Home ডাক্টার ইশতিহার ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১১

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১১

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১১
অনামিকা আহমেদ

” ওহ আপনার চিন্তা শুধুমাত্র আপনার সন্তান কে ঘিরে? আমার জন্য কি বিন্দুমাত্র চিন্তা হয় না আপনার? একবার আমার দিকে মায়াভরে তাকিয়েছেন? ব্য*থা তো আমিও পেয়েছি, মারা তো আমিও যেতে পারতাম। আপনি আসলে অনেক স্বার্থ*পর, নিজের উত্তরাধিকারীর জন্য আমাকে ব্যবহার করছেন। আপনি আসলে আমাকে ভালবাসেন না, সব লোক দেখানো।”
মনের মাঝে জমানো যত রাগ ছিল সব যেনো এক নিমিষেই রূপের ঠোঁট গলে বের হয়ে আসে। সে কাকে কথাগুলো বলছে সেটা রূপ এক বারের জন্য ও ভেবে দেখে না। নিজের ওপর দিয়ে এত বড় ঝড় যাওয়ার পর একটু উষ্ণ আদরের আশায় যখন সে ইশতিহার এর দিকে হাত বাড়িয়েছিল তখন কপালে জুটেছিল স্বামীর অপমান মাখানো কটু কথা আর থা*প্পড়। তাই হয়তো অভিমানের পাল্লাটা ভারী হয়ে রূপ এমন একটা কান্ড করে বসে।

কথাগুলো শেষ করে বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে রূপ চোখ খুলে তাকায়। দেখতে পায় ইশতিহার অবিশ্বাস্য চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টিতে অন্য দিনের মতো তেজী রাগ নেই বরং হতাশা, বেদনা আর অবিশ্বাস জমে গেছে। রূপ যখন উপলব্ধি করে সে ইশতিহার কে ঠিক কতটা ঘায়েল করেছে তখন সে ইশতিহার এর হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিতে চায়। কিন্তু ইশতিহার দু কদম পিছিয়ে যায়। ভাঙ্গা হালকা কম্পনরত কন্ঠে সে বলে,
” ঠিক বলেছিস আমি স্বার্থপর। আজ স্বার্থপর দেখেই পাঁচ কিলোমিটার পথ দৌড়ে তোর কাছে ছুটে এসেছি। আদনান কে ফোন দিয়ে আমার বলার উচিত ছিল যে আমার ডিউটি আগে, তারপর বউ বাচ্চা। আর কি জানি বললি, আমি তোকে ভালবাসি না? ঠিক ধরেছিস আসলেই আমি তোকে ঘৃণা করি, তুই আমার কাছে শারীরিক চাহিদা মেটানোর বস্তু ছাড়া আর কিছুই না। বাড়ির অন্যরা তোকে অনেক ভালবাসে তো? আচ্ছা আমি চলে যাচ্ছি তোর জীবন থেকে, তোকে যারা ভালবাসে তুই তাদের সাথেই থাক।”
এই বলে ইশতিহার চলে যেতে নিলে রূপ শক্ত করে তার হাত চেপে ধরে। রূপের চোখ বেয়ে অগণিত অশ্রু ইশতিহার এর হাতের ওপর পড়ছে। তবুও ইশতিহার রূপের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। চোখ মুখ চোয়াল শক্ত হয়ে আসে না। সে কখনও ভাবতে পারেনি রূপ তার ভালোবাসা কে এভাবে হেয় প্রতিপন্ন করবে।
” আমি এভাবে বলতে চাইনি ইশতিহার। প্লীজ আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমি আপনাকে কষ্ট দিয়ে চাইনি।”
ইশতিহার পেছন ফিরে রূপের ক্রন্দনরত মুখটা একবারের জন্য দেখে। তারপর চোখ বুজে নিজের রাগ কিছুটা নিবারণ করে বলে,

” তো কি বলতে চেয়েছিস? আমি তোকে অবহেলা করেছি? সন্তানের কথা চিন্তা করছি, তাই বলে কি তোর কথা ভাবছি না? তোর যাতে কোনো কষ্ট না হয় তার জন্য কি সকলের সামনে কাল আমি খারাপ, বেয়াদ*ব প্রতিপন্ন হইনি? আর তুই বা কোন আক্কেলে অরুণার সাথে যেতে গেলি? গরম লাগছিল যখন আমাদের রুমে এসি ছিল, সেটা চালাতি। কিন্তু না, তোর তো একটা বিপদ বাঁধানো চাই।”
” চাচীই তো বলেছিল আমাকে যেতে।”
মিনমিনে গলায় কথাটা বলে রূপ। কথাটা যেনো ইশতিহার এর সহ্য হলো না। সে সাথে সাথেই পেছন ঘুরে রূপ কে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বিছানার ওপর তারহাট দুটো চেপে ধরে। তারপর নিজেও রূপের ওপর একটু ঝুঁকে কাঠকাঠ কন্ঠে বলে,

