Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩২

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩২

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩২
আয়াত বিনতে নূর

ফারিস ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল।
বৃষ্টির শব্দে চারপাশ ভরে গেছে—ঝমঝম শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ, ঠান্ডা হাওয়া। কিন্তু এসব কিছুর মাঝেও তার চোখ আটকে আছে একটাই দৃশ্যে।
নিশিতা। নিশিতা তখনও এক ধ্যানে বাচ্চাদের মতো বৃষ্টিতে ভিজছে। কখনো হাত দুটো ছড়িয়ে দিচ্ছে, কখনো ঘুরে ঘুরে নাচছে। যেন চারপাশের কিছুই তার মাথায় নেই। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার মুখ, চুল, জামা ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর সে নিষ্পাপ আনন্দে ডুবে আছে।

হঠাৎ করেই নিশিতার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়। কেউ খুব কাছে… খুব বেশি কাছে।
এই ভাবনাটুকুই যথেষ্ট ছিল। নিশিতা ধীরে ধীরে পিছনে ফিরে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফারিস। এক মুহূর্তে তার সমস্ত আনন্দ উধাও হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল—
যদি ফারিস ভাই যদি রেগে যায়? যদি বকে? যদি মারেও? চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল। নিশিতা অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ভেজা মাটিতে পা হড়কে যাওয়ার উপক্রম হলেও সে কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিল।
আর ফারিস?ফারিস এক ধ্যানে শুধু তাকিয়ে আছে। নিশিতার ভেজা মুখ, ভয় পাওয়া চোখ, কাঁপা ঠোঁট—সবকিছু একসাথে তার বুকের ভেতর কেমন করে উঠছে। তারপর ফারিস এগিয়ে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“কি চাস তুই? আমাকে মেরে ফেলতে?”
কণ্ঠটা রাগী, কিন্তু সেই রাগের ভেতর লুকিয়ে আছে ভয়। ভীষণ ভয়।
“না বলে গাড়ি থেকে কেন বের হলি?”
একটু থেমে আবার বলল—
“আমার চিন্তা হয় না তোর জন্য?”
তার চোখে তখন আগুন, কিন্তু সেই আগুন আসলে উদ্বেগের।
“কি মনে করিস নিজেকে? খুব বড় হয়ে গেছিস?”
এতগুলো প্রশ্ন একসাথে এসে পড়ায় নিশিতা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল। মাথা কাজ করছিল না। কী বলবে, কীভাবে বলবে—কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর খুব আস্তে, কাঁপা গলায় বলল—
“সরি… আর হবে না…”
চোখ নামিয়ে নিয়ে আবার বলল—

“আসলে বৃষ্টি দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি… তাই বের হয়ে এসেছিলাম।”
কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই যা ঘটল, তার জন্য নিশিতা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
ফারিস হঠাৎ করে তাকে নিজের বুকে টেনে নিল।
একদম শক্ত করে। এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই নিশিতা মিলিয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে, আর সে আর কখনো খুঁজে পাবে না। ফারিসের বুকের ভেতর তখন দ্রুত হৃদস্পন্দন, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।
তার কণ্ঠ এবার নিচু, কাঁপা—
“ভয় পাই বুঝিস?”

নিশিতা অবাক হয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
বৃষ্টি তাদের দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু এই আলিঙ্গনের ভেতর এক অদ্ভুত উষ্ণতা।
ফারিসের শক্ত বাহু, বুকের গভীরতা—সব মিলিয়ে নিশিতা প্রথমবার বুঝতে পারল, এই রাগ আসলে রাগ নয়। এটা ভয়। হারানোর ভয়। আর ফারিস বুঝে ফেলল— এই মেয়েটাকে সে শুধু ভালোবাসে না, এই মেয়েটাই এখন তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
নিশিতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই ফারিস ধীরে মাথা নিচু করল। বৃষ্টির শব্দের মাঝেই খুব নরমভাবে নিশিতার কপালে একটা চুমু খেল। সেই চুমুতে কোনো তাড়াহুড়া নেই, আছে শুধু ভয় আর ভালোবাসার ভার।
ভাঙা, কাঁপা গলায় ফারিস বলল—

“তুই দূরে চলে গেলে খুব কষ্ট হয়, বুঝিস?”
একটু থেমে নিঃশ্বাস নিল।
“ঠিক করে নিশ্বাসও নিতে পারি না। বুকের ভেতর এমন ব্যথা হয়… মনে হয় কিছু একটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।”
নিশিতা স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। ফারিসের কণ্ঠে তখন আর রাগ নেই, আছে শুধু ভয়—একজন মানুষ তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা হারানোর ভয়ে যেমন কাঁপে। ফারিস আবার বলল—
“আমার থেকে দূরে যাস না। আমি পারি না… একদম পারি না।”
এই কথাগুলো নিশিতার বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। নিজের কাছেই নিজেকে অপরাধী লাগতে শুরু করল।

আমি কেন ওকে ভয় দেখালাম? কেন ওকে এমন কষ্ট দিলাম? এই ভাবনাগুলো মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। আর কোনো কথা না বলে ফারিস হঠাৎ করেই নিশিতাকে কোলে তুলে নিল। খুব সাবধানে, খুব যত্ন করে—যেন কোনো ভঙ্গুর জিনিস হাতে নিয়েছে।
নিশিতা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কোলে থাকা অবস্থাতেই ফারিসের গলা জড়িয়ে ধরল। গালটা ফারিসের কাঁধে রেখে খুব আস্তে বলল—
“আর যাবো না দূরে… সরি।”

এই ছোট্ট কথাটাই যেন ফারিসের সমস্ত ভেতরের অস্থিরতা এক নিমিষে শান্ত করে দিল।
সে মুচকি হেসে ফেলল—একটা হালকা, স্বস্তির হাসি। অনেকক্ষণ পর যেন ঠিক করে নিশ্বাস নিতে পারল। এরপর ফারিস নিশিতাকে কোলে রেখেই গাড়ির ভেতরে উঠে বসলো। বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু গাড়ির ভেতরে এক ধরনের নিরাপদ নীরবতা।
গাড়িতে রাখা টাওয়ালটা তুলে নিয়ে ফারিস খুব মন দিয়ে নিশিতার ভেজা চুল মুছিয়ে দিতে লাগল। কোনো তাড়াহুড়া নেই। প্রতিটা স্পর্শে ছিল যত্ন, ভয় আর অধিকারবোধ।
নিশিতা চুপচাপ বসে রইল। এখন আর ভয় নেই, আছে শুধু লজ্জা আর অপরাধবোধ।
হঠাৎ ফারিস গম্ভীর কণ্ঠে বলল—

“এই যদি শরীর খারাপ হয়, তাহলে কষ্ট কার হবে বল তো?”
চুল মুছাতে মুছাতে তাকাল তার দিকে।
“আমি না? নাকি তুই নিজে?”
একটু থেমে আবার বলল—
“কথা বললেও শুনবি না। আবার বৃষ্টিতে ভিজলি।”
এই কথাগুলোর মধ্যে বকুনি থাকলেও তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল নিখাদ যত্ন। নিশিতা সেটা বুঝতে পারল। সে মাথা নিচু করে শুধু ফারিসের বুকে আরেকটু গুটিয়ে গেল। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে,
ভেতরে দুটো হৃদয় ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। ফারিস বুঝে গেল— এই মেয়েটা শুধু তার ভালোবাসা নয়,
এই মেয়েটাই এখন তার দুর্বলতা, তার ভয়, তার শান্তি। আর নিশিতা বুঝে গেল— এই মানুষটার রাগের আড়ালেও শুধু সে-ই আছে।

নিশিতার মনের ভেতর ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। এই মুগ্ধতা হঠাৎ করে আসেনি—এসেছে ফারিসের ভয় পাওয়া চোখ দেখে, তার কাঁপা কণ্ঠ শুনে, আর তার নিঃশব্দ যত্ন অনুভব করে। সে বুঝতে পারল, ফারিস শুধু শাসন করে না, ফারিস আগলে রাখে।
ভয় পায়। চুপচাপ দায়িত্ব নেয়।
নিশিতার চোখে তখন আর আগের শিশুসুলভ দুষ্টুমি নেই। আছে শান্তি, আছে ভরসা। সে ধীরে মাথা তুলে ফারিসের দিকে তাকাল। বৃষ্টিতে ভেজা চুল, শক্ত মুখাবয়ব, অথচ চোখে গভীর মমতা—সব মিলিয়ে ফারিসকে সেই মুহূর্তে ভীষণ আপন মনে হলো।
খুব নরম কণ্ঠে নিশিতা বলল—

“আপনি আছেন না… আমাকে সুস্থ করে দেওয়ার জন্য।”
এই কথাটার ভেতরে কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
ছিল নিখাদ বিশ্বাস। ফারিস এক মুহূর্ত থমকে গেল।
তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে গর্ব নেই, অহংকার নেই—আছে দায়িত্ব আর নিশ্চয়তা।
সে কিছু বলল না। কিছু কথা বলা লাগে না—কিছু অনুভূতি শুধু থাকা দিয়েই বোঝানো যায়।
ফারিস ধীরে গাড়ির স্টার্ট দিল।
ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। বৃষ্টি এখনো পড়ছে, রাস্তা ভিজে চকচক করছে। গাড়িটা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল—ফার্মহাউজের উদ্দেশ্যে।নিশিতা চুপচাপ বসে রইল।
জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মন পড়ে আছে ফারিসের কথায়, তার আচরণে, তার ভয় আর ভালোবাসার মিশেলে।
আর ফারিস?
সে সামনে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু বুকের ভেতর একটাই অনুভূতি— এই মেয়েটার দায়িত্ব এখন তার। বৃষ্টি, নীরবতা আর পথ—
সব মিলিয়ে তারা দুজন এগিয়ে চলেছে এক নতুন অধ্যায়ের দিকে।

এদিকে রিয়া চৌধুরী ভিলার ভেতরে পা রাখল।
গেট পেরোনোর সাথেসাথেই তার মনে হলো—আজ বাড়িটা যেন অদ্ভুত রকমের নিস্তব্ধ। সাধারণত যে বাড়িতে সবসময় কারো না কারো হাঁটার শব্দ, কথা বলার আওয়াজ, কিংবা কাজের লোকজনের চলাফেরা থাকে—আজ সেখানে অস্বাভাবিক নীরবতা। রিয়া চারপাশে তাকাল।
কাউকে চোখে পড়ল না। ড্রয়িং রুম, করিডোর, সিঁড়ির দিক—সব জায়গাই যেন শুনশান। এই নিস্তব্ধতা রিয়ার বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি তৈরি করল। সে ব্যাগটা নামিয়ে ভেতরের দিকে এগোতেই একটি রুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন আমেনা চৌধুরী।

আমেনা চৌধুরী রিয়াকে দেখে মৃদু হাসলেন, তারপর প্রশ্ন করলেন—
“এসে গেছিস মা? তা নিশি কোথায়? ওকে তো দেখছি না। কোথায় ও?”
এই প্রশ্নটা শুনেই রিয়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল।
নিশিতা কোথায়—এই প্রশ্নের পুরো উত্তর সে নিজেও জানে না। ফারিস তাকে কীভাবে নিয়ে গেল, কোথায় গেল—সবকিছু আন্দাজ করতে পারলেও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
না জেনে কিছু বলা ঠিক হবে না—এই ভেবেই রিয়া নিজেকে সামলে নিল।
একটু ইতস্তত করে, শান্ত স্বরে বলল—
“আসলে ছোট আম্মু… নিশু অহনাদের বাসায় গিয়েছে।”
তারপর যেন নিজের কথাটাকে বিশ্বাসযোগ্য করতে
বলে —

“সামনে পরীক্ষা তো, তাই হয়তো নোট কালেক্ট করতে গিয়েছে।”
আমেনা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার চোখে ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
তিনি বললেন—
“এমনিতেই বাড়ির কর্তারা বাড়িতে নেই… তার উপর যদি ছেলে-মেয়েরা এমন করে যার যার মতো চলে যায়, তাহলে আমি কোন দিকে যাবো বল তো?”
কথাগুলোর মধ্যে অভিযোগ কম, অসহায়ত্ব বেশি।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন—
“যাই হোক, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি খাবার দিচ্ছি।”
রিয়া হালকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ঠিক তখনই ড্রয়িং রুমের দিকে রাজীব এসে দাঁড়াল। রাজীবকে দেখে আমেনা চৌধুরী একটু অবাক হয়েই বললেন—
“আজকে এত তাড়াতাড়ি চলে এলি যে বাবা! আর ফারিস কোথায়?”
রাজীবের মুখে স্বাভাবিক, চেনা হাসি। কণ্ঠেও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই।
সে বলল—

“হুম ছোট আম্মু। আজকে আর লাস্ট একটা মিটিং ছিলো। ওটা শেষ করে সবাইকে যার যার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে এলাম।”
রাজীবের কথা শেষ হতে না হতেই আমেনা চৌধুরি বললেন —
“ফারিস কই?”
ছোট আম্মুর কথা শুনে রাজী কিছুটা ভর্কে গিয়ে
একটু থেমে আবার বলল—
“আর ভাইয়া বাইরে বেরিয়েছে কোথাও। হয়তো কাজ আছে।”
এই কথার মধ্যে কোনো বিস্তারিত নেই—ইচ্ছাকৃতভাবেই নেই। আমেনা চৌধুরী মাথা নেড়ে বললেন—
“আচ্ছা। তোরা গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি খাবার বাড়ছি।”
রিয়া আর রাজীব দুজনেই একসাথে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কেউ আর কিছু বলল না।
দুজনেই যে যার মতো নিজের রুমের দিকে চলে গেল। কিন্তু এই নীরবতার ভেতরেও ঘরের দেয়ালগুলো যেন অনেক প্রশ্ন শুনে ফেলেছে—
যেগুলোর উত্তর আপাতত কেউ দিতে চাইছে না।

রাজীব নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা হালকা করে বন্ধ করে দিল। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি যেন একসাথে শরীরের উপর ভর করে বসেছে। সে আর কিছু না ভেবে টাওয়ালটা তুলে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ পর টানা এক লম্বা শাওয়ার নিল।
পানির ধারাগুলো যেন শুধু শরীরের ক্লান্তিই না, মাথার ভেতরে জমে থাকা অজানা চিন্তাগুলোও ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তবুও, একটা নাম বারবার মনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে—
অহনা। শাওয়ার বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে সে গভীর একটা নিশ্বাস ফেলল। তারপর আলমারি খুলে একটা সাদা টি-শার্ট আর কালো রঙের ট্রাউজার বের করে পরে নিল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের আঙুল দিয়ে চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিতে দিতে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল রাজীব।

চোখেমুখে অজান্তেই একটা চিন্তার ছাপ।
“অহনার নাম্বারটা কোথায় পাবো?”
এই প্রশ্নটা আজ না—বেশ কিছুদিন ধরেই তার মাথার ভেতরে ঘুরছে। কখনো কাজের ফাঁকে, কখনো রাতের নিস্তব্ধতায়, আবার কখনো একদম অকারণেই। হঠাৎ করেই তার মাথায় একটা কথা ঝিলিক দিয়ে উঠল—
রিয়ার ফোনে তো অহনার নাম্বার থাকতে পারে!
এই ভাবনাটা আসতেই আর এক সেকেন্ডও দেরি করল না সে। যেন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে—এমন তাড়নায় প্রায় দৌড়েই রিয়ার রুমের সামনে চলে গেল। ধীরে করে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকে তাকাল—
রুম ফাঁকা।

কিন্তু পাশের ওয়াশরুম থেকে স্পষ্ট পানির শব্দ ভেসে আসছে। তার মানে রিয়া ভেতরেই আছে।
রাজীব এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তাড়াহুড়ো করে রিয়ার ব্যাগ খুলে ফোনটা বের করল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে—ধরা পড়ার ভয় আর কৌতূহল দুটোই একসাথে।
ফোন আনলক করে কল লিস্টে ঢুকল।
বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করতে হলো না।
প্রথম দিকেই চোখে পড়ল সেই নামটা—
অহনা।
রাজীবের মুখে আপনাআপনি একটা বড় হাসি ফুটে উঠল। মনে হলো, বহুদিনের কোনো কাঙ্ক্ষিত জিনিস হঠাৎ করেই হাতে চলে এসেছে।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত নিজের ফোনে নাম্বারটা ডায়াল করল। তারপর নাম সেভ করার সময় একটু থেমে ভাবল—কী নামে সেভ করবে? এক মুহূর্তের চিন্তার পর ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে লিখে ফেলল—
“চড়ুই পাখি”
নামটা সেভ করে ফোনটা একবার তাকিয়ে দেখল।
তারপর দ্রুত রিয়ার ব্যাগে ফোনটা ঠিক জায়গায় রেখে দিল। ওয়াশরুমের পানির শব্দ তখনও চলছে।রাজীব নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে ফিরে গেল।কিন্তু তার মনে তখন একটাই অনুভূতি— এক অদ্ভুত মুগ্ধতা আর আসন্ন কোনো কিছুর অপেক্ষা। চড়ুই পাখির ডানায় ভর করেইরাজীবের মনে নতুন গল্পের শুরু হয়ে গেছে।

ফোনটা রেখে যেই পেছনে ঘুরলো, ঠিক তখনই—
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াকে দেখে রাজীব ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। এক সেকেন্ডের জন্য তার বুকটা ধক করে উঠল।
মুখের অভিব্যক্তি এমন হয়ে গেল, যেন বড় কোনো অপরাধ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে।
রিয়া বিরক্ত মুখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল—
“তুমি আমার ফোন নিয়ে কি করছিলে ভাইয়া?
আর এখন তুমি এখানে কেন?”
রিয়ার কণ্ঠে ছিল সন্দেহ,
আর চোখে ছিল স্পষ্ট প্রশ্ন— কিছু একটা নিশ্চয়ই গড়বড় আছে। রাজীব আমতা–আমতা করে, কথা জড়িয়ে ফেলল—
“আরে না… না মানে…

তোদের কলেজের অনুষ্ঠানের পিক দেখছিলাম আরকি।”
বলতে বলতে সে নিজেই বুঝতে পারছিল,
এই অজুহাতটা খুব একটা শক্ত না।
রিয়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইলো।
তারপর হালকা স্বরে বলল—
“ও আচ্ছা।”
রাজীব মনে মনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
বিপদ কেটে গেছে ভেবেই দ্রুত প্রসঙ্গ ঘোরাল।
“দাঁড়িয়ে না থেকে খেতে যা তুই,”
বলল সে।
রিয়া একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল—
“তুমি যাবে না ভাইয়া?”
রাজীব তাড়াতাড়ি উত্তর দিল—
“আসছি একটু পরে।
তুই যা।”

রিয়া আর কিছু না বলে চুপচাপ নিচে নেমে গেল।
রিয়ার পেছন ফিরে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রাজীব নিজের বুক চাপড়ে মনে মনে বলল—
“যাক বাবা… একটুর জন্য বেঁচে গেছি!”
মনের ভেতর তখন হালকা হাসি আর স্বস্তি।
এরপর নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালো সে।
রুমে ঢুকে বিছানার একপাশে বসে
রাজীব ভাবলো—
অহনাকে একটা কল দেবে।
দিনভর কাজ, মাথার ভেতর চাপ—
এই মুহূর্তে অহনার গলা শুনতে ইচ্ছে করছে খুব।
কিন্তু ঠিক তখনই পেটের ভেতর থেকে ভয়ংকর এক শব্দ উঠল। ক্ষুধার জন্য যেন পেটের ভেতরে ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে।
রাজীব নিজের পেটের দিকে তাকিয়ে হাসল।
নিজের সাথেই কথা বলল—

“না না…
আগে এই পেটের ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করি,
তারপর বউয়ের সাথে গলা ফাটাবো।”
এই ভেবেই সে আবার নিচে নামলো।
নিচে তখন আমেনা চৌধুরী রিয়ার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলেন। পরিপাটি করে, যত্ন করে—
মায়ের হাতের সেই চেনা যত্ন।
এর মাঝেই রাজীব চেয়ার টেনে বসে পড়ল।
রাজীবকে দেখে আমেনা
চৌধুরী স্নেহভরে বললেন—
“বস বাবা…
এই তো, খাবার বেড়ে দিচ্ছি।”
রাজীব মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

আমেনা চৌধুরী রাজীবের প্লেটেও খাবার তুলে দিলেন। আর কোনো কথা না বলে রাজীব খেতে শুরু করল। দিনভর দৌড়ঝাঁপের পর খাবারের স্বাদটা আজ একটু বেশিই লাগছিল। খাওয়া শেষ হতে হতে ঘড়িতে বাজে ৫টা ৪৫ মিনিট।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে ওপর থেকে তনয়া নেমে আসলো। রাজীব আর রিয়াকে একসাথে দেখে তনয়া বলল—
“আরে তোরা এখানে?
নিশি কোথায়?”
রিয়া একটু বিব্রত হলো।
মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে নিল।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—
“নিশু… অহনার বাড়িতে আছে।
চলে আসবে, চিন্তা করো না।”
তনয়া ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল—
“অহনার বাড়িতে ওর কি কাজ?”
রিয়া দ্রুত উত্তর দিল—
“সামনে পরীক্ষা তো… নোট আনতে গেছে মনে হয়।”
তনয়ার মুখে সন্দেহ থাকলেও সে আর কিছু বলল না। এরপর রাজীব সোফায় বসতে বসতে তনয়ার দিকে তাকিয়ে বলল—

“তা… তোর ট্যুর কেমন কাটলো?”
তনয়া রিয়ার পাশে সোফায় বসে হালকা হাসল—
“ভালোই কেটেছে। তোমার কি খবর?”
রাজীব কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
“এই চলছে… কোনো রকম।”
হঠাৎ রিয়া একটু ঠেস দিয়ে দুষ্টুমি ভরে বলল—
“তা আমাদের ভাবির কি খবর ভাইয়া?
কেমন আছে সে?”
রিয়ার এই কথায় তনয়া হেসে গুটিসুটি মারলো।
হাসিটা ছিল চাপা, কিন্তু মজার। রাজীব পুরোপুরি অবাক। চোখ বড় করে বলল—
“তোর ভাবির খবর আমি নিজেই জানি না,
আর তুই আমাকে কি না এই প্রশ্ন করছিস!”
এই কথা শুনে সবাই হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ ভাই–বোনের আড্ডা চললো। হাসি, ঠাট্টা, হালকা খুনসুটি— বাড়িটা যেন একটু প্রাণ ফিরে পেল। এরপর একে একে সবাই নিজের রুমের দিকে চলে যেতে লাগলো। রিয়া যাওয়ার আগে আমেনা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল—

“ছোট আম্মু… আমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছি।
রাতে আর খাবো না। তোমরা চিন্তা করো না।”
আমেনা চৌধুরী কিছু বলার আগেই
রিয়া নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল।
বিছানায় শুয়ে পড়ল। ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। কিন্তু রিয়ার চোখে তখনও ঘুম নেই—
মাথার ভেতরে ঘুরছে অনেক না বলা কথা।

এদিকে রাজীব নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল। রুমের ভেতরটা নিঃশব্দ, শুধু দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
কিন্তু রাজীবের বুকের ভেতর যেন সেই টিকটিকের থেকেও জোরে কিছু একটা ধুকধুক করছে।
সে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি করতে লাগল।
হাতের মোবাইলটা কখনো শক্ত করে ধরছে,
আবার কখনো বিছানার ওপর ছুঁড়ে রেখে দিচ্ছে।
মনের ভেতর একটাই দ্বন্দ্ব— কল দেবে, নাকি দেবে না? একবার মনে হচ্ছে,
“কল দিলে যদি বিরক্ত হয়?”
আবার পরক্ষণেই ভাবছে,
“না দিলে যদি মনে করে আগ্রহই নেই?”
.নিজের মনকেই ধমক দিয়ে বলল—
“এভাবে আর কত ভাববি?”

একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে হঠাৎ করেই আর কোনো চিন্তা না করে অহনার নাম্বারে কল বাটনে চাপ দিল। কল চলে গেল… রিং হতে লাগল…
প্রতিটা রিংয়ের সাথে সাথে রাজীবের বুকের ধুকপুকানি যেন বেড়ে যেতে লাগল।
এদিকে অহনা কলেজ থেকে ফিরেই ফ্রেশ হয়ে
নিজের রুমে শুয়ে পড়েছে। চুলগুলো আলগা করে ছেড়ে দেওয়া,ক্লান্ত শরীরটা বিছানার সাথে লেপ্টে আছে।কিন্তু মনটা বিশ্রাম নিচ্ছে না। মনের ভেতর বারবার নিশিতার কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। আজকের আচরণটা একদম স্বাভাবিক লাগেনি।
চোখের ভাষা, কথার টোন— সবকিছুতেই যেন একটা অদ্ভুত পরিবর্তন। নিজের মনেই নিজেকে প্রশ্ন করছে অহনা—
“মেয়েটার হলোটা কি?
হঠাৎ এমন বদলে গেল কেন?”
এইসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। অহনা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো—
Unknown Number একটু বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে গেল তার। এই সময় আবার কে?
সে উঠে বসলো। ফোনটা হাতে নিয়ে রিসিভ করল।
ভদ্র কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলল—

“হ্যালো…
আসসালামু ওয়ালাইকুম।
কে বলছেন?”
ফোনের ওপাশে অহনার কণ্ঠ কানে যেতেই
রাজীবের শরীরটা যেন জমে গেল। এই কণ্ঠ সে বহুবার কল্পনা করেছে, কিন্তু বাস্তবে শুনে
যে এমন অবস্থা হবে— সে নিজেও ভাবেনি।
গলা শুকিয়ে কাঠ। জিহ্বা যেন তালুর সাথে লেগে গেছে। একটা শব্দও বের হলো না।
ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
অহনা আবার বলল—
“হ্যালো?
কে?”
কণ্ঠে এবার সামান্য বিরক্তি।
“কল দিয়ে কথা বলছেন না কেন? আজব তো!”
রাজীব এবারও কথা বলতে পারলো না।
হাত-পা কাঁপছে। কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। আর হবে নাই বা কেন? ছাব্বিশ বছর বয়সে এসেও
আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের দিকে সে চোখ তুলে তাকায়নি। কথা বলা তো দূরের কথা। আর আজ— সরাসরি ফোনে কথা বলছে, তাও আবার অহনার সাথে! অহনার ধৈর্য এবার পুরোপুরি শেষ। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল তার।
রেগে গিয়ে বলল—

“এইটা কী ধরনের আচরণ? কল দিয়ে কথা না বলার মানে কী?”
একটু থেমে আরও জোরে বলল—
“কোন পাগল এটা? কল দিয়ে কথা বলতে পারেন না? বোবা নাকি আপনি?”
রাগের মাথায় বলে উঠল—
“আজাইরা লোকজন!”
ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে রাজীব পুরোপুরি হতভম্ব।
এমন কথা সে আশা করেনি। মনের ভেতর একটু ধাক্কা লাগল। ফোনটা কানে লাগিয়েই
নিজের অজান্তে বিড়বিড় করে বলল—
“এই ধানী লঙ্কাকে বিয়ে করলে আমার যে কী অবস্থা হবে!”
একটু থেমে আবার নিজেকেই বুঝ দিল—
“যাক… এখন আর কী করার। মন তো একটাই ছিল, সেটা তো আগেই দিয়ে ফেলেছি। ভালোবাসাও… ভালোবেসেই ফেলেছি।”

ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো,
কিন্তু রাজীবের বুকের ভেতর ঝড়টা তখনও থামেনি।রাজীব ফোনের ওপাশে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
গলা কিছুটা খাকরি দিয়ে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলল—
“আমি… রাজীব। তোমার ফ্রেন্ডের ভাই। মানে রিয়া আর নিশির।”
এই কথাগুলো শুনেই অহনা যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলো। মাথায় এক মুহূর্তে সব বন্ধ হয়ে গেল।
কিছু কাজ করছে না তার। হৃদয়টা দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো লাগছিল। কিছুক্ষণের জন্য শুধু তাকিয়ে রইল, মনের ভেতর এক ভোরের ঝড় ওঠা চুপচাপ।
একটু আগে কি না কি বলেছে—
এই বিষয়টাও তার মনে ভীষণ লজ্জা তৈরি করল।
মুখের রং লাল হয়ে গেলো। কিন্তু নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল। শেষমেশ কণ্ঠে কিছুটা কষ্ট আর সতর্কতা নিয়ে বলল—

“কেনো কল দিয়েছেন? আর… আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?”
রাজীব হেসে হেসে উত্তর দিল—
“এমনিই… কি করছো তুমি এখন?”
অহনা কণ্ঠে ঠাণ্ডা হলেও স্পষ্ট প্রতিরোধ দেখাল—
“আমি কি করছি, তাতে আপনার কি? আর কল কেউ এমনি দেয় নাকি! যদি এমন কিছু না বলার থাকে, আমি রাখলাম। আমি পড়তে বসবো।”
এই বলে অহনা ফোন কেটে দিল।
রাজীব শুনে হেসে বলল—

“হাই হাই…
বউ মনে হয় রেগে আছে। থাক, এখন একটু রেস্ট নিই। পরে বউয়ের রাগ ভাঙাবো না হয়।”
এই ভাবনায় সে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল।
হালকা শ্বাস নিল, চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণের মধ্যে রাজীব ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো। এদিকে শুধু রাজীবই নয়। বাড়ির সব সদস্য, যার যার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি, দৌড়ঝাঁপ আর মানসিক চাপ—
সব মিলিয়ে সবাই গভীর নিদ্রায় ডুবে গেছে।
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এসেছে। শুধু ঘড়ির টিকটিক, আর কখনো কখনো জানালার বাইরে বাতাসের নরম শব্দ। বাড়িটা শান্ত, শান্ত যেন সারা দিন-রাত্রির ক্লান্তি একসাথে বিশ্রাম নিচ্ছে।
আর রাজীব, বিছানার মধ্যে শুয়ে, মাথার ভেতরে অহনার কথা বারবার ফিরে এসেছে।
যেন স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে সব মিলেমিশে এক নতুন অনুভূতি তৈরি করছে।

দেখতে দেখতে রাতের ঘড়িতে বাজে ১২টা।
ফারিস আর নিশিতা বাগান বাড়ির গেট দিয়ে প্রবেশ করল। বৃষ্টি, জেম এবং অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে এতো দেরি হয়ে গেছে। নিশিতার জামাকাপড় বৃষ্টিতে ভিজেছিল। কয়েকবার হাঁচিও দিয়েছে, ঠান্ডা লেগেছে। কিন্তু এখন তা শুকিয়ে গেছে। তবুও শরীরটা ঠান্ডা লাগছে, হালকা শীত অনুভব করছে নিশিতা।
ফারিস ধীরে ধীরে নিশিতাকে কোলে নিয়ে বাগান বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করল। তার কোমল হাতের উষ্ণতা নিশিতার বুকের ভেতরে একটা অদ্ভুত শান্তি সৃষ্টি করল। ফারিসের দৃষ্টি যেন সবসময় তার দিকে,
অথচ চোখে কোনো চাপ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে থাকা নিরাপত্তার অনুভূতি।ফারিস ধীর পায়ে সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি উপরের তলায় উঠল।
নিশিতাকে রুমে নামিয়ে ফারিস বলল—

“ফ্রেশ হয়ে নে। আমার কথা শুনলি না,
এবার আবারও ঠান্ডা লাগবে।
আমার খাবার আনছি, খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিস।”
নিশিতা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়ালো।
তার কণ্ঠের ভেতর একটা কোমল নড়েচড়ে ওঠা,
একটু দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
তারপর ফারিসের দিকে তাকিয়ে সাহসের সঙ্গে বলল—
“আমরা কি আজকে বাড়ি যাবো না, ফারিস ভাই?”
ফারিস নিশিতার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টি রাখল।
শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে বলল—

“তুই আমার বউ, আমি যেখানে থাকবো, তুইও সেখানেই থাকবি। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
নিশিতা মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে হাসল। মনের ভেতর একটা অজানা আনন্দ আর সুরক্ষার অনুভূতি তৈরি হলো।
ফারিস কিছু না বলে ধীরে ধীরে নিচে কিচেনে চলে গেল। নিশিতা ক্লজেটের দিকে এগোলো এবং হাত বাড়িয়ে পারপেল রঙের থ্রী-পিস বের করল।
ওয়াশরুমে ঢুকেই ধীরে ধীরে ফ্রেশ হতে লাগল—
চুলগুলো পানি দিয়ে ধুয়ে, ঠান্ডা জলের সংস্পর্শে কোমলতার অনুভূতি পেয়ে নিজেকে সতেজ করল।
তারপর সাবধানভাবে জামাকাপড় বদলাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো খুলে আঁচড়ে নিল। দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি যেন ধীরে ধীরে উড়ে যাচ্ছে।

ছোট ছোট পা ফেলে ধীরে ধীরে নিচে নামল।
দেখলো ফারিস রান্না করছে, চোখ কেমে গেল।
ফারিসের হাতে রান্নার তালে যে নিখুঁত সাদৃশ্য,
সে দেখেই নিশিতার চোখ উজ্জ্বল হয়ে গেল।
আস্তে আস্তে ফারিসের
দিকে এগোলো এবং প্রশ্ন করল—
“আপনি রান্নাও করতে পারেন?”
ফারিস একটু মুচকি হেসে বলল—
“যখন বিদেশে ছিলাম তখন করতাম। রোজ অনেক দিন করি না, আজকে একটু ট্রাই করছি।”
নিশিতা মুগ্ধ হয়ে হেসে বলল—
“আপনাকে কখনো আগে রান্না করতে দেখিনি।
আজ প্রথম দেখলাম।”

ফারিস আবারও হেসে তার মুখের কোণ একটু উঁচু করল। নিশিতা চুপচাপ কেবিনেটের উপরে উঠে বসে ফারিসের রান্না দেখল। কিছুক্ষণের জন্য সময় থেমে গেল— শুধু ফারিসের মনোযোগ, হাতের কাজ, এবং রান্নার গন্ধের সাথে মিলেমিশে নিশিতার মনের আনন্দ।
কিছুক্ষণ পর ফারিস নিশিতার সামনে প্লেটে খিচুড়ি এবং কালাভুলা গরুর মাংস
সজ্জিত করে ধরল। বলল—
“খেয়ে দেখ, কেমন হয়েছে?”
নিশিতা মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে খেতে শুরু করল।
ফারিস খেলাধুলার মতো ভঙ্গিতে বলল—
“ও হু, আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
তারপর গরুর মাংস খিচুড়ির সাথে মিশিয়ে নিশিতার মুখে দিল। নিশিতা একটু খেয়ে বলল—
“খুব সুন্দর হয়েছে, ফারিস ভা…”
বলতে না শেষ হতেই ফারিস বলল—
“বলছিলাম না, ভাই ডাকবি না।”

নিশিতা থেমে গেল। চোখে হালকা লাজ, মুখে ছোট হাসি। আর কিছু বলল না, শুধু খেতে থাকল।
শেষমেশ তারা দুজন মিলে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করল। নিশিতার মুখে সন্তুষ্টি আর ফারিসের চোখে মৃদু হাসি। বাতাসে রান্নার গন্ধ, রাতে শান্তি, আর ছোট ছোট হাসি— সব মিলিয়ে যেন রাতটা আরও মধুর হয়ে উঠলো।
খাওয়ার পর, ফারিস নিশিতাকে রুমে নিয়ে গিয়ে ওষুধ খাইয়ে দিলো। নিশিতা কিছুক্ষণ একা বসে রুমের শান্তি অনুভব করল।কোনো শব্দ নেই, শুধু ঘরের হালকা বাতাস আর দূরের দূরের রাতের নিস্তব্ধতা। ফারিস ধীরে ধীরে তার ল্যাপটপ বের করল এবং অফিসের কাজ শুরু করল।

নিশিতা জানালার দিকে চোখ রাখল— বাইরে রাতের হাওয়া বইছে, গাছের পাতা নরমভাবে দুলছে, শীতল বাতাসে আকাশের নরম আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। মনের ভেতরে এক অজানা শান্তি, এক তৃপ্তির অনুভূতি ঢুকছে।
ধীরে ধীরে নিশিতা গুটিগুটি পায়ে বেলকনিতে চলে গেল। বেলকনি বিশাল, রাতে আলো আর বাতাসের মধ্যে এক নীরবতা। নিশিতা দাঁড়িয়ে বাতাসের ছোঁয়া অনুভব করার চেষ্টা করল।
হাওয়ায় তার চুল নরমভাবে দুলছে, বাতাসের হালকা গন্ধে যেন মনটা আরও প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছে। নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত আনন্দ, এক ছোট্ট স্বপ্নময় অনুভূতি। হঠাৎ পিছন থেকে ফারিসের হাত নিশিতাকে জড়িয়ে ধরল। নিশিতা চমকে চোখ খুলল। ফারিস তার গলায় মুখ
গুঁজে বলল—

“কি করছিস এখানে?”
নিশিতা শান্ত কণ্ঠে হেসে বলল—
“একা একা ভালো লাগছিলো না, তাই এখানে চলে আসলাম। এই বাড়িটা খুব সুন্দর, জানেন। মনে হয় আমার পছন্দ মতোই বানানো হয়েছে। আমি যা পছন্দ করি, ঠিক তাই এখানে আছে।
কি অদ্ভুত, না?”
ফারিস হেসে হালকা গলায় বলল—
“তুই এতো সুন্দর ভাবছিস, নিশি…
আর এই জায়গাটা তো শুধু তোর জন্যই।”
নিশিতা ফারিসের কণ্ঠে কোমলতা খুঁজে পেল।
তার ভেতরের আনন্দ আর শান্তি আরও গভীর হয়ে উঠল। নিশিতার কথায় ফারিস তার গলায় ধীরে ধীরে মুখ গুঁজে দিল। ছোট ছোট কয়েকটা কোমল চুমু একে একে দিয়ে বলল—

“বাড়িটা তোর, নিশি। আর তোর জন্যই বানানো।
আজকে তোকে সব খুলে বলবো।
কিছুই লুকিয়ে রাখবো না।”
নিশিতার চোখ বড় করে তাকাল। হৃদয়ের গভীরে আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। কণ্ঠে কেঁচকেঁচে স্বর শুনাল—
“কিহ? আমার বাড়ি মানে? আমাকে সব বলুন, প্লিজ!”
ফারিস মুচকি হেসে বলল—

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩১

“সব বলবো নিশি, সব। কোনো কিছুই আড়ালে থাকছে না।”
নিশিতার চোখে আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের মিশ্রণ ফুটে উঠল। তার মন দ্রুত গতিতে ভেতরে ভেতরে
নাচছে— সাত বছর আগে যা হয়েছিল, সেই দিনগুলো, ছোট ছোট স্বপ্ন, সব মিলিয়ে আজকের এই মুহূর্তকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
ফারিস এক ধীর হাসি দিয়ে বলল—
“আচ্ছা, তোর মনে আছে নিশি, আজ থেকে সাত বছর আগে…”

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৩