Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪০

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪০

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪০
রাফিয়া জান্নাত রিফা

ব্যাডমিন্টনের টানটান লড়াই চলেছিল টানা চল্লিশ মিনিট। শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর ঘোষণা এলো বিথী ও দির্শক। দু’জনেই ঘামে ভিজে একাকার, ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট শরীরজুড়ে।
কিন্তু আনন্দের সেই মুহূর্তেই অপ্রত্যাশিত বিপত্তি। খালি পায়ে খেলার কারণে শেষের দিকে বিথীর পায়ে নির্মমভাবে কাঁটা বিঁধে যায়। তীব্র যন্ত্রণায় বিথী পা চেপে ধরে মৃদু চিৎকার করে উঠতেই, মুহূর্তের মধ্যে দির্শক এক দৌড়ে তার কাছে এসে পৌঁছায়। কোনো দ্বিধা না করেই সে হাঁটু গেড়ে বিথীর সামনে বসে পড়ে।
বিথী আপত্তি জানাতে না জানাতেই দির্শক তার পা ধরে ফেলে। যন্ত্রণায় বিথীর চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ হয়ে আসে। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে গোল করে তাদের ঘিরে ধরে সবার দৃষ্টি বিথীর দিকেই।
এই পরিস্থিতিতে সিদ্দিকী বেগম বিরক্তির সুরে মন্তব্য করলেন,,

__ বারবার বললাম জুতো জোড়া খুলিস না , কিন্তু কে শুনে কার কথা,তার নাকি জুতো পড়ে লেখা জমছে না।
মায়ের এমন কথায় বিথী নিজেও বিরক্ত হলো,ইতি,নিধির চোখে মুখে স্পষ্ট চিন্তার রেশ।নাঈম তালুকদার সিদ্দিকী বেগমকে বলেন,,
__ এসব কথা কি এখন বলা খুব জরুরী।
__ বলবো না তো কি করবো,সে আমার একটা কথাও শোনে? না একদমই শোনে না।
এসব কথা বলতে বলতে সিদ্দিকী বেগম দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে গেলেন ফার্স্ট এইড বক্স আনতে। এদিকে দির্শক মনোযোগী, প্রায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিথীর পায়ের ক্ষতস্থানটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। বেলগাছের ধারালো কাঁটাটি পুরোপুরি ভেতরে ঢুকে যায়নি অল্প অংশ বাইরে রয়ে গেছে। তবু দেরি করা ঠিক নয় কাঁটাটি এখনই বের করা জরুরি।
কিন্তু সমস্যাটা সেখানেই এতে যে বিথীর ব্যথা হবে, তা দির্শকের অজানা নয়। সে ধীরে মাথা তুলে বিথীর চোখের দিকে তাকাল। চোখে ছিল সতর্কতা আর অদ্ভুত এক নিশ্চয়তার মিশেল। নরম কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে দির্শক বলল,,

__ লুক এট মাই আইস।
বিথী ধীরে চোখ মেলে তাকাল দির্শকের সমুদ্র-নীল চোখে। অজান্তেই তার হাত উঠে এসে দির্শকের কাঁধ আঁকড়ে ধরলো। মুহূর্তের মধ্যেই দির্শক ও বিথীর চোখ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হলো সেই দৃষ্টির গভীরতায় দু’জনেই হারিয়ে গেল।
বিথীর আর খেয়াল রইল না সে কোথায় আছে, চারপাশে কী ঘটছে। তার মনে হলো, এই নীল চোখের অতল গভীরে সে খুব যত্নে ডুবে গেছে, বাস্তবের সব ব্যথা আর শব্দকে পিছনে ফেলে। দির্শকও কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে বিথীর চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে একফোঁটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে, নিঃশব্দে কিন্তু দৃঢ় হাতে বিথীর পায়ের কাঁটাটি টেনে বের করে নিল।
দির্শকের এই কাজটি দেখে ইতি আর নিধি একসঙ্গে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। দৃশ্যটা তাদের সহ্য হচ্ছিল না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় বিথী ব্যথার লেশমাত্রও অনুভব করল না। সে তখনও ডুবে আছে দির্শকের চোখের গভীরতায়। কাঁটা বের হয়ে গেলেও বিথীর দৃষ্টি সরল না সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল দির্শকের দিকেই।
দির্শক তখন চারপাশে উপস্থিত সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। পরিস্থিতির ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,,