” অজুহাত দিবি না আমায় রূপ, অজুহাত শব্দ টা আমি মনে প্রাণে ঘৃ*ণা করি। আজ থেকে তুই আমার সাথে থাকবি অন্য বাড়িতে। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে, আমার হাতে বেশি সময় নেই।”
” কি বলছেন? অন্য বাড়িতে মানে? সবাই কে ছেড়ে আমরা কেনো যাবো?”
” কারণ ওই বাড়িতে তুই কিংবা আমাদের বাচ্চা কেও নিরাপদ না। তোকে যেকোনো একজন কে বেছে নিতে হবে রূপ, হয় বাড়ির সকল কে নয়তো আমাকে।”
রূপ বিস্ময় চোখে ইশতিহার এর দিকে তাকায়। ইশতিহার ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে টিপতে শুরু করেছে। রূপ বিছানার ওপর কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। মির্জা ম্যানশনে রূপের জন্ম, ছোট থেকেই সেখানে সে বড় হয়েছে। বাড়ির মানুষগুলো তাকে ভালো না বাসুক সে তো তাদের ভালবাসে, তাই তাদের ছাড়া অন্য কোথাও গিয়ে ইশতিহার এর সাথে সংসার পাতা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

” আমি যাব না।”
” কি?”
” বললাম, আমি যাব না আপনার সাথে অন্য কোথাও।”
কথাটা শুনতেই কিছুক্ষণ পূর্বের রাগ আবারো ইশতিহার এর মাথা ছাড়া দিয়ে উঠে। হাতের মোবাইলটা দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মেরে সে রূপের দুই কাঁধে হাত রেখে তাকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে,
” যাবি না,তাই না আমার সাথে। কেনো জানি না সেটা কি আমি বুঝি না। অন্য কোথাও গেলে তো তোর আর রুপমের সাথে দেখা হবে না। ওর সাথে ঢলাঢলি করতে পারবি না। একটু আগে তুই আমাকে বললি না যে আমি তোকে ভালবাসি না। এখন তো মনে হচ্ছে আমার প্রতি তোর সব অনুভূতি ক্ষীণ হয়ে গেছে।”
কথাগুলো শেষ করতেই ইশতিহার হনহন করে রুমের বাইরে চলে যায়। কিন্তু দরকার কাছে যেতেই সে আবারও বাজখাঁই কন্ঠে বলে উঠে,
” আমি চলে যাচ্ছি বলে ভাবিস না যে এখন তুই যা ইচ্ছা তাই করবি। আমার বাচ্চার যদি আবারো কোনো ক্ষতি হয় বা তাকে মারার পরিকল্পনা আবারো করা হয় তবে তার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকবি তুই রূপ। ”

আজকের রাতটা ইশতিহার আর রূপ দুজনের জন্যই আলাদা ছিল। একই শহরের দুটো ভিন্ন বাড়িতে তাদের দুজনের অবস্থান হলেও দুজনের আত্মা যেনো একে অপরের সঙ্গ ছাড়তে পারেনি। গত কয়দিনে ইশতিহার এর স্পর্শ রূপের এক বদঅ*ভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই হয়তো রাত গভীর হলেও রূপের চোখে ঘুম এলো না। বারংবার নিজের মন কে তিরস্কার করতে থাকলো ইশতিহার এর সাথে না যাওয়ার জন্য।
রূপ রাতের খবর না খেয়েই বিছানায় শুইয়ে পরে। এতক্ষণ সে অধীর আগ্রহ নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাড়ির মেইন গেটের ওপর নজর রেখেছিল। তার মনে কিঞ্চিৎ আশা জেগেছিল হয়তো ইশতিহার আবারো তাকে নিতে আসবে। এবার সে যাবে বইকি, কাপড় চোপড় গুছিয়ে আগে থেকেই রেডি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ইশতিহার এলো না, সময়ের সাথে সাথে কেবল রূপের চোখ ই ভিজলো, ইশতিহার এর এমন ভিজলো না।
একসময় ক্লান্তিতে মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ অন্ধকার হতে শুরু করলে রূপ ধীরে ধীরে নিজের শরীরটা কে বিছানায় টেনে নেয়। শরীর ক্লান্ত কিন্তু চোখে ঘুম নেই। বিছানার শীতল ওপর পাশটা শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে দেখে রূপের আরেক দফা কান্নার গমক আসে।

নাইটস্ট্যান্ড থেকে ইশতিহার এর ছবি খানা হাতে নিয়ে রূপ সেটা নিজের বুকে চেপে ধরে। একসময় কাদতে কাদতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। খেয়াল ও করে না বারান্দার দরজাটা সে বন্ধ করেনি। সে পথ দিয়ে চোর ছেচর প্রবেশ করে তার কোনো ক্ষতি করে দিতে পারে এমন ভয় আজ রূপের মনে ঠাঁয় পায়নি।
রাত আরেকটু গভীর হলে একটা কালো অবয়ব তার রুমে প্রবেশ করে। অবয়ব টা আরেকটু এগিয়ে এলে ল্যাম্পের আবছা আলোয় তার মুখখানি ফুটে উঠে। সে আর কেউ নয় বরং ইশতিহার। ল্যাম্পের হলদে আলো তার শ্যামলা চামড়ার ওপর পড়ছে।

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১০

চোখ তার দুটো অসম্ভব রকমের লাল হয়ে উঠেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পুরুষালি গৌরব ভেঙে পরিস্থিতি তাকে কাদতে বাধ্য করেছে। সে হাঁটু গেড়ে রূপের সামনে বলে খেয়াল করে রূপের চোখের কোণে জমা শুকনো অশ্রু। তার বুঝতে বাকি থাকে না তার অনুপস্থিতি রমণীকে কতটা পুড়িয়েছে। ইশতিহার এর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। আলতো করে রূপের ঘুমন্ত শরীর তাকে পেঁজা কোলে করে সে রুম থেকে বের হয়ে যায়। তাকে সঙ্গে নিয়েই ইশতিহার তাদের নতুন ঠিকানায় দিকে পাড়ি জমায়।

ডাক্টার ইশতিহার পর্ব ১২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here