চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯১
ইশরাত জাহান জেরিন
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরে কোথাও আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। চিত্রা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ তার সামনে, কিন্তু দৃষ্টি অনেক দূরে কোথাও আটকে আছে। উঠানের পুরোনো আমগাছটা আজ কেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাতে মুকুল ধরেছে।
আজ ঠিক এক সপ্তাহ হয়ে গেল। রাজন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। সময় যেন থেমে থাকেনি, তবু এই সাতটা দিন অনেক দীর্ঘ মনে হয়েছে সবার কাছে। নদীর কথাতেই শেষ পর্যন্ত তাকে মাটি দেওয়া হয়েছে রাবসারের পাশে। মাটির নিচে এখন নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে সে যে মানুষটা একসময় এত অস্থিরতা, এত ঝড় তুলে দিয়েছিল অনেকের জীবনে। সেদিনের সকালটা ছিল অদ্ভুত। ভোরের নরম আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি আকাশে। হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত খবর এসে যেন সবকিছু এলোমেলো করে দিল। খবরটা শুনেই ফারাজ আর চিত্রাকে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। সেই খবর রাজনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু। কেউ যেন ঠিক বিশ্বাসই করতে পারছিল না। যে মানুষটা এতদিন ধরে নদীর জীবনে বিরোধ, কষ্ট আর অপমানের এক দীর্ঘ খাতা খুলে রেখেছিল, সেই মানুষটির হিসাব যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু সত্যিটা হলো সেই খাতার শেষ দাগটা টেনেছিল নদী নিজেই। এতদিন ধরে যত অপমান, যত নির্যাতন, যত না-বলা যন্ত্রণা নদী বুকের ভেতর জমিয়ে রেখেছিল, সেদিন রাতে সবকিছুর সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। ধৈর্যের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে নিজের জীবনের হিসাবটা নিজেই মিলিয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সেই বিরোধের খাতা যেটা সে এত যত্ন করে বুকে আগলে রেখেছিল সেদিন রাতেই মুলতবি টানল সে।
এই জীবনটা নদীর জন্য সবসময়ই একটা আফসোসে ভরা ছিল। অনেক হিসাব ছিল তার, অনেক প্রশ্ন, অনেক অভিমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দুই পাশের হিসাব আর মিলল না। কেউ জিতল না, কেউ হারল না শুধু বুকের বাপাশে শূন্যতা থেকে গেল। তবে কেউ কি ভেবেছিল নদী এতটা বদলে যাবে? এই পরিবর্তনের জন্যই তো চিত্রা কতদিন ধরে অপেক্ষা করছিল। সে চাইত নদী একদিন নিজের জন্য দাঁড়াক, নিজের অপমানের বিরুদ্ধে নিজের কণ্ঠ তুলুক। কারণ চিত্রা জানত এই পৃথিবী কাউকে বিনা লড়াইয়ে ন্যায় দেয় না। বরং দুর্বলকে আরও নিচে ঠেলে দেয়। কিছুদিন আগের সেই ঘটনাটা এখনো চিত্রার মনে স্পষ্ট। যখন রাজন নদীর গায়ে হাত তুলেছিল, তখন চিত্রার ধৈর্য আর সহ্যশক্তি প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন যদি সে চাইত, রাজনের জন্য খুব কঠিন পরিণতি ঠিক করে ফেলতে তার হাত একটুও কাঁপত না। ক্রোধে, অপমানে, অন্যায়ের প্রতিবাদে তার ভেতরটা পাথর হয়ে উঠেছিল। তবু সে থেমে গিয়েছিল। নদীর মুখের দিকে তাকিয়ে চিত্রা চুপ করে গিয়েছিল। কারণ সে সবসময় একটা জিনিসই চেয়েছিল নদীর জীবনের লড়াইটা নদী নিজেই লড়ুক। অন্য কেউ এসে তাকে বাঁচিয়ে দিক, এটা সে চায়নি। সে চাইত নদী বুঝুক, নিজের মর্যাদা রক্ষা করার শক্তিটা তার নিজের মধ্যেই আছে। চিত্রা জানে, এই পৃথিবী এত সহজ না। এখানে কেউ এসে অন্যায়ের বিচার করে দেয় না। বরং তুমি যদি চুপ করে থাকো, পৃথিবী তোমাকে আরও অপমান, আরও অবহেলা উপহার দেবে। তাই নিজের লড়াইটা শেষ পর্যন্ত নিজেকেই লড়তে হয়। আর হয়তো সেই কারণেই নদী সত্যিই বদলে গিয়েছিল। সেই বদলটাই ছিল সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত।
পরশু থেকেই রোজা শুরু হবে। এই বাড়ির ভেতর এখন অন্যরকম ব্যস্ততা থাকবে। কিন্তু তার বুঝি আর বেশিদিন এখানে থাকা হবে না। তার পাসপোর্ট তৈরি। সব কাগজপত্রও গুছিয়ে রাখা হয়েছে। আর কয়েকদিনের মধ্যেই তাকে এই বড় এলাহী বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই উঠান, এই বারান্দা, এই সিঁড়ি, এই ঘর সবকিছুতেই তার কত দিনের হাসি, অভিমান, কথা আর অভিমান জড়িয়ে আছে। কিন্তু মানুষ তো শেষ পর্যন্ত কোথাও না কোথাও চলে যায়। বাড়ি থেকে, মানুষ থেকে, স্মৃতি থেকে। এসব কথা ভাবলেই আজকাল তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। অকারণে মনটা ভার হয়ে আসে। সবকিছু ঠিকঠাকই আছে তবু ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি জমে থাকে।
চিত্রা বসে আছে। আয়েশা খুব যত্ন করে হাতে হাতে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে তাকে।
কাপড়গুলো আলাদা করে ভাঁজ করছে, দরকারি কাগজগুলো এক জায়গায় রেখে দিচ্ছে, যেন কিছুই এলোমেলো না হয়। এদিকে পিয়াস আর নিশু ইতিমধ্যেই তাদের বাড়িতে ফিরে গেছে। এতদিন সবাই একসাথে থাকায় বাড়িটা কেমন সরগরম ছিল, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে আবার আগের মতো শান্ত হয়ে আসছে। তবে নাহিয়ান আর ফারিহা এখনো এখানেই আছে। তারা ঠিক করেছে আরো কিছুদিন থাকবে। এই সময়টায় একা একা সব সামলানো সহজ নয়, তাই কাছের মানুষগুলো পাশে থাকাটা অনেক বড় ভরসা। নিরুর পাসপোর্টের জন্য এখন যত অপেক্ষা। একটু দেরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সবাই জানে এটা হয়ে গেলেই আর কোনো বাধা থাকবে না। পাসপোর্টটা হাতে পেলেই তারা সবাই একসাথে ইতালি চলে যাবে। এই বাড়ির উঠান, এই পরিচিত ঘরগুলো, এই মানুষগুলোর সাথে কাটানো দিনগুলো সবকিছুই তখন ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতর চলে যাবে। সামনে থাকবে এক নতুন জীবন, নতুন শুরু।
আয়েশা এখনো বসে খুব যত্ন করে জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে। কাপড়গুলো ভাঁজ করছে একটার ওপর একটা।
মাঝে মাঝে থেমে জিজ্ঞেস করছে,
“আপা, এই শাড়িটা নিবেন তো?”
চিত্রা একটু তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
“হুম… রাখো।”
আয়েশা আবার ভাঁজ করে স্যুটকেসে রেখে দেয়।
এক পাশে আলাদা করে একটা ফাইল রাখা পাসপোর্ট, কাগজপত্র, কিছু দরকারি ডকুমেন্ট। চিত্রা সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। সব প্রস্তুত। আর কয়েকদিন পরই তাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে।
এই ঘরেই কত রাত গল্প করেছে তারা। এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত বিকেল কেটেছে। মানুষ আসলে কত সহজে একটা জায়গার সাথে জড়িয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। মনে হলো সত্যিই কি সে চলে যাবে? আয়েশা আবার বলল,
“আপা, এই ফাইলটা ব্যাগে রাখবো?”
চিত্রা চমকে তাকাল।
“হ্যাঁ… রাখো।”
আয়েশা খুব যত্ন করে ফাইলটা ভাঁজ করা কাপড়ের পাশে রেখে দিল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। চিত্রা তাকাল।
স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠেছে। “বাবা”
তার বুকটা কেঁপে উঠল। ইতালি থেকে কল।
সে ধীরে ফোনটা তুলে কানে ধরল।
“হ্যালো… বাবা?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর পরিচিত গলা,
“চিত্রা… কেমন আছো মা?”
চিত্রার চোখ হঠাৎ ভিজে উঠল।
“ভালো আছি।”
ওপাশ থেকে বাবা বললেন, “শুনলাম তোদের কাগজপত্র প্রায় সব তৈরি হয়ে গেছে। আমার ক্রিমিনাল মেয়ের জামাই কবে নাগাদ আসবে তোমাকে নিয়ে?”
“বাবা ওমন করে বলছো কেন?”
“তো কেমন করে বলব? একটা পাপী আমার সামনে নেচে ঘুরে বেড়াবে, আমার মেয়ের হাত ধরে ধরে ঘুরবে আমার চোখের সামনে আর আমি নাকি কিছু করতে পারব না। হায় চয়ন কায়সার তোমার এত অধপতন কি করে হয়ে গেল?”
“থামবে তুমি? নাকি ফোন রেখে দিবো?”
“এইযে মেয়েটাও একটা ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে। থাক মা রাগ করে না, বাবা মজা করে বলেছি। এখন বলো তোমার শরীর সুস্থ আছে?”
“হুম…”
“আর কদিনের মধ্যেই চলে আসবে তাই না?”
চিত্রা জানালার বাইরে তাকাল। উঠানের আমগাছটার পাতা বাতাসে দুলছে।
“হ্যাঁ বাবা… হয়তো খুব তাড়াতাড়িই।”
ওপাশে আবার কিছুক্ষণ চুপ। চয়ন কায়সার হঠাৎ বলল, “তোর মা বাসায় আছে। তোকে খুব মিস করে।”
“আমিও তো। সমস্যা নেই মায়ের সাথে কথা বলে নিবো। আর শুনো আমি ইতালি ফিরলে নতুন কেইসের ফাইলগুলো আমাকে পাঠিয়ে দিও। এসেই কাজ শুরু করব। চিত্রা কায়সারের হাত রক্ত আর বন্দুক ছাড়া বড্ড বেমানান লাগে।”
“জামাইয়ের পেছনে একটা গুলি মারতে মারতে পারলে আজকে ক্রিমিনাল মেয়ের জামাই হতো না আমাদের।”
“বাবা!”
“আরে মুখ ফুসকে বেরিয়ে গেছে। এত চোটে যাচ্ছো কেন মা জননী? থাক রাগ করেনা। কুল মা, কুল।”
“আমি যা বললাম মাথায় সেট করে রাখো। আর শুনো আমাদের একটা লোক ফারাজের এসিস্ট্যান্ট রোজের গায়ে গুলি করেছিল। আমার কাছে ওর ছবি আছে। ওটার বায়োডাটা বের করে আমাকে জানাও উদ্দেশ্য কি ছিল? গুলি তো হাওয়ায় কেউ ছুঁড়ে না। আর সব ব্যবস্থা করে রাখো, ইতালি আসলে আমার ছুঁড়া প্রথম গুলিটা যেন মিস্টার অ্যাপোলোর গায়েই লাগে। কত্ত সাহস আমার ফারাজের বুকে তীড় ছুঁড়তে চেয়েছিল। তীড়ের থেকে ভয়ানক কিছু যদি আমি ওর বুকে না ঢুকিয়েছি।”
“তোমার মাথা দেখছি এখনো আগের মতো গরম।”
“গরম না হলে এমন পেশায় টিকে থাকা যায়? খারাপের জন্য আমাদের খারাপ হতে হয় বাবা। আর তার জন্য মাথা গরম রাখতে হয়। যদিও মাথা আমি কখনোই গরম করিনা। মাথা গরম করলে গেইম নষ্ট হয়। আমি চিত্রা শান্ত মস্তিষ্কের নৃশংস খুনি। আমি আর দশটা মেয়ের মতো হাতে আলতা লাগাই না বাজার থেকে কিনে, খুনির খুনই আমার হাত রাঙানোর জন্য এনাফ।”
“খুনি তো ফারাজ এলাহীও।”
“ফারাজ এলাহীর সাথে কারো তুলনা হয় না বাবা। সে পাপ ছেড়েছে, তবে খুন ছাড়েনি কিন্তু! এই দুনিয়া খেলনা নিয়ে খেলে আর আমার ফারাজ এলাহী পিস্তল নিয়ে খেলে, তাই তাকে এত সহজ ভাববেন না। সে আমার জন্য যতখানি নরম, দুনিয়ার জন্য ততখানিই নিষ্ঠুর। তবে অবশ্যই খারাপ দুনিয়ার জন্যই সে নিষ্ঠুর,ভালোর জন্য ভালো।”
“বাহ! কথার কি তেজ! বুঝতে হবে, চয়ন কায়সারের মেয়ে বলে কথা। একেবারে খাঁটি সোনার জন্ম দিয়েছি আমি। গর্ভবোধ হচ্ছে।”
“বাবা! হয়েছে অনেক এখন রাখলাম।”
পুকুরপাড়ে বিকেলের আলোটা মলিন হয়ে আসছে। পুকুরের জলটা একেবারে স্থির। মাঝে মাঝে বাতাসে ঢেউ উঠে আবার থেমে যাচ্ছে। দূরে কোথাও একটা পাখিও বুঝি ডাকছে। পুকুরের ধারে পুরোনো আমগাছটার নিচে চুপচাপ বসে আছে রুমানা। তার পাশেই নদী। নদীর কোলে ছোট্ট নুড়ি। মেয়েটা আধো ঘুমে মায়ের বুকের সাথে মাথা রেখে আছে। সে মাঝে মাঝে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নদী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার মাথা নিচু। হাত দুটো কাঁপছে সামান্য। হঠাৎ খুব নিচু স্বরে সে বলল,
“আম্মা…”
রুমানা মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। চোখে কোনো বিস্ময় নেই, তবে দৃষ্টি গম্ভীর। নদীর গলা কেঁপে ওঠে।
“আম্মা… আমি তো খুনি। আমার এই হাত… এই হাত তো পাপে লাল হইয়া গেছে। আমি আপনার কোল থাইকা আপনার সন্তান কাইরা নিছি। আপনার বুক খালি কইরা দিছি।”
সে নিজের দুই হাতের দিকে তাকায়। তারপর খুব অসহায় কণ্ঠে বলে, “আমার শাস্তি কী, আম্মা?”
পুকুরের পানিতে তখন সূর্যের শেষ আলো কাঁপছে।
রুমানা কিছুক্ষণ কোনো কথা বলে না। নুড়িকে নিজের কোলে দেয়। মাথায় হাত বুলাতে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে নদীর দিকে তাকালেন। “নদী… মানুষ কখনো কখনো এমন পথ দিয়া যায়, যেই পথ সে নিজেও চায় নাই।”
নদী মাথা তোলে না। চোখের কোণ ভিজে উঠেছে।
রুমানা আবার বললেন, “পাপী মারলে কখনো পাপ হয় না।”
নদী থমকে যায়। রুমানা এবার একটু কাছে সরে আসে। “যে মানুষ অন্যের জীবন নষ্ট করে, অন্যের ঘর ভাঙে, অন্যের বুক খালি করে—তার বিচার কখনো কখনো মানুষের হাতেই হয়।”
নদীর গলা আবার কেঁপে ওঠে, “তবু তো আমি আপনার সন্তান…!” কথাটা শেষ করতে পারে না সে।
রুমানা ধীরে ধীরে তার কাঁধে হাত রাখেন।
“সন্তানকে হারানোর ব্যথা কি, আমি জানি নদী। সেই আগুন আমি প্রতিদিন বুকে নিয়ে বাঁচি।”
একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার বুক থেকে। “কিন্তু আমি এটাও জানি—যে পাপের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, সে শুধু নিজের জন্য না… অনেকের জন্যও দাঁড়ায়।”
নদী এবার মুখ তুলে তাকায়। চোখ দুটো ভিজে গেছে।
রুমানা মৃদু স্বরে বলে, “তুমি খুনি না নদী… তুমি বিচার করছো।”
পুকুরের পানিতে তখন সন্ধ্যার ছায়া নেমে এসেছে।
নুড়ি হালকা নড়েচড়ে আবার দাদুর বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ে। রুমানা আকাশের দিকে একবার তাকায়, তারপর খুব আস্তে করে বলেন, “কিছু রক্ত পাপের না… মুক্তিরও হয়।”
হঠাৎ নদী ভাঙা গলায় বলে ওঠে, “আম্মা… আপনি আমাকে সান্ত্বনা দেন কেন?”
রুমানা শান্ত চোখে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।
নদী আবার বলে, “আমি জানি সে খারাপ ছিল। সে তার ছোট ভাইরে মেরেছে… তার ভাইয়ের বউও মরছে… পেটের বাচ্চাটাও তার কারণে শেষ হইছে। কত মেয়ের জীবন সে নষ্ট করছে… আমি সব জানি।”
তার গলা ভারী হয়ে আসে।
“তবু তো সে আপনার ছেলে, আম্মা।”
রুমানার বুকটা কেঁপে ওঠে। কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে বলেন, “হ… সে আমার ছেলে। কিন্তু নদী… সব দোষ কি শুধু তোমার?”
