Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭২

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭২

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭২
ইশরাত জাহান জেরিন

বাড়ি ফিরে চিত্রা ফারাজকে বিছানায় বসায়। দরজাটা ভেতর থেকে লাগিয়ে সে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ ফারাজ পেছন থেকে তার হাত ধরে টেনে নেয়। যাত্রাপথেই থেমে যায় চিত্রা। “একটু থেকে যাও না…” চিত্রা ফিরে তাকায়। “ফ্রেশ হয়ে আসি?”
ফারাজ মাথা নাড়ল। “আজ আমায় রেখে কোথাও যেও না।” এই একটা বাক্যেই সব ক্লান্তি গলে যায় চিত্রার। সে এগিয়ে এসে ফারাজকে জড়িয়ে ধরে, আঙুল চালায় তার চুলের ভেতর দিয়ে। নরম স্বরে বলে, “সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি ইতালি যাবেন… ব্যাগটাও তো গুছাতে হবে।” ফারাজ হালকা হেসে তাকায়। হঠাৎই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, “আচ্ছা বউ, নেশা করা কি অপরাধ?”

চিত্রা এক মুহূর্ত থামে। “হয়তো।” ফারাজ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই তাকানোতে দুঃখ আছে, আবার অদ্ভুত এক আত্মসমর্পণও। ধীরে বলে,
“নেশা যদি অপরাধ হয়,
তবে দোষটা মদের নয়—তোমার চোখের আগুন, সুন্দরী।” চিত্রা কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে ফারাজের দিকে। তার ভেতরে প্রশ্নের ভিড় আবার ভয়ও আছে। আর ভয় কাদের থাকে? যারা কিছু লুকোচ্ছে, যারা নিজের ভেতর অপরাধ বয়ে বেড়ায়। ফারাজ হঠাৎ চিত্রাকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে। আঁকড়ে ধরে। কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। “তুমি ছেড়ে চলে গেলে আমি মরে যাব, চিত্রা। আমি এতিম… আমায় ভালোবাসার মতো মানুষ নেই এই দুনিয়াতে। এই এতিমকে ছেড়ে কোথাও যেও না। তুমি ছাড়া ফারাজ এলাহীর কোনো অস্তিত্ব নেই, ধরণীর বুকে একটুও না।” চিত্রার বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে ওঠে। সে কথা খুঁজে পায় না। ফারাজ তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, শিশুর মতো গুনগুন করে উঠতে থাকে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

~Tera Sath Choota Ye Vaada Jo Toota
Main Khud Ko Mitaa
Dungi Teri Chahat Mein
Main Duniya Bhula Dunga
Teri Chahat Mein…~
গান থেমে গেলেও তার কণ্ঠে লেগে থাকে ভয়, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক সব একসঙ্গে। ঘরটা ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে থাকে। শুধু দুটো হৃদয়ের ধাক্কাধাক্কি ঘুরে বেড়ায় ঘর জুড়ে।

গন্ধটাই আগে আসছে। তীব্র, ঝাঁঝালো ফিনাইলের গন্ধ।
মাথার ভেতর এখনো ঝিমুনি, চোখ খুলতে না খুলতেই নাকের ভেতর সেই পরিচিত হাসপাতালের মৃত গন্ধ ঢুকে পড়ে। অনুলিপি বুঝে যায় এটা কোনো সাধারণ ঘর না।
চারপাশের দৃশ্য স্পষ্ট হওয়ার আগেই নাহার খালার মুখটা ভেসে ওঠে মনে। এক মুহূর্তেই মাথার ভেতর সব হিসাব মিলে যায়। নাহার খালার জঘন্য কাজটা বুঝতে অনুলিপির তীক্ষ্ণ বুদ্ধির খুব বেশি সময় লাগে না।
কাকে বিশ্বাস করেছিল সে? আর এখন সে কোথায়?
চোখ পুরো খুলতেই বুকের ভেতর কেঁপে ওঠে।

এটা হাসপাতালের লাশঘর। চারদিকে সারি সারি স্টিলের ড্রয়ার। কিছু ড্রয়ার আধখোলা, ভেতর থেকে সাদা চাদরের নিচে মানুষের অবয়ব। কোথাও কোথাও চাদর সরে গিয়ে বেরিয়ে আছে শক্ত হয়ে যাওয়া আঙুল, নীলচে ঠোঁট, নিথর মুখ। এয়ার কন্ডিশনের ঠান্ডা বাতাস গায়ে কাঁটা ধরিয়ে দেয়, অথচ ঘরটার ভেতর একটা ভারী, পচা নিঃশ্বাস আটকে আছে। এই অসংখ্য লাশের মাঝখানে একটা জীবিত লাশ সে নিজেই।
হাত-পা বাঁধা, গলা শুকিয়ে আসছে। মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন, সোহান পালোয়ান তাকে এখানে আনলো কেন? হঠাৎ দরজার শব্দ। লোহার দরজা খুলে একজন ঢুকে পড়ে।হাতে একটা চাপাতি। এইটা দিয়ে কি মানুষ কাটে, না শুধু ভয় দেখায় অনুলিপি ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। মুহূর্তে সব গুলিয়ে যায়। লোকটার মুখে কালো মাস্ক। কোনো কথা না বলে সোজা অনুলিপির সামনে এসে চাপাতিটা নামিয়ে রাখে। ইচ্ছে করেই—যাতে সে দেখে।অনুলিপি ক্ষেপে ওঠে। ভয় ঢেকে রাগ বেরিয়ে আসে গলায়। “কাপুরুষদের থেকে এরচেয়ে ভালো কিছু আশা করা যায় না। থানা তোর জন্য ওয়েট করছে।”

মাস্কের আড়াল থেকে শান্ত, অবিচল একটা গলা ভেসে আসে, “বেঁচে থাকলে তো দেখা হবে।”
অনুলিপি থমকে যায়। “মানে?”
“মানে… কখনো কখনো সব জেনে ফেলা উচিত নয়।”
কথা শেষ হতেই লোকটা অনুলিপির বাঁধা হাতে সুচ ঢুকিয়ে দেয়। ঠান্ডা তরল শরীরে ঢুকতেই চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে। অচেতন হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে অনুলিপি ফিসফিস করে প্রশ্ন ছোড়ে, “কে তুই?”
লোকটা মাস্ক খুলে নেয়। মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়।
ডাক্তারের অ্যাপরনের পকেটে মাস্ক গুঁজে দিয়ে সে শান্ত স্বরে বলল,
“আমি? আমি বজ্র কায়সার।” অনুলিপির চোখ বন্ধ হয়ে আসে। বজ্র এবার মৃদু হাসে। হাসিটা লাশঘরের নিস্তব্ধতার সঙ্গে ভয়ংকরভাবে মিশে যায়। “লাশঘরের কোন ড্রয়ারে আজ তোমায় জায়গা দেই বলো তো?”
একটু থেমে ঠান্ডা গলায় যোগ করে, “কেন যে… লিমিটের বাইরে জানতে গেলে?” বলেই সে আবার হেঁসে ওঠে। লাশঘরের ভেতর সেই হাসিটা ধাতব দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে। একটা জীবিত মানুষের শেষ নিঃশ্বাসের ওপর ভেসে থাকা নিষ্ঠুর প্রতিধ্বনি হয়ে।

সকাল সকাল গোসল সেরে রান্নাঘরে চলে গেল চিত্রা। অন্দরমহলে রুমানা বেগম পান চিবোচ্ছেন আর খবর দেখছেন। হঠাৎ বজ্র এসে অন্দরমহলে উপস্থিত হলো। রুমানার পাশের সোফাতেই বসে পড়ে, গা এলিয়ে। ভেজা চুল তারও বোধহয় গোসল করেই নিচে নেমেছে।
চিত্রা অন্দরমহলে এসে রুমানাকে জিজ্ঞেস করল, “আর কিছু লাগবে আপনার?” রুমানা ফিরে তাকাল না। কেবল বলল, “না।” চিত্রা বজ্রর দিকে তাকাল। তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনাকে চা দেই? আপনার পছন্দের বাটার টোস্টও করা হয়েছে।” বজ্র চিত্রার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “দিলে তো উপকারই হয়।” চিত্রা আর কিছু না বলে বাঁকা হেসে সরাসরি রান্নাঘরে চলে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা আর নাস্তা নিয়ে ফিরে এসে বজ্রর সামনে রাখতেই চিত্রার চোখ পড়ল টিভি স্ক্রিনের ওপর।
বজ্র পায়ের ওপর পা তুলে, চায়ের কাপটা হাতে তুলে চুমুক বসিয়ে ভাবলেশহীনভাবে চা পানে মনোযোগ দিল। হঠাৎ চিত্রা টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, “এমা এটা কি পুলিশ ম্যাডাম অনুলিপির কথা বলছে?”
বজ্র টিভির দিকে না তাকিয়েই বলল, “তাই তো দেখছি। মরল কি করে? আহারে পুড়ে যাওয়া লাশ। আইডেন্টিটি ফাই করল কী করে?”
চিত্রা কেঁপে উঠল। পরক্ষণেই বজ্র আফসোসের সঙ্গে বলল, “এখন আর রাশুর খুনির বিচার হবে না।”
চিত্রা বজ্রর দিকে তাকাল। কেবল তাকিয়েই রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু কণ্ঠে কেবল সুধাল, “তাই তো দেখছি।”

দুপুরের কাঁচা ঘুমটা বিরক্তি নিয়েই ভাঙল চিত্রার। চোখ মেলে প্রথমেই টের পেল, ফারাজ নেই। বিছানা ছেড়ে উঠে রুম থেকে বেরিয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়াতেই নিচের দৃশ্যটা চোখে পড়ল। অনেকদিন পর আজ রুমানা বেগমকে হাসতে দেখা যাচ্ছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা-চওড়া এক মেয়ে, দু’জনেই হেসে কথা বলছেন। কার সঙ্গে কথা বলে এত হাসি বের হচ্ছে রুমানার মুখ দিয়ে? কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে চিত্রা নিচে নামল। সামনে যেতেই মেয়েটি একবার চিত্রার দিকে তাকিয়ে রুমানাকে জিজ্ঞেস করল, “এটা কে? চিনলাম না তো।”
রুমানা বেগম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, “ফারাজের বউ।” মেয়েটি হেসে উঠল, “আরে, আমার সতিন দেখছি!” চিত্রার ভ্রু কুঁচকে উঠতেই রুমানা তড়িঘড়ি যোগ করলেন, “মজা করছে। সাগরিকা ছোট থেকেই নিজেকে ফান করে ফারাজের বউ বলত। ওই কথা শুনে ফারাজ রাগ করত।”
সাগরিকা হেসে বলল, “হ্যাঁ, তাই তো। তুমি মাইন্ড করোনি তো? আচ্ছা, ফারাজ কোথায় মামুনি?”

“চিত্রা ভালো জানে,” রুমানা বললেন।
চিত্রার দিকে তাকিয়ে সে মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “হয়তো স্টাডি রুমে।”
“হয়তো?” সাগরিকার ঠোঁটে খোঁচা দেওয়া হাসি। “এত সুন্দর স্বামী পেয়েছো, একটু খোঁজও রাখো না! তোমার জায়গায় আমি থাকলে তো আঁচলে বেঁধে রাখতাম।”
চিত্রা স্থির চোখে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আপনি বাঁধবেন বলেই হয়তো আল্লাহ তায়ালা আমার স্বামীকে আপনার সঙ্গে বাঁধেননি।” এরপর আর কোনো কথা বের হলো না সাগরিকার মুখ থেকে। চিত্রাও দাঁড়াল না। সরাসরি চলে গেল রান্নাঘরের দিকে। রান্নাঘরে গিয়ে মোহনার মুখে যে কথাটা শুনল, তাতে চিত্রার মাথার ভেতর আগুন ধরে গেল। ছোটবেলায় ফারাজ একবার লুঙ্গি আর খৎনার প্রসঙ্গ তুলেছিল সেই সময় নাকি এক মেয়ে তার লুঙ্গি তুলে হাসাহাসি করে পালিয়েছিল। সেই মেয়েটাই এই সাগরিকা। ফরহাদ এলাহীর বন্ধুর মেয়ে।
রাগে চিত্রার বুক কাঁপছে। কী দুঃসাহস! তার স্বামীর ব্যক্তিগত সীমার ভেতর ছোটবেলা থেকেই এমন অনধিকার প্রবেশ? লজ্জা, শালীনতার বালাই নেই!

দীর্ঘ একটা শ্বাস ছেড়ে চিত্রা লেবুর শরবত বানাতে লাগল। উদ্দেশ্য ছিল সাগরিকার জন্য। উপকরণ হিসেবে কী ব্যবহার করল, তা তার মাথার ভেতরের রাগই ভালো জানে। কিন্তু অন্দরমহলে ফিরে এসে দেখল, সাগরিকা সেখানে নেই। রুমানার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানালেন,“ফারাজের সঙ্গে দেখা করতে গেছে।” কথাটা শোনামাত্র চিত্রার মাথা গরম হয়ে উঠল। তবু মুখে শান্তির মুখোশ ধরে রাখল সে। ঝড় আসার আগে যেমন আকাশ নিঃশব্দ থাকে চিত্রাও ঠিক তেমন।

এদিকে সাগরিকা সিঁড়ি বেয়ে স্টাডি রুমের দিকে যাওয়ার আগেই হঠাৎ কেউ পেছন থেকে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। সাগরিকা ঘুরে দেখল রাজনকে। রাজন তাকে নিজের ঘরে এনে দাঁত চেপে বলল, “যে কাজের জন্য তোকে এই বাড়িতে এনেছি, সেটা যেন ঠিকঠাক হয়। স্টাডি রুম খুঁজে বাড়ির দলিল আমার হাতে আনবি।”
“কিন্তু ফারাজ তো খুব চালাক,” সাগরিকা চাপা স্বরে বলল।
“চালাক হোক আর যাই হোক। দরকার হলে ইনজেকশন দিয়ে বেহুঁশ করবি। তবু কাজ চাই।”
“নেশা করিয়ে?”

রাজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “কাকে নেশা করাবি? ওই শালা নিজেই নেশার ব্যবসা করে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সাগরিকা বলল, “আচ্ছা… চেষ্টা করব।”
রাজন চোখ সরু করে বলল, “চেষ্টা না। সফল হতেই হবে।”
রাজন সাগরিকার হাত ছেড়ে দিতেই সে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। আশপাশে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে গায়ের জামার ওপরের দু’টি বোতাম আলগা করল, চুলগুলো আঙুলে ঠিক করে নিয়ে ধীর পায়ে এগোল ফারাজের স্টাডি রুমের দিকে।

এই ফারাজকে পাওয়ার জন্য সে কম কী করেছে? সারাজীবন লোকটা বলে এসেছে—মেয়েমানুষ তার অপছন্দ, ভালোবাসায় সে বিশ্বাস করে না। অথচ আজ দেখো, বিয়ে করে সংসারও করছে। অন্তত ওই মেয়েটিকে না করে তাকেই তো বিয়ে করতে পারত। রূপে-গুণে সে কি কম? বরং সাগরিকার ঝাঁঝালো উপস্থিতি ওই মেয়ের চেয়ে ঢের বেশি। কোনো অনুমতি না নিয়েই সাগরিকা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ফারাজ তখন কাজে ডুবে। ল্যাপটপের পর্দায় তার চোখ স্থির। দরজার শব্দে বিরক্ত হয়ে মুখ না তুলেই সে বলল, “বউয়ের ঘুম ভেঙেছে নাকি?”
সাগরিকা হেসে উঠল, “বউ হতে দিলে আর কখন?”
এবার ফারাজ চোখ তুলে তাকাল। কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। “রুমে ঢোকার আগে অনুমতি নিতে হয় এই সাধারণ জিনিসটা জানা নেই?”

“আহা, এত রাগ করছো কেন? কতদিন পর দেখা। কত বদলে গেছো।”
“হ্যাঁ, এখন সবই বদলে গেছে,” ফারাজ ধারালো গলায় বলল। “হ্যাঁ এখন সবই বড় হয়ে গিয়েছে। রুম থেকে বের না হলে বড় চাপের শিকার হবে তখন সহ্য করতে পারবে না। মেয়ে মানুষ তো আবার ন্যাকা। খারাপ কিছু মুখ দিয়ে বের হয়ে যাবে তখন কেঁদেও কুল পাবা না আম্মা।”
“আম্মা?”
“দেখতে তো সেই আম্মা টাইপেরই।”
কথাটা সাগরিকার গায়ে লাগল। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে কটাক্ষ সে সহ্য করতে পারে না। এক পা এগিয়ে ফারাজের দিকে ঝুঁকতেই ফারাজ সরে দাঁড়াল। ভারসাম্য হারিয়ে সাগরিকা হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে চিত্রা হাতে তার বানানো শরবত নিয়ে ঘরে ঢুকল। মেঝেতে পড়ে থাকা সাগরিকাকে দেখে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “ওমা, উনার কী হয়েছে?”

ফারাজ ঘাড় চুলকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “ওর কথা বলছো? বলছিল মেঝেতে নাকি ময়লা। কী বউ গো তুমি! স্বামীর স্টাডি রুমটার একটু যত্নও নিতে পারো না, আগুন সুন্দরী?” এক মুহূর্ত থেমে সে ব্যঙ্গ করে যোগ করল, “যাই হোক, দেখেছো—এই মেয়েটা আমাকে নিয়ে কত চিন্তিত! যাও তো, ঘর মোছার নেকরাটা এনে ওর হাতে দাও। দেখো না, কত কাজের উৎসাহ! ঘর মুছবে বলেই একেবারে পজিশনে চলে গেছে।”
পড়ে গিয়ে সাগরিকার কোমর ব্যথায় অবশ। উঠতে পারছে না, আবার অপমানটাও সহ্য করা কঠিন। কষ্ট চেপে কিছু বলতে যাবে তার আগেই চিত্রা শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু উনি তো আমাদের অতিথি।”
ফারাজ ঠোঁটে বাঁকা হাসি খেলিয়ে বলল, “গেস্ট না গোস্ট সেটা পরে দেখা যাবে। আগে নেকরাটা দাও। কাজ কি ছোট-বড় হয়? এই ছাগলিকা না মানে সাগরিকা কাজ ভালো জানে। জমেলা বুড়ির জায়গায় ওর চাকরি পাকা। কাছের লোক হলে মাইনে চার আনা বাড়িয়েও দেব।”

আকাশ তখনো পুরোপুরি ফর্সা হয়নি। পূর্ব দিগন্তে হালকা ছাইরঙা আলো ধীরে ধীরে ভাঙছে রাতের আঁধার। নদীর গা ঘেঁষে কুয়াশা নেমে এসেছে। নদীর বুকে সারি সারি নৌকা ভাসছে। কাঠের নৌকার গায়ে লেগে আছে রাতের স্যাঁতসেঁতে শীতলতা। জেলেরা তখন কাজে ব্যস্ত। কেউ কোমর বেঁকিয়ে জাল টানছে, কেউ ধীরে ধীরে গুছিয়ে তুলছে ভেজা ঝাল। ভোরের আলোয় সেই জালগুলো রুপালি রেখার মতো ঝিলমিল করে উঠছে। জেলেদের মুখে কোনো তাড়া নেই। চোখে ঘুমের ছাপ থাকলেও হাতে অভ্যস্ত দক্ষতা। ঠিক তখন দূর থেকে ফজরের আযান ভেসে আসে। সেই ধ্বনি নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়ে, কুয়াশা ছুঁয়ে যায়, জাল টানা হাতে থাকা জেলেদের বুকেও নেমে আসে শান্তি। কেউ এক মুহূর্ত থামে, কেউ চোখ নামিয়ে নেয় জলের দিকে। কাজ আর প্রার্থনা তখন একই স্রোতে বয়ে চলে। জেলেরা আবারও জাল টানতে শুরু করে। ভেজা দড়ি টেনে তুলতেই হঠাৎ ওজনটা অস্বাভাবিক লাগল। মাছের মতো ছটফটানি নেই, ঝালের স্বাভাবিক নরম ভাবও না। জালটা নৌকার কিনারায় উঠতেই এক মুহূর্ত সবাই চুপ করে গেল। জালের ভেতর ধরা পড়েছে একটা মেয়ের নিথর শরীর। চুল এলোমেলো, মুখটা ফ্যাকাশে, চোখ দুটো আধখোলা। জলের দিকে স্থির তাকিয়ে আছে। ভেজা কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। কয়েক ফোঁটা জল ঝরে পড়ছে জাল থেকে, টুপটাপ শব্দে নৌকার তলা কেঁপে উঠছে। একজন জেলে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। আরেকজন দড়ি ছেড়ে পিছিয়ে গেল। কেউ বিড়বিড় করে কলমা পড়ছে, কেউ ভয়ে জাল ছুঁতেও সাহস পাচ্ছে না। নদীর ভোরের শান্ত পরিবেশটা মুহূর্তে ভেঙে গেল। ফজরের আযান তখনো বাতাসে ভাসছে, সেই আযানের সুরের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে জেলেদের ভেতরকার আতঙ্ক। এই মেয়ে কে? কার লাশ এটা?

রাত জেগে ভোরে ঘুমাতে যাওয়াই রাজন এলাহীর চিরচেনা অভ্যাস। অথচ আজ সেই অভ্যাসে ছেদ পড়েছে। সকালবেলায় প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে বারান্দার চেয়ারে বসে সে গায়ে রোদ মেখে একদৃষ্টে কী যেন ভাবছিল। চোখ দুটো স্থির, মুখে চাপা গম্ভীরতা। মনে হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে কোনো অজানা হিসেব কষছে।
ঠিক তখনই নদী এসে জানাল, সাগরিকাকে পাওয়া যাচ্ছে না। খবরটা শুনে রাজন আরো চুপসে গেল। পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী? রাতেই তো কাজটা করার কথা ছিল। সে না করেই কোথায় উধাও হলো? এভাবে কিছু না বলে চলে যাওয়ার মানুষ তো সে নয়। রাজন কয়েকবার ফোন করল। নাম্বারে কল ঢুকছে না। বুকের ভেতর চিন্তার গিঁটটা আরো শক্ত হয়ে উঠল।

আর ভাবনা বাড়িয়ে লাভ নেই। তার কাজ তাকেই করতে হবে। সে গোসল সেরে ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলের দিকে গেল। মাথার ভেতর এখনো অজস্র প্রশ্ন, অথচ উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই। নিচে নেমে একবার রান্নাঘরে উঁকি দিলো, তারপর টেবিলে এসে বসল। ফারাজ, অভ্র, বজ্র আর রোশান আগেই বসে আছে। রাজনকে সকাল সকাল টেবিলে বসতে দেখে ফারাজ চোখ থেকে সানগ্লাসটা নামিয়ে ঠাট্টার সুরে বলল, “দেখ তো, খাওয়ার সময় সানগ্লাস পরে থাকলে আমাকে বেশি হ্যান্ডসাম লাগে, নাকি খুলে?”
অভ্র হেসে বলল, “আরে, আপনি তো এমনিতেই হ্যান্ডসাম। যেভাবেই থাকেন, চমৎকারই লাগেন।”
“যাহ দুষ্ট! এত বড় সত্য মুখে বলতে আছে?” বলেই ফারাজ মৃদু করে অভ্রকে ধাক্কা দিল। এর মধ্যেই চিত্রা আর আয়েশা নাস্তা নিয়ে টেবিলে এলো। হঠাৎ করেই রাজন উঠে দাঁড়াল। আয়েশা চা দিয়ে চলে যেতে যাবে ঠিক তখনই রাজন তাকে ডাকল। “আয়েশা।” আয়েশা থেমে ঘুরে তাকাল। “জ্বী, কিছু লাগবে?”

“না। একটা কথা ছিল।”
“বলুন।”
রাজনের চোখে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। “কাল রাতে তুমি আর তোমার দাদি বস্তা টেনে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলে? তাও এত রাতে?” আয়েশা মুহূর্তে চুপ করে গেল। রাজন তার দিকে তাকিয়ে আছে উত্তরের আশায়। টেবিলে বসে থাকা বাকিরাও কৌতূহলী হয়ে উঠল। অভ্র ভ্রু কুঁচকে আয়েশার দিকে তাকাল এত রাতে বস্তা টানাটানি?
চিত্রাই প্রথম নীরবতা ভাঙল। “শেষে ওই ল্যাপের বস্তা রাতে টেনেছিস? তুই ভাই পারিসও! অভ্র ভাইকে বললেই তো হতো।” এবার আয়েশা কথা বলল। রাজনের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি টেনে বলল,
“আরে…. দাদি ল্যাপ বস্তা করে স্টোররুমে রেখেছিল। মাঝরাতে ফোন করে বললল, ল্যাপ লাগবে শীতে মানছে না। বলতেই না বলতেই ফোনে চেঁচামেচি শুরু। শেষে বাধ্য হয়ে টানাটানি করে তার রুমে দিয়ে আসি।”
অভ্র খানিকটা অপরাধবোধে বলল, “সরি। আমি খুব ক্লান্ত ছিলাম। এত গভীর ঘুমে ছিলাম যে টেরই পাইনি। ডাকতে পারতে।”

“থাক না, হয়ে গেছে তো। এখন জলদি নাস্তা সারো।”
আয়েশা কথাটা হালকা করেই বলল। ঠিক তখনই ফারাজ হাই তুলে বলল, “আরে বাপ, কাল আমারও এমন গাঢ় ঘুম হয়েছে। মনে হচ্ছিল ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেলেছি। এখনো ঝিমুনি কাটছে না। এই বউ, লিকার কড়া করে আরেক কাপ চা দাও তো। ভালো কথা নিউজিল্যান্ডের গাভী ছাগলিকা কই গেলো? পালালো নাকি? ইশরে একটা কাজের বুয়া হাতছাড়া হয়ে গেল।”
চিত্রা ভ্রু তুলে তাকাল। “সে চলে গেছে। আচ্ছা আপনি কী খালি চা-ই খাবেন আমার হাতের? অন্য কিছু নয়?”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, “আমি কখন বলেছি তুমি বিষ আনলে খাব না?” চিত্রা আর কিছু বলল না। লোকটা যে এমনই। সে মৃদু হাসি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। আয়েশাও আর দাঁড়াল না। চিত্রার পেছন পেছন সে-ও এগিয়ে গেল।

ফারাজের কিছুতেই ইতালি যেতে ইচ্ছে করছে না এবার। মনে হচ্ছে সে চলে গেলে এখান থেকেও কিছু একটা তাকে ছেড়ে চলে যাবে। মনটা এমন আকুপাকু করছে কেন? মনে হচ্ছে বুকের কোথাও থেকে এখনি কিছু একটা খালি হয়ে যাচ্ছে। তবে সে বুঝতে পারছে না, চোখের সামনে হারিয়ে যাওয়া জিনিসটাকে সে ধরতে পারছে না। তবে মনটা আজ নিজের অজান্তেই জ্বালাপোড়া করছে, পুড়ছে। বাগানের দোলনায় একা বসল সে। রাত হয়েছে, চিত্রা ঘুমিয়ে পরেছে। তবে তার ঘুম যে আসছে না। কাল সকাল ৬ টার দিকে তার ফ্লাইট। তাকে ভোরের দিকে ঘর থেকে বের হতে হবে। জলদি এয়ারপোর্টে যেতে হবে। তবে রাত হলো এখনো ঘুম আসছে না। বাগানে এসে একটা সিগারেট জ্বালাতেই হঠাৎ একটা গলা শোনা গেল। “তোর সিগারেটটা দে, আমার সিগারেটটা ধরাই।”

আবছা অন্ধকারে ফারাজের বুঝতে বাকি রইল না এটা যে তার রোশান ভাই। আজও শৈশবের কত কথা মনে পড়ে। একদিন ফারাজের পায়ে খেজুর কাটা ঢুকে যায়। রাজনটা ইচ্ছে করে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলেদিয়েছিল। সবাই ছোট্ট মানুষ। ফারাজের পা দিয়ে স্রোতের মতো রক্ত বইছিল। বাগানে থাকা রাজন, জোহান ভয়ে পালায়। তবে রোশান পালায়নি। সে ফারাজকে বুকের সঙ্গে বাজিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। ফারাজ সেই রাতে ব্যথায় ছটফট করেছিল দেখে সারারাত ভাইয়ের সঙ্গে ছিল। নিজের ভাইকে রেখে ফারাজকে নিয়ে মাথা ব্যথা দেখানোর কারনে সেদিন রাতে সুলেমান এলাহী ছেলেকে মেরে দু’টো ব্যাত ভাঙে। তবুও ফারাজের থেকে দূরে সরানো যায়নি রোশানকে। ভাই বলে কথা, রক্তের সম্পর্ক খোদা দিয়েছে,ছিন্ন করার সাধ্য কার? রোশান না থাকলে ফারাজ তার শৈশবের শেষ স্মৃতিগুলোও কবে ব্রেন থেকে মুছে ফেলত।
রোশান সিগারেট ধরাতেই ফারাজ তাকে জিজ্ঞেস করল, “ভাই আপনি এখানে কী করেন?”
রোশান আকাশের নক্ষত্রপানে তাকিয়ে বলল,”ঘুম আসছে নারে ফারাজ।”

