তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪১
রাফিয়া জান্নাত রিফা
বিথী ও নিধির বর্তমান অবস্থান একটি ব্যস্ত রোড-প্লেসের ধারে। চারপাশজুড়ে অবিরাম গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল আর নগরজীবনের নিরন্তর ছুটে চলা সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন এক ব্যস্ত মহানগরীর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
একটি ভ্যানগাড়ির ভেতরে মুহিন চিত হয়ে শুয়ে আছে। তার মাথা ও পায়ে মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা, অবস্থা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সে গুরুতর আহত, কিন্তু তেমন কিছুই নয়। ভ্যানটি চালাচ্ছে সুন্দর তার মুখে অদ্ভুতভাবে লাগানো বিশাল নকল গোঁফ, জীর্ণ শীর্ণ পোশাক পড়নে যা তাকে একেবারেই অপরিচিত রূপ দিয়েছে।
ভ্যানটির পাশাপাশি হেঁটে চলছে ইতি, বিথী ও নিধি। তিনজনের পরনেই সাদা শাড়ি, মুখে আধা-কালো মাখানো, আর চুলে চুন লাগিয়ে এমনভাবে সাদা করা যে চেনার কোনো উপায় নেই। তাদের এই বেশভূষা ইচ্ছাকৃত ছদ্মবেশ।
বিথীর হাতে একটি ডোনেশন বক্স, যা থেকে মাