ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪
সাবিলা সাবি
ঢাকা শহরের সকালে আজ একটু বেশি নীরবতা। চৌধুরী নিকেতনের জানালা দিয়ে ভোরের রোদ গলে পড়ছে শীতল মেঝেতে। ছাদের ওপরে দোয়েল পাখির ডাক থেমে থেমে বাজছে—যেন বাতাসও অপেক্ষা করছে কারো ঘুম ভাঙার।
কফির কাপ হাতে জাভিয়ান ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলো, চোখ তার দূরে, আকাশের দিগন্তে আটকে আছে। ঢাকার মেঘে মেঘে সে আজ খুঁজে ফিরছে সান্তা লুসিয়ার রোদ, মেক্সিকোর সেই বিকেলগুলো, যেখানে শত্রুতা আর বিশ্বাসঘাতকতার পেছনে ছিলো একান্ত নীরব এক পুরনো যন্ত্রণা।
ঠিক তখনই রায়হান ছুটে এলো—সাদা শার্ট, কালো টাই পরিহিত, মুখে চাপা উত্তেজনা নিয়ে। “স্যার… রিকার্দো ইনভাইট করেছে আপনাকে” রায়হান হঠাৎ বলে উঠল।
জাভিয়ান ধীরে ধীরে চোখ ফিরিয়ে তাকাল, “কেন?”
“আগামীকাল একটা বড় ডিল হচ্ছে, রিকার্দো সেটার জন্য একটা প্রাইভেট সেলিব্রেশন রাখছে। ও খবর পেয়েছে আপনি বাংলাদেশে এসেছেন।”
জাভিয়ান ঠোঁটের কোণে একরকম শীতল হাসি টেনে বলল, “রিকার্দো কখনোই কিছু ‘সেলিব্রেট’ করে না, ও শুধু মঞ্চ সাজায়।”
রায়হান মুখ নামিয়ে বলল, “আমি তাহলে রেসপন্স পাঠিয়ে দিই, স্যার?”
“পাঠাও। বলো—আমি যাচ্ছি।”
জাভিয়ানের কণ্ঠ ছিলো স্থির, কিন্তু চোখের পাতার নিচে যেন হঠাৎই সেই পুরনো ক্ষত জ্বলে উঠল। যেটা এখনও এলোমেলোভাবে থাকা তার কালচে সোনালী চুলের ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছিল—অতীতের নীরব সাক্ষী হয়ে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
গুলশান –রাত
লোকেশন: Club Oro, Block C – G1, গুলশান ১, ঢাকা।
শহরের বাতাসে হালকা শীত জমে উঠছে। শহরটা ঘুমোতে যাচ্ছে, কিন্তু গুলশান ১-এর ব্যস্ত সীমানায় এক কোণে আলো ঠিকরে পড়ছে একটি ক্লাবের বাহারি দরজায়—Club Oro।
এই ক্লাব সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এই ক্লাবে ঢোকার জন্য পরিচয় নয়, দরকার “ওজন”।
আজ রাতের জন্য এটি সম্পূর্ণ বুক করেছে—রিকার্দো ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন এক ভয়ংকর নাম। “Club Oro” এর নিচে গোপন একটি ভিআইপি চেম্বার আছে—যেখানে বসবে আজকের মাফিয়া সেলিব্রেশন। কারণ কাল যে ডিল হচ্ছে, তা যদি সাকসেসফুল হয়—ঢাকার নারকীয় পাচারচক্রের আরও একটি নতুন শাখা খুলবে।
রাত ঠিক ১১:২২। চৌধুরী নিকেতন।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে জাভিয়ান আকাশ দেখছিল।
ঠোঁটে নিভু নিভু একটি সিগারেট—তবু জ্বালায়নি।
মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের শ্বাস ধরে আছে।
পেছন থেকে দরজায় নক পড়ল।রায়হান ঢুকল চুপচাপ, কিন্তু উত্তেজনা লুকাতে পারছে না।
“স্যার… রিকার্দো Club oro বুক করেছে আজকের জন্য। আজ রাতটা…ওর ভাষায়, ‘The real fire starts tonight.’ কাল ওর সবচেয়ে বড় ডিলটা ফাইনাল হচ্ছে।”
জাভিয়ান চোখ নামাল। ধীরে সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে একটা টান দিল—নীরব আগুনের মতো। “Did he say who else will be there?”
রায়হান একটু গলা নামিয়ে বলল— “Some international investors, Russian contacts, and… a couple of showbiz faces too. Plus, imported girls… fresh, clean. সব কিছু ও নিজের মতো সেট করেছে।”
জাভিয়ান ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখে একরকম ছায়া নামল—সামনে ঝড়ের পূর্বাভাসের মতো। একটা ঠান্ডা হাসি ফুটল ঠোঁটের একপাশে, অদ্ভুত ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল “Ready the car. I want to look like the devil himself tonight.”
