Home ডেসটেনি ডেসটেনি পর্ব ৩২

ডেসটেনি পর্ব ৩২

ডেসটেনি পর্ব ৩২
সুহাসিনি মিমি

“তা পাভেল, অনেক তো হলো। এবার বলো তো, আমাদের মেয়েটাকে আমাদের বাড়িতে কবে পাকাপাকিভাবে দিয়ে দিচ্ছো? আমরা তো আর অপেক্ষা করতে পারছি না!”
প্রিয়ন্তী উপর থেকে তখন বাধ্য মেয়ের মতোই এসে বসেছে ভাবীর পাশে। আর সরেনি একটুর জন্যও। আপাতত সবাই ওরা ডাইনিংয়ে বসেছে ডিনারে। মস্ত বড় কাচের টেবিলে হরেক রকমের দেশি-বিদেশি পদের বাহার সাজানো। পোলাও, বিফ রেজালা, গলদা চিংড়ির মালাইকারি থেকে শুরু করে থাই সুপ আর বিভিন্ন রকমের সালাদ—কী নেই সেখানে! সুস্বাদু সব খাবারের সুবাসে ডাইনিং রুম ম ম করছে। ​সবাই যার যার আসনে বসার পর অভিরাজের মা পরম আগ্রহে নিজে তদারকি করে সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে লাগলেন। পাভেল আর অভিরাজের বাবার মধ্যে ব্যবসার পাশাপাশি দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে ছোট ছোট আলাপ চলছে। মাঝে মাঝে মিতালীও হেসে সেই আলাপে যোগ দিচ্ছে। অভিরাজ প্লেটে খাবার তুলে নিলেও তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা বারবার গিয়ে থমকে যাচ্ছে প্রিয়ন্তীর উপর।

​প্রিয়ন্তী বসেছে মিতালীর একদম গা ঘেঁষে। প্রথমে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকলেও সবার সঙ্গে মিলিয়ে জোরপূর্বক খাবার মুখে তুলেছিল কিছুটা। অমনি ভদ্রমহিলার কথাটা কর্ণগোচর হতে খাবার চিবানো থামল মেয়েটার। বেশ চনমনে হয়েই প্রশ্নটা করে বসলেন ভদ্রমহিলা। আকস্মিক সরাসরি এহেন প্রশ্নে ভরকালো বুঝি স্বয়ং পাভেল নিজেও। চোখ তুলে তাকাল বোনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গেই চোখাচোখি হলো দুজনের। পাভেল বুঝল বোন তার বেশ শকড হয়েছে। তবে একদিন না একদিন বিষয়টা তো প্রকাশ্যেয় আনতেই হতো। সেসব ভেবেই পাভেল একগাল হেসে জানাল,

“আপনাদের মেয়ে। আপনারা যেদিন ঘরে তুলতে চান। আমার আর এতে কোনো সমস্যা নেই আপাতত!”
বিনা মেঘেই বজ্রপাত হলো কি প্রিয়ন্তীর উপর? ভাবসাবে তো এমনটাই মনে হচ্ছে। ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। দুদিন আগেও কথাটা শুনলে বোধহয় এতটা বিস্মিত হতোনা মেয়েটা। তবে আজ! এসব কি শুনছে ও? প্রিয়ন্তী যথেষ্ট বুঝদার একটা মেয়ে। ভদ্রমহিলার কথার পরিপেক্ষিতে যতটুকু বুঝল, ওর বিয়ের কথাটা বুঝি অনেক আগে থেকেই ঠিক করা ছিল? ওর ভাইও অবগত ছিল এই বিষয়ে? তাহলে ওর ভাই ওকে জানাল না কেন?নাকি কোনো ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখছে?
​পাভেলের সন্তুষ্টমূলক উত্তরে খুশি হলেন বোধহয় অভিরাজের পরিবার।অভিরাজের বাবা গম্ভীর হয়ে যোগ করলেন,

“আসলে পাভেল, এবার আমাদের বিদেশ থেকে হুট করে এই ছুটিতে আসার মূল কারণটাই কিন্তু এটা। আমরা এবার এসেছিই মূলত অভিরাজ আর প্রিয়ন্তীর বিয়ের ডেটটা পাকাপাকি করার জন্য। অনেকদিন তো হলো। আমার ছেলেটাও তো তোমার বোনের জন্য কম অপেক্ষা করল না! এবার শুভ কাজটা আর ফেলে রাখা ঠিক হবে না।”
​প্রিয়ন্তীর মাথাটা কেমন ভো ভো করে উঠল আচানক। আশ্চর্য! দুনিয়াটা এরকম এলোমেলো হয়ে ঘুরছে কেন? নাকি ওর মাথাটাই ঘুরছে? ঘুরে টুরে আবার পরে যাবেনাতো? প্রিয়ন্তী ধরে আসা গলায় কোনোরকম হাত চেপে আশেপাশে যা পেলো সেটাই খামচে শক্ত করে চেপে ধরল। খেয়াল করলোনা ওটা যে মিতালীর শাড়ির আঁচল ছিল।
​সম্পূর্ণ নির্বাক, অসাড় হয়ে প্রথমে আহাম্মকের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকাল নিজের ভাইয়ের দিকে। যে ভাই ওকে কলিজার টুকরোর মতো আগলে রাখতো সেই ভাই ওর অজান্তেই সত্যি সত্যি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে? এরপর বুকভর্তি এক তীব্র আতঙ্ক, তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে তাকাল ওপাশে বসা অভিরাজের বাবা-মায়ের দিকে। উনারা কতটা আনন্দের সাথে ওর জীবনের ভাগ্যলিপি লেখার গল্প করছেন! আহা! অথচ সে নিজেই জানতো না?উপরন্তু কেউ জানলও না, ওর ভাগ্য গতকাল বিকেলেই যে অন্য একজন মানুষের নামে সিলমোহর হয়ে গেছে।

​টেবিলের নিচে মিতালীর শাড়ির আঁচলটা প্রিয়ন্তী এতটাই শক্ত করে খামচে ধরেছে যে ওর অজান্তেই মিতালীর উরুর উপর কিঞ্চিৎ নখ দেবে গেছে।মিতালী অবশ্য খেয়াল করছে সবটা প্রথম থেকেই। ননদের এই ব্যাকুল ছটফটানি আর অবশ হয়ে যাওয়া ভাবটা টের পেলেও মুখ ফুটে কিছু বলল না। একটা দীর্ঘশাস ফেলে মিতালী চট করে টেবিলের আড়ালেই প্রিয়ন্তীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ইশারায় বুঝালো আপাতত স্বাভাবিক থাকতে। ভাবীর দিকে করুন চোখে তাকাল প্রিয়ন্তী। মিতালী জোরপূর্বক সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“আঙ্কেল, আন্টি আপনারা যদি কিছু মনে না করেন, তবে আমি একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
​মিতালীর এই আকস্মিক হস্তক্ষেপে পাভেল অবাক হয়েই চাইলো। অভিরাজের মা বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ মা, বলো না। তোমার আবার মনে করার কী আছে! তুমি তো এই বাড়িরই বড় বউয়ের মতো।”
​ “আসলে আন্টি, আপনারা তো প্রিয়ন্তীকে নিজেদের বাড়ির বউ করে নিতে চাচ্ছেন। এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পার আমাদের জন্য! কিন্তু প্রিয়ন্তীর তো সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। পড়াশোনার এই শেষ ধাপটায় ও এখন প্রচণ্ড প্রেসারে আছে। আমরা চাচ্ছিলাম এই মুহূর্তে ওর মনটা যেন অন্য কোথাও ডাইভার্ট না হয়।”

​স্ত্রীর মুখে এহেন কথায় খিটমিট করে উঠল পাভেলের চোয়াল। খানিকটা দৃঢ় স্বরেই সে স্ত্রীকে থামালো,
“পরীক্ষার সাথে বিয়ের ডেট ঠিক করার কী সম্পর্ক মিতু? ডেট তো আমরা তিন-চার মাস পরেরও রাখতে পারি। আঙ্কেল-আন্টি এত বছর ধরে অপেক্ষা করছেন, আর তুমি এখন পরীক্ষার উসিলা দিতে চাইছো?”
“তুমি ভুল বুঝছ। আঙ্কেল-আন্টি তো পর নন। আমি স্রেফ প্রিয়’র মানসিক অবস্থার কথা চিন্তা করে বলছি। ফাইনাল পরীক্ষার আগে যদি এই সময় বিয়ের প্রসঙ্গ উঠে, তবে পড়ালেখায় মন দেওয়াটা ওর জন্য বড্ড কঠিন হয়ে যাবে!”
​অভিরাজের মা এবার চিন্তিত মুখে শুধালেন,

“তা প্রিয়ন্তীর পরীক্ষাটা কবে থেকে মা? আর কতদিন বাকি আছে?”
​”আর বড়জোর এক মাসের মতো আছে আন্টি। এই একটা মাস পার হয়ে গেলেই ও একদম ফ্রি।”
মিতালী বেশ গুছিয়ে উত্তরটা দিলো।​ভদ্রমহিলা চট করেই বলে বসলেন,
“তাহলে এক কাজ করলে কেমন হয়? বিয়ে না হয় পরীক্ষার পরেই হোক। কিন্তু আমরা এই শুভক্ষণেই এঙ্গেজমেন্টটা সেরে রাখি ? আংটি বদলটা হয়ে থাকলে অন্তত একটা সম্পর্ক পাকাপাকি সিলমোহর পেয়ে যায়। এতে তো আর প্রিয়ন্তীর পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হবে না। কী বলো পাভেল?”
​”একদম ঠিক কথা আন্টি!এঙ্গেজমেন্টটা হয়ে থাকলে আমাদেরও মনটা হালকা হয়। এই সামান্য আংটি বদলের অনুষ্ঠানে তো আর প্রিয়ন্তীর এক মাস সময় নষ্ট হবে না। মিতালী তুমি খামোখাই জল ঘোলা করছ।”
​ভাইয়ের তাড়াহুড়ো সেই যুক্তি দেই সঙ্গে অভিরাজের মায়ের এঙ্গেজমেন্টের প্রস্তাবে প্রিয়ন্তীর চোখের সামনে তখন সর্ষে ফুল দেখার অবস্থা। মিতালী আবার কিছু বলতে যাবেই তার আগেই চোখের ইশারায় চুপ করিয়ে দিলো পাভেল। ভাইয়ের রাগী দৃষ্টিতে কাবু হয়ে ভাবীর হাতটা আরো জোরে খামচে ধরল প্রিয়ন্তী।
“আমার মনে হয় ভাবি ভুল কিছু বলেননি। পরীক্ষা যদি এত কাছেই হয়ে থাকে, তাহলে ওটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যায়। মিস প্রিয়ন্তীর কেরিয়ার এবং পড়াশোনা আমার কাছেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উনি যখন এই এক মাস নিজের পড়াশোনায় সম্পূর্ণ ফোকাস করতে চাইছে, তখন আমাদের উচিত সেই স্পেসটুকু উনাকে দেওয়া।এক মাসেরই তো ব্যাপার। এতদিন যখন আমি অপেক্ষা করতে পেরেছি, তখন ভাবির কথাকে সম্মান জানিয়ে এই আর একটা মাস অপেক্ষা করতে আমার কোনো সমস্যা নেই। পরীক্ষা শেষ হোক। তারপর সবাই মিলে বসে সুন্দরভাবে পরের সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।”

​অভিরাজের বাবা মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন,
“আমি মনে করি এটাও যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কথা।”
অভিরাজের মাও ছেলের সিদ্ধান্তের ওপর আর কোনো কথা বললেন না।​শুধু ছোট ককরে বললেন ভদ্রমহিলা,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তোমরা যখন সবাই এটাই চাও। তাহলে আপাতত আর কিছু বলছি না। পরীক্ষার পরেই সব হবে।”
এতক্ষনে খানিকটা স্বস্তির নিঃশাস ফেলল প্রিয়ন্তী।
​পুরো টেবিল জুড়ে আবার স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়া চলল। সবাই স্বাভাবিক ভাবে খেলেও প্রিয়ন্তী আর খেতে পারল কই। আপাতত ঝড়টা কে টে গেছে। কিন্তু প্রিয়ন্তী মনে মনে ভালো করেই জানে, এই ঝড়টা তো স্রেফ সাময়িক শান্ত অবস্থা। আসল সাইক্লোন তো এখনো ওর জীবনের পেছনে ধেই ধেই করে ধেয়ে আসছে।

রাতের ডিনার শেষ হতে হতে বাজল প্রায় সাড়ে দশটা। মেহরিণ সন্ধ্যার দিকে খেয়েই রুমে চলে গেছে। আর নামেনি। সুমি বেগম রান্নাঘর গুছিয়ে নিজের ঘরে চলে গেছেন। সেহরোজ মায়ের সঙ্গে ডিনারের পরপরই লিভিং রুমের বড় ডিভানটায় এসে বসেছিল। নেভাল ইন্টেলিজেন্স ও স্ট্র্যাটেজিক অপারেশনের কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল ডেটা এবং অফিশিয়াল ফাইল নিয়ে কাজ করছিল ল্যাপটপপে। ঝুমুর কে বলেছে একটা ব্ল্যাক কফি করে দিতে। পাশে থাকা ফোনটা বেজে উঠল তখুনি। স্ক্রিনে তাকিয়ে নামটা দেখে বাধ্য হয়েই উঠে দাঁড়াল সেহরোজ। ল্যাপটপটা বন্ধ করল না। ওভাবেই হাই-সিকিউরড স্ক্রিন অন রেখে লিভিং রুমের সেন্টার টেবিলটার ওপর নামিয়ে রাখল। তারপর ফোনটা কানে চেপে গম্ভীর মুখে কথা বলতে বলতে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল।
​উপর তলায় দাঁড়িয়ে বেশ অনেকক্ষণ যাবৎই উঁকি ঝুকি মারছিলো মেহরিণ। লোকটাকে বসা অবস্থায় দেখে নামার আর সাহস কুলোয়নি। ঘুমও আসছিলো না। মেহরিণ এর একটা আজব অভ্যাস আছে। পৃথিবীতে থাকা বিরল অভ্যাসও বলা চলে। রাতে ঘুম না হলে কড়া করে দুধ দিয়ে এক মগ চা খেলে ওর ঘুমে চলে আসে। সন্ধ্যায় যে ঢুকেছে রুমে শত চেষ্টায়ও দু চোখে ঘুম নামাতে পারেনি মেয়েটা। তাইতো একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই উঠে এসেছে। নিচে নামতে গিয়েই বসে থাকা সেহরোজ কে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে এখানটায়। তবে এই সুযোগ টুকু লুফে নিলো সে। ঝট করেই নিচে নেমে এলো। সোজা ঢুকল বরাবর থাকা কিচেনটায়। ঝুমুর কফি বানাচ্ছে তখনো। মেহরিণ গিয়ে বলল,

“আমাকে একটু চা বানিয়ে দিবে ঝুমুর আপা?”
“এতো রাইতে চা খাইবা? ক্ষুদা লাগসে? অন্য কিসু বানাইয়া দিমু?”
“না! ঘুম আসছে না। চা’ই লাগাবে। দিবা?”
অত্যন্ত ভড়কে গিয়ে মুখ কুঁচকে তাকাল ঝুমুর। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল,
“চা খাইলে তো আরো আগে ঘুম অইবোনা। একগ্লাস গরম গরম দুধ খাও। ঘুম আইয়া পড়ব নে দেখবা চোখের পলকে!”
“উহুম।দুধ খেলে আমার ঘুম আসেনা।পরীক্ষা চলাকালীন রাতে পড়ার চাপ থাকলে আম্মা আমারে চায়ের বদলে এক গ্লাস গরম দুধ করে দিতেন তাই!”
ঝুমুরের মন চাইছে নিজের মাথা নিজে ফাটাতে। সে এতদিন মনে করত দুনিয়াতে তার ভাইজানের মতো এমন আজব মানুষ আর একটাও নাই। কিন্ত এই মাইয়া তো দেখি তার থেইকাও দুই ধাপ উপরে। অবশেষে হাল ছেড়ে দিয়ে ঘন করে দুধ দিয়ে চা বানাল। চা টুকু কাপে ঢালতে যেতেই শুনতে পেল,
“কাপে না। মগে দাও। ”
ঝুমুর তাই করল। মগ নামিয়ে সবটুকু চা সেটায় ঢালল। মেহরিন সেই গরম চায়ের মগটা দুই হাতে ধরে, ফুঁ দিতে দিতে ধীর পায়ে লিভিং রুম পার হচ্ছিল নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য। ওর পরনে একটা একটা ঢিলেঢালা সালোয়ার কামিজ।ওড়নাটা গলায় পেঁচিয়ে রাখা।একপাশ টা ফ্লোর ছুঁয়ে আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে পা বাধিয়ে পড়বে নির্ঘাত। সেইসব ভেবেই একহাতে কফির মগ আরেকটা ওড়নাটা টেনে সামনের দিকে আনলো। আকস্মিক সামনে থাকা সেন্টার টেবিলের কোনায় অসাবধানতা বশত হোঁচট খেয়ে ভারসাম্য হারিয়ে চেঁচাল,

​”ওমাগো!”
​বলতে বলতেই সোজা হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেন্টার টেবিলের উপর।পায়ের কাই আঙ্গুলটায় ব্যথা পেয়েছে বেশ।সেই সাথে হাতে থাকা গরম ধোঁয়া উঠা চায়ের মগটা গিয়ে ছিটকে পড়ল ল্যাপটপটার ওপর!
​দুধ -চিনির আঠালো, গরম চায়ের পুরো সবটাই এক নিমেষে ল্যাপটপের কি-বোর্ড, টাচপ্যাড আর প্রসেসরের ভেন্টের ভেতর দিয়ে ঢুকে গেল।
‘চিড়চিড়’ শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল ল্যাপটপের জ্বলজ্বল কড়া স্ক্রিনটা। মাদারবোর্ডটা শর্ট সার্কিট হয়ে ওখানেই শেষ। কারো চিৎকার শুনে হন্তদন্ত হয়ে লিভিং রুমে ছুটে এলো সেহরোজ। ততক্ষনে যা ঘটার ঘটে গেছে
​”হেই, হেই ইডিয়েট! আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড! স্টুপিড কী করেছ এটা?”
​প্রায় চিৎকার করেই চেঁচিয়ে উঠল সেহরোজ। একরকম দৌড়ে এসে ছোবল মেরে টেবিলের ওপর থেকে চায়ে ভেজা ল্যাপটপটা তুলে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগল। ওটার স্পিকারের ফুটো দিয়ে তখনো টপ টপ করে গরম চা গড়িয়ে পড়ছে।​ছেলের এমন ভয়ানক গর্জনে সুমি বেগম নিজের ঘরের দরজা খুলে ছুটে এলেন লিভিং রুমে। মেহরিণ তখন ভয়ে একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সেহরোজের রাগী আর হিংস্র চেহারা দেখে সে তৎক্ষণাৎ ভদ্রমহিলার পেছনে বিড়াল ছানার মতো গুটিয়ে আশ্রয় নেয়।​ সুমি বেগম আতঙ্কিত হয়ে জানতে চান,

“কী হয়েছে বাবু? মাঝরাতে এভাবে চেচাচ্ছিস কেন?”
​”কী হয়েছে মানে! সী! এই মেয়ে আমার ল্যাপটপের কী হাল করেছে! এই স্টুপিড, সামনে আসো! বেরিয়ে আসো বলছি! না হলে থাপ্পড়িয়ে মুখের নকশা বদলে দেব বলে দিচ্ছি!”
​সুমি বেগম মেহরিনকে আড়াল করে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন,
“থাক! ছোট মানুষ। বুঝতে পারেনি, পায়ে হোঁচট লেগে ভুলে এমনটা হয়ে গেছে। তাই বলে সামান্য একটা বিষয় নিয়ে তুই মাঝরাতে এভাবে চিল্লাবি?”
​”হোয়াট! ডু ইউ ইভেন হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ মাচ দিস থিং কস্টস, মম?”
সেহরোজ ল্যাপটপটা থেকে চা ঝাড়তে ঝাড়তে প্রায় পাগলের মতো বলল,
“এই ল্যাপটপের দাম দিয়ে এই মেয়েকে তিন-চারবার কেনা-বেচা করা যাবে! মাই ল্যাপটপ ইজ ডেড, লিটারলি!”
​মেহরিন পুরো ইংলিশ বাক্যটার অর্থ বুঝতে সক্ষম না হলেও ‘ডেড’ কথাটার মানে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। ডেড মানে তো মারা যাওয়া। ও বুঝল, ল্যাপটপ নামের এই কালো জিনিসটা আর বেঁচে নেই। ওটুকু বুঝেই মেয়েটা ভয়ডর ভুলে ঝোঁকের বশে সুমি বেগমের আড়াল থেকে মাথাটা কিঞ্চিৎ বের করে নিষ্পাপ মুখে একবাক্যে আওড়াল,

​”মরে গেলে কবর দেন। এত চিল্লাচিল্লি করার কী আছে?”
​ঠিক এমন একটা মুহূর্তে এসে মেয়েটার মুখে এমন অদ্ভুত, সরল সান্ত্বনা শুনে সুমি বেগম নিজের হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেও বার্থ হলেন। হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি।
“আম্মু!”
প্রায় বজ্র কণ্ঠে ধমকে উঠল সেহরোজ। দাঁড়ালো না আর সেখানে। দুহাতে ভেজা ল্যাপটপটা তুলে নিয়ে রাগে রি রি করতে করতেই চলে গেল। যেতে যেতে অবশ্য মেহরিনের দিকে ভয়ানক অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করতে ভুলল না। লোকটার প্রস্থান নিশ্চিত হতেই আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো মেহরিণ। এতক্ষনে রান্নাঘরের আড়াল থেকে গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে এলো ঝুমুরও। এতক্ষন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখেছে সে। ​
“ওমাগো মেহরিণ আপা! আফনে তো দেহি এক্কেবারে ফাটাইয়া দিসেন। সব থুইয়া সবসময় আমার ভাইজানের জিনিসপত্রের দিকে কেন আপনার নজর যায়? কামডা করলেন কি? আল্লাহ গো!”
​ মেহরিন বেশ সরল মুখে বলল,
“আমি কী ইচ্ছা করে করছি নাকি? হোঁচট খেয়ে পরেছিলাম সেখানে। এখানে আমার দোষ কই?”
​সুমি বেগম সোফায় বসতে বসতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।বললেন,

“তুইও মেহরিণ! তোকে এই মাঝরাতে অত বড় মগে চা খেতে বলেছিলো কে শুনি? রাতের বেলা চা খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। বাবুর অফিশিয়াল ল্যাপটপ, কত জরুরি কাগজ ছিল ওটায়।”
​ঝুমুর মেঝে থেকে ভাঙা মগের টুকরো গুলো কুড়িয়ে নিলো। ঝাড়ু দিতে দিতে মেহরিনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল। রসিয়ে রসিয়ে বলল,
“আম্মা গো, আফনে ছোট আফারে বকেন ক্যা? ছোট আফা তো হাচা কথাই কইছে। যে জিনিস এক্কেরে ডেইড হইয়া গেছে, হেইডারে ঘরে রাখলে তো বদবু ছুটব! ছোট আফা তো ভালো বুদ্ধিই দিছে। কবর দিয়া দেওন! তা আফনে কন দেহি আফা? কবরটা কই দিবেন? আমাগো ছাদের ওই টবের নিচে নাকি এক্কেবারে সদর রাস্তার ড্রেনে ?”
​ঝুমুরের কথায় সত্যি সত্যি মেহরিণ বেশ গম্ভীর হয়ে ভাবল। গ্রামে কোনো পশুপাখি মরলে বাঁশঝাড়ের পাশে গর্ত করে পুঁতে ফেলা হতো। ও মাথা নেড়ে বলল,

“রাস্তার ড্রেনে দিলে তো পাপ হবে ঝুমুর আপা। জিনিসটা কত দামি বলল না ? ড্রেনে দিলে যদি ওটার আত্মা এসে রাতে ভয় দেখায়? তার চেয়ে ছাদের টবেই ভালো। লাল টবটায় ভালো মাটি আছে।”
​সুমি বেগম কপালে হাত ঠেকালেন। মেয়েটা এতো সরল সহজ কেন? এরা দুইজনেই যে দুই মেরুর। কিভাবে উনি এই মেয়েকে তার ছেলের মনে ধরাবেন? আজকালকার দিনে শহুরে মেয়েদের তিনি মোটেও ভরসা পান না। অতি শিক্ষিত মেয়েগুলো শাশুড়িকে মানে না। দেখতে পারেনা। সহ্য করতে পারেনা।দেখা যায় কিছুদিন না যেতেই স্বামী নিয়ে আলাদা থাকতে চায়। সেখানে উনার ছেলেটা সাড়া বছর থাকে বাড়ির বাইরে। উনি তো চেয়েছিলেন এমন একটা ঘরোয়া মেয়ে। যে কিনা তাকে সংঘ দিবে। তার মেয়ের আকাঙ্খা টা পূরণ করবে। মা মেয়ে হিসাবে সবসময় দুজন একত্রে থাকবে। এই ভেবেই তো গ্রামে নিজের বান্ধবীর মেয়েকে নিজের ছেলের বউ করার সিদ্ধান্ত নেন। ভেবেছিলেন মেয়েটা সহজ সরল। দেখতেও মাশাআল্লাহ চোখ ধাঁধানো সুন্দরী। যদিও একটু অবুঝ। তবে তিনি বুঝিয়ে সুজিয়ে মানিয়ে নিতেন। কিন্ত এরা যে একজন ভারত আরেকজন পাকিস্তান হয়ে বসে আছে। এই দুজনের মাঝখানের বর্ডার কিভাবে দূর করবেন তিনি?

​অফিসার্স কোয়ার্টার। রুমটা তাজধীরে’ই। বাইরে অন্ধকার সমুদ্রের বুক চিরে গর্জে উঠছে জোয়ারের ঢেউ। সিক্সথ ফ্লোরের জানালা টা খোলা। রুমের এক কোণে রাখা কাঠের গোল টেবিলটাকে ঘিরে বসে আছে তিন বন্ধু। তাজধীর, অর্ণব আর ফাহিম। টেবিলের ওপর নেভাল বেইজের কিছু ফাইল ছড়ানো। তবে সেদিকে কারও নজর নেই।​তাজধীরের কানে তখনো গোঁজা ব্লুটুথ ইয়ারফোন। সে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ গম্ভীর মুখে ওপাশে থাকা কারও সাথে কথা বলছিল। ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথাগুলো শেষ হতেই তাজধীর ঠান্ডা গলায় বলল,
“ঠিক আছে, তুই ওখানেই থাক। পরিস্থিতি বুঝেশুনে মুভ করিস।”
​কথা শেষ করে কানের ডিভাইসটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। ফোনটা কাটার সেকেন্ডের মধ্যেই পাশে বসে থাকা ফাহিম ফট করে বলে বসল,

“কী রে? কী বলল সেহরোজ? বেইজে কবে ফিরছে ও?”
​তাজধীর নিজের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল। ফাহিমের এমন হাবভাব দেখে অত্যন্ত বিরক্ত চোখে তাকাল। নিষ্প্রহ স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“ফোনের লাউডস্পিকার তো অনই ছিল। শুনিসনি?”
​ফাহিম অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল,
“না মানে, ও তো খুব আস্তে আস্তে কথা বলছিল। তাছাড়া নেভাল নেটওয়ার্কের ওই ঘড়ঘড়ে আওয়াজে সবটা ক্লিয়ার মাথায় ঢোকেনি। তুই ওকে সরাসরি বেইজে চলে আসতে না করলি কেন? এমনিতেই ক্রাইসিস চলছে।”
​তাজধীর টেবিলের ওপর রাখা ‘গ্রিন টি’ টা হাতে নিল। চুমুক দিয়ে পাথরের মতো শক্ত গলায় বলল,
“কতদিন পর ছেলেটা বাড়িতে গিয়েছে। তাছাড়া আন্টিও নাকি হঠাৎ ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। থাকুক ও কিছুদিন মায়ের কাছে। ছুটিটা কাটাক।”
​আন্টি অসুস্থ! তাজধীরের মুখ থেকে এই বাক্যটা বের হওয়া মাত্রই ওপাশে সোফার নিচে এলোমেলো হয়ে বসে থাকা অর্ণব আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। হুট করেই শব্দ করে হেসে উঠল ছেলেটা।
​আসলে আকস্মিক সেহরোজ এর বাড়িতে যাওয়া একটা গেইম। আর সেই গেমের পেছনের আসল মাস্টারমাইন্ড ছিল এই অর্ণবই! সুমি বেগমের এই হঠাৎ অসুস্থতার নাটক আর প্রেশার শুট করার পুরো আইডিয়াটা ছিল অর্ণবের চতুর মগজেরই উর্বর ফসল। সুমি বেগম যখন অর্ণবকে ফোন করে কেঁদে কেঁদে বলছিলেন যে সেহরোজ কোনোভাবেই বিয়েতে রাজি হচ্ছে না তখন অর্ণবই বুদ্ধি দিয়েছিল,
“আন্টি, আপনি জাস্ট প্রেশার ওঠার একটা জম্পেশ নাটক সাজিয়ে বিছানায় পড়ে থাকুন। বাকিটা আমি সামলে নিচ্ছে।”

​শুধু তাই নয়। সুমি বেগমের পছন্দ করা গ্রামের সেই চঞ্চলা মেয়ে মেহরিনকে যে একপ্রকার জোর করে হুট করে শহরে নিয়ে আসা হয়েছে, সেটাও ছিল অর্ণবেরই দেওয়া প্ল্যান। সুমি বেগম মূলত অর্ণবের এই সুপরামর্শ আর প্ল্যানের বশবর্তী হয়েই এমন একটা ভয়ানক ঝুঁকি নিয়েছেন। যদিও এই পুরো চক্রান্তের বিন্দুবিসর্গও সেহরোজ জানে না। ও সরল মনে বিশ্বাস করে বসে আছে তার মা সত্যিই গুরুতর অসুস্থ হয়তো। তাইতো শোনা মাত্রই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেছে।
​অর্ণব নিজের হাসিটা কোনোমতে সামলে নিয়ে কপালে হাত বুলাল। মনে মনে ও খুব ভালো করেই জানে, সেহরোজ যদি কোনোদিন টের পায় যে ওর মায়ের এই অসুস্থতার নাটক আর মেহরিনের এই বাড়িতে হুট করে আগমন—সবকিছুর পেছনে অর্ণবের হাত আছে, তবে আর রক্ষা নেই!গলা থেকে মাথাটা আলাদা করতে দু সেকেন্ড ভাববে না ওই খারুশ টা।
বন্ধুর আচানক এই হাসির রেশ টেনে ​ফাহিম আড় চোখে তাকাল। সন্দেহী গলায় বলল,
“তুই এভাবে হাসছিস কেন অর্ণব? আন্টির অসুস্থতার কথা শুনে তোর এত হাসি পাওয়ার কী হলো?”
​অর্ণব তৎক্ষণাৎ নিজের মুখে বন্ধ করল। আটকালো হাসি। সিরিয়াস ভাব ফুটিয়ে তোলর বৃথা চেষ্টা করল।

অর্ণব সোফায় ঠিকঠাক সোজা হয়ে বসতে পারে না। এটা তার পুরনো রোগ। এইযে এখনো সোফার ওপর সাপের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে আধা-শোয়া হয়ে বসে আছে। ওর পরনে বরাবরের মতোই একটা শর্টস আর ঢ্যাপঢ্যাপে টি-শার্ট জড়ানো।বন্ধুদের মধ্যে অর্ণব’ই একজন যে কিনা বয়সে বড় হলেও পোশাক আসাকে এখনো ঠিক সতেরো বছরের যুবক।
​ফাহিম ফাইলপত্র গোছাতে গোছাতে অর্ণবের বসার ভঙ্গিতে অসন্তুষ্ট হয়ে চাইল। নাক কুঁচকে বলে উঠল,
“এই অর্ণব, একটা কথা বল তো ভাই? তোর কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু অবশিষ্ট নাই? বেইজের কোয়ার্টারে আছিস। তাও ২৪ ঘণ্টা এই হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াস! অলওয়েজ এই শর্টস পরা কীসের স্বভাব তোর? দুদিন পর ছেলেপুলের বাপ্ হবি। অথচ এখনো বাচ্চাদের মতো এমন অর্ধ উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াস। দেখা যাবে বাসর ঘরেও এই হাফপ্যান্ট পরেই ঢুকেছিস। নির্লজ্জ কোথাকার!
​অর্ণব সোফায় আরও একটু লেতকা মেরে সটান হয়ে বসল। এটাকে বসা বললেও ভুল হবে। বসা আর শোয়ার মাঝামাঝি। দাঁত কেলিয়ে বলল,

“আরে ধুর ব্যাটা। তুই ফ্যাশনের কী বুঝিস? শর্টস হলো আরামের অপর নাম। আর বাসর ঘরের কথা বলিস না। সেখানে লুঙ্গি নাকি শর্টস—কোনটা বেশি কমফোর্টেবল, সেটা বিয়া করলে বুঝবি। তুই ব্যাটা আস্ত একটা ব্যাকডেটেড মেন্টালিটি নিয়া ঘুরিছিস!”
​ফাহিম একটা ফাইল অর্ণবের গায়ে ছুড়ে মারতে মারতে বলল,
“রাখ তোর কমফোর্ট! বাঘের মতো অফিসার।অথচ কাপড়ের ছিরি দেখ।”
​এদিকে তাজধীর অবশ্য এসব ফালতু কথায় এক ফোঁটাও কান দিচ্ছে না। সে অত্যন্ত মনোযোগের সহিত সুশৃঙ্খল পার্সোনালিটি বজায় রেখে টেবিলের সামনে বসে আছে। সামনে খোলা রয়েছে তার অফিশিয়াল ল্যাপটপটা। দীর্ঘ, বলিষ্ঠ শরীরটা সোজা হয়ে বসা। তীক্ষ্ণ মণি জোড়া নিবদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রিনেই। কি-বোর্ডের ওপর শক্ত আঙুলগুলো অনবরত নিখুঁত গতিতে টাইপ করে যাচ্ছে।
​অর্ণব এবার সোফার হাতলে মাথা ঠেকাল। এক পা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে তাজধীরের দিকে আড়চোখে তাকাল। তার গোয়েন্দা মগজ তখনো তাজধীরের এই আচমকা বিয়ের রহস্য উদঘাটন করার জন্য ছটফট করছে। সে তাজধীরকে সুন্দর করে কথার জালে ফাঁসানোর জন্য গলার স্বরটা যথেষ্ট নরম ও মোলায়েম করে বলল,
“আচ্ছা তাজধীর! তুই তো ভাই আমাদের কলিজার টুকরা বন্ধু। তাইনা বল?”
তাজধীর উত্তর দিলোনা। বন্ধুর মৌনতায় ক্ষেপে গেল অর্ণব। তবুও নিজেকে ধমিয়ে আবারও বলল,

“বল না ভাই?”
“উহু!”
“তোর না মানে হ্যা ধরে দিলাম। তা আসল কাহিনীটা একটু খুলে বলবি এবার ? মানে, আমরা তো পর না।বলনা ভাই চোখের পলকে কিভাবে নিজের গলায় বিয়ের ফাঁ সি পইরা আসলি ? আমরাও একটু শুনি?”
​অর্ণবের প্রশ্নের জবাবেও তাজধীরের মুখ দিয়ে একটি শব্দও বের হলো না। তার চোখ ল্যাপটপের স্ক্রিনেই আটকে রইল। আঙুলগুলো চলল আগের মতোই। ​তাজধীরের এই পাথরের মতো মৌনতা দেখে অর্ণব হতাশ হয়ে ফাহিমের দিকে তাকাল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিল চাপড়ে বলল,
“দেখছিস ফাহিম? এই শালায় সব কিছুতেই ফাস্ট! নেভাল অ্যাকাডেমির ড্রিল বল, শুটিং বল, প্রমোশন বল—সব জায়গায় ও আগে। আমরা ভাবলাম শালা আস্ত একটা নারীবিদ্বেষী। নারীদের ছায়াও মাড়ায় না। সারাজীবন এই বরফের চাঁই হইয়াই কাটায়া দিব! অথচ দেখ, আমাগো কিছু না জানাইয়া, কোনো দাওয়াত না দিয়া, এক কেজি মিষ্টি না খাওয়াইয়া চোখের পলকে আস্ত একটা মেয়েকে বিয়া কইরা চইলা আইল! কপাল রে কপাল!”
​অর্ণব একটু থামল। নিজের লাভ লাইফ ভাগ্যর উপর পরিহাস হলো তার। সোফায় একটা কুশন বুকে জড়িয়ে ধরে আক্ষেপের সুরে বলল,

“আর আমার কপালটা দেখ! আমারটা শালা বড়ই হইতাছে না এখনো! দেখতে দেখতে আমি বুড়া হয়ে যাবো। কিন্ত ওই ছেড়ি বড় হইব না। দিন দিন আরো ছোট হইতাসে। শুনলাম এখনো নাকি মায়ের বুকে লেটকা মাইরা ঘুমায়। কবে যে ম্যাচিউরড হবে। আমার দিকে ভালো করে তাকাবে। আমায় বুঝবে। আমার চোখের চাহুনির মানে বুঝবে তার কোনো লক্ষণই নাই।”
​ফাহিম অর্ণবের এই করুণ দশা দেখে হাহা করে হেসে উঠল,
“সালা বুইড়া খাটাস হয়ে একটা বাচ্চা মেয়ের উপর নজর দিয়ে রাখছিস। লাইন মারতে চাচ্ছিস।এমনটা তো হবেই।”
​ “আরে ধুর, বাচ্চা মানে কী?জন্মের পর প্রথমবার আমি কোলে নিয়েছিলাম। পেলে টেলে তো আমিই বড় করলাম। বয়স কোনো ব্যাপার না। সমস্যা তো অন্য জায়গায়! চাইলেও জোর বিয়েও করতে পারব না। এই দেশে যে আইন! জোর করে বিয়া করতে গেলেই তো সোজা কেস খামু মামা। কোর্ট-কাচারি আর জেলখানার ভাত খাওয়া লাগব। নেভির চাকরি তো যাইবই সাথে ইজ্জতের ফালুদা হইব।আর আমার যেই দাজ্জাল হবু শাশুড়ি! ফুপু নামের কলঙ্ক। আমারে দেখলেই সাপের মতো ফোঁসফোঁস করে। যেন তার বাপের সম্পত্তির অংশীদার আমার বাপে না স্বয়ং আমি!”

বন্ধুর এহেন করুন কাহিনীতেও হো হো করে হেসে উঠল ফাহিম। টেবিলের উপর থাকা খালি ওয়ান টাইম চায়ের কাঁপটা ছুড়ে মারল অর্ণব ফাহিমের মুখের উপর। বলল,
“সালা হাসিস না। বুঝবি একদিন। সেদিন গড়াগড়ি কইরা চিৎকার পারবি। এই বলে দিলাম।”
বলতে বলতে তাকাল তাজধীরের দিকে। ফট করে আবারও একদমে বলতে শুরু করল,
“আচ্ছা তাজধীর, তোর কাছে এমন কোনো হাইড্রো-টাইপের মেডিসিন বা কেমিক্যাল আছে রে ভাই? মানে তোরা তো ইন্টেলিজেন্সে আছিস। কত গোপন ল্যাবের খবর জানিস। এমন কিছু আছে যা খাওয়ালে মানুষ রাতারাতি বড় হয়ে যায়? মানে আজকে খাওয়াইলাম আর কাল সকালে উইঠা দেখলাম ও এক্কেবারে আঠারো বছরের ম্যাচিউরড লেডি গাগা হয়ে গেছে!একদম রেডি টু ম্যারি। থাকলে দে না ভাই একটু। আমার খুব দরকার!”
​ফাহিম অর্ণবের এই আজব আর অবাস্তব কথা শুনে সোফা থেকে প্রায় পরে যাওয়ার উপক্রম হলো। ও হাসতে হাসতে বলল,

“সালা পাগল ছাগলের দল।হাইড্রো ড্রপস খাওয়াইয়া তুই মানুষ বড় করবি? ওটা কী তোর বাগানের লাউ গাছ নাকি যে রাতারাতি সার দিবি আর ডালপালা ছড়ায়ে বড় হয়ে যাবে?”
“তো কি করব?বউয়ের সঙ্গে এই সময় বাসর করার বদলে বন্ধুদের সঙ্গে কাজের সিডিউল ঠিক করছি!আহা ভাগ্য দেখ আমার!আরেকটা দেখ। বিয়ে করে বাসরও শেষ করে চলে আসছে। অথচ হাবভাব দেখ! যেন কচি খোকা। দুধভাত খায়।”
“ও বাসর করছে নাকি না করছে সেটা তুই এতো শিউরিটি দিয়ে বলছিস কিভাবে?”
“তোর কি মনে হয়? বিয়ের মতো এমন কান্ড ঘটাইয়া বাসর না করেই এই সালা চলে আসার মাল?”
​ফাহিম এবার অর্ণবের পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে বলল,
“কী সব যা তা বলছিস অর্ণব! মুখ সামলে কথা বল। তুই বাসর ঘরের মতো সেনসিটিভ বিষয় নিয়া এভাবে ফাজলামো করছিস কেন?”
​অর্ণব ফাহিমের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বলল,

“আরে ধুর। এই সালা মিচকা শয়তান রে আমি একটুও বিস্বাস করিনা। কেউ যদি বলে কুমির ভর্তি খালে লাফ দিবা নাকি এই ব্যাটারে বিশ্বাস করবা। আমি সোজা ঝাঁপ দিবো। এই শালা আস্ত একটা ডেঞ্জারাস প্লেয়ার। ও বিয়া করবে আর বাসর না কইরা চলে আসবে? উহু। এটা বিস্বাস করা যায়না মামা। এটা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। জাস্ট কয়টা দিন যাইতে দে। শুনবি আমরা চাচা হইতাসি। দেখিস মিলাইয়া নিস্।”
​এবারে বোধহয় ধৈর্যের বাধ ভাঙলো তাজধীরে। ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে উল্টো ঘুরল সে। আকস্মিক লম্বা পা-খানা অবিশ্বাস্য গতিতে পেছনের দিকে বাড়াল।লাথি বসিয়ে দিল ঠিক অর্ণবের পাছার মাঝখান বরাবর!
​আকস্মিক হামলায় ভারসাম্য হারিয়ে ধুপ করে গড়িয়ে পড়ল অর্ণব ফ্লোরে। মুখ দিয়ে আকুল আর্তনাদ বেরিয়ে এলো,

“আহহহ মরে গেলাম রে! ওরে বাবারে! হাড্ডি গুড্ডি দিসে মনে হয় ভাইঙ্গা!”
​তাজধীর নির্বিকার। বসা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বরফশীতল কণ্ঠে জানাল,
“তোর এই নোংরা আর ফালতু ইমাজিনেশন যদি আর এক ইঞ্চিও আগে বাড়ে অর্ণব, তাহলে নেক্সট কিক-টা আর পাছায় পড়বে না, সোজা অন্য জায়গায় পড়বে। আমার পার্সোনাল লাইফ নিয়ে তোর এই সস্তা কমেন্ট করার সাহস দ্বিতীয়বার যেন না দেখি। শাট ইয়োর মাউথ অ্যান্ড গেট আউট অব মাই সাইট।”
ওদিকে অর্ণবের অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে খাটের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে ফাহিম।হাসতে হাসতেই বলল,
“একদম ঠিক হয়েছে। এবার বুঝ কেমন লাগে!”
মেঝে থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল অর্ণব । দুই হাত দিয়ে পাছাটা ডলতে ডলতে মুখ-চোখ কুঁচকে একাকার করে ফেলল। তাজধীরের দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বলতে লাগল,
“এইটা তোর পাও নাকি অন্য কিছু? লাথি না যেন আস্ত একটা কামানের গোলা! আমি তো ভাবীরে নিয়া টেনশনে আছি ! তোর এই লোহার মতো শক্ত শরীর নিয়া তুই যদি ভাবীর ওপর লেতকা মাইরা পড়িস, তাহলে তো বেচারির শরীরের একটা হাড্ডিও আর আস্ত থাকব না! সব মটমট কইরা ভাইঙ্গা চুরমার হইয়া যাইব! পরের দিন সকালে সোজা পঙ্গু হাসপাতালে নিয়া ভর্তি করা লাগব বেচারি কে!”
কথা শেষ করে আর দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগেই ছো মেরে দিলো ভো দৌড়। এখানে থাকলে যে আরো দুই চারটা লাথি পড়বে নিশ্চিত। অর্ণব যেতেই উঠে দাঁড়ালো ফাহিমও। তাজধীরের দিকে আড় চোখে চেয়ে ফাইল গুলো গুছিয়ে সেও প্রস্তান করল উক্ত রুম হতে। দুই বন্ধুর প্রস্তান নিশ্চিত হতেই দরজার দিকে চেয়ে আলগোছে হেসে উঠল তাজধীর। ভাগ্য করে একেকটা পিস’ই পেয়েছে সে জীবনে।

​পাভেলরা বাড়িতে এসে পৌছালো রাত এগারো টায়। প্রিয়ন্তী নামল সবার আগে। এরপর নামল মিতালী। সারাটা রাস্তা একবারের জন্যও মুখ খুলেনি প্রিয়ন্তী। জিজ্ঞেস করেনি কিছুই।নেমে দাঁড়িয়ে কোনো রকমে নিজের দুর্বল, নিস্তেজ শরীরটাকে টেনেটুনে ও ড্রয়িংরুম পার হয়ে নিজের রুমে এসে ঢুকল। দরজাটা আটকিয়ে পিঠ লাগিয়ে দাঁড়াল সেখানটায়।
গত দুইদিন যাবৎ ওর জীবনের সবকিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। গতকাল অনাকাক্ষিত সেই বিয়ে! আর আজ! মিতালী সাময়িকভাবে এক মাসের সময় চেয়ে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দিলেও, প্রিয়ন্তীর মনের ভেতরের ঝড়টা যে তাতে এক ফোঁটাও কমেনি।
​হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখা পার্সটা ছুড়ে মারল বিছানায়। ফর্সা মুখটা রাগে, ক্ষোভে,অসহায়ত্বে লাল হয়ে উঠেছে একদম। কাঁদতেও পারছেনা চেয়ে। দুহাতে নিজের মাথার চুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল এবার। বুক চিরে তীব্র চিৎকার দলা পাকিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু পারল না। দুই ঠোঁট কামড়ে ধরে গুমরে ওঠা কান্নাটাকে ভেতরেই চেপে রাখল।

​কী করবে ও এখন? কীভাবে সামাল দেবে এই পরিস্থিতি? মস্তিস্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আচ্ছা সেকি সোজা পাভেল ভাইকে সবটা জানাবে? বলবে ও এখন বিয়ে করতে চায়না? ভাই নিশ্চই ওর কথা শুনবে?বোনের চোখের পানি সহ্য করতে না পেরে নিশ্চই বিয়েটা ভেঙে দিবে?
​কিন্তু, কিন্তু পাভেল যদি উল্টো প্রশ্ন করে বসে, “কেন বিয়ে করতে চাস না প্রিয়ু? অভিরাজের মধ্যে কী খামতি আছে?উনি তোকে কতটা ভালোবাসে তুই জানিস না?”
তখন ভাইকে কী উত্তর দেবে সে? সে কি বলতে পারবে যে, গতকাল ওর অনিচ্ছাকৃতভাবেই একপ্রকার জোরপূর্বক তার বিয়ে হয়ে গেছে?মুখ ফুটে বলতে পারবে যে সে এখন একজন নেভি কমান্ডারের বিবাহিত স্ত্রী?

​না। পারবে না বলতে। ভাই যদি তাহলে ওকে অবিশ্বাস করে। ভাইয়ের চোখে ভালোবাসার পরিবর্তে অবিশ্বাস কিভাবে সহ্য করবে প্রিয়ন্তী? এর থেকে যে মরণ ঢের ভালো।
​ভাবতে ভাবতে প্রিয়ন্তী বিছানার এক কোণে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের ওপর ছড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই তার এই এলোমেলো ভাবনার গোলকধাঁধার মাঝেই হুট করে মাথায় একটা প্রশ্ন খটকা দিয়ে উঠল। আচ্ছা ​ লোকটা কীভাবে জানল যে প্রিয়ন্তী আজ অভিরাজদের বাড়িতে গেছে?এটা তো উনার জানার কথা না। উনি তো শহরেও নেই।
কোনো সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, কোনো গোয়েন্দার পক্ষেও এত নিখুঁত টাইমিংয়ে খবর পাওয়া অসম্ভব। যদি না তার ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হয়।তার মানে কি লোকটা ওর উপর নজরদারি করছে? ​প্রিয়ন্তী সমস্ত বুদ্ধি খাটিয়েও এই জটিল সমীকরণের কোনো উত্তর মেলাতে পারল না। মনের ভেতরের কৌতূহল এবার চরমে পৌছাল। সেই কৌতূহল থেকেই সে একটা সিদ্ধান্ত নিলো। লোকটার কাছ থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর নিবে সে।
​অবশেষে সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েই পার্স থেকে ফোনটা বের করল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে ইনবক্স খুলে সেই অপরিচিত নম্বরটা বের করল। যেখান থেকে মেসেজটা এসেছিল। অবশেষে প্রিয়ন্তী লম্বা একটা দম নিয়ে জড়তা কাটিয়ে লিখল,

“আস্সালামুআলাইকুম। আছেন?”
প্রিয়ন্তী ভেবেছিল হয়তো ওপাশ থেকে উত্তর আসতে অনেকটা সময় লাগবে। কিন্তু তার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে দিলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আসা মেসেজটা। প্রিয়ন্তী অত্যন্ত দ্রুততায় স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ওপাশে তখন চ্যাটবক্সে আনসেইভ নম্বরটার নিচে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে তিনটি শব্দ,
​”জি মিসেস, বলুন।”

​শব্দ তিনটি চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল মেয়েটার। ঘুরেফিরে নজর আটকালো মাত্র একটি শব্দেই।মিসেস! লোকটা সবসময় তো ওকে মিস বলেই সম্মোধন করতো। একদিনের ব্যবধানেই সরাসরি মিসেস? মিস থেকে মিসেস হয়ে উঠার এই দুর্দান্ত অনুভূতিটুকু ভাসিয়ে দিলো ওকে সমুদ্রের জোয়ারে।
প্রিয়ন্তী দ্রুতই নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে সেই অদ্ভুত অনুভূতি ঝেড়ে ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করল। এখন এসব ভাবার সময় নয়।যা জানতে চেয়ে মেসেজ করেছে সেটা আগে করা দরকার। ফোনের কি-বোর্ডে কাঁপাকাঁপা আঙুলে টাইপ করল সে,

“আপনি কি একটু ফ্রি আছেন? আসলে আপনার সাথে আমার খুব জরুরি কিছু কথা ছিল।”
​মেসেজটা সেন্ড করে দিয়ে ফোনটা দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।ধরেই রাখল অনেকটা সময়। এবার আর উত্তরটা সঙ্গে সঙ্গে এলোনা। অপেক্ষা করল প্রিয়ন্তী। লোকটা কি তাহলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নাকি? নাকি আর উত্তর দিবেনা কোনো?
প্রতিটা সেকেন্ড একটা ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। এভাবে পুরো ষাট সেকেন্ড পার হলো। দুই মিনিট পর ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। প্রিয়ন্তী দ্রুত মেসেজটা ওপেন করতেই দেখল, একটা বড়সড় মেসেজ পাঠিয়েছে লোকটা। লিখেছে,
“আপনার হাজব্যান্ড একজন সরকারি চাকরিজীবী, মিসেস। নরমাল টেক্সট মেসেজে এত কথা বলা ওনার প্রফেশনাল ডেকোরামের বাইরে। তাছাড়া এটা মাস শেষে তার ফাইনান্সিয়াল বাজেটেও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। আশা করি একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রীর এই ফিনান্সিয়াল ম্যাটারটা বোঝা উচিত।”

​মেসেজটা পড়ে প্রিয়ন্তীর চোয়াল ঝুলে গেল। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল মুখটা। কপালে গুনে গুনে তিন চারটে ভাজ ও পড়ল। কী কিপ্টা , আর কঞ্জুস টাইপের লোক রে বাবা! দেশের এত বড় একজন নেভি কমান্ডার। অথচ ওনার নরমাল মেসেজে কথা বললে নাকি মোবাইল বিল বেশি আসবে? সরকারি বেতনের বাজেট শেষ হয়ে যাবে? আর উনি কি তাকে পরোক্ষভাবে লোভী বা কাণ্ডজ্ঞানহীন ভাবছেন নাকি?’
​প্রিয়ন্তী লোকটার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলা কথার ভেতরের আসল চালটা ধরতে পারল না।ও বোকার মতই লোকটার পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা ঠিক আছে। বুঝতে পেরেছি। আপনার হোয়াটস্যাপ নাম্বারটা দিন। আমি ওখানেই টেক্সট করছি।”
​মেসেজটা পাঠিয়ে প্রিয়ন্তী এবারেও অপেক্ষায় রইল।
​এবার সঙ্গে সঙ্গেই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটা টেক্সট এলো,
“যে নম্বর থেকে টেক্সট করছি, এটাই।”
প্রিয়ন্তী নাম্বারটা কপি করল। এরপর ঢুকল কল অপশনে। ওখানে গিয়ে কপিকৃত নাম্বারটা সেইভ করল।ভাবল কি নামে সেভ করবে এই জল্লাদ, খিটখিটে আর অদ্ভুত লোকটার নাম্বার? ঠোঁটের কোনে দুষ্ট হাসি টেনে লিখল, নিরামিষ কমান্ডার।

​নামটা সেভ করেই দ্রুত হোয়াটস্যাপে গেল। সার্চ বারে গিয়ে ‘নিরামিষ কমান্ডার’ লিখতেই প্রোফাইল পিকচার ছাড়া একটা আইডি ভেসে উঠল।এযাত্রায় কেন যেন মেয়েটার মনটা ভীষণ খারাপ হলো। ব্যাটা প্রোফাইল পিক দিতেও কি তোর টাকা লাগে নাকি? কিপটে কোথাকার!
মনে মনে বকে নিজে থেকেই লিখল,
“আচ্ছা, আপনি কীভাবে জানলেন আমি ওখানে গিয়েছি?”
স্ক্রিনে ‘ডাবল টিক’ চিন্হ উঠেছে। মানে লোকটা অনলাইনেই আছে। সঙ্গে সঙ্গে সেটা ব্লু মার্ক হলো। লোকটা মেসেজটা সিন্ করেছে। সেই সঙ্গে টাইপিং লেখাটাও শো হচ্ছে। প্রিয়ন্ত দম আটকে অপেক্ষা করল। উত্তরটা এলো –
​”জানিনি, জেনে নিয়েছি।”
এটা কেমন কথা?জেনে নিয়েছে মানে কি? কার কাছ থেকে জেনে নিয়েছে? কে বলেছে উনাকে? লোকটার এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে দেয়া উত্তরটা কেন যেন হজম করতে পারল না প্রিয়ন্তী।অত্যন্ত কড়া গলায় টাইপ করে পাঠালো,

ডেসটেনি পর্ব ৩১

​”অধিকার দেখাচ্ছেন?”
​”আমি অধিকার দেখানো শুরু করলে, আপনি স্থির থাকতে পারবেন না মিসেস।”
​মেসেজটা চোখের সামনে ভেসে ওঠা মাত্রই প্রিয়ন্তীর কি হলো কে জানে। শরীরটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠল। ফর্সা, মসৃণ গাল দুটো হুট করেই লজ্জায় টকটকে লাল হলো। তোলপাড় করা অনুভূতিতে ছেয়ে গেল সমস্ত কায়া। মনে মনে বিড়বিড় করে উঠল,
“অসভ্য! নিরামিষ কোথাকার!”

ডেসটেনি পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here