ডেসটেনি পর্ব ৩৩ (২)
সুহাসিনি মিমি
“কেন, তোমার বর!”
বড্ড স্বাভাবিক সেই কণ্ঠস্বর! তবে স্বাভাবিক থাকতে পারল কই আর প্রিয়ন্তী। ওর চোখ দুটো তো বিস্ময়ে সেই তখুনি বড় বড় হয়ে গেছে। চোখের পলক টুকু অব্দি পড়ল না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল কিয়তক্ষণ। নিজের অজান্তেই এক পা এগিয়ে গেল।কণ্ঠে অবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করল,
”তু… তুমি জানতে?”
মিতালী এবারও ফোন থেকে চোখ সরাল না। বাটি থেকে একটা আঙুর মুখে পুরে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতেই বড্ড অবলীলায় উত্তর দিল,
”হুম।”
প্রিয়ন্তীর পায়ের তলার মাটি আরো খানিকটা আলগা হলো বোধহয়। কাঁপাকাঁপা গলায় আবার প্রশ্ন ছুড়ল,
”কবে? কখন থেকে জানতে তুমি?”
মিতালী এবার ফোনটা বিছানায় নামিয়ে রাখল। ননদের দিশেহারা, বোকা বনে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল অল্প।বলল,
”যেদিন থেকে তাজধীর সিদ্দিক আযানের নামটা তোমার নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ঠিক সেদিন থেকেই।”
এবার আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু পেলোনা প্রিয়ন্তী। টলতে টলতে এগিয়ে গেল ভাবীর কাছে। বিছানার প্রান্তে দুই হাত চেপে ধরে মিতালীর মুখের দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে রইল। চোখ দুটো ছলছল করে উঠল এক বুক অভিমান আর একরাশ বিস্ময় নিয়ে।ধরা গলায় বলল,
”তুমি সবটা জানতে ভাবী? প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু জানতে? তবুও… তবুও আমায় একটা বারও কিচ্ছু বলোনি?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিতালী। প্রিয়ন্তীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। খুব শান্ত গলায় উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিল ননদকে,
”তুমি বলেছিলে প্রিয়? তোমার মনের ভেতর যে এত তোলপাড় চলছিল। কই নিজে থেকে তো এসে কিছু বলোনি আমায়? এই তোমার আমাকে নিজের বড় বোন মনে করা?”
“ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম ভাবি। ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম আমি। আমার ওসব বলার মতো পরিস্থিতি ছিলোনা একদমই। তাছাড়া ভাইয়া তো জানোই কেমন। যদি রেগে যান? যদি আমায় অবিশ্বাস করেন?সেই ভয়ে বলতে পারিনি।
প্রিয়ন্তীর গাল বেয়ে টপ টপ করে দু-ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। মিতালী সেই জলটুকু পরম যত্নে মুছে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল ননদকে।
“একদম কাঁদবে না এই বলদ মেয়ে! এখানে তোমার কী দোষ? কারও তো কোনো দোষ ছিল না। ভাগ্যে যা লেখা ছিল, সেটাই তো হয়েছে। উপরওয়ালার এই ফয়সালা তুই-আমি কেউ কি বদলাতে পারতাম? আর তোমার ভাইয়া তোমাকে কতটা ভালোবাসে তুমি জানো না? তোমাকে কি অবিশ্বাস করতে পারে ও?”
প্রিয়ন্তী ভাবীর বুক থেকে মাথা তুলে হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
“সব বুঝলাম ভাবী। কিন্তু অভিরাজ ভাইয়ার বিষয়টা? ভাইয়া তো ওনাদের কথা দিয়েছেন। অভিরাজ ভাইয়া আর ওনার ফ্যামিলি যদি পুরো সত্যিটা জানতে পারে তখন কী হবে? আমি কীভাবে মুখ দেখাব ওনাদের সামনে? কীভাবে বলব ভাইয়াকে এই সব?”
মিতালী এবার প্রিয়ন্তীর দুই কাঁধ ধরে সোজা করে বসাল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে এই সব নিয়ে একদম মাথা ঘামাতে হবে না প্রিয়। সামনে তোমার পরীক্ষা না? এখন ফুল কনসেন্ট্রেশন শুধু পড়াশোনায় করো। মনে রেখো তোমার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, যার জীবনের সঙ্গে তুমি জড়িয়ে গেছ সে খুব সুন্দর করেই সম্পর্কের দায়ভার মেটাতে জানে। সম্পর্ক বহন করতে জানে। সম্পর্কের মূল্য দিতে জানে।”
মিতালী একটু থামল। দম নিয়ে বলল ফির,
“সে যেহেতু নিজে মুখে বলেছে সবকিছু সে হ্যান্ডেল করে নেবে, তাহলে তুমি অযথা কেন এত ভয় পাচ্ছো? শোনো। ভাইয়া চায় না আপাতত তোমাদের এই আকস্মিক বিয়ের বিষয়টা ফাঁস হোক। কেউ জানুক। কেউ তোমাকে নিয়ে কটু কথা বলুক।সমাজের মানুষ তোমাকে আঙুল তুলে ছোট করে কথা বলুক। বা কোনো অপবাদ দিক। এটা ভাইয়া চাচ্ছেনা বিধায় এখনো চুপ করে আছে। আর ঠিক এই কারণেই ভাইয়া আপাতত এই সম্পর্কটা আড়ালে রেখেছে। কাউকে কিছু জানাতে নিষেধ করেছে।তুমি শুধু তার ওপর ভরসা রাখ।”
চুপচাপ শুনল প্রিয়ন্তী ভাবির প্রতিটি কথা। মনোযোগ দিয়ে শুনল। মিতালী এবার অসহায় হয়ে বলতে লাগল,
“আমায় তো তোমরা ফেলেছো মোহা মুশকিলে। একসময়ে দুটো বিয়ে। একেতো তো ননদ। দ্বিতীয় আবার বড় ভাই। কার টা রেখে কার টা এঁটেন্ড করবো? এই ভেবে ভেবেই তো আমার ঘুম হারাম হচ্ছে। ইশ সামনে কত কাজ আমার!”
“উফ ভাবি!”
মৃদু স্বরে ধমকে উঠল প্রিয়ন্তী। গাল ভরে হাসল মিতালী এবার। বেঙ্গ করে বলল,
“উফ ভাবি!”
“আচ্ছা ভাবী একটা কথা বলো তো। উনি কি জানেন?”
মিতালী ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“কি?”
”আরেহ অভিরাজ ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ের কথাবার্তা চলার বিষয়টা? জানেন উনি?”
“তোমাকে একটু আগেই আমি কী বললাম? এসব নিয়ে তোমাকে একদম মাথা ঘামাতে বারণ করা হয়েছে না? তুমি ওসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে এখন ফুল ফোকাস শুধু নিজের পড়াশোনায় করো। ভাই কিন্ত আমার পড়াশোনার ব্যাপারে একদম স্ট্রিক্ট!যদি এই সব সাত-পাঁচ ভেবে পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ করো, তবে ভাইয়া কিন্তু তোমাকে একদমই ছেড়ে কথা বলবে না। ভাইয়ার সফট সাইড টাই দেখেছো তো। দোয়া করো যেন দৃঢ় সাইড টা না দেখতে হয় তোমায়। যাও অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। এবার রুমে গিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো বই নিয়ে বসো।”
প্রিয়ন্তী আর কোনো পাল্টা প্রশ্ন করার সুযোগ পেল না।দুজনের মধ্যে আরো কিছু বিষয় নিয়ে টুকটাক কথাবার্তা চলল। প্রিয়ন্তীর ভেতরের ভারী মেঘটা ভাবীর আশ্বাসে অনেকটাই কেটে গেছে।খানিকক্ষণ পর প্রিয়ন্তী উঠে দাঁড়াল। মিতালী তখন ফ্রুটসের বাটিটা হাতে নিয়ে গুছিয়ে রাখছিল।পদরজার কাছাকাছি গিয়েই থমকে দাঁড়ালো মেয়েটা। ভাবির দিকে চেয়ে ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
”ভাইয়ের হয়ে আমার ওপর পিয়নগিরিটা কিন্তু তুমি খুব ভালোই করছিলে ভাবী!”
খাট থেকে বালিশ টা ছুড়ে মারার আগেই দৌড়ে পালালো প্রিয়ন্তী। শব্দ করে হেসে উঠল মিতালী।আজ তার এতো আনন্দ লাগছে না! তার ভাইয়ের সঙ্গে নিজের ননদ কে প্রথম থেকেই কল্পনা করে এসেছিলো। সেই কল্পনা এভাবে হুট্ করেই বাস্তবে রূপ নিবে ভাবতেই পারেনি।
পরেরদিন সকালটা শুরুই হলো ঝুম বৃষ্টি দিয়ে।
রাতভর গুমোট গরমের পর ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আকাশ ভেঙে নামল শ্রাবণের ধারা। সেই সাথে যোগ হয়েছে এলোমেলো, ছন্নছাড়া দমকা হাওয়া। জানলার কাচ ভেদ করে সেই বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে ঘরের ভেতরের ফার্নিচারে।
প্রিয়ন্তী ঘুম থেকে উঠেছিল বেশ সকালেই। আজ ভার্সিটিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস ছিল।কিন্তু বিছানা ছেড়ে জানলা টেনে খুলতেই বুঝল—আজ আর কোনোমতেই ভার্সিটি যাওয়া হচ্ছে না। মনে মনে একটা বেশ অস্বস্তি বোধ করল প্রিয়ন্তী। নিচে নেমে ব্রেকফাস্ট করতে করতেই মিতালী বলল,
“বাইরে যা পরিস্থিতি!আজ আর কলেজে যাওয়া লাগবেনা প্রিয়। ভিজলে একদম জ্বর বাঁধিয়ে ছাড়বে!”
“যাবোনা ভাবি!”
“আরেকটু দিবো? খাওয়া দাওয়াটা ঠিক মতো করবে এখন থেকে। পড়ার প্রেসার খুব সামনে। এতো অল্প খেলে চলবে?”
“আমি তো একসঙ্গে এতো খেতে পারিনা। জানোই তো।”
“তাহলে অল্প অল্প করে খাবে। কিছুক্ষন পরপর। খেয়ে শরীর স্বাস্থ ঠিক না রাখলে ওরকম একটা স্বামীকে সামলাবে কি করে?”
শেষের কথাটা আস্তে করেই বলল মিতালী। কাজের মেয়েটা ওদের থেকে একটু দূরে। প্রিয়ন্তী চোখ পাকিয়ে চাইল। কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“ভাবিইই!”
“জিহ ভাবি?”
“উফ! তোমার সঙ্গে কথাই বলব না। যাও!”
“হুম। তা বলবে কেন? এখন তো কথা বলার মানুষের আবার অভাব নেই। এখন কি আর আমাকে ভালো লাগবে!”
“উফ ভাবি। থামবে?”
কোনোমতে ব্রেকফাস্টের পর্বটা শেষ করেই উপরে উঠে এলো। পড়ার টেবিলে বসে রইল অনেকক্ষন লাগিয়ে। তবে পড়ার মধ্যে মনোযোগ স্থির করতে পারল না আজ আর।
পায়ে পায়ে প্রিয়ন্তী এগিয়ে গেল ঘরের লাগোয়া ছোট্ট বারান্দাটায়। কবাট খুলতেই এক পশলা ঠান্ডা, ভেজা বাতাস এসে ঝাপটা মারল ওর মুখে-বুকে। ওখানেই রেলিং ধরে দাঁড়াল মেয়েটা।
বাইরে তখন প্রকৃতির আদিম রূপ বহমান। থেমে থেমে বাতাস বইছে। আর সেই বাতাসের তোড়ে লনের গাছগুলো মাথা নোয়াচ্ছে বারবার। প্রিয়ন্তীর পিঠময় ছড়িয়ে থাকা সিল্কের মতো কালো চুলগুলো বাতাসের অবাধ্য ছোঁয়ায় ওলোটপালোট হতে লাগল। কিছু অবাধ্য চুল এসে লেপ্টে গেল ওর ফরসা গালে। চট করে হাত দিয়ে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজল। দূর আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হুট করেই মনের কোণে একটা সুপ্ত ইচ্ছে চাড়া দিয়ে উঠল। বড্ড অদ্ভুত, চঞ্চল একটা ইচ্ছে!
এই মেঘলা দিনে নিজের মনের মতো করে সাজাতে ইচ্ছে হলো।সিদ্ধান্ত নিলো নিজের আত্মতৃপ্তির জন্যই সাজবে সে।
বারান্দা ছেড়ে কাঠের আলমারিটার সামনে এসে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী।বেছে বেছে একটা সাদা রঙের লাল পাড়ের শাড়ি খুঁজে বের করল। সাথে মিলিয়ে বের করল টুকটুকে লাল রঙের একটা ব্লাউজ। বেশ কিছুক্ষন সময় নিয়ে শাড়িটা জড়িয়ে নিল নিজের তন্বী শরীরে।পাড়টা ঠিকঠাক করে পিঠের ওপর মেলে দিল লাল আঁচল। সাজটা এখানেই শেষ হলো না। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার টেনে এক গোছা রেশমি লাল চুড়ি বের করল। ডান হাতে এক ডজন, বাঁ হাতে এক ডজন পড়ল।সেই সাথে দিলো মেরুন রঙের লিপস্টিক।
আয়নায় তাকাল এরপর। কিছু একটা মিসিং আছে। উম! চোখে কাজল পড়া হয়নি। এমনিতেই খুব একটা চোখে কাজল পড়েনা সে। পছন্দ নয় তেমন একটা। তবে আজ পড়ল। টানা টানা চোখ দুটোই কাজল টানল সুন্দর করে।এবার মানিয়েছে। শাড়ির সঙ্গে একটু আকটু কাজল না হলে চলে নাকি?
পিঠের চুলগুলো আজ আর বাঁধল না। একদম উন্মুক্ত করে ছেড়ে দিল পিঠের ওপর।সবার শেষে ড্রয়ারের একদম কোণ থেকে বের করল রুপোর একজোড়া নুপুর। পা বাড়াতেই ঝুমুর ঝুমুর শব্দে কেঁপে উঠল ঘর। নূপুর দুটো পায়ে গলিয়ে প্রিয়ন্তী আয়নার সামনে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল।আয়নায় ভেসে ওঠা প্রতিচ্ছবিটার দিকে চেয়ে নিজেই একটা আত্মতৃপ্তির হাসি হাসল প্রিয়ন্তী।
ধবধবে সাদা শাড়ি। টুকটুকে লাল পাড়ের আঁচল। হাতে রেশমি চুড়ির। পায়ে রুপোর নূপুর।সব মিলিয়ে সেলফ-স্যাটিসফ্যাকশন কাজ করল। ফুরফুরে আনন্দে ভরে উঠল মন।
আর ঘরে মন টিকল না। রিমঝিম পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। নূপুরের রিনিঝিনি শব্দটা সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে প্রতিধ্বনিত হতেই বাধ সাধল মিতালী। নিচ থেকে ডাকল তখন,
“বৃষ্টি তে ভিজো না প্রিয়। জ্বর আসবে। সামনে পরীক্ষা তোমার। মাথায় রেখো!”
ভাবির বারণ আজ আর শুনল না প্রিয়ন্তী। ছাদের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে উপরে উঠতে উঠতে বলে গেল ভাবির উদ্দেশ্য,
“নিজের ইচ্ছের কাছে মাঝে মাঝে হার মানতে হয় ভাবী!তুমিও আসতে পারো চাইলে।”
আকাশ ভেঙে পড়া হাজারো জলের কণা নিমেষেই ভিজিয়ে দিলো ওকে। ঠান্ডা জলের ছোঁয়া পেয়ে চোখ দুটো বুজে ফেলল পরম শান্তিতে। দমকা হাওয়া এসে ওর ভেজা শাড়ির আঁচলটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইছে যেন। দু-হাত মেলে দিয়ে ছাদের ঠিক মাঝখানটায় এসে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী।হাতের লাল কাচের চুড়িগুলো বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে।
প্রিয়ন্তী মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে চাইল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ওর মুখে, ঠোঁটে, চোখের পাতায় এসে আছড়ে পড়ছে। নিজের চারপাশ ঘুরে ঘুরে পা ফেলে ধীর লয়ে নাচতে লাগল সে। ভেজা চুলগুলো ওর পিঠে আর গালে লেপ্টে গেছে। জীবনের সব তোলপাড়, সব ভয়, সব দুশ্চিন্তা এই শ্রাবণের অঝোর ধারা এক নিমেষে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিচ্ছে।
ঠিক তখনই, ঝুম বৃষ্টির সেই একটানা সোঁ সোঁ শব্দের বুক চিরে পেছন হতে গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওর কানে,
“বৃষ্টিতে যে আহ্লাদ নিয়ে ভিজছেন,পরে ঠান্ডাটা লাগলে সেবা-যত্ন তো দিনশেষে আমারই করতে হবে! সেই খেয়াল আছে?”
কথাটা কান অব্দি পৌঁছানো মাত্রই সচকিত হলো প্রিয়ন্তী। তড়িৎ ঘুরে তাকাল পিছনে। হৃদপিণ্ডটা আচমকা এক লাফে গলার কাছে চলে এলো বুঝি। ওমনি থমকে গেল চারটে চোখ। প্রিয়ন্তীর মনে হলো এই অঝোর শ্রাবণের মাঝেও বুঝি ওর মাথার ওপর আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়ল! বুক ধড়ফড়ানি বেড়ে গেল শতগুণে। ছাদের দরজার ঠিক পাশে দেয়ালের সাথে আয়েশে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। দু-হাত বুকের কাছে আড়াআড়ি ভাঁজ করে রাখা। ঠোঁটের কোণে প্রচ্ছন্ন হাসি।
প্রিয়ন্তী সম্পূর্ণ পাথর বনে গেল ওখানটায়। প্রবল বিস্ময়ে চোখ দুটো চড়কগাছ! নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এই লোক, এই ঝুম বৃষ্টির দিনে ওদের বাড়ির ছাদে কী করছে?
তাজধীরের পরনে একখান ধবধবে সাদা সিল্কের শার্ট। কালো প্যান্ট। বৃষ্টির ছাঁটে শার্টের উপরিভাগটা সামান্য ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। যার দরুন সুগঠিত পুরুষালি চওড়া বুকটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কপালে এসে পড়েছে দুই-একটা অবাধ্য ভেজা চুলের গোছা।
তবে প্রিয়ন্তীর সমস্ত নজর ওসব পেরিয়ে গিয়ে আচমকা আটকে গেল লোকটার নাকের ওপর থাকা সেই কাটা দাগটায়। বিস্ময়ে তোলপাড় হওয়া প্রিয়ন্তী তখনো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে। বোকার মতোই প্রশ্নটা করল এবার,
“আ আপনি! এখানে? কিভাবে? কখন এসেছেন?”
