চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭০
ইশরাত জাহান জেরিন
ফারাজ চিত্রার দিকে এগিয়ে আসে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “বলো বিবিজান, কোথায় গিয়েছিলে?”
“শরীরটা কেমন অস্থির লাগছিল। ভাবলাম একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি। তবে বাইরে এত ঠান্ডা। বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। আর আপনি এখানে কী করছেন?”
“খারাপ একটা স্বপ্ন দেখলাম। পাশে তোমাকেও পেলাম না যে ভয় দূর করব জড়িয়ে ধরে।”
“আপনি ভয়ও পান?”
“খোঁচা মেরো না বউ, আমি ধরলে কিন্তু একেবারে জায়গা মতো খোঁচা মেরে দিব। তখন সামাল দিতে পারবে তো?”
চিত্রা আশেপাশে একবার তাকালো। তারপর ফারাজের দিকে রেগে তাকিয়ে বলল, “আপনার খোঁচা সামলাতে না পারলে তো এতদিন যাবৎ সংসার করা হতো না।”
“তুমি সংসার করছো?”
“তো কী করছি বলে আপনার মনে হচ্ছে? ”
“সবই করছো সংসার বাদে। সংসারে একটা বাচ্চা নেই সে আবার করছে সংসার! আগে ডজন খানেক এলাহী পয়দা করে প্রমাণ করো তুমি সংসারী নারী, সংসার করছো।”
“সংসারী প্রমাণের সঙ্গে বাচ্চার কী সম্পর্ক?”
“ওইটা বুঝলে তো তোমার নাম আবুলের নাতনি হতো না? বউ তোমার মাথায় জৈব সারটাও বোধ করি প্রয়োজন মতো নেই।”
“সকাল সকাল অপমান করলেন?”
“কেন কোলে তুলে চুমু দেওয়ার কথা ছিল নাকি?”
“এমন করে বলছেন কেন?”
“বলব না? এই ভোরে ঘুমটা ভাঙার পর আমার শরীর কত খারাপ হয় জানো না? শরীরের এত জটিল কন্ডিশন নিয়েও বুঝি বউ থাকতে ছটফট করা লাগে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কি হয়েছে?”
“ইশ যেমন ভাব করছো বুঝো না কিছু? রুমে আসো, ব্যথায় ফুলে যাচ্ছে তো।”
“ওমা কোথায় ফুলেছে? কি ফুলেছে?”
“যেটা ফোলার কথা সেটাই। খুলে দেখাই?”
“নাউজুবিল্লাহ! আপনি এত ঠোঁটকাটা কেন?”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বুকের ব্যথার কথা বলছিলাম। ব্যথায় বুকটা ফুলেফেঁটে গিয়েছে।”
চিত্রা তৎক্ষনাৎ লজ্জায় পড়ে যায়৷ তাকে লজ্জায় লাল হতে দেখে ফারাজ খপ করে তাকে টেনে নিয়ে হাতে একটা চুমু খেল। চিত্রার গায়ের চাদরটা টেনে সিঁড়িতেই খুলে ফেলতে নিলো চিত্রা ধমকে উঠার চেষ্টা করতেই ফারাজ তাকে কোলে তুলে, গায়ের ওপর চাদরটা দিয়ে বলল, “বাইরে অনেক ঠান্ডা বউ, চলো ভেতরে গিয়ে তোমায় গরম করে দেই। ঘাম না ছুটিয়ে ছাড়ছি না।”
“ফারাজ….”
“এত মৃদু চিৎকার পোষালো না। রুমে তো যাই আগে, আমার নাম তোমার মুখে আজ গর্জে উঠবে জয় বাংলার মিছিলের মতো।” বলেই সে চিত্রাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। “আজ আর ছাড়ছি না বউ, বাবা ডাক না শোনা অবধি এই শীতে আর দরজা খুলছি না।”
“নেশা লেগেছে আপনার। তেঁতুল জল খাওয়াতে হবে।”
ফারাজ বউকে নিয়ে রুমে যেতে যেতে বাঁকা হেসে গান ধরল,
~নেশা নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা
তাই ফারাজ দিবে আজকে চিত্রাকে শশা।~
চিত্রা আশ্চর্য হতেই ফারাজ জিহ্বা কেটে বলল, “উফস সরি ভুল লিরিক্স।” বলেই সে দাঁত টিপে হেসে পুনরায় গান ধরল,
~নেশা নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা
তাই মজনু দিবে লায়লাকে শশা~
এলাহী বাড়ির সবাই দাঁড়িয়ে আছে সেই পুরোনো পুকুরটার সামনে। ইতিমধ্যে পুলিশ এসেছে। আজ নতুন মুখ, একজন মহিলা অফিসার। আগের তদন্তকারী বদলি হয়েছে। নতুন অফিসারের নাম অনুলিপি হাওলাদার। শান্ত, পরিমিত ভঙ্গিতে তিনি চারপাশ খুঁটিয়ে দেখলেন, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করলেন, তারপর লোকজনকে নির্দেশ দিলেন। পুকুরের কালচে পানি ভেঙে লাশ তোলা হলো। হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা চলল নির্বাক তৎপরতায়। পুরো ঘটনায় বাড়ির মানুষজন যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। কেবল ফারাজ এলাহী ব্যতিক্রম। তার চোখে শোক নয়, আতঙ্কও নয় বরং অংক কষার ব্যস্ততা। অংকে পারদর্শী ফারাজের কাছে এই মুহূর্তে সব হিসেব এলোমেলো। হওয়াই স্বাভাবিক। যে রাশুকে সে নিজের হাতে খুন করতে চেয়েছিল, সেই রাশুই আজ তার বাড়ির পুকুরে ভাসমান লাশ। অথচ এই খুনটা সে করেনি এটুকু সে জানে। কিন্তু কে করেছে, সেই হিসেব মিলছে না। চিত্রা স্থির চোখে লাশের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে ভয় নেই, আছে এক ধরনের জমে থাকা বিস্ময়। বজ্র একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে সবকিছু যেন তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। আজ জমেলাও নির্বাক। লাশের অবস্থা ভয়াবহ। শরীরের এক পাশ আলাদা করে, কোনো যন্ত্রের সাহায্যে, নিষ্ঠুরভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। ফারাজ চিন্তিত মুখে নদী ভাবির দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাবি, কড়া লিকার দিয়ে এক কাপ চা করে আনেন তো।”
চা আসতেই ফারাজ পুকুরপাড়ে বসে পড়ল। পায়ের ওপর পা তুলে বসতেই নদী চায়ের কাপটা তার হাতে তুলে দিল। চায়ে এক চুমুক দিতেই অভ্র এগিয়ে এসে সিগারেট ধরিয়ে দিল। ফারাজ ধোঁয়া ছাড়ল। ধোঁয়ার ফাঁক দিয়ে একবার চিত্রার দিকে তাকাল, তারপর দৃষ্টি আবার ভেতরের অন্ধকারে ঢুকে গেল। চিত্রাকে বউ করে এই বাড়িতে আনার পর, জোহান ছাড়া, পরিবারের কাউকে সে কখনো আঘাত করেনি। অথচ দিনের পর দিন খুনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কেউ হিসেব রাখছে না কোথা থেকে এই ভুল শুরু হলো, কোন জায়গায় অংকটা ভেঙে গেল। সবাই ফলাফল দেখছে, কিন্তু সমীকরণ কেউ মিলাচ্ছে না। ভারী অদ্ভুত!
