ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৯
সাবিলা সাবি
রায়হান যখন তান্বীকে নিয়ে তার ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটিতে উঠে স্টার্ট দিল, তখনো বনের অন্য প্রান্তে ইভানের তীব্র চিৎকারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। রায়হানের গাড়িটি জঙ্গলঘেরা খাড়া পাহাড়ি পথ বেয়ে হাইওয়ের দিকে নেমে যাওয়ার ঠিক কয়েক মিনিট পরের কথা—
সার্চলাইটের তীব্র আলো ফেলতে ফেলতে ইভান অবশেষে এসে পৌঁছাল সেই পরিত্যক্ত, জং ধরা পুরোনো গাড়িটার সামনে। কিন্তু সেখানে তান্বী নেই। মাটির ওপর পড়ে আছে তান্বীর খুলে ফেলা সেই কালো হুডিটা। আর তার ঠিক পাশেই রক্তাক্ত, অর্ধমৃত অবস্থায় প্রায় জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থায় পড়ে আছে তার মার্কো! ইভান দৌড়ে গিয়ে মার্কোর কলার চেপে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করল, “মার্কো! ওঠ হারামজাদা! তান্বী কোথায়? ও কি এই পথ দিয়ে পালিয়েছে?”
ইভানের মারমুখী ধাক্কায় মার্কো আস্তে আস্তে চোখ মেলল। মাথার পেছনের তীব্র যন্ত্রণায় সে ঠিকমতো তাকাতেও পারছিল না। সে ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল, “.. তান্বী… তান্বী সব জেনে গেছে। ও সিঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে আমাদের সব ডিল শুনে ফেলেছিল। ও আমাকে থাপ্পড় মেরেছে… আর রায়হান… রায়হান এসে আমাকে মেরে ওকে নিয়ে গেছে…”
“কী বললি?!” ইভানের চোখের মণি দুটো ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেল। তার মানে তান্বী এখন জেনে গেছে যে ইভান কোনোদিন জাভিয়ানকে এই কেস থেকে ছাড়াবে না! আর মার্কো—যার ওপর তান্বীকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব ছিল, সে কি না তান্বীকে ধরে রাখতে পারল না! ইভানের মগজে তখন মাফিয়ার সেই হিংস্রতা চাড়া দিয়ে উঠল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাম্রাজ্য হাতছাড়া হওয়ার ভয় আর তান্বীকে হারানোর তীব্র উন্মাদনায় সে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।
ইভান কোমর থেকে তার গোল্ডেন রিভলভারটা বের করে সরাসরি তাক করল নিজের আপন ভাই মার্কোর কপালে। “ইভান.ব্রো.. না! আমি তোমার ভাই…” মার্কো আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল।
“আরে রাখ কিসের ভাই, যেখানে আমি নিজের হাতে নিজের সবচেয়ে কাছের আপন মা জন্মদাত্রী মাকে মেরে ফেলতে চেয়েছো দ্বিধা করিনি সেখানে তোর মতো একটা হারামজাদাকে আমি আমার ভাই হিসেবে মানবো, তুই ছিলি আমার আদেশের দাস এই পর্যন্ত,মার্কো! তুই আর আমার কোনো কাজেরই না, তুই একটা আস্ত আবর্জনা!”
আর তারপর পরেই সাইলেন্সর ছাড়া তীব্র গুলির বিকট শব্দ হলো। বনের নীরবতা চিরে পরপর দুটো বুলেটের শব্দ মেক্সিকোর আকাশে প্রতিধ্বনিত হলো। মার্কোর কপাল এফোঁড়ওফোঁড় করে রক্ত ছিটকে পড়ল জং ধরা গাড়ির বনেটে। নিজের আপন ভাইকে নিজের হাতে খুন করে ইভান রিভলভারটা পকেটে পুরল। সে বনের আকাশের দিকে তাকিয়ে চিত্কার করে বলল, “রায়হান! তুই জাভিয়ানের কাছে তান্বীকে নিয়ে পার পাবি না। আমি তোদের দুজনকেই জীবন্ত কবর দেব!”
এদিকে রায়হানের গাড়ির পেছনের সিটে বসে তান্বী তখনো কাঁপছিল। রায়হান অত্যন্ত দক্ষ হাতে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে মেক্সিকো সিটির এক ডাউনটাউন এলাকার দিকে গাড়ি ছোটোচ্ছিল। আয়না দিয়ে তান্বীর দিকে তাকিয়ে রায়হান গম্ভীর গলায় বলল, “ম্যাডাম, ইভান আর মার্কো মেক্সিকো সিটির এই আন্ডারগ্রাউন্ডের খোঁজ জানে না। আমি জানি আমার স্যার এখন কোথায় থাকতে পারে। মেক্সিকোর এক সস্তা লোকাল বস্তির পেছনের একটা পরিত্যক্ত গ্যারেজে উনি আশ্রয় নিয়েছেন। পকেটে টাকা নেই, ক্ষমতা নেই, উনি এখন এক জীবন্ত লা/শ হয়ে দিন কাটাচ্ছে। আমি আপনাকে ঠিক সেখানেই পৌঁছে দেব।” জাভিয়ানের এই করুণ অবস্থার কথা শুনে তান্বীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যে নাইট রেভেনের এক ইশারায় মেক্সিকো কাঁপত, সে আজ এক পরিত্যক্ত গ্যারেজে দিন কাটাচ্ছে! ঠিক তখনই তান্বীর মাথায় একটা তীব্র চিন্তা খেলে গেল। সে রায়হানের দিকে ঝুঁকে এসে অত্যন্ত আকুল হয়ে রিকোয়েস্ট করল—”রায়হান ভাইয়া… আমার একটা কথা রাখবেন? আমি আপনার কাছে হাত জোড় করছি।”
রায়হান একটু অবাক হয়ে আয়নায় তাকাল, “বলুন ম্যাডাম।”
“আমরা যখন জাভিয়ানের কাছে পৌঁছাব, আপনি প্লিজ এখন ওকে মার্কোর এই বিষয়টার কিচ্ছু জানাবেন না! ও যেন কোনোভাবেই টের না পায় যে আজ রাতে মার্কো আমার সাথে কী করতে চেয়েছিল, আর আপনি মার্কোকে আঘাত করেছেন।” রায়হান ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কিন্তু কেন ম্যাডাম? স্যার যদি জানে মার্কো আপনার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে, তবে সে নিজের এই নিঃস্ব অবস্থা ভুলে মার্কোকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে। উনি আপনাকে কতটা ভালোবাসে আপনি জানেন না।” তান্বী চোখ মুছে শক্ত গলায় বলল, “আমি জানি রায়হান ভাইয়া। আর ঠিক সেই কারণেই আমি চাই না ও এখন এটা জানুক। জাভিয়ানের ভেতরের প্রেমিকটা এখন তীব্র অভিমানে আর ঘেন্নায় পাথর হয়ে আছে। ও ভাবছে আমি টাকার জন্য ওকে ধোকা দিয়েছি। আমি আগে ওর সেই ভুল ভাঙাতে চাই। ও যদি এখনই মার্কোর এই নোংরা লালসার কথা জানতে পারে, তবে ও প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ হয়ে কোনো বড় ভুল করে বসবে। ওর এই নিঃস্ব অবস্থায় আইনের হাত ওর খুব কাছে। আমি চাই না আমার জাভিয়ান আবার কোনো বিপদে পড়ুক। মার্কো আর ইভানের হিসাব পড়ে দেখা যাবে আজ রাতে শুধু জিন্নীয়া তার জাভিয়ানের বুকে ফিরতে চায়। প্লিজ রায়হান ভাইয়া, কথা দিন ওকে কিছু বলবেন না!”
তান্বীর চোখের সেই তীব্র মায়া আর জাভিয়ানের প্রতি এই গভীর প্রটেক্টিভনেস দেখে রায়হানের মন গলে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল, “ঠিক আছে ম্যাডাম। আমি স্যারকে কিচ্ছু বলব না। আমাদের গাড়ি গ্যারেজের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।”
রায়হানের ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটি যখন সেই ডাউনটাউনের পরিত্যক্ত গ্যারেজের সামনে এসে থামল, তখন রাতের শেষ প্রহর। তান্বী গাড়ি থেকে নেমে বুকভরা আশা নিয়ে গ্যারেজের ভাঙা লোহার সাটার ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল। কিন্তু ভেতরের দৃশ্যটা তাকে এক নিমিষে স্তব্ধ করে দিল। গ্যারেজটা সম্পূর্ণ খালি। চারদিকে শুধু পুরোনো গাড়ির টায়ার, জং ধরা লোহা আর পোড়া মবিলের গন্ধ। জাভিয়ান সেখানে নেই। রায়হান ভেতরে ঢুকে চারপাশটা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমি বুঝতে পেরেছি ম্যাডাম। স্যার অত্যন্ত চতুর। ইন্টারপোল আর মেক্সিকান পুলিশ যখন তার জীবিত থাকার নিউজ ফ্ল্যাশ করেছে, সে তখন খুব ভালো করেই জানত এই শহরের কোনো আন্ডারগ্রাউন্ড আস্তানাই আর তার জন্য নিরাপদ নয়। সে এই গ্যারেজ ছেড়ে চলে গেছে।”
তান্বীর তখন কান্নারত স্বরে বললো “তাহলে ও কোথায় গেছে রায়হান ভাইয়া? ও এই নিঃস্ব অবস্থায় কোথায় লুকাবে?”
রায়হান চশমাটা ঠিক করে গম্ভীর গলায় বলল, “মেক্সিকো সিটির বাইরে ‘কপার ক্যানিয়ন’ এর গভীরে একটা গোপন পাহাড়ি উপত্যকা আছে। সেখানে প্রাচীন পাহাড়ি ঝরনা আর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বিশাল কয়েকটা পাথুরে গুহা আছে। ওই জায়গাটা এতই দুর্ভেদ্য যে সেখানে কোনো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বা মোবাইল সিগন্যাল পৌঁছায় না। মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ সেখানে কাউকে সহজে খুঁজে পাবে না। আগে স্যার যখনই চরম মেন্টাল ব্রেকডাউনে ভুগত, সে তখন নিজেকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ওই গুহায় চলে যেত। উনি সেখানেই আছে ম্যাডাম।”
রায়হান আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তান্বীকে নিয়ে সে গাড়ি ছুটিয়ে দিল সেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে। মাইলের পর মাইল খাড়া চড়াই-উতরাই আর কুয়াশাচ্ছন্ন পথ পার হয়ে যখন তারা সেই গিরিখাতের মুখে পৌঁছাল, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সামনে আর গাড়ি যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। রায়হান গাড়ি থামিয়ে দিল। তান্বী গাড়ি থেকে নেমে দেখল—সামনে এক ভয়ঙ্কর সুন্দর প্রকৃতি। পাহাড়ের বুক চিরে এক বিশাল ঝরনা তীব্র গর্জনে আছড়ে পড়ছে নিচের পাথুরে নদীতে। চারপাশটা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। আর সেই ঝরনার ঠিক পেছনেই লুকিয়ে আছে কয়েকটা বিশাল, অন্ধকার পাথুরে গুহা। রায়হান এবার নিচু গলায় বলল। “আমি এখানেই থাকছি ম্যাডাম। ভেতরের রাস্তাটা বড্ড সংকীর্ণ। আপনি একাই যান। ওই শেষ গুহাটায় সম্ভবত স্যার আছেন।”
তান্বী রায়হানের ব্লেজারটা নিজের শরীরের সাথে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে ধীরপায়ে সেই পিচ্ছিল পাথর ডিঙিয়ে ঝরনার পানির ঝাপটা গায়ে মেখে সেই গুহার ভেতরে প্রবেশ করল। গুহার ভেতরের পরিবেশটা একদম নিথর, ঠান্ডা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাইরের ঝরনার পতনের শব্দটা ভেতরে এসে গম্ভীর প্রতিধ্বনির মতো শোনাচ্ছে। তান্বী মৃদু কাঁপতে কাঁপতে আরও কয়েক কদম ভেতরে যেতেই অন্ধকারের মাঝে একটা অবয়ব দেখতে পেল। গুহার এক কোণে, একটা বড় পাথরের ওপর একাকী বসে আছে জাভিয়ান। তার মাথার হুডির ক্যাপটা নামানো। দুদিনের না কামানো হালকা খোঁচা দাড়ি আর চোখের নিচের কালচে দাগ তাকে চেনা রাজপুত্রের চেয়ে কোনো এক ডার্ক ওয়ার্ল্ডের নির্বাসিত সম্রাটের মতো দেখাচ্ছে। তার পরনের সাধারণ শার্টপ্যান্টে লেগে আছে কাদা আর ধুলো। তার দু হাত সম্পূর্ণ খালি, হাতঘড়ি বা ব্রেসলেটের সেই রাজকীয় চমক আজ আর নেই। সে শূন্য চোখে গুহার পাথুরে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে এক জ্যান্ত লা/শের মতো বসে আছে। চারপাশের কোনো নেটওয়ার্ক নেই, কোনো আইনের হুলিয়া নেই এখানে সে কেবলই এক সর্বহারা আর ভাঙা হৃদয়ের একাকী প্রেমিক।
তান্বী পাথরের ওপর পা রাখতেই একটা মৃদু শব্দ হলো।সেই শব্দে জাভিয়ানের ধ্যান ভাঙল। সে অত্যন্ত ধীরগতিতে তার সেই চেনা, বরফশীতল চোখ দুটো তুলে তাকাল দরজাটার দিকে। কুয়াশা আর অন্ধকারের আড়াল থেকে ছিঁড়ে যাওয়া পোশাকে, গায়ে রায়হানের ব্লেজার জড়ানো অবস্থায় তান্বীকে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জাভিয়ানের চোখের মণি দুটো এক সেকেন্ডের জন্য কেঁপে উঠল। সে কি কোনো ভুল দেখছে? নাকি তার জিন্নীয়ার এই রূপ কোনো অলীক কল্পনা? মেক্সিকোর এই গোপন গুহায়, পৃথিবীর সব চোখ ফাঁকি দিয়ে তার জিন্নীয়া আজ তার এই নিঃস্ব ডেরায় এসে দাঁড়িয়েছে।
মেক্সিকোর উপত্যকায় যখন জাভিয়ান আর তান্বী নিজেদের মুখোমুখি, ঠিক তখনই মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ভিলা এস্পেরেন্জার সদর দরজা এক প্রচণ্ড লাথিতে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করল এক ঝড়। সে আর কেউ নয়—তান্বীর ভাই ফারহান! নিজের বোনের নিখোঁজ হওয়ার খবর আর মেক্সিকোর ডার্ক ওয়ার্ল্ডের এই ওলটপালট নিউজ শোনার পর ফারহান আর এক সেকেন্ডও শান্ত থাকতে পারেনি। সে তার পুরো ফোর্স নিয়ে সোজা এসে হানা দিয়েছে এমিলিও চৌধুরীর এই ডেরায়। তার একমাত্র লক্ষ্য নিজের বোন তান্বীকে এই নরক থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে বুকে টেনে নেওয়া। লিভিং রুমে ফারহানকে একদল সশস্ত্র লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সায়েম চৌধুরী আর জাভিয়ানের মা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ফারহানের চোখের সেই রাগ দেখে সায়েম চৌধুরী এক কুটিল, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। তিনি নিজের চশমাটা ঠিক করতে করতে অত্যন্ত অবহেলার সুরে বললেন—”আরে ফারহান! তুমি এখানে তোমার বোনকে খুঁজতে এসেছ? কিন্তু আফসোস, তোমার বোন তো এখানে নেই। সে মেক্সিকোর এই রাজকীয় ভিলা ছেড়ে অনেক আগেই চলে গেছে।”
জাভিয়ানের মাও তাঁর অহংকারী সুর মিলিয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার বোন কতটা ধূর্ত আর লোভী তা কি তুমি জানো ফারহান? আমার ছেলে জাভিয়ান যখন আইনের চোখে ফেরারি হলো, তার ক্ষমতা আর টাকা যখন শেষ হয়ে গেল—তখন তোমার ওই বোন আমার ছেলের এই নিঃস্ব অবস্থা দেখে এক সেকেন্ডও ভাবেনি। সে আমার ছেলের হাত ছেড়ে দিয়ে, ডার্ক ওয়ার্ল্ডের নতুন ক্ষমতাধর সম্রাট মেইলস্ট্রোমের হাত ধরে পালিয়ে গেছে! টাকার জন্য যে মেয়ে নিজের স্বামীকে এভাবে মাঝরাস্তায় ফেলে অন্য পুরুষের কাছে যেতে পারে, তাকে খুঁজতে আর এই ভিলাতে এসো না।”
নিজের কলিজার টুকরো বোন তান্বীর নামে এই নোংরা, চরিত্রহীন অপবাদ শোনামাত্রই ফারহানের মস্তিষ্কের প্রতিটা শিরায় আগুন ধরে গেল। তার হিতাহিত জ্ঞান সম্পূর্ণ লোপ পেল। সে একলাফে সায়েম চৌধুরীকে ডিঙিয়ে গিয়ে সরাসরি জাভিয়ানের মায়ের সামনে দাঁড়াল। কোনো আভিজাত্য বা নারীপুরুষের বাছবিচার না করে, ফারহান এক চরম হিংস্রতায় নিজের শক্ত ডান হাতটা বাড়িয়ে সরাসরি জাভিয়ানের মায়ের গলা চেপে ধরল! জাভিয়ানের মা আতঙ্কে আর ব্যথায় নীল হয়ে গেলেন। সায়েম চৌধুরী চিৎকার করে উঠলেন, “ফারহান! লিভ হার!”
কিন্তু ফারহান তার হাতের গ্রিপ আরও শক্ত করল। সে জাভিয়ানের মায়ের মুখের একদম কাছাকাছি নিজের লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো এনে দাঁতে দাঁত চেপে পশুর মতো গর্জে উঠল—”এই মহিলা! একদম চুপ! আর একটাও বাজে কথা যদি আমার বোনের নামে তোর এই নোংরা মুখ দিয়ে বের হয়, তবে কসম খোদার… তোর জিব আমি টেনে নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেলব! তুই চিনিস না আমাকে আমি কি করতে পারি। আমার বোন তান্বী কেমন, তা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না। সে আমার জাভিয়ানের জন্য নিজের জীবন দিতে পারে, কিন্তু কোনোদিন টাকার লোভে অন্য কারো হাত ধরতে পারে না!”
ফারহান এক ঝটকায় জাভিয়ানের মাকে মেঝের ওপর ছুড়ে ফেলে দিল। তিনি কাশতে কাশতে সোফার ওপর আছড়ে পড়লেন। ফারহান এবার তার কোমর থেকে একটা রিভলভার বের করে সরাসরি সায়েম চৌধুরী আর তাঁর স্ত্রীর দিকে তাক করল। তার পুরো শরীর তখন রাগে কাঁপছে। সে ভিলার ঝাড়বাতি আর দামী আসবাবপত্রের দিকে তাকিয়ে তীব্র গলায় বলল— “কান খুলে শুনে রাখ তোরা দু’জনেই মেক্সিকোর এই মাটিতে যদি আমি আমার বোন তান্বীকে অক্ষত অবস্থায় খুঁজে না পাই… যদি আমার বোনের গায়ে একটা আঁচড়ও লাগে… তবে ইন্টারপোল বা মেক্সিকান পুলিশ তোদের বাঁচানোর সুযোগ পাবে না। তোদের এই সাধের রাজপ্রাসাদ, এই পুরো ‘ভিলা এস্পেরেন্জা’ আমি নিজের হাতে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেব! তোদের অহংকার আমি এই মেক্সিকোর মাটিতে পুঁতে ফেলব!”
ফারহানের এই রূপ দেখে সায়েম চৌধুরীও আজ প্রথমবার ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, ফারহান নিজের বোনের সুরক্ষায় এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। ফারহান তার আনা ফোর্সদের দিকে ইশারা করল, “সার্চ এভরি কর্নার অফ মেক্সিকো! আমার বোন তান্বীর হদিস যেকোনো মূল্যে চাই!” কথাটি বলেই সে এক ঝড়ের গতিতে ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল।
গুহার অন্ধকার কোণে পাথরের ওপর একাকী বসে থাকা জাভিয়ান তখনও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার চেনা জিন্নীয়া, তার তান্বী আজ তার এই নিঃস্ব ডেরায় দাঁড়িয়ে! কিন্তু তান্বী আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। জাভিয়ানের সেই শূন্য, বিষণ্ণ আর ধুলোমাখা অবয়বটা দেখামাত্রই তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল।
সে সব ভয়, সব লজ্জা আর শরীরের ক্লান্তি ভুলে এক ঝটকায় দৌড়ে গিয়ে জাভিয়ানের ওপর আছড়ে পড়ল। সজোরে জড়িয়ে ধরল তার সেই চেনা শক্ত বুকটা। জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে রইল, তার দুই হাত তখনও জড়ো করা, সে তান্বীকে ফিরিয়ে দিল না আবার জড়িয়েও ধরল না। কিন্তু তান্বী জাভিয়ানের বুকে নিজের মুখটা লুকিয়ে পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল—”আমাকে ক্ষমা করে দাও জাভিয়ান! প্লিজ আমাকে একটা বার ক্ষমা করে দাও! তুমি যা দেখেছো, যা ভেবেছো তার কিচ্ছু সত্যি নয়। তোমার ওই জিন্নীয়া কোনোদিন অন্য কারো হতে পারে না! ওই পেন্টহাউসে আমি যা করেছি, সব মিথ্যে ছিল জাভিয়ান… সব মিথ্যে অভিনয় ছিল!”