প্রিয়ন্তীর ওষ্ঠাধর কাঁপিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া বোকাটে প্রশ্নের পিঠে তাজধীর তুরন্ত কোনো উত্তর দিল না। দেয়াল থেকে পিঠ ছেড়ে ধীর কদমে এগোলো সে। লোকটার প্রতিটি কদমে প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরের হাতুড়ি পেটার শব্দটা আরও জোরালো হচ্ছে। একদম মুখোমুখি এসে থামল তাজধীর। বৃষ্টির ছাঁটে ততক্ষণে সিল্কের শুভ্র রঙা শার্টটা ভিজে চুপচুপে।কপালে লেপ্টে থাকা অবাধ্য চুলগুলোর নিচ থেকে ধারালো চোখ দুটো মেলল সে। প্রিয়ন্তীর চোখ, ভেজা গাল আর ওষ্ঠ পেরিয়ে দৃষ্টি জোড়া গিয়ে থমকাল উন্মুক্ত পিঠে এলিয়ে থাকা দীঘল কালো চুলে।
তাজধীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কণ্ঠস্বর মোলায়েম করে বলল,
“উম! কাছ থেকে আপনাকে একটু ছুঁয়ে দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না! তাই সব কাজ, সব ফাইল পেন্ডিং রেখে। সবকিছু ফেলেফুলে ছূটেই এলাম। তবে মনে হচ্ছে আমার কাজ ফেলে আসাটা বোধহয় বিফলে যায়নি।”
কথাটা বলেই তাজধীর আরও এক কদম অগ্রগামী হলো। এবার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াল মেয়েটার। শ্রাবণের দমকা হাওয়া ওদের মাঝের দূরত্বটুকু উধাও করে দিতে চাইছে যেন। তাজধীরের চওড়া বুক থেকে পুরুষালি তীব্র ওম এসে লাগছে প্রিয়ন্তীর বরফশীতল ভেজা শরীরে। তাজধীর ডান হাতটা আলতো করে বাড়িয়ে দিল। বৃষ্টির জল ছুঁয়ে থাকা প্রিয়ন্তীর ঠান্ডা গালটার ওপর নিজের তপ্ত আঙুলগুলো ছুঁইয়ে দিল আলতো করে। মেয়েটা সচকিত হয়ে চোখ বুজে ফেলল তখুনি।
তাজধীর ওই কাঁপন মাখা মুখের দিকে চেয়ে থেকে ঘোরলাগা কণ্ঠে ফের আওড়াল,
“ সমুদ্রের বুকে কত শত ভয়ংকর ঝড়-ঝাপটা দেখেছি। কত ঝড়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে মোকাবেলা করেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু আজ অব্দি প্রকৃতির কোনো ঝড় এই আমাকে বিন্দুমাত্র কাঁপিয়ে তোলার সামর্থ্য রাখেনি। যেটা আজ আপনি রাখছেন। আপনার এই রূপের ঝড় স্বয়ং তাজধীরকে সিদ্দিক আযানের ভিতরটা চুরমার করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট!”
প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতর তখন সুনামি চলছে। দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে চোখ মেলে চাইল সে। চোখ পড়ল লোকটার নাকের ওপর থাকা কাটা দাগটায়। বড্ড ইচ্ছে হলো ছুঁয়ে দেয়ার। ওষ্ঠাধর জোড়া কোনোমতে ফাঁক করে অবিশ্বাসের সুরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আ… আপনি সত্যিই এসেছেন? এটা কি সত্যি?”
কোমরে হাত গলিয়ে হেঁচকা টানে নিজের শক্ত, সুগঠিত বুকের সাথে আছড়ে ফেলল তাজধীর।প্রিয়ন্তী হকচকিয়ে তাজধীরের শার্টের কলারটা দুই হাতে খামচে ধরল। তাজধীর সেই ভেজা মুখের ওপর নিজের মুখটা সামান্য ঝুঁকে আনল। তপ্ত নিঃশ্বাস প্রিয়ন্তীর ওষ্ঠে লেপ্টে দিয়ে গাঢ় স্বরে শুধাল,
“এখন বিশ্বাস হয়েছে?”
তাজধীরের সেই ধারালো প্রশ্নের জবাবে প্রিয়ন্তীর ওষ্ঠাধর আর নড়ল না। এই প্রথম কোনো পুরুষের এতখানি পৌরুষদীপ্ত, তীব্র স্পর্শের সম্মুখীন হতে হয়েছে ওকে। লোকটার শক্ত বাঁধনে পিষ্ট হতে হতেই প্রিয়ন্তীর নাসিকারন্ধ্রে এসে হানা দিল তাজধীরের শরীর থেকে চুইয়ে আসা দামী পারফিউমের সেই মাদকতাময় ঘ্রাণ।অচেনা আবেশে ভেতরটা তুরন্ত দুমড়ে-মুচড়ে গেল মেয়েটার। থরথরিয়ে কেঁপে উঠল।
তাজধীরের ভেজা চুলগুলো কপালের সাথে লেপ্টে আছে। নাকের ওপর থাকা কাটা দাগটা বেয়ে শ্রাবণের দু-ফোঁটা জলের কণা টুপটাপ করে ঝরে পড়ল প্রিয়ন্তীর গাল ঘেঁষে। লোকটার সেই গাঢ়, ঘোরলাগা মোহনীয় চোখের প্রান্তজোড়া তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো চেয়ে রইল প্রিয়ন্তীর কম্পমান মুখশ্রীর পানে। হঠাৎই তাজধীরের ধারালো দৃষ্টি গিয়ে থমকাল চিকচিক করতে থাকা নাকফুলটার ওপর। ফরসা নাকের ছটফটে ডানাটায় থাকা ছোট্ট ডায়মন্ডের নাকফুলটার ওপর এক ফোঁটা বৃষ্টির জল জমে মুক্তোর মতো চকচক করছে। তাজধীর নিজের ডানহাতের বুড়ো আঙুলটা আলতো করে ছড়াল।
পরম যত্নে স্পর্শ করল সেই জলের ফোঁটা।
পরক্ষণেই ঘোর লাগা চোখে মুখটা আরও সামান্য নামিয়ে আনল। সযত্নে ওষ্ঠাধর ছোঁয়াল সেখানটায়।
আকস্মিক আবেশে নিমেষেই প্রিয়ন্তীর চোখের পাতা দুটো বুজে এলো। তপ্ত সেই ওষ্ঠের ছোঁয়ায় পুরো শরীরটা বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো থরথর করে কেঁপে উঠল ওর। সেই কাঁপুনি টের পেয়েই যেন তাজধীরের হাতের কোমরবেষ্টনী আরও শতগুণ দৃঢ় হলো। বুকের সাথে পিষে নিলো অর্ধাঙ্গিনী কে।
প্রিয়ন্তীর কাধের ওপর ছড়িয়ে থাকা ভেজা চুলগুলো নিজের আঙুলে ওপাশে সরালো। উন্মুক্ত হলো মেয়েটার গলার নিচের মেয়েলি ‘বিউটি বোন’। সেখানেও জমে আছে বৃষ্টির কয়েকটা ফোটা। তাজধীর বড্ড তৃষ্ণার্ত চোখে সেই শুভ্র কলার বোনের দিকে চেয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ। তারপর তপ্ত আঙুলে ওখানকার জলটুকু স্পর্শ করে প্রিয়ন্তীর কানের লতি ছুঁয়ে ফিসফিস করে আওড়াল,
“আপনাকে কি আরেকটু গভীরভাবে ছুঁয়ে দিতে পারি, মিসেস তাজধীর সিদ্দিক?”
