চেকমেট ২ পর্ব ২৯
সারিকা হোসাইন
নিজের পোশাক পাল্টে গটগট পায়ে শাহরান বেরিয়ে গেল নিজের ঘর থেকে।ড্রয়িং রুমে নামতেই রূপকথার মুখোমুখি হলো।বিরক্তিতে উষ্ণ শ্বাস ফেলে শক্ত গলায় শাহরান বলে উঠলো ―
“মেয়েটাকে কম করে প্রশ্রয় দাও মা।বেশি মাথায় উঠে যাচ্ছে।”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলে উঠলো -;
“তুমি চাও না ও মাথায় উঠুক?”
শাহরান জবাব দিলো না।সে মাথা নিচু করে বাইরে বেরিয়ে গেলো।ছেলের যাবার পানে অনিমেষ তাকিয়ে রইলো রূপকথা।ছেলেটার মনে কি চলছে রূপকথা জানে না।কিন্তু সে পুরোপুরি নিশ্চিত শাহরান আজও রোদকে ভুলে নি।ভুললে এতদিন ঠিক বিয়ে করে সংসার পাততো।মেয়েটার মাঝে এখনো আটকে আছে সে।হয়তো রোদের ভালোবাসা কতখানি খাঁটি তা যাচাইয়ে এতটা কঠিন রূপ ধারণ করেছে।নয়তো ছেলেকে কখনো এতগুলো বছরে এমন কঠিন দেখেনি সে।আচ্ছা রোদ কি পারবে শাহরানের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টের শক্ত পাথুরে দেয়ালটাকে ধ্বসিয়ে দিতে?মেয়েটার ভালোবাসার গভীরতার খাদ কতখানি?অবহেলা,অভিযোগ,অনুযোগে শাহরানের মনে যেই কষ্টের পাহাড় উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বিশালতা যে আকাশচুম্বী!
রূপকথার ভাবনার মাঝেই ধীরপায়ে বেরিয়ে এলো রোদ।এরপর বিমর্ষ মুখে বলে উঠলো ―
“বাড়ি যাচ্ছি আন্টি।ভালো থাকবেন।আবার দেখা হবে কোনো একদিন।’
ভাবনা ছেড়ে বেরিয়ে হকচকিয়ে উঠলো রূপকথা।এরপর নিজেলে ধাতস্থ করে শুধালো―
“সেকি না খেয়েই চলে যাবে?খেয়ে যাও।”
মাথা নিচু করেই মাথা নাড়লো রোদ।শাহরানের অবজ্ঞা ,অবহেলায় চোখ ফেটে বান। ভাসতে চাচ্ছে।গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে চূড়ান্ত কষ্ট।তাদের বিষাক্ত নীল ব্যাথায় বিষিয়ে উঠছে গলা।কথা বলার ক্ষমতা বিন্দু মাত্র অবশিষ্ট নেই আর।তবুও রোদ নিজেলে সামলে অল্প ভগ্ন গলায় বলল ―
“খিদে নেই।আসছি।”
বলেই বেরিয়ে গেলো রোদ।রূপকথা প্রস্তর মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখলো সব।মনে মনে ভাবলো―
“আকস্মিক কি হলো দুজনের?আবার ভুল বোঝাবুঝি নাকি অন্য কিছু?”
ভাবনা ফেলে নিজের কাজে মন দিলো রূপকথা।আজ ছুটির দিন ।ভেনেছিলো পরিবারের সবার সাথে আনন্দের সময় কাটাবে।কিন্তু সব কিছু কেমন বিষাদে ছেয়ে গেলো হঠাৎ।
রোদ নিজ বাড়িতে এসে দরজায় সিটকিনি টেনে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বালিসে মুখ গুজে গুমরে কেঁদে উঠলো।শাহরানের পক্ষ থেকে পাওয়া সামান্য অবহেলা তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে বারংবার।অথচ বিগত দকন গুলিতে কত নিঠুর ভাবেই না সে শাহরানকে ক্ষতবিক্ষত করেছে কথার চাবুকে।রোদের ইচ্ছে হলো মরে যেতে।এই কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা তার নেই।তবে শাহরান?সে কিভাবে এতগুলো বছর এভাবে প্রতিনিয়ত সহ্য করে গেছে?
রোদের অবচেতন মন বললো ―
“সামনা সামনি কথা বলে সবটা মিটিয়ে নে।ও তোকে এখনো ভালোবাসে।তোর ভালোবাসা কতটা পোক্ত তা পরিমাপ করছে ওই গম্ভীর পুরুষ।পরীক্ষা নিচ্ছে তোর।এখানে ফেইল করলেই তোর জীবনের সমাপ্তি ঘটবে।প্রচন্ড ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে তোল তাকে।পূর্ণতা আসবে।”
মনের জোড়ে বিছানা থেকে উঠে বসলো রোদ।হাতের করপুটে চোখের জল মুছে বলে উঠলো ―
“তোমার চাইতেও আমি বেহায়া হবো শাহ।কতবার ফেরাবে আমায়?একবার,দুই বার,হাজার বার?এরপর?”
বিকেলের প্রারম্ভে লেক গার্ডেনের সুন্দর বসার জায়গায় কফি পান করছে প্রিয়ন্তী আর নিনাদ।ইলিয়ানা আসবে দেখা করতে।ছুটির দিন জন্য নিনাদের সাথে জোড় বেঁধে চলে এসেছে প্রিয়ন্তী।উদ্দেশ্য তাদের বিরক্ত করা নয়।বরং সুন্দর জায়গায় কিছুক্ষন সময় কাটানো।কফি খেতে খেতে নিনাদ বলে উঠলো ―
“তোর বান্ধবী রোদসী শাহরানকে একদম চিপকে ধরেছে।এর সবই নাটক বুঝলি?যেই দেখেছে শাহরান প্রতিষ্ঠিত অমনি একদম হামলে পড়েছে।খুব সুযোগ সন্ধানী মেয়েটা।একদম বাপের মতো।”
প্রিয়ন্তী মাথা নাড়লো।বললো ―
“তোমার কোথাও একটা ভুল হচ্ছে ভাইয়া।রোদকে আমি যতদূর চিনি ও তেমন মেয়েই না।ঘটনার পেছনেও ঘটনা থাকে।আমার মনে হয় সে শুরুতেই শাহরানকে ভালোবাসতো।কিন্তু ওর বাবার ভয়ে বলতে পারেনি।”
নিনাদ মেয়েদের মতো মুখ বাকালো।তেঁতে উঠে বললো ―
“তাইলে মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে জেলে পাঠালো কেন?
“কোন টাকে মিথ্যে সাক্ষি। বলছো তুমি?ও কি পুলিশের কাছে বলেছে সে খু ন করতে দেখেছে?
বোনের উপর ক্ষিপ্ত হলো নিনাদ।সে চোখ রাঙিয়ে বললো ―
“বান্ধবীর হয়ে ভাইয়ের মুখে মুখে কথা বলছিস?তোর বুক কাঁপছে না?
“না কাঁপছে না।কারন মেয়েটা পরিস্থিতির শিকার।রুদ্র আংকেল কে আমরা সবাই ভালোভাবে চিনি ।সারফরাজ আংকেলের সাথে উনার একটা লুকোচুরি লুকোচুরি টাইপ সম্পর্ক।মেয়েকে সে এই পরিবারে বিয়ে দিবে না এটাই স্বাভাবিক।বাবা কি বলেছিলো শুনো নি?”
“খালামণিকে রুদ্ররাজ বিয়ে করতে কিডন্যাপ করেছিল সেটা?
প্রিয় মাথা ঝাঁকালো।বললো ―
“এত বড় ঘটনার পর খালামনির সামনে কিভাবে দাঁড়াত সে?এই জন্যই মেয়েকে সামলাতে চেয়েছিলো।
“কিন্তু এটা তো সকলেই ভুলে গিয়েছে।”
“গেলেই কি?জীবনের চূড়ান্ত লজ্জাজনক কাজ কেউ ভুলতে পারে।তাছাড়া পাছে এসব রোদসী জেনে যায় সেজন্যই আংকেল শাহরানের থেকে রোদকে দূরে রাখতে চেয়েছে।
“তুই কি করে জানলি এটা?
অবাক হয়ে শুধালো নিনাদ।কফিতে ছোট ছিপ দিয়ে প্রিয়ন্তী বলে উঠলো ;
“ঘটনা জলের মতো পরিষ্কার।বিশ্বাস না হলে রুদ্ররাজ চৌধুরী কে গিয়ে জিজ্ঞেস করো।আমি গেলাম।তোমার প্রেমিকা এসে গেছে।
বলেই কফি জার নিয়ে উঠে দাঁড়ালো প্রিয়ন্তী।নিজের হবু স্ত্রীকে একপলক তাকিয়ে দেখল নিনাদ।আহ বুকে ধারালো চাকুর কোপ পড়লো ওই হরিণী নজরে।নিনাদ ককিয়ে উঠলো।বুক চেপে ধরে হা করে রইলো।ইলিয়ানা বিরক্ত হয়ে চেয়ার টেনে বসে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলো ;
“নাটক বন্ধ করো।মানুষ তোমার তামাশা দেখে হাসছে।
“আমি সত্যিই মরে যাচ্ছি ঘাতকিনী কোথাকার।”
চোখ উল্টে ফস করে শ্বাস ছেড়ে ইলিয়ানা বলে উঠলো ―
“ঠিক আছে তুমি মরে যাও।আমি চলে যাচ্ছি।
তাৎক্ষণিক স্বাভাবিক ফর্মে ফিরে এলো নিনাদ।এরপর হো হো করে হেসে বলে উঠলো ―
“ভালো হয়ে গেছি।এই দেখো বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে না আর।
ইলিয়ানা চুল ঠিক করে বলে উঠলো ;
“তুমি এতো জোকার কেনো?
“কেনো তোমার পছন্দ নয়?
“নাহ।সব সময় এমন করলে রাগ উঠে।
“ঠিক আছে এখন থেকে শাহরানের মতো না হেসে শক্ত চোখে মুখে বসে থাকবো।হ্যাপি?
ইলিয়ানা ফস করে শ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলো;
“বাসায় জানিয়েছিলে বিয়ের কথা?
নিনাদ মাথা ঝাঁকালো।বললো ―
“বাসার সবাই এই মাসেই বিয়ের ডেট দিতে চাইছে।তুমি কি বলো?
ইলিয়ানা প্রশস্ত হেসে বললো ―
“আমার আপত্তি নেই।তোমাদের যেটা ভালো মনে হয়।
পরের দিন খুব সকাল সকাল ভার্সিটি এলো রোদ।এসেই উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগলো শাহরান কখন আসে।মুহূর্তের মাঝেই রোদকে খুশি করে ভার্সিটির গেট পেরিয়ে ছুটে এলো শাহরানের কালো রঙের গাড়িটি।রোদ লাজুক হাসলো ।বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।কিছুটা ভয় কিছুটা লজ্জা।আকস্মিক কোমরের কাছে শাহরানের স্পর্শের কথা মনে পড়তেই কেঁপে উঠলো রোদ।কেমন দম বন্ধকর মুহূর্ত।
শাহরান গাড়ি থেকে নেমে তিন তলার বারান্দার দিকে তাকালো।মুহূর্তেই দুজনের দৃষ্টি মিলিত হলো।রোদ ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে রইলো।শাহরান তাৎক্ষণিক চোখ নামিয়ে শার্টের হাত গুটাতে গুটাতে অফিস রুমের দিকে অগ্রসর হলো।
ক্লাস রুমে ঘটলো আরেক বিপত্তি।রোদ মেয়েটা কেমন অদ্ভুত নজরে খুবলে খাচ্ছে শাহরান কে।বইয়ের পাতায় নজর না রেখে একদম শাহরানের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে রয়েছে।এহেন পরিস্থিতিতে লেকচার দিতে বেশ অসুবিধায় পড়লো শাহরান।সে বার কয়েক ডেস্কে থাকা বোতল থেকে ঢকঢক করে পানি খেলো।মেয়েটার চোখ অফিমের মতো নেশালো।অদ্ভুত শিহরণ জাগে শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।শাহরান চশমা ঠিক করার বাহানায় বার কয়েক সেই নজর দেখে ফাঁকা ঢোক গিললো।মনে হচ্ছে তার মাথা ঘুরিয়ে বেহুশ হয়ে যাচ্ছে সে।
সেই নজর মাথা থেকে সরিয়ে কঠিন মনে লেকচারে মন বসালো শাহরান।কঠিন এক চ্যাপ্টার।মুহূর্তে মুহূর্তে কঠিন ম্যাথের সমাধান।সেখানে মেয়েটি ইচ্ছে করে তাকে জ্বালাচ্ছে।
এদিকে সমীকরণ মেলাতে ঘাম ছুটে যাচ্ছে কঠিনের খোলসে আবৃত মানবের।
সুযোগ বুঝে রোদ অদ্ভুত এক কান্ড ঘটালো।সকলের অলক্ষে চুমু ছুড়ে দিলো শাহরানের পানে।এবার চেঁচিয়ে উঠলো শাহরানের।ধমকে বলে উঠলো ―
“গেট আউট ফ্রম মাই আই সাইট”
শাহরানের ধমকে ক্লাসের সকলে কেঁপে উঠলো।কিন্তু রোদ নির্বিকার।সে নিজের ব্যাগ নিয়ে ধীরে ধীরে ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে গেলো।এরপর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চোখ টিপলো।
আজকের আবহাওয়া যথেষ্ট গরম মনে হলো শাহরানের কাছে।বুকের কাছের বোতাম খুলে টাইয়ের নট ঢিলে করেও রেহাই পেল না।এসির টেম্পারেচার কমালো।এদিকে ঠান্ডায় কাঁপুনি উঠলো ক্লাসের সকলের।কিন্তু কুলকুল করে ঘেমে ভিজে যাচ্ছে শাহরান।
কোনো মতে ক্লাস শেষ করে বাইরে বেরিয়ে এলো শাহরান।ইচ্ছে মতো ছবক শেখাতে আশেপাশে রোদকে খুজলো সে।কিন্তু মেয়েটি নিরুদ্দেশ।তপ্ত শ্বাস ফেলে নিজের কেবিনের দিকে এগুলো সে।পঁয়তাল্লিশ মিনিটে মেয়েটা তাকে একদম নাজেহাল করে ছেড়েছে।বাপরে কি সাংঘাতিক ফাজিল মেয়ে।
শাহরান নিজের কেবিন এসে দরজা লক করে ধপ করে চেয়ারে বসে গেলো।সুইভেল চেয়ারে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করতেই কারো উপস্থিতি টের পেলো।ত্বরিত চোখ খুলতেই রোদকে চোখের সামনে দেখে দাঁত পিষে লাফিয়ে উঠতে চাইলো।কিন্তু ঝড়ের গতিতে শাহরানের কোলে বসে টাই টেনে ধরলো রোদ।বললো ―
“এতো ভাব দেখাচ্ছেন কেনো?একটু না হয় ভালোই বাসতে চেয়েছি।তাতে এতো দেমাগের কি আছে?
শাহরান নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলে উঠলো ―
“তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করছো।তোমাকে বলেছি না তোমার প্রতি আমার কোন ইন্টারেস্ট নেই।আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি?
রোদ শাহরানের কপালে তর্জনী আঙ্গুলি ছুঁইয়ে সেটা স্লাইড করতে করতে ঠোঁটের কাছে এসে থামালো।এরপর ঠোঁট টিপে ধরে বলে উঠলো ―
“সব মিথ্যে।আমি বিশ্বাস করি না।
শাহরান দাঁত চেপে বসে রইল।মেয়েটা জানে সে কি ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে?এভাবে কতক্ষন ভদ্র সাধু সেজে বসে থাকা যায়?এতবড় মেয়ে হয়েছে এখনো এসব কিছু বুঝে না সে?যদি শাহরান পাল্টা আক্রমণ করে বসে তখন?তখন তো লাজুক লতার ন্যায় চুপসে মরে যাবে।
রোদ শাহরানের অ্যাডাম অ্যাপলে আঙ্গুল ছোঁয়াল।চোখ বন্ধ করে ভারী শ্বাস ফেললো শাহরান।এরপর তাৎক্ষণিক রোদের গলা টিপে বলে উঠলো ―
“ভুল করছো।পস্তাবে।সরে যাও এখনো সময় আছে।
রোদ শাহরানের ঠোঁটের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে উঠলো ―
“সাত বছর ধরে পস্তাচ্ছি।আর কতো?
রোডের চোখে চোখ রাখলো শাহরান।এই চোখে কোন ছলনা নেই,নেই কোনো বাহানা।পুরোটা সত্য দিয়ে ছাওয়া।
সহসাই রোদের চোখ থেকে দুফোঁটা জল খসে পড়লো।সে শক্ত করে শাহরানের গলা জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো ।প্রথম বারের ন্যায় আকুল হয়ে জানালো স্বীকারোক্তি –
“তোমার ভালোবাসা আমি কখনোই মন থেকে ফেরাতে পারিনি শাহরান।বাবার ভয়ে আমি শুধুমাত্র তা প্রকাশ করতে পারিনি।তুমি শুধু আমার মুখের কথা গুলো শুনেই দূরে সরে গেলে।আমার চোখে চোখ রেখে কাতর ভাষা গুলো পড়লে না।তুমি তো আমার চাইতেও নিষ্ঠুর।তোমার অভাবে আমি প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করেছি।আর তুমি দিব্যি শক্তিমান হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ।”
রোদের মুখের কথা গুলো শুনে শাহরানের প্রশস্ত বুক জুড়ে টাইফুনের তান্ডব বয়ে গেলো।সব কিছু অবিশ্বাস্য লাগছে।বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।পলক ফেলতে ভুলে গেল শাহরান।শুধু স্তব্ধ মূর্তির মতো চেয়ারে হেলে বসে রইলো।
হু হু করে কেঁদে ভাসালো রোদ।তার চোখের জলে শাহরানের কাঁধ ভিজে গেলো।রোদ শাহরানের কাঁধ ছেড়ে দুই হাতের আজলায় শাহরানের মুখ ভরে বলে উঠলো ―
“আমি তোমাকে ভালোবাসি শাহরান।খুব খুব খুব।প্লিজ তুমি আর অভিমান করে থেকো না।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।এবার আমি সত্যিই মরে যাবো।
মেয়েটার চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে।সফেদ গাল দুটো পাকা টমেটোর ন্যায় টকটকে।টেবিলের উপর থেকে টিস্যু নিয়ে ছোট বাচ্চাদের মতো করে রোদের চোখ মুছল শাহরান।এরপর নাক।
দুজনেই যখন চূড়ান্ত ঘোরের মাঝে এমন সময় দরজায় নক হলো।
শাহরান চমকে উঠলো।প্রিন্সিপাল ড্যারেক ডেকে উঠলো ―
“মিস্টার শাহরান?may i come in?
শাহরান ঝটকা দিয়ে রোদকে দাঁড় করিয়ে নিজের টাই ঠিক করলো।বদ্ধ কক্ষে এই ভার্সিটির স্টুডেন্ট কে ভদ্রলোক দেখতে পেল এখনই এক কঠিন তামাশা শুরু হয়ে যাবে।চুনকালি পড়বে একদম মুখের মধ্যে।শাহরানের মুখ ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো।সে রোদকে বলে উঠলো
“লুকাও।
রোদ ভ্যাবাচেকা খেয়ে পালানোর জায়গা খুজলো।স্টিলের আলামরি আর একটা ছোট কাবার্ড ছাড়া এখানে কিছুই নেই।অগত্যা নিজের টেবিলের নিচে রোদকে লুকিয়ে দরজা খুললো শাহরান।
প্রিন্সিপাল হাসি হাসি মুখে বসলো একটা চেয়ার টেনে।এরপর বললো ―
“আগামী সপ্তাহে আমার ছোট মেয়ের বিয়ে।তোমাকে বিশেষ ভাবে বলতে এসেছি।যেতেই হবে।
বলেই একটা কার্ড বের করলো।তাৎক্ষণিক সেই কার্ড হাতে নিয়ে বেকায়দায় হাসলো শাহরান।কিন্তু ভয়ে ভেতর পর্যন্ত জমে গিয়েছে তার।প্রিন্সিপাল আকস্মিক শাহরানের কাঁধ ইশারা করে বলে উঠলো ―
“ভিজলে কিভাবে?”
কাঁধের দিকে নজর দিকে চমকে উঠলো শাহরান।মনে মনে বললো ―
“চোখ নাকি ফারাক্কার বাঁধ?
এরপর তাৎক্ষণিক বলে উঠলো ―
“পানি খেতে গিয়ে ভিজে গেছি।
বয়স্ক প্রিন্সিপাল কপাল কুঁচকে বললো―
“বুক ভেজার কথা।
শাহরান হা হা করে হেসে বললো
“আমার পানি খাওয়ার স্টাইল আলাদা।
প্রিন্সিপাল বিশ্বাস করলো কি না কে জানে?শুধু হা হা করে তাল মিলিয়ে হাসলো।বেকায়দায় কান্না করার ভঙ্গিতে শাহরান ও হো হো করে হাসলো।এরপর বললো ―
চেকমেট ২ পর্ব ২৮
“আমার ক্লাস আছে এখন।আমাকে যেতে হবে।
প্রিন্সিপাল মাথা ঝাকিয়ে উঠে দাঁড়ালো ।এরপর শাহরানকে নিয়েই বেরিয়ে গেলো।যাবার আগে শাহরান পেছন পানে এক পলক তাকালো।এরপর ফাঁকা ঢোক গিলে বেরিয়ে গেল ক্লাসের উদ্দেশ্যে ।
