠাৎ ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বিকট এক চিৎকার ভেসে এলো।
স্যান্ডি তো ভয়ের চোটে পিয়াসের হাত খামচে ধরল। পিয়াস গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করেও নিজের শরীরের কাঁপুনি লুকাতে পারছিল না। ঠিক তখন সাদা কাপড় পরা এক মূর্তি ধীরে ধীরে ওদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। স্যান্ডি চিৎকার করে বলল,

“ওরে বাবা রে! পিয়াস ভাই, এটা ভূত নাকি ডাইনি?”
পিয়াস দাঁত চেপে বলল,
“ভয় পেও না স্যান্ডি, এগুলো নিশ্চয়ই ওই বাঁদরগুলোর কাজ।”
ঠিক তখনি অমিত আর নিহাল মিলে পেছন থেকে দুটো বড় বালতি ভর্তি ঠাণ্ডা পানি ওদের ওপর ঢেলে দিল। সাথে সাথে চারদিকের লাইট জ্বলে উঠল। আইয়ুব চাদর ফেলে দিয়ে হো হো করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো। পিয়াস আর স্যান্ডি ভিজে একাকার।
আইয়ুব তালি বাজিয়ে বলল,
“বিয়ের আগে ব্যাচেলর লাইফের শেষ ওয়াশ হয়ে গেল। দুজনেই তো হলুদের শাওয়ার রুমে গিয়ে নিয়েছ, তাই আমরা আবার আলাদা করে একটু হলুদের শাওয়ার করালাম। নাউ তোমাদের ফিলিংস বলো?”
স্যান্ডি রাগে কাঁপছে নাকি ঠাণ্ডায় বোঝা যাচ্ছে না। সে চিৎকার করে বলল,
“সময় আসুক, আপনাদের সবাইকে দেখে নেব।”
পিয়াস চুল থেকে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে ম্লান হেসে বলল,
“আইয়ুব, এটা কিন্তু বেশি হয়ে গেল। কাল বিয়ের দিনে যদি আমার সর্দি লাগে।”
ঠিক এই সময় ইশিতা আর ইনায়া বাহিরে এসে এই দৃশ্য দেখে হাসিতে ফেটে পড়ল। ইশিতা চিমটি কেটে আরবাজকে বলল,

“তোমাদের ছেলেদের কোনোদিন কি আক্কেল হবে না? বেচারা বর দুটোকে জবুথবু বানিয়ে দিলে?”
সকলে হেসে উঠল। পিয়াস আর স্যান্ডিও শেষে না হেসে পারল না। ভেজা কাপড়ে কাঁপতে কাঁপতেই ওরা দুজন জোর করে আইয়ুবদের সাথে কোলাকুলি করে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
সিমরান আর শেরান অনেক আগেই ইনায়া আর সারবাজের কাছে ঘুমানোর জন্য চলে গেছে। ছোটবেলা থেকেই ওদের কাছে শোবার একটা আলাদা টান আছে বাচ্চাদের, আর আজ বিয়ের বাড়িতে সেই আবদার যেন আরও জোরালো ছিল।
সুমু পা টিপে টিপে ইনায়াদের রুম থেকে দেখে এলো বাচ্চারা ঘুমিয়েছে কি না। দুই ভাই-বোন সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। সে ধীর পায়ে নিজের রুমে ফিরে এলো। ভেতরে ঢুকে খুব সাবধানে দরজাটা লাগিয়ে দিল, যাতে কোনো শব্দ না হয়। কিন্তু সে ঘোরার আগেই, আচমকা একজোড়া বলিষ্ঠ হাত পেছন থেকে তার কোমর জড়িয়ে ধরল।
সুমু চমকে উঠলেও পরক্ষণেই শরীরের সেই চেনা স্পর্শে শিউরে উঠল। তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে আবার দ্বিগুণ বেগে ধুকপুক করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, এটা আর কেউ নয়—তার খান সাহেব। শেরাজ খুব সন্তর্পণে সুমুর ঘাড়ে নিজের মুখটা রেখে অত্যন্ত নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,

“সবাই তো ঘুমিয়ে পড়েছে, এবার কি আমি একটু সময় পেতে পারি, স‍্যানোরিটা?”
সুমু মৃদু হেসে নিজের হাত দুটো দিয়ে শেরাজের হাত আঁকড়ে ধরল,
“আপনি কি কখনোই বড় হবেন না? সারাদিন এতো ধকল গেল, এখনো আপনার দুষ্টুমি শেষ হলো না?”
শেরাজ তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। নীল আলোয় শেরাজের চোখের সেই তীব্র চাহনি সুমুকে যেন সম্মোহিত করে ফেলল। শেরাজ তার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“পাঁচটা বছর আনমনেই এই মুহূর্তটার জন্য চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিলাম, ম‍্যাডাম। আজ যখন চারপাশে এতো আনন্দ, এতো পূর্ণতা—তখন তোমাকে একবার নিভৃতে নিজের করে না পেলে এই রাতটা অপূর্ণই থেকে যাবে।”
সুমু আর কিছু বলতে পারল না। শেরাজের বুকে মাথা রেখে সে পরম নির্ভরতায় চোখ বন্ধ করল। দীর্ঘ বিরহের পর এই যে মিলন, এর চেয়ে দামি উপহার আর কী-ই বা হতে পারে। শেরাজের বুকের প্রশস্ত আলিঙ্গনে সে নিজেকে সঁপে দিলেও তার মনের গহীনে জমে থাকা একটি পুরনো প্রশ্ন আচমকা ঠোঁটের ডগায় চলে এলো। সে শেরাজের শার্টের বোতাম নিয়ে আনমনে খেলতে খেলতে খুব আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“একটা কথা বলবেন? এই যে দীর্ঘ পাঁচটা বছর আমি আপনার পাশে ছিলাম না, আপনার স্মৃতিতেও আমার কোনো অস্তিত্ব ছিল না… বাংলাদেশের এই যান্ত্রিক জীবনে আপনার চারপাশে তো কত সুন্দরী নারী ছিল। কারো মায়াবী চোখ কি আপনাকে এক মুহূর্তের জন্যও টানেনি? কাউকে কি মনে ধরেনি আপনার?”
শেরাজ সুমুর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
“এই পাঁচ বছরে আমার স্মৃতি ছিল না ঠিকই, কিন্তু আমার আত্মার স্পন্দনে কোথাও না কোথাও তোমার অস্তিত্ব মিশে ছিল। তুমি ছাড়া অন্য কোনো নারীকে মনে ধরা তো অনেক দূরের কথা, তাদের দিকে অন্য কোনো দৃষ্টিতে তাকালেও যেন আমার সেই মুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে আসত। মনে হতো, আমার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকা বিদ্রোহ করছে, আমার ফুসফুস অক্সিজেন নিতে অস্বীকার করছে। আমি জানতাম না কার জন্য আমার এই বিজাতীয় অবাধ্যতা, কিন্তু আজ বুঝতে পারি— আমার হৃদপিণ্ডটা অন্য কারোর জন্য আগে থেকেই বুক করা ছিল। সেখানে তোমার নামটা এতোটা গভীরে খোদাই করা ছিল যে, স্মৃতিহীন শেরাজ চাইলেও অন্য কাউকে সেখানে বসাতে পারতো না।”

শেরাজ একটু থামল, তারপর সুমুর কপালে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিয়ে আবারও বলল,
“তুমিই আমার শুরু, তুমিই আমার শেষ সুইটহার্ট। তোমার ওই মায়াবী শাসনের বাইরে অন্য কোনো নারীর সৌন্দর্য আমাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা রাখে না। আমার পৃথিবীটা ছোট, আর সেই পৃথিবীর একক সম্রাজ্ঞী শুধু তুমিই। তুমি ছাড়া অন‍্য কোনো নারীকে ভালোবাসা তো দূরের কথা, তাদের দিকে তাকানোর আগেই যেন আমার নিঃশ্বাস চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।”
সুমুর চোখের কোণে এক ফোঁটা আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল। সে শেরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। পাঁচ বছরের সেই দীর্ঘ হাহাকার যেন এই এক মুহূর্তের স্বীকারোক্তি আর ভালোবাসার তাপে কর্পূরের মতো উবে গেল। শেরাজ সুমুর চুলের ওপর ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,

“কিছু ভালোবাসা মৃত্যুঞ্জয়ী হয়, যা স্মৃতি হারালোও পথ হারায় না।”
সে সুমুর দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। সে খুব নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করল, হাতের তালু দুটো একদমই ফ্যাকাসে, কোনো রঙ নেই। সে কিছুটা বিস্ময় আর কিছুটা অনুযোগের সুরে বলল,
“মেহেদী পরোনি? পুরো বাড়ি যখন উৎসবে মেতেছে, আমার রানি কি তবে ব্রাত্য রয়ে গেল?”
সুমু ম্লান হাসল। শেরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে মায়াবী গলায় বলল,
“সবদিক সামলাতে আর বাচ্চাদের সামলাতে গিয়ে নিজের জন্য সময় বের করতে পারিনি। তাছাড়া, কার জন্য সাজব? যার জন্য এই সাজগোজ, সে তো এখন আমাকে ভালোই বাসে না।”
শেরাজ কোনো কথা বলল না। সে ড্রয়ার থেকে মেহেদীর একটা নতুন টিউব বের করে আনল। বিছানায় সুমুর মুখোমুখি বসে সে পরম যত্নে সুমুর ডান হাতটি নিজের বাম হাতের তালুর ওপর রাখল। সুমু অবাক হয়ে বলল,
“আপনি পারবেন? এ তো অনেক সূক্ষ্ম কাজ।”

শেরাজ স্মিত হেসে মেহেদীর মুখটা খুলল। তারপর অত্যন্ত একাগ্রচিত্তে সুমুর হাতের তালুর মাঝখানে একটি ছোট্ট বিন্দু দিয়ে শুরু করল। সে অত্যন্ত নিপুণভাবে আলপনা আঁকতে আঁকতে নিচু স্বরে বলল,
“পারব কি না জানি না, তবে আমার ভালোবাসার যে রঙটা পাঁচ বছর ধরে মনের ভেতর জমা হয়ে ছিল, আজ সেটা তোমার হাতে মেখে দিতে চাই। তোমার ওই শূন্য হাত দুটো আমার বড্ড অচেনা লাগছে।”
সে খুব সন্তর্পণে সুমুর হাতে নিজের নামের আদ্যাক্ষর ‘এস’ ফুটিয়ে তুলল। সুমু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার প্রিয় মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল। শেরাজের একাগ্রতা দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন কোনো পার্থিব নকশা নয়, বরং হৃদয়ের গহীন থেকে পরম যত্নের কোনো কাব্য রচনা করছে। প্রতিটি রেখায়, প্রতিটি বিন্দুতে শেরাজের আঙুলের সেই চেনা স্পর্শ সুমুর সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বইয়ে দিচ্ছে। সুমু অনুভব করল, এই মেহেদীর রঙ হয়তো একদিন ধুয়ে যাবে, কিন্তু শেরাজ আজ তার আত্মার গহীন কোণে নিজের যে স্বত্বা নতুন করে লিখে দিচ্ছে, তা কোনোদিনও মুছে যাওয়ার নয়।
কাজ শেষ করে শেরাজ তার হাতে আলতো করে চুমু খেল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

“হাতদুটো এখন পূর্ণতা পেল। কাল যখন এই রঙটা গাঢ় হবে, তখন তুমি আবারও জানবে— তুমি শুধু আমার, কেবলই আমার।”
সে সুমুর আরও কাছে সরে এলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বলল,
“মেরে দিল মে সির্ফ তুম হো,
অউর কোই নেহি,
মেরে লিয়ে তুমহারা হোনাই কাফি হ্যায়,
অউর কোই নেহি!”
সুমু নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে শেরাজের কথাগুলো শুনছে। তার বুকটা ধুকপুক করছে। শেরাজ তার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে পুনরায় বলল,

“মোহাব্বত ইবাদাত হ্যায়,
আগার পাক সাফ হো!
ম্যা উস্সি মোহাব্বত কে লিয়ে তুমহে মাঙ্গা হ্যায়,
কিসি অউর কো নেহি!”
সে সুমুর একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে শেষবারের মতো বলল,
“তেরে সিবা কিসি অউর কো দেখনা গাওয়ারা নেহি,
ইয়ে দিল মেরা হ্যায়, মগার আব ইয়ে মেরা নেহি!”
ইয়ে ধাড়কান আব তেরে ইশারো পে চালতি হ্যায়,
মেরা দিল তো হ্যায়, মাগার তু ইসমে রেহতি হ্যায়!”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ তার হাতদুটো নিজের বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে পুনরায় বলল,

“এই যে দেখছ আমার হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি— এটাও এখন আমার অবাধ্য, সুইটহার্ট। এটা এখন কেবল তোমার ইশারায় স্তব্ধ হয়, আর তোমার ইশারায় স্পন্দিত হয়। আমি তো কেবল এক চলন্ত দেহ মাত্র, আমার সমস্ত নিয়ন্ত্রণ এখন তোমার হাতে।” সে আবারও বলল, “তুমি মায়ার কারাগার, আর আমি সেই মায়ায় চিরদিনের কয়েদি। চাইলেও এখান থেকে আমি পালাতে পারব না। আর আমি পালাতে চাইও না।”
সুমু শেরাজের এই ঐশ্বরিক ভালোবাসার সামনে সে যেন পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেল। শেরাজের প্রতিটি শব্দে যেন এক একটা অঙ্গীকার মিশে ছিল। সুমু আলতো হেসে বলল,
“কোনো পুরুষ যখন এভাবে নিজেকে কোনো নারীর কাছে সমর্পণ করে, তখন এই নারীর জীবনে আর কোনো অপূর্ণতা থাকতে পারে না। হীরা-জহরত বা দামী গয়নার চেয়েও এই যে পবিত্র একনিষ্ঠতা—একজন নারীর কাছে এর চেয়ে বড় কোনো ঐশ্বর্য এই পৃথিবীতে আর হতে পারে না। আপনি কেবল আমার স্বামী নন, আপনি আমার সমস্ত অস্তিত্বের মালিক।”
শেরাজ সুমুর কপালে দীর্ঘ এক ভালোবাসার পরশ এঁকে দিল। সুমু আবারও বলল,
“এই সুখ দেখলে, সারা বিশ্বের নারীরা হয়তো আজ আমার জায়গায় থাকতে চাইত। আমি বড্ড ভাগ‍্যবতী।”

​বিয়ের দিনের গোধূলি বেলা। বাড়ির মূল ফটকটি রজনীগন্ধার মালায় সাজানো হয়েছে। আজ পিয়াস-ইফতিয়া আর স্যান্ডি-নাতাশার জীবনের সেই দীর্ঘ প্রতিক্ষার মুহুর্তের অবসান ঘটবে। ​মুরুব্বিদের দল আজ বেশ গম্ভীর কিন্তু তৃপ্ত। শামীম সাহেব আর সাহাবাজ খান সাদা পাঞ্জাবিতে আভিজাত্যের ছাপ নিয়ে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। শেহেজাদ খান, মুস্তাক সিকদার আর সাখাওয়াত সাহেব তদারকি করছেন খাবারের বিশাল আয়োজনের। ইফতিয়াক সাহেব, আদনান সাহেব আর আনোয়ার সাহেব ডেকোরেশনের সমস্ত খুঁটিনাটি দেখছেন। সজীব কোমর বেঁধে আইয়ুবের সাথে সবকিছুর তদারকি করছে, যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে। হাসি বেগম, রুমা বেগম আর সুমি বেগম সকলের জন‍্য নাস্তা বানাতে ব‍্যস্ত। মিনা বেগম আর খুশি বেগম কার কি প্রয়োজন সেই দিকটা দেখছেন। মাজেরা বেগম আর আশাবানু বারান্দার সোফায় বসে খোশগল্প করছেন। তাদের সাথে অংশগ্রহণ করেছেন অনন‍্যা খাতুন, রুহি খাতুন আর আফিয়া খাতুন। তারাও কাজে হাত লাগাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু হাসি বেগম আর রুমা বেগম তাদের কোনো কাজে হাত লাগাতে দেননি।
​রুমের আয়নার সামনে তখন অন্যরকম দৃশ্য। পিয়াসকে আজ ঘিয়ে রঙের শেরওয়ানি আর মেরুন পাগড়িতে একদম রাজপুত্রের মতো লাগছে। আজ তার মুখে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য ছাপিয়ে এক চিলতে সুখের হাসি। পাশে স্যান্ডি— নীল শেরওয়ানি আর রুপোলি কাজ করা জুতো পরে বারবার নিজের পাগড়ি ঠিক করছে আর বিড়বিড় করে বলছে,

“বুকটা তো ধুকপুক করছে। বিয়ের আসর অব্দি পৌঁছাতে পারব তো?”
শাহরুখ তার অবস্থা দেখে বলল,
“আরে সান ব্রো, এতো চিন্তা করো না।”
​গেট ধরার জন্য আজ কোমর বেঁধে দাঁড়িয়েছে তিশা, ফারিন, রাইশা, রাইফ, আশিক। সাথে আছে রুহি, নিশান, হাফসা আর আহিয়া। তিশা ফারিনের কানে ফিসফিস করে বলল,
“আজ কিন্তু স্যান্ডি ভাইয়া আর পিয়াস ভাইয়ার পকেট খালি করে তবেই ছাড়ব।”
​ঠিক তখনই বাড়ির প্রধান ফটকের কাছে এক বিশাল তোলপাড় শুরু হলো। দুই বর যখন একসাথে বিয়ের আসরে দিকে এগোতে চাইল, তখনই তাদের পথ আটকে দাঁড়াল একঝাঁক ক্ষুদে সেনাদল। সিমরানকে আজ লাল রঙের বেনারসি লেহেঙ্গায় একদম ছোট্ট এক পরীর মতো লাগছে। তার একপাশে নিশান, আহিয়া আর হাফসা। অন্যপাশে রুহি আর নিশান ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​সিমরান দুহাত কোমরে রেখে পিয়াস আর স্যান্ডির সামনে দাঁড়িয়ে খুব তেজ নিয়ে বলল,

