Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৩

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৩
ইশরাত জাহান জেরিন

আজকে বাইরে শৈত্যপ্রবাহ চলছে। ফারাজ ফজরের নামাজ আদায় করে দেরি করেনি। বাইরে ফজর হলেও আলো ফুটেনি। ফারাজ যাওয়ার চিত্রা একা অনেকক্ষণ ধ্যান ধরে অন্দরমহলেই বসে থাকে। শেষে রান্নাঘরে যায়। মোহান, নদী বাকিরা ফারাজকে বিদায় জানাতে এসেছিল। তবে এখন সবাই যার যার রুমে চলে গেছে। চিত্রা হঠাৎ বসা থেকে উঠে রান্নাঘরে গেল। ফ্রিজ থেকে রাতে রাখা আস্ত গরুর কলিজাটা বের করে বরফ ছাড়তে দিলো। কলিজাটা থেকে বরফ ছাড়তেই চিত্রা বিরাট কলিজাটাকে উল্টে পাল্টে দেখল। আজ ফারাজের মতোই তার নাস্তায় কলিজা ভুনা আর ঘিয়ে ভাজা পরোটা খাওয়ার শখ জেগেছে। কলিজার বরফ ছাড়তেই তাতে ছুড়ি চালালো চিত্রা। টুকরো টুকরো করল। ইচ্ছে করে কলিজায় লেগে থাকা রক্ত গুলো হাতে লাগালো। ভালো লাগছে তার। ফারাজ এবার এলে তাকে সে খুব করে বলবে, “আপনি কলিজা ভুনা পছন্দ করেন, আর আমি কলিজা কেটে রান্না করতে। হয়ে গেলাম না পারফ্যাক্ট ফর ইচ আদার? উফস গরুর কলিজা কিন্তু!”

হঠাৎ সদর দরজায় খটখট শব্দ হলো। চিত্রা মুহূর্তেই সেই শব্দ শোনার চেষ্টা করল। বাইরে আলো তখনো একেবারে ক্ষীণ। চিত্রা পুনরায় তার রক্তমাখা হাতের দিকে তাকালো। চোখ বড় বড় করে হাসল একবার। চুলগুলো এলোমেলো। গায়ে তার একটু ঠান্ডা লাগছে না। একেবারে অসহনীয় উষ্ণতা তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। সে হাতের ধারালো ছুড়িটা হাতে নিয়ে সেই বেশেই সদর দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে দিতেই আবিষ্কার করে নেশাগ্রস্ত রাজনকে। তাকে দেখে চিত্রার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। রাজনের তখন হুঁশ জ্ঞান নেই। চিত্রা ছুড়িটা আরো শক্ত করে হাতের মুঠোয় নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আপনি এসেছেন। আপনি কিছু খেয়েছেন?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“না খিদা লাগছে। যাহ কিছু নিয়া আয়। আমি রুমে গেলাম।”
চিত্রা চুপ করে রইল। তারপর হেসে বলল, “আপনি আমার সঙ্গে আসুন। আজকে কলিজা ভুনা করছি।”
রাজন ভাবছে তার সামনে নদী হয়তো। চোখে সব ঝাপসা দেখছে। সে ভেতরে ঢুকে চিত্রার গায়ে হাত দেওয়ার আগেই চিত্রা সরে যায়। রাজনের হাতে আরেকটা মদের বোতল। সে আরেক ঢোক খেয়ে বলল, “তুই রান্না করবি তো আমি রান্না ঘরে যাইয়া কী করুম? রান্নাঘরে তোর সাথে…..”
চিত্রা সেই কথা পুরোটা শেষ হতে দিলো না৷ তার আগেই বলল, “কলিজা ভুনার জন্য তো গরু লাগবে।”
“তো আমারে কী গরু মনে হয় বান্দির বাচ্চা?”

চিত্রা একটা ছোট্ট শ্বাস ছেড়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর আবারও একটা মুচকি হাসি দেয় রাজনের দিকে তাকিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন থেকে নদী তার হাত ধরতেই চিত্রা নদীর দিকে তাকায়৷ চিত্রা তখনো আগের মতোই দাঁড়িয়ে। নদী তাকে বলল, “আজকে মহিষের কলিজা ভুনা কইরো বোন। গরুর কলিজা সবার পেটে সয়ে না। আর ফারাজ সেই, কলিজা খাওয়ার মানুষও নেই।”
চিত্রা পুনরায় মিষ্টি করে একটা হাসি দিয়ে বলল, “ঠিক আছে। তাহলে আমি আর ওইটা রান্না করলাম না। তবে অনুরোধ সময় করে একদিন গরুর কলিজাটা রান্না করে ল্যাটা চুকিয়ে দিয়েন। আমি আপনার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।”
নদী কিছু বলল না। রাজনকে সামলে রুমের দিকে পা বাড়ালো। চিত্রা তখনোই ঠাই দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি এখনো আঁটকে আছে রাজন আর নদীর দিকেই। ঠোঁটের কোণে সেই মুচকি হাসি।

ভোরে ফারাজ এলাহী বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর থেকেই এলাহী বাড়িটা কেমন যেন দমবন্ধকর পরিবেশে ডুবে গেল। চিত্রা আর নাস্তা করেনি। কলিজা ভুনা আর পরোটাও তৈরি করেনি। সারাদিন রুমের ভেতরেই পড়ে ছিল। এই বাড়ি ফারাজ এলাহী ছাড়া নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যায়, এটা সবাই জানে, কেউ স্বীকার করে না। দুপুরে খেয়ে রাজন নিজের রুম থেকে বের হয়। ভোরে সেই যে নেশা করে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়েছিল, আর একটু আগে উঠল। উঠে খেয়ে, তৈরি হয়েছে। নেশা করার পর তার কিছু মনে থাকে না। তবে এইটুকু মনে আছে রোজকার মতো আজকেও নদীই তাকে রুমে নিয়ে গেছে। বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।

রাজন কালো শার্ট, সাদা লুঙ্গি, চোখের নিচে হালকা সুরমা। আজও তাকে অস্বাভাবিক সুদর্শন লাগছে। অথচ এই সৌন্দর্যের ভেতরে বিষ জমে আছে। বের হয়েই একবার চিত্রার রুমের দিকে তাকায় সে। ঠিক তখনই কারো ছায়া দরজার ভেতরে মিলিয়ে যায়। বজ্র? হ্যাঁ, বজ্রই তো। রাজনের ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। স্বামী বেরোতেই রুমে পরপুরুষের যাতায়াত? তারপর আবার নীতি, ধর্ম আর পবিত্রতার বয়ান! এই লুকোচুরিই রাজনের সবচেয়ে অপছন্দ। পাপ করলে প্রকাশ্যে করো, আর যদি হাজি সাজতে চাও তাহলে হাজির মতোই নিখুঁত থাকার ভান করো। এই আধাখ্যাঁচড়া ভণ্ডামি তার সহ্য হয় না।

নিচে নামতেই মুখোমুখি হয়ে যায় মোহনার সঙ্গে। এক মুহূর্ত তাকিয়েই রাজন চোখ সরিয়ে নেয়। এই বাড়িতে প্রথম বউ হয়ে আসার দিন থেকেই মোহনার রূপে বাপ-চাচা, আত্মীয়-স্বজন সবাই উন্মাদ হয়ে উঠেছিল। রাজনের মনে পড়ে যায় রোশান যদি পাগলের মতো ভালো না বাসত, তাহলে এতদিনে এই শরীরটা মাটির নিচে পোকাদের খাবার হতো। এই ভাবনাটুকুই রাজনকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আর দেরি না করে তাড়াহুড়ো করে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

সোহানের মন আজ বেশ ফুরফুরে। শুক্রবার। বেঁধে পাড়ায় আজ বিয়ে। নিজের বোনের মতো করে মানুষ করা আমেনাকে ভালো জায়গায় বিয়ে দিতে পারছে এই গর্বটাই আজ তার মুখভরা হাসির কারণ। মানুষ খাওয়ানো, আয়োজন সবকিছু নিজের হাতে করতে পেরে সে সত্যিই খুশি। আজ সে নিজের সব কাজ বন্ধ রেখেছে। তাছাড়া ফারাজও শহর ছেড়ে গেছে। বড় বাধাটাও সরে গেছে পথ থেকে।
সোহানের মাথার ভেতর হিসেব কষা চলছে। আজ রাতেই চিত্রাকে তুলে আনতে হবে। তারপর একবার বিয়েটা হয়ে গেলেই সব ঠিক। আপাতত কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সব ব্যবস্থা আগেই গুছিয়ে রাখা হয়েছে।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

চিত্রা তখন রুমে বসে বই পড়ছিল। বিকেলের আলোটা জানালার ফাঁক গলে পাতায় পড়ছিল। হঠাৎ দরজা ঠেলে মোহনা প্রায় দৌড়েই ঢুকে পড়ে। চোখ-মুখে অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। চিত্রা অবাক হয়ে তাকায়। “কী হলো ভাবী?”
মোহনা কথা না বলে হাতে ধরা প্রেগন্যান্স রিপোর্টটা এগিয়ে দেয়। চিত্রার চোখ দুটো পড়তেই ভিজে ওঠে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে মোহনাকে জড়িয়ে ধরে।
“কংগ্র্যাচুলেশন ভাবী। আপনার খুশিতে কারো নজর না লাগুক। এটা আপনার সুখের দিন। অনেক কষ্টে পাওয়া সুখ—আগলে রাখবেন। ভাইকে জানিয়েছিলেন? তার প্রতিক্রিয়া কী?”
মোহনার হাসিটা একটু কেমন যেন থেমে যায়। “না… এখনো জানাইনি। কেমন একটা লাগছে।”
“আরে ভাবী! আগে বাচ্চার বাবাকেই জানান।”
“আরেকবার পরীক্ষা করে দেখব ভাবছি। ডাক্তার তো বলেছিল আর কোনো সুযোগ নেই।”

চিত্রা দৃঢ় গলায় বলে, “আল্লাহ চাইলে সব সম্ভব। আপনি এখনই রোশান ভাইকে ফোন দিন। আমি বজ্র ভাইকে বলি মিষ্টি আনতে। এত সুন্দর খবর মিষ্টি ছাড়া হয় নাকি? মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ তো মাস্ট। ফারাজ তো ইতালি যেতে এখনো সময় লাগবে ,নাহলে তাকেও এখনই জানাতাম। লোকটার বাচ্চার কী যে শখ! এই খবর শুনলে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাবে। যান, আপনি ভাইকে ফোন করুন। জলদি বাড়ি আসতে বলেন।”
মোহনা আর দেরি করে না। নিজের রুমে গিয়ে রোশানকে কল করতেই সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সব কাজ ফেলে বাড়ির পথে রওনা হয়। আসার সময় ফোনেই বলে,”আজ তুমি একটু সাজবে? একটা সুন্দর লাল শাড়িও পরবে। আমরা আজকের দিনটা উদযাপন করব। বাইরে সময় কাটাবো। তুমি তৈরি থেকো, আমি নিতে আসব। আর শুনো—লাল শাড়িটাই পরবে। রহু শুধু তোমায় লাল শাড়িতে দেখার জন্য কাতরাচ্ছে।”

“কেন?”
রোশান হেসে বলে, কারণ,
“আত্মার সাথে তোর ওই পিরিতি
দিওয়ানি কইও সজনী
নিতে আইলে নাইয়র যাইবা নি…”
“আপনার জন্য মরতেও পারব।” মোহনা মুচকি হেসে ফোন রেখে দেয়। তারপর দৌড়ে বারান্দায় চলে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“হায় খোদা… আমি তো পাপী। তবু তুমি আমাকে সব দিলে। পাগলের মতো ভালোবাসার স্বামী দিলে, কোল আলো করে নতুন মেহমান দিলে। শুধু একটাই প্রার্থনা—এই সুখটা কেড়ে নিও না। ওই কষ্ট আমার সহ্য হবে না খোদা। দুনিয়ার জমিনে আমাকে ওমন কঠিন আজাব দিও না। কখনোই দিও না।”
সেদিন মোহনা সাজে। একেবারে বিয়ের দিনের লাল শাড়িটা পরে, বউয়ের মতো করেই। সাজে কোনো কমতি রাখে না। রোশান বাড়ি এসে মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করে। গোসল সেরে আসরের নামাজ আদায় করে। তারপর মোহনাকে নিয়ে বের হওয়ার আগে দরজার সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারে না। শুধু তাকিয়ে থাকে। মোহনা হাসতে হাসতে বলে,

“এভাবে তাকিয়ে কী দেখছ?”
রোশান ধীরে বলে, “মানুষ মারা গেলে নাকি সব স্মৃতি ভুলে যায়। আমি চাই একটা স্মৃতি যেন কোনোদিন না ভুলি।”
“কোনটা?”
“আমার জীবনে তোমার আগমনের মুহূর্ত। আজ ঠিক সেদিনের মতোই অনুভূতি হচ্ছে। বিশ্বাস করো।” মোহনা মুচকি হাসল তবে জবাব ছাড়া, শব্দ ছাড়া। কারণ কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে শব্দের প্রয়োজন হয়না।
বিকেলের নরম আলোয় তারা বের হয়। গন্তব্য—নিকলী। আকাশে মেঘ জমছিল না, তবুও রোশানের বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা অস্থিরতা। রোশান তার পুরোনো বাইকটা নিয়ে বের হয় আজকে। যখন রোশান পাপী ছিল না তখন এই বাইক ছিল তার সঙ্গী। বাইকে মোহনাকে পেছনে বসিয়ে সে ধীরে বাইক চালাচ্ছে। আজ তাড়াহুড়ো নেই, আজ প্রতিটা মুহূর্ত গুনে গুনে বাঁচতে চাইছে। মোহনা তার পিঠে কপাল ঠেকিয়ে বসে আছে। “আজ তুমি চুপচাপ কেন?”

রোশান হালকা হাসল। “শুনছি।”
“কী?”
“তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ।”
মোহনা হেসে বলল, “এমন কথা বলো কেন? ভয় লাগে।”
“ভয় পেও না। ভয় লাগলে হাতটা শক্ত করে ধরো।”
মোহনা তার কোমরের চারপাশে হাত জড়িয়ে ধরল আরও শক্ত করে। লাল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছিল। নিকলীর কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নামল। পানির বুক জুড়ে সূর্যের শেষ আলো ছড়িয়ে আছে। লাল, কমলা আর সোনালি রঙের মিশেল। বাইক থামিয়ে রোশান বলল,“এই জায়গাটায় বসি।”
দু’জন নদীর ধারে বসল। আশেপাশে তেমন কেউ নেই। দূরে কয়েকটা নৌকা, মাঝিদের ক্ষীণ ডাক, আর পানির গায়ে বাতাসের মৃদু শব্দ। মোহনা নীরবতা ভেঙে বলল,
“রোশান, আমাদের বাচ্চাটা কেমন হবে?” রোশান একটু থমকে যায়। তারপর বলে, “তোমার মতো জেদি হবে। আর আমার মতো একগুঁয়ে।”

“ছেলে না মেয়ে?”
“মেয়ে হলে… লাল শাড়িতে তোমার মতোই লাগবে।”
মোহনার চোখে জল চলে আসে। “আমি খুব ভয় পাচ্ছি।”
“কেন?”
“এত সুখ একসাথে পেলে… আল্লাহ আবার কেড়ে নেন।” রোশান তার হাত ধরে। “যা পাই, তা আল্লাহর আমানত। কেড়ে নিলেও অভিযোগ নেই। শুধু চাই তুমি যেন শক্ত থাকো।”
“এই কথাগুলো কেন বলছ?”
“না, এমনিই।” সে উঠে দাঁড়ায়। চারপাশ একবার ভালো করে দেখে নেয়। নিকলীর জল, আকাশ, আর তার মোহনা সবই যেন সুন্দর। রোশান পকেট থেকে ফোন বের করে মোহনাকে ছবি তুলতে বলে। “আজকের দিনটা রেখে দিই।”
“একটাই?”
“একটাই যথেষ্ট।”

ছবি তোলার পর রোশান মোহনাকে নিজের বুকে টেনে নেয়। খুব নিচু গলায় বলে, “শোনো… যদি কখনো মনে হয় আমি দূরে চলে যাচ্ছি—জেনো, আমি তোমার মধ্যেই আছি।” মোহনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাশের মসজিদের মাইকিং কানে এসে লাগে। কেউ একজন মারা গেছে। অল্প সময়ের মধ্যেই জানাজা হবে। শব্দটা নিকলীর বাতাসে ভেসে ভেসে এসে বুকের ভেতর কোথাও কাঁপন তোলে। কিছুক্ষণ পর নদীর পাড়ে এসে বসে এক মধ্যবয়স্কা নারী। চোখের জল মুছছে বারবার, কিন্তু থামছে না। মোহনা বিষয়টা লক্ষ করে। অকারণে বুকটা ভারী হয়ে আসে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে রোশানের দিকে তাকিয়ে বলে, “গিয়ে দেখব? অনেকক্ষণ ধরে দেখছি উনি কাঁদছেন।”

রোশান মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। মোহনা এগিয়ে গিয়ে ধীরে জিজ্ঞেস করতেই নারীটি ভাঙা গলায় জানায়। মাইকে যে শোক সংবাদ দেওয়া হয়েছে, সেটা তার মায়ের। এই দুনিয়ায় মা ছাড়া তার আর কেউ নেই। কিন্তু অভাব বড় নিষ্ঠুর৷ কাফনের টাকার জন্য আটকে আছে লাশের গোসল। কথাটা শোনামাত্র রোশান আর এক মুহূর্ত দেরি করে না। পকেট থেকে কাফনের টাকা, সঙ্গে বাড়তি কিছু তুলে দেয় নারীর হাতে। নারীটি কাঁপা হাতে টাকাটা নেয়। চোখ তুলে শুধু বলে, “আল্লাহ তোমাদের ভালো রাখুক বাবা।” রোশানের বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন যেন শান্তি নামে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি। যেন কোনো ভার একটু হালকা হলো। ফিরে এসে মোহনার পাশে বসতেই সে চুপচাপ রোশানের হাত ধরে। “ভালো করেছো,” ফিসফিস করে বলে। রোশান নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। “জানো মোহনা, মানুষ ভাবে বড় বড় কাজ করলেই কিছু হয়। অথচ এই ছোট্ট জিনিসগুলো… কাউকে একটু সহজ করে দেওয়া এইগুলোই আসলে বাঁচিয়ে রাখে।”

“তুমি সবসময় এমন কেন?”
“কেমন?”
“মরে যাওয়ার মতো কথা বলো, আবার কাউকে বাঁচানোর মতো কাজ করো।”
রোশান হালকা হাসে। “কারণ জীবনটা খুব অদ্ভুত। এখানে কাউকে কিছু দিতে পারলেই মনে হয়… আমার আসাটা বৃথা যায়নি।” মোহনার চোখ ভিজে আসে। “তুমি এমন কথা বললে ভয় লাগে।”
“ভয় পেও না,” রোশান তার হাতটা শক্ত করে ধরে, “আমি তোমার আছি।”
“তুমি থাকবে তো?”
“থাকব… অন্য কোনোভাবে হলেও।”

“এই কথা বন্ধ করো,” মোহনা কাঁপা গলায় বলে, “আমাদের সামনে এত কিছু আছে। বাচ্চা আছে। সংসার আছে।” রোশান মুচকি হাসে। “এই জন্যই তো এত কথা বলছি। যাতে কিছু অপূর্ণ না থাকে।”
“তুমি কি জানো,” মোহনা চোখ মুছে বলে, “আমি কখনো কিছু চাইনি। আজ প্রথমবার চাইছি—তুমি শুধু আমার পাশে থেকো।” রোশানের চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। “এই চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
রোশান উঠে পড়ল। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরতে হবে তাদেরকে। দু’জনে উঠে পড়ল। হঠাৎ মোহনা বলল,” দেখো তো আমার চোখে কী?”

রোশান কাছে আসতেই মোহনা হঠাৎ তার নাকের ডগায় আলতো করে চুমু খেল। রোশান মুচকি হেসে উঠল। এই মেয়েটা না কী অদ্ভুত সব কাজ করে, বারবার নতুন করে তাকে প্রেমে ফেলতে জানে। সে মোহনাকে ঘুরিয়ে নিজের জায়গায় এনে শক্ত করে বুকে টেনে নেয়। ঠিক তখনই বিকট একটা শব্দ। মোহনা প্রথমে বুঝতেই পারল না কী হলো। বাজি? টায়ার ফাটা? কিন্তু পরমুহূর্তেই রোশানের শরীরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি। বুকের ওপর ভরটা হঠাৎ হালকা হয়ে এলো। “রোশান…?” মোহনার গলা কাঁপল।

রোশানের মুখ মুহূর্তে সাদা হয়ে গেল। চোখ দুটো বিস্ফারিত, নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে। বুকের ভেতর একটা তীব্র জ্বালা, অসহ্য চাপ হচ্ছে। সে পেছনে এক পা হড়কে পড়ে যায়। “আহ!” শব্দ বের হয়, কিন্তু তা আর্তনাদ নয়। এক ভাঙা শ্বাস। মোহনা এখনও পুরোটা বুঝে উঠতে পারছে না। “কী হয়েছে? কথা বলো!” তারপর সে অনুভব করল রোশানের পিঠ থেকে বের হওয়া উষ্ণ তরলকে। মোহনার চিৎকার নিকলীর বাতাস ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে। রোশানকে আঁকড়ে ধরে। তার শরীর ভারী হয়ে আসছে, আর সে বুঝতে পারছে প্রতি মুহূর্তেই সব শেষ হতে যাচ্ছে। “রক্ত… এত রক্ত কেন?” মোহনা দুই হাত দিয়ে ক্ষত চেপে ধরার চেষ্টা করে। লাল শাড়ি মুহূর্তেই আরও লাল হয়ে ওঠে।

রোশানের চোখ ফাঁকা হয়ে গেছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন ছুরি হয়ে হৃৎপিণ্ড কেটে যাচ্ছে। সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু চোখের জল আর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। তার হাতগুলো শক্ত করে মোহনাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু ব্যথা সব শক্তি খেয়ে নিচ্ছে। এই মুহূর্তে তার সব আশা, স্বপ্ন, ভালোবাসা সবই একসাথে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মোহনা প্রথমে শুধু রক্ত দেখে হতবাক। তারপর বুঝতে পারে তার সামনে তার জীবন, তার পৃথিবী, সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মোহনা কাঁদতে কাঁদতে রোশানের মুখ, চোখ, বুক আঁকড়ে ধরে বলে, “না… তুমি এইভাবে যেতে পারবে না… তুমি আমাকে ছাড়তে পারবে না… এই রোশান, এই চোখ বন্ধ করবে না বলে দিচ্ছি। খারাপ হয়ে যাবে। আমাদের এখনো বাচ্চার নাম রাখা হয়নি।”

প্রতিটি শব্দে তার অন্তরের ব্যথা রক্তের মতো বের হয়ে আসে। সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে কান্না করছে, থামছে না। প্রতিটি চিৎকারে রোশানের স্মৃতি, প্রেম, প্রতিশ্রুতি সবই জীবন্ত হয়ে ওঠে। রোশানের চোখ কিছুক্ষণ উন্মুক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। মোহনার চোখে চিরন্তন যন্ত্রণা তৈরি হয়। সে শরীরটা আঁকড়ে ধরে বসে থাকে। মোহনার কান্না থামে না। একপাশে মৃত্যু, আর একপাশে অব্যক্ত ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা এত গভীর যে, নিস্তব্ধতা আর রক্তের মাঝেও তার হৃদয়কে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, পুরো জগৎকে থমকে দিচ্ছে।

আসপাশের মানুষজন দৌড়ে আসে, চিৎকার করে, সাহায্যের চেষ্টা করে। কিন্তু রোশানের হাতে মুহূর্তেরও বেশি সময় নেই। তার সাদা পাঞ্জাবি রক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। গুলির আঘাত কলিজায় লেগেছে ঠিক সেখানে, যা হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি অসহ্য যন্ত্রণা জাগাচ্ছে। প্রতিটি শ্বাস কাঁটাতারে ছেঁড়া হচ্ছে। সে শ্বাস নিতে চায়, কিন্তু কষ্টের তীব্রতায় শরীরটা অচল হয়ে পড়ছে। রোশান বুঝতে পারে সময় কম, কিন্তু তাকে কিছু বলতে হবে। প্রতিটি নিঃশ্বাস একটা ঝাঁকুনি, প্রতিটি শব্দে তার কষ্টের আঘাত। তবুও কিছু কথা বলে না গেলেই নয়। সে তার হাত ধীরে ধীরে মোহনার গাল পর্যন্ত বাড়ায়।

সেই হাতটা স্পর্শ করলে রক্তের উষ্ণতা মোহনার গাল ছোঁয়। রোশানের হাতটা কেবল তার নিজের যন্ত্রণার কাছে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মোহনাকে আলতো করে বাঁচানোর, আশ্বাস দেওয়ার, আর বিদায়ের একমাত্ৰ সংযোগ। রোশানের চোখগুলো অদৃশ্য দৃষ্টি খুঁজছে। মোহনার চোখে, মুখে, আঙুলে। সে জানে, সময় ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু নিজের শেষ শক্তি দিয়ে মোহনাকে জড়িয়ে ধরে, হাত রাখে গালে। রক্ত গড়িয়ে নদীর মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে, তার পাঞ্জাবির সাদা কাপড় লাল হয়ে উঠেছে। তার শরীর কেঁপে উঠছে, হৃদয় কাঁপছে। মোহনা তখনও তার হাতের স্পর্শে স্থির, চোখ ভিজে, চিৎকার থেমে গেছে। রোশান কষ্টের তীব্রতায় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু কলিজার মধ্যে বুলেটের আঘাত, শ্বাসকষ্ট, এবং অদৃশ্য যন্ত্রণার চাপ সবই তাকে ভেঙে দিচ্ছে। মানুষজনকে রোশান তার গায়ে স্পর্শ করতে নিষেধ করে। এখন সময় নেই। এই শেষ সময়টাতেও যদি বাঁচার বৃথা চেষ্টা তাহলে মোহনার সঙ্গে শেষবারের তো তার আর কথা হবে না।

“আল্লাহ যদি আবার মিলনের অনুমতি দেন, আমি তোমার হাত ধরেই জান্নাতের পথে হাঁটব। এই দুনিয়ায় যতটা হারিয়ে গেছে, প্রতিটা মুহূর্ত আমি সেখানে ফিরিয়ে আনব। আখিরাতে যদি হাজার মুখের ভিড় থাকে, আমি রোশান এলাহী সেই মুখের ভীড় ঠেলে তোমার চোখের প্রেমে পড়ব ঠিক প্রথম দিনের মতোই।”
শ্বাস কষ্টটা বাড়ল আরো। তবুও থামল না রোশান। ভাঙা গলায় বলল, “পৃথিবীর সব সীমা পার হয়ে, আমাদের ভালোবাসা আখিরাতে মুক্ত হবে। মনে রেখো এখানে শেষ হয়েছে কেবল দেহের ছোঁয়া, কিন্তু আত্মার মিলন হবে চিরন্তন।”

রোশানের চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে। আশপাশের কিছু লোক গাড়ি ঢাকতে গিয়েছে। তারা এসেই রোশানকে গাড়িতে উঠাবে। ততক্ষণে চোখ বন্ধ করা যাবে না রোশানের। সে এত স্বার্থপর কেমন করে হয়ে গেল? মোহনাকে একা ফেলে যাওয়ার মতো দুঃসাহস তার? এখন তো সব মাত্র শুরু হলো। কেন রোশান তার জীবনে আসার পর পাঁচটা বছর ওইভাবে নষ্ট করেছিল সে? আরেকটু সময় কী তারা একসঙ্গে থাকলে খুব ক্ষতি হতো? রোশানের শরীর আবার ঝাঁকুনি দিলো। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছে। লোক গুলো আসছে না কেন? তার রোশান যে চলে যাচ্ছে। ওরা গাড়ি আনতে এতো দেরি কেন করছে? “গাড়িতে উঠিয়ে লাভ নেই মোহনা। খাটিয়া আমার অপেক্ষায়,আমার আসল বাড়ি মেহমান পাঠিয়েছে আমায় বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য।”

গাড়ি চলে এলো। ধরাধরি করে সবাই রোশানকে গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। রোশানের মাথাটা মোহনার কোলে। সে বারবার বলছে, “কিছু হবে না তোমার। চোখটা খোলা রাখো। এই তো ঠিক হয়ে যাবে তুমি। হাসপাতালে যাচ্ছি আমরা।” রোশান মোহনার কোলে মাথাটা আরোও গুঁজে দিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করল,বলল, “মৃত্যু কেবল সময়ের দেয়াল। ভালোবাসা সেই দেয়াল ডিঙিয়ে আবার ফিরে আসে। আর এই ভালোবাসা আল্লাহর আমানত। তিনি নেন না, শুধু অন্য জগতে তুলে রাখেন। যারা দুনিয়ায় আলাদা হলো, তারা আখিরাতে আর আলাদা থাকবে না। তখন আর ভয় থাকবে না, থাকবে না হারানোর আশঙ্কা। তাই বলছি কী মৃত্যু বিদায় নয়, ভালোবাসার আরেকটি ঠিকানা মাত্র।” একটু থেমে যোগ করল, “আমার চুলের গড়ায় ব্যথা হচ্ছে। চুলে একটু হাত বুলিয়ে দিবে?” মোহনা তাই করল। বুকফাটা আর্তনাদ দিয়ে সে রোশানের চুলে হাত বুলিয়ে দিলো। রোশান পুনরায় বলল, “একটু শক্ত করে টেনে দাও। খুব ব্যথা করছে।”

মোহনার সেই কথা শুনে চোখের পানি যেন দ্বিগুন হয়ে গেল। তার হাত কাঁপছে। রোশান চোখ বুঝল, “আমার ঘুম ধরছে মোহনা। তুমি কোল থেকে সরিও না আমায়। আমি একটু ঘুম দেই।” তুমি কপালটা একটু কাছে আনো তো। মোহনা তাই করল। রোশান কপালে একটা চুমু দিতেই মুখের কোনে হাসি ফুটল। সে মোহনার হাতটা শক্ত করে ধরে চোখটা বন্ধ করল। মোহনা এতবার বলেও খুলতে পারল না চোখ দুটো। তবে চোখটা বন্ধ করে হাতটা ছাড়ার আগে তার প্রিয় স্বামী রাজন এলাহী তাকে আজীবনের মৃত্যু দন্ড দিয়ে বলে গেল, “আমাদের আবার দেখা হবে চোখে চোখ রেখে, ব্যথাহীন, রক্তহীন, শুধু নিখাদ ভালোবাসা নিয়ে। পরের জন্মে তুমি আমার হয়ে জন্ম নিও, আমি কেবল তোমার স্বামী হয়ে জন্মাতে চাই। এলাহী বাড়ির পাপিষ্ঠ পুত্র, হেরে যাওয়া ভাই, হেরে যাওয়া নিকৃষ্ট পিতা, জঘন্য স্বামী হয়ে নয়। ভালোবাসি মোহনা,আমার সন্তানকে জানিও হতভাগা বাবা তাকেও অসম্ভব ভালোবাসে।”
হাতটা ছিটকে আলাদা হয়ে গেল। নিভু চলতে থাকা হৃদয়টা তার আসল ঠিকানায় চলে গেল। জীবন্ত মোহনাকে বাঁচিয়ে রেখেও মেরে দিয়ে তার স্বার্থরপর পুরুষ চলে গেল। “আচ্ছা একটা সুখ আসে কী এত দুঃখ দিবে বলে?”

তখন ইতালিতে কেবল দুপুর দুইটা বাজে। ফারাজ একটু আগেই ইতালি এসে পৌঁছালো। সেখানে গিয়েই প্রাণ খুলে একটা নিশ্বাস নিলো। এটা তার শহর। তার শৈশব, কৈশোর, যৌবন সব কেটেছে এই ইতালির মাটিতেই। বাংলার পর তার সবচেয়ে আপন লাগে এই দেশের মাতৃভাষা। পালের্মোর সিসিলির যেদিকে চোখ যায় সবই ফারাজের। এটাই তো একজন স্মাগলার, একজন ক্ষমতাবান শাসকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ফারাজের বিরাট প্রাসাদসম বাড়ি। যার নাম “ইনফার্নো।” বাড়ির চারপাশে সারিবদ্ধভাবে বিশাল জমকানো উদ্যান,ল্যান্ডস্কেপ, আর রঙিন ফুলে ভরা বাগান। তবে এই সৌন্দর্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা জাল। হরেক রকম সিকিউরিটি ক্যামেরা, অটোমেটেড গেট, এবং ঘনপ্রাচীরের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শক্তিশালী গার্ডরা রাত-দিন বাড়িটিকে পাহারা দেয়। বাড়ির গঠন একরাশ বিলাসিতা ও অভিজাততার মিশ্রণ। মার্বেল মেঝে, সুবিশাল চেস্টারফিল্ড সোফা, এবং সোনার কাঁটাসহ বিভিন্ন আলংকারিক বস্তু ঘরের অভ্যন্তরকে রাজকীয় মনে করায়। দেয়ালে ঝলমলে চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য আর প্রাচীন ভাস্কর্যের সংমিশ্রণ।

দুপুরের রোদে প্রাসাদের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো পড়লে, তার প্রতিফলন একদিকে সৌন্দর্যকে আরও জ্বলজ্বল করে তুলে। বাড়ির পিছনের অংশে ফারাজের প্রাইভেট পুল ও হেলিপ্যাড আছে। যেখানে ছায়াময় গতিতে গাড়ি ও হেলিকপ্টার ঢোকে।

ফারাজের এই বেডরুম পুরো এলাহী বাড়ির দোতলার সমান হবে। কী নেই এখানে? সে রুমে ঢুকতেই দু’জন মেইড ভেতরে ঢুকে। ওদিকে কালো সুট পড়া একজন লোক ফারাজের ব্লেজার খুলতে তাকে সাহায্য করছে। মেয়ে মেইড দুটোর মধ্যে একজন নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,” ইল বাঞ্জ’ও এ প্রো’ন্তো পের লেই।” অর্থাৎ ফারাজ এলাহী জন্য গোসলের সকল ব্যবস্থা করা শেষ। ফারাজ মেয়েটির দিকে তাকালোও না। কেবল বলল, “ভা বেনে। ভাই আদেস’সো, ভোল্লিও স্তারে দা সোলো।” ফারাজ মেয়েটিকে এখন চলে যেতে বলল। সে একা থাকতে চায় রুমে।
ফারাজ বাথটবে নামতেই চিত্রার কথা মাথায় এলো। কবে এই বিরাট বাথটবে চিত্রার সঙ্গে রোমান্স করবে সে? ফারাজের গোসলখানায় যে আসলেই এসি লাগানো এটা দেখে কী চিত্রা হাসবে? নাকি বুঝে নিবে তার স্বামীর গরম সহ্য হয়না বলেই এসব করা? ফারাজের সমুদ্র পছন্দ তাই বাথটবে সমুদ্রের থ্রিডি করা। সেখানে বসলেই সামুদ্রিক একটা ফিল আসে। খালি একটা নারকেল গাছের কমতি! ছ্যাহ!

ফারাজ তোয়ালে পড়ে ওয়াশরুমের দরজায় নক করতেই বাইরে থেকে দরজার হাতল টেনে খুলে দেয় একজন লোক। সে এতক্ষণ কেবল এই একটা কাজের জন্যই দরজার সামনে সটাং হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে আসতেই ফারাজ দেখতে পায় তার জামা কাপড় সব রাখা আছে। এমন কী একগাদা ঘড়ির কালেকশন, আড সানগ্লাস রাখা হয়েছে। ফারাজ একটা চয়েজ করবে বলে। ফারাজ সময় নষ্ট না করে তাই করল। জলদি রেডি হয়ে গ্রাউন্ড ফ্লোরে চলে গেল। রোজের সঙ্গে যে এখনো দেখা হয়নি। রোজকে যেই লোক গুলি করেছে তাকে পাওয়া গিয়েছে। প্রথমে খুনির সঙ্গে দেখা করবে তারপর তার শাস্তি নির্ধারণ করবে এরপর রোজের সঙ্গে দেখা করতে যাবে।

ফারাজ নিচে এসে তার রাজকীয় হায়নার মতো দেখতে আসনে বসল। সে নিজেকে সিংহ নয় বরং হায়নার সঙ্গে তুলনা করে। কারণ হায়নার থেকে হিংস্র আর কিছুই হয়না। ফারাজ সেখানে বসতেই দু’জন লোক টেনে খুনিকে হিঁচড়ে ফারাজের সামনে ফেলতেই ফারাজ তার চেহেরার দিকে তাকালো। বাহ এটারে এমন মারা হয়েছে, বাঁচার চান্স আছে? ফারাজ অভ্রর দিকে তাকাতেই অভ্র বলল, “ভাই আমি কিছু করিনি। আমাদের লোকেদের কাজ।”
“যারা করেছে তাদের কাজ থেকে বের হতে বল। চোখের সামনে থেকে যেন চলে যায়।”
মুহূর্তেই অভ্র সকলের দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বলল,”কি আ পিক্কিয়াতো কুয়েস্তু’ওমো ইন কুয়েস্তো মো’দো, সে নে ভাদা সু’বিতো দা কুই। নন ভোল্লিও মাই পিউ রিভেদেরে কুয়েল্লে ফাচ্চে ইনু’তিলি।”

যারা এমন অবস্থা করেছে তারা জলদি সেখান থেকে কেটে পড়ল। ফারাজ এখন ভালো হয়ে গিয়েছে। নইলে এই বাড়ির বাইরে যাওয়ার আগেই বুলেট ঢুকত সবকটার আগে। ফারাজ আহত লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল, “সোত্তো ওর্ডিনে দি কি আই স্পারাতো?” ফারাজ লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, সে কার আদেশে রোজের গায়ে গুলি চালিয়েছে। তবে লোকটা কিছু বলল না। পরপর দুইবার একই প্রশ্ন তবে উত্তর নেই। শেষে হাতের আঙুল গুলো চেপে ধরল ফারাজ। ছুড়িটা হাতে নিতেই বলল,”রিসপোন্দেরাই, ও তি তাল্লিও উন দিতো?” লোকটা ঘাবড়ে গেলেও জবাব দিলো না। তাতে রাগ হলো ফারাজের। রাগ হতে দেরি, আঙুল হাত থেকে সরতে নয়। অনেক চেষ্টা করার পরেও দল, সংঘ, উদ্দেশ্য কিছুই জানা গেল না। রাগ করে ফারাজ হাতের ছুরিটা হঠাৎ লোকটার সামনে ফেলে দিতেই সে এবার জলদি ছুরি হাতে তুলে নিলো। সবাই এগিয়ে আসতেই ফারাজ তাদেরকে হাত দিয়ে ইশারা করল সামনে না আসতে। এই খুনি কী করতে চায় সেও তো একটু দেখুক আগে। তবে যা ভেবেছিল ফারাজ তার থেকে বেশিই হলো। খুনি মহূর্তেই নিচের গলায় চাকু বসিয়ে দিয়ে শেষবার কেবল বলল,”নন তেমো লা মোর্তে, তেমো ইল ত্রাদিমেন্তো। ইল ত্রাদিমেন্তো ভিওলা লে রেগোলে দেল্লা মিয়া স্কোয়াদ্রা। আংকে সে দোভেসসি মোরিরে, নন ইনফ্রানজেরো লে রেগোলে।” অর্থাৎ “মৃত্যুকে ভয় করিনা, বেইমানিকে করি। যা আমার দলের নিয়মভঙ্গ করে। মরলেও নিয়ম ভাঙতে আমি রাজি নই।”

ফারাজ তা দেখে অবাক হলো। হেসে বলল,”ফোত্তুতামেন্তে ফান্তাস্তিকো বাট ত্রোপ্তো কমপোর্তামেন্টো দা পিক্কোলো উমো।” হঠাৎ ফারাজের চোখ আঁটকে গেল চোখের সামনে এতক্ষণ জবাই করা পশুর মতো ছটফট করতে থাকা লোকটির ঘাড়ের দিকে। উপুর হয়ে পড়ে আছে। তাই ঘাড়টা স্পর্শ। ফারাজ কাজে এসে ভালো করে দেখল। সেখানে একটা কাটা দাগ। সেই দাগের ওপরই একটা কঙ্কালের মাথা আকাঁ ট্যাটু। ছোট্ট একা ট্যাটু। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,”এটা কোন সংস্থার ট্যাটু্? আগে তো এমন কিছু দেখেনি। ইন্টারেস্টিং!”

সে অভ্রর দিকে তাকাতেই অভ্র পাশের লোকেদের দিকে তাকিয়ে বলল,”ত্রোভা সুবিতো ই দেত্তাল্লি দি কুয়েস্ত’উওমো। এ আস্সিকুরাতি দি কনসেরভারэ উনা ফোতো দি কুয়েস্তো তাত্তুয়াজ্জো।” অভ্র লোকগুলোকে এই মৃত মানুষটির ডিটেইলস বের করে তার ট্যাটুর ছবি তুলে রাখতে বলল। ফারাজ এখন রোজের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। সেখান থেকে ফ্যাক্টরীতে যাওয়া লাগবে। আগুন তো আর ফ্যাক্টরীতে এমনি এমনি লেগে যায়নি। যেভাবেই লাগুক কারণ ছাড়া লাগেনি৷ তাই বলা চলে সেখানে যাওয়াটা দরকার। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে না জানি চিত্রা কী করছে? ফারাজের ফোনটা বন্ধ। চালু করার জন্য প্রস্তুত হতেই অভ্র তাকে বলল,”গাড়ি তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এক্ষুনি বের হতে হবে।” ফোনটা বের করেও বের করা হলো না। এখানে দেরি করা মানেই বাংলাদেশ দেরি করে পৌঁছানো। তাই সময় নষ্ট করা কিছুতেই যাবে না। চিত্রা তার কাছ থেকে এক মুহূর্তের জন্য দেরি হলে মনে হয় বড় কোনো বিপদ জলদি হয়ে যাবে।

রাজন হাওরের পাড়ে বসে আছে। বাড়ি অব্দি যাওয়ার সাহস তার নেই। ইতিমধ্যে একটা খবর তার কানে এসে পৌঁছিয়েছে। রাজন তার হাতের দিকে তাকালো। এই হাতে ভাইয়ের খুনের রক্ত না চাইতেও লেগে গেছে। লোকটাকে বারবার বলেছিল মোহনার গায়ে গুলি যেন করে। সেই গুলি লাগল ভাইয়ের গায়ে। মোহনার সঙ্গে সব ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পরপরই রোশান বদলে গিয়েছিল। যেই বদলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারছিল না রাজন। সে ভালো করেই জানত মোহনা না সরা অবধি কিছুতেই রোশানকে ফিরে পাওয়া যাবে না। ফারাজের চলে যাওয়ার কথা শুনে ভেবেছে এটাই শেষ সুযোগ। কিন্তু এখন কী থেকে কী হয়ে গেল। মানুষ হারালে এত দুঃখ লাগে? মোহনা দেখা যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে গেছে কিন্তু রাজনের যেই লস হলো? হঠাৎ রাজনের ফোনে একটা কল এলো৷ রাবসাকে দেখাশোনা করে যেই মহিলা,তিনি কল করেছেন। রাজন একটা নিশ্বাস ছেড়ে কল ধরতেই ওপাশ থেকে একটা আতঙ্কিত গলা ভেসে এলো,”রাজন স্যার রাবসা আপায় তো বিষ খাইছে!”

ফ্যাক্টরীর সামনে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে গেল। এখানে এখন পাঁচটা বাজে। মানে বাংলাদেশে এখন রাত দশটা বাজে। রোজের সঙ্গে দেখা করা হয়েছে৷ শরীর এখন ভালো আছে তার। ফারাজ ফ্যাক্টরী দেখে মাত্রই বের হলো। এটা সাধারণ মনে হচ্ছে না তার। তবে এসব করার মতো মানুষের অভাব নেই। আপাতত নতুন শত্রু বলতে গ্যাংস্টার অ্যাপোলোর কথাই মাথায় আসছে। শেষবার সে ডিল করতে বাংলাদেশ পর্যন্ত এসেছিল। আর ফারাজ তাকে অপমান করে ডিল ক্যান্সেল করেছিল। সেই জিদ থেকেই এসব করছে না তো? ফারাজ বাইরে বের হয়ে একটা সিগারেট ধরালো। তার চারপাশে তার লোকজন দিয়ে ঘেরাও করা। এত হাই সিকিউরিটি এখানে যে, গায়ে একটা ঠোকা লাগাতে যে মারবে সে আসলেই অনেক প্রোফেশনাল। ফারাজ ফোনটা চালু করতেই দেখল মিনিমাম চিত্রার ফোন থেকে তো ৮৬ টা ফোন চলেই এসেছে। অনলাইনে ম্যাসেজ থেকে শুরু করে, কল সব করা শেষ৷ ফারাজ চিন্তায় পড়ে গেল। বউ তাকে দেখছি বেশিই মিস করছে। ফারাজ অভ্রকে বলল, “তুই ফোন ওন করেছিস?”

“না ভাই।”
“কেমন স্বামী তুই? দেখ দেখ আমি চালু করেছি। কত্তো ভালো স্বামী আমি। শিখে রাখ আমার থেকে এসব।”
অভ্র এক ঢোক গিলল। লোকটা আসার পর থেকেই একের পর এক হুকুম ছুড়ে দিচ্ছে এই অভ্র সিগারেট জ্বালিয়ে দে। এই অভ্র, হিশু করব—প্যান্টের জিপার খুলে দে। এই অভ্র, আমার বিশেষ কাজ শেষ—একটু ফ্লাশ মেরে দে। যদিও এসবের কিছুই করায়নি, তবু আদেশগুলো এমন ভঙ্গিতে আসছে যেন অভ্র তার ব্যক্তিগত ইয়ে। তার ওপর আবার আত্মপ্রশংসা! সে নাকি একাই আদর্শ স্বামী! দেশে গেলে ভাবির কাছে ভাইকে কট দিতে হবে।
ফারাজ আর দেরি করল না। সে দ্রুত ফোন করল চিত্রাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।কাঁপা একটা গলা ভেসে এলো চিত্রার। নেটওয়ার্কের টানাপোড়েনে কথাগুলো স্পষ্ট নয়।

ফারাজ বারবার বলল, হ্যালো… হ্যালো… হ্যাঁ বউ, শুনতে পারছো? ঠিক তখনই চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল। অভ্রের“ ভাই!” চিৎকারটা কানে আসতেই ফারাজ প্রবল এক ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেল। মুহূর্তেই তার লোকজন ছুটে এসে তাকে ঘিরে ধরল, নিরাপত্তার বলয় তৈরি হলো। কিন্তু এত মানুষের ভিড়েও ফারাজের দু’চোখ উন্মত্তভাবে খুঁজছে অভ্রকে। সে ধমকে লোকজনকে সরিয়ে সামনে এগোতেই দৃশ্যটা দেখে শরীরের রক্ত জমে গেল। বিষমাখানো তীর অভ্রর শরীর ভেদ করে ঢুকে গেছে। চারদিকে রক্ত। এক মুহূর্তের জন্য ফারাজ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে দৌড়ে অভ্রর কাছে পৌঁছাতেই অভ্র শরীর ছেড়ে দিল। ফারাজ গর্জে উঠল, “তিরা ফুয়েরি লা মাক্কিনা!” গাড়ি বের করার সেই আদেশে স্বরটা কেঁপে উঠল ক্রোধ আর আতঙ্কে। ফারাজ চারপাশে একবার তাকাল। এই তীর ছুঁড়ল কে? চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।

সে রক্তমাখা অভ্রকে কোলে টেনে নিয়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগল, ভাই… চোখটা খুল একবার। দেখ ভাই, একটু তাকা। এই অভ্র, কথা বল। দেখ, তুই কি চাইছিস আমি তোকে এখন রাগের বসে কথা শুনাই? সে কাঁপা হাতে অভ্রর মুখ ছুঁয়ে বলল, “এই… অভ্র… অভ্ররে… ভাইয়ের কথা শুনতে পারছিস? কেবল একবার… একবার ভাই বলে ডাক।” অভ্র চোখ বন্ধ করল। ফারাজের চোখের কোণে জল জমে উঠল। সে নিজেই অভ্রকে কোলে তুলে লোকজনকে ধমকে সরিয়ে গাড়িতে শুইয়ে দিল। চোখের সামনে সব ফাঁকা লাগছে তার। মাথা কাজ করছে না। বাস্তবতা যেন কোনো শব্দহীন শূন্যতায় মিলিয়ে যাচ্ছে। ফারাজ গাড়িতে উঠে বসতেই আবার ফোন বাজল। চিত্রার কল। আগেরটা কেটে গিয়েছিল। পরপর দুইবার বাজল। তৃতীয়বারে সে কলটা ধরল। মেজাজ তখন তুঙ্গে।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭২

রেগে বলল, “দেখছো না কল কেটে দিচ্ছি? বারবার কল দিচ্ছো কেন?” ওপাশ থেকে চিত্রার হাউমাউ করে কান্না ভেসে আসতেই ফারাজ আরেকটা তীব্র ধাক্কা খেল।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে চিত্রা বলল, “ফারাজ… রোশান ভাই আর নেই। আপনার ভাই আর নেই, ফারাজ। আপনি চলে আসেন… প্লিজ চলে আসেন। আমি আর পারছি না…
ফারাজের হাত থেকে ফোনটা ধীরে ধীরে নেমে এলো।
আজ, চারদিকে শুধু মৃত্যু আর শোক কেন? শরীরটা এবার তারও শীতল, অসার হয়ে এলো।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