রায়হান মাথা নোয়াল, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল।
ড্রেসিং রুমে ঢুকেই জাভিয়ান তার কালো ভেলভেট ব্লেজারটা তুলে নিল। এর বোতামগুলো ছিল ম্যাট ব্ল্যাক,আর গলার কাছে রেশমের হালকা কাটা। ভিতরে গাঢ় মেরুন রঙা সিল্ক শার্ট, যার দুটো বোতাম খোলা, যেন এক ঝলকে মনে হয়—সে ভদ্র, কিন্তু বিপজ্জনক।
প্যান্ট ছিল স্লিম ফিট কালো সাটিন ট্রাউজার, একেবারে নিখুঁত ফিটিং। পায়ে Christian Louboutin এর কালো লেদার লো-হিল জুতো, যার পেছনে লাল সোল একঝলকে চোখে পড়ে যায়।
চুলটা স্টাইল করল স্লিক ব্যাক করে, হালকা গ্লসি ফিনিশে। হেয়ার জেলটাও ছিল Dior Homme-এর styling clay, যা দীর্ঘ সময় একইভাবে ধরে রাখে।
পারফিউম? Maison Francis Kurkdjian Baccarat Rouge 540. একবার স্প্রে করল গলার কাছে, আরেকবার কব্জিতে—রক্ত-মেশানো মধুর ঘ্রাণ যেন চারপাশে ছড়িয়ে দিল দাবানলের মতো কামনার গন্ধ।
ঘড়ি হিসেবে পড়ল Audemars Piguet Royal Oak, কালো স্টিলের বডি।
রাত ১২ টা।
গাড়ি থামল ‘Club Oro’-এর সামনে। বাইরের আলো ছিল ম্লান, কিন্তু লাল কার্পেট আর কাঁচের দরজা ঠিকরে দিচ্ছিল ভেতরের সোনালি আলোর প্রতিচ্ছবি।
জাভিয়ানের গাড়ি ছিল: Aston Martin DBS Superleggera (Black & Red) গাড়ি থেকে নামল ধীর পায়ে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপে ছড়িয়ে পড়ছে তার অধিকার।
রায়হান দরজা খুলে ধরতেই জাভিয়ান কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব এক ঝলক দেখে নিল। তারপর ক্লাবের দরজা পার হলো মাথা উঁচু করে।
রিসেপশনিস্টের চোখ স্থির হয়ে গেল তার দিকে, আর শুধু একটা কথাই মুখে এল, “Sir, welcome. They’re waiting for you upstairs.”
জাভিয়ান ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “Let them wait.” তার পদচারণা যেন বাজের মতো—নিঃশব্দে গর্জে ওঠে। ক্লাবের লাল আলো তার মুখে পড়তেই মুখটা কল্পনাতীতভাবে ধারালো আর অনিন্দ্যসুন্দর দেখায়। চারপাশের কেউ তার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারে না।
Club Oro — VVIP সেকশন
রাত ১২টা ৩৮ মিনিট। সোনালি ঝাড়বাতির নিচে মোটা গ্লাসে হুইস্কি হালকা কাঁপছে। পাশের অ্যাশট্রে-তে আধপোড়া এক সিগারেট নিঃশব্দে ধোঁয়া ছাড়ছে।
ক্লাবের কোণার এক গোল টেবিলে, জাভিয়ান বসে আছে—পায়ের উপর পা তুলে হালকা হেলান দিয়ে।য়এক হাত সোফার হ্যান্ডেলে, আরেক হাতে সিগারেট। মুখের কোণে অদ্ভুত ঠান্ডা হাসি।
রিকার্দো বসে আছে তার ঠিক সামনের সোফায় বরাবর, কিছুটা অস্থির ভঙ্গিতে হুইস্কির গ্লাস ঘুরিয়ে বললো—রিকার্দোর কণ্ঠে রাগ আর তাচ্ছিল্য মেশানো “সব ঠিক হয়ে গেছে। কাল রাতেই দুবাই থেকে নতুন কন্টেইনার নামবে। কিন্তু একটা প্রবলেম হচ্ছে—আমার ডান হাত যে সবসময় আমার সব ডিল একাই সামলেছে ওই ফারহান শালা এই ডিলটা নিয়া টালবাহানা শুরু করেছে।”
জাভিয়ান, ঠোঁটে সিগারেট চেপে, চোখে চোখ রেখে ধীরস্বরে বললো “বিশ্বস্ত বলেই তো এতদিন টিকেছে…কিন্তু যখন নিজের লোকই কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়—তখন কি করো, রিকার্দো?”
রিকার্দো, গ্লাস নামিয়ে মুখে একটা গালি ফেলে বললো
“শালা বলেছে এই ডিলটা নাকি ও করতে পারবেনা ওর ঘরে নাকি বোন আছে ও অন্য কারো বোনকে বিক্রি করতে পারবেনা! এতদিনে বিবেক জেগেছে! ওকে আজএ পর্যন্ত সময় দিয়েছি আর আজ যদি জবাব না দেয়, ওর জীবন নরক করে দিবো।”
জাভিয়ান ধোঁয়া ছাড়লো—সিগারেটের ছায়ায় চোখগুলো অদ্ভুতভাবে চকচক করে ওঠলো। তার ঠোঁট বাঁকিয়ে উঠে আসে এক শীতল হাসি— “সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে… আঙুল বাঁকাতে হয়। কেউ না বুঝলে বুঝে যাবে। আর তারপরে ও না বুঝলে… You know what to do.”
রিকার্দো, গ্লাস তুলে চুমুক দেয়। চোখে এখন আগুন। “Tonight’s the line, my friend. Either he walks in… or gets wiped out.”
এই বলে রিকার্দো উঠে দাঁড়ায়। হালকা হেলান দিয়ে নিজের শার্ট ঠিক করে পাশের টেবিলের দিকে হাঁটা ধরে—সেখানে অপেক্ষা করছে দুই আন্তর্জাতিক ক্রেতা আর এক রাশিয়ান অনুবাদক।
জাভিয়ান তখনও চুপচাপ সোফায় বসে ধোঁয়া ছাড়ছে। চোখে এক অপার শীতলতা। জীবনের প্রতি কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন সবকিছু আগেই জানে।
সিগারেটের ধোঁয়া ভরে ওঠে টেবিলের চারপাশে। গ্লাসে পড়ে থাকা বরফের গলন আর হুইস্কির রং তার চোখে প্রতিফলিত হয়। গান, লাইট, হাসি—সবকিছু ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়… কিন্তু জাভিয়ানের চোখ স্থির, ঠান্ডা, আর একধরনের বিক্ষুব্ধ বিষণ্ণতায় ভরা।
এদিকে তার সেক্রেটারি রায়হান ডান্স ফ্লোরে কয়েকটা মেয়ের মাঝে, হালকা এলকোহলে ঝিম ধরেছে। ডিপ হাউজ বিটের সাথে সে কোমর দুলিয়ে হাসতে হাসতে নাচছে।
জাভিয়ান চোখ সরিয়ে একবার দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বললো “এই রায়হান টাও না, একে দিয়ে যে কী হবে?”
সেই রাতে ক্লাবে সবার চোখ ছিল ঝলমলে আলো আর উচ্চস্বরে বাজতে থাকা মিউজিকে, কিন্তু এক কোণে বসে থাকা জাভিয়ান ছিল ঠিক তার উল্টো। নিঃশব্দ, স্থির আর ভয়ংকরভাবে গম্ভীর। ঠোঁটে সিগারেট, চোখে তীক্ষ্ণ চাহনি—একটা আগুনের মতো শীতলতা ছড়াচ্ছিল তার চারপাশে।
অনেকক্ষণ ধরে এক সুন্দরী মেয়ে জাভিয়ানকে দূর থেকে নজরে রেখেছিল। চোখে ছিল কৌতূহল আর কিছুটা দম্ভ। হঠাৎ করেই সে এগিয়ে এসে জাভিয়ানের পাশে সোফায় বসল, যেন বহুদিনের চেনা। জাভিয়ান ঠোঁটে সিগারেট তুলে চোখ নামাল মেয়েটার দিকে—নির্বিকার, ঠান্ডা অথচ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে নিজের নকশা আঁকা লাল নখগুলো দিয়ে জাভিয়ানের হাতের তালু ছুঁয়ে কাঁধ পর্যন্ত আঙুল চালাল, যেন কোনো শিকারকে ঠাহর করছে। কিন্তু জাভিয়ানের চোখে এক বিন্দু নাড়া খেল না, ঠোঁটের কোণে সিগারেটটা ধোঁয়া ছাড়তেই থাকলো।
হঠাৎ মেয়েটি তার এক পায়ের উপর বসে পড়লো, গ্লাসভর্তি হুইস্কি জাভিয়ানের ঠোঁটের সামনে ধরে বললো “আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি খুব একা, নিঃসঙ্গ।”
জাভিয়ান এবার হালকা বাঁকা হেসে মেয়েটার দিকেই তাকিয়ে থাকল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই ঠোঁট থেকে সিগারেট নামিয়ে মেয়েটার উন্মুক্ত উরুতে এতটাই নৃশংসভাবে চেপে ধরল যে সিগারেটের ছ্যাঁকায় মেয়েটা তীব্র আর্তনাদ করে উঠল—এক লাফে জাভিয়ানের গা থেকে সরে গিয়ে পাশের সোফায় পড়ে গেল।
জাভিয়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর নিজেই নিজের ব্লেজারটা ঝাড়তে থাকলো, যেন তার গায়ে কিছু অপবিত্র ছোঁয়া লেগেছে। চোখে ঘৃণার ছায়া স্পষ্ট।
তারপর ব্লেজারটা খুলে মেয়েটার মুখের দিকে ছুঁড়ে দেয়। শান্ত অথচ কর্কশ গলায় বলে ওঠে, “এটা রেখে দাও। তোমার ওই বাজে শরীর ঢেকে রাখার কাজে লাগবে।”
মেয়েটা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। জাভিয়ান আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে ভারী পায়ে ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেল, পেছনে ফেলে রেখে গেল এক বিবর্ণ, অপমানিত মুখ আর চারপাশে স্তব্ধতা।
ক্লাবের বাইরের পার্কিং লট, রাত গভীর।
জাভিয়ান ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসে ধীরে, চোখে বিরক্তির ছায়া, পেছনের আলো-সঙ্গীত আর দম্ভিত কোলাহল থেকে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে আনে। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে, কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলো। চারপাশে রাতের নিস্তব্ধতা, মৃদু হাওয়ায় ঢাকা পড়া শহরের শব্দ।
ঠিক তখনই এক বৃদ্ধা মহিলা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, গায়ে ময়লা শাড়ি, মুখে শ্রান্তি আর চোখে ক্ষীণ আশার দীপ্তি।
মহিলা কাঁপা গলায় বললো “বাবা… কিছু সাহায্য করবা?”
জাভিয়ান ধীরে চোয়াল শক্ত করে তাকায়, পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখলো ফাঁকা তারপর বললো “ক্যাশ নেই এই মুহূর্তে আমার কাছে। তবে ক্রেডিট কার্ড আছে… চলবে?”
মহিলা কানের কাছে হাত এনে বললো “কি কইলা বাবা? কি কাড?”
জাভিয়ান তখন নিজের কালো ওয়ালেট থেকে একটা চকচকে ব্ল্যাক ক্রেডিট কার্ড বের করে মহিলার দিকে বাড়িয়ে দেয়। “এই নিন। চাইলে সব টাকা নিয়ে নিন।”
মহিলা কিংকর্তব্যবিমূঢ়—কার্ডের মানে বুঝে না, শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঠিক সেই সময় হন্তদন্ত হয়ে রায়হান ছুটে আসে।
রায়হান চোখ বড় বড় করে বললো “আরে আরে স্যার! কী করছেন আপনি! ভিক্ষুকরা আবার ক্রেডিট কার্ড বোঝে নাকি?
সে তাড়াতাড়ি নিজের পকেট থেকে একটা বিশ টাকার নোট বের করে মহিলার হাতে গুঁজে দেয়, আবার স্যার’র হাত থেকে কার্ডটা নিচে নামিয়ে রাখে।
রায়হান চোখ টিপে বললো “স্যার, বাংলাদেশে এসে ডিজিটাল দান করবেন ভাবছিলেন নাকি? এখনো বাংলাদেশ এত উন্নত হয়নি যে এখানে “ডিজিটাল ভিক্ষুক” থাকবে।”
জাভিয়ান তখন হালকা মাথা ঝাঁকায়। একটুও রেগে যায় না। শুধু জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলে, “এই দেশটা যেনো আমার পুরোনো দিনের মতো—সব কিছু ধোঁয়াটে, ধোঁয়ায় ঢাকা… কিন্তু কোথাও যেনো একটা সত্যি লুকিয়ে আছে।”
রায়হান হাসে, গাড়ির দরজা খুলে বসে পড়ে পাশের সিটে। “স্যার, এই দেশে আবেগ দিয়ে চললে পকেট খালি হয়ে যাবে… কিন্তু ভালোবাসায় ভরপুর!”
গাড়ির ভেতর, শহরের আলো পেছনে ফেলে গাড়ি চলছে। জাভিয়ান সামনের দিকে তাকিয়ে, ঠোঁটে সিগারেট। রায়হান পাশে বসে অস্থির, যেন কিছু না বললে গলার কাঁটা নামবে না।
রায়হান বুক ফুলিয়ে হেসে বলল “স্যার, আপনি তো রিকার্দোর সাথে দেখা করলেনই না… একদম হঠাৎ করেই বেরিয়ে এলেন। আমি তো ভাবলাম, আপনি আর ওই মেয়েটা একসাথে… একটু…
জাভিয়ান ঠান্ডা গলায় বললো “আর বেশিক্ষণ থাকলে আমার শরীরটাই নোংরা হয়ে যেত।আর তুমি… আমার থেকে দূরেই থাকো। মেয়েদের সাথে এমন ঘেঁষাঘেঁষি করে এসেছো—ঘামে, পারফিউমে, মিলেমিশে তোমার নিজস্ব গন্ধই বদলে গেছে।”
রায়হান হাসতে হাসতে হাহাহা! করে বললো ” ষএই কথা আপনি ছাড়া আর কেউ বললে ওকে নিয়ে চিকিৎসা করাতাম। আচ্ছা বলেন তো স্যার, কখনো কাউকে ভালো লাগেনি আপনার?
জাভিয়ান চোখ তুলে ধীরে তাকায় আর বলে “ভালো লাগা, প্রেম—এসব দুর্বলদের জন্য।
রায়হান হাসতে হাসতে বললো “ওহ বাবা! স্যার আপনি তো প্রেমে না পড়ে সোজা প্রেমকেই ডিভোর্স করে দিলেন! আচ্ছা প্রেম বাদ একটু তো প্রান খুলে কখনো হাসতেও দেখিনা আপনাকে।”
জাভিয়ান চোখ সরিয়ে নিয়ে বললো “হাসি? আমার মুখের পেশি সেসব অনুভব করেনা।”
রায়হান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকাতে না পেরে বললো “আপনার তো চেহারার ভাবটাই এমন। সব টাইম এমন মুখ করে রাখেন যেনো আল্লাহ কপালে ‘দুঃখ’ লেপে দিয়ে পাঠিয়েছে পৃথিবীতে! আপনাকে।”
জাভিয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বললো ” সাট আপ রায়হান। আমি তোমার মতো না আমি মানুষকে ব্রেইন দিয়ে পড়ি, হৃদয় দিয়ে না।
রায়হান হাত নাড়তে নাড়তে বললো “আপনি তো স্যার “হৃদয়হীন গুগল ট্রান্সলেট” আবেগ ঢুকাইলেও রেসপন্স নাই! আচ্ছা বলেন তো, যদি কখনো সত্যি প্রেমে পড়েন… তখন?
জাভিয়ান চোখ সরু করে তাকিয়ে বললো “তখন…ধরে নাও সেই মেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে আনলাকি গার্ল আর পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে।”
রায়হান মাথা নিচু করে হাসতে হাসতে বললো “আপনার মুখে শক্তির এত ভার যে হালকা কথা বললেও মনে হয় কেউ মাইক দিয়ে জাতিকে তর্জন করছে!
জাভিয়ান চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে,ঠোঁটে সিগারেট চাপা। রায়হান হেসে কাঁধে কাত হয়, আর জাভিয়ান তখনও… পাথরের মতো চুপ। গাড়ির ভেতরে সেই পুরোনো নীরবতা ফিরে আসে, একপাশে তুফান, অন্যপাশে দেয়াল।
গভীর রাত, শহরের এক নির্জন গুদামঘর। বাইরে টিনের চালের ওপর টুপটাপ করে বৃষ্টি পড়ছে। ভিতরে অন্ধকার ঘরে একা বসে আছে ফারহান। একটা পুরনো কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ, চোখে গ্লানি আর ঘৃণার মিশেল।
গতকাল রাতেই সে স্পষ্ট করে দিয়েছে—নারী পাচারের এই ডিলে সে নেই। নিজের বন্ধুকে খু/ন করে যা করেছে, তার চেয়েও গা শিউরে ওঠা অপরাধ এটা। “আমার ঘরে দুটো বোন আছে,”—এই কথাটুকু বলে সে চুপ করেছিল। কিন্তু, সে চুপ করলেও—রিকার্দোর বিশ্বস্ত মানুষদের মাঝে একজন চুপ থাকেনি।
অন্যদিকে, রিকার্দোর লুকানো অফিসরুম। মার্বেল ফ্লোর, বিলাসবহুল, কিন্তু নিঃশব্দে আগুন জ্বলছে। রিকার্দো বসে আছে চেয়ারে। সামনে রিকার্দোর সেই লোকটা যে সবসময় ফারহানকে হিংসা করতো এক প্রকার ঈর্ষা করতো কারন রিকার্দো ফারহান ছাড়া কোনো কাজের ডিল করতোই না।
লোকটা চাতুর্যে ভরা গলায় বললো “বস, ফারহান কাকে যেন ফোন করছিল… আমার মনে হচ্ছে ও হয়তো পুলিশের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছে। আপনি সব কাজ ওকে দেন আপনার সব তথ্য ওর কাছে …ও যদি পাল্টে খায়?
রিকার্দো চোখ সরু করে বললো ” তুমি কী দেখেছো ওকে ফোন করতে?
লোকটা বললো “আমি শুধু শুনেছি “সব বলব আমি”এই কথাটা…শুনেছি তারপর গাড়িতে চড়ে চলে গেল।
রিকার্দো কিছু বলেনা।ঠান্ডা হয়ে যায় তার মুখ।চোখের মণি কেবল হালকা একবার দুলে ওঠে। তারপর আস্তে করে বলে “ডেকে আনো ওকে।”
আবার সেই গুদামঘর। ফারহানকে ডেকে আনা হয়েছে। ঘরে কয়েকজন অস্ত্রধারী দাঁড়িয়ে আছে। বাতি দুলছে মাথার ওপরে।ফারহান দাঁড়িয়ে আর তার সামনে রিকার্দো।
রিকার্দো গম্ভীর কণ্ঠে বললো “শুনেছি তুই আমার পেছনে পুলিশ লাগাচ্ছিস?”
ফারহান চোখে জ্বলন্ত ঘৃণা নিয়ে বললো “ভুল শুনেছিস আর আমি তো তোর সামনেই দাঁড়িয়ে আছি এই মুহূর্তে।”
রিকার্দো সামনে হেলে বললো “তাহলে বল,কেনো আমার এই ডিলে রাজি হচ্ছিস না?