এই বাড়িতে খুনও যেন অংকের মতো ভুল এক জায়গায়, অথচ উত্তর বদলে যাচ্ছে সব জায়গার।
ঝামেলা মিটমাট হলো বিকেলের দিকটায়। দিনের আলো যখন ঢলে পড়ছে, এলাহী বাড়ির ভেতরটা তখন আবার ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক নীরবতা ফিরে পাচ্ছে। ফারাজ স্টাডি রুমে ঢুকে ব্লেজার খুলে চেয়ারে বসল। গাঢ় কাঠের ঘ্রাণ আর পুরোনো বইয়ের নীরবতা ঘরজুড়ে। ইতালি থেকে ফোন এসেছিল। কয়েকটা জরুরি মিটিং ছিল। ভিডিও কনফারেন্সেই সেরে ফেলল সব। ফারাজের নতুন ফ্যাক্টরির কাজ প্রায় শেষের পথে। বড় প্রোজেক্ট, বড় ঝুঁকি—কিন্তু ফারাজ এলাহী ঝুঁকি ভালোবাসে, ঠিক যেমন সে ভালোবাসে আগুন।
চিত্রাকে নিয়ে তার মাথায় ঘুরছে অন্য এক পরিকল্পনা। এবার সে একটা সারপ্রাইজ দেবে। এই তো ৩১ ডিসেম্বর—চিত্রার উনিশ বছর পূর্ণ হবে। জন্মদিনের আগেই ফ্যাক্টরির কাজ শেষ করতে হবে, এটাই তার জেদ। আগুন সুন্দরীকে জন্মদিনে কী দেওয়া যায় এই ভাবনাটা বহুদিন ধরেই ফারাজের মাথায় পাক খাচ্ছে। গয়না? না। গাড়ি? তাতেও মন ভরে না। চিত্রা তার কাছে কোনো বস্তু নয় সে একখণ্ড ভবিষ্যৎ। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা সে নিল খুব ঠান্ডা মাথায়। নতুন, বিরাট প্রোজেক্টের ফ্যাক্টরিটাই গিফট। অফিসিয়াল কাগজে, নিজের হাতে সবকিছু চিত্রার নামে করে দেবে। ক্ষমতা, সম্পদ, পরিচয় সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভালোবাসার দলিল। এতেই শেষ নয়। ডেনমার্কের এক মনোরম জায়গায় সে আগেই একটা বাড়ি কিনেছে। যেখানে দাঁড়ালে একদিকে সমুদ্র দেখা যায়, অন্যদিকে মেঘের কোলে ভেসে থাকা পাহাড় উঁকি দেয়। সেই বাড়িটাও চিত্রার নামে। বাড়ির নাম রেখেছে “চিত্রাঙ্গনা”।
নামটা মনে হলেই ফারাজের ঠোঁটে অল্প একটা হাসি চলে আসে। কী অসাধারণ তার নারীর নাম। শুনলেই মনে হয় আরেকটা জনম পেলেও এই নামটাকেই ভালোবেসে যেতে ইচ্ছে করবে। তবে ইদানীং মনটা কেমন উল্টোপাল্টা ভাবনায় ডুব দেয়। যা ফারাজ চিন্তা করতে চায় না তাই যেন ফারাজকে আরো বেশি ভাবাচ্ছে। সে যা চিন্তা করছে তা তো চিন্তা করাও পাপ। নিজে পাপি তবুও মনে হচ্ছে তার এই বদ চিন্তা করা যেন সব পাপের উর্ধ্বে। চাইলে ফারাজ কবেই এই খুনি কে খুঁজে বের করতে পারত তবে ওইযে তার সন্দেহের সুই যে বার বার এক জায়গাতেই আঁটকে যাচ্ছে, সেই সন্দেহ সত্য হলে সহ্য করতে পারবে না কেবল এই ভয়টাই তাকে সামনে এগুতে দিচ্ছে না। ইচ্ছে করছে না কোনো সত্য খুঁজে বের করতে। সত্য খুঁজতে গিয়ে যদি বিরাট কিছু বের হয়ে আসে? তখন কী হবে? ফারাজ পরপর বেশ কয়েকটি সিগারেট জ্বালাল। পাপ সে ছেড়ে দিলেও পাপ তাকে ছাড়তে চাইছে না।
আসলে এই ইহকালে তুমি ভালো মনে, তোমার নরক এখান থেকেই শুরু। মানুষ তোমায় ভালো থাকতে দিবে না। এখানে বেঁচে থাকতে হলে খারাপের সঙ্গে খারাপ আর ভালোর সঙ্গে ভালো করতে হবে। ফারাজ অভ্রকে রুম থেকে চলে যেতে বলল। একা থাকতে চায় সে। অন্ধকার রুমে কিছুক্ষণ চেয়ারে বসে মাথা ঝুকিয়ে দিলো পেছনের দিকে। চোখটা বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধ্যান করল। রাতে রাজন বাড়ি ফিরেনি। জুনায়েদ এলাহী ইদানীং রাত জেগে ঘরে ধ্যান ধরে বসে থাকেন। বজ্রও নিজের ঘরে ছিল। রোশান তো বদলেই গেছে। সোহান এসব করবে না। এই রাশু নামক ব্যক্তিকে খুনী কেন মারবে? ফারাজ আবারও পেছনে গেল।
এর আগে যেই সকল ব্যক্তিকে খুন করা হয়েছে সকলে সাধারণ মানুষ,বাড়িতে এর আগেও দু’জন কর্মচারী মারা গেছেন। দু’জনেই কাজ করতে এসেছিল। আর তারপর দুজনেই মৃত,তাঁদের যেইভাবে মারা হয়েছে আজকের খুনটাও একই ভাবে করা। তার মানে খুনী একজনই। আর ফারাজ নিশ্চিত খুনি এই বাড়িতেই আছে। তবে সন্দেহ করার মতো কাউকে তো পাচ্ছে না সে। হঠাৎ অন্ধকার রুমের দরজা যতসামান্য ফাঁকা হতেই বাইরের আলো এসে ঘরটায় পরল। অন্ধকার রুমের ভেতর চিত্রা ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে ফারাজকের দিকে মলিন মুখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি এত ভাবছেন কেন?”
