Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭১

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭১

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭১
ইশরাত জাহান জেরিন

রাজন তাড়াহুড়ো করে গায়ে সাদা শার্টটা চাপিয়ে, পরনের লুঙ্গিটা ঠিকমতো সামলানোরও সময় না নিয়ে ঘর ছাড়ল। মেঝেতে পড়ে থাকা নদীর পাশ দিয়েই সে হারিয়ে গেল। যাওয়ার মুহূর্তে রাজনের পায়ের চাপে নদীর হাতের ওপর চাপ পড়ল। দমফাটা এক চিৎকার গলা পর্যন্ত উঠে এসেও শব্দ হতে পারল না। যেন তার জীবনটাই এমন, চিৎকার করেও কেউ শোনে না।

রাজন চলে যেতেই নদী ধীরে ধীরে উঠে বসল। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা শাড়িটা কুড়িয়ে নিল সে। বুকের ভেতরটা কেমন জানি শূন্য হয়ে আছে। এক ঢোক শুকনো গিলে মাথা তুলে তাকাল সিলিং ফ্যানের দিকে। না, ওটা কোনো জিনিস না, ওটা তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকা হাজারো প্রশ্নের প্রতীক।
শেষ কবে মাকে দেখেছে? মনে করতে পারল না। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়েছিল তখন—বাবা মারা যাওয়ার এক মাস বিশ দিন পর। কী ভয়ংকর দেরি! কী নিষ্ঠুর ভাগ্য! নদীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মা অসুস্থ মানুষ। সে কি এখনো বেঁচে আছে? ছোট্ট সংসারটা কীভাবে চলছে? ছোট বোনটা কি এখন মায়ের হাত-পা হয়ে গেছে? আর ভাই, বাবার রেখে যাওয়া দর্জির কাজটা কি সে কোনোভাবে চালিয়ে নিচ্ছে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সবাইকে ফেলে সে কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে?
নদীর মনে হচ্ছে, সে এক ব্যর্থ মানুষ। কোনো সম্পর্ক ধরে রাখতে পারেনি, কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। যে শরীরটা দিয়ে সে বেঁচে আছে এই শরীরটার ওপরই তার আর কোনো অধিকার নেই। তার জীবনের কোনো দাম নেই। এই বিশ্বাসটা গভীরে ঢুকে গেছে।

এখন মনে হচ্ছে সে শুধু বোঝা। পরিবারের বোঝা, নিজের বোঝা। পৃথিবী থেকে সে সরে গেলে কার কীই বা আসে যায়? এই ভাবনাগুলোই তাকে ঠেলে নেয় শেষ সীমার দিকে। জীবনের সঙ্গে আর লড়াই করার শক্তি নেই। নদীর চোখে তখন জল নেই, আছে শুধু ক্লান্তি। আছে কেবল একটা জীবন। একটা অধ্যায়। শেষ করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। নদী ধীরে ধীরে খাটের ওপর রাখা চেয়ারটার দিকে তাকাল। ঘরটা তখন নিঃশব্দ। হাতে ধরা শাড়িটা তার কাছে আর কাপড় মনে হলো না মনে হলো বহুদিন জমে থাকা সব ব্যথা, সব লজ্জা, সব ব্যর্থতার ওজন। সে চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল। পায়ের নিচের মাটি হঠাৎ অনেক দূরে সরে গেল বলে মনে হলো। বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মাথার ভেতরে তখন কোনো স্পষ্ট চিন্তা নেই, শুধু একটাই বিশ্বাস ঘুরপাক খাচ্ছে এখানেই সব শেষ হলে ভালো।
এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করল নদী। মায়ের মুখ ভেসে উঠল, বাবার ক্লান্ত চোখ, ছোট বোনটার চুপচাপ থাকা, ভাইয়ের নীরব সংগ্রাম। তারপর আবার সব মুছে গেল। মনে হলো, সে আর কারও কাজে লাগেনি।

এখন শুধু একটা সিদ্ধান্ত বাকি। একটা ছোট্ট নড়াচড়া।
একটা মুহূর্ত। তারপর একটা জীবন। একটা অধ্যায়ের ইতি। ঠিক তখনই, পেছন থেকে ঘুম ভাঙা কণ্ঠে প্রশ্নটা ভেসে এলো, “মা… তুমি কী করছো?”

