Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ১২

তাকদিরে তুমি পর্ব ১২

তাকদিরে তুমি পর্ব ১২
মোনালিসা মেহরোজ

মির্জা গ্রুপের প্রধান অফিসের দশম তলায় নিজের কেবিনে বসে আছে আসিফ। সামনের কাঁচের দেয়াল পেরিয়ে পুরো শহরটা দেখা যাচ্ছে। ব্যস্ত রাস্তা, ছোট ছোট গাড়ি, দূরের উঁচু ভবন—সবকিছুই যেন অদ্ভুত লাগছে তার কাছে।
ডেস্কের উপর ছড়িয়ে আছে কয়েকটা ফাইল।
আসিফ ফাইল খুলে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মনটা বারবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। ভিষন অস্থির লাগছে নিজেকে৷ বারবার বাবার বলা কথাগুলো কানে বাজছে তার।
অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। এই অফিসে সে আগেও দু’একবার এসেছে। কিন্তু আজকের মতো করে কখনো বসেনি। কখনো আসেনি কাজ করার উদ্দেশ্য। কখনো এসেছে নিজের প্রয়োজনে,কখনো টাকা ফুরিয়ে গেলে সেটা আদায় করতে। এছাড়া কি এসেছিলো সে? কখনো গুরুত্ব দিয়েছে বাবার কাজকে?
অথচ আজ যেন আসিফ প্রথমবার বুঝতে পারছে—এই বিশাল ভবনটা শুধু ইট-পাথরের একখানা দালানকোঠা নয়। এটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার দাদা-বাবার ইতিহাস-পরিশ্রম আর এক আকাশ আকাঙ্খা।

আসিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তাকায় কাচের দেওয়াল ভেদ করে শুভ্র রঙা নির্মল আকাশের পানে৷ উজ্জ্বল মেঘগুলো আজ বড্ড অস্থির, ঠিক আসিফের মনের মতোই। চঞ্চল বাতাসের তোপে এপাশ থেকে ওপাশে দোল খেয়ে যাচ্ছে মেঘের ভেলারা।
ঠিক তখনই টেবিলের উপর রাখা ফোনটা কেঁপে উঠলো তার।স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ছায়ার নামটা।
আসিফ ভ্রু কুঁচকে কল রিসিভ করলো। কানে ধরে স্বাভাবিক গলায় বললো—-
—হ্যালো।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো ছায়ার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ।
—কোথায় তুমি? সকাল থেকে ফোন দিচ্ছি! ধরছিলে না কেনো?
—ব্যস্ত ছিলাম।
ছায়া নামক মেয়েটার কপাল কুঁচকে গেলো৷ আসিফ ব্যাস্ত? জিজ্ঞেস করলো ফের—
—ব্যাস্ত মানে?কোথায় তুমি? কি করছো?
—অফিসে এসেছি। কাজ ছিলো।
ওপাশে ছায়ার কানে বোধহয় বিস্ফোরণ ঘটলো এহেন অবস্থা। অবিশ্বাস্য গলায় খানিক চিৎকার করে বললো—-

—হোয়াট? অফিসে মানে?
—অফিসে মানে অফিসে।
আসিফের কথার পাছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওপাশ একদম চুপ হয়ে গেলো৷ আজ প্রথমবার সে শুনলো আসিফ অফিসে এসেছে। তাও কাজের উদ্দেশ্য। কই? আগে তো কখনো যায়নি! তাহলে হুট করে আজ কেনো গেলো? ছায়ার চোখমুখ লাল হয়ে এলো ফাতিহার কথা মনে পরতেই। তার উতপ্ত শ্বাসের সুস্পষ্ট আওয়াজ কানে লাগলো আসিফের। নিশ্চুপ রইলো পুরুষটি। তারপর আচমকাই ছায়ার কণ্ঠ বদলে খানিকটা কঠোর হয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলো আরো একবার—
—সত্যি গেছো?
—হ্যাঁ।
—বাহ্।
ছায়ার কণ্ঠে স্পষ্ট বিদ্রূপ ফুটে উঠলো, যা আসিফের বুঝতে বেশি বেগ পোহাতে হলো না। কপাল কুঁচকে গেলো পুরুষটির। সামনে খুলে রাখা ফাইলখানা বন্ধ করে মনোযোগ দিলো ছায়ার কথায়।

—তাহলে অবশেষে শুরু হয়ে গেছে?
আসিফ বিরক্ত হলো। বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে জানতে চাইলো—-
—কি শুরু হয়েছে?
—ফাতিহার ট্রেনিং।
আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো কথাটা কানে যেতেই। হাতের মুঠোই শক্ত করে দাঁতে দাঁত চাপলো।
—ছায়া, বাজে কথা বলা বন্ধ করো।
—বাজে কথা বলছি আমি?
তাচ্ছিল্য হাসলো ছায়া। ওপাশ থেকে এহেন হাসির শব্দ কানে সুস্পষ্ট ভেসে এলো আসিফের। আচানক নাকের পাটা ফুলে উঠলো তার। কোথাও একটা খুব জোড়ে আঘাত করলো এহেন তাচ্ছিল্যতা। আসিফ চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো।
—বিয়ের আগে তুমি কেমন ছিলে মনে আছে? কারো কথা শুনতে না। নিজের মতো চলতে, কখনো অফিসের দোরগোড়ায় তোমায় যেতে দেখিনি। কখনো কারো আদেশ পালন করতে দেখিনি। আর সেই আসিফ এখন কি করছে? অফিস….!

—ছায়া…
—এখন তোমার বউ বলছে অফিসে যাও, তুমি অফিসে যাচ্ছো। বউ বলছে এটা করো, তুমি সেটা করছো। আরেকটু দিন গেলে দেখবে ও যা বলবে, তুমি তাই করবে।
আসিফ থমকালো। কেন জানি কথাগুলো কানে বিঁধে গেলো তার। ছায়া থামলো না। দাঁতে দাঁত চেপে ফের বললো—-
—তুমি বুঝতে পারছো না আসিফ, মেয়েটা ধীরে ধীরে তোমাকে কন্ট্রোল করছে। নিজের হাতের পুতুল বানাচ্ছে তোমায়। সে তোমায় যা বলছে তুমি তাই….।
—স্টপ ইট, ছায়া।
—আমি মিথ্যা বলছি?
—আমি বলেছি থামো।
—তুমি কি নিজের সিদ্ধান্তে অফিসে এসেছো? নাকি ফাতিহা বলেছে বলে?
প্রশ্নটা শুনে আসিফের মুখ শক্ত হয়ে গেলো।

মুহূর্তেই সকালের দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো তার। সত্যিই কি সে ফাতিহার কথায় এসেছে? ফাতিহার দৃঢ়তা তাকে বাধ্য করেছে আজ তার গড়া নিয়ম ভাঙতে? সে তো স্বাধীন। কখনো কারো জন্য নিজের ইচ্ছে অথবা নিজের গড়া স্বাধীনতার প্রাচীর ভাঙেনি। তাহলে আজ! আজ কি তবে তার গড়া নিয়ম ভাঙতে বাধ্য করেছে ওই মেয়েটা? ফাতিহা নামক মেয়েটা কি সত্যিই তাকে কন্ট্রোল করতে শুরু করেছে? একটু একটু করে হাতের মুঠোই নিয়ে নিচ্ছে তাকে! খেলনা পুতুল হয়ে যাচ্ছে আসিফ?
কথাগুলো বারি খেতে লাগলো আসিফের কর্ণগোহরে। সে চোখজোড়া বন্ধ করে নিলো শক্ত করে। দাঁতে দাঁত চেপে ওপাশের ছায়াকে কড়া গলায় হুশিয়ার দিয়ে বললো—

—এনাফ, ছায়া! অনেক হয়েছে।
ছায়া তাচ্ছিল্য হাসলো ফের। ঠোঁট বাকিয়ে বললো—
—সত্যি কথা শুনতে খারাপ লাগছে?
—ছায়া, তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো।
—আর তুমি নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলছো।
আসিফ নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করলো। ধমকালোও ছায়াকে। তবে ছায়া আর থামলো না।
বরং আগুনে ঘি ঢালার ন্যায় কথার বিষ বিস্তার করতে লাগলো আসিফের কানে। যা আসিফকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নিজের অবস্থান ভুলিয়ে দিলো। তার কানে বাজতে লাগলো ছায়ার প্রতিটি বিদ্রুপাত্মক কথা।

খানিকবাদে তীব্র রাগে কাঁপতে কাঁপতে কল কেটে দিলো আসিফ। কেবিনজুড়ে নেমে এলো ভারী নীরবতা। আসিফের বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। মাথার ভেতর যেন ঝড় বইছে।একদিকে বাবার কথা। অন্যদিকে ছায়ার কথা। আর পরিশেষে ফাতিহার শীতল আচরণের প্রতিচ্ছবি ভাসতে থাকলো আসিফের মানসপটে।
হঠাৎ করেই আসিফ মুঠোবদ্ধ হাতটা ডেস্কের উপর আঘাত করলো। ধাম করে শব্দ হলো তাতে৷
ফাইলগুলো কেঁপে উঠলো মৃদু। তীব্র রাগে ফুঁসতে লাগলো আসিফ৷ বারবার কানে বাজছে একটা কথাই-“তুমি ফাতিহার হাতের পুতুল হয়ে যাচ্ছো…”
তীক্ষ্ণ চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো আসিফের।
সে হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। মনে মনে শুধু একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে, আর সেটা হলো ফাতিহা। আর সেই নামের সঙ্গেই অদ্ভুতভাবে মিশে যাচ্ছে তার মনের তীব্র রাগ, বিরক্তি, আর এক অজানা অস্থিরতা।

আসিফ আর দাঁড়ালো না। বরং নিজ বাবার থেকেও অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন অথবা জানানোর প্রয়োজন মনে না করে গটগট পায়ে অফিস থেকে বেড়িয়ে এলো। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অফিসের মেইন ফটক পেরিয়ে যখন সে রাস্তায় নামলো তখনি আযান মির্জা তিন’তলা হতে তার গাড়িটি দেখতে পেলেন। অবাক হলেন তিনি৷ হুট করেই না বলে এভাবে কেনো সে চলে গেলো তা বুঝে উঠতে পারলেন না। আর না-তো তিনি ফোন করলেন কারণ জানতে।
বরং অদ্ভুত এক অভিমান জন্মালো ছেলের প্রতি। মলিন হাসলেন তিনি। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিলেন। দীর্ঘক্ষন বাহিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মলিন হাসলেন আবারো। মনটা বড্ড ভারী হয়ে উঠলো ছেলের কাজে। তার ছেলে কি কখনোই তার কাজকে আপন করতে পারবে না! কখনোই কি আসিফ বুঝবে না তার বাবাকে?

বাড়িতে পৌঁছে আসিফ কোনদিকে তাকালো না। গটগট পায়ে চলে গেলো নিজের রূমে। বসার ঘরের একপাশে বসে ছিলেন সায়না মির্জাসহ ফাতিহা নিজেও। আসিফের এহেন উগ্রতা দেখে দু’জনের কপালেই ভাজের সৃষ্টি হলো। সায়না মির্জা ছেলেকে ডাকলেন, তবে আসিফ সাড়া দিলো না। চিন্তিত হয়ে পরলো মায়ের মন। দ্রুত তিনি বসা হতে উঠে পরলেন তিনি। অস্থির গলায় ফাতিহাকে সুধালেন—–
—আম্মা! ছেলেটার কি হলে? জবাব দিলো না কেনো আমাকে?
ফাতিহা শাশুড়ীর হাতে হাত রাখলো। ভরসা দিয়ে নিচু স্বরে বললো—-
—আমি দেখছি, আপনি চিন্তা করবেন না আম্মু, ঘরে যান।
বলেই সে ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলো। আলতো হাতে লেবুর ঠান্ডা শরবত বানিয়ে বেড়িয়ে আসতেই দেখলো সায়না মির্জা চিন্তিত মুখে এখনো সেখানেই দাঁড়িয়ে। মৃদু হাসলো ফাতিহা।

—নিশ্চিন্তে ঘরে যান। আমি দেখছি।
সায়না মির্জা পুত্রবধূর পানে তাকিয়ে মলিন হাসলেন। অতঃপর ধীর পায়ে ত্যাগ করলেন স্থান। ফাতিহা সেদিকে তাকিয়ে ধীর পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে এলো। পায়ে পায়ে দরজার সামনে এসে থামলো সে। ভেতর থেকে শাওয়ার বন্ধ হওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বাথরুমের দরজাটা খুলে গেলো।
সাদা তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছতে মুছতে বাইরে বেরিয়ে এলো আসিফ। পরনে শুধু কালো ট্রাউজার। ভেজা শরীর বেয়ে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে। কাঁধের পেশিগুলো টানটান। মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকমের কঠিন।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ফাতিহাকে দেখে এক মুহূর্ত থামলো সে। ফাতিহা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিলো। মুখ নামিয়ে ওড়নাটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো হাতের ভাজে। নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে এসে ট্রেটা এগিয়ে দিলো।
—অনেক গরম পড়েছে। ঠান্ডা লেবুর শরবত বানিয়েছি, খেয়ে নিন।
আসিফ কোনো উত্তর দিলো না।শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। ফাতিহা আবারও শান্ত স্বরে বললো—

—খেয়ে নিলে একটু ভালো লাগবে। ধরুন।
কথাটা শেষ হতেই আসিফের ভেতরে যেন জমে থাকা সব রাগ একসঙ্গে জ্বলে উঠলো। মনে পরলো ছায়ার বলা প্রতিটি কথা। ছায়ার বিদ্রুপাত্মক হাসিও তার কানে বেজে উঠলো। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো সে। ফাতিহার হাত থেকে গ্লাসটা টেনে নিলো। অতঃপর চোখে চোখ রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললো—-
—আমি কী খাব, কী খাব না সেটা কি এখন তুমিই ঠিক করবে?
ভিষন অবাক হলো ফাতিহা। সামান্য একটা বিষয়ে আসিফের এতোটা কঠোরতা সে আশা করে নি। শান্ত স্বরেই ফের বললো—
—আমি শুধু…
—শুধু কী?
কর্কশ কণ্ঠে থামিয়ে দিলো আসিফ। একপা এগিয়ে এসে আবারো বললো—
—সকালেও তুমি ঠিক করেছো আমি কোথায় যাবো না যাবো। এখন ঠিক করছো আমি কী খাব!
ফাতিহা বিস্মিত চোখে তাকালো।
—আপনি ভুল বুঝছেন…
—চুপ!
কথার মাঝখানেই আচমকা গর্জে উঠলো আসিফ।
পুরো ঘর কেঁপে উঠলো তার গর্জনে। ফাতিহা কেঁপে মাথা নত করে নিলো।

—আমার জীবনে নাক গলানোর অভ্যাস অথবা দুঃসাহস দেখানো আজই বন্ধ করো।
ফাতিহা শুকনো ঢোক গিললো কেবল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে ধীরে বললো—
—আমি আপনার ভালো…
কথা শেষ হওয়ার আগেই আসিফ গ্লাসটা সজোরে মেঝেতে ছুঁড়ে মারলো। ঝনঝন শব্দে কাঁচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শরবতের ঠান্ডা পানি ছিটকে ভিজিয়ে দিলো মেঝে। ঘরটা মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। ফাতিহা চমকে উঠলেও এক পা-ও সরলো না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আসিফের দিকে। মুখ আড়াল করে রাখা ওড়নাটা হাতের মুঠোই শক্ত হয়ে এলো। তবে সে নড়লো না, কোনরূপ ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলো না। আর এটাই যেন আরও ক্ষেপিয়ে দিলো পুরুষটিকে। আসিফ দাঁতে দাঁত চেপে আঙুল তুলে শাসিয়ে বললো—-

—বের হও।
ফাতিহা লম্বা শ্বাস টানলো। নরম গলায় বললো—
—আপনি রেগে আছেন,কিন্তু কেনো?
—আমি বলেছি বের হও!
তবুও ফাতিহা নড়লো না। দৃষ্টি স্থির রেখে পুনরায় মুখ খুললো—-
—এমন আচরণ করার মানে কি?
—কারণ আমি তোমায় ঘৃণা করি। আই জাস্ট হেইট ইউ ফাতিহা নূর। আই জাস্ট হেইট ইউ। বেড়িয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। আমি সহ্য করতে পারছি না তোমায়।
ফাতিহার চোখ স্থির হয়ে গেলো। কানে বাজতে লাগলো আসিফের কথাখানা। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে কেঁপে গেলো। শূন্যতায় ছেয়ে গেলো তার চারিপাশ। নিজ স্বামীর মুখে ঘৃণা নামক শব্দটায় কেঁপে উঠলো ফাতিহার মেইলি অন্তরখানা। অন্যদিকে আসিফ হুংকার ছেড়ে জলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। পরের মুহূর্তেই ফাতিহার সরু কব্জিটা শক্ত করে চেপে ধরলো।

—আমার কথা একবারে বুঝতে সমস্যা হয়?
বলেই প্রবল শক্তিতে তাকে দরজার দিক থেকে সরিয়ে দিলো। সবকিছু এত দ্রুত ঘটলো যে নিজেকে সামলাতে পারলো না ফাতিহা।
পেছনে থাকা দেওয়ালে সজোরে ধাক্কা খেলো সে।
কপালটা দেওয়ালের কোণায় লেগে অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো রমণীর রিনঝিনে কন্ঠ হতে। ব্যথায় চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার। একফোঁটা র*ক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়লো কপালের পাশ বেয়ে। ফাতিহা দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে রইলো। কোন শব্দ করলো না, না-তো গলা চড়াও করলো আসিফের প্রতি। শুধু গভীর নিঃশ্বাস ফেললো সে।
অন্যদিকে আসিফ একবারও ফিরে তাকালো না তার দিকে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। দরজাটা সজোরে বন্ধ হওয়ার শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠলো। নিস্তব্ধ ঘরে পড়ে রইলো ভাঙা কাঁচের টুকরো, ছড়িয়ে থাকা শরবত, আর ফাতিহার অশান্ত মুখটা।
ফাতিহা আসিফের চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললো কেবল। চোখজোড়া ভরে উঠলো টলটলে নোনতা পানিতে। অভিমান জন্মায়। তবে সাথে এটাও বুঝতে পারে, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে আসিফের সাথে। নইলে সে এমনটা কেনো করবে? আসিফ নিষ্ঠুর তার প্রতি, তবে হুটহাট এহেন আক্রমণ সে তো করে না। তাহলে আজ হটাৎ কি হলো?
ফাতিহা নিজের কপালে হাত ছোঁয়ালো। লাল রঙা তরল পদার্থ দেখা দিলো সেথায়। মলিন হাসলো রমণী। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো কুড়িয়ে নিলো হাতের মাঝে। মৃদু হেঁসে আওড়ালো—–

তাকদিরে তুমি পর্ব ১১

—আপনার আফসোসের পরিমাণ একটু বেশিই হতে চলেছে মিস্টার মির্জা। অনুতপ্ত হবেন জানি, তবে এতোটা বেশি হতে হবে তা বুঝতে পারিনি। আর না এখনও সঠিক পরিমাণ আন্দাজ করতে পারছি। খোদা হেদায়েত দান করুক আপনাকে।
চোখের কোণ মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুটিগুটি পায়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসে ফাতিহা। কিচেনে গিয়ে কাচের টুকরোগুলো ফেলে আবারো ফিরে আসে নিজের ঘরে। অন্যদিকে আসিফ তখন ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকতে ব্যাস্ত। সাড়া শরীর তীব্র রাগে কাঁপছে তার। খালি মনে হচ্ছে ফাতিহা সত্যিই তাকে পুতুল বানাতে চাইছে। ছায়ার কথায় ঠিক। ফাতিহা তার উপর নিরবে অধিকার ফলানো শুরু করছে। আদেশ করছে তাকে!
আর এসবি মেনে নিতে পারছে না আসিফ। ফাতিহা নামক মেয়েটা তার উপর প্রভাব বিস্তার করবে সেটা সে কখনোই মেনে নিতে পারবে না। কখনোই না।

তাকদিরে তুমি পর্ব ১৩