ফারহানের চোখ লাল হয়ে উঠছে আর রাগান্বিত ভবে বললো “কারণ আমি গ্যাংস্টার! তোর চাকর না আমার যে কাজ ভালো লাগবে আমি সেটাই করবো যেটা লাগবেনা সেটা আমি করবো না। আমি আর তোর এই দাসত্ব করছি না।
একটা মুহূর্ত থেমে যায়। রিকার্দো চেয়ারে বসে থাকে চুপচাপ। ফারহান তখনো দাঁড়িয়ে। হঠাৎ পেছন থেকে এক বন্দুকধারী লোক ফারহানকে ধরতে আসে।
হঠাৎ! ফারহান ঘুরে এক লাথিতে লোকটাকে মাটিতে ফেলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই পকেট থেকে ছোট পিস্তল বের করে পা বরাবর গুলি করে দেয় ফারহান। বাকিরা হতভম্ব।
গোলাগুলি শুরু। একেকজন লোক ফারহানকে ঘিরে ধরে, কিন্তু সে যেন একাই এক সেনাবাহিনী। টেবিলের আড়ালে গিয়ে গুলি চালাচ্ছে, মাটিতে লুটিয়ে পড়া এক জনের বন্দুক নিয়ে আবার ফায়ার।
রিকার্দো প্রথমে চুপ করে দেখছিল। এবার উঠে দাঁড়ায়। চোখে শীতল আগুন।
রিকার্দো ধীরে ধীর বললো “তুই অনেক বড় ভুল করলি ফারহান।”
সময় থেমে যায় আরেকটা গুলির শব্দে। বাতি দুলছে। মেঝে রক্তে লাল। কিন্তু ফারহান দাঁড়িয়ে আছে। নিঃশ্বাস ভারী। চোখে আগুন জ্বলছে।
শহরের এক অন্ধকার কোণা, বৃষ্টিভেজা রাস্তায় ফারহান হেঁটে বেরিয়ে আসছে গুদামঘর থেকে। কিন্তু হঠাৎই— ফোন বেজে ওঠে। এক অচেনা নম্বর থেকে।ফোনটা ধরতেই তার কানে আসে ভয়ানক কিছু কথা…
রিকার্দোর এক গুন্ডা ওপাশ থেকে ফিসফিসিয়ে বললো “ফারহান তোর বাড়িতে পৌঁছে যেতে আর বেশি সময় নেই… এখন রিকো বলেছে, প্রথমে ওদেরকেই শেষ করতে হবে।”
এক সেকেন্ডের জন্য ফারহানের দম বন্ধ হয়ে আসে। তারপর… ছুটে দৌড় শুরু করে বাড়ির দিকে।
রেহমান প্রিয়াঙ্গন। শান্ত, গাছপালা ঘেরা পুরান ঢাকার এক এলাকা।কোলাহল থেকে অনেকটাই দূরে, এই জায়গাটা বরাবরই ছিলো নিরাপদ—অন্তত ফারহানদের জন্য তাই ছিলো এতদিন।
রাত গভীর হলেও আজ ঘরে আলো জ্বলছিল। এলিনার গায়ে হলুদ ঠিক দু’দিন পর। তাই ঘরে মা, বাবা, এলিনা আর তান্বী ব্যস্ত ছিলো প্রস্তুতিতে। হাসি-আড্ডা আর আলো জ্বালানো ঘরের ভিতরে কারো কল্পনাতেও ছিল না—ভবিষ্যতের একটা ছায়া দরজার দিকে এগিয়ে আসছে।
হঠাৎ— ঘরের দরজা বিকট শব্দে খুলে গেল।
ফারহান দৌড়ে ঢুকে পড়ে ভেতরে। মুখে আতঙ্ক, শরীরে ধুলো-মাটি, আর বুকের মাঝে অদ্ভুত এক তাড়না।
এলিনা চমকে উঠে দাঁড়াল, কণ্ঠ কেঁপে উঠলো—
— “ভাইয়া! কী হয়েছে? এমন দৌড়ে আসছো কেন?”
ফারহান হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “প্রশ্ন করিস না! একটুও সময় নেই! এখনই আমাদের এখান থেকে বের হতে হবে! সব কথা পরে বলবো—কিন্তু এখন না গেলে… আমরা কেউ বাঁচবো না!”
তান্বী তখন সামনে এসে পড়ে। কণ্ঠে ভয় আর উদ্বেগ—“ভাইয়া… কারা আসছে? কেনো আমরা পালাচ্ছি?”
বাবা উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিন্তু হঠাৎ এমন কী হলো, ফারহান?”
কথা থেমে গেল। চারজনের চোখই তখন আটকে রইলো ফারহানের মুখে।আর সেই মুখে…ছিলো এক নিঃশব্দ বার্তা। চোখে ছিল দগদগে আতঙ্ক, যেন সে মৃ/ত্যু দেখতে পেয়েছে একেবারে সামনে থেকে।
ফারহান কিছু না বলে এক ঝটকায় মা-বাবার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো বাইরের করিডোরের দিকে। “চলো! এক মুহূর্তও দাঁড়ালে শেষ!”
তারা দরজার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই, হঠাৎ—
বাইরে গাড়ির গর্জন। তারপর…ব্রেক কষে থামে একের পর এক গাড়ি।
বাতাসে ধুলো উড়ে যায়। শব্দহীন রাত্রি আর থাকলো না।
ফারহান ঘুরে দাঁড়ায়, জানালা দিয়ে তাকায় বাইরে। তারপর চোখ ঘুরিয়ে এলিনা আর তান্বীর দিকে বললো “তোরা দুজন মা-বাবাকে নিয়ে ওই স্টোররুমে যা! ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করো! এখনই! এক সেকেন্ড দেরি করলে শেষ!”