এই একটা প্রশ্ন। এই একটা ডাক। নদীর শরীরটা জমে যায়। সময় যেন হঠাৎ থেমে দাঁড়ায়। শুধু নূড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে সে, এই ছোট্ট মেয়েটা, যাকে পেটে সে ধরেনি, জন্ম দেয়নি, কিন্তু কত সোহাগ করে সে তাকে মা বলে ডাকে। নদীর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুকের ভেতরটা ফেটে যেতে চায়। এই শিশুর সামনে সে কী করতে যাচ্ছিল? এই মেয়েটার চোখে সে কী রেখে যেতে চেয়েছিল? হঠাৎ বুঝতে পারে, এভাবে হেরে গেলে চলবে না। নূড়ির তাকে দরকার। এই ঘরে, এই পৃথিবীতে, এই নিষ্ঠুর জীবনের ভেতরে নূড়ির জন্য হলেও তাকে দাঁড়াতে হবে। সে যদি ভেঙে পড়ে, নূড়ি কাকে আঁকড়ে ধরবে? কে তাকে বলবে সব ঠিক হয়ে যাবে? নদী ধীরে ধীরে নূড়ির কাছে গিয়ে তাকে বুকে টেনে নেয়। নূড়ির মাথাটা তার বুকের সঙ্গে ঠেসে ধরে ফিসফিস করে বলে, “কিছু না মা… একটু দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।” কিন্তু আসলে দুঃস্বপ্নটা নদীরই ছিল।

আর এই মেয়েটাই তাকে সেই দুঃস্বপ্ন থেকে টেনে বের করল। এই জীবন থেকে পালিয়ে গেলে সহজ হতো কিন্তু বাঁচা কঠিন। তবু নদী ঠিক করে নেয়, সে লড়বে। নূড়ির জন্য। নিজের জন্য নয়। কারণ কিছু সম্পর্ক রক্তের না হলেও, জীবনটা ধরে রাখার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে ওঠে।

সকাল থেকে ফারাজ স্টাডি রুমেই। অভ্রর সঙ্গে একটানা আলাপ চলছে। দরজা বন্ধ, কণ্ঠস্বর নিচু। যেন এমন কোনো কথা, যা চিত্রার কানে যাওয়ার নয়।
এই ব্যাপারটাই চিত্রার মাথায় আগুন ধরিয়ে দেয়।
কী এমন কথা, যা বউ শুনতে পারবে না?

বোমা পড়ুক সেই মুখে যে মুখের কথা তার কাছ থেকে লুকাতে হয়! এমন কী দরকারি আলোচনা, যা স্ত্রীর সামনে বলা যাবে না? এক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচবারের মতো স্টাডি রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল চিত্রা। প্রতিবারই ভেতর থেকে ফিসফাস, থেমে যাওয়া কণ্ঠ, আবার শুরু কিন্তু দরজা খুলল না। শেষ পর্যন্ত রাগে গাল ফুলিয়ে নিজের রুমে ফিরে আসে সে। দরজাটা সজোরে বন্ধ করে বিছানার ধারে বসে পড়ে। চোখে জল, বুকভরা অভিমান। কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ে। আয়েশা আর জমেলা ঢোকে। চিত্রার মুখ দেখেই সব বুঝে যায় তারা। কথার একপর্যায়ে চিত্রার অনুরোধে নদী আর মোহনাকেও ডেকে আনা হয়। মোহনাকে দেখেই চোখ আটকে যায় চিত্রার। মেয়েটা এমনিতেই অপরূপা ছিল, এখন ভালোবাসা পেয়ে যেন আরও ঝলমলে হয়ে উঠেছে। মুখে আলাদা এক ধরনের আলো, চোখে নিশ্চিন্ত হাসি। একটু বেশি গুলুমুলুও হয়েছে বটে—কিন্তু সেটা সুখের ভারে। তারপর চিত্রার চোখ গিয়ে পড়ে নদীর দিকে। শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ। কোথাও নীলচে ছাপ, কোথাও শুকিয়ে আসা ক্ষতচিহ্ন। দৃশ্যটা দেখেই চিত্রার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। ওই জানোয়ারটা আবার বুঝি নিষ্পাপ ফুলের গায়ে হাত দিয়েছে?

