জাহানারা পর্ব ৫৩
জান্নাত মুন
আমার একনাগাড়ে বলা বাক্যগুলো শেষ হতেই তন্নির চোখ দিয়ে টপটপ করে কয়েক ফোটা নোনাজল গড়িয়ে পড়লো।আমি আগের ন্যায় মাথায় হাত ধরে, মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছি।তন্নি ফুপিয়ে উঠলো।কারো ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ আমার কর্ণধার হতেই মাথা হালকা বাকিয়ে তন্নির দিকে তাকালাম। মেয়েটা বাচ্চাদের মতো নাক টানছে। চোখ দু’টো ভেজা।আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে সোজা হয়ে বসলাম।তন্নিকে কিছু বলবো তার আগেই আমাকে দু’হাত দিয়ে ঝাপটে ধরে আরও কাঁদতে লাগল।আমি বিস্মিত হলাম।সবাই আমাদের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে। সরাসরি তাকানোর সাহসও পাচ্ছে না।আমিও তন্নিকে জড়িয়ে ধরে এক হাতে তার মাথয় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদু হেসে বললাম,
–“এই বোকা এভাবে কাঁদছিস কেন?”
–“তোর আজও খুব কষ্ট লাগে তাই-নারে জাহান?”
–“কিছু কিছু কষ্ট যদি কাউকে আজীবন সরণ করিয়ে রাখে, একাকীত্বের সঙ্গী হয়__তাহলে সেই কষ্টগুলো বয়ে যাওয়া মন্দ নয়।”
আমি উদাস ভঙ্গিতে প্রতিত্তোর করলাম।তন্নি আমার দিকে তাকিয়ে নাক টানতে টানতে বললো,”এত কষ্ট যন্ত্রণা কিভাবে চেপে রাখিস নিজের মধ্যে ? তোর এই মায়াবী চেহারা দেখলেই তো আমার বুকটা ফেটে যায়।না জানি তোর ভেতরের অবস্থা কেমন!!”
–“বাদ দে এসব কথা।আমার ভালো লাগছে না।শিঙারাগুলো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে খেয়ে নে।”
আমি তপ্ত শ্বাস ছাড়লাম। তন্নি আমার বিষয়টা বুঝতে পেরে চোখমুখ মুছে নিলো।অতঃপর নিজেকে সামলে এটা-ওটা বলে টপিক পালটালো।তন্নি খাচ্ছে আর আমাকে হাসানোর জন্য বিভিন্ন কথা বলছে।আমাকে খেতে না দেখে মুখের খাবারটুকু গিলে বললো,
–“কিরে খাচ্ছিস না কেন?খাবারগুলো তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।আর এসেছিস থেকে একবারো মুখের মাস্ক খুলছিস না কেন হুম? নাকি নতুন বউয়ের মতো শরম করতাছে তর।”
–“শরম আবার কি ধরনের জিনিস?”
–“হইছে ভাব রেখে এবার খাও।নিশ্চয়ই খিদে লাগছে।”
আমি ফোনে মনযোগ রেখেই বললাম,”সে তো একটু লাগছেই।”
–“তাহলে খাচ্ছিস না কেন?”
আমি ফোনটা টেবিলে রেখে আসেপাশে তাকিয়ে দেখলাম, না কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে নেই। সবাই নিজেদের মতো আড্ডা দিচ্ছে।আমি মাস্ক খুলে নিলাম।মুখ ঘেমে একাকার। শাড়ির আচল দিয়ে সারা মুখ মুছে নিলাম।অতঃপর সমুচায় সস লাগিয়ে কামুড় দিয়ে মনযোগ সহকারে খেতে লাগলাম।
তন্নি আমার দিকে তাকাতেই লক্ষ করলো গালে একটা দাগ।কিভাবে ব্যথা পেলাম দেখতে আরেকটু কাছে আসলো।তন্নি কোনো কিছু না ভেবেই বলে উঠলো,
–“এই সেরি তোর গালে কে কামুড় মারছে।”
তন্নির এমন প্রশ্নে আমি মুখের খাবার চিবানো থামিয়ে, চোখ ছোট করে বিষ্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। তন্নির বিষয়টা বোধগম্য হতেই আমার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে শুকনো কাশতে লাগলো।তন্নির রিয়াকশন দেখে হাসি পেল।আমি ঠোঁট কামড়ে হেসে খাওয়ায় মনযোগ দিলাম।খেতে খেতে বললাম,
–“দাগটা কি বেশি ভাসে?”
তন্নি আড় চোখে তাকিয়ে বললো,”এত না। তবে কাছ থেকে বুঝা যায় কিছুটা।”
–“সকালে স্পষ্ট ছিলো।এখন মনে হয় মিলিয়ে গেছে অনেকটা।”
আমাদের কথার মাঝে হঠাৎই আমার ফোনটা বেজে উঠলো।আমি শিঙারায় কামুড় দিতে দিতে টেবিলে রাখা ফোনটার দিকে তাকালাম। স্কিনে ভাসছে “চো*দনবাজ ” নামক সেইভ করা নাম্বারটা।
আমার ফোনের দিকে তন্নি তাকাতেই আরেক দফা বিষম খেলো।কাশতে কাশতে বলে উঠলো, “আস্তাগফিরুল্লা ভাই।তুই কার নাম এটা সেইভ করে রাখছস!!”
–“কি জানি!”
আমি চোখ উল্টে জবাব দিয়ে আবার খাওয়ায় মনযোগ দিলাম।ফোন বেজে কেটে গেলো।মূহুর্তেই আবার কল আসলো।আমি বেশ বিরক্ত হলাম।টিস্যু দিয়ে হাতটা মুচে ফোন রিসিভ করে কানে ধরলাম। অপর প্রান্ত থেকে কিছু বলার আগেই আমি বলে উঠলাম,
–“দেখতে পারছ কল ধরছি না।তাহলে বারবার কল দিয়ে বিরক্ত করার মানে কি?”
–“কোথায় তুমি?গার্ডদের মানা করেছ মেনে নিয়েছি।বাট ইনানকেও না করে দেওয়ার কারণ কি?
ইফান শক্ত কন্ঠে বললো।আমি আইসক্রিম খেতে খেতে উত্তর করলাম,”ওরা কেউ যাতে না আসে।আমার ভালো লাগে না সবসময় আমার পিছে পিছে মানুষের খবরদারি করা।”
ইফান নরম কন্ঠে শুধালো, “কোথায় তুমি?”
–“টিএসসিতে।”
–“কি করছ?”
ইফানের কথা শুনে দাঁতে দাঁত পিষে বললাম,”তুমি ভালো করেই জান আমি কি করছি কোথায় আছি।নিশ্চয়ই বসে বসে আমাকেই দেখছ।তাহলে আমাকে জিগ্যেস করছ কেন?”
ইফানের চাপা হাসির আওয়াজ শুনতে পেলাম।ইফান হাস্কি স্বরে বললো,”মিস ইউ বেইবি।”
–“আমি ফোন রাখছি।অসহ্য….”
আমি কল কেটে ফোনটা টেবিলে রেখে দিলাম।তন্নি আইসক্রিম খেতে খেতে আমার দিকে তাকিয়ে,,,
–“কেন ফোন দিয়েছিলোরে?”
–“তার মনে তো রঙের শেষ নাই।ধুর সব কিছুতেই বিরক্ত লাগছে।”
–“তোর তো সবসময়ই বিরক্ত লাগে।আইসক্রিম টা খেয়ে মাথা ঠান্ডা কর।”
আমি বেজার মুখ করে আইসক্রিম খাচ্ছি।হঠাৎই নজরে পড়ে আমাদের থেকে কিছুটা দূরে সুমাইয়া নাফিয়া দাঁড়িয়ে। কাঁদতে কাঁদতে ওদের চোখ ফুলে গেছে। আমার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে। ওদেরকে দেখা মাত্রই মাথা গরম হয়ে উঠলো।আমি দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাগে ফুঁসছি।তন্নির নজরেও পড়লো ওদেরকে।তন্নি ওদেরকে দেখে আড় চোখে আমার দিকে তাকাতেই আমি বলে উঠলাম,
–“আমাকে বাসায় যেতে হবে।”
–“কিন্তু তু….”
তন্নিকে বাকি কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম।তন্নি হতাশ হয়ে সেও উঠে দাঁড়াল। আমি কাঁধে ব্যাগটা তুলে সামনে হাঁটা ধরতেই সুমাইয়া নাফিয়া ঝড়ের বেগে এসে আমাকে ঝাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো।আমি বিরক্ত হচ্ছি ওদেরকে দেখে।একদমই সহ্য হচ্ছে না ওদের। বরং ওদের কান্না দেখে আমার মাথার রগগুলো কিলবিল করে উঠছে।আমি ওদের ঠেলে সরিয়ে চলে যেতে চাইলাম।সুমাইয়া পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।নাফিয়া আমার পা জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে লাগলো।সুমাইয়া হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো,
–“জাহান বিশ্বাস কর তর জামাইয়ের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নাই। বিশ্বাস কর,,,”
সুমাইয়াকে চিৎকার করে থামিয়ে দিলাম,”কোনো সম্পর্ক নেই না!কোনো সম্পর্ক নেই!!ইফান সেদিন মিথ্যা বলেছে এটা বলতে চাইছিস।”
আমি সুমাইয়াকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলাম।চোখেমুখে ওদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে বলে উঠলাম,”লজ্জা করলো না একবার,বেস্ট ফ্রেন্ডের বরের সাথে শুতে।একটুও করলো না।ছিহ্!!ঘৃণা হচ্ছে তোদের দেখে।বেইমান কোথাকার! জানতি না আঘাত পেতে পেতে আমার ভেতরটা পচে গেছে।তবুও কেন আঘাত করলি।আমাকে কষ্ট পেতে দেখলে তোদের মহা আনন্দ লাগে তাই না।তোদের মুখও দেখতে চাই না আমি।ছিহ্!!”
আমি আবার চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নাফিয়া আরও শক্ত করে ধরে ফুপিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলতে লাগলো,”তুই এইসব কি বলছিস।আমরা ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছি।তুই আমাদের এতটা নিচু খারাপ কিভাবে ভাবতে পারছিস।বিশ্বাস কর তোর বরের সাথে আমাদের কিছু নেই। এমনকি আমাদের কখনো সরাসরি দেখাও হয়নি।সেই দিনই সরাসরি দেখা হয়েছে।”
নাফিয়ার কথা শুনে এক মূহুর্তের জন্য শান্ত হলাম।সুমাইয়া আমার হাতে ধরে কান্নারত কন্ঠে বলল,”নাফিয়া সত্যি বলছে জাহান। আমাদের কখনো সরাসরি দেখা হয় নি।আমাদের তো,,,,”
–“তোদের কি?”
আমি সুমাইয়ার মুখের কথা কেড়ে নিলাম।নাফিয়া আমার পা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। চোখ মুছতে মুছতে বললো,”তুই একটু শান্ত হ। আমরা সব সত্যি তোকে খুলে বলছি।”
জুইদের কলেজ ছুটি দিয়েছে সবে।আজও কলেজে ইতি এসেছে।চার বান্ধবী কলেজের গেইটের সামনে এসে থামলো।ইতির পিছনে তিন জন বডিগার্ড দাঁড়িয়ে। জুই ইতিকে হাত নাড়িয়ে টাটা দিয়ে বললো,”আগামীকাল দেখা হবে কলেজে।”
সোমা আর মিনাও বাই বললো।ইতিও বাই বলে চলে যেতে নিলেই হঠাৎই থেমে গেলো।সে তাড়াতাড়ি ফোন বের করে জুইকে বললো,”জুই এই পিকটা দেখ তো।”
জুই দেখে বললো,”আরে এটা তো জিতু ভাইয়া আর তার সিআইডি টিমের গ্রুপ ফটো।তুমি এটা কোথায় পেলে।”
ইতি জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটে ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বললো,”ঐ যে ফেবুতে সামনে এসেছিলো আরকি।আচ্ছা আগে এটা বল এখানের সবাইকে তুমি চেন?”
জুই ঝটপট উত্তর করলো,”হুম চিনি তো।কেন কি হয়েছে?”
–“না মানে এরা কারা? না মানে আমি তো চিনি না তাই আরকি।”
–“ও আচ্ছা।… ”
জুই সবার পরিচয় দিলো।আবার কে কেমন মিশুক সেটাও বললো।ইতিকে সোমা আর মিনাও তাদের সম্পর্কে বললো।তারাও সব সিআইডি অফিসারদের কে দেখেছে। আবার কথাও বলেছে।ইতি আরেকটা ছবি সবার সামনে ধরলো।অতঃপর বললো,”এই পিকে মাস্ক পড়া এটা কে গো?”
জুই সহ সবাই পিকটা ভালো করে দেখলো।সোমা মিনা চিনতে পারলো না।জুই একটু ভেবে বললো,”উমম আমি ফেইস দেখলে বলতে পারতাম এটা কে।আসলে সিআইডি টিমে নতুন পুরাতন অনেকেই কাজ করে।আবার অনেক পুরাতন অফিসার যারা ছিলো তারা অনেকে অন্য কোথাও ট্রান্সফার হয়ে গেছে। হয় তো তাদের মধ্যে কেউ হবে।”
–“ওও আচ্ছা। আজ আসি কেমন।কাল কলেজে আবার দেখা হবে।টাটা সবাইকে।”
ইতি সবার থেকে বিদায় নিয়ে গড়িতে উঠে চলে গেলো।জুই, সোমা আর মিনা বাজারের দিকে যেতে লাগলো।জিতু ভাইয়া মাছমাংস সব কিনে দিয়ে গেছে। কিন্তু ওদের তিনজনই শাকসবজি বেশি পছন্দ করে।তাই মাঝেমধ্যেই বাজারে গিয়ে টাটকা টাটকা সবজি কিনে আনে।
জুইরা কাচামলে এসে দেখে সবই টাটকা টাটকা শাকসবজি। যা দেখছে তাই কিনে নিতে মন চাইছে।শীতকাল তাই ভালো সবজি উঠেছে।সোমা জুইকে বললো,”আরে ভাই আমার তো সবই কিনে নিতে মন চাইতেছে।”
মিনাও সুর মিলালো।তারা বেচে বেচে এক কিলো লাল টুকটুকে টমেটো, এক কিলো ছোট আলু,এক কিলো গাজর,এক কিলো শশা,হাফ কিলো জলপাই আরও কিছু শাকসবজি কিনে নিলো।
তিনজনের হাতেই বাজারের ব্যাগ।হঠাৎই সোমা বললো,”এই জুই তাজা বেগুন নিছি।এটার সাথে নোনা ইলিশ দিয়ে রান্না করলে সেই লাগবো ভাই।”
তিন বান্ধবী ঢোক গিললো।অতঃপর জুইয়ের কাছে সব বাজারের ব্যাগ দিয়ে ওরা দুজন মাছ মলে চলে গেল।সেখানে যদিও নোনা ইলিশ কিনতে গেছে। কিন্তু ওরা যা মানুষ টাকা বাঁচলে আরও কয়েক ধরনের মাছ, শুটকি কিনে নিয়ে আসবে।
জুই বাজারের ব্যাগ গুলো নিয়ে বাজারের এক কোণায় চেনা একটা সবজি কাকুর দোকানে দাঁড়িয়ে আছে।এই লোকটার থেকেই সবসময় পেঁয়াজ রসুন কিনে থাকে জুইরা।জিতু ভাই-ই মূলত দোকানদারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।দোকানের সামনে প্রচুর মানুষ চলাচল করছে।এতে জুইকে বারবার নড়েচড়ে দাঁড়াতে হচ্ছে। দোকানদার কাকু বললো,”ও মায়া তুমি ঐখানটায় খাঁড়াও।এনে মানুষের ঠেলাঠেলিতে পইড়া যাইবে।”
জুই বাজারের ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে বললো,”আচ্ছা কাকু।”
জুই কয়েক কদম এগোতেই ভীড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন আচমকা ছুটে এসে স্ব-জোরে মেয়েটাকে ধাক্কা মারে।আচমকা ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে জুই হাতের ব্যাগগুলো নিয়ে পড়ে গেলো।শুধু জুই-ই নয়।জুইয়ের উপর আগুন্তকও পড়ে গেলো।জুই ভুবন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলো।আশেপাশে জনগণ মূহুর্তেই ঝটপট জুইয়ের উপর থেকে লোকটাকে তুললো।জুই মাটিতে পড়া থেকে উঠে বসে উপরের দিকে তাকাতে তাকাতে চেঁচিয়ে উঠলো,
–“এএএ কোন হতচ্ছাড়া ধুন্দারে?”
জুই যখনই উপরে দিকে তাকালো তখনই দেখলো তার উপর ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ব্যক্তিকে। জুইয়ের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো মূহুর্তেই।জুই পুনরায় চেচিয়ে উঠলো,
–“আবার আপনিইই!!”
টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া……।।
একটা টেবিলে আমরা চারজন বসে আছি।আমার পাশে তন্নি বসে।আর সামনে মাথা নিচু করে বসে আছে সুমাইয়া আর নাফিয়া।আমি চোখমুখ শক্ত করে ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে। সুমাইয়া নাফিয়া হালকা মাথা তুলে আমার দিকে তাকাতেই দেখলো আমার ক্ষিপ্ত দৃষ্টি। আবার ওরা মাথা নিচু করে নিলো।আমি ফোনে টাইম দেখলাম প্রায় চারটা বাজে।আমি ওদের উদ্দেশ্য বললাম,
–“তোদের যা বলার তাড়াতাড়ি বল।আমার কাছে এত ফাউল টাইম নেই।”
আমার ভয়ে সুমাইয়ার শরীর কাঁপছে। নাফিয়ার হাতও কিছুটা কাঁপছে। সে একটা শুকনো ঢুক গিললো।এতেই তার বেশ পরিশ্রম হলো।আমি তন্নিকে ইশারা করলাম দু গ্লাস পানি দিতে।তন্নি এগিয়ে দিলো। দু’জনই এক চুমুকে সবটা পানি শেষ করে দিলো।নাফিয়া চোখ বন্ধ করে বলার জন্য প্রস্তুতি নিলো।অতঃপর আমার দিকে হালকা তাকিয়ে বললো,
–“আমি আজ তোকে সব কথা বলবো।পুরো তিন বছরের কথা।আগে বল তুই আমাদেরকে বকবি না।”
আমি এক ব্রু উঁচিয়ে বললাম,”বলা শুরু কর।”
সুমাইয়া টেবিলের নিচ দিয়ে নাফিয়ার উরুর উপর হাত রাখলো।বুঝালো, আজ সব বলে দে।নাফিয়া দীর্ঘ শ্বাস টেনে বলতে লাগলো,
–“ইফান চৌধুরীকে আমি চিনতাম না।ইফান চৌধুরীকে যখন চিনি, তখন সময়টা আমাদের ভালোও যাচ্ছিল না।যতটুকু মনে আছে জায়ান ভাইয়ের মৃত্যুর দু বছর পেরিয়েছে সবে।তুই তখনও জায়ান ভাইয়ের শোক কাটিয়ে উঠতে পারিস নি।আমরা সবাই এক সাথে ভার্সিটি ঠিকই ভর্তি হয়েছি।তবে তুই এতটা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলি যে আমরাও বাকি বন্ধু বান্ধবদের সাথে তেমন একটা যোগাযোগ করতাম না।তুই নেই, আরিফও পড়ালেখার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়। বলতে গেলে আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলটাই ভেঙে যায়।ঠিক সেই সময়ে আমরা সবাই নিজেদেরকে ফোনের মধ্যে ডুবিয়ে দেই।
সময়টা ছিলো রাত বারোটা কি সারে বারোটা। আমি ফেইসবুকে রিলস দেখছিলাম।সাথে ফেইসবুকের কিছু ফ্রেন্ড হয়।তাদের সাথে টুকটাক কথা হতো।হঠাৎ একটা অচেনা আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট আসে।আইডির নাম ছিলো ইফান চৌধুরী। প্রোফাইল পিক দেখে আমি ক্রাশ খাই।পিক দেখে ভাবলাম ছেলেটা স্মার্ট ফ্রেন্ড হলে মন্দ হয় না।আমার বেশ পছন্দ হয় লোকটাকে।তাই এক্সেপ্ট করে ফেলি।তারপর থেকে আমার মনটা উসখুস করছিলো লোকটার সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু মেয়ে হয়ে কিভাবে নক দিব।তাই আর দেওয়া হয় নি।কিন্তু উদ্ভূত বিষয় রাত একটার দিকে লোকটা আমাকে ইনবক্সে হাই দেয়। আমি তো খুশিতে আত্মহারা। বেশ কিছুদিন টুকটাক কথা হয়।মানে লোকটার সাথে প্রতিদিন মাঝ রাতের দিকে কথা হতো।আমি লোকটার প্রেমে পড়ে যায়।যদিও লোকটা কখনো আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয় নি।আমিই মনে করতাম লোকটা আমাকে পছন্দ করে।তাই আমি ইনিয়েবিনিয়ে প্রেমালাপ জমাতাম। অদ্ভুত বিষয় ছিলো লোকটা আমার সাথে একটা নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত কথা বলতো।বেশ কয়েকমাস চলে এমন।তারমধ্যে আমরা ভার্সিটিতে রেগুলার ক্লাস শুরু করি।তুইও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছিস অনেকটা।আবার আমাদের বন্ধুত্ব স্ট্রং হয়।
প্রতিদিন দেখা হয়, আড্ডা হয়,কথা হয়।আর এই সারাদিনে কি কি করতাম সব ইফান চৌধুরীকে রাতে বলতাম।আমি তখন ইফান কে ভালোবাসি। তার প্রেমে ডুবে ছিলাম। তোদেরকেও বলেছিলাম, আমি একজনকে ভালোবাসি।