প্রশ্নটা প্রিয়ন্তীর কানের পর্দা পেরিয়ে মগজে পৌঁছানো মাত্রই লজ্জায় লাল নীল হলো। ফর্সা গাল দুটো ব্লাশিং করতে করতে একদম টমেটোর মতো লালচে রূপ ধারণ করল তখুনি। তাজধীর আর অনুমতির তোয়াক্কা করল না। পুরুষালি ওষ্ঠাধর জোড়া গলার কাছাকাছি নামিয়ে আনতেই সব ভয়, সব জড়তা একপাশে সরিয়ে দু-হাতে লোকটার পিছনের শার্ট এর একাংশ খামচে ধরল প্রিয়ন্তী।
“এই প্রিয়! ওঠ। ওঠ বলছি। কত ঘুমাবি আর?”
তীব্র ঝাঁকুনিতে প্রিয়ন্তীর আবেশিত চোখ দুটো পিটপিট করে চাইল। পুরো শরীর তখনো ঘামে জবুথবু। ও চোখ না খুলেই আধো আধো গলায় আওড়াল,
“আচ্ছা আপনার কণ্ঠটা হঠাৎ এমন শোনাচ্ছে কেন?”
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
“কীরকম?”
“এই যে কেমন যেন শ্রেয়া শ্রেয়ার মতো শোনাচ্ছে!”
“বলদী মাইয়া! আমি শ্রেয়াই। ওঠ বলছি।কি সব আবোলতাবোল বকছিস ঘুমের ঘোরে? ওঠ!”
চেনা ধমকটা কান অব্দি পৌঁছানো মাত্রই ধরফর করে বিছানায় উঠে বসল প্রিয়ন্তী। চোখের পলক ফেলে চাইল সামনে। কোথায় ছাদ? কোথায় বৃষ্টি? আর কোথায় সেই তামাটে পাষণ্ড পুরুষটা?
বরং সামনে অগ্নিমূর্তি হয়ে দুই হাত কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে ওর বান্ধবী। শ্রেয়া! প্রিয়ন্তীর বুকটা তখনো কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। দিকবিদিকশূন্য হয়ে বোকার মতো এদিক-ওদিক তাকাল আবার। ঘরের জানলা-কবাট সব বন্ধ। বাইরে কড়া রোদ! শ্রেয়া ওর ওই বোকাটে মুখের দিকে চেয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ফাজিল মাইয়া! কখন থেকে ডাকতাছি ওঠার কোনো নামগন্ধ নাই। আর তোর গাল দুটো এমন ব্লাশিং করতাছে কেন রে? কী এমন স্বপ্ন দেখছিলি ঘুমের ঘোরে, শুনি?”
প্রিয়ন্তী এবার সচকিত হয়ে নিজের পরনের ড্রেসটার দিকে তাকাল। কই, লাল-সাদা শাড়ি তো নেই! ও তো সকালে যে থ্রি-পিসটা পরেছিল, সেটাই জড়িয়ে আছে শরীরে। চরম হতাশায় বিরবিরালো,
“তার মানে এতক্ষণ যা দেখছিলাম। সবটাই স্বপ্ন ছিল!”
শ্রেয়া দুই হাত কোমরে গুঁজে যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, সেভাবেই রইল
“কী রে? কথা কস না কেন? একদম বোবা বনে গেলি যে! সত্যি করে বল স্বপ্নে কী এমন দেখছিলি যার জন্য গাল-কান এভাবে লাল হয়ে আছে?”
প্রিয়ন্তী ততক্ষণে নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তড়িঘড়ি করে গায়ের চাদরটা টেনে টুনে গলার কাছে এনে চোখ-মুখ স্বাভাবিক করার ভান করল। ঢোক গিলে বলল,
“কী কী দেখব আবার? কিছু না তো। এমনিই। গরমে ঘুমাচ্ছিলাম তো। তাই হয়তো ফেস লাল হয়ে গেছে।”
শ্রেয়া এক গাল হাসল।মেয়েটার চোখের কোণের ধূর্ত চাউনি দেখে প্রিয়ন্তীর পিঠ ঘেমে উঠল অচিরে। শ্রেয়া ওর মুখের ওপর ঝুঁকে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আমাকে ফাঁকি দেওয়া এত সোজা না মাইয়া ! তোর লক্ষণ বড্ড খারাপ। এই নির্লজ্জ মাইয়া! সত্যি করে বল তো, তুই স্বপ্নে এক্কেবারে বাসর-টাসর সেরে ফেলিসনি তো?”
“শ্রেয়াআআ!”