তান্বীর চোখের তপ্ত জল তখন জাভিয়ানের সাধারণ শার্টের বুকটা ভিজিয়ে দিচ্ছে। জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু সে কোনো কথা বলল না। তান্বী আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরে হড়বড় করে বলতে লাগল—”তোমাকে বাঁচানোর জন্য, আলতিপ্লানো জেলের ওই নরক থেকে তোমাকে বের করার জন্য ইভান আমার সামনে শর্ত রেখেছিল। ও বলেছিল আমি তোমাকে ডিভোর্স দিলে ও আইনি পথে তোমার কেস লড়বে, তোমাকে ক্রসফায়ারের হাত থেকে বাঁচাবে। আমি শুধু তোমাকে বাঁচাতে, তোমার এই সুন্দর জীবনটাকে রক্ষা করার জন্যই নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ওই ইভানের ঘরে গিয়ে উঠেছিলাম জাভিয়ান!”
ঝরনার পানির শব্দের চেয়েও তান্বীর গলার এই আকুলতা গুহার পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তান্বী জাভিয়ানের বুকের কাপড়টা খামচে ধরে মুখ তুলে তাকাল তার চোখের দিকে। সেই চোখে এখন শুধু সত্যের লেলিহান শিখা। “কিন্তু আজ… আজ রাতে আমি নিজের কানে ইভান আর মার্কোর সব কথা শুনে ফেলেছি জাভিয়ান! ওরা আমাদের সাথে বেইমানি করেছে। ইভান আসলে কোনোদিনও তোমাকে এই ইন্টারন্যাশনাল কেস থেকে ছাড়াতে পারবে না, আর কোনোদিন ছাড়াতও না! ও শুধু আমাকে পাওয়ার জন্য এই কুৎসিত চালটা চেলেছিল। আমি সব জেনে ওর ডেরা থেকে পালিয়ে এসেছি জাভিয়ান। তোমার কাছে আসার পথে আজ আমি একটা গার্ডকে নিজের হাতে খু/ন পর্যন্ত করেছি! তুমি ছাড়া আমার এই দুনিয়ায় আর কেউ নেই… প্লিজ আমাকে তাড়িয়ে দিও না!”
ইভান আর মার্কোর এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের কথা তান্বীর মুখে শোনা মাত্রই জাভিয়ানের মস্তিষ্কের প্রতিটা কোণায় যেন এক তীব্র বজ্রপাত হলো। তার ভেতরের এতদিনের জমে থাকা রাগ, ঘৃণা আর তীব্র অভিমান এক সেকেন্ডে উবে গেল। সে বুঝতে পারল তার ভালোবাসা কোনো ভুল ছিল না, তার জিন্নীয়া কোনোদিন তাকে ধোঁকা দেয়নি। সে তো মেক্সিকোর এই নরকের মাঝেও তাকে বাঁচানোর জন্য এক অসম লড়াই লড়ছিল! নিজের সামনে ছিঁড়ে যাওয়া টপসে, গায়ে রায়হানের ব্লেজার জড়ানো, ধুলো আর রক্তে মাখা তান্বীর এই রূপ দেখে জাভিয়ানের সেই পাথুরে সম্রাট রূপটা এক নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। বিগত কয়েকদিনের সমস্ত নিঃস্বতা, ক্ষুধা আর একাকীত্ব যেন তান্বীর এই একটা জড়িয়ে ধরায় উধাও হয়ে গেল। জাভিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার সেই বিশাল, শক্তিশালী দুটো হাত বাড়িয়ে তান্বীকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে এমনভাবে পিষে ধরল, যেন আর কোনোদিন কোনো ইভান বা কোনো আন্ডারওয়ার্ল্ড তাদের মাঝখানে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে না পারে। সে তান্বীর চুলে নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিয়ে অত্যন্ত গভীর, আবেগী গলায় ফিসফিস করে বলল “জিন্নীয়া…!”
তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখার মাঝেই হঠাৎ জাভিয়ানের আঙুলগুলো আটকে গেল তান্বীর অনাবৃত কাঁধ আর গলার কাছে। ঝরনা গলে আসা ভোরের সেই হালকা আলোয় জাভিয়ানের চোখ পড়ল তান্বীর গলার চামড়ায় বসে যাওয়া লালচে, গভীর আঁচড়ের দাগগুলোর ওপর। শুধু তাই নয়, তান্বীর টপসের একপাশের কাঁধের কাপড়টা ছিঁড়ে ঝুলে আছে যা ব্লেজারের আড়ালে ঢাকা পড়লেও বোঝা যাচ্ছে কিছুটা। পলকের মাঝে জাভিয়ানের সারা শরীরে এক ভয়ঙ্কর তড়িৎপ্রবাহ বয়ে গেল। সে এক ঝটকায় তান্বীকে নিজের বুক থেকে কিছুটা সরিয়ে দিল। তার চোখের মণি দুটো রাগে আর প্রতিহিংসায় লাল হয়ে উঠল, চোয়ালের হাড় দুটো শক্ত হয়ে কাঁপতে লাগল।সে তান্বীর গলার সেই ক্ষতবিক্ষত দাগটার ওপর নিজের একটা কাঁপা আঙুল ছুঁইয়ে বরফশীতল, হাড়হিম করা গলায় বলল—”এসব কী তান্বী?! এগুলা কে করেছে? কোন কুত্তার বাচ্চা তোমার গায়ে হাত তোলার সাহস করেছে? বলো আমাকে… কে তোমাকে ছুঁয়েছে?!” জাভিয়ানের এই রুদ্রমূর্তি দেখে তান্বী মনে মনে কেঁপে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে মার্কোর সেই পৈশাচিক লালসার কথা যদি জাভিয়ান এখন জানতে পারে, তবে এই নিঃস্ব অবস্থাতেই সে খালি হাতে ইভান আর মার্কোর কাছে ছুটে যাবে। আর এই মুহূর্তে আইনের চোখ তার খুব কাছে। জাভিয়ানকে কোনো বিপদে সে পড়তে দেবে না।
তাই তান্বী জোর করে নিজের চোখের জল লুকিয়ে, জাভিয়ানের গালে নিজের দুটো হাত রাখল। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে বলল—”না জাভিয়ান, তুমি যেমনটা ভাবছ তেমন কিচ্ছু না। আমি তো ইভানের ডেরা থেকে পালিয়ে ওই ঘন, ভয়ংকর জঙ্গলটার ভেতর দিয়ে অন্ধের মতো দৌড়ে আসছিলাম। চারদিকে শুধু বুনো কাঁটাগাছ আর পাইন গাছের ডালপালা ছিল। ওগুলো পার হতে গিয়েই জঙ্গলের গাছের আঁচড় লেগে এই অবস্থা হয়েছে। আমাকে কেউ ছোঁয়েনি জাভিয়ান, তোমার জিন্নীয়াকে ছুঁয়ে দেওয়ার মতো ক্ষমতা ওই ইভান বা এর কোনো বাহিনীর নেই। শান্ত হও তুমি…”
জাভিয়ান তান্বীর চোখের দিকে একপলক তাকাল। সে কি তান্বীর এই মিথ্যেটা ধরতে পারল? হয়তো পারল, কিংবা তান্বীকে ফিরে পাওয়ার তীব্র আবেগের কাছে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এই প্রথম হেরে গেল। তান্বীর মুখে নিজের প্রতি এই গভীর প্রটেক্টিভনেস দেখে জাভিয়ানের ভেতরের সেই ভয়ঙ্কর নাইট রেভেন এক সেকেন্ডে শান্ত হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। তান্বীকে নিজের অসীম শক্তির টানে আবার নিজের বুকের সাথে শক্ত করে আছড়ে ফেলল। এবার তার জড়িয়ে ধরার মাঝে কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল এক প্রখর অধিকার আর হারানোর তীব্র ভয়। সে তার মুখটা নামিয়ে এনে তান্বীর রেশমি চুলে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এক পরম ভালোবাসায় সে তান্বীর চুলে একের পর এক চুমু খেতে লাগল। তার ঠোঁট জোড়া এবার নেমে এল তান্বীর ফর্সা কপালে, যেখানে দীর্ঘদিনের বিরহ আর কষ্টের সমাপ্তি ঘটল এক পবিত্র স্পর্শে। জাভিয়ান আলতো করে তান্বীর মুখটা দুহাতে তুলে ধরল। তান্বীর যে চোখ দুটো গত কয়েকদিন ধরে শুধু নোনা জল ফেলেছে, আজ জাভিয়ান নিজের ঠোঁট দিয়ে তান্বীর সেই ভেজা চোখ দুটোর ওপর গভীর চুমু খেল। তার ভালোবাসার সেই উষ্ণ ছোঁয়া তান্বীর গাল বেয়ে নেমে এল। এতদিনের অপমান, ইভানের খাঁচার বন্দিদশা আর মার্কোর সেই নোংরা ধস্তাধস্তির সমস্ত গ্লানি জাভিয়ানের এই ওষ্ঠস্পর্শে এক নিমেষে ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে গেল। জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে নিজের মুখটা এনে অত্যন্ত আবেগে বুঁজে আসা গলায় ফিসফিস করে বলল, “আই অ্যাম সরি জিন্নীয়া… আমি তোমাকে ভুল বুঝেছিলাম। আর কখনো তোমাকে অবিশ্বাস করবোনা কোনদিনোও না।”
জাভিয়ান তান্বীর ক্ষতবিক্ষত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দুটোতে তখন এক তীব্র অপরাধবোধ আর অনুশোচনার ছায়া। যে মেয়েটাকে সে রাজপ্রাসাদের রানী করে রাখতে চেয়েছিল, সে আজ এক সাধারণ টপস আর গায়ে রায়হানের ব্লেজার জড়িয়ে এক ফেরারি আসামির মতো গুহার মেঝেতে দাঁড়িয়ে আছে।জাভিয়ান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত ভাঙা, অপরাধী গলায় বলল—
“সেদিন… সেদিন যদি তোমাকে জোর করে বিয়ে করে না আনতাম, তবে আজ তোমার জীবনটা এমন ছন্নছাড়া হতো না তান্বী। তুমি নিজের পরিবার নিয়ে কোনো এক শান্ত, নিরাপদ পৃথিবীতে সুখে থাকতে পারতে। আমার এই অভিশপ্ত ছায়া তোমার জীবনটাকে নরক বানিয়ে দিল।”
তান্বী জাভিয়ানের ঠোঁটের ওপর নিজের একটা আঙুল চেপে ধরল। তার চোখের কোণ দিয়ে আবার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সেই কান্না আর কষ্টের ছিল না, তা ছিল এক পরম প্রাপ্তির। সে জাভিয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে আবেগী গলায় বলল “তাহলে তো আর কোনোদিন তোমাকে পাওয়া হতো না, জাভিয়ান! তোমার এই ধ্বংসাত্মক ভালোবাসার চেয়ে নিরাপদ কোনো জীবন আমার কখনোই চাইনি। যে জীবনে তুমি নেই, সেই নিরাপদ স্বর্গও আমার কাছে এক জীবন্ত কবর।”
জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের সাথে আরও একটু জড়িয়ে নিল। তার গলার স্বর এবার এক অবোধ বালকের মতো শোনাল, “পেন্টহাউসের ওই দৃশ্যটা দেখার পর… আমি সত্যি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছো। ভেবেছিলাম ইভানের ক্ষমতা আর টাকার কাছে আমার এই নিঃস্ব রূপটা হেরে গেছে।” তান্বী জাভিয়ানের গালে হাত রেখে আলতো করে বুড়ো আঙুল দিয়ে তার গালটা ছুঁয়ে দিল। সে এক চিলতে পবিত্র হাসি হেসে বলল—”যে মানুষটা সত্যিকারে তোমাকে ভালোবাসবে, সে কখনো চলে যাওয়ার অজুহাত খুঁজবে না। বরং থেকে যাওয়ার হাজারটা কারনই খুঁজবে সবসময়।”
তান্বীর মুখের এই অফুরন্ত ভালোবাসার কথাগুলো শোনামাত্রই মেক্সিকোর সেই দুর্ধর্ষ আন্ডারওয়ার্ল্ড কিংপিন, সেই অহংকারী ‘নাইট রেভেন’ এক নিমেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে এই প্রথম সে নিজেকে কারো সামনে এতটা ছোট, এতটা অসহায় আবিষ্কার করল। সে আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। জাভিয়ান ধীরপায়ে তান্বীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তারপর তান্বীর উদরে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল—ঠিক যেভাবে এক ক্লান্ত নাবিক বহু ঝড়তুফান পার করে অবশেষে তার তীরে এসে আশ্রয় পায়। সে তান্বীর পিঠে খামচে ধরে নিজের মুখ লুকিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল গলায় কেঁদে উঠে বলল—
“আই অ্যাম সরি জিন্নীয়া… সরি! আমার মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে। আমি তোমাকে অবিশ্বাস করেছিলাম। তোমার গায়ে আগুন ছুড়ে দিয়েছিলাম। রাগে অন্ধ হয়ে আমি তোমার ওই পবিত্র চোখ দুটো দেখতে পাইনি। আমি তোমাকে ডিজার্ভ করি না তান্বী… আই ডোন্ট ডিজার্ভ ইউ!”
তান্বীর চোখ থেকেও জল টপটপ করে পড়তে লাগল জাভিয়ানের চুলে। সে জাভিয়ানের মুখটা আলতো করে ওপরে তুলে ধরল, যাতে তাদের চোখ আবার এক হয়ে যায়। সে পরম মমতায় জাভিয়ানের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল—”না জাভিয়ান, একদম আর একটাও এমন কথা বলবে না। উই আর মেইড ফর ইচ আদার। দুনিয়ার কোনো শক্তি, কোনো ইভান, কোনো ইন্টারপোল আমাদের আলাদা করতে পারবে না। তুমি নিঃস্ব হতে পারো, কিন্তু তোমার এই জিন্নীয়া আজীবন তোমার পাশে থাকবে।”
গুহার ভেতরে জাভিয়ান আর তান্বী যখন নিজেদের সবটুকু আবেগ দিয়ে এক হয়ে আছে, তখন গুহার বাইরের পৃথিবীটা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ময়দানে রূপ নিয়েছে। মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের তিনটি বড় শক্তি এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে এই যুগলকে। ভিলা এস্পেরেন্জায় জাভিয়ানের বাবা-মাকে চরম হুমকি দিয়ে বের হওয়ার পর ফারহান এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করেনি। সে খুব ভালো করেই জানত, মেক্সিকোর এই গোলকধাঁধায় একা তান্বীকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তাই সে লুসিয়াকেও সাথে করে নিয়ে নেয়। লুসিয়াকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ফারহান স্টিয়ারিংয়ে চরম গতিতে চাপ দিল। লুসিয়া তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কি-বোর্ড খটখট করতে করতে বলল— “ফারহান তান্বী যদি ইভান ব্রো এর কাছে থাকে তাহলে ওরা সম্ভবত এই শহরে নেই। আর ইভান ব্রো এর নাম্বার আমি কোনোভাবেই ট্র্যাক করতে পারছিনা।।”
ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের মণি দুটো রাগে জ্বলতে লাগল। সে ড্যাশবোর্ডে রাখা রিভলভারটা লোড করতে করতে বলল, “তোমার ভাই মেইলস্ট্রোম একটা খ্যাপা কুত্তা! আমার বোন যদি ওর আশেপাশে থাকে, ও তান্বীর ক্ষতি করতে দুবার ভাববে না। লুসিয়া, গাড়ির স্পিড ট্র্যাকার অন করো, আমাদের স্ট্রোম হাউজে যেতে হবে!”
ওদিকে, নিজের আপন ভাই মার্কোকে ঠান্ডা মাথায় খুন করার পর ইভানের ভেতরের মাফিয়া সত্ত্বাটা পুরোপুরি এক সাইকো কিলারে রূপ নিয়েছে। তার পুরো শার্টে তখন মার্কোর রক্তের দাগ। সে তার বাহিনীর দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো চিত্কার করে বলল—”তান্বী মেইন রোড দিয়ে পালায়নি। এই জঙ্গলের পেছনের গিরিখাত ধরে রায়হান তাকে নিয়ে গেছে। রায়হান জানে জাভিয়ান কোথায় লুকিয়ে থাকে! মেক্সিকোর প্রতিটা ইঞ্চি তোলপাড় কর। জাভিয়ানকে আমি আজ এই বনের মাটিতেই শেষ করব, আর তান্বীকে আমার চাই-ই চাই!”
ইভানের গাড়িগুলো তখন হিংস্র নেকড়ের মতো হাইওয়ে ছেড়ে কপার ক্যানিয়নের সেই দুর্গম পাহাড়ি কাঁচা রাস্তার দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ধামাকাটা ঘটল মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ আর ইন্টারপোলের হেডকোয়ার্টারে। জাভিয়ান জীবিত—এই নিউজ ফ্ল্যাশ হওয়ার পর থেকেই ইন্টারপোলের স্পেশাল কমান্ডো ফোর্স মেক্সিকোর পুরো ডার্ক ওয়েবের সিগন্যাল স্ক্যান করছিল। ঠিক তখনই, রায়হান যখন তান্বীকে নিয়ে ওই পরিত্যক্ত গ্যারেজ থেকে কপার ক্যানিয়নের দিকে গাড়ি ছুটিয়েছিল, রায়হানের আনট্র্যাসেবল ফোনের একটা এনক্রিপ্টেড কোড ইন্টারপোলের মেইন সার্ভারে হিট করে।
ইন্টারপোলের চিফ কমান্ডো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিত্কার করে উঠলেন—”অ্যালার্ট! নাইট রেভেনের লাস্ট কো-অর্ডিনেটস পাওয়া গেছে! সে মেক্সিকো সিটির বাইরে কপার ক্যানিয়নের সেই প্রাচীন ঝরনা আর গুহার ভেতরে সেলফ-আইসোলেশনে আছে। ওই জোনে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, কিন্তু আমাদের জিপিএস ট্র্যাকার কনফার্ম করছে ওখানেই ও লুকিয়ে আছে। মুভ এভরিওয়ান! এবার জ্যান্ত অথবা মৃত—নাইট রেভেনকে আমাদের চাই!”
মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারপোলের চারটে ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টার বিশাল ডানার শব্দ করে মেক্সিকোর আকাশ কাঁপিয়ে কপার ক্যানিয়নের দিকে রওনা দিল। সাইরেন বাজিয়ে ধেয়ে চলল ডজন খানেক পুলিশ ভ্যান। দুনিয়ার সব কোলাহলকে একপাশে ফেলে গুহার গভীরতম প্রকোষ্ঠে তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে এক নিবিড় শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল জাভিয়ান। কপার ক্যানিয়নের এই জোনে অসংখ্য ছোটবড় গুহার গোলকধাঁধা থাকায় পুলিশ সহজে তাদের হদিস পাচ্ছিল না। কিন্তু সেই শান্তির ঘুম বেশি সময় স্থায়ী হলো না। হঠাৎ করেই পাহাড়ের পাথুরে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে আছড়ে পড়ল ইন্টারপোলের মেগাফোনের কর্কশ শব্দ আর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টারের ডানার গর্জন। সেই তীব্র মাইকিংয়ের শব্দে ধড়ফড় করে জাভিয়ান আর তান্বীর ঘুম ভেঙে গেল। জাভিয়ান এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে গুহার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখ দুটোতে তখন কোনো ভয় নেই, আছে এক পরম বাস্তবতার নিষ্ঠুর আলো। সে তান্বীর হাত দুটো ধরে অত্যন্ত গম্ভীর প্রটেক্টিভ গলায় বলল—”ওরা চলে এসেছে তান্বী! চারদিক থেকে পুরো ক্যানিয়ন ঘিরে ফেলেছে। এই জোন থেকে এখন আর পালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তুমি আর এক মুহূর্তও এখানে থেকো না… জাস্ট চলে যাও এখান থেকে। মুভ!” তান্বী ঝাপসা চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “আমি চলে যাব মানে? আমি তোমাকে এই অবস্থায় ফেলে কোথায় যাব, জাভিয়ান?!”
“তুমি ফারহানের মেক্সিকোর ফ্ল্যাটটা চেনো, রাইট?” জাভিয়ান তান্বীর কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে বলল, “তুমি সোজা ফারহানের কাছে চলে যাও। ও তোমাকে আগলে রাখবে। তারপর ওখান থেকে সরাসরি বাংলাদেশে, তোমার নিজের বাবামায়ের কাছে ফিরে যাও। এই অভিশপ্ত মেক্সিকো আর এই ডার্ক ওয়ার্ল্ডের চ্যাপ্টার এখানেই ক্লোজ করে দাও তান্বী। বাংলাদেশে গিয়ে আবার নতুন করে নিজের পড়াশোনা শুরু করো, নিজের সুন্দর জীবনটা আবার নতুন করে গুছিয়ে নাও।”
জাভিয়ানের মুখে নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার কথা শুনে তান্বী এক মুহূর্তে চরম রাগে আর অপমানে ফেটে পড়ল। সে জাভিয়ানের হাতটা এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে তীব্র চোখে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল—”আমি নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার জন্য এই নরকে, তোমার কাছে ছুটে এসেছি? আমার যদি নিজের আখেরই গোছাতে হতো, তবে তো আমি ওই ইভানের কাছেই আরামে থাকতে পারতাম! ওর টাকা আর ক্ষমতার অভাব ছিল না, ওর সাথেই নিজের লাইফ সেটেল করে নিতাম! একসাথে থাকার প্রমিজ করে, আজ মেক্সিকোর এই গুহায় এনে আমাকে চলে যেতে বলছ তুমি? তোমাকে ছাড়া আমার কিসের জীবন, আর কার জন্য আমি সেই জীবন গুছাবো, জাভিয়ান?”
জাভিয়ান এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে তান্বীর মুখটা নিজের দুহাতে তুলে নিল, “বোঝার চেষ্টা করো তান্বী! আমি আলতিপ্লানো জেল থেকে পালানো একজন দাগী আসামি। ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ এবার আমাকে অ্যারেস্ট করার পর জ্যান্ত রাখবে না, ওরা আমাকে এনকাউন্টারে মেরে ফেলবে! তাহলে আমার জন্য তুমি কি সারাজীবন শুধু অপেক্ষা করে করে নিজের পুরো লাইফটা শেষ করে দেবে? তোমাকে তো বাঁচতে হবে জিন্নীয়া… আর বাঁচতে হলে ভালোভাবেই বাঁচতে হবে।”
তান্বী এবার জাভিয়ানকে পাগলের মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠল, “কী বলছ এসব ছাইপাঁশ? ওরা কেন তোমাকে মেরে ফেলবে? তোমাকে ছাড়া আমি কীভাবে এক সেকেন্ড বেঁচে থাকব, জাভিয়ান? আমি কিচ্ছু জানি না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”
ঠিক তখনই গুহার বাইরে মেগাফোনের শব্দটা আরও তীব্র, আরও নিষ্ঠুর হয়ে গর্জে উঠল—”মিস্টার জাভিয়ান! আপনি ওই গুহার ভেতরে আর কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবেন? মেক্সিকান ফেডারেল পুলিশ আর ইন্টারপোল আপনাকে চারদিক থেকে লক করে ফেলেছে। যদি আপনি আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাত তুলে স্যারেন্ডার না করেন, তবে আপনাকে এখানেই স্পট ক্রসফায়ার করতে বাধ্য হব! ওপর মহল থেকে আমাদের কাছে শুট-অন-সাইটের ক্লিয়ার অর্ডার আছে। আই রিপিট… স্যারেন্ডার করুন!”
ক্রসফায়ার শব্দটা শোনামাত্রই তান্বী আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে কাঁপতে কাঁপতে জাভিয়ানের শার্ট খামচে ধরে বলল, “জাভিয়ান… এখন কী করবে তুমি? ওরা তো তোমাকে মেরে ফেলবে!” জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে তখন এক পৈশাচিক, আত্মসম্মানী হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, “আমি ওদের হাতকড়া নিজের হাতে পরব না তান্বী। ওদের হাতে স্যারেন্ডার করে কুকুরের মতো এনকাউন্টারে মরার রেকর্ড নাইট রেভেনের ডায়েরিতে নেই।”
“তাহলে তুমি কী করতে চাইছ?” তান্বী এক তীব্র আশঙ্কায় জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকাল।
জাভিয়ান তান্বীর থেকে নিজের হাতটা আলতো করে সরিয়ে নিয়ে গুহার পেছনের সেই অতল খাদের দিকে তাকাল, যেখান থেকে ঝরনার জল শত ফুট নিচে পাথুরে নদীতে আছড়ে পড়ছে। সে নিচু গলায় বলল, “তুমি চলে যাও তান্বী। আমি এভাবে ফেরারি হয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেশিদিন থাকতে পারব না। ওরা আমাকে ধরে ক্রসফায়ার করার চেয়ে… এই ঝরনার খাদের গভীরতা অনেক বেশি সম্মানজনক।”
তান্বী এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। জাভিয়ান বাই এনি চান্স এই খাদের তীব্র স্রোতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দিতে চাইছে! তান্বী আর এক মুহূর্তও ভাবল না। সে ছুটে গিয়ে জাভিয়ানের ডান হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। তার চোখে তখন কোনো ভয় নেই, আছে একরাশ উন্মাদনা। সে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “বেশ তবে চলো… একসাথেই!” জাভিয়ান চমকে উঠে তান্বীর হাতটা ছাড়াতে চাইল, “পাগল নাকি তুমি তান্বী?! তুমি মরবে কেন? আমি তোমাকে কোনোদিনও মরতে দেব না!”
“জাভিয়ান…” তান্বী এবার চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল, “আমি যদি আজ এখানে বেঁচে থাকি, তবে ওই পিশাচ ইভান আমাকে কোনোদিনও ছাড়বে না! ও আমাকে টেনেহিঁচড়ে আবার নিজের কাছে বন্দি করবে। আমি মরে গেলেও কোনোদিন ওই ইভানের হব না জাভিয়ান, কোনোদিন না! আমি তোমাকে নিজের জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। প্লিজ… বাঁচলে আমরা একসাথেই বাঁচব, একসাথেই থাকব। আর এই দুনিয়া যদি আমাদের একসাথে থাকতে না দেয়, তবে অন্তত এই খাদের গভীরে আমরা একসাথে মরতে তো পারব! আমাদের ভালোবাসাকে কেউ বন্দি করতে পারবে না।”
তান্বীর চোখের সেই তীব্র, আত্মত্যাগী ভালোবাসার রূপ দেখে জাভিয়ানের পাথুরে হৃদয়ে এক প্রবল জোয়ার আছড়ে পড়ল। বাইরে তখন পুলিশের বুটের শব্দ ক্রমশ এগিয়ে আসছে, গুহার মুখে ইভানের বাহিনীর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। জাভিয়ান তান্বীর হাতটা আর ছাড়াল না, বরং নিজের শক্ত গ্রিপে তান্বীর হাতটা লক করে ফেলল।
গুহার সরু, চিপা প্যাসেজের অন্ধকার চিরে হঠাৎ দুটি তীব্র ফ্ল্যাশলাইটের আলো এসে পড়ল জাভিয়ান আর তান্বীর মুখের ওপর। সেই আলোর পেছনেই কালো ট্যাকটিক্যাল গিয়ার পরা ইন্টারপোলের দুই মেক্সিকান পুলিশ অফিসার তাদের হাতের রিভলভার সরাসরি তাক করল জাভিয়ানের বুক বরাবর। “হ্যান্ডস আপ, মিস্টার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী! ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু মুভ!” এক অফিসার স্প্যানিশ টোনে ইংরেজিতে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু অফিসারটির আঙুল ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগেই, এক ক্ষিপ্রতায় তান্বী নিজের শরীরটাকে মেলে দিয়ে জাভিয়ানের ঠিক সামনে এসে দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। সে নিজের দু হাত দুপাশে প্রসারিত করে জাভিয়ানকে সম্পূর্ণ আড়াল করে নিল। অফিসারটি তান্বীকে আচমকা সামনে দেখে নিজের রিভলভার কিছুটা নামিয়ে ক্রুদ্ধ গলায় বলল, “ম্যাডাম! আপনি সরে যান প্লিজ! ও একজন ইন্টারন্যাশনাল কয়েদি, ওনাকে আমাদের হাতে তুলে দিন। সরে না দাঁড়ালে আমরা গুলি করতে বাধ্য হবো!”
জাভিয়ান তান্বীর কাঁধ ধরে তাকে পেছনে টানার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বলল, “তান্বী, পাগলামি করো না! তুমি সরে যাও আমার সামনে থেকে…”
“না, আমি সরব না!” তান্বী অফিসারদের দিকে তাকিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে কেঁদে উঠে বলল, “আমি আপনাদের হাত জোড় করছি… প্লিজ আমার জাভিয়ানকে ছেড়ে দিন! ও কোনো অপরাধ করেনি, ওকে নিয়ে যেতে দেব না আমি!”
দ্বিতীয় পুলিশ অফিসারটি তান্বীর এই আকুলতা দেখে কিছুটা নরম হয়ে বোঝানোর সুরে বলল, “ম্যাম, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড! সরে আসুন প্লিজ। ওপর মহলের ক্লিয়ার অর্ডার আছে। আমরা কোনো নিরপরাধ মানুষকে মারতে চাই না, তাই দয়া করে ওনার সামনে থেকে সরে দাঁড়ান।”
তান্বীর চোখ দিয়ে তখন অশ্রু ঝরছিল ঠিকই, কিন্তু তার কণ্ঠস্বরে ছিল এক পাথুরে জেদ। সে অফিসারদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সিংহের মতো গর্জে উঠল—”আমি এক চুলও সরব না! গুলি যদি চালাতেই হয়, তবে আগে আমাকে শুট করুন! আমার বুক ঝাঁঝরা করে তারপর আমার স্বামীর গায়ে হাত দেবেন। আমার চোখের সামনে, আমি বেঁচে থাকতে আপনারা আমার স্বামীকে ছুঁতেও পারবেন না!”
মেক্সিকোর সেই চিপা গুহার ভেতরে এক বাঙালি মেয়ের এই রুদ্রমূর্তি দেখে দুই সশস্ত্র পুলিশ অফিসারও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারা বুঝতে পারল, এই মেয়েকে জীবিতাবস্থায় জাভিয়ানের থেকে আলাদা করা অসম্ভব।
অফিসার দুজন যখন তান্বীকে জোর করে সরিয়ে জাভিয়ানকে হ্যান্ডকাফ পরানোর জন্য ধীরপায়ে আরও কাছে এগিয়ে আসতে চাইল, ঠিক তখনই তান্বী ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের জাভিয়ানের দিকে তাকাল।বিকেলের আবছা আলো আর ফ্ল্যাশলাইটের মিশ্রণে তান্বীর সেই চোখের ইশারা জাভিয়ান এক পলকে বুঝে নিল। সেই ইশারায় কোনো ভয় ছিল না, ছিল না কোনো বিদায়ের করুণ সুর; তাতে ছিল শুধু এক অনাবিল শান্তি আর একসাথে অনন্তকালের পথে পা বাড়ানোর এক গোপন চুক্তি। “আই লাভ ইউ, জাভিয়ান…” তান্বী ফিসফিস করে বলল। “আই লাভ ইউ টু, জিন্নীয়া…” জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিজয়ী হাসি।
পুলিশ অফিসাররা কিছু বুঝে ওঠতে পারলেন না, ট্রিগারে চাপ দেওয়ার এক ভগ্নাংশ সময় আগেই তান্বী এক ঝটকায় ঘুরে জাভিয়ানকে তার পুরো অস্তিত্ব দিয়ে, সমস্ত শক্তি দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। জাভিয়ানও তার হাতজোড়া দিয়ে তান্বীকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। আর ঠিক তার পরের মুহূর্তেই, দুই পুলিশ অফিসারের চোখের সামনে দিয়ে—হাত ধরাধরি করে নয়, বরং একে অপরের বুকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে তারা গুহার পেছনের সেই শত ফুট গভীর, কুয়াশাচ্ছন্ন ঝরনার খাদের দিকে শূন্যে ঝাঁপ দিল!
“নো! স্টপ!” পুলিশ অফিসার দুজন গগনবিদারী চিৎকার করে খাদের কিনারার দিকে ছুটে গেল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মেক্সিকোর সেই তীব্র গতিতে আছড়ে পড়া জলপ্রপাতের সাদা ফেনার মাঝে, ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা সেই অতল খাদের অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল মেক্সিকোর সেই একচ্ছত্র সম্রাট ‘নাইট রেভেন’ আর তার শেষ নিঃশ্বাসের কবচ তার ভালোবাসা তার ‘জিন্নীয়া’ বাইরে তখনো ইন্টারপোলের হেলিকপ্টার ঘুরছে, ইভানের বাহিনী গুহার দিকে ছুটে আসছে,কিন্তু এই পৃথিবীর সব ক্ষমতা, সব টাকা, সব মাফিয়া সাম্রাজ্য আর আইনের বেড়াজালকে এক তুড়িতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জাভিয়ান আর তান্বী ততক্ষণে এমন এক দেশে পাড়ি জমিয়েছে, যেখানে তাদের আলাদা করার সাধ্য স্বয়ং মেইলস্ট্রেমেরও নেই।
ইন্টারপোলের ব্ল্যাকহক হেলিকপ্টারগুলোর ঠিক পাশেই উড়ছিল ইভানের ব্যক্তিগত একটি কুচকুচে কালো হেলিকপ্টার। তান্বীকে নিজের খাঁচায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ইভান নিজেই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার দিয়ে গুহার ভেতরের প্রতিটা ইঞ্চি স্ক্যান করছিল। আর ঠিক তখনই, তার চোখের সামনে ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ফ্ল্যাশলাইটের আলোর নিচে তার তান্বী তার সেই সোলফ্লেম যাকে পাওয়ার জন্য সে নিজের মা ভাইকে খুন করেছে, নিজের পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড সাম্রাজ্য বাজি ধরেছে সে কি না ওই অভিশপ্ত জাভিয়ানের বুকে জড়িয়ে ধরে ঝরনার অতল খাদের দিকে শূন্যে ঝাঁপ দিল!
“তান্বীইইইইই…” হেলিকপ্টারের ইঞ্জিনের কানফাটানো শব্দকে ছাপিয়ে ইভানের গলা দিয়ে এক বন্য পশুর মতো চিৎকার বেরিয়ে এল। তার চোখের মণি দুটো এক লহমায় রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, মাথার সমস্ত শিরা উপশিরা রাগে আর অবিশ্বাসে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। জাভিয়ানের সাথে তান্বীর এই আত্মাহুতি সে নিজের সুস্থ মস্তিষ্কে মেনে নিতে পারল না। ইভান সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেল। সে কোনো কিছু না ভেবেই চলন্ত হেলিকপ্টারের খোলা দরজা দিয়ে তান্বীকে বাঁচানোর জন্য, কিংবা তান্বীর সাথে মরার জন্যই খাদের দিকে ঝাঁপ দিতে গেল!
“বস! পাগল হয়েছেন?! মরে যাবেন!” ঠিক শেষ মুহূর্তে ইভানের প্রধান বডিগার্ড আর পাইলট একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইভানের কোমর আর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তারা তাকে টেনে ভেতরের মেঝের দিকে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ইভানের ভেতরের সাইকো প্রেমিক তখন এক হিংস্র দানবে পরিণত হয়েছে। সে কনুই দিয়ে বডিগার্ডের মুখে আঘাত করল, লাথি মারল, পাগলের মতো ছটফট করতে করতে বাতাসের বুকে হাত বাড়িয়ে চিত্কার করতে লাগল—”ছেড়ে দে আমাকে! তোরা তোদের এই জানোয়ারের হাত সরা আমার ওপর থেকে! তান্বী… তুমি জাভিয়ানের হতে পারো না! তুমি শুধু আমার… আমার! আমি তোমাককে মরতে দেব না! বাস্টার্ড ল্যান্ড কর জেট… ল্যান্ড কর বলছি!”
হেলিকপ্টারের মেঝেতে পড়ে ইভান যেভাবে ছটফট করছিল, তা কোনো মাফিয়া কিং এর রূপ ছিল না; তা ছিল এক সর্বহারা, পরাজিত পিশাচের শেষ আর্তনাদ। যাকে ভালোবেসে সে পেতে চেয়েছিল, সে নিজের পবিত্রতা রক্ষায় মৃত্যুর কোল বেছে নিল, তবুও ইভানের হলো না।এদিকে, কপার ক্যানিয়নের সেই পাহাড়ি নদীর ঠিক নিচের পাড়ে, পাথুরে রাস্তার ওপর টায়ার লাইনের কর্কশ শব্দ তুলে এসে থামল রায়হানের ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটি।
গাড়ির দরজা খুলে রায়হান যখন মাত্র নামল, তখনই ওপরের খাদের দিকে তাকিয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গেল। ইন্টারপোলের অফিসারদের চিৎকার আর ঝরনার তীব্র ফেনার মাঝে সে পরিষ্কার দেখতে পেল—তার স্যার আর তান্বী একসাথে খাদের তীব্র স্রোতে তলিয়ে গেল। রায়হানের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা ছিল একটি ব্ল্যাক এনক্রিপ্টেড পেনড্রাইভ আর কিছু আইনি নথিপত্র। তার চোখের চশমাটা তীব্র কষ্টে কেঁপে উঠল। সে স্তব্ধ হয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কারণ… সে বড্ড দেরি করে ফেলেছে! পেনড্রাইভটার ভেতরে ছিল সেই মোক্ষম প্রমাণ—যেখানে মার্কো আর মেইলস্ট্রোমের কথোপকথনের রেকর্ড আর পাসকোড হ্যাক করার প্রমাণ। এই একটা প্রমাণ আদালতের সামনে আনলে ইন্টারপোল আর মেক্সিকান পুলিশ এক সেকেন্ডে জাভিয়ানের ওপর থেকে সব হুলিয়া তুলে নিতে বাধ্য হতো। প্রমাণ হয়ে যেত—জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী সম্পূর্ণ নিরপরাধ, তাকে এই ইন্টারন্যাশনাল কেসে বেইমানি করে ফাঁসিয়েছে মেইলস্ট্রোম আর মার্কো! রায়হান তার স্যারের সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য, তাঁকে আবার মেক্সিকোর রাজসিংহাসনে বসানোর জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে এই পরম সত্য জোগাড় করে এনেছিল। কিন্তু আজ যখন প্রমাণ হাত তৈরি, তখন সেই প্রমাণ দেখার জন্য সিংহ আর বেঁচে নেই। সে তার ভালোবাসার হাত ধরে এই পৃথিবীর সব নোংরামি থেকে দূরে, খাদের অতল গভীরে হারিয়ে গেছে।
রায়হান পেনড্রাইভটা হাতের মুঠোয় এত শক্ত করে চাপল যে তার আঙুলের চামড়া কেটে রক্ত বের হতে চাইল। সে ওপরের আকাশে উড়তে থাকা ইভানের হেলিকপ্টারের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই চেনা শান্ত চাউনিটা এক নিমেষে বদলে গিয়ে সেখানে জমা হলো এক ভয়ঙ্কর,প্রতিজ্ঞা। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল—”স্যার… আপনি আপনার জিন্নীয়াকে নিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু এই রায়হান এখনো বেঁচে আছে। আপনার এই অপমানের বদলা আমি ইভানের বংশের রক্ত দিয়ে চুকাবো। মেইলস্ট্রোমের এই সাম্রাজ্য আমি নিজের হাতে কবর দেব!”
হাতের মুঠোয় সেই মোক্ষম প্রমাণের পেনড্রাইভটা নিয়ে রায়হান যখন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তখনই তার পেছনের গাড়ির দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এল মিলা। এতক্ষণ সে গাড়ির ভেতরে বসেই ল্যাপটপে রায়হানের আনা এভিডেন্সগুলো ইন্টারপোলের মেইন সার্ভারে পাঠানোর শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু রায়হানকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিলা নিজেও অবাক হয়ে ছুটে এলো। রায়হান আজীবন নিজেকে এক আবেগহীন, পাথুরে মানুষ হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সামনে দাঁড় করিয়ে এসেছে। জাভিয়ানের প্রতিটা বিপদে, প্রতিটা হুকুমে সে চশমার আড়ালে নিজের চোখ দুটোকে সবসময় বরফের মতো ঠান্ডা রেখেছে। কিন্তু আজ… আজ তার সেই বর্ম এক নিমেষে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
পাহাড়ের সেই ধারালো, শক্ত পাথুরে মেঝের ওপর রায়হান নিজের দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার হাতের মুঠো থেকে পেনড্রাইভটা মাটিতে ছিটকে পড়ে গেল। যে মানুষটা কোনোদিন মরণঘাতী বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েও এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি, সে আজ মেক্সিকোর এই নির্জন প্রান্তরে এক অবোধ শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।
তার চশমাটা চোখ থেকে খসে পাথরের ওপর পড়ে
গেল। দুই হাতে নিজের মুখটা চেপে ধরে রায়হান বুকফাটা গলায় চিত্কার করে বলতে লাগল—”আমি পারলাম না মিলা… আমি বড্ড দেরি করে ফেললাম! স্যারকে আমি বাঁচাতে পারলাম না! উনি নিরপরাধ, উনি কোনো বেইমানি করেননি—এই সত্যটা দুনিয়ার সামনে প্রমাণ করার আগেই উনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেলেন! কার জন্য আমি এই প্রমাণ খাটাবো মিলা?” রায়হানের এই আর্তনাদ ঝরনার তীব্র গর্জনকেও যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল। তার পুরো শরীর তখন তীব্র কান্নায় কাঁপছিল, চোখের জলে ভিজে যাচ্ছিল মেক্সিকোর সেই ধূসর মাটি। মিলার নিজের চোখের কোণ দিয়েও তখন নোনা জল গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে রায়হানের এই চরম ভেঙে পড়া রূপ সে সহ্য করতে পারল না। সে খুব ভালো করেই জানে, রায়হানের জীবনে জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী কেবল একজন বস ছিলেন না, ছিলেন তার বেঁচে থাকার একমাত্র ভিত্তি।
মিলা আর এক সেকেন্ডও দ্বিধা করল না। সে রায়হানের ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। নিজের দুটো নরম হাত বাড়িয়ে সে রায়হানের সেই কাঁপতে থাকা চওড়া কাঁধ দুটো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রায়হানের মাথাটা আলতো করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে, তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মিলা অত্যন্ত ভেজা কিন্তু শক্ত গলায় বলতে লাগল—”শান্ত হও রায়হান… প্লিজ নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেলো না! হাত জোড় করছি তোমার কাছে, শান্ত হও।”
মিলা নিজের ওড়না দিয়ে রায়হানের চোখের জল মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল—
“তুমি তো সম্রাটের বিশ্বস্ত সেনাপতি, রায়হান! তুমি যদি আজ এভাবে ভেঙে পড়ো, তবে জাভিয়ান ভাইয়ার এই অপমানের বদলা কে নেবে? মেইলস্ট্রোমের সেই কুৎসিত মাফিয়া সাম্রাজ্য কে ধ্বংস করবে? এই পেনড্রাইভের প্রমাণ দিয়ে আমাদের এখনো ওই মেইলস্ট্রোমের মুখোশ পুরো দুনিয়ার সামনে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হবে। জাভিয়ান ভাইয়ার আত্মার শান্তির জন্য হলেও তোমাকে এখন শক্ত হতে হবে, রায়হান। আমি আছি তোমার পাশে… আজীবন থাকব।” মিলার এই গভীর, উষ্ণ সান্ত্বনার পরশ আর তার বুকের আশ্রয় রায়হানের ভেতরের সেই তীব্র কান্নার আবেগকে আস্তে আস্তে এক ভয়ানক বারুদে রূপ দিতে লাগল।
রায়হান মিলার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখের সেই চেনা শান্ত চিলতে চাউনিটা এবার এক চরম খুনে প্রতিজ্ঞায় রূপ নিল। ওপরের আকাশে তখনো ইভানের হেলিকপ্টার উন্মাদের মতো ঘুরছিল। রায়হান সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে মিলার হাতটা ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তুমি ঠিক বলেছ মিলা। স্যার আর তার ভালোবাসা যেখানেই থাকুক শান্তিতে থাকুক। কিন্তু এই মেক্সিকোর মাটিতে আজ থেকে মেইলস্ট্রোমের জন্য কোনো শান্তি অবশিষ্ট নেই। ওর ধ্বংসের চ্যাপ্টার এবার আমি নিজে লিখব।”
রায়হানের এনে দেওয়া সেই অকাট্য প্রমাণের পেনড্রাইভ এবং লিগ্যাল ডকুমেন্টস যখন ইন্টারপোল আর মেক্সিকান ফেডারেল কোর্টের সামনে পেশ করা হলো, তখন পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভূমিকম্প হয়ে গেল। আদালতের ডকে দাঁড়িয়ে জজ সাহেব রায় দিলেন—*জাভিয়ান চৌধুরী সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তাকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছিল। আর মেইলস্ট্রোম ওরফে ইভানই হলো এই পুরো অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল হোতা।* এরই মধ্যে পুলিশ কপার ক্যানিয়নের জঙ্গল থেকে মার্কোর লাশ উদ্ধার করে। ফরেনসিক রিপোর্টে প্রমাণিত হয়, মার্কোর কপালে লাগা বুলেটটি ইভানের নিজস্ব গোল্ডেন রিভলভার থেকে বের হওয়া। কিন্তু ইভানকে গ্রেফতার করতে পুলিশের কোনো বেগ পেতে হয়নি। তান্বীকে নিজের চোখের সামনে খাদের গভীরে হারিয়ে যেতে দেখে ইভান ততক্ষনে সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এক জ্যান্ত পাগলে রূপ নিয়েছিল। তান্বীর শোকের উন্মাদনায় সে এখন তার স্ট্রোমহাউজে অন্ধকার সেলে পড়ে আছে। তার পাপের সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে গেছে।
ঝরনার সেই মরণঘাতী ঝাঁপ দেওয়ার ঠিক একদিন পরের কথা। কপার ক্যানিয়নের শত ফুট নিচে বয়ে যাওয়া আদিম নদীর এক শান্ত, জনমানবহীন কিনারায় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঠান্ডা জলের ঝাপটায় নদীর চরে জমে থাকা বালির ওপর ধীরে ধীরে নড়ে উঠল একটা হাত। তীব্র যন্ত্রণায় চোখ মেলল জাভিয়ান। তার মাথায়, পিঠে, সারা শরীরে তখন ক্ষতবিক্ষত আঘাত। কিন্তু জ্ঞান ফিরে আসার এক ভগ্নাংশ সময়ের মাঝেই তার মগজে আছড়ে পড়ল কাল রাতের সেই শেষ স্মৃতি—জিন্নীয়া!
“তান্বীইইই…!”জাভিয়ান নিজের দুর্বল শরীর নিয়ে বালি থেকে হড়বড় করে উঠে দাঁড়াল। সে পাগলের মতো, হন্যে হয়ে নদীর কিনারা ধরে টলমল পায়ে ছুটতে লাগল। তার চোখ দুটো তখন তীব্র আতঙ্কে কাঁপছে। সে চিৎকার করে চারদিকের জঙ্গল কাঁপিয়ে ডাকতে লাগল, কিন্তু বনের প্রতিধ্বনি ছাড়া কোনো জবাব এল না। ছুটতে ছুটতে প্রায় আধ মাইল দূরে, নদীর এক বাঁকে একটা বিশাল কালচে পাথরের ওপর জাভিয়ানের চোখ থমকে গেল। সেখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে তান্বীর নিথর শরীর। তার মাথার একপাশটা খাড়া পাথরের সাথে লেগে ফেটে গেছে, আর সেই ক্ষত থেকে ফিনকি দিয়ে বের হওয়া তাজা রক্তে নদীর ঠান্ডা জল লাল হয়ে ভেসে যাচ্ছে। “না… না খোদা! এটা তুমি করতে পারো না!” জাভিয়ান পাগলের মতো ছুটে গিয়ে তান্বীকে নিজের বুকের মাঝে তুলে নিল। তান্বীর শরীর তখন বরফের মতো ঠান্ডা, কোনো হৃদস্পন্দন নেই, পালস পাওয়া যাচ্ছে না। জাভিয়ান আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে তান্বীর ভেজা অবিন্যস্ত চুলগুলো সরিয়ে নিজের মুখটা তান্বীর মুখের সাথে লাগাল। নিজের ফুসফুসের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে সে তান্বীর মুখে কৃত্রিম নিঃশ্বাস (CPR) দিতে শুরু করল।
“ওঠো জিন্নীয়া… প্লিজ চোখ খোলো! তুমি আমাকে এভাবে ফেলে যেতে পারো না!” জাভিয়ান পাগলের মতো তান্বীর পেটে দুই হাত দিয়ে চাপ দিতে লাগল, আর অনবরত মুখে মুখ লাগিয়ে নিজের ভেতরের শেষ প্রাণটুকু তান্বীর শরীরে ঢেলে দিতে লাগল। হঠাৎ করেই এক বুক জল উগরে দিয়ে তান্বীর শরীরটা কেঁপে উঠল। সে ফুসফুস ভরে এক দীর্ঘ বাতাস টেনে নিয়ে অত্যন্ত ধীর গতিতে তার সেই ঝাপসা চোখ দুটো মেলল। ভোরের আলোর মাঝে নিজের সামনে জাভিয়ানের সেই চেনা রক্তাক্ত, উদ্বিগ্ন মুখটা দেখে তান্বী ভাঙা, দুর্বল গলায় ফিসফিস করে বলল—”কোথায়… আমার জাভিয়ান কোথায়? আমরা… আমরা কি সত্যি বেঁচে আছি? নাকি আমরা মরে গেছি?”
জাভিয়ান তান্বীকে নিজের বুকের সাথে এত শক্ত করে পিষে ধরল যে তার নিজের চোখের জল তান্বীর গালে এসে পড়ল। সে বুঁজে আসা গলায় বলল, “হ্যাঁ তান্বী… আমরা বেঁচে আছি। আমি এতটাই অভিশপ্ত, এতটাই পাপী যে আল্লাহ বোধহয় আমাকে এত সহজে তাঁর নিজের কাছে নিতে চাননি। আমার এই পাপের ছায়া তোমাকেও মরতে দিল না।”
তান্বী নিজের কাঁপতে থাকা দুর্বল হাতটা কষ্ট করে ওপরে তুলে জাভিয়ানের ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। সে একটা পরম তৃপ্তির হাসি হেসে বলল—”চুপ করো জাভিয়ান! একদম আর একটাও এসব বাজে কথা বলবে না। হয়তো আল্লাহ চেয়েছেন তুমি আর আমি একসাথে আরও কটা দিন বাঁচি। এই পৃথিবীর কেউ আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দেয়নি। কিন্তু দেখো, এখন আমরা সারা দুনিয়ার কাছে মৃত। পুলিশ, ইন্টারপোল, ইভান কেউ আর আমাদের খুঁজবে না। মেক্সিকোর এই গভীর জঙ্গলেই আমরা আমাদের একটা ছোট সুন্দর সংসার বানাবো… যেখানে কোনো ডার্ক ওয়ার্ল্ড থাকবে না, কোনো মাফিয়া থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি থাকব। কেমন হবে বলো, জাভিয়ান?”
জাভিয়ান তান্বীর কপালে নিজের ঠোঁটটা ছুঁইয়ে তার চোখ দুটো মুছে দিল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক নতুন সমুদ্র। সে তান্বীকে আলতো করে পাঁজকোলা করে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বনের ভেতরের এক নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল—”সব হবে জিন্নীয়া, তোমার ওই ছোট সংসার আমি নিজের হাতে সাজাবো। কিন্তু তার আগে তোমাকে সুস্থ করতে হবে। মাথা থেকে অনেক রক্ত বেরিয়েছে তোমার।” হঠাৎ তান্বীর দেহে নিথর হয়ে আসতে লাগলো। জাভিয়ান তান্বীকে নিয়ে বসে পড়লো।
“তান্বী! চোখ খোলো জিন্নীয়া! এই তো আমি… তোমার জাভিয়ান!” জাভিয়ান পাগলের মতো তান্বীর গালে চাপড়াতে লাগল, কিন্তু তান্বীর শরীরটা আবার নিথর হয়ে একপাশে হেলে পড়ল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ চোখ এক সেকেন্ডে পরিস্থিতি বুঝে নিল—মেক্সিকোর এই জঙ্গলে কোনো জাদুমন্ত্রে তান্বী সুস্থ হবে না। এই মুহূর্তে যদি তাকে কোনো বড় হসপিটালে নিয়ে প্রপার ট্রিটমেন্ট না দেওয়া যায়, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার জিন্নীয়া আজই তাকে ছেড়ে চিরতরে চলে যাবে।
জাভিয়ানের নিজের শরীরে তখন তীব্র জ্বর, পিঠের চামড়া ছিলে রক্ত বের হচ্ছে, পা দুটো কাঁপছে অবসাদে। কিন্তু তার ভেতরের প্রেমিক আজ এক অলৌকিক শক্তিতে জেগে উঠল। দুনিয়ার কাছে মৃত থাকার সেই পরম স্বাধীনতা, সেই নতুন সংসারের স্বপ্ন সব এক সেকেন্ডে বিসর্জন দিল সে। সে মনে মনে বলল, “খোদা! আমার জিন্নীয়াকে বাঁচানোর জন্য যদি আমাকে আবার ওই নরক আলতিপ্লানো জেলেই ফিরে যেতে হয়… যদি ইন্টারপোলের ক্রসফায়ারের সামনেও দাঁড়াতে হয়, আমি রাজি! শুধু আমার তান্বীকে ফিরিয়ে দাও।”
জাভিয়ান পুনরায় নিজের সমস্ত শক্তি এক করে তান্বীর রক্তাক্ত দেহটাকে শক্ত করে নিজের পাঁজকোলা করে কোলে তুলে নিল। ঝর্নার পিচ্ছিল পাথর আর বুনো লতাপাতা মাড়িয়ে সে খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। প্রতিটা পদক্ষেপে তার মনে হচ্ছিল হাড়গুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে, ফুসফুস ছিঁড়ে বাতাস বেরিয়ে আসছে, কিন্তু তার কোল ঘেঁষে থাকা তান্বীর নিস্পন্দ শরীরটা তাকে এক পাও থামতে দিল না। প্রায় এক ঘণ্টার এক মরণপণ লড়াই শেষে, জাভিয়ান অবশেষে জঙ্গল পার হয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে যাওয়া একটা নির্জন, সরু কাঁচা রাস্তার মুখে এসে দাঁড়াল।
রাস্তাটা একদম জনমানবহীন। দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনো গাড়ির হদিস নেই। জাভিয়ান তান্বীকে রাস্তার পাশে একটা ঘাসের ওপর শুইয়ে দিয়ে নিজে মাঝরাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো তখন বন্য পশুর মতো চাতক পাখির দৃষ্টিতে গাড়ির খোঁজ করছে। বাতাসে উড়ছে তার ধুলো আর রক্তে মাখা শার্ট।
ঠিক তখনই, বহুদূর থেকে একটা পুরোনো পিকআপ ভ্যানের ইঞ্জিনের আওয়াজ কুয়াশা চিরে ভেসে এল। একটা মেক্সিকান লোকাল চাষী তার ভ্যান নিয়ে শহরের দিকে যাচ্ছিল। জাভিয়ান দুই হাত ওপরে তুলে পাগলের মতো গাড়িটা থামানোর ইশারা করতে লাগল। মেক্সিকোর এই বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তায় এভাবে একটা রক্তাক্ত, দুর্ধর্ষ অবয়বের মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চালক প্রথমে ভয় পেয়ে ব্রেক চেপে গাড়িটা থামিয়ে দিল। সে ভয়ে গাড়ি থেকে নামল না, কেবল জানলা দিয়ে এক হাতে নিজের রিভলভারটা উঁচিয়ে স্প্যানিশ ভাষায় চেঁচিয়ে বলল, “কে তুমি? রাস্তা থেকে সরো!”