__ পানি দিয়ে ক্ষতটির ময়লা পরিষ্কার করতে হবে এভাবে ব্যান্ডেজ করলে ইনফেকশন হতে পারে ,আমি কি বিথীকে কোলে নিতে পারি।
এবার সবাই তাকালো নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদারের দিকে নাঈম তালুকদার দির্শকের দিকে তাকালেন,বিষয়টা যে একেবারেই তুচ্ছ নয় তা তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। কয়েক সেকেন্ড নীরবে থেকে যেন মনে মনে কিছু একটা ভেবে নিলেন।
তারপর ঠোঁট একটু চেপে ধরে, মুখটা সামান্য আমুট-চুমুট করে অবশেষে বললেন,,

__ হ্যাঁ।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দির্শক বিথীকে কোলে তুলে নিল। বিথী তখনও দির্শকের দিকেই তাকিয়ে চোখে বাস্তবের ছায়া নেই, কোনো এক কল্পনার জগতে হারিয়ে গেছে সে।
দির্শক তাকে নিয়ে এগিয়ে গেল বাগানের সামনের ছোট্ট পুকুরপাড়ে। পুকুরের সিঁড়িতে আলতো করে বিথীকে বসিয়ে দিল। বিথীর এমন স্থির, নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দির্শকের ভালোই লাগছিল। ঠোঁটের কোণে একফোঁটা ফিচেল হাসি খেলে গেল তার মুখে, তবে সে দ্রুত নিজের কাজে মনোযোগ ফিরিয়ে নিল।
দু’হাত ভরে পুকুরের স্বচ্ছ পানি তুলে নিয়ে বিথীর পায়ের তালুর ক্ষতস্থানে ঢেলে দিল দির্শক। ঠাণ্ডা তরল স্পর্শ পেতেই বিথী হঠাৎ যেন ঘোর ভেঙে ফিরে এলো বাস্তবে। সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতস্থানে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করায় সে ককিয়ে উঠল।
দির্শক সাবধানে নিজের হাত দিয়ে জায়গাটা ভালো করে পরিষ্কার করতে করতে নরম, শান্ত কণ্ঠে বলল,,

__ তুমি কি জানো?
__কি?
দির্শক বেশ হেঁসে হেসেই বললো,,
__ তোমাকে তোমার বাবা মা রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিল? নাহলে আজ‌ তোমার মা এভাবে তোমায় বকতো না।
দির্শক এমন কথা বলার কারণ হলো যাতে বিথী কোন প্রকার ব্যাথা অনুভব না করে।দির্শকের এমন কথায় বিথী ও হেঁয়ালি করে বলে,,,
__ এমন কথা শুনে কোন এক রাজা, বাদশাহর মেয়ে মনে আফসোস করলাম আমি।
দির্শক শব্দ করে হেঁসে বলে,,,
__ কেনো এ বাবা মা ভালো না?
__ আপনি বললেন কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে তাই তো আফসোস করাই যায়,বলা তো যায় না হতেও পারতাম কোন এক রাজা বাদশাহর মেয়ে।
__ ভাগ্যিস রাজা বাদশাহর মেয়ে হও নি, নাহলে তো মাটিতেই পা ই পড়তো না।
বিথী কিছু একটা ভেবে বলে,,

__ অবশ্যই হ্যাঁ, কারণ তখন আমার রাজা পাপ্পা মাটিতে
টাইল্স লাগিয়ে দিতো।
দির্শক ও বিথী পুনরায় শব্দ করে দুজনেই হেসে উঠলো,তখনি গমগমে স্বরের আওয়াজ এলো,,
__ এতো হাঁসি কিসের, হ্যাঁ।
সিদ্দিকী বেগমের দিকে বিথী ও দির্শক দুজনেই তাকালো, সিদ্দিকী তাদের দিকে এগিয়ে এসে দির্শকে বলেন,,
__ বাবা তুমি যাও,বাকিটা আমি করে নিচ্ছি।
__ না আন্টি ফাস্ট এইড বক্সটা আমায় দিন আমি করে দিচ্ছি।
সিদ্দিকী বেগম আরো কিছু বলতে যাবেন তখনি বিথী বলে,,,

