Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৮

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৮
আয়াত বিনতে নূর

ফারিস চিন্তায় অস্থির হয়ে আবার দরজায় ধাক্কা দিল।তবুও ভেতর থেকে কোনো শব্দ এলো না।
“নিশিতা দরজা খোল প্লিজ ”
তার কণ্ঠে এবার স্পষ্ট কাঁপন। কয়েকবার চেষ্টা করার পরও যখন কোনো সাড়া পেল না, তখন ফারিসের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো।
এসি চলছিল, তবুও তার কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।মুখে আতঙ্কের ছাপ, ভ্রু দুটো কুঁচকে গেছে, চোখে অজানা ভয়। হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই সে দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। টেবিলের ড্রয়ার খুলে তাড়াহুড়ো করে হাতড়াতে লাগলো।
কাগজ, কলম, ফাইল সব এলোমেলো হয়ে গেল মুহূর্তে। তারপরই হাতের মধ্যে ঠান্ডা ধাতব একটা জিনিস অনুভব করতেই থমকে গেল সে।

এক্সট্রা চাবি!
এতক্ষণে কেন যে মনে পড়লো না নিজেই নিজের উপর বিরক্ত হলো ফারিস। আর এক সেকেন্ডও নষ্ট না করে আবার দৌড়ে এসে নিশিতার রুমের দরজার সামনে দাঁড়ালো। কাঁপা হাতে চাবিটা তালায় ঢুকিয়ে ঘুরাতেই ক্লিক দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল। ফারিস যেন দীর্ঘক্ষণ শ্বাস বন্ধ করে ছিল, হঠাৎ করে বড় করে নিঃশ্বাস ফেললো।
মনে হলো বুকের উপর থেকে বিশাল একটা পাথর নেমে গেল। তবুও ভেতরে কী অপেক্ষা করছে সেই অজানা ভয় এখনো তার বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে রাখলো।
আর এদিকে রিয়া স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দরজার বাইরে।ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ফারিসের দিকে। এতক্ষণ যা যা ঘটেছে সবই সে চুপচাপ দেখেছে, শুনেছে। ফারিস আর নিশিতার বিয়ের কথাও তার অজানা নয়। উপর থেকে প্রতিটা শব্দ তার কানে গেছে। তবুও সে কিছু বলেনি শুধু নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
ফারিস কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সোজা ভিতরে ঢুকে গেল। ঘরে ঢুকেই যা দেখলো তাতে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো।

নিশিতা বিছানার কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
অবিরাম কান্নায় তার পুরো মুখ ভিজে গেছে।
চোখ দুটো এতটাই লাল যে মনে হচ্ছে রক্ত জমে আছে ভিতরে। পালকগুলো ফুলে উঠেছে, গাল দুটো আপেলের মতো লাল, নিঃশ্বাস কাঁপছে বারবার। এই দৃশ্যটা ফারিস সহ্য করতে পারলো না।
এক মুহূর্ত দেরি না করে সে এগিয়ে গেল। বিছানায় বসে ধীরে কিন্তু তাড়াহুড়োর মধ্যে নিশিতাকে নিজের বুকে টেনে নিল। হঠাৎ করে এমনটা হওয়ায় নিশিতা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলো না।
তার শরীরটা কেঁপে উঠলো, হাত দুটো মাঝ আকাশে থেমে গেল।ফারিসের বুকের ভেতর তখন ঢেউ উঠছে,
“চুপ আর কাদিস না আমি আছি। ”

তার কণ্ঠে ছিল অপরাধবোধ, ছিল অস্থিরতা, আর ছিল অদ্ভুত এক কোমলতা।নিশিতা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলো কে তাকে জড়িয়ে আছে।তার কান্না থামলো না, বরং আরও জোরে ফেটে পড়লো।
ফারিসের বুকে নিজেকে আবিষ্কার করতেই নিশিতার শরীরটা যেন বিদ্যুৎ খেয়ে উঠলো।
এক ঝটকায় সে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
ফারিস সামলে উঠে বিছানা থেকে দাঁড়ালো।
চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে চাপা উদ্বেগ। সে আবার এগিয়ে এসে নিশিতার হাত ধরে টেনে বিছানার কোণে বসালো। নিজেও একটু ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“কি হয়েছে জান? এতো রাগ করছিস কেনো? খুলে বল আমাকে।”
নিশিতার চোখ-মুখ তখন ক্রোধে কঠিন।
ঠোঁট কাঁপছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত।নিজেকে সামলাতে পারছে না সে।হঠাৎ করেই চিৎকার করে উঠলো,

