চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৯ (২)
আয়াত বিনতে নূর
ফারিস অফিসের ভিতরে গিয়ে কোনো দিক না তাকিয়ে সোজা রিভানের কেবিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। এক মুহূর্তও দেরি না করে দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলো।ভেতরে দেখা গেল রিভান নিজের ডেস্কে বসে কিছু ফাইল খুব মনোযোগ দিয়ে চেক করছে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকাতেই ফারিসকে সামনে দেখে সে খানিকটা অবাক হয়ে গেল।তাড়াতাড়ি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আরে মি. চৌধুরী! আপনি এখানে?”
ফারিস ঠোঁটের কোণে হালকা বাকা হাসি রেখে ধীর গলায় বলল,
“কেন? আসতে পারি না?”
রিভান একটু অপ্রস্তুত হয়ে হালকা হাসলো।
তারপর দ্রুত বলল,
“কেন নয়! অবশ্যই পারেন। বসুন, প্লিজ।”
ফারিস আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে সামনে রাখা চেয়ারে বসে পড়লো। রিভানও আবার নিজের চেয়ারে বসলো। কিন্তু তার চোখে-মুখে স্পষ্ট কৌতূহল আর অস্বস্তি ফুটে উঠেছে। কিছুক্ষণ ফারিসের দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলল,
“কিছু হয়েছে মি. চৌধুরী? না মানে… হঠাৎ করে আপনি এখানে?”
ফারিসের ঠোঁটে তখনও সেই বিদ্রুপ মাখা হাসিটা লেগে আছে। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে রিভানের দিকে যেন ভেতরের সব কথা সে চোখ দিয়েই পড়ে নিতে চাইছে। ঘরের ভেতরের পরিবেশটা মুহূর্তেই ভারী হয়ে উঠলো। রিভানের বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি কাজ করতে লাগলো, আর ফারিস তখনও একইভাবে বসে আছে, শান্ত, স্থির কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে ঝড়ের আগামন।
রিভানের দিকে তাকিয়ে ফারিস গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“মি. তালুকদার… আপনি ডালে ডালে চললেও আমি চলি পাতায় পাতায়। নাহলে এমনিই কি এত বড় বিজনেসম্যান হতে পেরেছি বলুন?”
ফারিসের চোখের দৃষ্টিটা এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে রিভানের বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। তবুও সে নিজেকে সামলে রেখে শান্ত গলায় বলল,
“আপনার কথার মানে বুঝতে পারলাম না, মি. চৌধুরী।”
ফারিস ধীরে ধীরে পায়ের উপর পা তুলে বসল।
তারপর ঠোঁটে দুই আঙুল ছুঁইয়ে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“কালকে রাতে আপনি লোক পাঠিয়েছিলেন এনএস গ্রুপের বিগ টেন্ডারের ডকুমেন্টস চুরি করার জন্য। এম আই রাইট?”
কথাটা শুনে রিভানের মুখের রঙ এক মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না ফারিস এত কিছু জানলো কীভাবে!
আর এতটা নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলছে!
ফারিস আবারও ধীরে ধীরে বলল,
“আই নো… আপনি পাকা খেলোয়াড় না হলেও খুব একটা মন্দ খেলেন না। বাট বাট বাট…”
সে একটু থামলো।তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমার কাছে আপনি এখনও ছোট্ট একটা পাখির বাচ্চা সমান।”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
ফারিস সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল,
“আপনার মনে হলোটা কী? আমার সিকিউরিটি সিস্টেম এতোটাই দুর্বল যে আপনার ভাড়া করা লোক আমার অফিস থেকে আমার টেন্ডারের ডকুমেন্টস নিয়ে চলে যাবে আর আমি বসে বসে দেখবো?”
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবার বলল,
“মি. তালুকদার আমি এতোটাও বোকা না যে আমার এত ইম্পরট্যান্ট ডকুমেন্টস অফিসে রেখে দেবো।”
তারপর ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বলল,
“যেগুলো নিয়ে এসেছেন… সেগুলো একটু চেক করে দেখুন তো ওগুলো আসলে কী?”
ফারিসের চোখের দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে রিভানের উপর। আর রিভানের বুকের ভেতর তখন ধুকপুক শব্দ যেন আরও জোরে বাজতে শুরু করেছে। রিভান নির্বাক হয়ে বসে রইলো।
সে বুঝে গেছে সে ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু এখন কী বলবে? কীভাবে স্বীকার করবে যে এসব কাজ সে-ই করেছে? কেবিনের ভেতরে কয়েক সেকেন্ডের ভারী নীরবতা নেমে এলো। ফারিস গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“দেখুন মি. তালুকদার… আমার কোম্পানিটা আমার স্বপ্ন। গত সাত বছর ধরে এই কোম্পানিটাকে আমি বিশ্বের টপ ১৫ কোম্পানির মধ্যে দাঁড় করিয়েছি। আর আপনি যা করেছেন
এর ফল ভালো হবে না।”
তার চোখে তখন ঠান্ডা সতর্কতা। সে আবার বলল,
“সময় আসলে সবটা ফিরিয়ে দেবো।
আপাতত আসি।”
এই বলে ফারিস চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।
দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেল।ঠিক তখনই পিছন থেকে রিভানের কণ্ঠ ভেসে এলো,
“খুব ভালোবাসেন না নিশিতাকে?”
কথাটা শোনা মাত্রই ফারিস এক ঝটকায় পিছনে ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখে তখন আগুনের ঝলক।
রিভানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“শাট আপ। জাস্ট শাট আপ। আর একবারও ওর নামটা যেন আপনার মুখে না শুনি। নাহলে ভদ্রতা কাকে বলে সেটা আমাকে ভুলে যেতে হবে।”
রিভান ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসলো। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আমার সন্দেহটা ভুল না, মি. চৌধুরী।
আপনি সত্যিই ভালোবাসেন নিশিতাকে?”
ফারিস মাথা সামান্য কাত করে বাকা হাসলো।
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত তীব্রতা। সে ধীরে ধীরে বলল,
“শুধু ভালোবাসি না ও আমার আনহেলদি অবসেশন। যাকে ছাড়া নিঃশ্বাস নেওয়াটাও
আমার জন্য দুষ্কর।”
এই বলে ফারিস ধীর পায়ে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন পুরো কেবিন জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। রিভান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ এখনও দরজার দিকেই স্থির। যেন সে এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না ঠিক এইমাত্র কি ঘটল।
ফারিসের বলা কথাগুলো যেন কেবিনের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে। হঠাৎ করেই রিভানের মনে হলো তার বুকের ভেতর থেকে কেউ যেন তার হৃৎপিণ্ডটা ছিনিয়ে নিতে চাইছে। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না সে।
ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল।
তার দুই হাত টেবিলের উপর রাখা, মাথাটা একটু নিচু। মনের ভিতরে যেন তীব্র এক ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই ঝড়কে থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে সে, কিন্তু মন কি আর কারও কথা শুনে? রিভানের ভিতরটা কেমন জানি জ্বলে যাচ্ছে। যেন আগুনে পুড়ে যাচ্ছে সবকিছু। বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ছে।
ফারিসের বলা প্রতিটা কথা বারবার তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে,
“নিশিতার কাছ থেকে দূরে থাকবেন ”
“ওর জীবনে যতটা ঢুকেছেন তার বেশি ঢোকার চেষ্টা করবেন না ” “কিছু জিনিস আমি কাউকে ভাগ দিতে পছন্দ করি না ”
কথাগুলো যেন কাঁটার মতো এসে বিঁধছে রিভানের মনে। রিভান চোখ বন্ধ করল। গভীর করে কয়েকবার শ্বাস নিল। নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল সামনে।
তার চোখে এখন আর আগের সেই শান্ত মানুষটার ছায়া নেই। চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠেছে, ঠোঁট শক্ত করে চেপে আছে।চোখে মুখে এক অদ্ভুত হিংস্রতা ফুটে উঠল। রিভান ধীরে ধীরে টেবিলের উপর রাখা ফাইলটা সরিয়ে দিল। তার মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। তারপর নিচু গলায়, দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি নিশিতাকে ভালোবাসেন নাকি বাসেন না এতে আমার কোনো যায় আসে না, মি. চৌধুরী।”
তার চোখে জেদ আর দখলদারির আগুন জ্বলে উঠল।
“নিশিতা আমার… আর আমারই থাকবে।”
একটু থেমে ঠান্ডা কিন্তু ভয়ংকর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“ইটস ফাইনাল।”
কেবিনের নিস্তব্ধতার মধ্যে তার কথাগুলো যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।রিভান ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। কিন্তু তার চোখে তখন একটাই সংকল্প
যে করেই হোক, নিশিতাকে সে কারও হতে দেবে না।
কাউকেই না।
চৌধুরী বাড়ির পরিবেশটা তখন বেশ শান্ত। সকলে যে যার রুমে ব্যস্ত। করিডোর জুড়ে নীরবতা।
নিশিতা এখনও তার রুমের দরজা খোলেনি। পড়ার টেবিলে বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মনটা পুরোপুরি পড়ায় নেই। মাঝে মাঝে তার চোখ চলে যাচ্ছে জানালার দিকে। মনে অজানা এক দুশ্চিন্তা কাজ করছে, যদিও নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে,
“সব ঠিক হয়ে যাবে… ফারিস তো বলেছিল সব সামলে নেবে।”
এদিকে রাজীবের ঘুম ভাঙলো প্রায় বেলা ১০টার দিকে। গতরাতে অনেক দেরিতে ঘুমোনোর জন্যই এত দেরি হয়ে গেল। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসলো সে। মাথার চুলে হাত বুলিয়ে একবার ঘড়ির দিকে তাকাল।
“উফ! এত দেরি হয়ে গেল!”
আর কিছু না ভেবে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল শাওয়ার নিতে। অফিসের বিভিন্ন কাজের চাপ যেন একসাথে এসে মাথায় চেপে বসেছে। কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে বের হলো রাজীব। আলমারি খুলে একটা ফর্মাল শার্ট আর প্যান্ট বের করে পরল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই ঠিক করতে করতে নিজের ফোনটা হাতে নিল। ফোন হাতে নিতেই হঠাৎ করেই অহনার কথা মনে পড়ল।
রাজীবের ঠোঁটে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলে,
“মেয়েটাকে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে… এতদিন ধরে শুধু ফোনেই কথা হচ্ছে।”
ভাবতেই আর নিজেকে আটকাতে পারল না সে।
দ্রুত অহনার নাম্বারে কল দিল।
অহনা অনেকক্ষণ ধরে পড়তে বসে আছে। সামনে একগাদা বই খোলা। সামনেই পরীক্ষা, তাই মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ করেই ফোনটা বেজে উঠল। অহনা একটু বিরক্ত হয়ে ফোনটার দিকে তাকাল। কিন্তু স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
নামটা সেভ করা,
“Disturb”।
“এই ছেলেটা না…!”
মনে মনে বিড়বিড় করল অহনা।
তবুও ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসি নিয়ে ফোনটা রিসিভ করল।ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রাজীবের দুষ্টু গলা,
“কি করো বউ?”
অহনা হালকা হেসে বলল,
“এই তো পড়ছিলাম। আপনি কি করছেন?”
রাজীব একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“আরে এত পড়াশোনা করতে হবে না। তাড়াতাড়ি করে বাড়ি থেকে বের হও। আমি আসছি তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে বউ। তোমার এই এক্সামটা শেষ হবে যে কবে!”
তারপর আর অহনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত বলল,
“যাক এসব বাদ দাও। তাড়াতাড়ি এসো। আর হ্যাঁ… আমি কিন্তু না শুনতে চাইছি না।”
এই বলে একদম ঝট করে কল কেটে দিল।
অহনা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
“এই লোকটা না !” কি করবে এখন সে?
রাজীব তো এক নিঃশ্বাসে সব কথা বলে কল কেটে দিল। অহনাকে কিছু বলার সুযোগই দিল না।
অহনার মাথায় তখন নতুন চিন্তা।
“এখন আমি বাড়ি থেকে বের হবো কিভাবে?”
সামনেই পরীক্ষা। এত এত পড়া বাকি। তার উপর যদি আম্মু জানতে পারে এখন বাইরে যাবে তাহলে তো আর রক্ষা নেই! কিছুক্ষণ বিছানায় বসে ভাবল সে। তারপর হঠাৎ করেই উঠে দাঁড়াল।
“না না এত ভাবলে হবে না। যেতেই যখন হবে, দেরি করে লাভ নেই।”
নিজের মনকেই বুঝিয়ে বলল সে।তারপর তাড়াহুড়ো করে আলমারি খুলে কাপড় বের করল।
“দেখি আজ মিস্টার ডিস্টার্ব কি বলেন!”
হালকা হাসি দিয়ে অহনা দ্রুত রেডি হতে চলে গেল।
এদিকে দেখতে দেখতে পুরো দিনটাই কেটে গেলো।
ফারিস আজ সারাদিনই নিজের অফিসে ব্যস্ত ছিল।
অফিসের কাজের চাপ যেন দিন দিন আরও বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশে তার এতগুলো ব্রাঞ্চ সামলানো মোটেও মুখের কথা নয়। প্রত্যেকটা অফিসের পাই টু পাই আপডেট, কোথায় কি হচ্ছে, কোন ডিপার্টমেন্টে কি কাজ চলছে সবকিছুতেই নজর রাখতে হয় তাকে। তার উপর আবার বিগ টেন্ডারের বিষয়টা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
একদিকে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলোর চাপ, অন্যদিকে নিজের কোম্পানির সুনাম ধরে রাখা সব মিলিয়ে একপ্রকার হিমশিম খেতে হচ্ছে ফারিসকে।
তবুও আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার মুখে বিন্দুমাত্র বিরক্তির ছাপ নেই। সেই আগের মতোই গম্ভীর, স্থির আর আত্মবিশ্বাসী। নিজের কাজের প্রতি সে সবসময়ই অটল। ডেস্কের সামনে বসে ফাইলগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই ফারিসের চোখ গেল দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে।
রাত ৮টা বাজতে আর খুব বেশি সময় নেই।
ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়েই হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো নিশিতার সেই নিষ্পাপ, বাচ্চা বাচ্চা মুখটা। মেয়েটার বড় বড় চোখ একটু ভীতু ভীতু চাহনি আর হাসলে গালে ছোট্ট টোল পড়ে।
ভাবতেই ফারিসের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
তবে সেই হাসিটা এতটাই সূক্ষ্ম যে কেউ সামনে থাকলেও বুঝতে পারত না সে হাসছে। মনে মনে ধীর কণ্ঠে বলল,
“আর একটু ওয়েট কর জান আমি আসছি… খুব তাড়াতাড়িই।”
তারপর আবার নিজেকে সামলে নিয়ে ফাইলের দিকে মনোযোগ দিলো।
চৌধুরী বাড়িতে সারাদিন প্রায় নিজের রুমেই ছিল নিশিতা। রুমের দরজা বন্ধ করে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে বসে ছিল সে। আমেনা চৌধুরী একবার এসে জোর করেই তাকে খাইয়ে দিয়ে গেছেন। নিশিতাকে নিয়ে তার চিন্তার যেন শেষ নেই। পরীক্ষা শুরু হলেই মেয়েটা যেন আর পৃথিবীর কিছুই বোঝে না। সারাদিন না খেয়ে, না ঘুমিয়ে শুধু বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকে।
এই বিষয়টা নিয়ে মাঝে মাঝে আমেনা চৌধুরী
বিরক্ত হন ঠিকই, কিন্তু মুখে তেমন কিছু বলেন না।
কারণ তিনি জানেন মেয়েটা তাদের জন্যই এতটা পরিশ্রম করে পড়াশোনা করছে। তাদের মুখ উজ্জ্বল করার জন্যই নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছে।
বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ তার চোখ গেল টেবিলের পাশে রাখা ছোট্ট ঘড়িটার দিকে।
ঠিক রাত ৮টা বাজে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হালকা ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বলল,
“ফারিস ভাই এখনও আসলো না যে…”
তাই পড়ার মাঝেই একবার নিশিতাকে কল করলো সব কিছু নিজের মুখে শোনার জন্য। অহনার নাম্বারটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই নিশিতা একটু হাসলো। তারপর ফোনটা রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে অহনা বলল,
“কিরে নিশুর বাচ্চা! আমাদের কাছে না বলেই বিয়ে করে নিলি তুই? একবারও তোর এই অবিবাহিত বোন আর বান্ধবীর কথা মনে হলো না?”
নিশিতা হালকা করে হাসলো। তারপর একটু লজ্জা মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“সরি রে… তোদের সবটা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময়ের অভাবে বলতে পারিনি। তোরা রাগ করিস না প্লিজ।”
অহনা হেসে বলল,
“আরে রাগ করবো কেনো নিশু! আমরা তো তোর অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু যাই হোক শোন কালকে কিন্তু কলেজে লাস্ট ক্লাস। তুই কি আসবি, না আসবি না?”
নিশিতা একটু ভেবে বলল,
“হয়তো আসতে পারবো না রে। অনেক পড়া বাকি। আর তার সাথে ফারিস ভাই তো আছেই পড়ার জন্য চাপ দেয় সব সময়। তাই ভাবছি একেবারে পরীক্ষার দিনই যাবো।”
অহনা হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তাহলে তুই পড় জান। আমিও পড়ি, না হলে আবার পরীক্ষায় ফেল করবো।”
এই বলেই অহনা কলটা কেটে দিলো। আর নিশিতা ফারিসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।ডিনার টাইমে রিয়া এসেছিল নিশিতাকে ডাকতে কিন্তু নিশিতা বলেছে পারিস এর সাথে খাবে তাই রিয়া চলে যায় আর হাসিটা ফারিশের জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করতে লাগে।
জামান বাড়িতে এক অদ্ভুত অস্থির পরিবেশ। গতকাল থেকে আরিশা নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে রেখেছে। কেউ যতই ডাকাডাকি করুক, সে একবারের জন্যও দরজা খুলেনি। প্রথমে সবাই ভেবেছিল কিছু সময় পর নিজে থেকেই দরজা খুলবে, কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগলো, ততই চিন্তা বাড়তে লাগলো।
শেষ পর্যন্ত আর উপায় না পেয়ে আরিশ জামান বাধ্য হয়ে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলেন।
দরজা ভাঙা হলো। দরজা খুলতেই সবাই থমকে গেল। রুমের ভেতরের অবস্থা যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে। টেবিল-চেয়ার উল্টে আছে, ফুলদানি ভাঙা, বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। আয়নার এক কোণ ভাঙা, ড্রেসিং টেবিলের সব জিনিস ছড়িয়ে আছে চারদিকে। আর মাঝখানে বিছানার পাশে মেঝেতে বসে আছে আরিশা।
একদিনেই যেন মেয়েটা একেবারে বদলে গেছে। চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ, মুখটা ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে সে ঠিকমতো ঘুমায়নি, ঠিকমতো খায়ওনি।
ডাক্তার এসে তাকে দেখছিলেন। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করার পর ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়ে আরিশ জামানের দিকে এগিয়ে এলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
“দেখুন, উনাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব দুর্বল হয়ে গেছেন। সম্ভবত ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছেন না। মানসিক চাপও অনেক বেশি। এভাবে চলতে থাকলে খুব দ্রুতই আরও অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি কিছু ওষুধ লিখে দিচ্ছি। নিয়ম করে খাওয়াবেন। আর সবচেয়ে জরুরি ওনাকে খুশি রাখার চেষ্টা করুন। নাহলে খুব দ্রুত ট্রমাটাইজ হয়ে যেতে পারেন।”
এই বলে ডাক্তার চলে গেলেন।
ডাক্তারের কথাগুলো শুনে আরিশ জামান দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন। এই মুহূর্তে তার স্ত্রী দেশের বাইরে। যদি তিনি এসব শুনে ফেলেন তাহলে দুশ্চিন্তায় ভেঙে পড়বেন। তাই সবকিছু একাই সামলাতে হচ্ছে তাকে। ধীরে ধীরে তিনি আরিশার কাছে গিয়ে বসলেন। মেয়ের দিকে তাকাতেই তার বুকটা যেন হুহু করে উঠলো।
ছোটবেলা থেকে মেয়েটাকে তিনি সব দিয়েছেন যা চেয়েছে তাই। কিন্তু আজ প্রথমবার তিনি বুঝলেন, সবকিছু দিয়েও কিছু জিনিস দেওয়া যায় না।
নরম গলায় বললেন,
“ছোট থেকে তুমি যা চেয়েছো, আমি সব দিয়েছি তোমাকে। কিন্তু এবার যখন দিতে পারলাম না তাহলে কেড়ে নাও, বেটা। আমি তো তোমাকে কখনো হারতে শেখাইনি। এবার তোমাকেই কিছু করতে হবে।”
আরিশা ধীরে ধীরে মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো। তার ঠোঁটে এক অদ্ভুত বাকা হাসি ফুটে উঠলো।সে বলল,
“তুমি ভাবলে কিভাবে, ডেড… আমি ফারিসকে ছেড়ে দেবো?”
তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো।
“একদম না। আরিশা জামান কখনো হারতে শেখেনি। আমি আমার জিনিস ছিনিয়ে নিতে জানি। শুধু সময়ের অপেক্ষা। আমার ভালোবাসার আগুন এবার সব ধ্বংস করে দেবে। আমি যদি ফারিসকে না পাই তাহলে ফারিসও নিশিতাকে পাবে না। আমি যে কষ্টে পুড়ছি সেটা সবাইকে অনুভব করাবো।”
আরিশ জামান কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন,
“তাহলে আগে নিজেকে শক্ত করো, বেটা। এভাবে নিজেকে দুর্বল করলে হবে না। নিজের যত্ন নাও।”
আরিশা ধীরে মাথা নাড়লো।
এদিকে রাত অনেক হয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ১২টা ৩০ ছুঁই ছুঁই করছে। নিশিতা অনেকক্ষণ ধরে পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে গেছে। বই বন্ধ করে সে ধীরে ধীরে উঠে বেলকনিতে এসে দাঁড়ালো। নিচের রাস্তাটা প্রায় ফাঁকা। মাঝে মাঝে দূরে কোনো গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে। নিশিতা রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে একটা অদ্ভুত অপেক্ষা।
মনে মনে বলল,
“ফারিস ভাই এখনও আসলো না…”
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছে।
ফারিস অনেকক্ষণ আগেই অফিস থেকে বের হয়েছে।গাড়ি চালাতে চালাতে শহরের নির্জন রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়লো রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট ফুলের দোকানের দিকে। এতো রাতে দোকান খোলা দেখে সে একটু অবাক হলো।
গাড়িটা ধীরে করে থামালো। নেমে দোকানের সামনে গিয়ে দেখলো সেখানে গাজরা ফুল সাজিয়ে রাখা আছে। সাদা ছোট ছোট ফুলের মালা… যার ঘ্রাণ মিষ্টি আর নেশা ধরানো। ফারিস এক মুহূর্তও দেরি করলো না। যতগুলো গাজরা ফুল ছিল সবই কিনে নিলো। টাকা দিয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে বসল। ফুলগুলো গাড়ির পেছনের সিটে রেখে সে হালকা করে বাকা হাসলো। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত কোমলতা।
মনে মনে বলল,
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৪৯
“আমি আসছি জান আর একটু ওয়েট কর।”
তারপর আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাতের অন্ধকার রাস্তায় এগিয়ে গেল সোজা সেই জায়গার দিকে,
যেখানে কেউ একজন অধীর আগ্রহে তার জন্য অপেক্ষা করছে।