__ মা তোমাকে বাবা ডাকছে যাও।
সিদ্দিকী বেগম বলেন,,
__ কই আমি তো শুনলাম না।
__ আমি শুনেছি আমার কথা বিশ্বাস না হলে দু্ষ্শমন স্যারকে বলো।
সিদ্দিকী বেগমের দৃষ্টি তখন দির্শকের দিকে তাকালেন চোখে প্রশ্ন, মুখে উদ্বেগের ছাপ। দির্শক একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার দৃষ্টি ফেরাল বিথীর দিকে। ঠিক তখনই বিথী চোখ টিপে ইশারা করল যার অর্থ স্পষ্ট, চুপ থাকেন… আমার কথাতেই সায় দিন।
বিথীর সেই নিঃশব্দ অনুরোধ বুঝতে দির্শকের এক মুহূর্তও লাগল না। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলিয়ে, স্বাভাবিক অথচ নিশ্চিন্ত কণ্ঠে দির্শক বলল,,
__ হ্যাঁ, আমিও শুনেছি।
সিদ্দিকী বেগম দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন,,

__ ঠিক আছে বাবা ভালো করে ব্যান্ডেজ করে দিও,আসছি।
দির্শক মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বলল।
বিথীর পা ধোয়া শেষ করে দির্শক অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ক্ষতস্থানে প্রলেপ লাগাল, তারপর সাবধানে ব্যান্ডেজ করে দিল। বিথী কখনো নিজের পায়ের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কখনো দির্শকের মুখের দিকে চোখে কৌতূহল, বিস্ময় আর অদ্ভুত এক নির্ভরতার মিশ্র ছায়া।ব্যান্ডেজ করা শেষ হতেই দির্শক আবার বিথীকে কোলে তুলে নিল এবং ধীর পায়ে এগোতে লাগল বাড়ির উদ্দেশ্যে।বেশ আনন্দের সহিত দির্শকের কোলে থাকা অবস্থাতেই পা দুলিয়ে দুলিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরলো বিথী,,

_Sari duniya ko chhod ke maine,
Chaha hai ek tumhe
পরের লাইন বিথী বলার আগেই দির্শক বলে,,,
_Maine zindagi se maanga hai toh
Sirf maanga hai ek tumhe
খুশিতে আটখানা হয়ে ফের পরের লাইনে বিথী বলে,,,
_Ab issi chah mein
Ab issi raah mein
Zindagi bhar mere tum ho na
Hey shona, hey shona
Hey shona, hey shona.

গান যতক্ষন বিথী গাইলো ততক্ষণেই অপলক দৃষ্টিতে দির্শক তাকিয়ে ছিল বিথী পানে,ফেচেল হেসে বললো সে,,
__ পা যে নাচাচ্ছো,পায়ে ক্ষত আছে তা কি ভুলে গেলে।
নাক সিঁটকিয়ে হেঁসে বিথী বলে,,
__ ব্যাথা করছে না, বরং খুশি লাগছে।
দির্শক আর কোন কথা বলে মুচকি হেসে চলতে লাগলো।
এই পুরো দৃশ্যটা আমগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ইতি, নিধি, মুহিন আর পিকি নিঃশব্দে দেখে গেল চারজনেরই চোখ বড় বড় হয়ে গেল, যেন বিশ্বাস করতেই পারছে না তারা ঠিক কী দেখল এতক্ষণ ধরে।

এদিকে পিকি ও দুল্লুর প্রেম তো জমে ঘি, সুন্দর ভেবলার মতো তাকিয়ে তাদের ঢলাঢলি দেখছে,দুল্লুকে পিকি বলে,,
__ শুনলাম তুমি নাকি তোমার মায়ের ছাগল বিক্রি করে দিয়েছো।
দুল্লু আমতা আমতা করে বলে,,
__ মায়ের কষ্ট কলে ঘাস কাটতে হয় বলে,ছাগল বেতে দিয়েতি?
__ ওহহহ।
পিকি ফের বলে,,
__ তোমার বাবার ও নাকি সাইকেল বিক্রি করে দিয়েছো?
__ বারাল সাইকেলের পেট্রোল মালতে কষ্ট হয় বলে তা বেতে দিয়েতি।
পিকি এবার দুল্লু দুগাল টেনে টেনে বলে,,
__ ওহো তুমি কত বুদ্ধি মান,আই লাভ ইউ।
__ আই লাভ ইউ টু।
দুল্লু লজ্জা লজ্জা করে বলে,,