নদী অবাক হয়ে তাকায়। রুমানা মাথা নিচু করে বলেন, “সবচেয়ে বড় দোষ তো আমার।”
নদী হতভম্ব হয়ে যায়। “আম্মা, আপনি এই কথা কইতেছেন কেন?”
রুমানা খুব ধীরে ধীরে বলেন, “মা যদি ঠিক থাকে… সন্তান খুব দূর পর্যন্ত ভুল পথে যাইতে পারে না।”
তার চোখে তখন পানি জমেছে। “রাজন ছোট থাকতে যখন প্রথম অন্যায় করছিল… আমি থামাই নাই। ভাবছি ছেলে মানুষ, ঠিক হইয়া যাবে।” একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয় তার বুক থেকে। “তারপর যখন সে মিথ্যা বলত… আমি জানতাম। তবু চুপ থাকতাম।”
নদী চুপ করে শুনছে।
রুমানা আবার বলেন, “যখন সে মানুষের ক্ষতি করতে শুরু করল… আমি তখনও ভাবলাম একদিন বুঝবে।”
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
“কিন্তু বুঝার আগেই সে মানুষ হওয়া ভুলে গেল।”
পুকুরের পানি তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে।
নদী আস্তে বলল, “আম্মা… সব মায়ের হাতে তো সবকিছু থাকে না।”
রুমানা মাথা নাড়ে। “না নদী… কিছু কিছু থাকে। আমি যদি একদিন তার সামনে দাঁড়াতাম… যদি বলতাম ‘তুই ভুল করছিস’… যদি তার বিরুদ্ধে যাইতাম… কিন্তু আমি তো নিজেই তার চোখের সামনে পাপ করছি। তো আমার পেটের সন্তান কেমনে ভালো হইব?” তার গলা ভেঙে যায়। “হয়তো এত মানুষ শেষ হইত না যদি আমি ঠিক থাকতাম।
নদীর চোখও ভিজে ওঠে। “আপনি নিজেকে এত দোষ দিতেছেন কেন? অতীত ভুলে যান।”
রুমানা নুড়ির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। “কারণ আমি মা।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে আবার বলে, “মা যদি অন্যায়ের সামনে চুপ থাকে… সেই চুপ থাকাটাও পাপ হয়ে যায়।”
নদী আকাশের দিকে তাকায়। দীর্ঘ এই সংসারের তার অবসান ঘটেছে। ফাঁসির দঁড়িতে কতবার ঝুলতে যাওয়া মেয়েটিও আজ নিজের প্রতি ন্যায় বিচার করেছে। এখন তার নতুন একটা জন্ম হয়েছে। যেই জন্মে সে বাঁচবে কেবল মেয়ে নুড়ির দিকে তাকিয়ে। হ্যাঁ এই নুড়ির দিকে তাকিয়েই। নুড়িটা দেখতে রাজনের মতো। তবে পার্থক্য নুড়ি নদীকে ভালোবাসে, রাজন কোনোদিন বাসেনি। তবে নদী খুশি কারণ তাকে না ভালোবাসুক, একজনকে তো মন দিয়ে ভালোবেসেছে লোকটা। সেও ভালোবাসতে জানে।
ফারাজ ধীরে দরজা ঠেলে রুমে ঢুকল। দরজাটা বন্ধ করতেই তার চোখ গিয়ে থামল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চিত্রার ওপর। চিত্রা আজ একটু বেশি সাজেনি তবুও তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। হালকা রঙা একটা শাড়ি, খোলা চুল তাতেই একেবারে মাশাল্লাহ টাইপ লাগছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলটা ঠিক করছিল। ফারাজ কিছুক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর নিঃশব্দে পা ফেলে পেছন থেকে এগিয়ে গেল।
চিত্রা বুঝতেই পারেনি কখন ফারাজ তার একদম পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎই ফারাজ দুহাত দিয়ে তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
চিত্রা হালকা চমকে উঠল।
“উফ! আপনি? ভয় পেয়ে গেছিলাম।”
ফারাজ মৃদু হেসে তার কাঁধে মুখ রেখে বলল,
“ভয় পাওয়ার কি আছে? আইনের লোকেদের এত ভয় পেলে চলে?”
“পরশু থেকে রোজা, আপনি রাখবেন না? আগে কখনো রাখা হয়েছে।”
“উহুঁ।”
“কী? এত ছোটলোক আপনি?”
“হোপ। এইবার রাখব। এসব রাখা কোনো ব্যাপার হলো?”
“অনেক ব্যাপার আছে। কত নিয়ম মানতে হয় জানেন?”
“কি? আবার কি মানতে হবে?”
“ ঠোঁট কাটা কথা বলা যাবে না, আদর আদর করা যাবে না।”
“সব মানলাম কিন্তু আদরের বিষয়টা! উফ বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেল।”
“নাটক করবেন না।”
“আচ্ছা যাও সমস্যা নেই। পরশু তো দেরি আছে। যেহেতু এখন নিয়ম করে আদর করতে হবে বউকে তাহলে পুরো ৩০ দিনের আদর এখনো করে ফেলি। আমার কিন্তু উদার মনে ভালোবাসা দেওয়ার সামর্থ্য আছে। আপনার নেওয়ার সামর্থ্য আছে তো বিবিজান?”
“এই আপনিও না। একটু পেয়েছেন, ওমনি শুরু হয়ে গেলেন। যান এখন, দূরে যান বলছি।”
ফারাজ হেসে খুব আলতো স্বরে বলল, “জানো চিত্রা… আমি মাঝে মাঝে ভাবি… আমার জীবনে এত সুন্দর দুটো মানুষ কিভাবে চলে এলো?”
চিত্রা ভ্রু কুঁচকে আয়নায় তাকাল। “দুটো?”
ফারাজ মৃদু হেসে তার পেটে হাতটা একটু নরম করে বুলিয়ে দিল। “হুম… একটা তুমি… আর একটা আমাদের ছোট্ট লিটল ভার্সন।”
চিত্রার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
ফারাজ আবার বলল, “আমি আগে কখনো বুঝিনি, একটা মানুষকে এতটা ভালো লাগতে পারে… আর এখন তো মনে হয়, তোমাদের দুজনকে পেয়ে আমি পুরো একটা পৃথিবী পেয়ে গেছি।”
সে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে চিত্রার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল, “সত্যি বলছি চিত্রা, এই মুহূর্তটা আমি কখনো হারাতে চাই না।”
চিত্রা ধীরে ধীরে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। “আপনি না… মাঝে মাঝে এমন কথা বলেন… শুনলে মনে হয় আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মেয়ে।”
ফারাজ মৃদু হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। “তুমি শুধু ভাগ্যবতী না চিত্রা… তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ, সুখের কারণ, আমার ভাললবাসা।”
ফারাজ আবার আলতো করে পেটে হাত বুলিয়ে দিল। “আর ইনি হচ্ছে আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।” ফারাজ আস্তে করে চিত্রার ঘাড়ে চুমু খেতে গেলেই চিত্রা তাকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “না করেছি না? বেশি করলে আমার স্বামী কাছে বিচার দিবো।”
“ওহ তাই নাকি? তো কে সেই মহৎ ব্যক্তি?”
“ফারাজ এলাহী।”
“নাম শুনেই তো মনে হচ্ছে ছোটলোক।”
“ইশ আপনাকে বলেছে! এই দুনিয়া খেলনা নিয়ে খেলে আর আমার ফারাজ এলাহী পিস্তল নিয়ে খেলে, তাই তাকে এত সহজ ভাববেন না। সে আমার জন্য যতখানি নরম, দুনিয়ার জন্য ততখানিই নিষ্ঠুর।”
“ওহ তাহলে তো সে টু মাচ ছোটলোক।”
“আচ্ছা হয়েছে এখন তৈরি হয়ে নিন।”
“হানিমুনে যাবো নাকি?”
“না আমার না হওয়া জামাইয়ের সাথে দেখা করতে যাবো।”
“হোয়াট!”
“হুম সোহান পালোয়ানের সঙ্গে দেখা করতে যাবো।”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯০
“চাঁদ দেখাই ভালো লাগে না? তোমার সৌরজগতের অন্ধকার দেখার শখ? ওয়েট ভালো হয়ে যাবো ভাবছিলাম, রোজা রোমজানের মাস আসছে, তুমি আর হতে দিলে না। এখন চাঁদের কলঙ্ক যদি টুকুস করে সিল মেরে সুন্দরী তোমার অঙ্গে না বসিয়ে দেই তবে আমিও ফারাজ এলাহী না।”