“থামো তোমলা! এতো থহজে ভেতনে যাওয়া যাবে না। আগে তাতা দাও, তালপল লাত্তা ছালবো। পাপা বনেছে, তাতা না দিলে তোমাদেল ভেতলে ঢুততে দেওয়া যাবে না।”
​পিয়াস হাসিমুখে একমুঠো চকলেট বের করতেই সিমরান নাক কুঁচকে বলল,
“এথব চতনেট দিয়ে আমাদেল পতানো যাবে না।”
​পেছন থেকে শেরাজ মুচকি হাসতে হাসতে এগিয়ে এলো। আজ সে পরেছে অফ-হোয়াইট রঙের একটি সিল্কের পাঞ্জাবি, যার কাজগুলো একদম সূক্ষ্ম। পাশে সুমু—তার হাতে শেরাজের নিজ হাতে পরানো সেই মেহেন্দির রঙ আজ একদম কালচে লাল হয়ে উঠেছে।
শেরাজ সিমরানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“কী হয়েছে আমার প্রিন্সেসের? বর’রা কি কিপটেমি করছে?”
​নাহিয়ান আর আয়াস পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সুযোগ বুঝে সিমরানের পক্ষ নিয়ে পিয়াসের পাঞ্জাবি টেনে ধরল। আয়াস বলল,

“আঙ্কেল, সিমরান যা বলছে তাই হবে। আগে মানি ব্যাগ বের করুন।”
ওর কথা শুনে সকলে হেসে উঠল। ​ওদিকে আশিক আর ফারিনের সেই চিরকালীন ঝগড়া আজও শুরু হলো। আশিক ফারিনের হাতে থাকা গেটের ফিতা কাটার কাঁচিটা নিয়ে বলল,
“এই যে ঝগড়ুটে মেয়ে, বিয়ের গেট তো আমরা ধরব, তুই না বরপক্ষ? যা, কনেদের কাছে যা।”
ফারিন রাগে ফোঁস করে উঠে বলল,
“দেখো আশিক ভাইয়া, ফালতু কথা বলবে না।”
ওদের দুজনের ঝগড়ার মাঝে শেরাজরা বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে গেট মুক্ত করল। পিয়াস আর স্যান্ডি বিয়ের আসরে গিয়ে বসতেই, চারপাশে হুল্লোড় শুরু হলো। আজ ইশিতা আর ইনায়া ক্যামেরা হাতে সেই মুহূর্তগুলো বন্দি করতে ব্যস্ত।
​শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলল,

“সবাই কত সুন্দর করে ঘর বাঁধছে, তাই না সুইটহার্ট? মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা আজ আমাদের খুশিতে রঙিন হয়ে গেছে।”
সুমু শেরাজের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার মনে হলো, আজ কেবল পিয়াস বা স্যান্ডির বিয়ে নয়, আজ তাদের পাঁচ বছরের অপেক্ষার সেই পূর্ণতা যেন শেখ বাড়ির প্রতিটি কোনায় উৎসব হয়ে আছড়ে পড়ছে।
​সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতে শুরু করল। ​মুরুব্বিদের দল আসরে বসেছেন। সাখাওয়াত সাহেব, সাহাবাজ খান আর মুস্তাক সিকদাররা মুখোমুখি বসে আছেন। কাজী সাহেব বড় একটি খাতা নিয়ে তৈরি। পিয়াস আর স্যান্ডি—দুই বরই আজ বেশ শান্ত। পিয়াসের চোখে শেরাজের প্রতি এক ধরণের কৃতজ্ঞতা, আর স্যান্ডির চোখে নতুন জীবনের জন‍্য কিছুটা ভয় আর অনেকটা আনন্দ।
​প্রথমে পিয়াস আর ইফতিয়ার নিকাহ। কাজী সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বিয়ের খুৎবা পাঠ শুরু করতেই, পুরো মজলিস স্তব্ধ হয়ে গেল। পিয়াসের বাবা মুস্তাক সিকদার ছেলের কাঁধে হাত রেখে পরম নির্ভরতায় বসে আছেন। কাজী সাহেব পিয়াসের দিকে তাকিয়ে বিয়ের ইজাব-কবুল সম্পন্ন করার জন্য বললেন,

​“মোহাম্মদ পিয়াস সিকদার, আপনার সাথে ইফতিয়া খাতুনকে দশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া বিবাহ দেওয়া হইতেছে। আপনি কি কবুল করিলেন?”
​পিয়াস এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে, স্পষ্ট কণ্ঠে তিনবার বলল,
“কবুল, কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল!”
​পুরো মজলিস থেকে সমস্বরে দোয়ার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো। পিয়াস দস্তখত করার পর শুরু হলো স্যান্ডি আর নাতাশার পালা। স্যান্ডির বেলায় সাক্ষী হিসেবে সই করল শেরাজ আর সারবাজ। কাজী সাহেবের কথামতো স্যান্ডি বেশ আবেগী কণ্ঠে “কবুল” বলল।
বিবাহ শেষ হতেই খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শুরু হলো। ​এরই মধ্যেই বাড়ির ভেতর থেকে কান্নার রোল শোনা গেল। ইফতিয়া আর নাতাশার বিদায় বেলা ঘনিয়ে আসছে। রুমা বেগম আর অনন্যা খাতুন দুই কনেকে ধরে বাইরের ঘরে নিয়ে এলেন। ইফতিয়া তার বাবা ইফতিয়াক সাহেব আর খুশি বেগমের গলা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে। বাবার বুক থেকে কোনো মেয়েই বোধহয় সহজে সরতে চায় না। ওদিকে পাঁচটা বছর ধরে শেখ বাড়িতে থেকে, নাতাশা সকলের মায়ায় ভীষণভাবে জড়িয়ে গেছে। নাতাশাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে রুমা বেগম আর হাসি বেগম। এদিকে ছোট সদস‍্যরা বুঝতেই পারছে না আজকের এই আনন্দের দিনে সকলে কাঁদছে কেন।
​সিমরান শেরাজের পাঞ্জাবি টেনে ধরে বড় বড় চোখে জিজ্ঞেস করল,

“পাপা! নাতাথা আন্টি তাঁদছে তেনো? পিয়াত মামা আল চান আন্তেল তি তবাইকে মেলেছে?”
​শেরাজ ম্লান হেসে সিমরানকে কোলে তুলে নিল। সে মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
“না মাম্মা! নাতাশা আন্টি আর ইফতিয়া আন্টি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে তো, তাই এখন তাদের নতুন একটা বাড়িতে যেতে হবে। আর এরজন‍্যই সবাই কাঁদছে।”
​সিমরান গোল গোল চোখে চারপাশের কান্নার দৃশ্যগুলো দেখল। শেরাজের উত্তর শুনে সে যেন আরও চিন্তায় পড়ে গেল। সে তার ছোট্ট কচি আঙুলগুলো দিয়ে শেরাজের গাল ছুঁয়ে একদম আদুরে কিন্তু সিরিয়াস গলায় জিজ্ঞেস করল,
“পাপা, বনো হনে তি তবাইতে ছেনে নতুন বানিতে যেতে হয়? আমিও বনো হনে তি আমাতেও তবাইতে ছেনে নতুন বানিতে যেতে হবে?”
​মেয়ের এমন নিষ্পাপ আর আবেগমাখা প্রশ্ন শুনে শেরাজের বুকটা হঠাৎ হু হু করে উঠল। সে যেন উত্তর দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলল। ঠিক তখনই পেছন থেকে সুমু ছোট শেরানকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এলো। সে ম্লান হেসে সিমরানের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,

“হ‍্যাঁ মাম্মা! এটাই নিয়ম। মেয়েরা বড় হলে তাদের বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে চলে যেতে হয়।”
​সুমুর কথা শেষ হতে না হতেই শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোমাকে কে বলেছে আমার মাম্মাকে আমি পরের বাড়িতে পাঠাব? আমার মাম্মা চিরকাল আমার কাছেই থাকবে। কোনো পরের বাড়ি-টারি নেই। আমি আগে থেকেই ডিসাইড করে রেখেছি, দরকার হলে মেয়ের জামাইকে ‘ঘর জামাই’ রাখব, কিন্তু আমার চোখের মণি আমার চোখের আড়ালে যাবে না। ইমপসিবল!”
​শেরাজের এমন ‘পজেসিভ’ উত্তর শুনে সুমু হেসেই ফেলল। সে শেরানের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“শুনেছ বেটা? তোমার পাপা আগে থেকেই এসব উল্টাপাল্টা চিন্তা করছে।”
​সিমরান অবশ্য বাবার উত্তরে খুব খুশি। সে শেরাজের গলা জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে বলল,
“হ‍্যাঁ পাপা! আমি তোমাল থাতেই থাতবো। আমি তোথাও যাবো না।”

​বিদায়ে যখন গাড়িতে কনেদের তোলা হচ্ছে, তখন সজীব আর শাহরুখ ব্যস্ত সবার মালপত্র গুছিয়ে দিতে। তিশা, রাইশা আর রাইফ তখনো ইফতিয়ার পাশে বসে চোখের পানি ফেলছে। ​সুমু একপাশে দাঁড়িয়ে এই বিদায়ের দৃশ্য দেখছিল আর বারবার নিজের মেহেদী রাঙানো হাতের দিকে তাকাচ্ছিল। বেশ কয়েক বছর আগে সেও এভাবেই বিদায় নিয়েছিল, আজ সেই একই আঙিনায় অন্যদের ঘর বাঁধতে দেখে তার মনে হলো—ভালোবাসা আসলে কখনো ফুরায় না, কেবল রূপ বদলায়।
​শেরাজ সুমুর পাশে এসে দাঁড়াল। সে পিয়াস আর স্যান্ডির গাড়ির দিকে ইশারা করে ফিসফিস করে বলল,
“জীবনটা আজ পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে, তাই না সুইটহার্ট? ইনশাআল্লাহ ওদের জীবনও আমাদের মতোই সুখের হবে।”
​সুমু শেরাজের কাঁধে মাথা রেখে তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। পিয়াস আর ইফতিয়াকে সিকদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে, এক বিশাল শোরগোল আর হুল্লোড় নিয়ে সবাই রওনা হলো শেরাজের বাগানঘেরা সেই বাংলোর দিকে। আজ স্যান্ডি আর নাতাশার বাসর ওখানেই হবে।

পিয়াসদের বাড়ির দ্বিতল কামরাটি আজ একদম অন্যরকম। পিয়াস সবসময় পরিপাটি আর গম্ভীর থাকতে পছন্দ করে বলে রুমটি খুব ছিমছাম অথচ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সাদা রজনীগন্ধার লম্বা লহরিগুলো ছাদ থেকে বিছানা পর্যন্ত ঝুলে আছে, আর মাঝখানে লাল গোলাপের ছড়াছড়ি।
ইফতিয়া বিছানার একদম মাঝখানে জড়সড় হয়ে বসে আছে। তার পরনে ভারী মেরুন রঙের কাতান শাড়ি, সারা শরীরে সোনার গয়নার মৃদু ভার। ঘোমটার আড়ালে সে নিজের মেহেন্দি রাঙানো আঙুলগুলো দিয়ে শাড়ির আঁচল মোচড়াচ্ছে। তার বুকটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে।

পিয়াস ঘরে ঢুকে দরজাটা সন্তর্পণে লাগিয়ে দিল। সে ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। পিয়াস এমনিতে খুব রাশভারী ছেলে, কিন্তু আজ তার নিজেরই হাত-পা হালকা কাঁপছে। সে ইফতিয়ার খুব কাছে এসে বসল। ইফতিয়া আরও কিছুটা কুঁকড়ে গেল। পিয়াস খুব মোলায়েম স্বরে ডাকল, “ইফতিয়া…”
নামটা শোনার সাথে সাথে ইফতিয়া একবার মাথা তুলে পিয়াসের চোখের দিকে তাকিয়েই আবার নজর নামিয়ে নিল। পিয়াস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইফতিয়ার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার হাতের উষ্ণতা অনুভব করতেই ইফতিয়া এক প্রশান্তি পেল। পিয়াস তার চিরচেনা সেই গভীর কণ্ঠে বলল,
“জানো ইফতিয়া, আমাদের এই বাড়িটা অনেক বড়, কিন্তু আজ তোমাকে এই রুমে দেখার পর মনে হচ্ছে রুমটা আজই প্রথম পূর্ণতা পেল। এতো বছর আমি শুধু একটা দেয়ালঘেরা দালানে বাস করেছি, আজ থেকে এটা আমার রুম হলো।”

সে ইফতিয়ার ঘোমটাটা একটু সরিয়ে তার কপালে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছোঁয়াল। তারপর তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মানুষ বলে ভালোবাসা নাকি অন্ধ, কিন্তু আমি বলি ভালোবাসা হলো স্বচ্ছ—যেখানে আমি আমার আয়না হিসেবে আজকের পর তোমাকে দেখতে পাব। আজ থেকে আমার সব জেদ, সব গাম্ভীর্য তোমার ওই এক চিলতে হাসির কাছে বন্ধক রাখলাম। আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছে, গেছে—কিন্তু কেউ আমার নিঃশ্বাসের গতি পরিবর্তন করতে পারেনি। অথচ আজ তোমার পাশে বসে থাকতে থাকতে আমার নিজের অস্তিত্বই যেন হারিয়ে যাচ্ছে।”
ইফতিয়া খুব নিচু স্বরে বলল,
“আপনি কি সবসময় এমন গম্ভীর থাকবেন? ভয় লাগে তো।”
পিয়াস মৃদু হাসল—যা সে সচরাচর কারো সামনে করে না। সে ইফতিয়ার হাতটা নিজের বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে বলল,

“এই যে এখানে হাত রাখো। শোনো তো কী বলছে? বাইরে থেকে পিয়াস সিকদার হয়তো অনেক কঠিন, কিন্তু এই ভেতরের মানুষটা কেবল ভালোবাসার ইশারায় চলে। তুমি আমাকে সেই সব ভালোবাসা দেবে, আমি জানি। তোমাকে কোনোদিন ভয় পেতে দেব না ইফতিয়া, বরং সারাটা জীবন আগলে রাখব।”
ইফতিয়া আর থাকতে পারল না, সে পিয়াসের কাঁধে মাথা রাখল। পিয়াস ধীরে বলল,
“আমার একটা অতীত আছে, তুমি জানো। কিছু জিনিস হয়তো চাইলেই সহজে ভোলা যায় না। তবে যেই মুহুর্তে কবুল বলেছি, সেই মুহূর্ত থেকেই আমি না চাইতেও শুধু তোমার হয়ে গেছি।”
পিয়াসের কথাগুলো শুনে ইফতিয়ার বুকের ভেতরটা যেন একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতায় মুচড়ে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর মায়ার চাদরে ঢাকা পড়ে গেল সবটুকু সংশয়। সে পিয়াসের কাঁধ থেকে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনো কৃত্রিম গাম্ভীর্য নেই, বরং আছে এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব আর সমর্পণের চিহ্ন।
​ইফতিয়া খুব ধীরস্থিরভাবে পিয়াসের হাতটা নিজের দুই হাতের আঁজলায় ভরে নিল। তারপর কিছুটা কম্পিত কণ্ঠে বলল,

“অতীত তো সবারই থাকে, নেতা সাহেব। ধুলোবালিহীন পথ যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি দাগহীন অতীত পাওয়াও তো দুর্লভ। আপনার সেই অতীতে কী ছিল, কে ছিল—সেটা আজ থেকে আমার কাছে গুরুত্বহীন। আমি সেই মানুষটাকে চাই না যে কোনোদিন কাউকে ভালোবাসেনি। আমি বরং সেই মানুষটাকে চাই যে একবার ভালোবাসলে আর কোনোদিন ভুলতে পারে না। কারণ আমি জানি, এমন একজন মানুষ যদি একবার আমাকে নিজের করে নেয়, তবে সে আমাকেও কোনোদিন মাঝপথে ছেড়ে যাবে না।”
​সে একটু থামল, তারপর পিয়াসের চোখের গভীর অতলান্তে নিজের দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি কবুল বলেছেন বলে আমার হয়েছেন—আমি শুধু এটুকুই মানতে চাই না। আমি চাই আপনার মনের প্রতিটি অলিগলিতে আমার পদচারণা থাকুক। আপনার না ভোলা স্মৃতিগুলোও আজ থেকে আমার হোক। আমাকে শুধু আপনার জীবনসঙ্গিনী নয়, আপনার শান্তি হওয়ার সুযোগটুকু দেবেন?”

​ইফতিয়ার এই নিঃস্বার্থ আর পরিপক্ক কথাগুলো পিয়াসের ভেতরের সেই জমাট বাঁধা পাথরটাকে যেন এক নিমিষেই গলিয়ে দিল। সে বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে ইফতিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। পিয়াস হাত বাড়িয়ে ইফতিয়ার চিবুকটা আলতো করে স্পর্শ করল। ​সে কোনো কথা না বলে ইফতিয়াকে জড়িয়ে ধরল। ইফতিয়া অনুভব করল পিয়াসের বুকের ধুকপুকানিটা এখন আর স্বাভাবিক নেই—সেটা যেন এক অবিরাম ঝড়ের সঙ্কেত দিচ্ছে। পিয়াস তার চুলের সুবাস নিতে নিতে বিড়বিড় করে বলল,
“তুমি এতোটা সহজিয়া কেন, ফেইরীব্লুম? আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে তোমার কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।”
​সে ইফতিয়ার কাঁধ থেকে শাড়ির আলগা আঁচলটা সরিয়ে দিয়ে তার ঘাড়ে নিজের উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। ইফতিয়া এক অদ্ভুত শিহরণে চোখ বুজে ফেলল। পিয়াস তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আজ থেকে আমার অতীত কেবলই একটা গল্প, আর তুমিই হলে আমার বর্তমান আর ভবিষ্যতের পূর্ণ কাব্য। এখন থেকে আমার প্রতিটি স্পন্দন তোমার ইশারায় বাজবে, ফেইরীব্লুম।”

সে ইফতিয়ার কপালে দীর্ঘ এক ভালোবাসার পরশ দিয়ে তাকে বিছানার নরম কোমলতায় সঁপে দিল। বাইরের পৃথিবী তখন ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু এই নির্জন ঘরে তখন ভালোবাসার এক নতুন গল্প লেখা হচ্ছে—যেখানে না বলা কথাগুলোই আজ সব থেকে বেশি সরব হয়ে উঠেছে।

​বাংলোর সামনে আসতেই আইয়ুব, সারবাজ, নিহাল আর অমিত মিলে স্যান্ডিকে ঘিরে ধরল। স্যান্ডি তখন নতুন বরের সাজে এই শীতের মধ্যেও বেশ ঘামছে, আর বন্ধুদের এই চাণক্য হাসি দেখে তার পিলে চমকে যাওয়ার দশা।
​আইয়ুব স্যান্ডির শেরওয়ানির কলারটা ঠিক করে দিয়ে কুটিল হেসে বলল,
“কি গো সান মামা! মনে আছে তো কাল রাতের সেই বালতি ভর্তি ঠাণ্ডা পানি? আজ কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক কিছু হবে। বাসর ঘরে ঢোকা এতো সহজ না, সোনা। আমার আর রাহিনের বেলায় কি করেছিলে, আমাদের পরিষ্কার মনে আছে।”

স্যান্ডি অসহায় মুখে শেরাজের দিকে তাকাল। শেরাজ তখন সুমুর হাত ধরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। স্যান্ডি আর্তনাদ করে বলল,
“স‍্যার! দেখুন আপনার বন্ধুরা কী শুরু করেছে। আমি কি আজ ঘরে ঢুকতে পারব না?”

সারবাজ একধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“পারবে তো! আগে বলো, নাতাশাকে বেশি ভালোবাসো নাকি আমাদের? তোমার বলা উত্তর রেকর্ড করে নাতাশাকে শোনাব।”
স‍্যান্ডি জানে, নাতাশার কথা বললে এদের হাত থেকে ছাড়া পাবেনা—আর এদের কথা বললে, নাতাশার হাতে সে মার্ডার হবে। সে বন্ধুদের এই ট্র্যাপ থেকে বাঁচতে স্যান্ডি ওয়ালেট বের করে মোটা অঙ্কের টাকা দিতে বাধ্য হলো। ফাহিম আর রিসান মিলে স্যান্ডিকে পাঁজাকোলা করে দরজার সামনে নিয়ে গিয়ে হুংকার ছাড়ল,
“যাও বাঘিনীর ঘরে, তবে মনে রেখো আমরা কিন্তু দরজার বাইরেই আছি।”
​স্যান্ডি কাঁচুমাচু হয়ে ভেতরে ঢোকার পর যখন দরজাটা লাগল, তখন সবাই বাইরে থেকে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। শেরাজ সবাইকে তাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“যথেষ্ট হয়েছে, এবার ওদের একটু শান্তিতে থাকতে দে।”
​বাংলোর বিশেষ ঘরটি আজ অপার্থিব এক সৌন্দর্যে সাজানো হয়েছে। রুমের দরজা খুলতেই স্যান্ডির নাকে এলো তাজা কামিনী আর বেলী ফুলের তীব্র মিষ্টি সুবাস। পুরো ঘরটি কয়েক হাজার সাদা আর গোলাপি গোলাপ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। বিছানার ওপর সুনিপুণভাবে ফুলের পাপড়ি দিয়ে একটি হৃদপিণ্ড আঁকা, যার মাঝখানে বড় করে ইংরেজিতে লেখা ‘এন’ অ‍্যান্ড ‘এস’।

রুমের কোণে কোণে সুগন্ধি মোমবাতি জ্বলছে। নাতাশা বিছানার এক কোণে বসে আছে। তার পরনে টকটকে লাল বেনারসি, মাথায় চওড়া ঘোমটা। তার গয়নাগুলোর ঝিলিক মোমবাতির আলোয় ঠিকরে পড়ছে।

স্যান্ডি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। বাইরের বন্ধুদের সেই দুষ্টুমি এখন ম্লান হয়ে গেছে, তার হৃদপিণ্ড এখন ড্রামের মতো বাজছে। সে বিছানার পাশে গিয়ে বসল। নাতাশার মেহেদী রাঙানো হাত দুটো কাঁপছে। স্যান্ডি খুব আলতো করে নাতাশার ঘোমটাটা সরিয়ে দিল।

নাতাশা লাজুক চোখে তাকাতেই স্যান্ডি যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,
“বিশ্বাস করো স্টারিফেইরী, আজ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে এই দুনিয়ায় এর চেয়ে সুন্দর আর কোনো দৃশ্য হতে পারে না। আমি সত্যিই কি তোমাকে জয় করতে পেরেছি?”
​নাতাশা মৃদু হেসে স্যান্ডির হাতটা চেপে ধরল,
“আমিও কি কোনোদিন ভেবেছিলাম এই বাংলোর চার দেয়ালের মাঝে আমাদের একটা আলাদা জগত হবে? আজ থেকে আমি কেবলই আপনার।”
​স্যান্ডি নাতাশার খুব কাছে এসে বসল। নাতাশার মাথাটা লজ্জায় নত করে ফেলল। স্যান্ডি তার থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। সেই দৃষ্টিতে হাজার বছরের তৃষ্ণা আর এক জীবনের পূর্ণতা মিশে আছে। স্যান্ডি নাতাশার মেহেদী রাঙানো হাত দুটো নিজের হাতের ভেতর নিয়ে বলল,
​“জানো স্টারিফেইরী, মানুষ বলে জীবন নাকি ছোট। কিন্তু তোমাকে পাওয়ার পর মনে হচ্ছে, এই এক জীবনে আমি সাত জন্মের সুখ পেয়ে গেছি। আমার অগোছালো পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা আজ তোমার আগমনে মখমলের মতো কোমল হয়ে গেছে।”
​নাতাশা স্যান্ডির শার্টের কলারটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখের কোণ থেকে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা আনন্দের অশ্রু। সে ভাঙা গলায় বলল,

“মিস্টার ঝগড়ুটে, আপনি কি জানেন? আপনার এই পাগলামিগুলোই আমার বাঁচার রসদ। আজ থেকে আমি আর আমার নেই, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে এখন আপনার নাম লেখা।”
স‍্যান্ডি কিছু বলতে নিতেই নাতাশা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“ভালোবাসা যখন এভাবে পূর্ণতা পায়, তখন শব্দরা ফুরিয়ে যায়, কেবল হৃদয়ের স্পন্দনগুলোই একে অপরের ভাষা বুঝে নেয়।”
​স্যান্ডি তাকে নিবিড়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিল। জানালার পর্দা দিয়ে চুইয়ে আসা চাঁদের আলো সাক্ষী হয়ে রইল—দুটি ভবঘুরে আত্মা আজ ভালোবাসার জন‍্য এক ঠিকানায় এসে পৌঁছেছে।

​ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতেই শেখ বাড়িতে আবার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। আজ পিয়াস-ইফতিয়া আর স্যান্ডি-নাতাশাকে আবারও শেখ বাড়িতে আনা হবে। বাড়ির বড়দের মতে, বিয়ের পরদিন দুই জামাই যখন দুই বউকে নিয়ে শ্বশুরালয়ে আসে, সেই মুহূর্তের আনন্দটাই আলাদা।
আজ সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সুমু। সে রান্নাঘরে নতুন বউদের পছন্দের সব নাস্তা সাজাতে ব্যস্ত। তার সাথে সাহায্য করছে ইশিতা, ইনায়া, সামিয়া আর নাজমিন।
সকাল দশটা নাগাদ বর-কনেরা শেখ বাড়িতে এসে পৌঁছাল। বাড়ির সবাই তাদের হাসিমুখে স্বাগত জানাতে এগিয়ে গেল। গাড়ি এসে থামল গেটের সামনে। প্রথমে নামল পিয়াস আর ইফতিয়া। পিয়াস আজ সাদা পাঞ্জাবিতে বেশ মার্জিত লাগছে, আর ইফতিয়ার পরনে হালকা গোলাপি একটি জামদানি। ঠিক তার পেছনেই স্যান্ডি আর নাতাশার গাড়ি। স্যান্ডি গাড়ি থেকে নেমেই শার্টের হাতা গুটিয়ে বলল,

“উফ! আবারও সেই গেট নাকি? আবারও কি আমার ওয়ালেট খালি হবে?”
নাতাশা আজ নীল একটি শাড়ি পরেছে। সে স্যান্ডির দিকে তাকিয়ে চোখ মটকাল, স‍্যান্ডিও চুপসে গেল। সকলে মিলে তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানিয়ে বাড়ির ভেতর নিয়ে এলো। বাড়ির নারী বড় সদস‍্যরা সুমুদের সাহায্য করতে গেল। বাড়ির পুরুষ সদস‍্যরা কেউ কেউ বাহিরে হাঁটাহাঁটি করতে গেল আর কেউ কেউ নতুন বর-কনেদের জন‍্য বাজার করতে গেল।
ড্রয়িংরুমে আপাতত যুবকদের এক বিশাল আড্ডা জমে উঠল। শেরাজ সোফায় বসে পিয়াস আর স্যান্ডিকে পর্যবেক্ষণ করছে। তার মুখে রহস্যময় হাসি। সে সজীবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ব্রো, আমাদের নতুন দুই জামাইয়ের তো দেখি চেহারা পাল্টে গেছে। পিয়াসকে তো আজ একটু বেশিই ফুরফুরে লাগছে, আর সানের চোখের নিচে কালি কেন? রাতভর কি করেছ তুমি? একটুও ঘুমাওনি নাকি? এতো ডেস্পারেট হওয়া ভালো নয় কিন্তু।”
শেরাজের কথা শেষ হতেই ড্রয়িংরুমে যেন একটা হাসির বোমা ফাটল। আইয়ুব আর সারবাজ সোফায় হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে। স্যান্ডি বেচারা লজ্জা আর অস্বস্তিতে একদম লাল হয়ে গেছে। সে পিয়াসের দিকে করুণ চোখে তাকাল সাহায্যের জন্য, কিন্তু পিয়াস আজ উল্টো নিজের ভাব ধরে রাখার জন্য মুচকি হাসছে।

সজীব নিজের ফোনটা একপাশে রেখে স্যান্ডির কাঁধে হাত দিয়ে টিপ্পনী কাটল,
“আরে শেরাজ, স্যান্ডিকে আর কী বলব! বেচারা বোধহয় সারা রাত কনফিউশনেই ছিল—বাসর ঘরে কি বিড়াল মারবে নাকি বিড়ালের ভয়ে জানালার কার্নিশে বসে থাকবে? স্যান্ডি, সত্যি করে বলো তো, কাল রাতে কি তুমি ব্যাট বল নিয়ে অলআউট খেলেছ, নাকি প্রথম ওভারেই বোল্ড হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে এসেছ?”

স্যান্ডি মাথা চুলকাতে চুলকাতে মিনমিন করে বলল,
“আরে, ওসব কিছু না। মশার উৎপাতে ঘুমাতে পারিনি।”
রিয়াদ পাশ থেকে ফোড়ন কাটল,
“মশা? এস.কের বাড়িতে মশা? কই আমি তো দেখতে পেলাম না। মশা নাকি ভালোবাসা? সান ব্রো! আমরা কিন্তু জানতাম তুমি একটু ভীতু, কিন্তু তুমি যে প্রথম রাতেই চোখের নিচে এমন ‘ডার্ক সার্কেল’ বানিয়ে ফিরবে, সেটা ভাবিনি।”

শেরাজ এবার পিয়াসের দিকে ঘুরে বসল। পিয়াসকে বেশ শান্ত আর তৃপ্ত দেখাচ্ছে। শেরাজ ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“আর আমাদের নেতা সাহেবের কি খবর? পিয়াস, তুমি তো বেশ গম্ভীর আর মেপে মেপে কথা বলো। কাল কি বাসর ঘরেও কোনো ইম্পরট্যান্ট মিটিং ছিল?”
​পিয়াস গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা করে বলল,
“ব্রো, তুমিও কি এদের সাথে যোগ দিলে? বাসর ঘর তো নিজেদের প্রাইভেট ব্যাপার, সেখানে মিটিং-সিটিং কীসের?”
​আইয়ুব সাথে সাথে পিয়াসের সোফার হাতলে বসে ফিসফিস করে বলল,
“প্রাইভেট ব্যাপার তো অবশ্যই! এমন প্রাইভেট কথা কি আর শেয়ার করা যায়। এই সিঙ্গেল টিম এসব বুঝবে না।”
নিহাল ভ্রু কুঁচকে বলল,

“সিঙ্গেল বলে কি অপমান করলি?”
রাহিন হেসে বলল,
“তোদের মান আছে নাকি, যে আপমান করব?”
অমিত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আরে ভাই, সিঙ্গেল বলে কি আমাদের কোনো ফিলিংস নেই? আমরা কি বাসর রাতের গল্প শুনতে পারি না?”

আরবাজ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
“শুনলে তো হার্ট অ্যাটাক করবে। সান মামা আর পিয়াস ব্রো যা শুরু করেছে, তোমরা তো ভাববে বিয়ের মানেই শুধু বউয়ের শাসন। দেখছ না সান মামার হাল? বেচারার কোমরের হাড় আছে না গেছে আল্লাহ জানে। সান মামা, সত্যি করে বলো তো, কাল রাতে কি তুমি মারামারি করেছ নাকি?”
​স্যান্ডি সোফার কুশন দিয়ে মুখ লুকিয়ে চিৎকার করে বলল,
“স‍্যার, আপনারা থামেন। নাতাশা যদি এসব শোনে, তবে আমার কপালে দুঃখ আছে।”
​শেরাজ শান্ত গলায় টিপ্পনী কাটল,

“সান, ভয়ের কিছু নেই। নাতাশার হাত তো এখন মেহেদীতে রাঙানো, মারতে পারবে না। তবে পিয়াস, তোমার তো দেখি গলা পর্যন্ত রোমান্স উপচে পড়ছে। সাদা পাঞ্জাবিতে আজ তোমাকে একদম মিল্কিওয়ের মতো লাগছে।”
​সারবাজ একধাপ এগিয়ে এসে স্যান্ডির হাত ধরে টেনে দাঁড় করাল। সে স্যান্ডির পকেট চেক করতে করতে বলল,
“দাঁড়া, দেখি তো এর পকেটে কোনো এনার্জি ড্রিংক বা ক্যালসিয়ামের ওষুধ আছে কি না। যে অবস্থা ওর, আজ দুপুরের বিরিয়ানি খাওয়ার মতো শক্তিও ওর মধ্যে অবশিষ্ট আছে কি না সন্দেহ।”
সাইফ হেসে বলল,
“শোন ভাই, আমাদের এই বর দুটো এখন ‘বিপন্ন প্রজাতি’। এদের রাত কাটে রোমান্সে আর দিন কাটে আমাদের ভয়ে। আর এই যে সান মামা, তোমার চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে কাল রাতে তুমি শুধু রোমান্স না, বরং বউয়ের কাছে কড়া শাসনও খেয়েছ।”
​স্যান্ডি এবার মরিয়া হয়ে বলল,

“স‍্যার, আপনারা থামুন! আমি কবুল বলেছি, কোনো ক্রাইম করিনি। পিয়াস ভাই, আপনি কিছু একটা বলুন!”
​পিয়াস মৃদু হেসে স্যান্ডির দিকে তাকাল। সে খুব শান্তভাবে বলল,
“স্যান্ডি, এদের কথা শুনে লাভ নেই। এরা তো বাসর ঘরে শুধু ফুল আর মিষ্টি দ‍্যাখে, আমরা জানি সেখানে কতটা ‘ঘাম’ ঝরাতে হয়—মানে বিয়ে করার ক্লান্তিতে আর কি!”
পিয়াসের এই ঘাম ঝরানোর দ্ব্যর্থবোধক কথা শুনে পুরো ঘর আবারও হাসিতে ফেটে পড়ল। শাহরুখ পাশ থেকে বলল,
“বুঝলাম পিয়াস ভাই! বাসর ঘরে আপনার অনেক পরিশ্রম হয়েছে। মানে বিয়ে করে আর কি!”

বন্ধুদের এই ‘নির্লজ্জ’ লেভেলের ফানি আড্ডায় পিয়াস আর স্যান্ডি এখন শুধু পালানোর পথ খুঁজছে। আড়াল থেকে সুমু আর ইশিতা উঁকি দিয়ে হাসতে হাসতে শেষ। ইশিতা হেসে বলল,
“দেখেছ সুমু? ছেলেদের আড্ডা যে এই লেভেলে নামতে পারে, আগে জানতাম না। বেচারা স্যান্ডির তো ইজ্জত শেষ হতে আর কিছু বাকি নেই।”
​ঠিক তখনই আসরে প্রবেশ করল বাচ্চারা। সিমরান সোজা গিয়ে স্যান্ডির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সান আন্তেল! তুমি নাতাথা আন্টিতে অনেত ভানোবাতো, তাই না?”
​স্যান্ডি সিমরানকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
“এইটা তোমাকে কে বলল, মাম্মা?”
“আমি মুভিতে দেদেছি, যতন তেউ তাউতে ভানোবাতে, ততন তালা বিয়ে তরে।”
সিমরানের কথা শুনে সকলে হেসে উঠল। ইনায়া, সামিয়া আর নাজমিন নাস্তার ট্রে নিয়ে হাজির হলো। ফারিয়া, ইফতিয়া আর নাতাশাকে নিয়ে এলো। তাদের সাথে অজান্তা আর মাইশাও এলো। ফারিয়া ফিসফিস করে বলল,
“কাল রাতে বর’রা গিফট দিয়েছে কিছু?”
ইফতিয়া লাজুক হেসে মাথা নিচু করল। সে মৃদুস্বরে বলল,
“উপহারের চেয়েও সুন্দর ছিল কালকের রাতটা।”