__ বাবু তোমাল নাম্বাল টা দেও রাতে কথা বলবো।
পিকি তার পকেট থেকে ফোনটা বের করে দুল্লুকে নাম্বার দিলো, অতঃপর দুজনেই ফ্লাই কিস আদান প্রদান করে জায়গাটি ত্যাগ করলো।

দির্শক বিথীকে তার ঘরে এনে শুইয়ে দিয়ে বললো,,
__ ক’দিন হাঁটাহাঁটি বন্ধ, বুঝলে।
বিথী আবাক হয়ে বললো,,
__ ওমা যদি না হাঁটি তাহলে, প্রেম করবো কিভাবে?
বুকে হাত গুজে দির্শক বলে,,
__ আরো তিনদিন না হয় বাড়িয়ে নিলাম।
__ তিনদিন কেনো,তিন যুগেরও ছাড়া পাচ্ছেন না মশাই।
ভয়ের শুকনো ঢোঁক গিললো দির্শক পরপর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,,
__ আসছি আমি,রেস্ট নাও।
এই বলে হনহনিয়ে চলে গেল দির্শক,মুখে অসহায়ত্ব নেমে এলো,কত সুন্দর আজকে প্রেম করতো তারা কিন্তু পায়ে কাঁটা বিঁধে সব এলোমেলো হয়ে গেলো, বিথী বিরক্তির সহিত আওড়ালো,,,

__ ভাল্লাগে না,ধ্যাত।
এই বলে বিথী হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য নেটের গতি ছিল ভীষণ ধীর। তাতেই তার মাথাটা যেন আরও বিগড়ে গেল।
ব্যথায় জর্জরিত পা নিয়েই সে উঠে দাঁড়াল। নেটের আশায় ফোনটা উপরে তুলে ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে লাগল। একে একে দরজার সামনে গেল, তারপর আলমারির পাশে, এমনকি ওয়াশরুমের দিকেও উঁকি দিল। কোথাওই নেটের দেখা নেই।
শেষমেশ ক্লান্তি আর বিরক্তি একসঙ্গে চেপে বসতেই সে আবার বিছানায় এসে বসে পড়ল। মুখে স্পষ্ট অসন্তোষ, কণ্ঠে চাপা রাগ বিরক্তির সুরে সে বলে উঠল,,

__ বালে নেট, বালের দেশ।
কিছুদিন পর জাপানে 7G চালু হবে,আর এই বালের দেশে 4G, বাড়ির সামনে H+, দরজায় E, খাটের উপর Emergency,আর খাটের নিচে insent sim।
বিরক্তির সুরে বলা কথাগুলো বুঝি নেটওয়ার্ক শুনেই ফেলেছিল একটু একটু করে সিগন্যাল ফিরে এলো। বিথী আবার ফোনের দিকে মন দিল, ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগল।
হঠাৎই তার চোখে পড়ল একটি বয়’স ওয়াচ রোলেক্স ব্যান্ডের, ঝকঝকে কালো রঙের। কয়েকদিন আগেও এমনই একটি ঘড়ি তার চোখে পড়েছিল। তখন ভালো লেগেছিল ঠিকই, কিন্তু কেনার ইচ্ছে এতটা তীব্র হয়ে ওঠেনি। আজ অজানা এক কারণে ঘড়িটা তাকে অদ্ভুতভাবে টানছিল।
বিথী বারবার ছবিটা জুম করে দেখতে লাগল। ঠোঁটের কোণে আপনাআপনিই একফোঁটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই যেন মাথার ভেতর কিছু একটা খেলে গেল। হঠাৎ সে বিছানা থেকে নেমে পড়ল, পড়ার টেবিলের ওপর রাখা মাটির ব্যাংকটা তুলে নিয়ে মেঝেতে আছড়ে ফেলল।
মুহূর্তের মধ্যেই খুচরো খুচরো কয়েন আর নোট মেঝে জুড়ে ছিটকে পড়ল। ব্যথা ভুলে গিয়ে বিথী খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সেগুলো কুড়াতে লাগল মনে হচ্ছিল প্রতিটা টাকার সঙ্গেই সে কোনো এক স্বপ্ন জড়ো করছে।
ঠিক তখনই ঘরে এসে হাজির হলো ইতি আর নিধি। বিথীর এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে দু’জনেই থমকে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে, তারপর বিথীর দিকে চেয়ে অবাক হয়ে বলে উঠল,,