একদিন লাজ লজ্জা ভুলে ইফানকে আই লাভ ইউ বলে ফেলি।ইফান প্রচুর হাসে আমার কথা শুনে। অতঃপর আরও কদিন চলে গেলো।ইফান খালি তোর সম্পর্কে কথা তুলে।আমি মন খারাপ করতাম, কেন খালি আমার বান্ধবী নিয়ে কথা হয় আমাদের মাঝে। কেন সে আমার সাথে প্রেমালাপ করে না।আমি একদিন সরাসরি মনের কথা উগরে দেই।বলি তোদেরকে নিয়ে বলতে ভালো লাগে না।এটা শুনে ইফান আমাকে কল দেয়।রাত তখন দুইটা। এদিনই প্রথম ইফান আমার সাথে নিদিষ্ট সময়ের বাইরে গিয়ে কথা কন্টিনিউ করে।ইফান আর আমার কথা কাটাকাটি হয়।আমি ইফানকে সব জায়গায় ব্লক করে দেই।তারপর কদিন সব ঠিক থাকে।আমিও ভুলে যাই সব।
কয়েকমাস পর সুমাইয়া আমাদের বাসায় আসে।কাঁদতে কাঁদতে বলে ও ফেঁসে গেছে। সুমাইয়া আমাকে সবকিছু খুলে বলে।ইফান চৌধুরী যেভাবে আমার সাথে কথা বলতো সেভাবেই সুমাইয়ার সাথে কথা বলে।সুমাইয়াও প্রেমে পড়ে।বেশ কিছু মাস পর সুমাইয়াও আমার মতো বিরক্ত হতে থাকে।কেন খালি তোর সম্পর্কে জানতে চায়।তুই আজ কি মন খারাপ করে আছিস?তোর কি খেতে ইচ্ছে করে?কোথাও ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করে নাকি।তোর কিছু ইচ্ছে করলে সেটা সুমাইয়াকে করতে বলতো।একদমই আমার মতো ঘটনা।
সুমাইয়া যখন ইফান চৌধুরী কে ব্লক করে তখন হুমকি দেয় সুমাইয়ার ক্ষতি করবে।এরপর আমাকেও আবার ফোন করে হুমকি দেয় আমাদের সহ তোদেরও ক্ষতি করবে।আমরা একবার ভেবেছি জিতু ভাইয়াকে সব খুলে বলবো।কিন্তু সেদিন রাতেই সুমাইয়া আর আমার ফোনে কয়েকটি পিক পাঠায়।যেখানে ইফান চৌধুরী খালি গায়ে সোফায় বসে আছে।আর তার কোলে তুই লেপ্টে ঘুমচ্ছিস।পিকটা সাধারণ চোখে খারাপ দেখায়।তোর পড়নে ছিল আমাদের স্কুল ড্রেস। বেশ এলোমেলো লাগছিলো তোকে।আমরা যখন আকাশ কুসুম ভাবনায় নিমজ্জিত তখনই ইফানের মেসেজ আসে,আমার একমাত্র আদরের বউ।তোরা থাকতেও যদি আমার জানটা কষ্টে থাকে,তাহলে তোদের রেখে কি লাভ।
আমরা অবাক হয় ইফান চৌধুরীর কথায়।আমরা সিদ্ধান্ত নেই তোকে আর জিতু ভাইয়াকে সব জানিয়ে দিব।কিন্তু তার আগেই আমার ছোট ভাইকে মাদরাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়।সবাই পাগলের মতো তাকে খুঁজতে থাকে।ইফান আমাকে ছবি পাঠায়। আমার ভাই দোকানে আইসক্রিম খাচ্ছে দুটো লোকের সাথে। পিছন থেকে আরেকজন রিভলবার ধরে আছে তার মাথায়।বিশ্বাস কর জারা এখানেই থেমে থাকে নি।সুমাইয়ার বাবারও এক্সিডেন্ট করায় ছোটখাটো। হুমকি দিয়ে বলে পরের বার উপরওয়ালার কাছে পাঠিয়ে দিবে।
আমরা হার মানি ইফানের কাছে।প্রতিদিন তোর প্রতিটি মূহুর্তের খবর ইফানকে আমরা দিতাম।তোর মুড অফ থাকলে জানাতাম। ইফান কোনো না কোনো ভাবে আমাদের দিয়ে তোর মুখে হাসি ফুটাতো।তুই একদিন ফুচকা খেতে চেয়েছিলি বলে, ইফান পুরো ফুচকাওয়ালা কেই কিনে নেয়।তুই ভাবতি আমি কিংবা সুমাইয়া টাকা দেই।আসলে আমরা তো ফ্রী খেতাম।কারণ মাসে ফুচকাওয়ালা কে এডভান্স মোটা অংকের টাকা দিতো।তোর ছোট বড় সব ইচ্ছে আড়াল থেকে পূরণ করতো।
এক সময় আমি আর সুমাইয়া লক্ষ করলাম ইফান চৌধুরী না আমাদের আর না তোর কোনো ক্ষতি করছে।তাই সব কিছু স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিই।শুধু একটাই আতংক ছিলো তুই কখনো জানলে আমাদের কি করবি!ভয় লাগতো আমাদের এত বছরের বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার।
তন্নির কথাগুলো শুনে আমার রাগের পরিমাণ আরও বাড়লো।আমি নিজেকে সামলাতে হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ করে নিলাম।মানে এতগুলো বছর ধরে আমার আড়ালে এসব হতো।বিয়ের আগে আমার কাছে প্রায় সময়ই এটা-ওটা পার্সেল আসতো।আমি ভাবতাম কখনো ফ্রেন্ডরা দিয়েছে।তো কখনো ভাইয়া দিয়েছে।আমি চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে শক্ত কন্ঠে বললাম,
–“সেই দিনেও কি খবর তোরাই দিয়েছিলি?”