“কেনো এসেছেন আমার রুমে? সার্কাস দেখতে?
ওহ্ সরি আপনি তো নিজেই একটা সার্কাসের মালিক! যখন খুশি যাকে ব্যবহার করবেন, তারপর পুতুলের মতো ছুড়ে ফেলে দেবেন!”
কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধলো ফারিসের ভেতরে।
সে বুঝলো এই রাগের পেছনে গভীর কোনো আঘাত আছে তবুও সে নিজেকে সামলে শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল,
“তুই কোনো পুতুল না নিশি। তুই অবসেশন নেশা আমার বেচেঁ থাকার সম্বল তার থেকেও অনেক বড় কিছু।আর ভুলে যাস না আমার সাথে কেউ এভাবে কথা বলতে পারে না।”
নিশিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিল।
“বেশ। আমিও কিছু বলছি না।কিন্তু আপনার পায়ে পড়ি দয়া করে এখান থেকে যান।আমার মুখ দিয়ে এখন সম্মানজনক কিছু বের হবে না। আমি আপনাকে অসম্মান করতে চাই না।”
ফারিস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
কণ্ঠ নরম হলো আবার,

“নিজের জন্য না হোক আমার জন্য রাগটা কমা।
আমাকে কি ভালোবাসিস না নিশি?দেখ আমি সকাল থেকে না খেয়ে আছি তোর সাথে খাবো বলে।এখন যদি তুই রাগ করিস, তাহলে আমার কি হবে বল?”
নিশিতার চোখে আবার জল এসে ভরলো, কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে নিল।ধীরে, ভাঙা গলায় বলল,
“আমি এখন শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবতে চাই
অন্য কাউকে না।আপনি যান প্লিজ আমি রিকুয়েস্ট করছি…”
এই কথাটাই যেন ফারিসের ভেতরের সব সংযম ভেঙে দিল।তার চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল, চোয়াল শক্ত।
“কি বললি তুই? আমাকে নিয়ে ভাবিস না?”
সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।

“আচ্ছা—ভাবতে হবে না।কিন্তু একটা কথা ভুলে যাস নাতুই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরীর বউ।আমার মালিকানায় বন্দি তুই।আমার থেকে মুক্তি তোর নেই।”
তার কণ্ঠে অদ্ভুত এক অধিকার, এক অন্ধ জেদ।
“বাঁচলে আমার হয়ে বাঁচবি মরলে আমার হয়েই মরবি।আমার ছাড়া তোর কোনো পরিচয় নেই আন্ডারস্ট্যান্ড?”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। নিশিতা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে চোখে ভয়, ক্ষোভ, আর কোথাও একফোঁটা ভাঙা ভালোবাসার ছায়া।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়া নিঃশব্দে কাঁপছিল এই ভালোবাসা না কি বন্দিত্ব সে নিজেও বুঝতে পারছিল না।
নিশিতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ফারিসের দিকে। তার চোখে অবিশ্বাস, ক্ষোভ আর অদ্ভুত এক শূন্যতা। ফারিস কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দরজার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াকে বলল,
“নিচে গিয়ে আমার আর নিশির জন্য খাবার নিয়ে আয়।”
রিয়া এতক্ষণ দরজার কোণ থেকে সবকিছু দেখছিল। মুখে কোনো কথা নেই, চোখে ভয় আর অস্বস্তি। কিছু বলার সাহস তার হলো না।
নীরবে মাথা নিচু করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো। নিশিতা ধীরে ধীরে ফারিসকে সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠ এবার শান্ত, কিন্তু ভেতরে তীব্র ঝড়,

“আজ আপনার ভালোবাসার প্রমাণ চাই আমি।”
ফারিস ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি টেনে বলল,
“বল তোর কি প্রমাণ লাগবে?নিজের জীবন দিতে হলেও এই ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী দ্বিতীয়বার ভাববে না।”
নিশিতা কোনো উত্তর না দিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুললো। ভেতর থেকে ছোট্ট একটা কাঁচের শিশি বের করলো। শিশিটার ভেতরে স্বচ্ছ, হালকা নীলচে তরল।ফারিসের চোখে প্রশ্ন ভেসে উঠলো।
নিশিতা ধীরে ধীরে বলল,
“আপনি আমাকে ভালোবাসেন না, ফারিস ভাই
আপনি আরিশা আপুকে ভালোবাসেন তাই না?
এই বিষটা খেয়ে প্রমাণ করুন, আপনি আমাকে কতটা ভালোবাসেন।”
এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন থেমে গেল।

বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। ফারিস তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তোকে আমি কতটা ভালোবাসি, সেইটার প্রমাণ দিতেযদি আমাকে বিষ পান করতেই হয় তাহলে আমি হাজার বারসেই বিষ পান করতে রাজি।”
কথা শেষ না হতেই সে নিশিতার হাত থেকে শিশিটা নিয়ে নিল।এক সেকেন্ডও দেরি করলো না।
ঢাকনা খুলে এক নিঃশ্বাসে সবটা পান করে ফেললো।
“ফারিস!”
নিশিতার মুখ থেকে আতঙ্কে শব্দ বের হলো।
সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। মনে হচ্ছিল এই মানুষটা কি সত্যিই মানুষ? না কি পাগল? না কি ভালোবাসা নামের কোনো অন্ধ ঝড়ে ভেসে গেছে?
ফারিস ঠোঁটে ফিকে হাসি এনে বলল,

“আর কি প্রমাণ চাই তোর, জান? তুই যা বলবি তাই করবো কিন্তু আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা
কখনো ভাবিস না ”
এই কথা শুনে নিশিতার সব রাগ, অভিমান, জেদ
মুহূর্তে ভেঙে গেল। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল ফারিসের বুকে। দু’হাতে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,
“আপনি পাগল পুরো পাগল।”
ফারিসও তাকে আগলে নিল বুকের মধ্যে।
মনে হচ্ছিলদু’জনের সব ভাঙা, সব কষ্ট, সব ভুল
এই এক আলিঙ্গনের মধ্যে মিশে যাচ্ছে।
নিশিতা ফারিসের দিকে তাকিয়ে বলে,
” এইটা বিষ না এইটা পানি ছিলো আপনার কি মনে হয় আমি আমার জামাইকে বিষ দিব।? ”
নিশিতার কথা শুনে অবাক হয়ে ফারিস বলে,

“বাহ মানে তুই আমার সাথে মজা করছিলি?।
এই বলে নিশিতার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দিয়ে হালকা চুমু একে বলে,
“এরপর থেকে আমাকে আর অবিশ্বাস করবি না জানপাখি…”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠটা কেঁপে উঠেছিল। চোখ দুটো ভিজে, তবুও সে হাসার চেষ্টা করছিল যেন কষ্টটা লুকিয়ে রাখতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

“তোর চোখে নিজের জন্য অবিশ্বাস দেখলেই এই কলিজাটা জ্বলে পুড়ে যায়। মনে হয় আমি তোর থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি, অথচ আমি তো তোর কাছেই থাকতে চাই সবসময়।”
ফারিসের কথা শুনে নিশিতা হাসি মুখে বলে,
“আমার চোখে আপনার জন্য কোনো অবিশ্বাস নেই আর না আছে কোনো সন্দেহ। আপনি হয়তো ভুল দেখেছেন, কিন্তু আমার ভেতরে শুধু আপনি আছেন। কেবল এক আকাশ সমান ভালোবাস যেটা কখনো কমবে না, কখনো বদলাবে না।”
ফারিয়া অবাক হয়ে নিশিতার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বললাম
“আপনি আমার ভরসা, আমার নিরাপত্তা, আমার শান্তি। আপনাকে সন্দেহ করার মতো অমানুষ আমি না আপনি তো আমার হৃদয়ের সবচেয়ে আপন মানুষ।”

তার চোখের ভেজা জল তখন ধীরে ধীরে হাসিতে বদলে গেল। আর সেই মুহূর্তে দুজনের মাঝখানের সব ভুল বোঝাবুঝি গলে গিয়ে শুধু ভালোবাসাটাই রয়ে গেল নির্মল, গভীর, আর চিরস্থায়ী। নিশিতা তখন ফারিসের বুকে শান্তিতে মাথা রেখে বলেছিল,
“আমার সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো আপনার কেমন লাগে ফারিস ভাই?”
ফারিস নিশিতার কথা শুনে ফারিস মুচকি হেসে বলল,
” তোর সাথে কাটানো প্রত্যেকটা মূহুর্ত আমি রূপকথার মতো অনুভব করি মাই লিটিল হার্টবিট।”
নিশিতা মুচকি হাসলো। তাদের মুহূর্তটা কেটে গেলো ভালোবাসায়।
নিচে,
এদিকে রাজীব অহনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে নিজের বাসায় ফিরলো।গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো বাড়িটা আজ অদ্ভুত নীরব।
ড্রয়িংরুমে কেউ নেই।যেখানে ছুটির দিন মানেই হাসি, আড্ডা, জায়গাটা আজ ফাঁকা, ঠান্ডা, গম্ভীর।
রাজীব ভ্রু কুঁচকে চারদিকে তাকালো।
মনে একরাশ অস্বস্তি।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়লো রিয়ার উপর।
সোফার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ট্রে, মুখ গম্ভীর।
রাজীব এগিয়ে গেল।

“কি হয়েছে রিয়া? তোর মন খারাপ নাকি?”
রিয়া জোর করে একটা হালকা হাসি দিল,
“না ভাইয়া, তেমন কিছু না ”
কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ ছিল না।রাজীব আবার বলল,
“বাড়িটা এতো শান্ত কেন? সবাই কোথায়?”
রিয়া এবার আর এড়িয়ে গেল না।পেছনে ঘুরে সোজা তাকালো তার চোখে,
“আজকে সবাই জেনে গেছে ভাইয়া আর নিশির বিয়ে হয়েছে তাই সবাই যে যার রুমে। কারও মন ভালো নেই ”
রাজীব যেন প্রথমে কথাটা বুঝতেই পারলো না।

“মানে ? কি বলছিস তুই?”
তার কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
“সব খুলে বল আমাকে। এত অল্প সময়ে কি এমন হলো?”
রিয়া ধীরে ধীরে সব বললো,
কিভাবে হঠাৎ করে বিয়েটা হয়েছে, কিভাবে বাড়ির সবাই অবাক, কিভাবে পরিবেশটা ভারী হয়ে গেছে।
সব শুনে রাজীব স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
চোখে বিস্ময়, মুখে অবিশ্বাস।
নিজের সাথে নিজেই বিড়বিড় করে বলল,
“কবে কখন কিভাবে এত কিছু হয়ে গেল?”
তার মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। রিয়া আর কিছু বললো না।ট্রে হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো।নিশিতার রুমের দিকে।
রাজীব দাঁড়িয়ে রইলো নিচে, নীরব বাড়ির মাঝে
আরও বেশি একা।

এদিকে তালুকদার বাড়ির সকালটা অন্য দিনের মতো শুরু হলেও একটা জিনিস স্পষ্ট রিভানের কোনো খোঁজ নেই। ঘরের সবাই খুব ভোরে উঠে পড়েছে,কিন্তু কিয়াস আগেই বলে রেখেছিল আজ কেউ রিভানকে ডাকবে না।
তবুও মমতা তালুকদারের মেজাজ চড়ে আছে চরমে। দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা বারোটার দিকে এগোচ্ছে, আর তার ছেলের এখনও ঘুম ভাঙেনি!
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে বিরক্ত গলায় বললেন,
“তোমাদের কি কোনো জ্ঞান আছে?ছেলেটা বারোটা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছে! কারও কোনো চিন্তা নেই? সবাই নিশ্চিন্তে বসে আছো?”
কিয়াস শান্ত স্বরে বলল,

“চিন্তা করো না আম্মু, একটু পরেই উঠবে।
কালকে অনেক রাত করে ফিরেছে ক্লান্ত।”
মমতা তালুকদার বিরক্ত হয়ে আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে গেলেন।উপরে নিজের রুমে রিভান তখনও গভীর ঘুমে অচেতন। জানো দুনিয়ার কোনো খবরই নেই তার। হঠাৎ ফোনের তীব্র রিংটোনে ঘুম ভাঙলো।চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্ত হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কল কেটে দিল।
ধীরে ধীরে উঠে বসতেই মাথার ভেতর যেন হাতুড়ি পড়তে লাগলো।
গত রাতের ঝাপসা স্মৃতিগুলো একে একে মাথায় ভেসে উঠলো।আর তার সাথে ফারিস আর নিশিতাকে এত কাছাকাছি দেখার দৃশ্যটা।
রিভান গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কোথাও চাপা আগুন জ্বলছে।
কিন্তু সে মাথা নাড়িয়ে নিজেকে থামালো,

“নো এসব ভেবে লাভ নেই।”
ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠলো।
এবার সে রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে উপাসের কণ্ঠ,
“স্যার, আপনি কোথায়? একটু পরেই আপনার দুইটার মিটিং। ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী আসবেন আজ আপনার সাথে দেখা করতে।
আপনিও তাড়াতাড়ি আসুন।”
ফারিসের নাম শুনতেই রিভানের চোখে অদ্ভুত একটা ঝিলিক দেখা দিল। মুখে আবার সেই নির্লিপ্ত ভাব ফিরিয়ে এনে বলল,
“ওহ্ হ্যাঁ আমি আসছি। জাস্ট থার্টি মিনিট টাইম দাও।”
কল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল, আজকের এই মিটিং শুধু ব্যবসার জন্য না,এর ভেতরে আরও কিছু জমে আছে যার হিসাব এখনো বাকি।

“চৌধুরি বাড়ি”
ফারিস নিশিতাকে আরও কাছে টেনে নিল।
কণ্ঠে আগের সেই দুষ্টু সুর,
“এবার ভালো করে পড়াশোনা কর। না হলে কিন্তু মার খাবি আমার কাছে।”
নিশিতা মুখ বাকিয়ে বলল,
“আপনি তো শুধু মারতেই পারেন।”
ফারিস হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।
“মারি তোকে? আর আদরটা দেখলি না, জান?”
নিশিতা লাজুক ভঙ্গিতে তার বুকে মুখ গুঁজে বলল,
“জানি তো ভালোবাসেন।”
ঘরের ভেতর নরম একটা শান্তি নেমে এসেছিল।
ঠিক তখনই দরজায় নক। ঠক ঠক
নিশিতা বিরক্ত হয়ে মাথা তুলল,

“এখন আবার কে?”
ফারিস স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হয়তো রিয়া। খাবার আনতে বলেছিলাম।
যা, নিয়ে আয়। তুইও কিছু খাসনি, আমিও না।”
নিশিতা আর কিছু না বলে দরজার দিকে গেল।
দরজা খুলতেই রিয়ার গম্ভীর মুখটা সামনে ভেসে উঠলো। চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। নীরবে ট্রেটা নিশিতার হাতে দিয়ে ঘুরে চলে গেল নিজের রুমের দিকে।নিশিতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো
কেন যে এমন গম্ভীর রিয়া, বুঝতে পারলো না।
তবুও আর ভাবলো না।
খাবার নিয়ে এসে ফারিসের পাশে বসলো।

দু’জন চুপচাপ খেতে লাগলো। মাঝে মাঝে চোখাচোখি হালকা হাসি অভিমান ভাঙার পরের সেই নরম অনুভূতি। খাওয়া শেষ হতে না হতেই ফারিস কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো,
নিহান ফারিস ফোন রিসিভ করলো।
“গুড মর্নিং স্যার,” ওপাশ থেকে নিহানের কণ্ঠ।“
একটু পরে আপনার মিস্টার তালুকদারের সাথে একটা মিটিং ফিক্স করা হয়েছে। মিটিংটা কি আজ ক্যান্সেল করে দেবো?”
ফারিস ফোনটা কানে ধরে স্বাভাবিক গলায় বলল,

“না আমি আসছি। আগে মি. তালুকদারের সাথে মিটিংটা করে তারপর অফিসে যাবো।”
কল কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
মুখে চিন্তার রেখা। ধীরে বিড়বিড় করে বলল,
“মি. তালুকদার খুব একটা সহজ মানুষ না আমার সাথে এতো কথা কেন? নাকি বিশ্বের টপ টেন কোম্পানির মধ্যে আমার কোম্পানি বলেই এতো খাতির ”
পেছন থেকে নিশিতার কণ্ঠ,

“কি হয়েছে ফারিস ভাই? কোনো সমস্যা?”
ফারিস তৎক্ষণাৎ স্বাভাবিক হয়ে মাথা নাড়লো,
“না, তেমন কিছু না। তুই পড়াশোনা কর। আমি অফিসে যাচ্ছি, হয়তো আসতে রাত হবে আর তোর সামনে এক্সাম না পড়তে বস এবং সিলেবাস কমপ্লিট।”
কথা শেষ করে আলতো করে নিশিতার কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেল। নিশিতা দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার মন চাইছিল আরও একটু কাছে যেতে,
আরও একটু সময় ধরে রাখতে। কিন্তু সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল।

কালো মার্সিডিজটা এসে থামলো তালুকদার ইন্ডাস্ট্রির সামনে। ফারিস গাড়ি থেকে নেমে সোজা ভিতরে ঢুকলো। অফিসটা নিখুঁতভাবে সাজানো
নিরিবিলি, পরিপাটি, শৃঙ্খলিত। প্রতিটা ডেস্কে কাজ চলছে নিঃশব্দে। কোথাও কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই। কিন্তু ফারিস এসব উপেক্ষা করে সোজা এগিয়ে গেল রিভানের কেবিনের দিকে।
দরজা খুলতে,

“ওয়েলকাম মি. চৌধুরী,” রিভানের কণ্ঠে ভদ্রতা।
“থ্যাংক ইউ,” ফারিস বসে পড়লো।
রিভান উঠে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“প্লিজ, বসুন।”
মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে আগুন জ্বলছে কিন্তু তার কোনো ছাপ বাইরে নেই। সে ল্যান্ডলাইনে কফি অর্ডার দিল।তারপর বলল,
“কেমন আছেন?আমাদের অফিস কেমন লাগলো?”
ফারিস শান্তভাবে বলল,
“Alhamdulillah, I am doing well.
I must say, your office is very beautiful and nicely maintained.”
রিভান আবারও হাসলো,

“ধন্যবাদ।”
ফারিস সরাসরি বলল,
“এবার কাজের কথায় আসা যাক?”
রিভান চেয়ারে হেলান দিয়ে ধীরে বলল,
“সিওর।আপনার সাথে মিটিং ফিক্স করার একটা কারণ আছে। গতকাল পার্টিতে আমি আপনার আর মিস আরিশার সম্পর্কটা খুব একটা ভালো দেখিনি। আমি জানি না আপনাদের মধ্যে কি সমস্যা কিন্তু আমি চাই টেন্ডারটা যেন কোনো পার্সোনাল ইস্যুর কারণে খারাপ না হয়।
আপনি তো নিজেও একজন বড় ব্যবসায়ী।
বিষয়টা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন… মি. চৌধুরী।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
ফারিসের কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা উত্তেজনা
চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
ফারিস তার গাঢ় বাদামি চোখ স্থির করে রাখলো রিভানের হালকা সবুজ আভা নয়নের উপর।
তার কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস,

“আই নো আমি আপনার বিষয়টা বুঝতে পারছি।
কিন্তু ফারিস ওয়াহিদ চৌধুরী এতোটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারে আমি কোনো পার্সোনাল প্রবলেম বিজনেসে জড়াই না। বিজনেস তো আর কম দিন করছি না। আর যদি কাজে হেলাফেলা করতাম
তাহলে আমার দাঁড় করানো কোম্পানি আজ বিশ্বের টপ টেনের মধ্যে থাকতো না।
চিন্তা করবেন না আপনার টেন্ডার যখন নিয়েছি,
তখন সেটা কমপ্লিট করার দায়িত্বও আমার।”
রিভানের বুঝতে বাকি রইলো না, ফারিস খুব ঠান্ডা মাথায় তার অবস্থান বুঝিয়ে দিল।
তবুও মুখে হাসি রেখে বলল,

“আমি আসলে”
কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারিস উঠে দাঁড়ালো।
“আজ তাহলে আসি, মি. তালুকদার। অফিসে অনেক কাজ ফেলে এসেছি।”
আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। গটগট পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। রিভান স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার দিকে। তারপর ধীরে বিড়বিড় করে বলল,
“খেলাটা এবার শুরু হবে, মি. চৌধুরী আপনি পাকা খেলোয়াড় জানি। কিন্তু আমিও খুব একটা খারাপ খেলি না”
এরপর বাকা হাসি দিয়ে চেয়ারে আরাম করে বসে।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল, বিকাল পেরিয়ে রাত।
সারাদিন অফিসের কাজে ডুবে ছিল ফারিস।
একটা নাদুটো কোম্পানি একসাথে সামলাতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা। তবুও মুখে বিরক্তির ছাপ নেই।
এটাই তার অভ্যাস। হঠাৎ কাজের মাঝেই নিশিতার মুখ ভেসে উঠলো।মনটা কেমন নরম হয়ে গেল।
ফোন বের করে ওয়ালপেপারের ছবিটার দিকে তাকালো। অজান্তেই ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসি,
“সারাদিন বউটার খবর নেওয়া হয়নি একটা কল করেই দেখি ”
রাত তখন প্রায় নয়টা। ফারিস কল দিল নিশিতার ফোনে। এদিকে নিশিতা সারাদিন রুম থেকে বের হয়নি। সামনেই পরীক্ষা ফারিসের কথা মতো সিলেবাস কমপ্লিট করতে ব্যস্ত ছিল। দুপুরে খায়ওনি। আমেনা চৌধুরী মেইড দিয়ে খাবার পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সে খায়নি। ফারিসের সাথে একসাথে খাবে বলে। পড়তে পড়তেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না। ফোনটা পাশে পড়ে আছে, নীরব। ফারিস টানা কয়েকবার কল দিল
কোনো রিসিভ নেই। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ।

“ঘুমিয়ে গেছে নাকি…?”
নিজেকে বোঝাতে চাইল। কিন্তু অদ্ভুত অস্বস্তি কাটলো না। কাজের ফাইল সামনে খোলা তবুও মন বসছে না। নিশিতার কথা বারবার মাথায় ঘুরছে। একটা অজানা ভয় ধীরে ধীরে ফারিসের ভেতরে জায়গা করে নিতে লাগলো।
হঠাৎ করেই অ্যালার্ম বেজে উঠতেই নিশিতা ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঠিক রাত নয়টা। পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়েই বুক ধক করে উঠলো
ফারিসের একের পর এক মিসড কল। আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি নাম্বার ডায়াল করলো। কল যেতেই ওপাশ থেকে ফারিস সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করলো কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি,
“সমস্যা কি তোর? আমাকে টেনশনে রাখবি নাকি?
কতবার ফোন করলাম একবারও রিসিভ করলি না?”
নিশিতা শান্ত গলায় বলল,

“ঘুমিয়ে গেছিলাম তাই রিসিভ করতে পারিনি।
সরি”
ফারিস যেন আরও রেগে গেল,
“ওয়েট কর। আজকে বাসায় ফিরি তারপর তোকে বোঝাবো আমি তোর ভাই নাকি বর!”
নিশিতা নরম গলায় বলল,.
“আচ্ছা সরি আর বলবো না। আপনি তাড়াতাড়ি আসুন। আপনাকে খুব মিস করছি…”
এই কথাটুকুই ফারিসের রাগ গলিয়ে দিল।
কণ্ঠ নরম হয়ে গেল,
“আচ্ছা জান আর একটু ওয়েট কর।
আমি আসছি। চিন্তা করিস না।”
“সাবধানে আসবেন,” নিশিতা বলল।
“হুম ” বলে ফারিস কল কেটে দিল।
এদিকে চৌধুরী বাড়িতে আজ জমজমাট পরিবেশ।
সবাই একসাথে খেতে বসেছে। হাসি-আড্ডা চলছে।

কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও আরাফাত চৌধুরী আর রিয়ার মুখ গম্ভীর। তাদের ভালো লাগছে না কিছুই।
আমেনা চৌধুরী মেইড দিয়ে নিশিতার রুমে খাবার পাঠিয়ে দিয়েছেন কারণ তিনি জানেন মেয়েটার পরীক্ষা।এক এক করে সবার খাওয়া শেষ।
বাড়ি ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেল। রাত প্রায় বারোটা। নিশিতা এখনও পড়ছে। কিন্তু কতক্ষণ আর পড়া যায়? বই বন্ধ করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। আকাশে কয়েকটা মেঘ ভাসছে।
হালকা বাতাস। সে চুপচাপ তাকিয়ে রইলো
মনে পুরনো স্মৃতি, গত কয়েক মাসের ঝড়,
অভিমান, ভালোবাসা এসব ভাবতে এখন আর ভালো লাগে না তার।ঠিক তখনই চৌধুরী ভিলার সামনে গাড়ি এসে থামলো। গাড়ি থেকে নামলো ফারিস আর রাজীব।ফারিস চাবিটা রাজীবের হাতে দিয়ে বলল,
“গাড়ি পার্ক করে আস।”

আর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল, তার গন্তব্য একটাই নিশিতার রুম। রাজীব আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“বউ পেয়ে সবারই আগে বাড়িতে যাওয়ার পাল্লা
জীবন যুদ্ধে আমি নিজেই অনেক পিছিয়ে গেছি।
কি জানি কবে নিজের করে পাবো আমার বউটাকে”
আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি পার্ক করে সেও ভিতরে ঢুকলো। ফারিস তখন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে।
রাজীব পাশে এসে খোঁচা দিল,
“বউ পেয়ে দেখছি মুখে গ্লো ফুটে উঠেছে! কবে যে আমারও একটা হবে ”
ফারিস চোখ রাঙিয়ে বলল,
“যাবি এখান থেকে? নাকি মার খাবি?”
রাজীব হেসে বলল,
“যাচ্ছি যাচ্ছি এই এতিমটাকে কেউ দেখলোও না।
একদিন আমারও বউ হবে ওইদিন সবাইকে দেখিয়ে দিবো!”
ফারিস আর পাত্তা না দিয়ে সোজা নিশিতার রুমে ঢুকলো রুমে ঢুকেই থমকে গেল, রুমে ঢুকেই থমকে গেল নিশিতা নেই। কপালে ভাঁজ পড়লো।

ওয়াশরুমে গেল দরজা খোলা, ভেতরে কেউ নেই।
এক অদ্ভুত অস্বস্তি হলো তার।হঠাৎ চোখ গেল বেলকনির দরজার দিকে আধখোলা।
নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে দেখলো নিশিতা হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
ফারিস পেছন থেকে এসে ধীরে কোমর জড়িয়ে ধরলো। মুখ ডুবিয়ে দিল তার গলায়।
হঠাৎ পুরুষালী স্পর্শে নিশিতা চমকে উঠলো
কিছুক্ষণ পর বুঝলো ফারিস।শান্ত হয়ে গেল।
ফারিস নেশা মেশানো কণ্ঠে বলল,
“কি হয়েছে জান? ভয় পাস না আমি ছাড়া তোকে আর কে ছুঁবে?কার এত সাহস?”
নিশিতা চুপ।

“এতো রাতে এখানে কেন?
ঘুমাসনি?”
মাথা নিচু করে বলল,
“আপনার জন্য ওয়েট করছিলাম…”
ফারিসের চোখ নরম হয়ে গেল।
“আজ থেকে তুই আমার রুমে থাকবি। আমার বউ আমার কাছেই থাকবে।”
নিশিতা অবাক,
“কিন্তু বাড়ির সবাই কি বলবে?”
ফারিস দৃঢ় কণ্ঠে,
“সে আমি দেখে নেবো। তুই আর আমার থেকে দূরে থাকবি না আমি সহ্য করতে পারি না।”
তার হাত ধরে বলল,
“চল খুব ক্লান্ত আজ। ঘুমাবো তোর বুকে মাথা রেখে।”

নিশিতা কিছু বললো না শুধু চুপচাপ তার সাথে হাঁটতে লাগলো। দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে পড়লো করিডোরে একসাথে, এক পথেই। তারপর রুমে গিয়ে ফারিস নিশিতার বুকের উপর থেকে ওড়নাটা
শরিয়ে ঘুমিয়ে গেল আর নিশিতাও ফারিসের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে কখন যে ঘুমিয়ে গেল নিজেই জানেনা।
.
.
এদিকে রাজীব ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে রইলো। রুমটা অদ্ভুত নীরব। আজ সারাদিন অহনার সাথে ঠিক মতো কথা হয়নি সকালবেলার সেই ছোট্ট কথাটাই ছিল শেষ।
হঠাৎ করেই বুকের ভিতর কেমন যেন শূন্য শূন্য লাগলো তার। মোবাইলটা হাতে তুলে নিলো।
কোনো কিছু না ভেবেই কন্টাক্ট লিস্ট থেকে অহনার নামটা বের করে কল দিলো।এদিকে অহনা ফোন স্ক্রল করছিলো। এতো রাতে রাজীবের কল দেখে অবাক হয়ে গেলো সে। ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর রিসিভ করলো।
“ঘুমাননি আপনি?”
নরম কণ্ঠে বললো অহনা। রাজীব হালকা হাসলো, যদিও সেই হাসি কেউ দেখলো না।

“নাহ্ ঘুম আসছে না। তোমার কথা মনে পড়ছে। মিস ইউ অহনা ”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর অহনার মৃদু হাসি ভেসে এলো।
“আজকেই তো দেখা হলো। তাহলে এতো মিস করছেন কেনো?”
রাজীব জানালার দিকে তাকিয়ে বললো,
“জানি না… হয়তো তোমার সাথে কথা না বললে দিনটা অসম্পূর্ণ লাগে।”
অহনার গলায় এবার মায়া মিশে গেলো।
“আপনি না… একদম পাগল।” “তোমার জন্যই পাগল।”
দুজনেই চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ।কিন্তু সেই নীরবতাও যেন ভরা ছিল কথায়, অনুভূতিতে।
এরপর শুরু হলো ছোট ছোট কথা আজকে কে কি করলো, কে কাকে কি বললো, মাঝে মাঝে অহনার হাসি, আর রাজীবের মুগ্ধ হয়ে শোনা।সময় কিভাবে কেটে গেলো কেউ বুঝতেই পারলো না।
রাত আরো গভীর হলো, কিন্তু তাদের কথার শেষ হলো না।শেষে অহনা বললো,

“এখন ঘুমান। না হলে কাল উঠতে পারবেন না।”
রাজীব ধীরে বললো,
“ঠিক আছে… কিন্তু একটা কথা?”
“কি?”
“শুভরাত্রি আর স্বপ্নে আসবা।”
অহনা লজ্জা পেয়ে ধীরে বললো,
“দেখা যাবে…”
কল কেটে যাওয়ার পরও রাজীব কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়েই বসে থাকলো। মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠেছে।মনে হলো জীবনের যুদ্ধে সে হয়তো পিছিয়ে আছে, কিন্তু ভালোবাসার পথে
ধীরে ধীরে সে এগিয়েই যাচ্ছে।

এদিকে জামান বাড়িতে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে।
আরিশ জামান আরিশাকে বাড়িতে আনার পর থেকেই মেয়েটা নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে আর বের হয়নি একবারও। সারাদিন তার মুখে এক দানাও খাবার তোলেনি। আরিশ জামান নিজেও কিছু খেতে পারেননি।মেয়ের চিন্তায় বারবার রুমের সামনে গিয়ে ডাকছেন,
“মা দরজা খোল কিছু খেয়ে নে।”
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া নেই। রুমের ভেতরে সবকিছু এলোমেলো। বালিশ মেঝেতে পড়ে আছে, টেবিলের উপর বই ছড়ানো, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আরিশা। চোখ দুটো কান্নায় ফুলে গেছে, লাল হয়ে আছে। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললো,

“তোর মধ্যে কি এমন কম ছিলো, যে ফারিস তোকে ভালোবাসলো না? নিশিতার থেকে কোন দিক দিয়ে কম ছিলি তুই?”
কথাগুলো বলতেই গলা আটকে গেলো।
দু’ফোটা নোনা পানি গড়িয়ে পড়লো গাল বেয়ে।
নিজেকে সামলে নিতে চেষ্টা করলো সে।
ধীরে ধীরে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো।
আজকের হাওয়াটাও যেন বিষের মতো লাগছে তার কাছে। চারপাশের সবকিছু ফাঁকা শূন্য
ঠিক তখনই খবরটা মাথায় ঘুরে উঠলো,
নিশিতা এখন ফারিসের স্ত্রী।
এই সত্যিটা যেন বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধলো।
দূরের আকাশে গোল চাঁদটা জ্বলছে কিন্তু তার জীবনে কোনো আলো নেই। অশ্রু ভেজা চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কণ্ঠে গেয়ে উঠলো,

“রাত চাঁদের আলো জ্বলে বন্ধু…” 🌕
“তোমারও ঘরে…”
“হায় আলো যে জ্বলে না আমি…” ✨
“একলা আন্ধারে”

গলার স্বর ভেঙে গেলো।
শেষ লাইনটা আর পুরো করতে পারলো না।
মেঝেতে বসে পড়লো আরিশা। নিজের হাঁটু জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো যেন বুকের ভেতরের সব শব্দচোখের পানি হয়ে বের হয়ে আসছে।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৭

এদিকে দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আরিশ জামান কেবলই মেয়ের কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছেন।কিন্তু দরজা ভাঙার সাহস পাচ্ছেন না কারণ তিনি জানেন, মেয়েটার ভাঙা মনটা জোর করে জোড়া দেওয়া যাবে না। রাতটা কেটে গেলো এই নিস্তব্ধতায়।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৯