__ এত তাড়াতাড়ি ব্যাংটা ভাঙ্গলি কেন?
নির্বিকার ভাবে বিথী বলে,,
__ ব্যান্ডের ঘড়ি কিনবো তাই?
ইতি বলে,,
__ কেমন?
বিথী ইশারা করে ফোন দেখতে বলল,ইতি,নিধি ফোনের স্ক্রিনে ঘড়িটি দেখে বলল,,,
__ এটা তো ছেলেদের ঘড়ি।
বিথী টাকা কুঁড়াতে কুড়াতে বলে,,
__ হ্যাঁ।
নিধি বলে,,
__ কাকে দিবি?
__ দির্শক স্যারকে।
__ কি?
__ হ্যাঁ।
ইতি বলে,,

__ দির্শক স্যারকে কেন দিবি?
তখন বিথীর সব টাকা একএিত হয়েছে সেগুলো বিছানায় রেখে গোছাতে গোছাতে বলল,,
__ ভালোবাসি, প্রেম ও করি তো গিফট তো দিতেই হবে,তাই না।
ইতি,নিধি হা হয়ে বিথীকে দেখলো শুধু, বিথী সব টাকা একএিত করে ১৫ হাজার টাকা হলো, ঘড়িটির দাম ২৫ হাজার, বিথীর কাছে আর কোন টাকা নেই এবার বিথী বেশ চিন্তায় পড়ে গেল এবং চিন্তিত স্বরে বলল,,,
__ আরো টাকার প্রয়োজন?
এবার ইতি ও নিধি দৌড়ে তাদের ব্যাংক দুটি এনে বিথীকে দিয়ে বলে,,
__ এ দুটো ব্যাংক ও ভাঙ্গ।
বিথী দুজনের দিকে তাকিয়ে বলে,,

__ না এটা তোদের প্রয়োজনে লাগবে, যেমন ধর তোদের ইচ্ছে হলো যে আলবান ভাই বা আর্দ্র ভাই কে কিছু গিফট করার তখন এই টাকার খুব প্রয়োজন হবে,তাই এগুলো রেখে দে।
নিধি বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে বলে,,
__ তা না হয় বুঝলাম এখন কি করবি টাকা কই পাবি।
ইতি বলে,,
__ আলবান ভাইয়ের টাকার অভাব পড়ছে যে আমাকে তাকে গিফট করতে হবে,লাগবে না এটা, তুই টাকা গুলো নে বিথী।
__ ইতি তুই বুঝছিস না,তোর এই টাকা গুলো আরো অনেক কাজে লাগবে, রেখে দে।
__ ঘড়িটির দাম ২৫ হাজার টাকা এখন এত টাকা ম্যানেজ করবি কেমন।
চোখ কুঁচকে বিথী কিছুক্ষণ ভাবলো ব্যাস মিনিটের মধ্যেই ফট করে মাথায় আইড়িয়া এসে গেলো,,,

__ আইডিয়া পেয়ে গেছি।
নিধি ও ইতি একসাথে বলে,,,
__ কি আইডিয়া?
বিথী হাসতে হাসতে বলে,,,
__ আগে চল দাদির ঘরে?
বিথী তাদের কথা না শুনে টানতে টানতে দাদিমার ঘরে নিয়ে গেল। দাদিমা তখন ঘরে ছিলেন না। তিন বোনই চুপিচুপি ঘরে ঢুকে আলমারি থেকে তিনটি সাদা সুতির শাড়ি বের করল।
এরপর বাবার ঘরে গিয়ে চুপিচুপি একটি লুঙ্গিও নিল। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী সম্পন্ন করে, তারা তিনজন মুহিনের ঘরে চলে গেল।
ফোন বুকের ওপর চাপিয়ে ঘুমোয়া বিথী, তাদের তপ্ত নিঃশ্বাস অনুভব করে হেসে বলল,,