প্রিয়ন্তী দুই হাতে বালিশটা খামচে ধরে সজোরে চেঁচিয়ে উঠল।পরোক্ষনে শ্রেয়াকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরাতে সরাতে বলল,
“যা ইচ্ছে তা-ই? আবোলতাবোল বকিস না তো!”
“আরে সত্যি করে বল না প্রিয়! তুই স্বপ্নে বাসর করিসনি তো? দেখিস ভাই, আমার কিন্তু শখ তোর বাসর ঘর সাজানোর। এখনই স্বপ্নে সব সেরে ফেলে আমার সেই অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করিস না প্লিজ! তুই আদতে কী দেখেছিস বলবি তো?”
“উফ শ্রেয়া, তুই জাস্ট থামবি এবার? সকাল সকাল কোথা থেকে যে এত নোংরা বুদ্ধি নিয়ে হাজির হস!”
প্রিয়ন্তী বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে নিজের ওড়নাটা ঠিক করতে করতে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল। শ্রেয়া এবার দুষ্টুমি ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা যা, আর ক্ষ্যাপালাম না। কিন্তু তুই যে এত সুখের নিদ্রা দিচ্ছিলি। তোর কি খেয়াল আছে বাইরে কী চলছে? আজ ভার্সিটিতে এত ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস ছিল!”
প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকে জানলার দিকে তাকাল। বাইরে তখনো রোদের তেজ কড়া। ও অবাক হয়ে বলল,
“তুই ভার্সিটি যাসনি কেন আজ? আর তুই আমাদের বাড়ি এলি কখন?”
“যাব কীভাবে? সকালবেলা যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন তো আকাশ ভেঙে এমন ঝুম শ্রাবণের বৃষ্টি নামল যে ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় ছিল না।”
প্রিয়ন্তী মনে মনে হিসাব মেলাল। তার মানে ও যখন ঘুমাচ্ছিল, তখন সত্যিই বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল! আর সেই বৃষ্টির সোঁ সোঁ আওয়াজ আর শীতল বাতাসই ওর অবচেতন মনে ওই ঘোরলাগা স্বপ্নের জাল বুনেছে।শ্রেয়া ফের বলতে লাগল,
“তারপর বৃষ্টিটা একটু কমতেই আমি আর দেরি করলাম না। ব্যাগ গুছিয়ে সোজা তোদের বাড়ি চলে এলাম। এসে দেখি তুই তখনো আয়েশ করে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিস। ভাবী বলল ডাকতে, তাই তো এলাম।”
প্রিয়ন্তী এবার টেবিলের ওপর ছড়ানো বইখাতাগুলোর দিকে চাইল। সামনেই ফাইনাল পরীক্ষা। অথচ ওর পড়াশোনার এই বেহাল দশা! ও এক হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে বিছানায় বসল আবার। ধীর গলায় বলল,
“ভালোই করেছিস চলে এসেছিস। আমার পড়াশোনার যা অবস্থা, মাথা কাজ করছে না একদম।ভাইয়া তো বলেই দিয়েছেন।এবার রেজাল্ট খারাপ হলে রক্ষে নেই।”
শ্রেয়া ব্যাগ থেকে নিজের নোটখাতাগুলো বের করতে করতে বলল,
“সেই জন্যই তো গ্রুপ স্টাডি করতে আসা। অনেক দিন ধরে তো শুধু ফাঁকিবাজিই করলি। এবার একটু বই-খাতা নিয়ে বস। এই কদিন একদম জানপ্রাণ দিয়ে পড়তে হবে, বুঝলি? নে, ফটাফট মুখ-হাত ধুয়ে আয়। আমি চ্যাপ্টারগুলো দাগিয়ে রাখছি।”
শ্রেয়া খাতাটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে হুট করেই প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে চাইল এবার। চোখ দুটো ছোট ছোট করে বেশ কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করল ওকে। প্রিয়ন্তী বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে নিতেই শ্রেয়া পেছন থেকে ডেকে উঠল,
“এই প্রিয়, শোন তো একটু!”
প্রিয়ন্তী থমকে দাঁড়িয়ে ঘাড় বাঁকাল,
“কী হলো?”
শ্রেয়া বিছানা থেকে উঠে একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল।
“তোকে কেমন যেন অন্যরকম লাগছে রে আজকে দেখতে! মানে… কেমন যেন একটা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।”
প্রিয়ন্তী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নিজের গালে হাত দিল,
“কীরকম লাগছে?”
“বউ বউ লাগছে!”
“ধুর শ্রেয়া! যা তা বলিস না তো।”
“ওই! ওয়েট ওয়েট! তুই নাকফুল পরেছিস কবে? গতকালও তো তোকে দেখলাম না নাকফুল পরা। আজ হঠাৎ?”
প্রিয়ন্তী অপ্রস্তুত হয়ে নিজের নাকের ওপর হাত রাখল। ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল,
“আঁ… হ্যাঁ ওটা আসলে। ভাবী এনে পরিয়ে দিয়েছে।”
শ্রেয়া ভ্রু জোড়া কুঁচকে কপালে তুলল,
“ভাবী এনে পরিয়ে দিয়েছে মানে? হঠাৎ ভাবী তোকে নাকফুল পরাবে কেন?”
“না… আসলে উনি দিয়েছেন।”
“উনি দিয়েছেন মানে? ওয়েট, আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না রে! উনি দিয়েছেন, আবার বলছিস ভাবী এনে পরিয়েছে। বুঝলাম না তো কিছু!”
“ভাবী সবটা জানে শ্রেয়া।”
শ্রেয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিস্মিত হয়ে চোখ বড় বড় করে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল,
“জানে মানে? কী বলছিস তুই এসব প্রিয়? তোর ভাবী সব জানে?”
“হ্যাঁ, ভাবী প্রথম থেকেই সবটা জানে। আমাদের বিয়ের বিষয়টা প্রথম থেকেই ভাবীর জানা ছিল।”
শ্রেয়া কপালে এক হাত চাপড়ে বিছানায় ধুপ করে বসল,
“তোর ভাবী তো সাংঘাতিক জিনিস মাইরি! এত বড় একটা কথা চেপে বসে আছে? তা… তোর ভাইয়াও কি জানে নাকি?”
প্রিয়ন্তী আঁতকে উঠে বলল,
“না! মাথা খারাপ তোর?ভাইয়া জানলে তো এতক্ষণে কেয়ামত হয়ে যেত এ বাড়িতে।”
শ্রেয়া এবার প্রিয়ন্তীর নাকের আরও কাছাকাছি মুখটা নিয়ে এলো। চকচকে পাথরটার দিকে চেয়ে নিখুঁত এক দৃষ্টি মেলাল। তারপর চট করে বলল,
“তা যা-ই বলিস বোন, এটা তো সাধারণ কোনো কাচ বা পাথর না। দেখে তো খাঁটি ডায়মন্ডের নোজ পিন মনে হচ্ছে!”
“ডায়মন্ডই।”
“একটু কাছে আয় তো। ভালো করে দেখি।”
শ্রেয়া প্রিয়ন্তীর চিবুক ধরে নিজের দিকে টানল।
প্রিয়ন্তী বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ওর হাতটা সরিয়ে দিল,
“কী দেখবি তুই এত?”
শ্রেয়া এবার বেশ অভিজ্ঞ জহুরির মতো নাকফুলটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কাটল। মাথা নেড়ে বলল,
“না রে প্রিয়, এটা তো যেই সেই ডায়মন্ড মনে হচ্ছে না। পাথরের কাটিং আর এই ফিনিশিং দেখ! এটা ভীষণ এক্সপেন্সিভ কোনো নামী-দামী ব্র্যান্ডের ডায়মন্ড মনে হচ্ছে আমার কাছে। কত দিয়ে কিনেছে রে এটা তোর বর?”
“জানিনা তো!”
“ভাবী কিছু বলেনি তোকে?”
“না।”
শ্রেয়া একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
“আমার তো দেখেই মনে হচ্ছে এটা ভীষণ এক্সপেন্সিভ ডায়মন্ড। বাবা! বিয়ে হতে না হতেই এত দামী গিফট দিয়ে দিল লোকটা? তোর কপাল তো দেখি সেই খুলে গেছে!”
“ধুর বাল ! ডায়মন্ড তো এমনিতেও এক্সপেন্সিভই হয়। ওতে এত তফাত করার কী আছে?”
“আরে না, তুই বুঝবি না।আমার তো এটা কোনো সাধারণ বাংলাদেশী ডায়মন্ড বলেই মনে হচ্ছে না। তুই হয়তো জানিস না, আমার ছোট চাচ্চুর তো জুয়েলারি আর ডায়মন্ডের বড় বিজনেস আছে। চাচ্চুর দোকানে গিয়ে বসে বসে এই পাথরের চকমকানি আমি কম দেখিনি! এই নাকফুলের যে স্পার্ক আর যে মেটেরিয়াল, এটা কোনো ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডের কালেকশন। আমাদের দেশের লোকাল মার্কেটে এসব ডিজাইন মেলা ভার।”
”একেবারে পাগল হয়ে গেছিছ তুই শ্রেয়া! মাথাটা কি আজ আসলেও গেছে তোর? উনি এত দামী বিদেশী ডায়মন্ড কোথা থেকে আনবে শুনি? বাংলাদেশী কোনো নরমাল ডায়মন্ডই হবে ওটা। সাধারণ কোনো শপে তৈরি। তুই বেশি বুঝিস তো! তাই সব জিনিসেই ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড দেখিস!”
চোখ রাঙিয়ে জেদ ধরে বলল শ্রেয়া,
“তুই আমাকে যত ইচ্ছা খ্যাপা, কিন্তু আমার চোখ কখনো ভুল দেখতে পারে না প্রিয়! এই নোজ পিন কোনো সাধারণ ডায়মন্ড নয়। তুই লিখে রাখ।”
প্রিয়ন্তী আর কথা বাড়াল না। শ্রেয়ার কথার পিঠে কোনো পাল্টা যুক্তি না দিয়ে ও দ্রুত বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। বেশ কয়েক ঘন্টা লাগিয়ে পড়ল দুজনে মিলে।তবে পুরোটা সময় প্রিয়ন্তীর মনে খচখচ করেই গেল। শ্রেয়া চলে গেলেও ওর খচখচানি কমল না।
“তোর বিশ্বাস না হলে নোজ পিনের বক্সটা একবার এনে দেখ। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এটা নরমাল কোনো ডায়মন্ড না প্রিয়!”
শ্রেয়ার কথাটা বারবার কানে বাজছে প্রিয়ন্তীর।পুরোটা সময় মেয়েটা তর্ক করে গেছে একপ্রকার।শ্রেয়ার এই আত্মবিশ্বাস দেখে এবার সত্যি সত্যি দোটানায় পড়ল প্রিয়ন্তী। সত্যিই কি তাই? আর তর সইলো না প্রিয়ন্তীর। তীব্র কৌতুহল চেপে পা বাড়াল ভাবির রুমের দিকে। মিতালী তখন ছাদে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলমারির ড্রয়ার খুলে নোজ পিনের ছোট্ট বক্সটা খুঁজতে শুরু করল সে। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় পেয়েও গেল বক্সটা। রবিন এগ ব্লু” (Robin Egg Blue) কালারের মখমলে মোড়ানো লাক্সারি বক্সের ওপর সাদা অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে একটি নাম।
”Tiffany & Co.”
বিস্ফোরিত হলো প্রিয়ন্তীর চাহুনি। এই ব্র্যান্ডের নাম ও চেনে না এমন নয়। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আর আকাশছোঁয়া দামী জুয়েলারি ব্র্যান্ড এটি! তবে কি শ্রেয়ার কথাই তবে সত্যি? কিন্তু উনি সাধারণ এক নেভি অফিসার হয়ে এত দামী ব্রান্ডের গয়না কোথা থেকে পেলেন? ক্যামেরা অন করে চটপট দুটো ছবি তুলল বক্সটার। পাঠিয়ে দিলো শ্রেয়ার আইডি তে।মিনিটের মধ্যেই কল দিলো শ্রেয়া। ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নেওয়া মাত্রই ওপাশ থেকে শ্রেয়া প্রায় চিৎকার করে উঠল,
“ওরে আমার খোদা! প্রিয়! তুই এই বক্স পেলি কোথায়? আমি তোকে কী বলেছিলাম? আমার চোখ কখনো ভুল হতে পারে না, দেখেছিস তো?”
প্রিয়ন্তী শুকনো ঢোক গিলে কবাটের দিকে একবার চাইল। মিতালী এখনো ছাদ থেকে নামেনি। ও গলার স্বর নিচু করে বলল,
“আচ্ছা শ্রেয়া এটার প্রাইজ কেমন রে?”
” এই Tiffany-র একটা সাধারণ নোজ পিনের প্রাইস কত থেকে শুরু জানিস? এইটার প্রাইজ সর্বনিম্ন ১০ লক্ষ টাকা থেকে শুরু! কাটিং আর ক্যারেট ভেদে আরও বেশিও হতে পারে। ভাবা যায়? লোকটা তোকে কতটা এক্সপেন্সিভ আর লাক্সারি গিফট দিয়েছে বিয়ে হতে না হতেই! তোকে তো মাথায় করে রাখার মতো বর পেয়েছিস তুই।”
প্রত্যুত্তর করল না প্রিয়ন্তী। শ্রেয়ার সাথে কোনোমতে কথা শেষ করে ফোনটা কেটে দিল।১০ লক্ষ টাকা! সর্বনিম্ন ১০ লক্ষ!প্রিয়ন্তী বক্সটা যথাস্থানে রেখে আলমারির ড্রয়ারটা সাবধানে আটকে দিল। ও যতটুকু জানে, একজন নেভি লেফট্যানেন্ট কমান্ডারের সেলারি তো এমন আকাশছোঁয়া নয় যে হুট করে দশ লক্ষ টাকার নাকফুল গিফট করে বসবেন!
তীব্র এক অস্থিরতা নিয়ে প্রিয়ন্তী দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই দেখল মিতালী ছাদ থেকে কাপড় নিয়ে নেমে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে সেগুলো ভাঁজ করতে ব্যস্ত। প্রিয়ন্তী গেল সেদিকেই। মিতালী কাপড় ভাঁজ করতে করতেই পায়ের শব্দে মুখ তুলে চাইল। আলতো হেসে বলল,
“কিছু খাবে?”
প্রিয়ন্তী সোফার একপাশে বসে ভাবীর দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। চোখের দৃষ্টি জোড়া স্থির রেখে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব সত্যি করে উত্তর দিবে তো ভাবি?”
মিতালী একটু অবাক হলো। কাপড় একপাশে রেখে বলল,
“বলোনা, কী হয়েছে?”
“আচ্ছা ভাবী উনি যে নাকফুলটা পাঠিয়েছেন, সেটার প্রাইস কেমন? কত দিয়ে কিনেছেন ওটা?”
প্রিয়ন্তীর মুখ থেকে হুট করে এই অদ্ভুত প্রশ্নটা শুনে মিতালী তুরন্ত কিছুটা থতমত খেল। চট করে নিজেকে সামলে নিয়ে শুধাল,
“হঠাৎ এই প্রশ্ন প্রিয়? কেন তোমার কি ওটা পছন্দ হয়নি?”
“তেমনটা না ভাবী। ওটা ভীষণ সুন্দর। কিন্তু তুমি জাস্ট বলো না। এটার প্রাইস কত?”
প্রিয়ন্তীর তীক্ষ্ণ নজর এড়ালো না মিতালীর চোখ। বুঝল মেয়েটা সবটা জেনেই ওকে এমন প্রশ্ন করছে। তাই মিতালী আর অযথা লুকোচুরির আশ্রয় নিলো না। সোজা-সাপ্টা ভাষায় বলে দিল,
“এই তো ১০-১২ লক্ষ টাকার মতো হবে।”
দশ-বারো লক্ষ! শ্রেয়ার অনুমান তবে এক ফোঁটাও ভুল ছিল না! প্রিয়ন্তী চরম অবিশ্বাবে তাকাল ভাবীর শান্ত মুখে। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল তখুনি। আমতা আমতা করে বলল,
“এত… এত দামী একটা জিনিস হুট করে আমাকে দিয়ে দিলেন?”
“তাতে কী হয়েছে প্রিয়? নিজের অর্ধাঙ্গিনীকে সামান্য একটা জিনিস উপহার দিয়েছে। এর মধ্যে এত ভাবার কী আছে? নিজের সাথে সামান্য একটা জিনিসের এভাবে কম্পেয়ার করতে নেই।”
ভাবীর মুখে ‘সামান্য’ শব্দটা শুনে প্রিয়ন্তী যেন আকাশ থেকে পড়ল। চোখ দুটো বড় বড় করে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল,
“তোমার কাছে এই জিনিসটা সামান্য লাগছে ভাবী? ১০-১২ লক্ষ টাকা তোমার কাছে সামান্য? এতটা স্বাভাবিকভাবে কীভাবে বলছ তুমি?”
মিতালীর চেহারায় তবুও কোনো হেলদোল দেখা গেল না। যেন আগে থেকেই জানত প্রিয়ন্তীর প্রতিক্রিয়া এমনটাই হবে। প্রিয়ন্তী এবার ভাবীর আরও কাছে ঘেঁষে বসল।
“ভাবী, আমি যতটুকু জানি নেভির একজন অফিসারের সেলারি তো এতটা বেশি না যে এক নিমেষে ১০-১২ লক্ষ টাকা খরচ করে একটা নাকফুল কিনে ফেলবেন। উনার কি নেভির প্রফেশন ছাড়াও অন্য কোনো পরিচয় আছে? অন্য কোনো সোর্স আছে যেখান থেকে এত টাকা আসে? প্লিজ ভাবী, সত্যিটা বলো।”
মিতালী চুপ রইল কীয়তক্ষণ। ঠোঁট কামড়ে ভেবে চলল অনেক কিছু। এরপর বলল,
ডেসটেনি পর্ব ৩৩
“তোমার যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তার পরিচয়টা শুধু ওই নেভির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় প্রিয়। ওই প্রফেশন ছাড়াও তার আরো পরিচয় আছে। আর সেই সত্যিটা খুব শীঘ্রই তুমি জানতে পারবে। তার জীবনের সঙ্গে যেহেতু জড়িয়েছই আস্তে আস্তে সবটাই জানতে পারবে। সেই তোমাকে বলবে। কারণ এখন তুমি তার অর্ধাঙ্গিনী। দিনশেষে তো তার সেই বিশাল সাম্রাজ্য আর সবটা তোমাকেই তো সামলাতে হবে।তাইনা?