এলিনা থরথর করে কাঁপছে। এলিনা মায়ের হাত ধরে টান দিলো। ফারহান এবার আরেকটু নরম গলায় বলল,
— “বাবা… মা… প্লিজ! শুধু একবার আমার কথা শুনো। এই একবার…”
তারা কিছু না বলে তাকিয়ে থাকলো ছেলেটার দিকে—আর কিছু বলার সময় নেই। চোখে জল নিয়ে মা আর বাবা এলিনা-তান্বীর সঙ্গে ভেতরে চলে গেলেন। ফারহান একা রয়ে গেল দরজার সামনে।
ধীরে ধীরে সে হাঁটতে শুরু করলো বাইরে।
জ্যাকেট খুলে ফেলল। শরীরে লেগে আছে রক্তের দাগ।
প্যান্টের পেছনে পিস্তলের হাতল। চোখে আগুন, মুখে দৃঢ়তা।
সে মেইন গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
গেটের ওপাশে কালো পোশাকে কয়েকজন মুখ বাঁধা লোক নামছে গাড়ি থেকে। তাদের হাতে অস্ত্র। শব্দহীন। ভয়াবহ নিঃশব্দ। ফারহান দাঁড়িয়েই বলল “এই বাড়িতে আজ কেউ নেই। যেখান থেকে এসেছো সেখানেই ফিরে যাও। তা না হলে আমি কাউকেই বাঁচতে দেবো না। কাউকেই না।”
গেটের দুই পাশে দাঁড়ানো লোকেরা অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে।
ফারহান নিজের দুই হাত কোমরে রাখে। পিস্তলের হাতল ছুঁয়ে। জ্যাকেটের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে তার যোদ্ধার শরীর। চোখে আগুন, ঠোঁটে নীরব প্রতিজ্ঞা। বাতাস থেমে যায়। এ যেন এক নিঃশব্দ যুদ্ধের সূচনা।
ফারহান দাঁড়িয়ে ছিলো গেটের সামনে। রাত গভীর, বাতাস থেমে আছে। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু তার হৃদস্পন্দন যেন নিজেই নিজের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
হাতের পিস্তলটা মুঠোয় শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। চোখে ছিলো আগুন। হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে থামে। হেডলাইট নিভে যায়। গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নামলো রিকার্দো। পরনে ভারী কোট, হাতে ধোঁয়া ওঠা সিগারেট, মুখে সেই চিরচেনা ঠান্ডা বিকৃত হাসি।
রিকার্দো একটু এগিয়ে এসে সরু চোখে তাকিয়ে বলল,
— “তুই জানিস, আমি কাকে বিশ্বাস করতাম? তুই-ই ছিলি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত। আর আজ তুই-ই আমার পেছনে ছুরি মারলি, ফারহান?”
ফারহানের বুক ফুলে ওঠে। কণ্ঠ কাঁপে না, চোখেও একটুও ভয় নেই। “বিশ্বাস? তোর বিশ্বাস মানে তো ব্যবসা! মানুষকে বিক্রি করে, পরিবার ধ্বংস করে। আমি আর তোর নিচু কাজগুলো করবো না, রিকার্দো।”
এক মুহূর্তের নীরবতা। দুজন দাঁড়িয়ে থাকে চোখে চোখ রেখে। তারপর রিকার্দোর ঠোঁটের কোণ বাঁকলো। মুখের সেই ঠান্ডা হাসি আরেকটু গভীর হলো। কোমরের কাছ থেকে ধীরে বন্দুকটা বের করল সে।
সবচেয়ে আগে টের পেল ফারহান। তার হাতও উঠল।
কিন্তু… হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হলো।
রিকার্দোর ছোঁড়া গুলি বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেল ফারহানের। তার শরীরটা একটু কেঁপে উঠল, পিঠ দিয়ে গুলিটা বেরিয়ে পাশের কাঠের দরজায় গিয়ে লাগল—
একটা ফুটো হয়ে গেল দরজায়।
তারপর রিকার্দো থামল না।আরও তিনটা গুলি করলো আর তা লাগলো গিয়ে লাগল দরজায়। যেন ভেতরে থাকা মানুষগুলোকে জানিয়ে দিল—”আমি এসেছি।”
ফারহান তখনো পড়েনি। এক হাঁটুতে নেমে এসেছে, শরীর দুলছে। ঠিক তখনই ফারহানের বুকে পড়ে এক লাথি। রিকার্দোর কোনো লোক ফারহানকে উড়ে এসে লাথিটা মেরে ছিলো। ফারহান সেই লাথিতে উড়ে গিয়ে সরাসরি দরজায় আছড়ে পড়ে। কাঠ ভেঙে যায়, গুঁড়ো উড়ে যায়। সে ঘরের ভেতরে পড়ে থাকে, নিঃশ্বাস আটকে আসা শরীরটা মেঝেতে।
উপরের দিকে চোখ তুলে চেয়ে দেখে—তার মা, বাবা, এলিনা আর তান্বী দাঁড়িয়ে। সবার মুখ স্তব্ধ। কেউ কিছু বলতে পারছে না। তখনই যেন সময়টা এক মুহূর্ত থেমে যায়।
মা চিৎকার করে ওঠেন “ফারহা—আআআআন!!!”