শেখ বাড়ির বিশাল গার্ডেনে বড় আম আর কাঁঠাল গাছের ছায়ায় চাদর বিছিয়ে পিকনিকের এলাহি কারবার। বড়দের জন্য ভেতরে খাবারের ব্যবস্থা থাকলেও, বাড়ির ছোট আর তরুণ ব্রিগেড জেদ ধরেছে—আজ তারা খোলা আকাশের নিচে লাকড়ির চুলায় রান্না করে খাবে। বড়দের থাকতে বলা হয়েছিল কিন্তু শামীম সাহেব আর সাহাবাজ খান সাহেবরা বলেছেন, ‘তোমাদের এই পিচ্চি-পাচ্চি বাহিনীর হাঙ্গামা সামলানোর শক্তি আমাদের নেই, তোমরা বরং নিজেদের মতো আনন্দ করো।’

​সজীব, শাহরুখ আর আইয়ুব কোমর বেঁধে গরুর মাংস ধোয়ার কাজে লেগেছে। ওদিকে নাতাশা, সুমু আর ইফতিয়া মিলে চাল বাছছে। অজান্তা, মাইশা আর ফারিয়া সমস্ত কাটাকুটি করছে। ইনায়া, ইশিতা আর সামিয়া মশলা কষানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফারিন, রাইশা আর তিশা সবার হাতে হাতে সাহায্য করছে। ফিরোজা আর নাজমিন বসে রসুনের খোসা ছাড়াচ্ছে। নিহাল, আরবাজ আর অমিত লাকড়ি জোগাড় করে দিচ্ছে, আর সারবাজ ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক শট নিচ্ছে। সাইফ, রিয়াদ, ফাহিম, রাহিন, রিসান, রিয়াজ, শাহরুখ, নয়ন, রিফাত, আশিক, পিয়াস— সবাই মিলে আড্ডায় মত্ত। বাচ্চারা সবাই মিলে বাগানের এক কোণে ফুটবল নিয়ে লাফালাফি করছে।
​শেরাজ চেয়ারে বসে ল্যাপটপটা পাশে রেখে বাচ্চাদের দুষ্টুমি দেখছে। ঠিক এমন সময় বাড়ির প্রধান ফটকের সামনে একটা কুচকুচে কালো রঙের দামী সেডান গাড়ি এসে থামল। টায়ার ঘষার কর্কশ শব্দে সবার হাতের কাজ থেমে গেল। গেটম্যান দ্রুত গেট খুলে দিতেই গাড়িটা ভেতরে ঢুকল।
​গাড়ি থেকে নামলেন এক নারী। পরনে গাঢ় নেভি ব্লু রঙের ব্লেজার আর ফরমাল ট্রাউজার। চোখে দামি সানগ্লাস, হাতে একটা হ‍্যান্ডব‍্যাগ। ​সানগ্লাসটা সরাতেই দেখা গেল সেই তীক্ষ্ণ চোখ—অফিসার আলিয়া।
​ইনায়ার হাত থেকে মশলার বাটিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। সে অস্ফুট স্বরে পাশে থাকা সারবাজকে ফিসফিস করে বলল,

“সারবাজ! উনি এখানে কী করছেন? অফিসার আলিয়া বাংলাদেশে কেন? উনি যদি এস.কে-কে দেখে ফেলেন, তবে তো লঙ্কাকাণ্ড হয়ে যাবে। উনি কি কোনোভাবে খবর পেয়ে গেছেন যে এস.কে বেঁচে আছে?”
সারবাজের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে নিচু স্বরে বলল,
“জানি না, ইনায়া। পরিস্থিতি বুঝতে দাও।”
আলিয়া গার্ডেনের দিকে এগিয়ে এলেন। গার্ডেনে উপস্থিত প্রত্যেকেই আগন্তুককে পরখ করছে। শেরাজের চোখেমুখে একরাশ প্রশ্ন। সুমু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত এগিয়ে এলো। আলিয়া তখন শেরাজের খুব কাছে। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আলিয়া আলতো করে হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন,
​ “হাই মিস্টার খান! আমি আলিয়া, সুমুর ওমানের বন্ধু। সুমুর সাথে দেখা করে ওকে সারপ্রাইজ দিতে এলাম।”
​শেরাজ হ‍্যান্ডশেক করল না, সে কিছুটা ইতস্তত করল। তার স্মৃতিতে আলিয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই, তবে সুমুর বন্ধু শুনে সে কিছুটা সহজ হয়ে বলল,
“ওহ, সুমুর বন্ধু! আসলে আমি ঠিক মনে করতে পারছি না, তবে আপনাকে স্বাগতম।”
​আলিয়া সুমুর চোখে চোখ রাখল। ​সুমু সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনারা সবাই প্লিজ আনন্দ চালিয়ে যান। আমার বন্ধু অনেকদিন পর এসেছে, আমি আমার এই বন্ধুর সাথে একটু নিভৃতে কথা বলে আসি।”

সুমু আলিয়াকে ইশারায় বাগানের একটু নির্জন কোণে নিয়ে গেল। পেছনে রয়ে গেল একঝাঁক কৌতূহলী চোখ। ​বাগানের এক কোণে গিয়ে সুমু আলিয়ার মুখোমুখি দাঁড়াল। পেছনে তখনও রান্নার প্রস্তুতি আর হাসাহাসির শব্দ আসছে। ​সুমু আলিয়াকে আরও একটু আড়ালে নিয়ে এসে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার চোখেমুখে অনেক দিনের জমা করা এক প্রশান্তি। সে আলিয়াকে লক্ষ্য করে খুব নরম গলায় বলল,
“আপনি আসবেন আমি জানতাম, অফিসার। তবে আপনি যে এতোটা দেরি করে ফেলবেন, সেটা ভাবিনি। আমি প্রতিদিন ভাবতাম, জেলের সেই দিনগুলোতে যার কাছে নিজের সবটা উজাড় করে দিয়েছি, সে নিশ্চয়ই একদিন এই নতুন গল্পটার সাক্ষী হতে আসবে।”
​আলিয়া হালকা হাসলেন। তিনি চশমাটা ব্লেজারের পকেটে রেখে বললেন,
“কী করব বলো, সুমু? সরকারি কর্মচারী বলে কথা। চাইলেই তো সব ফেলে আসা যায় না। অনেক ফাইল, অনেক নিয়মকানুন গুছিয়ে আসতে হলো। তবে দেরিতে হলেও আমাকে আসতেই হতো। কারণ, আমি জানি এই গল্পের অনেক রহস্য এখনো বাকি আছে।”
​তিনি সুমুর কাঁধে হাত রেখে একটু নিচু স্বরে বলল,
“তোমার গল্পটা কোনো ‘অসমাপ্ত স্যাড এন্ডিং’ নয়, সুমু। এই গল্পটা আসলে ‘হ্যাপি এন্ডিং’-এর জন্য লেখা হয়েছে।”
​কথাটা বলে ব্যাগ থেকে একটি পুরনো ডায়েরি বের করলেন। সুমু ডায়েরিটা দেখে হালকা হাসল। ​আলিয়া ডায়েরিটা সুমুর হাতে দিয়ে বললেন,

“আমি তোমার এই ডায়েরিটা দিতেই আজ এখানে এসেছি। এই গল্পের হ্যাপি এন্ডিংটা এখন তুমি নিজে লিখবে। সুমু, তোমার আর শেরাজের বীরত্ব, ত্যাগ আর এই ফিরে আসা—এসবই এই ডায়েরির শেষ পাতায় লিখে তুমি নিজে দুনিয়ার মাঝে ছড়িয়ে দাও। যাতে মানুষ জানে, ভালোবাসা সব জয় করতে পারে।”
​দূর থেকে শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য তাদের দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো বিভ্রান্তি, কিন্তু সুমুর ঠোঁটে হাসি দেখে সে অজ্ঞাতসারেই একটু আশ্বস্ত হলো। ​সুমু ডায়েরিটা হাতে নিয়ে বুক চিরে আসা এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার চোখের কোণে জমানো অশ্রু রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠল। আলিয়া সুমুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। তিনি পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খুব ধীরস্থির গলায় বললেন,
“কিন্তু সুমু, এত বড় একটা আত্মত্যাগ! শেরাজ খান বেঁচে থাকতেও তোমার এই পাঁচটা বছরের ত‍্যাগ কেন? জেলের ওই অন্ধকার দেয়াল, একাকিত্ব, আর নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে অপরিচিত হয়ে থাকা—সব মিলিয়ে কি খুব বেশি কষ্ট হয়ে যায়নি তোমার?”
​সুমু কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে আলিয়ার পাশে এসে দাঁড়াল এবং তর্জনী উঁচিয়ে সামনের বাগানটার দিকে ইশারা করল। সেখানে শেরাজ এখন মাটিতে বসে সিমরান আর শেরানকে দুহাতে জাপ্টে ধরে আছে। পাশে নিশান, রুহি, হাফসা, আয়াস, আহিয়া আর নাহিয়ান মিলে তাদের ওপর জাপিয়ে পড়ছে। সুমু আলিয়াকে উদ্দেশ্য করে খুব শান্ত গলায় বলল,

