Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ১১

জাহানারা পর্ব ১১

জাহানারা পর্ব ১১
জান্নাত মুন

বিগত বিশটি মিনিট ধরে মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় স্থবির হয়ে বসে আছি। মস্তিষ্কের ভেতরে কেবল একটি চিন্তাই অবিরাম পাক খাচ্ছে— লোকটা কি আমাকে স্টক করছে? আচ্ছা, ঠিক কবে থেকে সে আমায় স্টক করছে?
হায় খোদা! লোকটা যদি অনেক আগে থেকেই আমায় স্টক করে থাকে, তবে তো আমার লোকচক্ষুর অন্তরালের সবটুকুই তার নখদর্পণে। বাইরের জগতের সামনে আমি যতটা শান্ত আর তেজি স্বভাবের আবরণ ধরে রাখি, নিজের খালি ঘর আর ওয়াশরুম-এর নিভৃতে গেলেই যেন এক নাদান বাচ্চা হয়ে যাই।

এই যেমন, জনমানবহীন ফাঁকা ঘর পেয়ে আমি খেয়ালি মনে উরাধুরা কুংফু করি। কখনোবা রূপালি পর্দার নায়িকাদের ভঙ্গিমায় কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে সারা ঘরে ক্যাটওয়াক করি। আবার কখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অধরে দংশন করে কিংবা এলোচুল উড়িয়ে আবেদনময়ী নায়িকাদের মতো হরেক রকম হট পোজ নিই। সে কি তবে আমার এই একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও..?
মনে মনে এই কথাগুলো ভেবে শরীর জমে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে। চোখমুখ কুচকে দু’হাত দিয়ে বিছানার চাদর খামচে ধরলাম। তারপর ঘনঘন কয়েকবার শ্বাস নিয়ে মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম,

–“কোনো ব্যপার না আমি তো জাস্ট একটু ভাব ভঙ্গিই ধরেছি। কোনো আ’কাম-কু’কাম তো আর করিনি ।”
তখই ওয়াশরুম থেকে শাওয়ারের রিমঝিম শব্দে ভাবনায় ছেদ ঘটে। ওয়াশরুমের দরজার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলাম। একটু আগে শ’য়তানটা আমাকে আবল তাবল বলে শাওয়ার নিতে গেছে। যাওয়ার আগে কত আগডুম বাগডুম বকে গেছে কিছুই মাথায় ঢুকলো না। ঢুকবেই বা কিভাবে? যে কথা প্রথমে বলল সেটা শুনেই তো আমি অর্ধেক ডিপ্রেশনে চলে গেছিলাম। তবে ওয়াশরুমে ডুকে কি মনে করে যেন আবার বাইরে উকি দিয়েছিলো। তখন আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে ঠোঁট গোল করে চুম্মা দিয়ে বলেছিলো,

“লাইক নোরা উফফ।”
আজীব পুরুষ এই ইফান চৌধুরী। এখানে নোরা-টোরা শব্দগুলো কোথা থেকে যে আসল, তা আমার বোধগম্য হলো না। আমি তাচ্ছিল্যভরে চোখ উল্টালাম। ঠিক তখনই অবচেতনে কি মনে করে যেন বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলাম— নোরা। এবার অতি মৃদু স্বরে আবারও উচ্চারণ করলাম— নোরা। আর সাথে সাথেই আমার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল।

এক অজানা আ’তঙ্কে গলা যেন মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে; অনেক কসরত করে একটা ঢোক গিললাম। মুহূর্তেই মনের মধ্যে ভেসে উঠল আমার বিবাহিত জীবনের আগের দিনগুলোর কথা। এই যে নির্জন শূন্য রুম পেয়ে যেমন সব ভুংভাং কাণ্ডকারখানা করতাম, ওয়াশরুম-এ তো চলত তার চেয়েও দ্বিগুণ উন্মাদনা!
প্রথমে গলা ফাটিয়ে তারস্বরে গান গাইতে গাইতে গায়ের আবরণ ছাড়তাম। তারপর জলের মগ মাথায় নিয়ে শুরু হতো আমার অদ্ভুত বেলি ডান্স। মাঝে মাঝে আবার অতিরিক্ত কোমর দুলানোর চোটে ভারসাম্য হারিয়ে আছাড়ও খেতাম। কিন্তু আমার পা’গলামি শুধু এখানেই ক্ষান্ত হতো না; বরং চারদিকে ঘুরে ঘুরে পর্দার নায়িকাদের মতো বাতাসে ফ্লাই কিস বিলিয়ে দিতাম। আর যা যা করতাম, তার ভ’য়াবহতা আমি নিজেই আর ভাবতে পারলাম না। ল’জ্জায় আর অনুশোচনায় দুই হাত দিয়ে সজোরে কান চেপে ধরলাম এবং চোখমুখ কুঁচকে গলার সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সজোরে চিৎকার করে উঠলাম,
“নাআআআআ…”
–“ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন ঝাঁঝওয়ালি?”

গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর কানে আসতেই ধীরলয়ে চোখ মেলে তাকালাম। আমার থেকে হাত কয়েক দূরে দাঁড়িয়ে সে কোমরে একটি টাওয়াল জড়িয়ে অন্য একটি টাওয়াল দিয়ে সিক্ত কালো চুলগুলো মুছছে। তার সুগঠিত বলিষ্ঠ দেহে মুক্তদানা সদৃশ স্ফটিক জলবিন্দু চিকচিক করছে। একটি ভ্রু কিঞ্চিৎ উঁচিয়ে সে আমার দিকে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
আমি তখন তার সুঠাম জিম করা শরীরটি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণে মত্ত— উদরে কয়টি খাঁজ ফুটে উঠেছে তা গুণতেই যেন ব্যস্ত। আমার দৃষ্টির অনুসরণ ধরে সেও নিজের শরীরের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অতঃপর ঠোঁটের কোণে সেই চেনা শয়তানি হাসির রেখা ফুটিয়ে জিহ্বার ডগা দিয়ে গালের ভেতরের অংশ ঠেলতে লাগল। লোকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই সশব্দে ঢোক গিলল, যার ফলে তার কণ্ঠনালীর অ্যাডামস অ্যাপল স্পষ্ট হয়ে উঠল— তা দেখে অবচেতনে আমিও একটি ঢোক গিলে ফেললাম।

মুহূর্তেই দৃষ্টি সরিয়ে যখন তার চোখের দিকে তাকালাম, দেখলাম সে কী এক অদ্ভুত কুটিল হাসি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ইশ! লজ্জায় যেন মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। এতক্ষণ আমি যে নির্লজ্জের মতো তার পানে চেয়ে ছিলাম, তা ভেবেই নিজের ওপর বিরক্তিতে গা ঘিনঘিন করে উঠছে।
–“এখন চাইলেও টেস্ট করতে দিবো না। আমি ধরতে গেলেই তো তেজ বেড়ে যায়। আর এখন তুমি লোভ দিলেও লাভ হবে না। শাওয়ারের আগের কাজ পরে করতে পারবো না আ’ম সো সরি ডিয়ার ।”
ইফান চৌধুরীর সেই নোংরা ইঙ্গিতপূর্ণ হেয়ালি বাক্যটি কানে আসতেই মনের পুরনো ক্ষতগুলো যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। তীব্র রাগে মস্তিষ্ক যেন টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে। ক্ষিপ্ত হয়ে বিছানা থেকে একটি বালিশ সজোরে তার দিকে ছুঁড়ে মারলাম; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলো না, সে নিপুণ দক্ষতায় আগেই সেটি ক্যাচ ধরে ফেলল। আমি আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না, ধপ করে বিছানা থেকে নেমে ক্ষিপ্র পদক্ষেপে ঠিক তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালাম। তারপর চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,

–“ডোন্ট টক ক্র্যাপ উইথ মি, অ্যাসহোল। তর সরকারি নড়বড়ে গাড়ি বস্তির রাস্তায় গিয়ে চালা।আমার প্রাইভেট এরিয়ায় আসার চেষ্টা করবি না।”
–“এত তেজ দিয়ে জীবনে কি করলে ঝাঁঝওয়ালি।সেই তো আমার সরকারি গাড়িটাই তোমার নতুন রাস্তায় লং ড্রাইভ করলো। তাও আবার ফুওওওওল নাইট ।”
শেষ কথাটা আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো। রাগে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসল তৎক্ষনাৎ। এটা দেখে ইফানের চোখে উল্লাস ফুটে উঠেছে। এদিকে আমার শরীরটা কিলবিল করে উঠলো। আমার খ্যা’পা দৃষ্টি আর তার পৈশাসিক দৃষ্টির বিনিময় ঘটলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎই আমি মৃদু হেসে ওর গলা জড়িয়ে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম,

–“খুব তাড়াতাড়ি জ্বলে পু’ড়ে শেষ হয়ে যাবে।”
অতঃপর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করলাম না। এক টান মেরে শয়তানটার পরিধেয় টাওয়ালটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেলাম। কিছু একটা মনে করে আবার দরজা একটু ফাঁ’ক করে মাথাটা বের করলাম। আমার এহেন কান্ডে তব্দা লেগে গেছে ইফান চৌধুরী। মুখ হা করে আমার দিকেই তাকিয়ে এখনো। আমি তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে দাঁত কেলিয়ে আঙ্গুল গোল করে বুঝালাম, নাইস।তারপরই ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলাম। দরজা লাগানোর শব্দে যেন ইফান ঘোর থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর আস্তে আস্তে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখে স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে ,

“সামনে সোনার বাংলা, পেছনে জয় বাংলা।”
নিজের এমন অবস্থা দেখে বাকরুদ্ধ ইফান চৌধুরী। আবার ওয়াশরুমের দরজার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। অতঃপর একটা শুকনো ঢোক গিলে অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়,
❝পেট্রোল খরচ করে আমি ভুল রাস্তায় ড্রাইভিং করছি না তো।❞

শাওয়ার নিয়ে ইফানের একটা হাফপ্যান্ট আর কালো রঙের গেঞ্জি পড়ে চো’রের মতো তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। নাহলে আজকে নিশ্চয়ই আমাকে খেয়ে দিতো। ড্রয়িং রুমে বসে সিরিয়াল দেখছে পলি, ইতি, কাকিয়া আর দাদি। সিঁড়ি দিয়ে আমাকে নামতে দেখে সবাই হা করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। এভাবে তাকিয়ে থাকাটায় স্বাভাবিক। ইফানের হাটু পর্যন্ত প্যান্টটা আমার পায়ের গোড়ালির এক ইঞ্চি উপর পর্যন্ত ঠেকেছে। আর গেঞ্জিটা পায়ের হাঁটু সমান হয়েছে। আর ওড়নার অনুপস্থিতি আমাকে ভাবাল না। বরং সেই অভাবটুকু ঘুচিয়ে দিতে আমার একরাশি ঘন কালো কেশদামকেই বেছে নিলাম ।”

–“আরে জাহানারা এগুলো কি পড়েছ?”
কাকিয়ার কথা শুনে অপ্রস্তুত হয়ে মৃদু হাসলাম।এইদিকে ননদিনী ইতি দৌড়ে এসে আমাকে ঘুরে ঘুরে দেখা শুরু করেছে। অতঃপর আশ্চর্য হয়ে বলল,
–“ও বড় ভাবি ভাবি গো তোমাকে বড় ভাইয়ার কাপড় পড়ে যা লাগছে না!”
আমি অপ্রস্তুত হাসলাম। তারপর সকলের সাথে বসে হাসাহাসি করে আড্ডা দিতে লাগলাম। কিছু সময় পড় মেইন ডোরে কলিং বেল বেজে উঠে। কাকিয়া পলিকে বললো দরজা খুলে দিতে। এদিকে পলি আলসেমি করে ইতিকে বললো দরজা খুলে দিতে। আর ইতি সিরিয়াল শেষ না করে উঠবে না। তারা একে অপরকে ঠেলাঠেলি করতে দেখে আমিই গেলাম দরজা খুলতে। দরজা খুলতেই দেখি আমার অতি প্রিয় সাসু মা, মানে নাবিলা চৌধুরী আর তার কনিষ্ঠ পুত্র ইমরান চৌধুরী দাঁড়িয়ে। নাবিলা চৌধুরী নীল রঙের জামদানী শাড়ি পড়ে এমন ভাবে ফিটফাট হয়ে অফিসে গিয়েছিল, যে আমার মনে হচ্ছে এই বয়সে কচি খুকি সেজে লাং ধরতে গিয়েছিল। আমাকে ইফানের কাপড় পড়ে থাকতে দেখে ইমরান ঠোঁট চেপে হাসে দৃষ্টি ঘুরিয়ে অন্য পাশ ফিরে দাঁড়াল। আর নাবিলা চৌধুরী আমাকে আপাদমস্তক দেখে চেঁচিয়ে উঠল,

–“এই ঢিঙ্গি মেয়ে, আমার ছেলের কাপড় পড়েছ কেন?”
–“কি বলছেন সাসুমা, বা’ল তো সব পেকে গেলো আপনার। আর এখনো জানেন না স্ত্রী কখন স্বামীর পোষাক পড়ে? বুঝলাম আব্বাজান বড্ড আন রোমান্টিক হুমমম।”

জাহানারা পর্ব ১০

আমি তৎক্ষনাৎ নেকামি স্বরে প্রতিত্তোর করেই মুখ ঝামটি মেরে চলে গেলাম। ইমরান হাতের উল্টো তালু দিয়ে মুখে ঢেকে কোনো মতে হাসি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। সকলের সামনে এমন কথা শুনে এই দিকে নাবিলা চৌধুরী রাগে ফুঁসে উঠল। সকলের ঠোঁট টিপে হাসি লক্ষ করতেই আরও চেতে যায়। অতঃপর সবার উদ্দেশ্যে সজোরে একটা ধমক দিয়ে ফুঁসতে ফুঁসতে নিজের রুমে চলে যায়। উনি চলে যেতেই উপস্থিত সকলে একসাথে শব্দ করে হেসে দিলো।

জাহানারা পর্ব ১২