আমার কথা শুনে নুইয়ে রাখা মাথা আরও নুইয়ে নিলো দু’জন। আমি আচমকা টেবিলে থাপ্পড় বসিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম,”কি হলো উত্তর দিচ্ছিস না কেন?”
সুমাইয়া নাফিয়া চমকে উঠলো হঠাৎ এমন আচরণে।তন্নি আমাকে শান্ত থাকতে অনুরোধ করতে লাগলো।সুমাইয়া হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললো,”আমাদের ভুল বুঝিস না জাহান।আমরা কখনো কল্পনাও করি,,,,”
আমি ধমকে থামিয়ে বললাম,”তোদের জন্য, শুধু মাত্র তোদের ভুলের জন্য আমাকে একটা জানোয়ার ছিড়ে খেয়েছিলো সেদ…..”
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না।সেই রাতের ঘটনাটা মনে পড়লেই গা শিউরে ওঠে। আমি চোখমুখ খিচকে নিলাম।মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো আরও শক্ত হয়ে গেছে। সুমাইয়া নাফিয়া ওঠে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।কাঁদতে কাঁদতে বারবার ভুলের মাপ চাইতে লাগলো।আমি চোখ বন্ধ করেই আছি।কোনো কথা বলছি না।সুমাইয়া নাক টেনে বললো,”বিশ্বাস কর যারা আমরা ইফান চৌধুরীর সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝেছিলাম, তিনি তোকে নিয়ে অনেক সিরিয়াস। কখনো মনে হতো সত্যিই তুই লোকটার বউ।লোকটা তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
সেদিন তন্নি আসেনি।আমরা ভার্সিটিতে এসেছিলাম।ক্লাস শেষে আমরা লাইব্রেরিতে যায়।তুই উপন্যাস পড়ায় এতটাই মনযোগ দিয়েছিলি যে দিন দুনিয়ার প্রতি তোর কোনো খেয়াল নেই। সকালে আমরা ভার্সিটি আসি।আমি আর নাফি অনেক টায়ার্ড হয়ে যায়।লাইব্রেরিতে উপস্থিত সকলেও চলে যায়।তবুও তোর পড়া বন্ধ হচ্ছিলো না।আমরা তোকে কতবার বলেছি চল এবার বাসায় চলে যায়।আমরা বারবার এ কথা বলায় তুই রেগে বলেছিলি, “তোদের মন চাইলে চলে যা।”
আমরা উপায়ন্তর না পেয়ে ইফানকে মেসেজ দেই।ইফান যে দেশে আছে তা তোর থেকেই জানি।আমরা গ্রামে ছিলাম বলে মুক্তার বিয়েতে আসিনি।আর তুই-ই বলেছিলে ইফানের সাথে ঝামেলা হয়েছে। তো সেদিন ইফান বলে সে দেশে আছে।ভার্সিটির আসেপাশেই তার অবস্থান। আমরা চলে গেলেও সমস্যা নেই। সে সেইফলি তোকে বাসায় পৌঁছে দিবে।কিন্তু ইফান,,,”
–“চুপ আর বলতে হবে না কিছু। যা বুঝার বুঝে গেছি।”
আমি সুমাইয়াকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললাম।সুমাইয়া আর কিছু বলতে পারছে না।তাদের চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে কতটা অসহায় তারা।আমি হা করে দম ফেলে এক গ্লাস পানি খেলাম।ওরা দুইজন বারবার আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছে। আমি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে বললাম,”আমি ক্ষমা করার কে।আমার কারো প্রতি কোনো ক্ষোভ অভিমান নেই। আমার তো কপালটাই পোড়া।”
তন্নি আমার বাহু ধরে বললো,”জাহান এমন বলিস না প্লিজ। ভুলে যা সব।”
আমি মৃদু হাসলাম। সত্যিই কি সব ভুলা সম্ভব!আমি আর কিছু বললাম না।ওদের ক্ষমা করে দিলাম।নাফিয়া আমার হাত তার হাতের মুঠোয় নিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,”বিশ্বাস কর আমি আজও কিছুতেই হজম করতে পারি না,যে ইফান চৌধুরী তোর জন্য এতটা কেয়ারিং,তোর প্রতি উন্মাদ,সেই লোকটা ঐদিন এটা কি করলো তর সাথে!!আচ্ছা জাহান এমন না তো, ঐদিন তোর সাথে ইফান যা করলো তার পিছনে কোনো বড় কারণ আছে!!”
আমি চোখ সরু করে অস্পষ্ট আওড়ালাম,
–“কারণ? ”
মাহিন চোয়াল শক্ত করে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে।হাত দু’টো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলেছে।এই মূহুর্তে মাহিনের ইচ্ছে করছে কোমরে গুঁজে রাখা লোড করা রিভলবারের সবকটা বুলেট জুইয়ের মাথায় ভরে দিতে।জুই আর মাহিনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাবলিক। জুইয়ের বাজার করা সকল শাকসবজি রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।জুই আর রাস্তার পাবলিক মাহিনকে এখান থেকে যেতে দিচ্ছে না।জুই পুনরায় মাহিনকে বললো,
–“এই যে মিস্টার ভালোয় ভালোয় আমার বাজার গুলো তুলে দিন।আর নাহলে আজ সারাদিনও এখান থেকে যেতে পারবেন না।”
মাহিন রাগে রিরি করতে করতে বললো,”আর ইউ কিডিং উইথ মি!! আমি মাহিন চৌধুরী রাস্তায় বসে সবজি কুড়বো। লাইক সিরিয়াসলি!!
মাহিন কোমরে দু’হাত ধরে তাচ্ছিল্য করে হাসলো।জুই জেদি কন্ঠে বললো,”শুনুন মিস্টার, আপনি যে চৌধুরীই হন কেন আমার ক্ষতি করেছেন। এখন আমার সবজি গুলো তুলে দিবেন।”
মাহিন নিজের রাগ সামলাতে পারছে না।সে যথেষ্ট শান্ত মাথার খেলোয়াড়। কিন্তু জুইয়ের কথায় শান্ত হতে পারছে না।মাহিন তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো,”আপনার কত টাকা লাগবে আমি তার ডাবল দিয়ে দিচ্ছি।বাট আমার পথ ছাড়ুন।”
জুই চেঁচিয়ে উঠলো, “আপনি কি আমাকে রাস্তার ভিখারি পেয়েছেন।আপনারা দেখছেন অসভ্য লোকটা কিভাবে অপমান করছে।”
মাহিনের উপর রাস্তার পাবলিক ক্ষ্যাপে উঠলো।মাহিনের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসে এখানে আটকে গেছে। মাহিন আর কিছু ভাবলো না।চুপ করে বসে একটা একটা আলু,টমেটো সহ যে সবজিগুলো পড়ে গেছে সব তুলতে লাগলো।সোমা আর মিনা মাছের হাটঁ থেকে এসে দেখে একটা লোক সবজি কুড়চ্ছে।সামনে বুকে দু’হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে জুই।তারা অবাক হয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো।আশেপাশে মানুষ এই দৃশ্যটা গিলে খাচ্ছে। কেউ কেউ তো আবার ভিডিও করছে।
মাহিন ব্যাগে সব সবজি ঢুকিয়ে জুইয়ের দু’হাতে ধরিয়ে দিলো।রাগে মাহিনের মস্তিষ্ক ফেটে পড়ছে। একটা হাঁটু বয়সী মেয়ের কাছে রাস্তায় এভবে বেইজ্জতি হতে হলো তার মতো এত বড় বিজনেসম্যান অরুপে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় মাফিয়া গ্রুপের মাফিয়া বস ইফান চৌধুরীর ডান হাত হয়ে।আজ মাহিন খুব অসম্মানিত অনুভব করছে।রাস্তার পাবলিক আস্তে আস্তে নিজেদের কাজে চলে গেলো।জুই বিজয়ের হাসি হাসলো।মাহিন কড়া চোখে জুইয়ের দিকে তাকিয়ে শাসাচ্ছে।
–“কি হচ্ছে এখানে?”
হঠাৎ অন্য কারো পুরুষালি কন্ঠ কানে আসতেই জুই আর মাহিন উভয়ই পিছনে তাকালো।অফিসার আবির এগিয়ে এসে জুইয়ের পাশে দাঁড়াল। তারপর মাহিনকে সুক্ষ্ম নজরে পরুক করতে লাগলো।অফিসার আবিরকে দেখে জুইয়ের অ্যাটিটিউড বেড়ে গেলো।আবিরকে দেখে মাহিনের চিনতে অসুবিধা হলো না।আবিরের ক্ষেত্রেও তাই।তবুও কেউ কারো সাথে কথা বললো না।মাহিন নিজেকে আবিরের সামনে ইনোসেন্ট ফেস করে তুলে ধরলো।কয়েক মূহুর্ত আগেও যে সে রাগে ফেটে পড়ছিলো, এখন মনে হচ্ছে সব নর্মাল। অফিসার আবির জুইয়ের দিকে চেয়ে হেসে বললো,
–“কি হয়েছে এখানে?”
জুই আড় চোখে মাহিনের দিকে তাকিয়ে মুখ বাকিয়ে বললো,”কিছু হয়নি। এখান থেকে চলুন। বাইরের মানুষের সামনে এত কথা বলতে নেই।”
জুইয়ের কথায় আবির মুচকি হাসলো। অতঃপর জুইয়ের হাত থেকে বাজারের ব্যাগগুলো নিতে গেলে জুইয়ের হাতে টাচ লাগে।জুই একটু অস্বস্তি ফিল করলো।মাহিন সরু চোখে বিষয়টি খেয়াল করল।তার চোখের সামনে দিয়ে জুই আর আবির হেসে কথা বলতে বলতে চলে গেলো।মাহিন সেদিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্য করে হেসে বিরবির করলো,
–“চিপ গার্ল।”
মাহিনের ধ্যান ভাঙে ফোনের আওয়াজে।মাহিন কিছুক্ষণের জন্য ভুলেই গিয়েছিলো সে যে একটা কাজে এসেছে।পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখলো ভি ব্রো সেইভ করা নাম্বার থেকে কল এসেছে।মাহিন ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইফান বললো,
–“কিরে ধরতে পেরেছিস?”