রাগে তার হাত দুটো শক্ত হয়ে আসে। দাঁত চেপে ধরে সে। আর না। আর একটুও না। সে কেবল নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি আপনাকে আগেও বুঝিয়েছি সামনে আর বুঝাতে পারব না হয়তো। তবে শেষবার বলছি আপনার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের সঙ্গে আপনি লড়াই করুন, প্রতিবাদ করুন। প্রতিবাদ অন্য কাউকে করতে হলে কিন্তু পরিনাম ভয়াবহও হতে পারে।”
অভ্র গ্লাসে পানি ঢেলে মাথা ব্যাথার ঔষধ দিলো ফারাজকে। দিয়ে বলল, “খেয়ে নেন। ভালো লাগবে।”

” অভ্র তুই থেকে যাহ। আমি একা যেতে পারব। তুই পারবি না তোর ভাবীকে সামলে রাখতে?”
“না ভাই আপনি গেলে আমিও আপনার সঙ্গে যাব। আর আমরা তো পাপ করতে যাচ্ছি না। কাজে যাচ্ছি তো সমস্যা কোথায়?”
“চিত্রা এই বাড়িতে নিরাপদ নয়। এককাজ করা যায় তো! চিত্রা, আয়েশা, আর জমেলাকে আমার অবর্তমানে আমার এলাহী কুঠিতে পাঠিয়ে দিলে কেমন হয়?”
“ভালো হয়। বজ্রকে সঙ্গে থাকতে বললেই হবে।”

“তুই থেকে যা ভাই। তুই থাকলে চিন্তামুক্ত হবো। এমন সময় বিপদ আসতে হবে তা কে জানত? তবে আমার তো জানতেই হবে কার এত বড় সাহস যে আমার লোক, রোজের গায়ে গুলি চালাবে? ফ্যাক্টরীতে কি করে আগুন লেগে এত টাকার লস হলো সেটাও তো বের করতে হবে। তার চেয়ে বড় কথা পন্য যার কাছে যাওয়ার কথা সেই ব্যবসায়ীকেও তো ম্যানেজ করতে হবে। এতদিন রোজ সব সামাল দিয়েছে এখন সে নিজেই অসুস্থ। এই মূহূর্তে আমার তো সেখানে যাওয়াই লাগবে। ২য় কোনো উপায় নেই রে অভ্র।”

“এতকিছু জানি না। কেবল জানি আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি আর ভাবী, ঘরনী ওদের সঙ্গে এখানে বজ্র থাকছে।”
ফারাজ আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আজকে গিয়ে ঝামেলা শেষ করতে পারলে আরো ভালো হতো। কিন্তু ডিলার অন্য দেশে আছে। তার ইতালি আসতে ২-৩ দিন সময় লাগবে। তাই আমিও ২ দিন পর ইতালি যাবো। এত জলদি গিয়ে লাভ নেই। যাইহোক তোর ভাবী রাগ করেছে আগুন সুন্দরীকে একটু বরফ রোমান্স দিয়ে আসি।”

“খেয়াল রাখবেন ভাই বরফ রোমান্স দিতে গিয়ে আইমক্রিম বানিয়ে ফেইলেন না। পরে বরফ হয়ে গেলে তো সমস্যা। ”
“আসো তোমার বংশবৃদ্ধির সাত রাজার ধনে একটু বরফ লাগিয়ে ট্রায়াল দেই। আসো আসো দেখি, তোমারটা বরফ হয় কিনা।”
“আরে ভাই আপনার কাছে দেখছি আজ-কাল আমি নিরাপদ না। ইস কি ছোটলোকি কারবার।”

সারাদিন আজ চিত্রার মনটা ভীষণ খারাপ। বিশেষ করে ফারাজ যখন সব খুলে বলল—ইতালি যেতেই হবে! রোজের নাকি গুলি লেগেছে। খবরটা শুনে মনটা তখন আরও বেশি ভারী হয়ে গেল। তবু স্বামীকে সে আঁটকে তো আর রাখতে পারে না। একদিনেরই তো বিষয়। তবু কই ইতালি আর কই বাংলাদেশ! দূরত্বটা বড় অচেনা। হয়তো অনেক দূর। চিত্রা তো কখনোই যায়নি সেখানে, তাই জানাও নেই।

সন্ধ্যায় চিত্রার মন ভালো করতে ফারাজ তাকে নিয়ে গেল তার মায়ের আশ্রমে। আজ ফারাজের খুব মনে পড়ছে মায়ের কথা। তাছাড়া লতামণিকেও কতদিন ধরে দেখা হয়নি। আজ ফারাজ পরেছে কালো রঙের একটি ব্লেজার। আর চিত্রা তার ঠিক উল্টো, গাঢ় সবুজ রঙের একটি শাড়ি। কী যে সুন্দর লাগছে তাকে! আসলে ফর্সা মানুষকে যা পরানো হয়, তাতেই যেন আলাদা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। ফারাজও কম কিসে? কালো-বাদামির সংমিশ্রণে গড়া অদ্ভুত সুন্দর চোখ, শক্ত চোয়াল, ফর্সা গায়ের রং সব মিলিয়ে চেহারায় দৃঢ় আকর্ষণ। গালের চাপ দাড়িগুলোও বেশ মানিয়েছে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বরাবরের মতোই তার গলার কণ্ঠমণি। ওটার ওঠানামার দৃশ্য শরীর কাঁপিয়ে দেয়। ইচ্ছে করে তাকিয়েই থাকতে।
লতামণির সঙ্গে দেখা করার পর হঠাৎ ফারাজ চিত্রাকে বলল, “আমি মায়ের কবরটা জিয়ারত করে আসি। তুমি মণির কাছেই থাকো।”

চিত্রা সায় দিল। মা আর ছেলেকে একটু একা থাকতে দেওয়া যাক। কতদিন পর ফারাজ মায়ের কাছে এসেছে। হাঁটতে হাঁটতে চিত্রা গেটের কাছে চলে এলো। ওদিকটায় আরেকটা আশ্রম। সেখানে অনাথ মেয়েদের থাকার জায়গা। নিজের কথাই মনে পড়ে গেল চিত্রার। সেও তো প্রকৃতপক্ষে অনাথই। পা যেন নিজে থেকেই টেনে নিয়ে গেল তাকে সেই আশ্রমের দিকে। ভেতর থেকে ভেসে আসছে অনেক গলার আওয়াজ৷ কিসের এত ভাষণ? যাওয়ার আগে একবার পেছনে তাকাল। না গেলে সমস্যা নেই। এখান থেকে এখানেই তো। প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারল নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সমাবেশ হচ্ছে। কিন্তু ঘোষণা মঞ্চে সোহান পালোয়ানকে ভাষণ দিতে দেখে চিত্রার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই পেছন থেকে মেয়েলি একটি কণ্ঠ, “তুমি চিত্রা না?” পেছন ফিরে অফিসার অনুলিপি হাওলাদারকে দেখে চিত্রা ভ্রু কুঁচকাল। “জি।”

“রাশুর খুনিকে নিয়ে তদন্ত চলছে। খুনি ধরা না পড়া পর্যন্ত তোমাদের বাড়ির সবাইকেই লিস্টে রাখা হয়েছিল। রাশুর সঙ্গে থাকা একজন বলেছিল, শেষবার নাকি সে তোমাকে নিয়ে কটু কথা বলেছিল।”
“আমি তো শুনিনি। আর আমাকে এসব বলে লাভ কী? আগে প্রমাণ হোক খুনি কে।”
“হয়ে যাবে।”
চিত্রার ঠোঁটে তিক্ত হাসি। “তার নমুনা তো দেখছিই। ওই যে নারীদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়া সেই মহৎ ব্যক্তি আজ এখানে এসে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে ভাষণ দিচ্ছে। তার কিছুই করতে পারছেন না আর ধরবেন রাশুর খুনি?”

অনুলিপি দূর থেকে সোহান পালোয়ানের দিকে তাকাল। সবাই তাকে চেনে, তবুও চুপ। এত কিছু জেনেও এই নীরবতা! তবে অনুলিপি এই শহরে এসেছে মানেই এক এক করে সব নারীকে সে হেফাজত করবে।
“আপনি এখানে থানার কাজে এসেছেন?” চিত্রা জানতে চাইল।
“না। কিন্তু মনে হচ্ছিল এখানে আসাটা দরকার। মানুষগুলো সুবিধার নয়। যদি কোনো নারীর ক্ষতি করে?”
চিত্রা শান্ত গলায় বলল, “নারী যতদিন নিজের বুঝ নিজে না বুঝবে, ততদিন এসব বন্ধ হবে না, অফিসার ম্যাডাম। আমি আশপাশে একদল হায়না দেখতে পাচ্ছি। ওদের উদ্দেশ্য মোটেও ভালো নয়।”
“তুমি চলে যাও। আগুনের মতো সুন্দর তুমি। হায়নারা এমন শিকারই খোঁজে। নতুন ঝামেলা চাই না।”
“চলে যাচ্ছি। আপনি পারবেন, একদিন নারীগুলোকে বাঁচাতে পারবেন অবশ্যই। আরেকটা কথা… শিকারী নিজেও অনেক সময় জানে না, সে-ও যে অন্য কারো শিকার।”

অনুলিপি হাওলাদার চিত্রার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আর চিত্রা তাকিয়ে আছে সোহান পালোয়ানের দিকে। তার চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। করবেই তো পাপিরা বুক ফুলিয়ে ঘুরছে, আর নিষ্পাপরা মরছে। বৈঠকখানায় সেদিনও কিছু নারী বিষয়ক কথা শুনেছিল চিত্রা। একই বাড়িতে এত জঘন্য মানুষের সঙ্গে থাকতেও রুচিতে বাঁধে। কেবল ফারাজ এলাহীর কথা ভেবেই চুপ করে আছে নইলে কবেই না… ভাবনা থামিয়ে অনুলিপির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে চিত্রা বলল, “আইনের লোক আপনি। ইমানদারের সঙ্গে কাজ করলে ওপারে খোদার সামনে মুখ উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন। তবে সাবধানে থাকবেন এই গল্পের প্রতিটি পৃষ্ঠা আপনার জন্য মরণফাঁদ।”

অনুলিপি দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “মরণের ভয় করি না। মরণ যেভাবে লেখা, সেভাবেই হবে। তবে এই নিষ্পাপ মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে না মরতে পারলে মরেও শান্তি পাব না। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব আমি।”
চিত্রা আর সময় নষ্ট করল না। অনেকক্ষণ এখানে কাটিয়েছে। ফারাজ নিশ্চয়ই তার জন্য অপেক্ষা করছে, খুঁজে বেড়াচ্ছে। তবু বুকটা কেমন অস্বস্তিতে ভরে উঠল। সোহান পালোয়ান আর তার দলকে এভাবে বুক ফুলিয়ে ঘুরতে দেখে। আচ্ছা… কোনো বিপদ হবে না তো?

ফারাজ তখনো মায়ের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে। জীবনটার কোনো ভরসা নেই, কারণ ভরসা দেওয়ার মানুষটাই তো তার জীবনে নেই। মায়ের কবরের মাটি হাতে ছুঁয়ে দেখল ফারাজ। চোখে তার জল। সে মাকে ছুঁয়ে বলল, “তুমি তো জানো মা আমি কোনো ভুল করছি না। মা আমি খারাপ কাজ, পাপ সব ছেড়েছে কিন্তু তাকে কি করে ছেড়ে দেই যে মায়ের জাতের ওপর হাত দেয়? আমার চিত্রাঙ্গনা যতবার শকুনের নজরে পড়বে আমি ফারাজ ততবারই তার জন্য হাতে রক্ত লাগাবো।”

ফারাজ কবরের সামনে আরেকটু নুয়ে পড়ে। মায়ের মাটির গন্ধে তার বুকটা হাহাকার করে ওঠে। “মা… আমি জানি তুমি আমাকে মানুষ করতে চেয়েছিলে, রক্ত নয় মেরুদণ্ড দিয়ে। কিন্তু এই পৃথিবী আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি মা। এখানে নরম হলে চিবিয়ে খায়।”
মাটির ওপর কপাল ঠেকায় সে। “তুমি বলেছিলে, অন্যায়কে ঘৃণা করো, মানুষকে নয়। আমি চেষ্টা করেছি মা… সত্যি চেষ্টা করেছি। কিন্তু যে মানুষগুলো নারীকে মানুষ ভাবে না, তাদের মানুষ ভাবা কি আমার দায়িত্ব?”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে। “মা, আমি আর আগের ফারাজ না।তবু যখন চিত্রাঙ্গনার দিকে সেই লোভী চোখ ওঠে আমার ভেতরের জন্তুটা জেগে ওঠে মা। তখন তোমার শেখানো সব শান্ত কথা রক্তের শব্দে চাপা পড়ে যায়।” ফারাজ চোখ মুছে নেয়। “আমি খুনি হতে চাই না মা। আমি শুধু ভালো ছেলে, ভালো স্বামী হতে চাই, যে তার স্ত্রীর নিরাপত্তা কিনে নেয় নিজের নৈতিকতা ভেঙে হলেও।”একটু থেমে পুনরায় বলল, “তুমি যদি আমাকে ক্ষমা করো মা, তাতেই চলবে। এই দুনিয়া আমাকে ঘৃণা করলেও চলবে। তোমার দোয়া থাকলে আমি আগুনেও হাঁটতে পারি।” ফারাজের কঠিন হৃদয়ের বাঁধ ভেঙে নোনা জল বেরিয়ে আসে হাহাকার হয়ে। মাকে বলার তো হাজারটা কথা আছে কিন্তু মা যে আর নেই। সে তো দুনিয়ার জান্নাত মায়ের সঙ্গেই হারিয়ে ফেলেছে। আর পরকালের জান্নাত সে তো তার মতো পাপীর জন্য নয়। এই জীবন তোমার বৃথা ফারাজ, তুমি আঁধার রাতে চাঁদও চাও আবার অন্ধকারও মেনে নিতে পারো না। ফারাজের আহত হৃদয়টা কেবল মাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। মাকে চিৎকার করে বলতে চাইছে,

~এলোমেলো চুল যত্ন নিয়ে সরিয়ে
চুমু দিয়ে খুব চেপে বুকে জড়িয়ে
আংগুলে আংগুল ধরে রেখে জানাতে বিদায়।
আকাশে জ্বলে থেকে,
চেয়ে দেখো খুব বড় হয়ে গেছি আমি
উঁচু উঁচু ফ্ল্যাট, আকাশে তাকিয়ে থামি
তবু কতদিন স্পর্শে পাইনা তোমায়~
হঠাৎ চিত্রা এসে পেছন থেকে ফারাজের গায়ে হাত রাখে। ফারাজ আস্তে করে চোখ ফিরিয়ে চিত্রার দিকে তাকায়। ক্লান্তি শরীরটা নিয়ে কেবল অসহায়ের মতো স্ত্রীকে আকুতি করে জানায়, “আমায় একটু জড়িয়ে ধরবে চিত্রাঙ্গনা?”