ফারাজ এবার সামনের দিকে ঝুঁকে বসল। চিত্রার দিকে মনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,”তোমার না রক্ত আর অন্ধকারে ভয়? এখন তো দেখছি কাছ থেকে লাশ দেখলেও ভয় করে না। ব্যাপার কী?”
চিত্রা বাঁকা করে একটু হাসল। “ভয় এক সময় করত। এখন শক্ত হয়ে গেছি। সয়ে গেছে বুঝলেন তো? এখন আর ভয় করে না। মাঝে মাঝে মনে হয় ওই লাশ আর আমার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”
“মানে?”
“এই যে চোখের সামনে স্বামীকে খুন করতে দেখলাম, এই বাড়িতে আসার পর থেকে লাশের পর লাশ দেখলাম, এমনকি এটাও জানলাম আমার স্বামী নাকি স্মাগলার। ইতালি জুড়ে তার শাসন দিয়ে সে দাপিয়ে বেড়ায়। যেই বাড়ির বউ হয়ে আসলাম, জানতে পারলাম সেই বাড়িও নারীদের জন্য জাহান্নাম। এখানে সবাই কেবল নারীদের অবহেলা করতে জানে,সবাই অবলা মেয়ে জাতিকে ধরে পাচারকারীদের হাতে তুলে দিয়ে পেট চালায়, নারী বেঁচে পেট চালায় সেই বাড়িতে কি দূর্বল হয়ে থাকলে চলবে বলুন? আর যেই মেয়ে আট বছর বয়সে পুরো পরিবারের লাশ দেখেছে তার আর ভয় কিসের?”
ফারাজ কিয়ৎক্ষণ চেয়ে থাকে চিত্রার দিকে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “থামলে কেন? নিজের পরিবারের খুনির সঙ্গে সংসার করছো এটাও বলো?”
চিত্রা চুপ করে রইল। ফারাজ তখনো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা কোথায় আঁটকে গেছে সে? চারিদিকে যাকে দেখে তার মধ্যেই দোষ। ছোটখাটো দোষ না, একেবারে ভয়ানক দোষ। সবার হাতে রক্ত! তার তো এখন নিজের হাতের দিকে তাকাতেও ভয় করে। ফারাজ উঠে এগিয়ে এলো তার দিকে। চিত্রার মুখের সামনে পড়ে থাকা চুলগুলোকে কানে গুঁজে দিয়ে বলল, “তুমি চাও সব খুনিরা শাস্তি পাক?”
“খুনিরা কোনো না কোনো ভাবে তো শাস্তি পাবেই।”
“হ্যাঁ। খুব জলদি রাশু, সুলেমান এলাহী সহ বাড়িতে খুন হওয়া আরো দুই কর্মচারীর খুনিকেও আমি খুঁজে বের করব। এতদিন এই জিনিসে হাত লাগাইনি, কিন্তু বউ যেহেতু বিচার চাইছে তাহলে তো আমাকে কিছু একটা করতেই হবে। শত হলেও আমার বিবিজানের ইচ্ছা বলে কথা।”
চিত্রা এবার পলক ফেলে ফারাজের দিকে তাকিয়ে বলল, “ওরা তো মারাই গেছে। শুধু শুধু মৃত মানুষের খুনি নিয়ে সময় নষ্ট করলে কি এখন তারা কবর থেকে উঠে আসবে্? বাদ দেন এসব।”
“বাদ দেব কেন? যেভাবে বলছো খুনি বোধ-হয় তোমার খুব কাছের মানুষ।”
“খুনিরা চিত্রার কাছেরই হয়।”
“হয় তো, এই যেমন আমি।”
চিত্রা প্রসঙ্গ বদলে বলল,”আমি রুমে যাচ্ছি ঘুম পাচ্ছে আমার। আপনি কাজ শেষ করে আসুন।” বলেই সে রুম থেকে বের হয়ে গেল। ফারাজ চেয়ে রইল কেবল তার যাওয়ার পথের দিকে। মাথায় এখন একটাই প্রশ্ন, এত ভোরে এই শীতের মধ্যে তাকে না জাগিয়ে চিত্রা সত্যি নিজের অস্থিরতা দূর করতে বাগানে হাঁটতে গিয়েছিল। হ্যাঁ তাই হবে হয়তো। কারণ চিত্রা পবিত্র তাকে নিয়ে এসব ভাবাও পাপ। তবে ওইযে একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে, পাপ আর পবিত্র দু’টো যেমন একে অপরের বিপরীত তেমনই কিন্তু দুটোর প্রথম অক্ষরটাও আবার এক।
শীতের রাত। নদীর পাড়ে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া গা কাঁপিয়ে দেয়। নদীর তীর ঘেঁষে একটি ট্রলার নীরবে থেমে আছে। ট্রলারের ভেতরেই ছোট্ট রান্নার ব্যবস্থা।চুলোর আগুন জ্বলছে মৃদু আলো ছড়িয়ে। সেই আগুনের চারপাশে সোহান, রাজন আর জুনায়েদ গোল হয়ে বসে আছে। সোহানের মন আজ অদ্ভুতভাবে হালকা। মায়ের শরীরের অবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো—এই খবরটাই যেন বুকের ভেতরের জমে থাকা ভার কিছুটা নামিয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর নিজের মনটাকে সুস্থ মনে হচ্ছে তার। ঠান্ডা হাওয়ার মাঝেও ভেতরে একটা স্থির উষ্ণতা কাজ করছে।
মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আজ আর রক্তে হাত রাঙাবে না। আজ হত্যা নয়, তাড়া নয়, লুকোচুরি নয়। আজ শুধু পরিকল্পনা। সামনে কী আসছে, কোন পথে হাঁটবে সেই হিসাবটাই কষার রাত আজকে। মদের আসরে আজ বহুদিন পর জুনায়েদ এলাহী যোগ দিয়েছেন। বয়স কম নয়। সে জানে বয়স আর কমবে না। তবে এই বয়সে কামানো টাকায় ইচ্ছে হলে সবই করা যায়। স্ত্রীকে সে ভালোবাসত, এতে সন্দেহ নেই। তবু পুরুষ শরীর—বয়স বাড়লেও নারীসঙ্গের তৃষ্ণা শুকায় না। চাচার এই বেহাল দশা দেখে শেষমেশ রাজনই লোক পাঠিয়েছে। বড়ঘাটে লঞ্চ ভেড়ানো আছে আজ রাতটা সেখানেই হেব্বি কাটবে জুনায়েদ এলাহীর। ইতিমধ্যে সিফাতও সেখানে পৌঁছে গেছে। নারীর নরম ডাকে সে চুম্বকের মতো টান খাচ্ছে। ফলে পড়ে রইল রাজন আর সোহান। রাজনকে আজ অস্বাভাবিক রকম চিন্তিত লাগছে। একের পর এক সিগারেট জ্বালাচ্ছে। ধোঁয়া টানতে টানতে বুক ভারী হয়ে আসছে, ঠান্ডা যেন জমে গেছে ভেতরে। তবু তার খেয়াল সেদিকে নেই। সোহান মুখে পান ঠেসে চিবোতে চিবোতে বলল,
“কিছু হইছে নাকি? পেরেশান লাগতেছে তোমারে।”
রাজন চাপা স্বরে বলল, “চিন্তার বাইরে থাকার উপায় আছে? রোশানকে যেই ডিলটা দেওয়া হয়েছিল সেটা হাত ছাড়া হয়ে যাবে নাকি হবে না তা আজকেই জানতে পারব। ওরা ফোন দিয়ে জানাবে। চিন্তায় মাথা খারাপ হচ্ছে। নিজের সব কিছু এই ডিল পাওয়ার জন্য লাগিয়ে দিয়েছি। এটা না পেলে শেষ আমি।”
“চিন্তা কইরো না, পাইয়া যাবা।”
“পাইলে ভালো। না পাইলে রক্ত ঝড়বে।”
সোহান চোখ কুঁচকে তাকাল। “রোশানরে খুন করবা নাকি?” রাজন কোনো জবাব দিল না। শুধু আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখই সব বলে দিচ্ছে কিন্তু সোহান সেই ভাষা বোঝে কি না, তাতে রাজনের কিছু যায় আসে না। হঠাৎ সোহান আবার বলল, “এইবার আর থামলে চলবো না। এই নিয়া দুইবার ফারাজরে মারতে গিয়াও মারতে পারি নাই। শালা বাইচা গেছে। এইবার ছাড়লে হইবো না। প্ল্যানটা শক্ত করতে হইবো।”
রাজন ধীরে বলল, “ফারাজরে মারলে কী লাভ?”
সোহান ঠোঁটের কোণে হাসি টানল। “লাভ? এলাহী বাড়ি, সব সহায়-সম্পদ—সব তো ফারাজের নামে। সে মরলে ভাগ পড়বে তোমাদের। জোহান নাই, নিরুও নাই, তোমার বইন ফারিয়াও চইলা গেছে। রোশানের এসবের প্রতি আগ্রহ নাই। তাই সবই তোমার। তুমি পাইবা টাকা-সম্পদ, আর আমি পামু চিত্রারে।”
রাজনের কপালে ভাঁজ পড়ল। এভাবে সে আগে ভাবেনি। অথচ এই মুহূর্তে তার টাকার প্রয়োজন ভয়াবহ। রাবসার চিকিৎসা, নিজের আলাদা অবৈধ ব্যবসা দাঁড় করানো সবখানেই টাকার চাপ। উপরন্তু পাচারকারীদের হাতে মেয়ে তুলে দেওয়ার ব্যবসায় এখন মন্দা। মেয়েরা পড়ালেখা শিখে চালাক হয়ে যাচ্ছে আর কতদিন এই পথ চলবে, তা বলা মুশকিল।
তার ওপর সোহানের পুরান ঢাকার গোডাউনে আগুন লাগার পর কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ব্যবসা আবার দাঁড় করানোর মতো চালানও নেই। এত মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জোগাড় করা কি আর মুখের কথা?
আগুনটা ধিকিধিকি জ্বলছে। আর তার আলোয় রাজনের চোখে ধীরে ধীরে জমে উঠছে আরও ভয়ংকর এক সিদ্ধান্তের ছায়া। হ্যাঁ এবার হয়তো ফারাজকে বিদায় নিতে হতেই পারে। কেবল একটা সুযোগ প্রয়োজন। তবে ফারাজের আগে আরেকজনকে সরানো দরকার। আর বাকি রইল চিত্রা। ফারাজ মরলে তার তৈরি করা রাজত্বের মালিক হবে অন্য কেউ। আর চিত্রা তো মেয়ে মানুষ। তাকে নিয়ে কোনো মাথা ঘামানোর দরকার নেই। পুরুষ নারীকে যেভাবে চালাবে নারী সেইভাবেই চলতে বাধ্য। চিত্রা ঝামেলা করলে বুদ্ধি খাটিয়ে সোহানের হাতেই মরণ লিখবে এই রাজন এলাহী। রাজন আরেকটু মাথা ঘামাল। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “একবার ফারাজ সরে যাক এই এলাহী বাড়ি আমার হবে। তখন কাকে কেমন করে দাবার কোট থেকে সরাতে হয় তা আমিও জানি।” রাজন চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর হেসে বলল, “রাবসা খুব জলদি আমি তোমাকে এলাহীতে নিয়ে আসব। সেদিন এই বাড়ি হবে কেবল আমাদের দু’জনার।”
ভোর ফুটতে অনেক দেরি। নেশাগ্রস্ত পা টেনে রাজন ঘরে ঢুকতেই তার মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে উঠল। নদী নদীর টেবিলের ওপর ঘুমিয়ে আছে। কী আশ্চর্য শান্তির ঘুম! কত যত্ন করে সেজেছে—চুলগুলো খোলা, মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। অথচ কালীকে যতই সাজানো হোক, কালী তো কালীই—মা লক্ষী বা সরস্বতী হয় না।
রাজন কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়ে রইল নদীর দিকে। এই শান্তি তার সহ্য হচ্ছে না। একদিকে তার রাবসা যন্ত্রণায় আকুপাকু করছে, আর অন্যদিকে এই মহারাণী নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে! এমন ঘুম তো কেবল রাবসার প্রাপ্য—নদীর নয়। জীবনে রাবসা না এলে রাজন বুঝতেই পারত না ভালোবাসার মূল্য। এই যে আগের তিনটে বিয়ে, নদী, আর জীবনে আসা অসংখ্য নারী—কেউই তাকে ভালোবাসা শেখাতে পারেনি। কেবল রাবসাই পেরেছে।
রাবসার রূপ এমন—বর্ণনা করার ভাষা নেই। কবি হলে কবিতার শব্দই হারিয়ে ফেলত। তার চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যের সামনে দাঁড়িয়ে শব্দরাও লজ্জা পেত।
রাজন চারপাশে চোখ বুলাল। ঘরটা এত সাজানো কেন? সে আলতো করে নদীর চুলে হাত বুলিয়ে দিল। মুহূর্তেই সেই কোমল স্পর্শ বদলে গেল হিংস্র মুঠোয়। আচমকা চুলের গোছা চেপে ধরতেই ব্যথায় ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল নদী।
“এত সাজগোছ কেন? লাং ডেকে বাসর সারছোত নাকি বান্দির বাচ্চা? বুড়া বয়সে তোর কিসের এত সাজা লাগব?”
নদীর চোখে জল চলে এলো। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। রাজন কি সত্যিই ভুলে গেছে? চুলের মুঠি ছেড়ে দিতেই নদী কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“খাবেন না? আজকে আপনার পছন্দের সব রান্না করছি আমি।”
“ইচ্ছা নাই। খাওয়ার ইচ্ছা তোর মতো বৈশ্যারে দেইখা ফুঁস!”
শব্দগুলো ছুরির মতো বিঁধল। নদীর চোখ ভিজে উঠল। রাজনের জন্য আজ কত যত্ন করে সেজেছিল সে! অথচ তার স্বামী তাকে কীসের সঙ্গে তুলনা করল? বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
চোখের জল লুকাতে নদী মেয়ের কাছে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে রাজন হঠাৎ তার আঁচল টেনে নিজের মুঠোয় ভরে নিল।
“কই যাস? পেটের ক্ষুধা নাই কইছি কিন্তু শরীরের?”
নদীর মুখে কোনো শব্দ নেই। চোখে শুধু জল—সহ্য করতে না পারার জল। প্রশ্ন জাগে কেন নদীদের নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই? কেন সাগরদের ছাড়া তারা চিরকালই এত অসহায়?
শরীরের ক্ষুধা মিটতে দেরি হলেও, নদীর ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে জঘন্য অবহেলা করতে রাজনের এক মুহূর্তও লাগল না। শীতের ভোররাতে গোসল সেরে দরকারি ফোনে কথা বলতে বলতে সে হাঁটতে হাঁটতে সিঁড়ির দিকে চলে এলো। হঠাৎ খেয়াল হলো রুমে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। ছাদে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালে মন্দ হয় না। ছাদের শেষ সিঁড়িটা পেরিয়ে দরজাটা হালকা খুলতেই কানে ভেসে এলো এক গম্ভীর, পুরুষালী কণ্ঠ। রাজন থমকে গেল। এই সময় ছাদে কে থাকতে পারে? কার সঙ্গে কথা বলছে? আরো মনোযোগ দিয়ে শুনতেই গলার স্বরটা চিনে ফেলল সে। এটা তো ফারাজ এলাহী। ঠিক তখনই কানে এসে ঠেকল স্পষ্ট কিছু কথা,“আমি যে করেই হোক, দুই–এক দিনের মধ্যে ইতালি আসছি। আমার ঝামেলা আমাকেই শেষ করতে হবে। সমস্যা নেই, চিত্রাকে বুঝিয়ে, মানিয়ে নেব। আচ্ছা, রাখলাম।”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৯
এক মুহূর্তও দেরি না করে রাজন দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে নিজের রুমে ফিরে এলো। বারান্দায় গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। কিছুক্ষণ সিগারেটের ধোঁয়ার সঙ্গে সময় কাটিয়ে, ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি নিয়ে সে সোহানকে ফোন করল। সোহান তখন কাঁচা ঘুমে। একটু আগেই শুয়েছে। তিনবারের মাথায় ফোন ধরেই অশ্লীল গালিগালাজ শুরু করল। রাজন তাতে আরো খুশি হলো। ঠান্ডা গলায় সে বলল,
“ভালো খবর আছে। এটাই সময় চিত্রা আর ফারাজকে আলাদা করার। ফারাজ এলাহী ইতালি যাচ্ছে। এই সুযোগে আমি তার বাড়ি দখল করব, আর তুমি তার নারী। এবার আমাদের পালা। কী বলো?”