“আলিয়া, ওই যে দৃশ্যটা দেখছেন—ঠিক এই দিনটার জন‍্যই আমি সব সহ্য করেছি। ওই পাঁচটা বছরের ত‍্যাগের ফলস্বরূপ আজ আমার চোখের সামনে আমার স্বামী আর সন্তানের এই হাসিমুখ। আমি যদি সেদিন ধরা না দিতাম, তবে আজ হয়তো খান সাহেবের হাতে পুলিশের হ্যান্ডকাফ থাকত, অথবা সে আত্মগ্লানিতে নিজেকে শেষ করে দিত। কিন্তু আজ সে স্বাধীন, সে একজন সফল মানুষ এবং একজন শ্রেষ্ঠ বাবা।

আমার পাঁচ বছরের হাহাকারের বিনিময়ে যদি আমি আমার পরিবারের এই পূর্ণতাটুকু ফিরে পাই, তবে বিশ্বাস করুন অফিসার—ওই জেলের দিনগুলো আমার কাছে অতি সামান্য মনে হয়। আমার খান সাহেব হাসছেন, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
​আলিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি পেশাগত জীবনে অনেক অপরাধী আর অনেক প্রেম দেখেছেন, কিন্তু এমন নিঃস্বার্থ ত্যাগের মহাকাব্য এর আগে কখনো শোনেননি। তিনি সুমুর দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললেন,
“সুমু, একটা কথা আমাকে বলো। তুমি পুলিশকে বলেছিলে তুমি আরিয়ান চৌধুরী আর রায়য়ান চৌধুরীকে মেরেছ। কিন্তু তুমিই আমাকে বলেছিলে, ওদের তুমি মারোনি, ওদের শেষ করেছিল স্বয়ং শেরাজ খান। তুমি বললে, তুমি শেরাজ খানকে মেরে ফেলেছ। কিন্তু শেরাজ খান বেঁচে আছে। আমার মাথায় একটা জট আজ অবধি খোলেনি… কীভাবে সুমু? শেরাজ খান তোমায় এতোটা ভালোবাসে, অথচ সে বেঁচে থেকেও পাঁচটা বছর তুমি জেলের কালকুঠুরিতে তিলে তিলে শেষ হলে, সে তোমাকে বাঁচানো তো দূর, একটাবারের জন্যও দেখতে এলো না কেন?”
​সুমু ম্লান হাসল। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল,

“সেদিন ওমানের সেই রক্তঝরা রাতে যখন উনি মৃত্যুর জন্য পাগলামি করছিলেন, তখন আমি রাজি হয়েছিলাম উনাকে মারার জন্য। উনি ভেবেছিলেন আমি ওনার ইচ্ছে পূরণ করছি। কিন্তু আমি উনাকে কথার মাঝে ব্যস্ত রেখে খুব সন্তর্পণে আমার সাথে আগে থেকে রাখা একটা কড়া ইনজেকশন ওনার শরীরে পুশ করি। উনি মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমে ঢলে পড়লেন।
উনি ঘুমে ঢলে পড়তেই আমি সান ভাইয়াকে ডাকি। আগে থেকেই প্ল্যান করা ছিল—সান ভাইয়া ওনাকে নিয়ে ওমান ছাড়বে। আমি সান ভাইয়ার সাথে ওনাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু আমি জানতাম, আমার খান সাহেব সুস্থ অবস্থায় জ্ঞান ফিরে পেলে আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও কোথাও স্থির থাকবেনা। উনি সুস্থ থাকলে একটা দিনও আমাকে জেলে থাকতে দিতেন না। এমনকি নিজের আত্মসম্মানের তোয়াক্কা না করে আমাকে বাঁচাতে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতেন। আমার খান সাহেবের গায়ে অপরাধীর কলঙ্ক লাগুক, এটা আমি কোনোদিনও হতে দিতাম না।
তাই ওনাকে ওমান থেকে দূরে আর নিরাপদে রাখতে ওনার স্মৃতি নষ্ট করার মেডিসিন দেওয়া হয়। আমি চেয়েছিলাম উনি আমাকে ভুলে যান, কিন্তু সুস্থ থাকুন। তবে এই স্মৃতি নষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়াটা এতো সহজ ছিল না। ঔষধের ডোজ কেটে যেতেই পুরোনো সব কথা ওনার ধীরে ধীরে মনে পড়তে শুরু করত। তখন উনি অসহ্য মাথা যন্ত্রণায় ছটফট করতেন। কিন্তু পুরোপুরি সব মনে পড়ার আগেই আবারও ওনাকে মেডিসিনের ডোজ দেওয়া হতো। এরপর থেকে সময় হিসেব করে মেডিসিন দেওয়া হতো, যাতে স্মৃতি পুরোপুরি ফেরার আগেই ওনাকে আবারও ভুলিয়ে রাখা যায়।”
​আলিয়া স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন সুমুর দিকে। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন,

“অর্থাৎ, তুমি শুধু শেরাজকে বাঁচাওনি, তুমি পাঁচ বছর ধরে সচেতনভাবে নিজেকে ওনার স্মৃতি থেকে মুছে দিয়েছ— কেবল ওনাকে শান্তিতে রাখার জন্য? কিন্তু শেরাজ কিছু বলেনি এসব জানার পর?”
“সে এখনো কিছুই জানেনা।”
​আলিয়া চোখ বড় বড় করে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,
“কিহ! ও তোমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি?”
​“না!” সুমুর গলায় অদ্ভুত আতঙ্ক ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় বলল, “আর এইটাই আমার সবথেকে বড় ভয়, অফিসার। স্মৃতি ফেরার পরেও উনি একদম চুপচাপ, হাসিখুশি আছেন। ওনার এই অস্বাভাবিক শান্ত ভাবটাই আমাকে ভেতর থেকে কুঁকড়ে দিচ্ছে। জানি না উনি মনে মনে কী পাকাচ্ছেন, তবে কিছু একটা তো হবেই… আমি নিশ্চিত।
তুমি এই পাঁচ বছর তোমার স্বামীকে কত বড় শাস্তি দিয়েছো সুমু, তা কি তুমি বুঝতে পারছো? ওমানের সেই রাতে তুমি যদি তাকে মেরে ফেলতে পারতে, তবে সেটা হয়তো দয়া হতো। কিন্তু তুমি তাকে বাঁচিয়ে রেখে প্রতিদিন এক অমানুষিক শাস্তি দিয়েছো। মৃত্যুর চেয়েও বড় যন্ত্রণা তুমি তাকে দিচ্ছো।”
​সুমু অবাক হয়ে আলিয়ার দিকে তাকাল। আলিয়া থামলেন না, বরং আরও কঠোর স্বরে বলতে লাগলেন,

“যে মানুষটা তোমার গায়ে ফুলের টোকা সহ্য করতে পারে না, যে তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না, তাকে তুমি এমন শাস্তি দিলে? তুমি জানো সুমু, তুমি তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নিজেকে, তোমাদের ভালোবাসাকে আর তোমাদের সন্তানদের হাতিয়ার বানিয়েছিলে। তুমি তাকে একটা অদৃশ্য কারাগারের মাঝে বেঁধে রেখেছিলে।
তার সবথেকে বড় দুর্বলতা ছিলে তুমি আর তোমার দুই সন্তান। আর তুমি সেই দুর্বলতাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাকে আরও গভীর যন্ত্রণায় ফেলে দিয়েছো। তুমি জানো, তুমি কষ্টে থাকলে, তুমি দূরে থাকলে আর তার সন্তানরা যদি তার থেকে দূরে থাকে—সেটা তার জন্য মৃত্যুর চেয়ে হাজার গুণ বেশি কষ্টের। আর তুমি তাকে সেই দোজখেই রেখেছিল।”
“অফিসার! আপনার তো রাগ হওয়া উচিত। আমি একজন অপরাধীকে, একজন পাপিষ্ঠকে বাঁচিয়ে দিয়েছি বলে আপনার আমাকে ঘৃণা করার কথা। কিন্তু আপনি তো দেখছি অন্য কথা বলছেন।”

খান সাহেব পর্ব ৯১

“না সুমু। তুমি তাকে মুক্তি দাওনি, তুমি তুমি তাকে সবচেয়ে বড় শাস্তি দিয়েছো। সারা জীবনের জেলের চেয়েও বড় দণ্ড। তুমি ভালোবাসার দোহাই দিয়ে তার হৃদয়ের ভেতরে যন্ত্রণার এক অবিরাম আগুন ধরিয়ে দিয়েছো। সে আজও বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু হয়তো ভেতর ভেতর দগ্ধ হচ্ছে, যেটা সে অপ্রকাশিত রেখেছে। এই যে তিলে তিলে ক্ষয় হওয়া— এটাই তোমার দেওয়া উপহার।”

খান সাহেব পর্ব ৯২ (২)