তান্বী আর এলিনা একসাথে চিৎকার করে “ভাইয়া!!!”
ফারহানের ঠোঁট থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। সে তাকিয়ে থাকে শুধু তাদের দিকে। চোখে ছিল একটা নীরব অনুরোধ “ওদের কিছু করিস না। ওরা নির্দোষ।”
আর তখনই ঘরের বাইরে থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসে জুতোর শব্দ। রিকার্দোর জুতো। একেকটা ধাপ যেন মৃত্যু/র বার্তা। সবার বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে।
ঘরের দরজাটা একদম ভেঙে পড়ে আছে। চারপাশে ধুলা আর কাঠের গুঁড়ো। সেই গুঁড়োর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকছে রিকার্দোর লোকজন। সবার হাতে বন্দুক। চোখে সেই চিরচেনা হিংস্রতা—যা কোনো দয়া চেনে না।
ফারহান তখনো মেঝেতে পড়ে। বুকের রক্ত এখন শুকিয়ে গিয়েছে, কিন্তু শরীর চলছে কোনোমতে—হাত দিয়ে নিজেকে টেনে এগোতে চাইছে।
হঠাৎই একজন লোক সামনে এসে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কলার ধরে তাকে এক ঝাঁকুনিতে উঠিয়ে নিলো, তারপর টেনে হিচড়ে নিয়ে যেতে শুরু করলো দরজার দিকে। ফারহানের পা মেঝেতে টান পড়ছে, রক্তের দাগ রেখে যাচ্ছে পেছনে।
পেছন থেকে মা ছুটে এসে ছেলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলেন, কাঁপা গলায় চিৎকার করলেন “ছেড়ে দিন আমার ছেলেকে! প্লিজ… ওকে মেরে ফেলবেন না!”
লোকটা এক পলক তাকিয়ে কষ্টে হেসে বলল, “তোদের কেউ বাঁচবে না, বুড়ি। সবাইকে নিচে পিষে দেব, এক এক করে!”
এদিকে এলিনা, তান্বী আর বাবা-মাকে ধরে ধরে ঠেলে বের করে আনছে বাকিরা। কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ ঠেলায় কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়ছে।
তান্বী তখন রুমের কোণায়। ভয়ে জমে গেছে, কিন্তু চোখ খুঁজছে সুযোগ। হঠাৎ… এক লোক ওর হাত ধরে টানছিলো, পেছনে ফিরতেই তান্বী পুরো শক্তিতে পা তুলে…এক লাথি! মারলো ঠিক লোকটার পেছনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গায়।
লোকটা ছিটকে পড়ে গেল। মুখে বিকৃত ব্যথা।
সবাই চমকে তাকালো। এক এক সেকেন্ডের নীরবতা।
তারপরই রিকার্দো নিজেই সামনে এসে দাঁড়ালো।
চোখে আগুন, গলার স্বর ছুরির মতো ধারালো।
এক ঝটকায় তান্বীর গালে এক থাপ্পড় মারলো।তান্বীর মাথাটা ঘুরে যায় পাশের দিকে, মুখে লাল দাগ ফুটে ওঠে। সে কোনো শব্দ করে না—চোখে জল এসে পড়ে, কিন্তু সে নড়ে না।
রিকার্দো চুল চেপে ধরে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় দরজার দিকে। “তোদের পরিবার মানেই কি বিষ নাকি?এইটুকু মেয়ের এত সাহস?”
বাকি সবাই—মা, বাবা, এলিনা—কেউ আর বাধা দিতে পারছে না। তাদেরও একে একে ধাক্কা মেরে গাড়ির পেছনে তোলা হচ্ছে।
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩
মা কাঁদছেন। বাবার মুখ নিস্তব্ধ, ফ্যাকাসে। এলিনা মুখ ঢেকে চুপচাপ কাঁদছে।
আর ঠিক তখনই… গাড়ির ধারে পড়ে থাকা ফারহান, আধমরা শরীরে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে তার পুরো পরিবারকে একে একে গাড়ির পেছনে তোলা হচ্ছে।
সে কোনো শব্দ করতে পারে না, শরীর নড়ে না, শুধু বুকটা ওঠানামা করছে ভারী নিঃশ্বাসে। চোখে একটাই জ্বলন্ত অনুভব—অপরাধবোধ। ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর যেন দগদগে আগুনের মতো ছুটে আসছে “তাদের কিছু হলে… আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবো না…”
ফারহানের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় তান্বীর মুখে। এক মুহূর্ত, এক অনন্তকাল। গাড়ির দরজা বন্ধ হয়। সব শেষ বলে মনে হয়… কিন্তু ফারহানের চোখ তখনো খোলা।