ভাষণ শেষ করে মাত্রই পানি মুখে দিল সোহান। এতগুলো মিথ্যা কথা বলা মুখের কথা নয়। গলাটা শুকিয়ে এসেছে। এখানে আসলে সে ভাষণ দিতে আসেনি—এসেছিল নতুন ডিলের জন্য মেয়ে নিতে। এই ছেলেগুলোর রুচি ভালো না। আজ সে নিজেই পছন্দ করে মেয়ে তুলবে চালান হিসেবে। কারণ কাস্টমার তার রেগুলার। সিফাত এসে সোহানের পাশে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল, “কড়া একখান মাইয়া পাইছি ভাই।”
“তগো পছন্দ, আমার অপছন্দ। আমি আগে দেখমু, তারপর বাকি সিদ্ধান্ত।” সোহান বলল।
হাওয়া খাওয়ার নাম করে উঠে গেল সে। বাইরে বের হয়ে সিফাতের ইশারা করা মেয়েটার দিকে তাকাল সোহান। মেয়েটা কিছুর সঙ্গে বাড়ি খেয়ে ব্যথা পেয়েছে। পাশে আরেকজন মেয়ে তাকে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে।
সোহান আবার সিফাতকে জিজ্ঞেস করল,

“মাইয়া কোনটা?”
“ওইযে, যেটা ব্যথা পাইছে।” সোহান এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে। কী হয়েছে জানতে চাইতেই পাশের নারীটি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “আপনার ভাষণ শেষ হয়নি? বাড়ি যাবেন কখন?” সোহান কাঠখোট্টা জবাব দেওয়া মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তার সঙ্গে এমন করে কথা বলছে কেন? ঠিক তখনই সিফাত কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “এটা নতুন মহিলা পুলিশ অফিসার। ওইদিন যে চালানটা ভারতে যাওয়ার কথা ছিল, ওইটায় এই শালী চেকিং বসাইয়া মাল আটকাইছে।”

“গাঁজার চালানটা?” সোহান চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“জ্বি, ওইটাই।” সোহান অনুলিপির দিকে তাকাল। ভেতরে ভেতরে রাগ উঠছে তার, তবে মুখে একদম স্বাভাবিক। নিজের রাগ সে এত সহজে প্রকাশ করে না। হেসে বলল, “আসলে বিপদ দেখেই জিজ্ঞেস করতে আসছিলাম। আপনি মাইন্ড করলেন না তো?”

“বিপদ এসেছে বিপদ নিয়ে জিজ্ঞেস করতে?” অনুলিপি উঠে দাঁড়াল। গায়ে ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে বলল,
“হাসালেন, পালোয়ান সাহেব। চালিয়ে যান, আমরাও দেখতে চাই আপনার বিপদ থেকে উদ্ধার করার নমুনা কী।” হঠাৎ সোহানের ফোনে কল এলো। রাজনের কল। আজকের পাঠানো চালানটাও নাকি পুলিশ ধরে ফেলেছে। টাকা দিয়েও এখন আর পাচার চলছে না।
সোহানের মাথার রগগুলো ফুলে উঠল।
সে অনুলিপির দিকে তাকাতেই মেয়েটা আশ্রমের মেয়েগুলোকে রুমে যেতে বলল। তারপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি এনে বলল,“আহারে! কেউ একজন নাকি অন্যকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে এসেছিল। এসে দেখি নিজের বিপদের কথাই ভুলে গেছে।”
বলেই সোহানের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে গেল।
সে চলে যেতেই সোহান সিফাতকে জিজ্ঞেস করল,

“এই মেয়ের সম্পর্ক কী কী জানোস? এই সময় এখানে কেন? পুলিশ বাহিনী নিয়া আসছে নাকি?”
“এই মাইয়াও এই আশ্রম থেকেই মানুষ হইছে, মিয়া ভাই। প্রথম চালান ধরা খাওয়ার পরই এর সম্পর্কে খোঁজ নিছিলাম। মাইয়াগোরে অধিকার আদায় করা শেখানোই শালীর স্বপ্ন। ভাই, এটার ব্যবস্থা করতে হইব। না হইলে ধান্দা করা যাইব না।”
সোহান কোনো জবাব দিল না। কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “এই মাইয়া নিজেও জানে না যার হাতে আশ্রমে মানুষ হইছে, সেই মহিলাই আসলে ধান্দাবাজ। ১৮ বছর হইলে এই আশ্রমে এমনিতেই থাকা যায় না। নিজের পথ নিজেই দেখতে হয়। এই ‘১৮ বছর’-এর অজুহাতে আমাগো হাতে এর আগেও কত মাইয়া বেইচা ফেলছে, তা যদি জানত!”
একটু থেমে জিজ্ঞেস করল, “আজকে আশ্রম থেকে কয়টা মাইয়া নেওয়ার কথা ছিল?”

“দশজন।”
“উঁহু,” সোহান মাথা নাড়ল।
“আজকে এগারো জন যাইব।”
“মানে?” সিফাত থমকে গেল।
“দশজন যাইব কাস্টমারের বিছানায়,”
সোহান থেমে গেল। ভিড়ের মধ্যে তখনও তার দৃষ্টি আটকে আছে অনুলিপির দিকেই, “আর এগারো নম্বর জন…”

রাত দশটার কাছাকাছি। আশ্রমের ভেতরের বাতাস সেভাবে আর প্রাণবন্ত নেই এখন। প্রতিটি করিডোর ফাঁকা। আশ্রমে ঢোকার পথে অনুলিপি একাকী হাঁটছে। আশ্রমের মূল গেটের দিকে এগোতে গিয়ে মনে হচ্ছে আজকে চারপাশের অন্ধকারও তাকে চুপ করে দেখছে।

থানায় যেতে হবে, কিন্তু তার আগে দেখা করতে হবে আশ্রমের ম্যানেজারের সঙ্গে। ম্যানেজারের নাম নাহার। আশ্রমের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি নিয়ম, নাহার খালার হাতেই মানুষ হয়েছে। এখানকার মেয়েদের জীবন নাহার খালার নজরদারির জন্য রূপ নিয়েছে। নাহারের সঙ্গে কথা শেষ করে বিদায় নিলেও গেটের সামনে দাঁড়াতে পারেনি অনুলিপি। আগেই ফোন বেজে ওঠে। গুপ্ত গোয়েন্দা বিভাগ থেকে কল এসেছে। ফোন ধরতেই অনুলিপির শরীর এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। কিছু সময় থমকে দাঁড়ালো সে। তারপর মুখ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বের হলো, “তার মানে… রাশুর খুনি সাধারণ কেউ নয়?

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭০

কিন্তু কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না… খুনি কী করে সে হতে পারে? তার চেয়ে বড় কথা… সেও ইতালির…” শব্দ শেষ করতেই, পেছন থেকে হঠাৎ কোনো অদৃশ্য শক্তি তার মুখ ঢেকে ধরল।
প্রত্যেকটি মুহূর্ত একেবারে দ্রুত, অযৌক্তিক। হৃদস্পন্দন দ্রুত গতিতে বেড়ে যাচ্ছে। অনুলিপি কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু হাতের স্পর্শ, ঠোঁটের ওপর চাপ, চোখের সামনে অন্ধকারের দোলা অনুভব করল। চোখ বন্ধ হওয়ার আগে, মুখের ভেতর থেকে শেষবার যে শব্দটা বের হলো, তা ছিল,
“নাহার খালা…”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭২

1 COMMENT

Comments are closed.