Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২১

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২১
আয়াত বিনতে নূর

এর মাঝে নিশিতার নাচ শেষ হলো।
হলজুড়ে তখনও হাততালির রেশ। আলো ঝলমল স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিশি শেষবারের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাল। ওর কপালে ঘাম চিকচিক করছে, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। নাচটা শেষ হলেও ওর ভেতরের উত্তেজনা এখনো শেষ হয়নি।

ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ করেই ফারিসের মনে হলো নিশিতা তাকে মিথ্যা কথা বলেছে।
এই অনুভূতিটা যেন আচমকা এসে বুকের ভেতর কামড় বসালো। ফারিস ঠোঁটের কোণে ব্যঙ্গের একটা হাসি টানলো। বাইরে থেকে সেটা হাসি হলেও ভেতরে ভেতরে যেন আগুন জ্বলছে।
চোখ দুটো স্থির, কিন্তু চিন্তাগুলো অস্থির। মনে মনে বলল—
“মিথ্যা কেন বললি জানিস? তুই যদি বলতিস যে নাচ করবি, আমি কি তোকে না বলতাম?
আমি কি তোকে আটকে রাখতাম?
নাকি তোকে নিজের মতো করে উড়তে দিতাম না?”
এই প্রশ্নগুলো একটার পর একটা ওর মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগলো। নিশিকে নিয়ে ওর যে বিশ্বাস, যে অধিকারবোধ—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে টালমাটাল হয়ে গেল। এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ফারিসের চোখ গিয়ে পড়লো নাভিদের দিকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নিশিতা স্টেজ থেকে নামছে।
স্টেজের আলো থেকে নেমে আসতেই নিশিতার চারপাশটা একটু অন্ধকার লাগলো। তখনই নাভিদ এগিয়ে গেল। মুখে সেই চেনা আত্মবিশ্বাসী হাসি, চোখে প্রশংসার ঝিলিক।
নাভিদ নিশির সামনে দাঁড়িয়ে বলল—
“দারুণ হয়েছে নিশি। তুই তো অনেক সুন্দর নাচতে পারিস।”
কথাগুলো সাধারণ হলেও কণ্ঠের ভেতরে আলাদা একটা আন্তরিকতা ছিল। এমন একটা প্রশংসা, যা শুনলে যে কারো ভালো লাগবে।
নিশি এক মুহূর্তের জন্য তাকালো। চোখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো লজ্জা নেই—শুধু একরকম ক্লান্ত নির্লিপ্ততা। ঠোঁট একটু নড়লো মাত্র।

“হু…”
এই ছোট্ট শব্দেই কথাটা শেষ করে দিল সে।
কিন্তু দূর থেকে দৃশ্যটা ফারিসের চোখে একদম অন্যরকম লাগলো।
নিশিতা আর নাভিদের এই সামান্য
কথোপকথনটুকু ফারিসের ভেতরের রাগকে যেন
তিরতির করে বাড়িয়ে দিল। বুকের ভেতর জমে থাকা আগুন হঠাৎ করেই দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
পেশিগুলো টানটান হয়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠলো।
হাত দুটো অজান্তেই মুঠো পাকিয়ে ফেললো সে।
রাগের তোপে চোখ দুটো লাল হয়ে গেল, যেন যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটবে।
ফারিসের মাথার ভেতর তখন একটাই কথা—

—”আমার সামনে না বলেও, আমার চোখের আড়ালে এসব কেন? ” আমি তোর কাছে কিছুই না?””
এই পরিবর্তনটা রাজীবের চোখ এড়ালো না।
ফারিসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজীব ওর দিকে একবার তাকিয়েই বুঝে গেল—কিছু একটা ভয়ংকর হতে যাচ্ছে। ফারিস যখন এমন হয়ে যায়, তখন পরিস্থিতি সামলানো কঠিন।
রাজীব অজান্তেই একটু ঘাবড়ে গেল। গলা শুকিয়ে এলো। মনে মনে ভাবলো—
এই মুহূর্তে যদি ফারিস কিছু করে বসে… তাহলে পুরো প্রোগ্রামটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
হলের ভেতর তখনও হাততালি, হাসি আর আনন্দের শব্দ— কিন্তু ফারিসের ভেতরে তখন শুধুই রাগ, অবিশ্বাস আর দমবন্ধ করা প্রশ্ন।

তারপর রাজীব ফারিসকে কিছু বলতে বা কিছু করতে উদ্যত হতেই ফারিস তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলো। সেই ইশারায় ছিল না কোনো দ্বিধা, ছিল না কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ—শুধু কঠোর আদেশ। মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল।
চোখে জমে উঠলো অদ্ভুত এক রাগ, যা সে সচরাচর প্রকাশ করে না।
এরপর ইচ্ছে করেই কণ্ঠটা খাদে নামিয়ে, চাপা
অথচ দৃঢ় স্বরে বলল—
“এক্ষুনি বাইরে চল।”
এই একটুকু কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল অনেক না বলা কথা, অনেক অজানা ঝড়। আর কিছু না বলেই সে গটগট করে সামনে এগিয়ে গেল, যেন এক মুহূর্তও দেরি করা তার পক্ষে অসম্ভব।
তার হাঁটার ভঙ্গিতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল—ভেতরে ভেতরে সে নিজেকেই সামলাতে পারছে না।
রাজীব প্রথমে একটু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ফারিস এমন আচরণ খুব কমই করে। তবু প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
শুধু নীরবে তার পেছনে পেছনে বেরিয়ে গেল। রাজীবের মাথার ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল—হঠাৎ করে ফারিসের হলোটা কী?

বাইরে এসে ফারিস আর এক সেকেন্ডও ভাবলো না। পকেট থেকে ফোন বের করে সরাসরি নিহানকে কল দিল।
কল ধরতেই ফারিসের গলায় জমে থাকা রাগ যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠলো। নিচু অথচ বিপজ্জনক স্বরে সে কিছু একটা “ব্যবস্থা” করার কথা বলল—
ঠিক কী ব্যবস্থা, রাজীব কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু বুঝলো, ফারিস এখন এমন অবস্থায় আছে যেখানে যুক্তি কাজ করছে না।
রাগ তাকে হেতাহেয়াত করে ফেলেছে।
মাথার ভেতরের চিন্তাগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে, ঠিক–ভুলের সীমারেখা ঝাপসা। ফারিস নিজেও হয়তো বুঝতে পারছে না, সে আসলে কী করতে চাইছে।

রাজীব পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছে, কিন্তু কিছুই মিলাতে পারছে না। কয়েক মিনিট আগেও যে ফারিস ছিল শান্ত, নিয়ন্ত্রিত—সে এখন যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। এই পরিবর্তনটা রাজীবকে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিতে ফেলছে।
এর মাঝেই ভেতর থেকে সবাই একে একে বেরিয়ে আসতে লাগলো। কারো হাতে ট্রফি, কারো হাতে সার্টিফিকেট, কারো মুখে হাসি আর উচ্ছ্বাস।
বিজয়ের আনন্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ সেই আনন্দের মাঝেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিস যেন একেবারে আলাদা এক জগতে আটকে আছে—রাগ, সন্দেহ আর অজানা আশঙ্কার ঘন অন্ধকারে।
আর রাজীব তখনও বুঝে উঠতে পারছে না—এই মুহূর্তে ফারিসের জীবনে ঠিক কোন ঝড়টা নেমে এসেছে।

নিশি, রিয়া আর অহনা একসাথে কলেজ থেকে বের হলো। তিনজনের হাঁটার ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল—দিনটা তাদের জন্য হালকা, হাসি-ঠাট্টায় ভরা। ঠিক তাদের কিছুটা পেছনেই নীরবে বের হলো নাভিদ। সে ইচ্ছা করেই সামনে আসেনি, আবার দূরেও থাকেনি—এক অদ্ভুত দ্বিধা নিয়ে তাদের অনুসরণ করছিল।
তাড়াহুড়োর মধ্যে নিশিতা খেয়ালই করেনি যে সে হিজাব বাঁধেনি। কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ নিজের মাথাটা খালি লাগায়। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ খুলে তড়িঘড়ি করে ওড়নাটা বের করে মাথায় জড়িয়ে নিলো। এই ছোট্ট অস্থিরতায়ও নিশির ভেতরের সংযমটা স্পষ্ট ছিল।
এই দৃশ্য দেখে অহনা হেসে উঠলো।
দুষ্টুমি আর খুনসুটির সুরে সে বলল—

“দেখলি নিশু বেবি, তুই-ই প্রথম হয়ে গেলি!”
অহনাকে থামানোর আগেই রিয়া গলা খাঁকারি দিয়ে একটু ব্যঙ্গ মেশানো স্বরে বলল—
“দেখতে হবে না বোনটা কার!”
তিনজনের হাসির মাঝেই তারা আবার হাঁটা শুরু করলো। ঠিক তখনই নিশির পা পড়ে গেলো একটা ছোট পাথরের ওপর। ভারসাম্য হারিয়ে সে পড়ে যেতে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই নাভিদ সামনে এগিয়ে এসে নিশির হাত ধরে ফেললো।
সেটা ছিল নিছকই একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া—কাউকে পড়ে যেতে বাঁচানোর স্বাভাবিক তাগিদ।
কিন্তু সেই দৃশ্যটাই সবকিছু বদলে দিল।
কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিস দূর থেকেই সবটা দেখে ফেলেছিল।
নিশিতার হাত নাভিদের হাতে—এই এক মুহূর্তের দৃশ্য তার চোখে যেন আগুন ঢেলে দিল। এতক্ষণ ধরে জমে থাকা রাগ মুহূর্তে বিস্ফোরিত হলো।
হঠাৎ করেই ফারিস চিৎকার করে উঠলো—

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ১৯+২০

“ডোন্ট টাচ হার!”
চিৎকারটা এতটাই জোরে ছিল যে আশপাশে থাকা সবার বুক কেঁপে উঠলো। কথাগুলো যেন শুধু শব্দ ছিল না—ছিল হুঁশিয়ারি, ছিল অধিকারবোধ, ছিল অদম্য রাগ। ফারিসের কণ্ঠ শুনেই নাভিদ চমকে উঠলো। এক সেকেন্ডও দেরি না করে সে নিশির হাত ছেড়ে দিল।
নিশিতা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো—একদিকে লজ্জা, অন্যদিকে ভয় আর অজানা এক অস্বস্তি তার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো……….

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ২২