__ এটার খালি ঘুম,এই অসময়ে ঘুমাচ্ছে দেখ।
ইতি বলে,,
__ থাক ওরে ডিস্টার্ব করিস না,হয়তো আবার ও ছ্যাঁকা খেয়েছে ছেলেটা।
এই বলেই তিনজনই হাসলো, বিথী মুহিনের কানের কাছে গিয়ে জোরে জোরে ডাকতে লাগলো। মুহিন উঠতে না চাইলেও জোর করে টেনে তুললো তাকে,নিধি পানি এনে মুহিনের মুখে ছিটিয়ে দিলো, বিরক্ত হয়ে মুহিন বলে,,
__ ঘুমোতে দে না এমন করছিস কেন?
বিথী বলে,,
__ ওঠ আমাদের সাথে একজায়গায় যেতে হবে।
__ যাবো না আমি তোরা যা।
ইতি বলে,,
__ আরে চল।
__ যাবো না ,তোরা যা।
এবার নিধি বলে,,

__ লক্ষি ভাই আমার উঠ।
মুহিনকে কিছুতেই রাজি করা গেল না,এবার বিথী বুদ্ধি খাটিয়ে বলে,,
__ ঠিক আছে যেতে হবে না, ভেবেছিলাম পাশের বাড়ির আন্টির মেয়ে রুহির নাম্বারটা দিতাম তোরে, কিন্তু এখন আর দিবো না।
মুহুর্তেই মুহিন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে, গাঁয়ের শার্ট ও মাথার চুল ঠিকঠাক করে বলে,,
__ আমি রেডি চল,তার বিনিময়ে রুহির নাম্বার।
__ ওকে চল।
চারজনই আবার ইতি, বিথী,নিধির ঘরে আসলো,তখনি নিধি ডাক আসলো, বিরক্তির শ্বাস ফেলে বিথী বলে,,
__ যা স্বামী সেবা আয়।
নিধি দৌড় লাগালো স্বামীর ডাকে তার কাছে,এক দৌড়ে ঘরে এসে হাজির হলো আর্দ্রের সামনে এবং হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,,
__ বলুন।
আর্দ্র তখন ড্রেসিং টেবিল মাথার ব্যাক ব্লাশ করছিল,নিধিকে এমন হাঁফাতে দেখে বলে,,

__ দৌড়ে আসতে গেলে,যদি পড়ে যেতে।
__ ওষুধ লাগিয়ে দেওয়ার জন্য আপনি তো ছিলেন।
আর্দ্র হালকা হেসে নিধিকে বুকের সাথে মিশিয়ে, শুকনো ঠোঁট জোড়া নিধির ঠোঁটে ছুঁয়ে বলে,,
__ জ্বালাতে শিখে গেছো তাই না।
__ হ্যাঁ।
নিধি আর্দ্রকে ফের বলে,,
__ কোথাও যাচ্ছেন।
এবার আর্দ্র সোফায় বসে নিধিকে কোলে বসিয়ে বলে,,,
__ হ্যাঁ।
সন্দিহান কন্ঠে আর্দ্র বলে,,
__ কোথায়?
নিধির গলায় মুখ গুঁজে আদ্র বলে,,
__ তোমার স্বামীর সিক্রেট একটা কাজ আছে ওটাই করতে।
নিধি কিছুক্ষণ ভেবে বলে,,

__ ও ওই অ্যানোনেইমস না কি তার কাজে।
নিধির চুলের সুবাস রোমাঞ্চকর ভাবে শরীরে শিহরণ তুললো পুরুষত্বে,নেশালো কন্ঠে বলল,,
__ হ্যাঁ কিন্তু এখন যেতে ইচ্ছে করছে না, অন্যকিছু করতে মন চাচ্ছে।
নিধি অভিমানী কন্ঠে বলে,,
__ যাবেন তো যাবেন তা এতো সাজুগুজুর কি ছিলো।
আর্দ্র নিধির ফোলা ফোলা গাল দুটোও টুক করে চুমু একে বলে,,
__ কই সেজেছি শুধু তো লেদার জ্যাকেট ও চুলটা ঠিক করে নিলাম, অবশ্য তুমি চাইলে সেদিনের মতো খোকা বাবু সাজিয়ে দিতেই পারো এতে তোমার স্বামীকে দেখে হাসবে সবাই এই আরকি।
নিধি আর্দ্রের দিকে মুখ ঘুরালো না তা দেখে আর্দ্র ফের বলে,,

__ চুড়ুই তুমি রাগ করলে।
মুখ ফুলিয়ে নিধি বলে,,
__ হ্যাঁ।
আর্দ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
__ কি করলে রাগ কমবে বলো।
__ সরি বললে।
আর্দ্র অবাক হয়ে বলে,,
__ সরি কেন বলবো।
নিধি একই ভাবেই মুখ ফুলিয়ে রাখলো তা দেখে আর্দ্র আবার দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে,,
__ ওকে সরি।
নিধি অযথা খুশি হয়ে আর্দ্র কপাল,গাল,মুখ, ঠোঁটে, সবখানে ফটাফট চুমু দিয়ে আর্দ্রকে এক ঝটকায় সোফায় ডাসায় ফেলে দিয়ে মার এক ভৌ দৌড়, আর্দ্র পেছন থেকে অনেক বার ডাকলো,,
__ আরে শোনো,আমি তো ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খেতে চাই যাকে বলে দীর্ঘচুমু,এভাবে যেতে পারো না তুমি,চুড়ুই শোনো, শরীরে আগুন লেগেছে নিভিয়ে যাও,চুড়ুই পাখি কথা শুনো প্লিজ।
কিন্তু কে শুনে কার কথা, আর্দ্রের আর কি করার সে ভালো করেই বুজলো এই মেয়েকে রাত ছাড়া আর এখন তাকে পাওয়ার কোন উপায় নেই,তাই বিরক্ত হয়ে উঠে দাড়ালো সে।
আলবান ও আর্দ্র দুজনেই গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে চলে গেল সেই জঙ্গলে।

ইতি, বিথী, নিধি, মুহিন ও সুন্দর সবাই পুঁটলিতে কাপড় নিয়ে এগোলো। আজ নিঝুম বাড়ি ফিরে গিয়েছিল, তাই সুন্দর কিছুটা মন খারাপ অবস্থায়। সে ঠিক করল আজ ইতি, বিথী ও নিধির সঙ্গে থেকে মন ভালো করা জরুরি।
এদিকে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে সিদ্দিকী বেগম বিথীর কাঁধে ঝুলতে থাকা ব্যাগটি দেখে বললেন,,
__ ব্যাগে কি,আর কোথায় যাচ্ছিস তোরা।
ইতি বলে,,
__ মিশন আছে মা।
রাগে তিনি খুন্তি হাতে রান্নঘর থেকে বের হয়ে বলেন,,
__ বিথী তুই যা মুহিন ও সুন্দর কে নিয়ে, কিন্তু নিধি ও ইতিকে রেখে যা,ওরা এখন এ বাড়ির বউ এটা ভুলে গেলে চলবে না।
আর ইতি,নিধি তোদের বলি,
কোথাও যাবি তার আগে স্বামী, শাশুড়ির থেকে পারমিশন নিয়েছিস?
ইতি,নিধি মাথা নিচু করে নিলো,তারা কিছু বলার আগেই আলিফা বেগম রান্নাঘর থেকে হাক ছাড়লো,,

__ তাদের শাশুড়ি অনুমতি দিলো তাদের যাওয়ার জন্য। এখুনি ঘুরার সময় ঘুরুক একটু।
ইতি, নিধি খুশিতে গদগদ হয়ে দৌড়ে যায় আলিফা বেগমের নিকটে দুজনেই আলিফা বেগমের দুগালে চুমু খেয়ে বলে,,,
__ ধন্যবাদ শাশুড়ি মা।
__ হয়েছে হয়েছে,ছাড় এখন, কোথায় যাচ্ছিস যা।
এসব কান্ড হা হয়ে সিদ্দিকী বেগম দেখে বলেন,,
__ বুবু জান তুমি তোমার বউমাদের এমনে মাথায় তুলছো কিন্তু।
__ বাড়ির মেয়ে আবার আমার বউমা মাথায় তো তুলবোই নাকি।
সিদ্দিকী বেগম আর কিছু না বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,,
__ করো যা ইচ্ছা, আমার কি?
বিথী তার মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,,

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৩৯

__ উফফ মা জননী আমার,এত হেজিটেড কিছুই নেই,এই যাবো আর এই আসবো।
সিদ্দিকী বেগম বলেন,,
__ যা তবে, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে,মনে থাকে যেন।
__ আচ্ছা।
পরিশেষে হেলেদুলে তারা চললো ভান্ডামির কাজে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪১