Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮১

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮১

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮১
ইশরাত জাহান জেরিন

জমেলা একটু আগেই চিত্রার জন্য ফল কেটে এনেছে। সে আসতেই ফারাজ ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকায়। এই বুড়িও নাকি তলে তলে এত কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে? আরো লাগাও ফারাজ রাতের বেলায় চোখে সানগ্লাস, তোমার আব্বায় কবর থেকে উঠে দয়াল বাবা ডান্স দিয়ে জমেলাকে তোমার সামনে নেচে নেচে চুমু খেলেও তুমি চোখে দেখতে পাবা না। ইজ্জতের রফাদফা কোন লেভেলে হয়েছে? এমন যেছে গিয়ে সাপের ছোবল কে খায় ভাই? ফারাজ মুখে একটা স্ট্রেবেরি দিয়ে জমেলাকে বলল, “আমার জন্য কিছু আনোনি? বাচ্চার বাবা হবো আমি, এইসময় আমারও বেশি বেশি খেতে হবে।”

জমেলার কথা বলার ধরন একেবারে বদলে গেল, “কেন ফারাজ এলাহী বাচ্চা কী আপনি পেটে ধরেছেন? যে আপনার বেশি বেশি খেতে হবে?”
“পেটে না ধরলে কী হয়েছে? পেটে ধরিনি তবে পেটে ধরিয়ে দেওয়ার কাজ তো করেছি। কত এনার্জি খরচ হয়েছে জানা আছে? যত্তসব ছোটলোকের দল। আর এত ভাব নিয়ে কথা বলার কিছু নেই বুড়ি, তোমাকে ওই মেন্টেল কন্ডিশনেই আইটেম বোম লাগে বুঝলে তো। ছোটলোকের মতো ফারাজ এলাহী না ডেকে হেন্ড বয় ডাকো।”
জমেলা মুখ বাঁকিয়ে চলে যেতেই ফারাজ চেঁচিয়ে বলল, “বুড়ির ঘরের বুড়ি কয়দিন পর দেখবা হার্ট অ্যাটাক করে মুখটা এমন চিকার মতোই বাঁকা হয়ে যাবে।”
চিত্রা একটা আঙুল মুখে দিয়ে বলে, “আপনি সিরিয়াস ভাবে কিছু শুনছেন না কেন?”
“কারণ আমার মুড নেই।”
“তো আপনার কিসে মুড আছে?”

“দাঁড়াও বাতিখানা বন্ধ করে আসি, তারপর বলছি।” চিত্রা পুনরায় কপাল কুঁচকে তাকাতেই ফারাজ গলা ছেড়ে বলে, “কী যেন বলছিলে তারপর বলো। আচ্ছা এবার আমি প্রশ্ন করব তুমি জবাব দিবে। প্রস্তত?”
চিত্রা চোখের পাতা ফেলে সাই দিলো। ফারাজ তা দেখে বলল,”তোমাকে বিয়ে করার পর তোমার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলাম ওইসবের পেছনে কী কোনো কারণ আছে? তুমি বলেছিলে তোমার মামী তোমার ওপর অত্যাচার করেছিল।”
“ওইসব মার্জিয়া বেগমের কাজ ছিল না। আপনি যেন আমার প্রতি গুরুত্ব দেন তাই আমি নিজের দেহে নিজে আঘাত করে ক্ষত তৈরি করেছিলাম।”
“আচ্ছা তারপর বলো। এই বাড়িতে আসার পর কি কি করেছো সব বলো।”

“এই বাড়িতে আসার পর প্রথম যেই কাজটা করেছিলাম তা হলো খুন। মনে আছে বাগনে দু’জন কর্মী আপনার সামনে আমাকে বাজে কথা বলেছিল? ও-ই দুটোকে আমি খুন করি। তবে এত সহজও ছিল না। প্রথম প্রথম আপনি আমাকে ড্রাগস দিতেন, কখনো কখনো ব্যথার ঔষধের নাম করে ঘুমের ঔষধও। ওইরাতেও আপনি আমাকে ঔষধ দিয়েছিলেন কিন্তু ঔষধ আমি খাইনি। উল্টো প্রথমে ভেবেছিলাম আপনাকেই সেটা খাইয়ে কাজ সারব। তবে সেদিন রাতে ওই লোককে মারার আগে আপনি আপনার লতামনির কাছে গিয়েছিলেন। আর ওই সুযোগটা কাজে লাগাই আমি। তবে সেই ঘটনার পরেও মানুষ আপনাকে সন্দেহ করেছিল কারণ ঘটনাস্থলে আপনিও ছিলেন, আর আপনার বউকে নিয়ে বাজে কথা অন্তত আপনি সহ্য করতে পারবেন না। কিছুদিন পর তো বজ্র আর বাকিরাও বাড়িতে চলে আসে। পরের খুন গুলো আমায় আর করতে হয়নি। সেগুলো কখনো বজ্র, কখনো আয়েশা আবার কখনো জমেলা সামলে নিয়েছিল। আপনার বাড়িতে একটা কাজের মেয়ে ছিল, নাম ছিল তার নিলুফা মনে আছে?”

“আমার জীবনে বউ তুমি ছাড়া কোনো মেয়ের নাম মনে নেই।”
“ফারাজ!”
ফারাজ চুপ হয়ে গেল পুনরায়। “চিত্রা বলল, ওই নিলুফাকে রাজন তার ঘরে শরবত তৈরি করতে পাঠাতে বলে। ওই রাতে নিলুফার মৃত্যু হয় আমার জন্য। যদিও এটা জানতে আমার কিছুদিন সময় লেগেছিল। মনে আছে নিলুফার মা আমাদের বাড়িতে এসেছিল? আপনার বাবা সুলেমানের কাছে সাহায্য চাইতে? আপনার বাবা বলেছিল দেখবে। তারপর ওনার মেয়ে মারা যায়। যেই মহিলা মেয়ের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিল সেই মহিলা হুট করেই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায়, এই বিষয়টাই আমাকে ভাবাচ্ছিল। আর তারচেয়েও ভাবনার বিষয় ছিল সে,সুলেমান এলাহীর সঙ্গে বৈঠকখানায় কথা বলছিল ওইদিন, আমার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল তখন বলেছিল কথা বলবে, কি যেন একটা বলতে চায় সে৷ অথচ আমি নিচে আসতে না আসতেই সে যে নিখোঁজ হলো তাকে আর খুঁজে পেলাম না। সেই ঘটনার সমাধান খুজতে গিয়ে জানতে পারি এই বাড়ির পুরুষদের নোংরা রূপ। মুখশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তাদের পৈশাচিক ব্যবসার কথা। ঘটনা সেখানেই যদি থেমে যেত, কিন্তু যায়নি।

সব কিছু বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সোহান পালোয়ানের খোঁজও পাই। জানতে পারি নিলু আমার জন্যই মারা গিয়েছিল। কি করে জানেন? আমার বিয়ের রাতে মিজান সাহেবের কথা ছিল আমাকে সোহান পালোয়ানদের হাতে তুলে দেওয়া। অথচ আমি হাতছাড়া হওয়ার পর কোনো মেয়ে সেইভাবে জোগাড় করা আপনার ভাইয়ের কঠিন হয়ে যায়, আর তাই আপনার ভাই রাজনের খারাপ নজর নিলুফার ওপর পড়ে। জোহান তার কথা মতোই নিলুফাকে কিডন্যাপ করে। তবে সেই নিলুফা মৃত্যু থেকেও বেঁচে মৃত্যু বরণ করে। কারণ কী জানেন? আপনার ভাই। মিতালি ওইদিন ঠিকই বলেছিল, নিলুফা জীবন বাঁচিয়ে সাহায্যের জন্য আমাদের কাছেই ছুটে এসেছিল কিন্তু এখানে এসে আপনার ভাই রাজনের চোখে পড়ে জীবন হারায়। এসব হিসেব মিলাতে সময় লেগেছিল আমার ঠিকই কিন্তু আমি সক্ষম হয়েছি। আর আমি সিউর নিলুফার মা আপনাদের বাড়ির লোককেই সন্দেহ করেছিল। তিনি জানতেন এই বাড়ির নারীদের ভেতর ভেতর কী যন্ত্রণা চলছে তাই হয়তো নতুন বউকে তিনি যাওয়ার আগে সাবধান করতে চেয়েছিল কিন্তু আপনার বাবা-চাচা তাকে হুমকি দিয়ে বিদায় করে। সে চলে যাওয়ার একমাস পরে আমার নামে একটা চিঠি আসে। নাম ছাড়া, পরিচয় ছাড়া সেই চিঠি। যেখানে বাড়ির লোকদের বিষয়ে আমাকে সতর্কতা মূলক চিঠি পাঠানো হয়। ওটা ওই নিলুফার মায়ের পাঠানো চিঠিই হবে। ”

“কিন্তু নিলুফা তো আত্মহত্যা করেছিল। লাশ পাওয়া গিয়েছিল ওর।”
“সে আত্মহত্যা করেনি। আপনার ভাই, সোহান ওদের লোক নিলুফাকে প্রথমে পালাক্রমে ধর্ষণ করেছিল তারপর মেরে ওদের বাড়ি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছিল।”
“তুমি এতকিছু কি করে জানলে?”
“কারন অপরাধী শনাক্ত করাই আমার কাজ। এইটুকু পরিমাণ চালাক না হলে কী আর এই পেশায় জড়াতাম? তবে বলছি বলছি, এত কিছু তো আর এমনে এমনে জানি নি। কোনটা কিভাবে জেনেছি সব বলছি। আচ্ছা এরই মাঝে আপনার মিতালির কথা মনে আছে? তার ঘটনাটা বলি তবে, তাকে কে মেরেছে জানেন? আপনার ভাই রাজন এবং বাকিরা মিলে। এত পাপ আপনার ভাইয়েদের তবুও আমি তাদের শাস্তি দেইনি কেন প্রশ্ন থাকতে পারে? জানবেন, সবই জানবেন। রাজনের একজন লোক মারা যায় মনে আছে? ওই লোকের মৃত্যুর দায়ে রাজন মিতালিকে মেরে ফেলল। অথচ ঘটনা কী ছিল জানেন? রাজনের আকবর নামক লোকই, খোকনকে মেরেছিল। কারণ খোকন রাজনের খুব ক্লোজ ছিল। তাই নিচের পথের কাটা সরিয়ে নিজের ওপর যেন দোষ না পরে তাই দোষ চাপিয়েছিল মিতালির ওপর।”
“কিন্তু ওর ওপর দোষ চাপিয়েছে কেন?”

“আমি, আয়েশা আর মিতালি একদিন সন্ধ্যায় বাগানে হাঁটতে বের হই। ওইদিন রাজনের খোকন নামক লোক বারবার মিতালিকে রুমে আসতে বলছিল। মিতুকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোনো সমস্যা নাকি। সে জবাব দিলো না। কিন্তু আমার চোখে যেটা পড়েছে সেটা তো এভাবে আমি ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নই। আয়েশা নজর রাখতেই দেখল খোকান নামক লোকটা ওর সাথে অসভ্যমি করে, মিতালি তাতে রাজি নয়। বলেছে এমন আর কিছু হলে সরাসরি ফারাজের কাছেই নালিশ দিবে। এসব আবার আকবর জানত। তাই এই সুযোগকে সে কাজে লাগায়। নিজে খুন করে, আর দোষ চাপায় মিতালির ওপর। রাজনকে জানায়, মিতালিকে খোকন অফার দিলে সে রাজি হয়নি, বিরক্ত থেকেই সেই খুন করা। অথচ আকবরের লাভ কী হলো? তাকে তো শাস্তি পেতেই হতো। সেই আকবরের লাশও এলাহী বাড়ির পুকুরে ভাসল। তবে এবারের খুনটা হয়েছিল আয়েশার হাতে। মিতালির ফরেনসিক রিপোর্ট বদলে দিয়েছিল ডাক্তার আকরাম। সে রাজনের কাছ থেকে টাকা খেয়েছিল। তবে লাভ হলো কী? সেই তো লোভে পড়ে আকরামকে মরতেই হলো আকরামকে আপনি মেরেছিলেন। আপনার সাথে বজ্রও ছিল। আপনি না মারলেও সে আমার হাতেই মরত। একটা কথা কী জানেন ফারাজ? অপরাধীকে মারার আগে তার হাত-পা গুলোকে প্রথমে ভাঙতে হয়। যাতে সে ২য় বার উঠে দাঁড়াতে না পারে। আমিও তাই করেছিলাম। আকরাম সবই জানতেন, সেই তো আত্মহত্যা বানায় মিতালির ঘটনাকে। আকরামকে মারার সময় তার থেকে সব ঘটনা আপনি আর বজ্র জানতে পেরেছিলেন, যদিও আমার থেকে লুকিয়ে গেছেন অথচ বজ্রর মাধ্যমে আমি কিন্তু ঠিকই সব জানতে পারি। তারপর আর জানি কাকে মেরেছিলাম? আসলে এত মারামারি করেছি এখন মনেও পড়ছে না।”

“মন থাকলে তো মনে পড়বে। সুলেমান এলাহীকে তুমিই মেরেছিলে?”
“না, এত ছোটলোকি কারবার আপনার বউ করে না। আপনার হিটলার, হাফ কবরে যাওয়া দয়ালবাবাকে আয়েশা উপরের টিকেট কেটে দিয়েছে। আগে হলেও মরত উনি, পরে হলেও। আমাকে আর বজ্রকে সে রাতের আঁধারে কথা বলতে দেখে ফেলে। ঝামেলা ওইদিন একটা লাগিয়েই দিতো যদি না আয়েশা বিষয়টা সামলে নিতো। আর ওইদিন কিন্তু আপনি ভালোই রাত করে ফিরেছিলেন। তারপর…”
“তারপর তুমি আমাকে ঘুমের ইনজেকশন দেও। কারন তুমি জানতে গু যেই মাছেই খাক না কেন দোষ একা পাঙ্গাস মাছের ওপরই পড়বে। এই বাসায় তো কেউ পাদ দিতেও ফারাজের ওপর এসে দোষ পড়ে। ঠিক তাই হয়েছিল খুন করলে তোমরা আর সবাই ভাবল আমি বোধহয় বুড়াকে মেরে হাত লাল করেছি।”
“আপনার তো মারা উচিত ছিল। সেও আপনার মায়ের খুনিদের মধ্যকার একজন।”
“হ্যাঁ মারতে চেয়েছিলাম বুঝলে, রোশান ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু সত্যি একদিন মেরেই ফেলতাম। তুমি না মারলেও মরত ওরা।”

“রুমানাকে মারব বলেও মারিনি। কারন কী জানেন? সে এমনিতেই ভেঙে গেছে। নিজে নিজেই যে কাজের সমাধান হতে পারে সেখানে হাত নোংরা করে লাভ কী?”
“হাত নোংরা করবে না? তোমার সংস্থার তো এটাই কাজ।”
“মোটেও না। আমার সংস্থা যা করে নিজের উদ্যোগে করে। তা এটার পিছনে সরকারি কোনো কারণ লুকিয়ে, না কারো স্বার্থ। আমার বাবা এই সংস্থা খুলে মূলত বড় বড়, সর্বোচ্ছ অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য। যারা এত এত অপরাধ করার পরেও দেশের আইন তাদের শাস্তি দেয় না। আমরা উচ্চ পর্যায়ের খুনিদের শাস্তি দেই, এমন চোরছোরদের নয়। তবুও এখানে এসে ধর্য্যের সীমা ছেড়ে যাচ্ছিল আমার। আর তার থেকেও বড় কথা ফারাজ, আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। এই বাড়ির মানুষের দিন শুরুই হতো আপনাকে রাস্তা থেকে সরানোর নাম নিয়ে। আমি চিত্রা ভালোবাসার জন্য নিয়ম ভেঙে পাপ করেছি, আপনাকে পাওয়ার জন্য পাপ করেছি। আপনার শত্রু আমারও শত্রু। ওদেরকে কী করে ছেড়ে দিতাম যারা আমার থেকে আমার ফারাজ এলাহীকে কেড়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল?”
“তুমি জানতে আমি তোমাকে কতবার কী করে মারার চেষ্টা করেছি। তবুও কেন থেকে গেলে আমার কাছে? মৃত্যুর ভয় নেই? যদি সত্যি মেরেই ফেলতাম?”

“আপনার হাতে মৃত্যুও কবুল। মৃত্যুর চিন্তা নিয়ে আমি আপনাকে ভালোবাসিনি। আমি জানি, আপনি আমাকে মেরেও ফেলতে পারেন, তবুও আমি খোদায় বিশ্বাসী। আমার ভালোবাসা মিথ্যা ছিল না এটাও জানতাম। যদি খোদা আমাদেরকে একে-অপরের জন্য তৈরি করে থাকে তাহলে হাজারটা বিপদ পাড়ি দিয়েও আমি আপনাকে পেতামই।”
ফারাজ নিঃশ্বাস ছাড়ল। আপনার চাচাতো বোন ফারিয়া আর তার স্বামী নাহিয়ান খানের কথা মনে আছে? ওরা কোথায় আছে এখন তাও জানি। তবে আপনি জেনে অবাক হবেন নাহিয়ানও আমার বিষয়ে সব জানত। এর কারণ কী জানেন? সেও আমাদেরই লোক ছিল। এবার আপনাকে বলি, নাহিয়ানকে আমি কি করে চিনতে পারলাম। আসলে আমাদের সংস্থার সুবিধার কারনে বিভিন্ন দেশের মানুষ নিয়োজিত করা হয়। তাদেরকে মিশনে পাঠানো হয়। নাহিয়ানের বাড়ি বাংলাদেশ হওয়ায় সে পায় এখান কার দায়িত্ব। তবে আমি তাকে চিনতাম না। কারন বাংলাদেশের থেকেও বড় বড় ক্রাইম অন্য দেশে হয়। তাই বাংলাদেশের দিকে এত ফোকাস ছিল না। বাবার থেকে শুনেছিলাম বাংলাদেশে আমাদের হয়ে অনেকেই কাজ করে। ওদের মধ্যে একজন ক্রিমিনালদের সাথে নিজেকে এমন ভাবে মিশিয়ে নিয়েছে যে তাকে চেনা মুশকিল। নাহিয়ান এখানে আসার পরেও নাকি ইনফরমেশন দিতো। তারপর এখানে এসে ফারিয়ার সাথে বিয়ে হয়, ঝামেলায় ফেঁসে যায়। যদিও তার স্বপ্ন ছিল এমন রক্তপাত, খুন থেকে দূরে থাকার তাই সে নিজের কাজ ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে ফারিয়াকে নিয়ে ভালোভাবে সংসার করছে। তো বলে রাখি, তাকে কি করে চিনতাম।

ওই যে ফিনিক্সের ট্যাটু! ওইটার মাধ্যমেই। বুঝলাম সে কোনো না কোনো ভাবে আমাদের লোকই। বাবাকে বাংলাদেশে যারা কাজ করেছিল কিংবা করছে তাদের তথ্য বের করতে বললে সে সব পাঠায়। যদিও বাবার সাথে আমি কোনো কথা বলতে পারতাম না। ওইসব আয়েশা করত,যা কাগজপত্র ছিল তা ওর কাছেই ছিল। তো সেভাবেই জানতে পারলাম নাহিয়ানের খবর। ভাবলাম নাহিয়ানের থেকে নিজেকে লুকিয়ে লাভ নেই। এমনিতেও সে আমার ওপর একটা সন্দেহ করেছিল। তাই সন্দেহ নেগেটিভ হওয়ার আগেই আমি আমার পরিচয় দিলাম তার কাছে। সে কেবল আমার কাছ থেকে একটাই আবদার করল, “ফারিয়াকে সে ভালোবাসে। সাধারণ একটা জীবন চায় সে। এই পেশায় থাকলে তা আর সম্ভব নয়।” যেহেতু বিষয় ভালোবাসা ছিল, তাই ফিরিয়ে দিলাম না তাকে। সে সত্যি এখন সুখী। বাইরে দেশে আছে। ভালোই জীবন চলে যাচ্ছে। তবে জেনে অবাক হবেন নাহিয়ান কিন্তু আমায় এখানে থাকাকালীন অনেক সাহায্য করেছে। এমন কী নিলুফার সঙ্গে কী কী হয়েছে এইসব পরবর্তীতে তার থেকেই আমি জানতে পারি। মিতালির সঙ্গে ঘটা সেই ঘটনাও সে আমাকে বলেছিল। আমি চেষ্টা করেছিলাম বাঁচাতে মিতালিকে, কিন্তু ঘটনা অনেক পড়ে জানি ততক্ষণে করার মতো কিছুই ছিল না।” চিত্রা একটা আঘাত নিঃশ্বাস ছাড়ল।

“আচ্ছা একটা কথা, একজন সিইউ তো কখনোই ১৮ বছরের হতে পারে না, আর ৫ বিষয়ে পরীক্ষায় ফেইল তো কখনোই না।”
“কে বলল আমি ১৮ বছরের? আমার ২৭ বছর চলছে।”
ফারাজের এবার সত্যি বেহুঁশ হওয়ার কথা ছিল,কিন্তু সে বেহুঁশ না হয়ে বলল, “আরে বাপরে, এই বউ তোমার রূপের রহস্য কী? এত ইয়াং কেমন করে? এই বউ ভালো, স্কিন কেয়ার রুটিংটা দিও, আল্লাহ তোমার ভালো করব। যৌবন ধরে রাখার জন্য কিছু খাও নাকি?”
“উঁহু কিন্তু এখন থেকে খাবো।”
“কী খাবে?”

“আপনার মাথা।” বলেই সে চোখ রাঙাতেই ফারাজ আবারও সিরিয়াস হয়ে বসল। চিত্রা আবারও বলতে শুরু করল, ” আমি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস নিয়ে ব্যাচেলর আর সেখান থেকেই সিকিউরিটি স্টাডিজের ওপর মাস্টার্স শেষ করেছি। এছাড়া আমি সাইবার সিকিউরিটি ও স্পেশাল অপারেশন ট্রেনিংয়ে এক এক বছর প্রশিক্ষণ কমপ্লিট করেছি। আমার ২৪ বছরে বয়সে মাস্টার্স শেষ হলেই বাবার ফিনিক্স সংস্থায় নিয়জিত হই, তারপর ২৫ বছর হলে প্রশিক্ষণ শেষ করে বাবা হয়ে যায় সংস্থায় চেয়ারম্যান আর তার পদে আমি পরে হয়ে যাই সিইউ। আর পাঁচ বিষয়ে ফেইলের কথা বলছেন? আমি ফেইল না হলে আমাকে হাবাগোবা একটা মেয়ে হিসেবে আপনার সন্দেহ এত বাড়ত?”

“খোদা আমার পাপের লেভেল কী এতই বেড়ে গিয়েছিল যে ঝটকার ওপর বউ খালি ঝটকা দিচ্ছে।”
“বিষয় যদি হোন আপনি ফারাজ এলাহী, আমি চিত্রা সকল নিয়ম ভাঙতে পারি।”
হঠাৎ চিত্রার ফোনে একটা কল এলো। সে রিসিভ করে কেবল বলল, “আসো।”
ফারাজের মাথা ব্যথা করছে। সারাজীবন ভেবেছিল বউয়ের পরিবারের খুনি সে। বউ বুঝি এই কষ্ট কোনোদিন ভুলতে পারবে না। অথচ বউয়ের নাকি চৌদ্দগুষ্টি বেঁচে আছে। শেষে ক্রিমিনাল ফারাজের শশুর কি এমন আইনের লোক হওয়া খুব দরকার ছিল? আর কেমন হিটলার ওই লোক। সে আদৌও শশুর নাকি অশুর?
বজ্র রুমে এসে নক করতেই ফারাজ তাকে বলল, “আসো বাবা কায়সার, তোমার আপনা বোন চিত্রা আর দুলাভাই ফারাজ তোমার অপেক্ষাতেই ছিল।”

“আজ একা আসিনি।”
“সঙ্গে আবার কোন ঝামেলাকে নিয়ে এসেছো?” বজ্র এবার সাইড হতেই পেছন থেকে নিরুপমা বের হতেই বলে, “কেমন আছো ফারাজ ভাই।”
ফারাজের এবার কাশি উঠে যেতেই চিত্রা তাকে পানি এগিয়ে দেয়। “ঠিক আছেন আপনি?”
“তুমি বউ অকালে চাও বিধবা হতে?”
“ছি এসব কী বলছেন?”
“তাহলে পরপর এতো ঝাটকা কেন দিচ্ছো? একটু রয়েসয়ে দাও।”
“আসলে….”
“এই নিরু তুই এখানে কেন?”
নিরু কিছু বলার আগেই চিত্রা বলল, “নিরুকে আমি বাঁচিয়েছি। সোহানের সঙ্গে বিয়ে হলে মেয়েটা মরেই যেত। চোখের সামনে এত মানুষের ধ্বংস দেখতে দেখতে আমি ত্যক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। বজ্রের মাধ্যমে নিরুকে সরিয়ে ফেলি। কিন্তু…..”

“কিন্তু নিরু এখন বজ্রের বউ।”
ফারাজ বজ্রের দিকে তাকায়। “ভাই আমার বিয়েতে তোকে দাওয়াত দেইনি বলে তুই তো দিতে পারতি!”
বজ্র মুখ বাঁকিয়ে বলল, “তুই আমার চাচাতো বোন বিয়ে করেছিস, আমি তোর চাচাতো বোনকে। তুই আমাকে দাওয়াত দেসনি, তো আমি কেমন করে দিতাম?”
“বোমা পড়ুক তোর জীবনের ওপর।”
“সে তো পরেছেই, তোর বোনকে বিয়ে করেছি না।”
“তাও ভালো, আর আমার ওপর তো নিউক্লিয়ার বিস্ফোরণ ঘটেছে। কারন তোর বোনকে যে বিয়ে করেছি।”
চিত্রা শেষে বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা থামবেন।”
“কি করে থামব বলো? অভিনেত্রী নিরু আপা আবার চলে এসেছে। তুমি আরেকটু দেরিতে জীবনে আসলে নির্গাত এই অভিনেত্রী আপা আমাকে তাবিজ করে বিয়ে করে ফেলত। তখন তুমি আমার বাচ্চার মা এখন কী করে হতে?”
চিত্রা কিছু বলার আগেই বজ্র বলল, “আমার বউকে নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবি না।”
“বাজে কথা বলার দরকার নেই, তোর বউ এমনিতেই বাজে।”

চিত্রা শেষে চেঁচিয়ে উঠতেই দুই দু’জন থামল। সবাই থেমে যেতেই চিত্রা চুপ করল। শেষে ফারাজ তাকে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “একটা সত্যি কথা বলোতো। নিরু তো আমাকে পছন্দ করত, সাথে মোহনাও এসব তো তুমিও জানতে তাহলে ওদের ক্ষতি কেন করোনি?”
“ইয়ে মানে, নিরুকেই সবার আগে খুন করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলাম, আমার ফারাজ এলাহীর ওপর নজর দেওয়া? কিন্তু তার দরকার হলো না। কারণ দেখলাম নিরু মেয়েটা আসলেই আস্ত পাগল একটা। আর আমি অসুস্থ ব্যক্তিকে মেরে পাপ কুড়াতে চাই না।”

বজ্র চিত্রার দিকে তাকাতেই চিত্রা কি বলবে বুঝতে পারছে না। হেসে নিরুর দিকে তাকিয়ে বলল, “সরি বোন তোমার বিড়াল মিনিকে সেদিন আমিই।” বজ্র বুঝতে পেরে পুরোটা শোনার আগেই নিরুকে নিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। বিড়ালের বিষয়ে নিরু অনেক কাহিনি শুনিয়েছে বজ্রকে। এখন বিড়াল খুনের কথা শুনলে নির্গাত কান্না করে দিবে। সে যেতেই চিত্রা উঠে জানালার দিকে উঠে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে বলল, “মোহনা আর নদী ভাবী দু’জনেই আমার সম্পর্কে জানত। রাজন ভাইকে কতবার যে মারতে গিয়েও মারিনি, কেবল নদী ভাবীর কারনে। কিছুদিন আগের কথা, আমি খোদার কসম সেদিন রাজন ভাইয়ের কলিজা ছিড়ে কুঁচি কুঁচি করতাম৷ নদী ভাবীর অনুরোধে সে এখনো বেঁচে আছে।”
“না মানে যা বুঝলাম আমার বাড়িতে আমি বাদে সবাই সব কিছু জানে। ভালো কথা, বজ্রের সাথে সোহান পালোয়ানের কী সম্পর্ক?”

“তেমন কিছুই না। সোহানের সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ার কারণ সব তথ্য বের করা। সোহানকে যখন প্রথম দেখলাম সেদিনই তো বজ্রকে পাঠাই তার কাছে। বজ্রের সাথে ধীরে ধীরে তার ভাব হয়। কিন্তু সেই বিষয়ে সে রাজন, জোহান ওদেরকেও জানায়নি। বজ্র ওর সঙ্গে মিল রাখার চেষ্টা করেছিল, যাতে কোনো বিপদ হলে আগাম জানতে পারে। অনুলিপি নামক একজন পুলিশ এসেছিল বাড়িতে মনে আছে? সে এখনো বেঁচে আছে। সোহানের লোকেরা সেদিন তাকেও ধরে নিয়ে যেত কিন্তু বজ্রর মাধ্যমে তাকে উদ্ধার করি আমি। আর যেই লাশ পরেরদিন পাওয়া গিয়েছিল তার ফরেনসিক রিপোর্ট ভুয়া ছিল, এমন কী ওটা একটা মরা মানুষের ডেড বডি ছিল অনুলিপিকে বাঁচানোর জন্য একটু নাটক সাজাতে হয় আর কী। আচ্ছা আমার সহপাঠী মরিয়মকে আপনি বাঁচিয়েছিলেন, আলাদা ভাবে তাকে রেখেছিলেন সেটা জানতে পারি?”
“কেন সব জানো এটা জানো না?”
“বলেন না।”

“মরিময় জোহান, রাজনদের পাপ দেখে ফেলেছিল। জোহান তাই তাকে খুঁজে মারতে চেয়েছিল। ওইরাতে মরিয়মকে তুমি যখন আমাদের বাড়িতে আনো সেদিন একটুর জন্য জোহান তাকে দেখেনি৷ ওইদিন আমি তাকে সরিয়ে ফেলি। সবাই তখন জেনেছে মরিয়ম মারা গিয়েছে। জোহান ওরা এই কারণেই আর মরিয়মকে খুজেঁনি। কিন্তু আমি সিউর ছিলাম জোহান যতদিন বেঁচে আছে ততদিন মরিয়ম আড়ালে থাকলেই নিরাপদ থাকবে। তাই তো জোহানের মৃত্যুর পর তাকে তোমার সাথে দেখা করাই।”
“জানেন এখানে আমি এসেছিলাম আপনাকে জানতে, অথচ আপনাকে জানতে গিয়ে কত কিছু জেনেছি। আপনার মায়ের বিষয়ে জেনে সত্যি খারাপ লেগেছিল। আজও লাগে। তিনি থাকলে ভালো হতো। আচ্ছা আপনার আর কিছু জানার আছে?”

“আছে।”
“ঠিক আছে, তবে তার আগে বলুন তো আপনার বাড়িতে আসার পর একবার আমি রবীন্দ্র সংগীত আর নুপুরের আওয়াজ উপর থেকে পেয়েছিলাম৷ ওইসময় আপনি আমাকে ওপরে যেতে দেননি কেন?”
“তুমি তখন বাড়িতে নতুন এসেছিল চাইনি ভয় পাও, আসলে আগে মোহনা অদ্ভুত ছিল। আজেবাজে কাজকর্ম করত। হুটহাট সে ছাদে গিয়ে রাতের বেলা নাচানাচি করত, গান গাইত। চাইনি তুমি ভয় পেয়ে যাও। আর তিন তলায় আমি কাউকেই যেতে দিতাম না। বিশেষ করে তোমাকে যেতে দেইনি কারন আমার মায়ের জিনিসপত্র তিনতলার ঘরে বন্দী আছে। আমি কখনো চাইনি, তালুকদারের রক্ত, মায়ের খুনির মেয়ে আমার মায়ের জিনিসপত্র স্পর্শ করুক।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮০

“হুম এইবার বুঝলাম। আপনার মা ডেনমার্কের নারী ছিলেন তাই না?”
“এদিক থেকে আপনার সাথে আমার একটা মিল আছে।”
“কেমন মিল?”
“আমার মা ইতালিয়ান নারী।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮২