Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ১২

জাহানারা পর্ব ১২

জাহানারা পর্ব ১২
জান্নাত মুন

❝আমি বুঝতে পারছি না, যে ছেলে তর হাতের থাপ্পড় খেয়ে রাগে বশবর্তি হয়ে তোকে ধ’র্ষ’ণ পর্যন্ত করলো। সেই ছেলে বিয়ের পর থেকে এত ভালো আচরণ কিভাবে করছে? ইফান চৌধুরীর জায়গায় অন্য কেউ হলে ঘৃ’ণার চোখে দেখতো তোকে। উঠতে বসতে কথা শুনাতো। বাট তর কথা অনুযায়ী ঐ বাড়ির সকলেই ভালো। যদিও নাবিলা চৌধুরী কে একটু ব’দমেজাজি মনে হচ্ছে। তাতে কি? বাকি সবার সাথে তর ভালোই সম্পর্কই ছিল মনে হচ্ছে। ❞

নাদিয়ার কথায় জাহানারার অধরে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি খেলে গেল। ধীর পায়ে সে গিয়ে দাঁড়াল বেলকনির রেলিং ঘেঁষে। টানা দুদিন অঝোর ধারায় বর্ষণের পর আজ আকাশটা যেন ধুয়ে-মুছে একাকার, অদ্ভুত স্বচ্ছ আর নির্মল। শূন্য নীলিমার দিকে তাকিয়ে মেয়েটার বুকের ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে; একরাশ আফসোস নিয়ে সে ভাবে—তার নিজের জীবনটাও তো এই আকাশের মতোই এমন নিষ্কলুষ আর পরিষ্কার হওয়ার কথা ছিল।

সহসা কাঁধের ওপর কারো স্নিগ্ধ করস্পর্শে তার ভাবনার জাল ছিন্ন হয়ে গেল। সম্বিত ফিরে পেয়ে সে পুনরায় দৃষ্টি মেলে দিল সুদূরের পানে, যেন অজানার মাঝে কিছু একটা খুঁজে ফিরছে। নাদিয়াও আর কোনো প্রশ্ন তুলে নিস্তব্ধতা ভাঙল না; বরং জাহানারার পাশাপাশি সে-ও মৌন চোখে তাকিয়ে রইল দিগন্তের শেষ সীমানায়। সময়ের চাকা অলসভাবে ঘুরে চলল। এরই মাঝে হঠাৎ দেখা গেল, সেই স্বচ্ছ আকাশটা আবারও বিষণ্ণ কালো মেঘের অবগুণ্ঠনে ঢাকা পড়ছে। জাহানারা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ত্যাগ করে বলে উঠলো ,
–“অতঃপর আপন মানুষগুলোও ভীষণ রকম অপরিচিত ছিল।”

গতকাল সারারাত লোকটা বাসায় ছিল না। তবে গতকাল নয় বেশির ভাগ সময়ই রাতে বাসায় থাকে না। আজ সকাল থেকে বাসাতেই ছিল।তাকে আর বলে উঠা হয়নি আমার জন্য শপিং করে নিয়ে আসতে। এভাবে আর কদিন তার কাপড় পড়ে থাকা যাবে। তাই বাধ্য হয়ে আবার তার সামনে গিয়ে দাড়ালাম।
–“কোথাও যাচ্ছেন?”
ড্রেসিং টেবিল এর সামনে দাঁড়িয়ে চুল সেট করছিল।আমার গলা শুনে দরজার পানে তাকালো। আমাকে এক পলক দেখে আবার নিজের কাজে মন দিলো। অতঃপর ভাবলেশহীন উত্তর করল,
–“কখনো তুই তুকানি কর, আবার কখনো আদর্শ বউদের মতো আচরণ কর। আসল মতলবটা কি ম্যাডাম।”
–“আপনি কি অন্ধ? আসার পর থেকে কেউ কোনো শপিং করে দিলো না। আপনার কাপড় পড়ে আর কতদিন ঘুরবো।”

ইফান নিজেকে পরিপাটি করে গুছিয়ে নিয়ে আমার সান্নিধ্যে এসে দাঁড়াল। তার একটি ভ্রু কিঞ্চিৎ উঁচিয়ে সে আমায় খুব খুঁটিয়ে পরখ করতে লাগল। আমার উচ্চতা নেহাৎ কম নয়, তবুও তার বলিষ্ঠ অবয়বের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে বড্ড ক্ষুদ্র আর নগণ্য মনে হয়। তার ধূসর বাদামী চোখের সেই গভীর ও স্থির দৃষ্টির সামনে আমি ক্রমশ এক অদ্ভুত অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যাচ্ছি। তবুও নিজেকে বাইরে থেকে স্বাভাবিক রেখে গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম,
–“আমি কিছু বলছি।”
আমার বাক্যটা কানে যেতেই ইফান চোখে চোখ রাখলো।অধর কোণে সেই চিরচেনা ক্রুর হাসিটা রেখেই বললো,
–“আমার হাফ প্যান্ট আর গেঞ্জি টা ঠিকঠাকই লেগেছে। আর শপিং দিয়ে কি করবে ঝাঁঝওয়ালি? আমার এরকম অনেক ইউজ করা কাপড়ই আছে।দেখতে একদমই নতুন। তুমি এগুলো পরো আর পরতে ইচ্ছে না করলে পড়ো না। ঘরে আমার সামনে কাপড় পড়তে কে বলেছে। তোমাকে তো লেং”টুস দেখতেই হেব্বি লাগে।”

–“তু…”
বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই আমার ঠোঁটে এক আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে দিলো। তারপর কানের কাছে হাস্কি স্বরে বললো,
–“এত ল’জ্জা লাগলে আমাকে বলো। আমিও না হয় তোমাকে কোম্পানি দিবো। আর তুমিই তো বলেছ নেকেড’ই আমাকে বেশি সুন্দর লাগে।”
আমি চোখ গরম করে দাঁতে দাঁত চেপে তার দিকে তাকালাম। সে পৈশাচিক হেসে আমার ঠোঁটের কোণে আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে আবার বলে উঠলো ,
–“অনেক হট গার্লসই বলেছিল। বাট বিশ্বাস হয়নি।তোমার কথায় আজ বিশ্বাস হলো।”
–“নিজের বেলায় নেকেড আমার বেলায় লেং”টা শা’লা খা’ইস্টা। তুই ভালো ব্যবহারের যোগ্যই না।”
তীব্র রাগে ইফানকে একটা ধাক্কা দিয়ে গদগদ পায়ে আমি ওয়াশরুমে সেঁধিয়ে গেলাম। আমার সেই ক্রুদ্ধ প্রস্থান দেখে সে একগাল হাসতে হাসতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

–“দেখলে তো, সবকিছু কিভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমি আগেই বলেছিলাম সময় থাকতে থাকতে আমার বেটার সাথে তোমার মেয়ের বিয়েটা দিয়ে দেওয়ার কথা। তখন সময় না নিলে এখন তোমার মেয়ে আমার পুত্র বধু হতো।”
নাবিলা চৌধুরী ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। উনার কথার পর, ফোনের ওপাশের ব্যক্তি কিছু একটা বললো। তারপর নাবিলা চৌধুরী আবার বলতে শুরু করলো,
–“একদম ঠিক বলেছ। হাতের বাইরে সবকিছু চলে যাওয়ার আগে আমাদেরকেই কিছু করতে হবে।তোমাদের অপেক্ষায় রইলাম।”

জাহানারা পর্ব ১১

ফোনের ওপ্রান্তের কথোপকথন শেষ করে নাবিলা চৌধুরী কিছুটা আয়েশ করে সিঙ্গেল সোফাটায় গা এলিয়ে দিলেন। তার চোখেমুখে এক দীপ্তি আর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল পরম তৃপ্তির হাসি। সোফার পিঠে মাথাটা হেলিয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন তিনি। তারপর অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করে বলে উঠলো,
–“যত উড়ার উড়ে নাও জাহানারা শেখ। এখন থেকে তোমার করুণ গল্পটা আমি লেখবো। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ।”

জাহানারা পর্ব ১৩