চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৪
আয়াত বিনতে নূর
এদিকে রিভান দাঁড়িয়ে ছিল কিছুটা দূরে। চারপাশে আলো, গান আর আনন্দে ভরা পরিবেশ হলেও তার ভেতরে যেন আগুন জ্বলছিল। নিশিতা আর ফারিসকে এতটা কাছাকাছি দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক জ্বালা ছড়িয়ে পড়েছিল। চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছিল রাগে আর অস্থিরতায়। তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গিয়েছিল, যেন নিজের রাগকে কোনোমতে সামলে রাখার চেষ্টা করছে।
হঠাৎ করেই নিজের হাতে ধরা গ্লাসটা প্রচণ্ড জোরে মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো রিভান।
কাঁচ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দ চারপাশের আনন্দমুখর পরিবেশটাকে মুহূর্তেই স্তব্ধ করে দিল। সবার চোখ একসাথে ঘুরে গেল তার দিকে। কিন্তু কারো দিকে না তাকিয়েই রিভান গটগট পায়ে দরজার দিকে হাঁটা দিল। তার চোখে-মুখে জমে থাকা রাগ আর কষ্ট স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
বাড়ির বাইরে বের হয়েই সে দ্রুত নিজের গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ির দরজা জোরে বন্ধ করার শব্দ যেন তার ভেতরের ঝড়টারই প্রতিফলন ছিল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা বাড়ির গেট পেরিয়ে অন্ধকার রাস্তায় মিলিয়ে গেল।এদিকে হঠাৎ এই ঘটনার কারণে সবার নাচ থেমে গেল। চারপাশে অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। নিশিতা লজ্জায় আর অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। সবার দৃষ্টি যেন তার উপরেই এসে পড়েছে এমন অনুভূতি হচ্ছিল তার। বুক ধড়ফড় করতে করতে সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে এক কোণায় দাঁড়িয়ে পড়ল
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
। মুখে লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে, চোখ নামিয়ে নিজের ওড়নাটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
অন্যদিকে অহনাও খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে তো নাচতেই পারে না, তবুও রাজীবের জোরাজুরিতে তাকে নাচতে হয়েছিল। এত মানুষের সামনে নাচতে গিয়ে সে ভীষণ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।
তাই সুযোগ পেতেই সেও দ্রুত সেখান থেকে দৌড়ে সরে গেল। রাজীব দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। অহনার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটে উঠল। চোখে অদ্ভুত এক মায়া আর আগ্রহ নিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনাকেই বউ বানাবো, মিস অহনা রহমান…”
এদিকে অহনার পিছনে পিছনে রিয়াও দৌড়ে গেল। অহনাকে ধরে খোঁচা দিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“ভালোই তো নাচলি আমার ভাইয়ার সাথে! তাহলে এবার আমারও একটা সেটিং করিয়ে দে রে বইন!”
অহনা তখন হাঁপাচ্ছিল। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসের কারণে। রিয়ার কথা শুনে সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“যাহ শয়তান! কি সব বলিস তুই?”
রিয়া ঠোঁট চেপে হাসলো। তারপর একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আমার ভাইয়া মনে হয় তোকে পছন্দ করে…”
অহনা সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আরে গাধী! কি সব আজেবাজে বলিস তুই? এসব বাদ দে না প্লিজ!”
রিয়া নাটকীয়ভাবে হতাশ হওয়ার ভান করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
“আচ্ছা বাদ দিলাম কিন্তু আমার সেটিং করিয়ে দিবি এই কথা দিয়ে দিলাম!”
অহনা বিরক্ত হয়ে তাকালেও তার চোখে লুকানো লজ্জা আর অস্বস্তি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু অহনা নিজেকে সামলে নিল। অহনা রিয়ার কথায় হাসি পেল। চারপাশের আলো, হালকা সংগীত আর নরম আলোতে ভরা হ্যালের মধ্যে সে যেন সামান্য স্বস্তি পেল।
এদিকে আমেনা চৌধুরী শান্তভাবে একটি চেয়ারে একা বসে ছিলেন। তার চোখে মৃদু উষ্ণতা আর সৌজন্যের ছাপ ছিল। পাশেই আফিয়া চৌধুরী কয়েকজন মহিলার সঙ্গে হালকা আড্ডা দিচ্ছিলেন, হাসি আর কথোপকথনের মাঝে সময় কাটাচ্ছিলেন। এমন সময় মমতা তালুকদার অল্প একটু লাজুক ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন আমেনা চৌধুরীর দিকে। তিনি পাশে থাকা চেয়ারটায় বসে বিনম্রভাবে বললেন,
“কেমন আছেন আপনি?”
আমেনা চৌধুরী হেসে উত্তর দিলেন,
“এই তো আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
মমতা তালুকদার আবারও নম্রভাবে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। আপনার কাছে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কিভাবে বলব, তা বুঝতে পারছি না।”
আমেনা চৌধুরী মিষ্টি হাসলেন এবং বললেন,
“আরে না, সমস্যা নেই। বলুন আপনি।”
মমতা তালুকদারের চোখে সামান্য লজ্জা বা অস্বস্তির ছাপ দেখা গেল। কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন,
“আফিয়া আমার অনেক আগের বান্ধবী। আগে তো আপনাদের বাড়িতে যেতাম, তারপর অনেক বছর হয়ে গেছে আর যাওয়া হয় না। কিন্তু আফিয়ার কাছ থেকে শুনেছি যে আপনার ছোট মেয়ে ভারী লক্ষী আর সুন্দরী সত্যিই সুন্দর বললেও ভুল হবে। আর আজকে নিজে দেখেও তাই মনে হলো। আপনার মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমার ছোট ছেলে রিভানের সঙ্গে আপনার ছোট মেয়ে নিশিতার বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে আছে।”
আমেনা চৌধুরীর মুখে হালকা খুশির ছাপ ফুটল, কিন্তু মধুর স্বরে তিনি বললেন,
“সবই তো ঠিক আছে, কিন্তু আমার মেয়েটা এখনও ছোট, ভাবি। এখনো তার বিয়ে দেওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই। আর সামনে ওর ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা আছে, তাই এই সময়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।”
মমতা তালুকদার হেসে বললেন,
“চিন্তা করবেন না। আপনার মেয়েকে নিজের মেয়ের মতোই রাখব। এখনই কিছু বলছি না, আগে ওর পরীক্ষা শেষ হোক, তারপর এই বিষয়ে কথা হবে।”
আমেনা চৌধুরী কিছুই বললেন না চারপাশের পরিবেশ যেন হালকা আর উষ্ণ হয়ে উঠল।
ঠিক সেই সময় আফিয়া চৌধুরী এসে বললেন,
“কি রে মমতা, কি কথা বলছিস তোরা?”
মমতা তালুকদার শান্তভাবে উত্তর দিলেন,
“কিছু না। আসলে তো আমার সঙ্গে তো এখনো কথা বলোনি, তাই আবার এলাম।”
আফিয়া চৌধুরী হেসে বললেন,
“রাগ করিস না। আরও অনেকে ছিলো, তাই তোর সঙ্গে কথা বলার মতো সময় পাইনি। তাই তো এখন সবাইকে ফেলে তোর সঙ্গে কথা বলতে এলাম।”
এরপর তারা তিনজন মিলে আরও বিভিন্ন রকম বিষয় নিয়ে আড্ডা দিতে থাকলেন। হাসি, গল্প, স্মৃতিচারণ সবই মিশে গেল সেই সন্ধ্যার উষ্ণ পরিবেশে। তাদের কথাবার্তা যেন পুরো কক্ষটাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলল।
নিশিতা চুপচাপ এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল।চারপাশে লোকদের হাসি, আলো আর হালকা সংগীতের মধ্যে সে যেন একাকী একটি পৃথক জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ করে, পিছন দিক থেকে এক শক্ত হাত তার হাতে লেগে গেল। নিশিতা reflexively দমকে উঠল।
চোখ খুলে পিছন দিকে তাকাল, আরিশা ছিল তার চোখে আগুন, আর হাতে শক্তভাবে ধরা। নিশিতা একটু অবাক হয়ে বলল না—শুধু তার চোখের ইশারাতেই বোঝা যাচ্ছিল, এই আচরণটা তার জন্য নতুন। আরিশা টানতে টানতে নিশিতাকে ট্যারেসের দিকে নিয়ে গেল। বাতাসে হালকা ঠান্ডা ছোঁয়া, কিন্তু নিশিতার গায়ে যেন একটা তাপ ছড়াচ্ছিল রাগ, বিস্ময় আর কিছুটা ভীতির মিশ্রণ। নিশিতা ঝাড়ি দিয়ে আরিশার হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল।
রাগ আর বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
“সমস্যা কি তোমার? আর আমাকে এভাবে টানছো কেন তুমি?”
আরিশার চোখে আগুন আরও জ্বলে উঠল। মনে হচ্ছিল, এবার নিশিতা যেন ফেটে পড়বে। এক মুহূর্তের জন্য তার নিশ্বাস থেমে গেল, তারপর চিৎকারের মতো ভাঙা কণ্ঠে সে বলল,
“খুব শখ না তোর পরপুরুষের সাথে মেশার! তার সাথে নাচ করার? তুই জানিস না আমি ফারিসকে কতটা ভালোবাসি? তবু কেন ওর সাথে নাচ করলি? জবাব দে, আমার কাছে!”
আরিশার চোখে এমন তেজ, এমন আবেগ, যে চারপাশের আলো, মানুষের হাসি, সব কিছু যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার চিৎকার, রাগ আর ব্যথা মিলেমিশে নিশিতার কানে কেঁপে উঠল।
তারপর আরও ক্রুদ্ধভাবে আরিশা বলল,
“তোদের মতো মেয়েদের জন্যই পুরুষরা নষ্ট হয়।
নষ্ট মেয়ে তুই!”
নিশিতা একটু স্ফীত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকের ভেতরে রাগ আর অবাক হওয়ার অনুভূতি ঘোরতেছিল। সে জানত এই মুহূর্তে আরিশার রাগ শুধুই ফারিসের প্রতি নয়, বরং পুরো পরিস্থিতি নিয়েও। নিশিতা এতটা সময় চুপ চাপ ছিলো কিন্তু এখন আর সহ্য করতে না পেরে নিশিতা আর চুপ থাকতে পারলো না। আরিশার আগুনে লাল চোখ আর অভিযোগের চিৎকার তাকে ভীত করলেও, এবার তার ভেতরের ক্ষোভও জেগে উঠল। হঠাৎ করেই নিশি তার হাত শক্ত হয়ে আরিশার গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। চিৎকার দিয়ে বলল,
“চুপ… জাস্ট শাট আপ!”
আরিশা কিছু বলতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিশিতা চোখে আগুন নিয়ে এগিয়ে বলল,
“এরপর যদি তোমার মুখ থেকে আর একটা নোংরা কথা বের হয়, তাহলে আমি ভুলে যাবো তুমি আমার বড়। আর এই হাতটা আবারও তোমার গায়ে উঠবে। কাকে নষ্ট মেয়ে বলছো তুমি? আমাকে?”
নিশিতা একটু এগিয়ে আরিশার চোখে চোখ রেখে বলল,
“নিজেকে কখনো আয়নায় দেখেছো? দেখলে আমাকে নষ্ট মেয়ে বলতে পারবি না। যে তোমাকে রিজেক্ট করেছে, এখনও তার পিছনে ঘুরে বেড়াও, আর সে নাকি আমি! সো ফানি।”
আরিশার চোখে ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল, কিন্তু নিশিতার দৃঢ়তা তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অচল করার মতো। হঠাৎ করেই আরিশার রাগের দিকে ফারিসের গরম আগুন ঢুকে গেল। ফারিস গর্জন করল, চোখ লাল হয়ে ওঠা, ভেতরের রাগ আর প্রেমের সংমিশ্রণে,
“হ্যাঁ… আমি ভালোবাসি ফারিসকে। আর ফারিস শুধু আর শুধু আমার! আর যে মেয়ে ওর আশেপাশে যাবে, তাকে মারতেও আমার হাত কাপবে না।”
এই বলে ফারিস নিশিতার গলা টিপে ধরল। নিশিতার শরীর অপ্রাণ হয়ে গেল, শ্বাস আটকে আসল। সে ঠিকভাবে কথাও বলতে পারছিল না। আতঙ্ক আর অসহায়তার মধ্যে সে কেবল ফারিসের দিকে তাকাচ্ছিল, ভীত এবং বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ফারিস এক প্রকার ঝড়ের মতো দৌড়ে এসে নিশিতাকে আরিশার হাত থেকে ছুঁড়ে আনল। নিশিতাকে সুরক্ষিত করার জন্য নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। তার চোখে রাগ আর সংরক্ষণের আগুন, আর নিশিতার প্রতি অশেষ স্নেহ ফুটে উঠল।
ফারিস আরিশার গালে জোরে একটি থাপ্পড় বসাল। আরিশা ছিটকে গিয়ে ট্রেসে পড়ে গেল। নিশিতার বুকে কাঁপন কেটে গেল, এবং ধীরে ধীরে সে নিজের প্রাণ ফিরে পেল। চোখে আনন্দ আর শ্বাসে স্বস্তি মেশা।
নিশিতা ফারিসের দিকে ঢলে পড়ল। তার হাত, যা এতক্ষণ ভয় ও অসহায়তার সঙ্গে কেঁপেছিল, এখন ফারিসের শক্ত বাহুতে আশ্রয় পেল। ফারিস নিশিতার দিকে তাকিয়ে চিন্তিত কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছিস তুই?”
নিশিতা কোনো রকম মাথা নাড়ল না। তার চোখে সামান্য শিহরণ, কিন্তু ভেতরের ভয় আর উত্তেজনা মিলেমিশে রয়ে গেল। সে জানত, ফারিসের সঙ্গে থাকা মানেই নিরাপত্তা।
ট্যারেসের কোণে পড়ে থাকা আরিশা এই দৃশ্য সব দেখছিল। ফারিস তখন আরিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“যদি নেক্সট টাইম দেখি নিশিতার কোনো ক্ষতি করার ওইদিনই তোর শেষ দিন হবে, আরিশা। তোকে বুঝিয়ে দিবো, এই ফারসি ওয়াহিদ চৌধুরী জিনিসে হাত দিলে কি হয়।”
আরিশা কিছু বলল না। কেবল মেঝেতে পড়ে ফসফস করতে লাগল, যেন এক ধরনের চরম হুমকি বুঝে ফেলেছে। ফারিস নিশিতাকে নিজের পাশে ধরে ধীরে ধীরে নিচে নামল। নিশিতার শরীর তার কাছে নিরাপদ, আর তার চোখে এক অদ্ভুত শান্তি ফুটে উঠল।
আরিশা ধীরে ধীরে উঠল, নিজের রাগ আর হুমকিকে মৃদু ফিসফিসে পরিণত করে বলল,
“আজকে মতো যা খুশি করে নাও ফারিস।
কালকের জন্য প্রস্তুত থেকো।কালকের দিনটা শুধু আর শুধু আমার হবে। আর কারও নয়।
যে খেলায় আমি নেমেছি, তা আমি জিতেই ছাড়বো।”
ফারিস নিশিতাকে নিয়ে নিচে নামতে থাকল। পার্টির মধ্যে এখন প্রায় সবাই চলে গেছে, শুধুমাত্র কয়েকজন বাকি ছিলেন। এদিকে মমতা তালুকদার রিভানকে খুঁজে না পেয়ে একপ্রকার কান্না জুড়িয়ে ফেললেন। মাহতাব তালুকদারের কাছে সহায়তার জন্য হাত বাড়ালেন।
মাহতাব তালুকদার শান্তভাবে বললেন,
“আহা, মমতা, চিন্তা করো না। গেছে কোথাও চলে আসবে। ছেলে তো এখন বড় হয়েছে, নাকি?”
কিন্তু মমতা তালুকদারের কান্নার মধ্যে রাগও লুকিয়ে ছিল। সে বললেন,
“তুমি কেমন বাবা হ্যাঁ? তোমার ছেলেটা পার্টির মধ্যে চলে গেল, আর তুমি চিন্তা করছো না?”
মাহতাব তালুকদার বুঝতে পারলেন কী বলতে হবে না, তাই চুপ করে রইলেন।ফারিস নিশিতাকে নিচে এনে একটু দূরে রেখে বলল,
“পাঁচ মিনিট ওয়েট কর। কোথাও যাবি না।”
নিশিতা যেন লাজুক, লক্ষী মেয়ের মতো মাথা নাড়ালো। ফারিস সরাসরি আফিয়া চৌধুরীর কাছে গেল। স্থির কণ্ঠে বলল,
“আম্মু, পার্টি শেষ। এখন বাড়ি চলো। রাত হয়ে গেছে অনেক।”
আফিয়া চৌধুরী হেসে বললেন,
“ঠিক আছে, বাবা। কিন্তু সবাইকে ডাকো, তারপর সবাই একসাথে যাব।”
ফারিস ফোন বের করে রাজীবকে কল করলেন।
রাজীব তখন অহনার সঙ্গে ছিল। ফারিসের কল পেয়ে সে কিছুটা ঘাবড়ে গেল, কারণ ফোনের ডিসপ্লেতে ফারিসের নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছিল এটা কোনো সাধারণ কল নয়।
ফোনের ডিসপ্লেতে রাজীবের নাম দেখে রাজীব কিছু বলার আগেই ফারিস নিজের রাগ আর অভিজ্ঞতায় ভরা কণ্ঠে বলল,
“তাড়াতাড়ি সবাই নিয়ে বাড়ি যাবি। আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি আর নিশিতা আমার সাথে আছে।”
এই বলে সে এক মুহূর্তের জন্য কোনো আলোচনা ছাড়াই ফোন কেটে দিল। নিশিতার হাত শক্ত করে ধরে সে দ্রুত পার্টির ভিড় থেকে বের হয়ে গেল। বাইরে এসে পাকিং লটে পৌঁছলে ফারিস নিশিতার দিকে তাকাল, চোখের ইশারায় বোঝাল উঠে বস।
নিশিতাও কোনো বাক্য না বলেই তার রাগি চেহারা দেখে উঠে বসল। ফারিসের রাগ, তার চেহারার প্রতিটি রেখা, নিশিতার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
গাড়ি ঢিলে গড়িয়ে চৌধুরী বাড়ির দিকে এগোতে শুরু করল। চারপাশে কেউ খেয়ালই পেল না যে ফারিস নিশিতাকে নিয়ে চলে গেছে।
আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী এখনো বসে হালকা আড্ডা দিচ্ছিলেন, পার্টির শেষ মুহূর্ত উপভোগ করছেন। রাজীব অহনার সঙ্গে একের পর এক কথা বলছে, কিন্তু অহনা পাত্তাই দিচ্ছে না। রিয়া আর অহনা নিজেদের কথোপকথন নিয়ে ব্যস্ত।
এদিকে আরাফাত চৌধুরী সহ আলতাফ চৌধুরী অন্য ব্যবসায়ী মহিলাদের সঙ্গে আড্ডায় মগ্ন। তনয়া কিয়াসের সঙ্গে কথা বলার চাপে পুরোপুরি মিশে গেছে। কিয়াস অবশ্য এতে পুরোপুরি লাভবান, কারণ তনয়ার মনোযোগ এখন তার দিকে।
এর মাঝেই আরিশা, রাগে ফুলতে ফুলতে, ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখল ফারিস বা নিশিতা কেউ নেই। রাগ, ঘৃণা আর হতাশা একত্রে তার মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটাল।
নিজেকে সামলাতে না পেরে আরিশা গটগট পায়ে তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
যদিও সে জানে, আরিশ জামানের চোখ এড়ানো সম্ভব নয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা যে ধ্বংসের খেলায় নেমেছে, শেষমেশ তার ফল নিজেই ভোগ করতে হবে। কিন্তু সেই তিক্ত অনুভূতি যেন তাকে থামাতে পারছে না রাগ আর অহংকারের মিশ্রণে সে আরও কঠোর ও বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে।
আরিশ জামান, আরিশার পেছনে পেছনে গিয়েও শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারল না। আরিশা নিজের রাগ আর অবরোধকে কাজে লাগিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে দ্রুত চলে গেল। আরিশ জামান কোনো সময় নষ্ট না করে দ্রুত ড্রাইভারকে ফোন করল এবং বলল,
“ফ্রন্টে আসো। এখনই।”
এদিকে আরিশা গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিচ্ছিল। প্রতিটি ধাক্কায় মনে হচ্ছিল, তার রাগ আর ঘৃণা পুরো শরীর দিয়ে বের হচ্ছে। চোখে আগুন, মনে হিংসা হিতাহিতের কোনো ভয় নেই তার। রাস্তায় গাড়ির হুইল ঘুরছে দ্রুত, আর চারপাশের আলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
তার রাগের তাপে মনে হচ্ছিল, সে আর কাকে কিছু ভাবছে না, শুধু ফারিসের প্রতি ক্ষোভ আর নিজের অদম্য অহংকারের প্রতিফলন।
অন্যদিকে সবার থেকে বিদায় নিয়ে চৌধুরি বাড়ির উদ্দেশ্য সবাই রওনা দিয়ে দেয়। কিন্তু গাড়িতে নিশিতাকে না দেখে আমেনা চৌধুরি রাজীবকে বলে ছিলেন,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৩ (২)
“নিশিতা কোথায় ”
রাজীব বলে,
” ভাইয়ার সাথে আছে “।
রাজীবের কথা শুনে সবাই শান্ত হলে। রাজীব গাড়ি চালাতে মন দেয়।আর চোখে আহনার দিকে তাকাতেও ভুলে না। রিয়া অহনার সাথে কথা বলতে থাকে আর অন্য দিকে তনয়া আজকের পার্টির কথা ভেবে যাচ্ছে।
প্রায় ৩ ঘন্টা ড্রাইভ করার পর ফারিস নিশিতা সবার আগে বাড়িতে ফিরে……