নাইট রেভেন—যার এক ইশারায় মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপত, সে আজ সেই অচেনা চাষীর সামনে দুই হাত জোড় করে রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে স্প্যানিশ ভাষায় ভাঙা গলায় আর্তি জানিয়ে বলল—”দয়া করে রিভলভার নামান ভাই! আমি কোনো ডাকাত নই। ওপাশে দেখুন… আমার স্ত্রী মরে যাচ্ছে! ওর মাথায় প্রচণ্ড চোট লেগেছে, প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমি আপনার পায়ে পড়ছি, আমাদের শহরের যেকোনো একটা হসপিটালে পৌঁছে দিন। আপনার এই ঋণ আমি সারাজীবন শোধ করতে পারব না!”
ভ্যানের চালক জাভিয়ানের চোখের সেই চরম আকুলতা আর রাস্তার পাশে পড়ে থাকা তান্বীর রক্তাক্ত, অসহায় রূপ দেখে থমকে গেল। মেক্সিকোর এই অন্ধকার সাম্রাজ্যর বুকেও হয়তো এখনো কিছুটা মনুষ্যত্ব বেঁচে ছিল। চালক দ্রুত রিভলভারটা পকেটে পুরে গাড়ি থেকে নেমে এল।
“তাড়াতাড়ি করো! ওনাকে গাড়ির পেছনের সিটে তোলো!” চালক চিত্কার করে বলল। জাভিয়ান এক লহমায় তান্বীকে আবার কোলে তুলে নিয়ে ভ্যানের পেছনের সিটে শুইয়ে দিল এবং নিজে তার মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। ভ্যানের চালক সজোরে এক্সিলারেটরে চাপ দিতেই গাড়িটি তীব্র গতিতে ছুটে চলল মেক্সিকো সিটির মেইন হসপিটালের দিকে। জাভিয়ান তান্বীর কপালে নিজের হাতটা রেখে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকাল। সে জানে, হসপিটালে পৌঁছানো মাত্রই ডক্টররা পুলিশকে ইনফর্ম করবে, আর ইন্টারপোল এক সেকেন্ডে চিনে নেবে যে সে ‘নাইট রেভেন’। হাতকড়া আর অন্ধকার সেল তার জন্য অপেক্ষা করছে, কিন্তু জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত শান্তি। তার জিন্নীয়া তো বেঁচে যাবে! এর চেয়ে বড় রাজত্ব তার আর চাই না।
ইন্টারপোলের চিফ কমান্ডো যখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে বসে আছেন, তখন তাঁর টেবিলের ওপর এসে পড়ল মেক্সিকোর ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে ডার্ক সিক্রেটগুলো। আর এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানটি রায়হান কীভাবে সাজিয়েছিল, তা এক এক করে উন্মোচিত হতে লাগল। ইভানের মা মাফিয়া কুইন ইসাবেলা মোরেলাস বহু আগে থেকেই জানত তার ছেলে মেইলস্ট্রোম কতটা সাইকো আর হিংস্র। সে খুব ভালো করেই জানত, ইভান তান্বীর উন্মাদনায় একদিন জাভিয়ানের চরম ক্ষতি করবে এবং চৌধুরী বংশকে ধ্বংস করে দেবে। তাই নিজের ছেলেকে বাঁচাতে না পারলেও, আন্ডারওয়ার্ল্ডে টিকে থাকার জন্য ইসাবেলা ইভানের করা অতীতেরই অনেকগুলো কু-কর্ম, অবৈধ ড্রাগ ডিল আর মার্ডারের এভিডেন্স নিজের সেফে লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু সে জানত না, ভিলা এস্পেরেন্জার প্রতিটি ইঞ্চির ওপর কার নজর ছিল। জাভিয়ানের পারফেক্ট সেক্রেটারি রায়হান অনেক আগেই ইসাবেলার সেই গোপন হদিস পেয়ে যায় এবং অত্যন্ত চতুরতার সাথে সেই সমস্ত ডেটা নিজের আন্ডারে কালেক্ট করে রেখেছিল। রায়হান শুধু অপেক্ষা করছিল সঠিক সময়ের যখন সে ইভানকে এক চালের মাত দেবে! আসলে, জাভিয়ান যেদিন আলতিপ্লানো জেল থেকে বের হয়, সেদিন থেকেই রায়হান তার মিশন শুরু করে দিয়েছিল। সে প্রথমেই মার্কোর প্রতিটা পদক্ষেপের ওপর নজর রাখছিলো এবং চতুরতার সাথে মার্কোর ব্যক্তিগত গাড়িতে একটি আনট্র্যাসেবল ট্র্যাকিং চিপ বসিয়ে দেয়।
সেই চিপের সিগন্যাল ট্র্যাক করেই রায়হান সেদিন সরাসরি পৌঁছে গিয়েছিল ইভানের সেই গোপন পেন্টহাউসে! যখন ফার্মহাউসের সাইরেন বেজে ওঠে এবং ইভান ও মার্কো পাগলের মতো তান্বীকে খুঁজতে হন্যে হয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, ঠিক তখনই রায়হান অন্ধকারের ছায়া হয়ে পেন্টহাউসের ভেতরে প্রবেশ করে। সে ভেতরে ঢুকেই সবচেয়ে বড় কাজটা করে—পেন্টহাউসের ইন্টারনাল সার্ভার হ্যাক করে বেডরুমের সিসিটিভি ক্যামেরা ফুটেজ নিজের পেনড্রাইভে কপি করে নেয়। যে ফুটেজে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল যে তান্বী ইভানের বিছানায় নিজের ইচ্ছায় যায়নি, বরং জাভিয়ানকে বাঁচানোর জন্য সে ইভানের শর্তে বন্দি ছিল এবং কেঁদে যাচ্ছিল! সেই সাথে মার্কোর সাথে ইভানের সব কথপকথনের ফুটেজ।
শুধু তাই নয়, রায়হান ইভানের পার্সোনাল ল্যাপটপটি অন করে সেখান থেকে সার্ভার হ্যাকিংয়ের সমস্ত মেলওয়্যার কোড, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট আর হ্যাকিং হিস্ট্রি এক নিমিষে ডাউনলোড করে নেয়। যা প্রমাণ করে—জাভিয়ান নিজে থেকে কোড দেয়নি। মার্কো আর ইভানের চক্রান্ত ছিলো সব।
কপার ক্যানিয়নের খাদের পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন রায়হান মিলার বুকে কেঁদে উঠেছিল, তার পরদিনই সে আর মিলা মিলে এই নিখুঁত চেইন অফ এভিডেন্স ইন্টারপোল আর মেক্সিকান ফেডারেল কোর্টের মেইন সার্ভারে ডাম্প করে দেয়।
ইসাবেলার সেই পুরোনো এভিডেন্স, মার্কোর ট্র্যাকিং হিস্ট্রি, পেন্টহাউসের সিসিটিভি ফুটেজ আর ল্যাপটপের হ্যাকিং ডেটা—সব যখন ইন্টারপোলের সামনে একসাথে ওপেন হলো, তখন জজ সাহেবের আর বুঝতে বাকি রইল না যে আসল কালপ্রিট কে। যে ইভান তান্বীর শোকে পাগল হয়ে যাচ্ছিল, এই এভিডেন্স সাবমিট হওয়ার ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় ইন্টারপোলের এক বিশাল আর্মার্ড স্কোয়াড এসে ইভানের হাউজের চারপাশ ঘিরে ফেলে। ইভানের হাতের গোল্ডেন রিভলভার কেড়ে নিয়ে, তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণিত ও দাগী মাফিয়া হিসেবে অফিশিয়ালি হ্যান্ডকাফ পরিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় মেক্সিকোর সবচেয়ে সুরক্ষিত আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে।
ইন্টারপোলের চিফ নিজে প্রেস কনফারেন্সে ঘোষণা করেন “মিস্টার জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তাঁর ওপর থাকা সমস্ত আইনি হুলিয়া এবং রেড নোটিশ এই মুহূর্ত থেকে প্রত্যাহার করা হলো।”
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৪৮
এদিকে, পিকআপ ভ্যানের পেছনের সিটে তান্বীর মাথাটা নিজের কোলের ওপর ধরে রাখতে রাখতে জাভিয়ান দেখল—হসপিটালের বিশাল ইমার্জেন্সি গেটটা তাদের সামনে এসে গেছে। জাভিয়ান তখনও জানে না যে রায়হান অলরেডি তাকে এই পৃথিবীর বুকে আবার স্বাধীন রাজা বানিয়ে দিয়েছে। সে কেবল তান্বীকে কোলে তুলে নিয়ে হসপিটালের ভেতরের দিকে দৌড়াতে শুরু করল, তার চোখে তখন কেবলই তার জিন্নীয়াকে বাঁচানোর এক পরম আকুতি!