“চেষ্টা করেন, ঘুম ধরে যাবে।”
“নারে। তুই ঘুমাতে যাবি এখন?”
“না, আরেকটু থাকি।”
“তাহলে থাক। কতদিন ধরে তোর সঙ্গে কথা বলি না। আজ একটু কথার সময় হবে তোর?”
“কি যে বলেন ভাই আপনিও।”
রোশান একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে বলল,”মাঝে মাঝে মনে হয় কিছুই করতে পারিনি। খোদার নাফরমানি করেই জীবনটা শেষ হয়ে গেল।”

“তাহলে তো আমি আপনার থেকেও বড় নাফরমান।”
“আচ্ছা ফারাজ, আমি যদি চলে যাই আমার কথা তোর মনে পড়বে না?”
“কেন কোথায় যাবেন?”
“তা তো জানি না। তবে মনে হয় দূরে কোথাও চলে যাই। একদম দূরে।”
“আপনার সংসার জীবনের সুখ মাত্র শুরু হলো। এখনই সব ছেড়ে যাবেন বলছেন? এটা ফেয়ার না ভাই।”
রোশান ধোঁয়ার রিংটা বাতাসে ছেড়ে দিয়ে ধীরে বলল,

“ফারাজ, তুই জানিস… মানুষ যখন খুব চুপ হয়ে যায়, তখন সে আসলে অনেক কথা শেষ করে ফেলে।”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “এইসব ফিলোসফি এখন কেন ভাই? রাত বেশি হলে আপনার মাথায় এসব আসে।”
রোশান হালকা হাসল। “হয়তো আসে। আবার হয়তো আর বলার সময় থাকে না বলেই আসে।”
“আপনি ঠিক নেই ভাই। এই কয়দিন ধরে কথা কেমন যেন।”
ফারাজ সিগারেটের ছাই ঝাড়ল, গলার স্বরটা অকারণেই শক্ত হয়ে গেল। রোশান আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল, “আকাশ দেখেছিস? সব তারা একসাথে থাকে, তবু প্রত্যেকটা একা।”
“আপনি আজ আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন।” ফারাজ হেসে ফেলতে চাইল, কিন্তু হাসিটা ঠিক জমল না।
“ভয় পাস না। ভয় পাওয়ার মানুষ তুই না।”

একটু থেমে রোশান বলল, “ফারাজ, যদি কখনো মনে হয় আমি ভুল করেছি… তুই কি আমাকে মাফ করবি?”
ফারাজ এবার সোজা তাকাল। “এমন কী ভুল আপনি করেছেন ভাই, যেটার হিসাব আমাকে দিতে হবে?”
“সব ভুলের নাম থাকে না।”
রোশানের গলায় অদ্ভুত শান্তি। “কিছু ভুল মানুষ বুকের ভেতর নিয়ে ঘোরে, কাউকে দেখায় না।”
“আপনি আমাকে সব সময় আগলে রেখেছেন। এর বাইরে আমি কিছু জানি না।”
ফারাজ একটু থেমে যোগ করল, “আজও জানতাম না আপনি এভাবে ভাবেন।”
রোশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আগলে রাখা… সেটাই তো আমার কাজ ছিল। ভাই বলে কথা। তবে আমি ব্যর্থ কিছু আর করতে পারলাম কই?

“এইসব কথা এখন বলার কী দরকার?” ফারাজের গলায় বিরক্তি, অথচ চোখে অজানা অস্বস্তি।
“ধর, আমি যদি না থাকি…” রোশান কথাটা শেষ করল না।
ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল, “এই লাইনটা এখানেই থামান ভাই। ভালো লাগে না।”
রোশান হালকা হেসে মাথা নেড়েছে। “দেখলি, তুই এখনো ছোটই রয়ে গেছিস। কিছু শব্দ শুনতেই পারিস না।”
“আমি ছোট না, আপনি আজ বেশি বড় হয়ে কথা বলছেন।” কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ ভেসে আসছে। রোশান ধীরে বলল, “ফারাজ, জীবনটা খুব সোজা না। কেউ কেউ দায়িত্ব নিতে নিতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।”

“তাহলে খুঁজে নেন নিজেকে। এখনো সময় আছে।”
“সব জিনিস খোঁজা যায় না।” রোশানের গলায় এবার ক্লান্তি। “কিছু জিনিস থাকলে ভালো, না থাকলেও চলতে হয়।”
ফারাজ অস্বস্তিতে পা দোলাল। “আপনি এমন কথা বলছেন যেন… যেন অনেক দূরে যাচ্ছেন।”
“দূরে তো সবাইকেই যেতে হবে একদিন।” রোশান এবার ফারাজের দিকে তাকাল। “তুই শক্ত থাকিস। তোর শক্ত থাকার দায়টা আমার ছিল, এখন সেটা তোর নিজের।”
“আমি আপনার মতো শক্ত না। দেখেন চেয়ে কত্তো নরম মনের মানুষ আমি।”
ফারাজ ধীরে বলল। “তুই আমার চেয়েও শক্ত। একটু থেমে রোশান যোগ করল, “চিত্রাকে আগলে রাখিস। ও তোকে ভালোবাসে, তুই জানিস।”

ফারাজ মুখ ফিরিয়ে নিল। “এইসব উপদেশ এখন দেবেন না ভাই। আমার বউকে আমিই আগলে রেখে এসেছি, সামনেও রাগব। আপনি আপনারটা নিয়ে ভাবেন।”
“উপদেশ না… দায়িত্ব মনে করিয়ে দিচ্ছি।”
রোশান উঠে দাঁড়াল। “ঘুমোতে যা। তোর ভোরে ফ্লাইট।”
ফারাজও উঠল।

“আপনি?”
“আমি একটু বসি। আজ রাতটা ভালো লাগছে।”
ফারাজ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল,
“ভাই… কাল আমি গেলে ফোন দিয়েন।”
রোশান হালকা হাসল।
“দেখা যাক। তবে তুই ইতালি থেকে জলদি ফিরে আছিস। এবার তুই ফিরলে একসঙ্গে আয়োজন করে বিরিয়ানি খাবো। তোর হাতের রান্না করা। কত্তদিন ধরে খাই না।”
“আমি কি আপনার চাকর নাকি? নিজেরটা নিজে রেঁধে খাইয়েন।”
“তুই রাঁধবি ভাই, এইবার ঠিকই রাঁধবি। বাড়ি ভর্তি মানুষকে আয়োজন করে রেঁধে খাওয়াবি। তুই আসার পর আমার একটা কাজ আছে। একজায়গায় যাবো। আমি বলার আগ পর্যন্ত মোহনাকেও একটু দেখে রাখিস। দায়িত্ব ভেবেই।”
“নিজের একটার জন্যই তো শান্তি পাই না, আরেকজন নিজেরটার দায়িত্ব দিতে আসছে। পারব না। হুহ!”
রোশান কিছু বলল না। আরেকটা সিগারেট বের করে ফারাজকে বলল,”একটা প্রশ্ন করি?”

“এটা বলার আগেই তো একডজন প্রশ্ন করা শেষ আপনার। আর প্রশ্ন করার বাকি রাখলেন কী?”
“তুই আমাকে ভালেবাসিস ভাই?”
“নাউজুবিল্লাহ। আমি ওইটাপের পুরুষ নাকি? আপনাকে কেন ভালোবাসতে যাব? এই ভাই রুমে চলে যান। নিশ্চিত সস্তা নেশা করেছেন। চেয়ে দেখুন আমি আপনার বউ না ভাই! এসব ভালোবাসার কথা রুমের মধ্যেই বলতে হয়। যান রুমে চলে যান।”
“আমিও তোকে একদম ভালোবাসি না।”
“যাক তাহলে আলহামদুলিল্লাহ।”
হঠাৎ দুজনের মধ্যেই নিরবতা। সেই নিরবতার বাঁধ ভেঙে হঠাৎ রোশান বলল, “মনে আজ অশান্তি লাগছে। আজকে আমার সঙ্গে ফজরের নামাজটা পড়বি?”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭১

“পড়লাম।” ফারাজ আর কিছু বলতে গিয়েও বলল না। দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এই যে দু’জন দু’জনকে কত্তো ভালোবাসে। তবে মুখে কেউ প্রকাশ করতে রাজি নয়। পুরুষ মানুষের ভালোবাসা গুলোই বোধ-হয় এমন। একেকজনের প্রতি তাদের ভালোবাসা প্রকাশের ধরন একেক রকম। এরা মুখে ভালোবাসি না বললেও তাদের ভালোবাসা তাদের কর্মে প্রকাশ পায়। তবুও রোশান যদি বুঝত ফারাজ তাকে কতখানি ভালোবাসে। খালি মুখে বললেই কি ভাইকে ভালোবাসা হয়? রোশান কী বুঝে না তার ভাইয়ের না বলাতেই অজস্র ভালোবাসা লুকিয়ে আছে? আর ফারাজ? সেও রোশানের মুখে অস্বীকার করা ভালোবাসা উপলব্ধি করেছে? করতেও পারে, করলেও কী? তারা বুঝবে কিন্তু কাউকে বুঝতে দিবে না৷ একেই না বলে পুরুষ মানুষের জাত!

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৩

1 COMMENT

Comments are closed.