চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯২
ইশরাত জাহান জেরিন
রাত তখন প্রায় গভীরতার দিকে ঢলে পড়েছে। আকাশে আধখানা চাঁদ ঝুলে আছে, মেঘের আড়াল থেকে মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে আবার লুকিয়ে পড়ছে। শহরের কোলাহল অনেকটাই থেমে গেছে। ফারাজ গাড়ি থামাল সোহান পালোয়ানের বাড়ির সামনে। পুরোনো ধাঁচের দোতলা বাড়ি। এ বাড়ির বারান্দার গ্রিলে মরিচা জমেছে। চিত্রা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে একবার তাকাল। এই বাড়ির নাম সে বহুবার শুনেছে, কিন্তু আজই প্রথম আসা। বাড়ির নাম পালোয়ান। ফারাজ দরজায় কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে একজন বয়স্ক লোক দরজা খুলল। চোখে কৌতূহল আর সতর্কতার মিশ্র দৃষ্টি।
“কাকে চান?”
ফারাজ ভদ্র স্বরে বলল, “আমরা সোহান পালোয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছি।”
লোকটা একটু থমকে গেল। “আপনারা কারা?”
ফারাজ সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিল, “ওর পরিচিত। জরুরি কথা আছে।”
লোকটা মাথা নেড়ে ধীরে বলল, “সোহান ভাই তো এখন বাসায় নাই।”
চিত্রা কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে এল। “কোথায় গেছেন?”
লোকটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “ওনার মায়ের কবর আছে পুরানো কবরস্থানে। মাঝে মাঝে রাতে সেখানে যায়। আজও গেছেন।”
চিত্রা আর ফারাজ একবার চোখাচোখি করল। ফারাজ জিজ্ঞেস করল, “কবরস্থানটা কোথায়?”
লোকটা একটু ইতস্তত করে শেষমেশ ঠিকানাটা বলে দিল। “এই রাস্তা সোজা গিয়ে বাঁ দিকে একটা পুরোনো গেট আছে… ওটাই কবরস্থান। ওনার মায়ের কবর ভেতরে অনেকটা ভেতরের দিকে।”
ফারাজ মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানাল। “ঠিক আছে। ধন্যবাদ আপনাকে।”
লোকটা দরজা বন্ধ করে দিল। গাড়িতে উঠে বসতেই কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো। গাড়ির কাচে রাতের বাতাস হালকা ধোঁয়াটে হয়ে লাগছে। চিত্রা ধীরে বলল,
“রাতে কেউ কি সত্যিই এভাবে কবরস্থানে যায়?”
ফারাজ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে শান্ত গলায় বলল,
“মায়ের কাছে যেতে দিন কিংবা রাতের প্রয়োজন হয়না।”
চিত্রা চুপ করে রইল। কথাটা শুনে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার নেমে এলো। গাড়ি ধীরে ধীরে অন্ধকার রাস্তায় এগোতে লাগল। কিছুক্ষণ পর তারা পৌঁছাল সেই পুরোনো কবরস্থানের সামনে। বিশাল লোহার গেট, অর্ধেক খোলা। ভেতর থেকে কেমন একটা স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ ভেসে আসছে। বাতাসে শিউলি গাছের শুকনো পাতার খসখস শব্দ। ফারাজ গাড়ি থামাল। চিত্রা গেটের ভেতরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সোহান কি সত্যিই এখানে আছে?”
ফারাজ ধীরে দরজা খুলে নামতে নামতে বলল,
“চলো… দেখলেই বুঝতে পারবে।”
কবরস্থানের ভেতরে পা রাখতেই চারপাশের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। দূরে কোথাও রাতজাগা একটা পাখি ডেকে উঠল। তারপর আবার নিস্তব্ধতা। চাঁদের আলো মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে মাঝে মাঝে কবরগুলোর ওপর পড়ছে। পুরোনো কবরের পাথরগুলোতে শ্যাওলা জমে আছে, কোথাও কোথাও নামগুলোও আর স্পষ্ট বোঝা যায় না। চিত্রা আর ফারাজ ধীরে ধীরে ভেতরের দিকে হাঁটছে।
তাদের পায়ের নিচে শুকনো পাতার শব্দ খস… খস… শব্দ তুলছে। কিছুটা ভেতরে যেতেই ফারাজ হঠাৎ থেমে গেল। সে হাত তুলে ইশারা করল সামনে।
চিত্রা তাকিয়ে দেখল দূরের এক কোণে একটা কবরের পাশে কেউ পড়ে আছে। চাঁদের ফ্যাকাসে আলোয় অবয়বটা অস্পষ্ট। কেউ একজন মাটির কাছে ঝুঁকে বসে আছে… যেন কারও সাথে কথা বলছে।
ফারাজ নিচু স্বরে বলল, “ওইটাই… মনে হয় সোহান।”
চিত্রার বুক ধড়ফড় করে উঠল।
ফারাজ ধীরে বলল, “তুমি যাও। তুমি কথা বলো।”
চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল।
“আমি?”
ফারাজ শান্ত চোখে তাকাল তার দিকে। “হ্যাঁ। আমি এখানেই আছি। ভয় পেও না।”
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল চিত্রা। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে সামনে এগোল। প্রতিটা পা যেন ভারী হয়ে উঠছে।
আর একটু কাছে যেতেই সে স্পষ্ট দেখতে পেল কবরটার পাশে মাটিতে প্রায় পড়ে আছে একজন মানুষ।
অগোছালো চুল। ময়লা জামা। দাড়িতে ধুলো জমে গেছে। সে কবরের মাটিতে হাত রেখে বসে আছে… যেন মাটির ভেতর কারও সাথে কথা বলছে।
চিত্রার গলা শুকিয়ে গেল। সে ধীরে ডাকল,
“সোহান…”
কোনো সাড়া নেই। লোকটা নড়লও না। শুধু বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ। চিত্রা আরেকটু এগিয়ে এল।
তার গলায় এবার একটু কাঁপুনি।
“সোহান… শুনতে পাচ্ছেন?”
তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মনে হচ্ছে সে যেন এই পৃথিবীতেই নেই। চিত্রা আরও কাছে গিয়ে দাঁড়াল। এবার প্রায় কবরের পাশেই। তারপর একটু জোরে ডাকল,
“সোহান!” এইবার লোকটার শরীর সামান্য কেঁপে উঠল।ধীরে ধীরে… খুব ধীরে… সে মাথা তুলল।
চাঁদের আলো এসে পড়ল তার মুখে। চিত্রার বুক হঠাৎ ধাক্কা খেল। ওটা সত্যিই সোহান। কিন্তু সেই সোহান না
যাকে সে চেনে। চোখ দুটো লাল। অগোছালো দৃষ্টি।
মুখে ক্লান্তি আর ভাঙনের ছাপ। সে কয়েক সেকেন্ড চিত্রার দিকে তাকিয়ে রইল… তারপর কর্কশ, ভাঙা গলায় বলল,
“কেডা…..?”
চিত্রার গলা নরম হয়ে গেল। “আমি… চিত্রা।”
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। ” তুমি অবশেষে আইলা চিত্রা?”
চিত্রা বেঞ্চে বসে আছে। সোহান দাঁড়িয়ে আছে সামনের গাছটায় হেলান দিয়ে। দু’জনেই চুপচাপ। হঠাৎ চিত্রা বলল, “আজকের এই পরিণতির জন্য তুমি নিজেই দায়ী, এবার এটা মানো কিংবা না মানো।”
“একথা বলার জন্যই বুঝি দেখা দিলা?”
“না, ভাবলাম এই সপ্তাহ শেষে ইতালি চলে যাবো। যাওয়ার আগে আরেক পাপীকে শেষ বারের মতো দেখে যাই। আমি সবই জানি বুঝলে তো? মাহাদী, মারিয়া, মিতালি সহ অসংখ্য নরনারীর গল্প আমার জানা আছে। এত নিষ্পাপের প্রাণ নিয়ে এখনো বেচে আছো কেমন করে? নিজের প্রতি ঘৃণা হয়না? তোমার মায়ের দিকে একবার তাকাও, উনার তো মরে যাওয়ার পরেও হয়তো এমন ছেলে দুনিয়ায় রেখে গিয়ে শান্তি হচ্ছে না। কত মানুষের অভিশাপ তোমার কাঁধে। এই অভিশাপ, এত দাগ তোমার নিষ্পাপ মায়ের গায়ে না লাগালেও পারতে।”
“আমারে বাঁচাইয়া রাখছো কেন? তোমার স্বামীকে কও গুলি করতে।”
“কখনো কখনো বেঁচে থাকার মতো বড় শাস্তি আর একটিও হয়না। এইযে বাঁচিয়ে রাখলাম, এই বাঁচিয়ে রাখার ফলে তোমার রোজ একটা করে মৃত্যু হবে। এরচেয়ে কঠিন কিছু আছে? মরলে একবার মরণের যন্ত্রণা পেতে, আর বেঁচে আছো যতদিন মরণের যন্ত্রণা ততদিন।”
সোহান চুপ করে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার কাছে দেওয়ার মতো কোনো জবাবই নেই। চিত্রা ফের বলল,
“সোহান… তুমি জানো না কি? তোমার সব এই ধ্বংস, এই নষ্টের মূল… তোমার পাপের ফল। তুমি যতই নিজেকে ঢাকতে চাও, শেষমেষ প্রত্যেক পাপীর পরিণতি একটাই। আর তুমি… তুমি সেই পরিণতি নিজেই বেছে নিয়েছ।”
“চিত্রা… মানলাম আমি পাপী… আমি… আমি ভুল করেছি। কিন্তু ফারাজ? তুমি ওরে সুযোগ দিলা আমারে কেন না? এত তফাৎ কেন? আমিও তো তোমারে পাগলের মতো চাইছিলাম।”
“কারণ আমি চাইনি তোমাকে। তুমি আমাকে চেয়েছো আমি ফারাজ এলাহীকে। আর কেন সুযোগ দিলাম জানো? ফারাজ ভালোবাসার খাতিরে পাপ ছেড়েছে, তার হাতে কোনো নিষ্পাপ মরেনি। তবে তুমি? তুমি ভালোবাসার কি বুঝো? ওটা বুঝলে তোমার মায়ের চোখের আড়ালে এত পাপ কখনোই করতে না। তোমার মায়ের প্রতি তোমার ভালোবাসাও বুঝি নাটক ছিল? সত্য ভালোবাসলে মায়ের জন্য পাপ ছাড়তে। তবে মায়ের দিকে তাকিয়েই ওসব ছাড়তে পারলে না, আবার আমাকে বলছো সুযোগ কেন দেইনি? হাস্যকর। তোমার জায়গায় আমি থাকলে কবেই বিষপান করতাম, কারণ এত পাপ করে খোদার বেহেস্তের আশা করাটাও একটা পাপ।”
সোহান দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। চিত্রার প্রতিটা শব্দ তার বুকের ভেতর গেঁথে আছে কাঁটার মতো, নড়লেই রক্ত ঝরবে। হঠাৎ সে হেসে উঠল। এক অদ্ভুত হাসি। “জানো চিত্রা… আমি চেষ্টা করছিলাম। সব ছেড়ে দিতে। কিন্তু মানুষ একবার যখন কাদায় নামে, তখন কাদা ওরে ছাড়ে না… টেনে ধরে, গিলতে থাকে।”
চিত্রা নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল, কোনো সহানুভূতি নেই। “না, সোহান। কাদা কখনো কাউকে টানে না। মানুষ নিজেই কাদায় গড়াগড়ি খায়… তারপর দোষ দেয় কাদার।”
সোহানের গলা কেঁপে উঠল, “আমি কি এতটাই খারাপ? একটুও কি ভালো ছিলাম না?”
চিত্রা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো, চোখ দুটো সোজা তার চোখে স্থির করে বলল, “তুমি ভালো ছিলে… হয়তো কোনো একসময়। কিন্তু তুমি নিজেই সেই মানুষটাকে মেরে ফেলছো। প্রতিদিন, প্রতিটা পাপে একটু একটু করে।” একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল চারপাশে। বাতাসও থেমে গেছে। সোহান ফিসফিস করে বলল, “একবার… শুধু একবার যদি তুমি আমারে বিশ্বাস করতে…”
চিত্রা এবার মুখ ফিরিয়ে নিল। “বিশ্বাস এমন জিনিস না, সোহান… যেটা জোর করে আদায় করা যায়। এটা অর্জন করতে হয়। আর তুমি? তুমি বিশ্বাস না, শুধু ভয় তৈরি করেছো চারপাশে। তোমার মাকে এই জবাব দিতে পারবে? তোমার মাও তোমাকে বিশ্বাস করেছিল। প্রতিদান কি দিলে?”
দূরে ফারাজ দাঁড়িয়ে থাকা ফারাজ হঠাৎ বলল,”হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
চিত্রা ধীরে ধীরে তার দিকে হাঁটা শুরু করল। সোহান হঠাৎ ডেকে উঠল, “চিত্রা…!”
চিত্রা থামল, কিন্তু পেছনে তাকাল না।
সোহানের কণ্ঠ ভেঙে গেল, “আমার জন্য শেষে অভিশাপ রাইখা চইলা যাইতাছো?
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর কাঁপনহীন কণ্ঠে বলল, “ অভিশাপ নয় দোয়া করি… তুমি যেন নিজের পাপগুলার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পাও। কারণ ওখানেই তোমার আসল বিচার হবে।” এরপর আর একবারও পেছনে তাকাল না সে। ফারাজের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ফারাজ একবার সোহানের দিকে তাকাল। তারপর দু’জন একসাথে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে গেল। সোহান দাঁড়িয়ে রইল… একা। চারপাশে গাছগুলো নিশ্চুপ সাক্ষী হয়ে রইল তার ভাঙনের। হঠাৎ সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দু’হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। যেন মাথার ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করছে।
“আমার দোষ… সব আমার দোষ…”
তার কণ্ঠ ফেটে গেল। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। সেই স্নেহভরা চোখ, যেটাকে সে নিজেই কলঙ্কিত করেছে। “আম্মা… আমি পারি নাই…”
এক ফোঁটা, দুই ফোঁটা… তারপর ঝরে পড়তে লাগল অশ্রু। সেই রাতে, প্রথমবারের মতো সোহান পালোয়ান নিজের কাছে ধরা পড়ল। আর সেই ধরা পড়ার যন্ত্রণাই… তার জন্য সবচেয়ে বড় শাস্তি হয়ে রইল।
চিত্রা ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির দরজার কাছে এসে থামল। ফারাজ আগে থেকেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে। “আসো,” খুব নিচু স্বরে বলল ফারাজ।
চিত্রা কিছু না বলে উঠে বসল গাড়িতে।
গাড়ি স্টার্ট দিল ফারাজ। হেডলাইট কেটে দিল অন্ধকার, রাস্তা ফাঁকা। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
হঠাৎ “ফারাজ…”
ফারাজ আড়চোখে তার দিকে তাকাল, “হুম?”
চিত্রা একটু গুটিসুটি হয়ে বসল, তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, “আমার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে।”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকাল, “এখন?”
“হুম, এখনই।”
“চিত্রা, রাত কয়টা বাজে দেখছো?”
“দেখেছি। তাতে কি?”
ফারাজ একদম সোজা হয়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত চেপে ধরল, “ঠাণ্ডা জিনিস এই সময়ে খাওয়া ঠিক না। তুমি এখন”
চিত্রা মাঝপথেই থামিয়ে দিল, “আমি মা হতে চলেছি, তাই খেতে ইচ্ছে করছে।”
ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “এইটাই তো এখন সমস্যা। এসব এখন একদম চলবে না।”
চিত্রা তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে একরাশ জেদ… আর শিশুসুলভ আকুতি।
“আমি খুব বেশি কিছু চাইছি?”
ফারাজ চুপ। “একটা আইসক্রিম… এইটুকুই।”
ফারাজ এবার হেসে ফেলল। “তুমি জানো, তুমি ভয়ংকর রকমের জেদি?”
চিত্রা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তোমারই বাচ্চা বহন করছি… জেদ তো থাকবেই।”
ফারাজ মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে… থাকো এখানে।”
গাড়িটা রাস্তার পাশে থামাল সে। দূরে একটা ছোট্ট দোকানের নীয়ন আলো টিমটিম করছে।
ফারাজ ইঞ্জিন বন্ধ করে চিত্রার দিকে ঘুরে বলল, “নামবে না। আমি নিয়ে আসছি।”
চিত্রা সিটে হেলান দিয়ে বলল, “দুটো আনবে।”
“দুটো?”
“হুম। একটা আমার জন্য… একটা আমার বেবির জন্য।”
ফারাজ এবার হেসে মাথা নিচু করল, “ঠিক আছে, বিবিজান।”
দরজা খুলে নামার আগে একটু থামল সে। ঝুঁকে এসে খুব আলতো করে চিত্রার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“নড়াচড়া করবে না। আমি জলদি আসছি।”
চিত্রা চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ডের জন্য। ফারাজ দরজা বন্ধ করে চলে গেল অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে সেই আলো ঝলমলে দোকানের দিকে। গাড়ির ভেতর একা চিত্রা। বাইরে বাতাসে হালকা বাতাস, দূরে কুকুরের ডাকে রাতটা আরো নির্জন হয়ে উঠছে। চিত্রা নিজের পেটে হাত রাখল। খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“তোর আব্বুটা না… খুব রাগী, কিন্তু খুব ভালোও।”
হঠাৎ ঠক… ঠক শব্দ হয় জানালায়। কে যেন জানালায় টোকা দিলো। চিত্রা চমকে উঠে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা মুখ ধীরে স্পষ্ট হলো।একজন বৃদ্ধ লোক। এলোমেলো দাড়ি, কাঁধে ছেঁড়া চাদর, চোখে ক্লান্তি আর আতঙ্কের মিশ্র ছাপ।
“মা… একটু সাহায্য করবা?” কাঁপা গলায় বলল লোকটা।
চিত্রার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল।মায়া আর সন্দেহের মাঝামাঝি কোথাও।
“কি হয়েছে আপনার?”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগিয়ে এলো, “ওপাশে… আমার ছেলেটা অসুস্থ… ঔষধ কিনতে পারতেছি না… একটু টাকা দিলে বাঁচাইতাম মা…”
চিত্রার মন গলল। সে ব্যাগটা টেনে নিল কোলে। চেইন খুলতে খুলতে বলল, “একটু দাঁড়ান…”
লোকটা আরো কাছে ঝুঁকে এলো জানালার দিকে।
চিত্রা ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করল। তারপর জানালার লক খুলতে হাত বাড়াল। জানালাটা অল্প নামতেই সবকিছু ঘটে গেল এক মুহূর্তে। লোকটার হাত বিদ্যুৎগতিতে ঢুকে পড়ল ভেতরে। চিত্রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা শক্ত, রুক্ষ হাত তার গলা চেপে ধরল! “আহ—!” চিত্রা চিৎকার করতে গেল, কিন্তু আরেকটা হাত সাথে সাথে তার মুখ চেপে ধরল।
“চুপ! একদম চুপ!”
চিত্রার চোখ বিস্ফারিত। সে ছটফট করতে লাগল, হাত দিয়ে ঠেলতে চেষ্টা করল, কিন্তু গলার ওপর চাপ এতটাই শক্ত যে নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে।
“ম্ম… ম্ম…!” লোকটা পকেট থেকে দ্রুত একটা ভেজা রুমাল বের করল। চিত্রা মাথা ঝাঁকাতে লাগল। “না… না…!” কিন্তু কোনো সুযোগ পেল না। রুমালটা জোর করে তার নাক-মুখে চেপে ধরা হলো। তীব্র একটা গন্ধ।
চিত্রার শরীর ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে আসছে। হাতের শক্তি কমে যাচ্ছে। দৃষ্টি ঝাপসা। শেষবারের মতো সে চোখ তুলে তাকাল অন্ধকারে লোকটার মুখটা আর বৃদ্ধের মতো লাগছে না… একটা হিংস্র, নিষ্ঠুর ছায়া লুকিয়ে সেখানে। তারপর সব অন্ধকার।
কিছুক্ষণের মধ্যে দূরের দোকানের নীয়ন আলো থেকে বেরিয়ে আসছে ফারাজ। হাতে দু’টা আইসক্রিম। একটা ভ্যানিলা, একটা চকোলেট। ঠাণ্ডা ধোঁয়া উঠছে কাপের গা বেয়ে। হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির দিকে এগিয়ে এলো।
হেডলাইট নিভে থাকা গাড়িটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ফারাজ ভ্রু কুঁচকাল। আরো কাছে এলো। তার পা হঠাৎ থেমে গেল। গাড়ির দরজা অল্প খোলা।
ভেতরে কেউ নেই। তার চোখের মণি হঠাৎ কেঁপে উঠল।
“চিত্রা…?”
সে দ্রুত দরজা খুলে ভেতরে তাকাল। সিট খালি।
“চিত্রা!” কণ্ঠে এবার স্পষ্ট আতঙ্ক।
সে দ্রুত চারপাশে তাকাতে লাগল। সবটা ফাঁকা। হাতের আইসক্রিমগুলো কাঁপতে শুরু করল তার আঙুলে।
সে তাড়াতাড়ি ফোন বের করে ডায়াল করল। রিং যাওয়ার কথা কিন্তু শব্দটা গাড়ির ভেতর থেকেই ভেসে এলো। ফারাজ জমে গেল। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল সিটের দিকে। চিত্রার ফোনটা সেখানেই পড়ে আছে। একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল তার মেরুদণ্ড বেয়ে।
হঠাৎ পাগলের মতো চারদিকে ছুটতে শুরু করল।
“চিত্রা!!” তার গলা ফেটে যাচ্ছে, “চিত্রা! কোথায় তুমি?!” গাছের আড়ালে, রাস্তার পাশে, অন্ধকারে প্রতিটা কোণায় খুঁজতে লাগল সে।
“চিত্রা… প্লিজ… বের হও…”
দৌড়াতে দৌড়াতে সে থেমে গেল একসময়। হাঁপাচ্ছে। বুক উঠানামা করছে দ্রুত। চারপাশে শুধু অন্ধকার।
কোনো উত্তর নেই। সে ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।
“আমি… আমি তো শুধু পাঁচ মিনিটের জন্য গেলাম…”
কণ্ঠ ভেঙে আসে ফারাজের। ঠিক তখনই পেছন থেকে হালকা একটা খস খস শব্দ এলো। ফারাজ ঘুরে তাকানোর আগেই একটা ভারী আঘাত তার মাথায়।
সবকিছু কেঁপে উঠল। তার হাত থেকে আইসক্রিমগুলো ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। সে টলতে টলতে মাথায় হাত দিল। আঙুল ভিজে গেল রক্তে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে তার। সে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল
“কে…?”
কিন্তু আরেকটা আঘাত! এইবার আরও জোরে। দুনিয়া যেন ভেঙে পড়ল তার ওপর। ফারাজ আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধীরে ধীরে শরীরটা ভেঙে পড়ল মাটিতে। আইসক্রিমগুলো গড়িয়ে এসে থামল তার পাশেই। একটা উল্টে গিয়ে গলতে শুরু করেছে।
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯১
চকোলেটটা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে… ঠিক যেমন রক্তটা ছড়িয়ে যাচ্ছে তার কপাল থেকে। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে। শ্বাস ধীর হচ্ছে। চোখ আধখোলা। কিন্তু সেই নিস্তেজ চোখও যেন খুঁজছে, চিত্রাকে। ঠোঁট কাঁপল তার। “চি…ত্রা…” শব্দটা বের হওয়ার আগেই গিলে ফেলল অন্ধকার। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো।
সবকিছু ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। শেষ আলোটুকু নিভে যাওয়ার আগে তার চোখে শুধু একটাই ছবি ফুটে উঠল। তা তার বিবিজানের। তারপর কেবলই নিকষ কালো আঁধার।