মাহিন শুকনো কাশলো।কি বলবে সে, আজ তার দায়িত্ব ঠিক মতো করতে পারে নি।এটা মাহিনের জন্য লজ্জাজনক বিষয়।তখন মাহিন একজনকে তাড়া করেছিলো।মাঝখানে জুই আসায় পালিয়েছে উক্ত ব্যক্তি।মাহিন হালকা কেশে বললো,
–“ব্রো টেনশন করো না।শালা আমাদের হাত থেকে পালিয়ে যাবে কোথায়।”
মাহিন ফোন কল শেষ করতেই মাহিনের গার্ড এসে বললো,চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়েছে।মাহিন তাদের নিয়ে আবার তাড়াহুড়ো করে আরেকদিকে যেতে যেতে জুইকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করতে লাগলো।
সুমাইয়া আর নাফি আমাকে জোর করে শপিং মলে নিয়ে এসেছে।আমি যে তাদের ক্ষমা করেছি তার জন্য তারা আমাকে গিফট কিনে দিবে।আমি আসতে চাইনি।মেজাজ বিগড়ে ছিলো।কিন্তু ওদের পাশাপাশি তন্নিও আবদার করে বসলো।না চাইতেও পুলিশ প্লাজা শপিং মলে আসতে হয়েছে।আমি ওদের পিছুপিছু হাঁটছি। ওরা একটার পর একটা শো-রুম ঘুরছে।সবকিছুর এত দাম বলার বাইরে।
নাফি একটা শো-রুমে টেনে নিয়ে গেলো।বেশকিছু থ্রি পিস দেখছে।আজ চারজনের জন্য একরকম থ্রি পিস কিনবে।আমি নাফিকে বললাম,
–“তোরা কিন।আমার জন্য শুধু শুধু টাকা নষ্ট করার দরকার নেই।”
নাফি কাঁদু কাঁদু চেহারা করে বললো,”কেন বেইবি?এখনো রাগ করে আছিস।”
–“না।আমার শ্বশুর বাড়িতে বউদের শাড়ি ছাড়া অন্য কাপড় পড়া বারণ।এটা নাকি বংশের রীতি। আমি নিয়ম ভাঙলে দাদি কষ্ট পাবে।”
সুমাইয়া বললো,”তাহলে তোর জন্য শাড়ি পছন্দ কর।”
–“আরে লাগবে না।এমনিতেই আমার শাড়ির পাহাড় জমে গেছে। এত দিয়ে কি করব।প্রতিদিন একটা একটা করে পড়লেও সবগুলো পড়ে শেষ করতে পারব না।তার উপর “ও” বাড়িতে।আরও স্তুপ জমবে।আমার লাগবে না।তোরা তোদের জন্য কিছু নিয়ে নে।”
আমার কথায় নাফি আহ্লাদি করে বলে উঠলো, “সে যা মন চায় তা দিক।আজ আমরা তোকে গিফট দিবো।”
ওদের কথায় আর কিছু বলতে পারলাম না।ওরা আমার জন্য শাড়ি দেখতে ব্যস্ত।হঠাৎই নজর পড়ে বাইরে আলাল দুলাল দাঁড়িয়ে। আমার চোখে পড়তেই দাঁত বের করে হেসে দিলো।আমি চোয়াল শক্ত করতেই, মাথায় হাত ঠেকিয়ে সালাম দিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেলো।আমি ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লাম।
শাড়ি দেখতে দেখতে আমার একটা রানী গোলাপি রঙের শাড়ি বেশ ভালো লাগলো।আমি শাড়িটা হাতে নিয়ে দেখতে ব্যস্ত।নাফিয়া’রা বললো এটা আমাকে খুব সুন্দর মানাবে। কিন্তু হঠাৎ করেই আরেকজন এসে আমার হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে নিজে ট্রায়াল দিয়ে দেখতে লাগলো।
নাফিয়া ফোঁস করে উঠলো মেয়েটার প্রতি।বাকি তিনজন মেয়েটার সাথে কথা কাটাকাটি করছে।আমি ওদের থামাতে পারছি না।মেয়েটা জেদ ধরে বললো শাড়িটা তার পছন্দ হয়েছে।আমি কিছু আর বললাম না।ঝামেলায় জড়াতে ইচ্ছে করছে না।কিন্তু নাফিরা শুনছে না।
জাহানারা পর্ব ৫২
মেয়েটা জেদ ধরে দামের চেয়েও বেশি দাম দিয়ে কিনে নেয়।নাফিয়ারা স্টাফদের সাথে ঝগড়া শুরু করে দিলো,কেন তাদের কাছে বিক্রি করে নি।এদিকে বিক্রেতারা বলছে তাদের দাম বেশি দিয়েছে তাই বিক্রি করেছে।
ওদের এসব ঝামেলা অসহ্য লাগছে।তাই বিরক্তিতে ওদের ঝগড়া করতে দিয়ে আমি বাইরে বেড়িয়ে আসলাম।
আরেকটা শো-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে একটা লোক।সারা শরীর ঢাকা।লোকটা আসেপাশে চোরের মতো দেখে মুখের মাস্কটি খুললো।অতঃপর বোতল থেকে ঢুকঢুক করে পানি ক্ষেতে লাগলো।আমি বাইরে বেরিয়ে এসে আসেপাশে একবার তাকাতেই বেখেয়ালি লোকটার উপর নজর পড়লো।আমার নিজের চোখে বিশ্বাস হচ্ছে না আমি যাকে দেখছি তা কি ঠিক দেখছি!!
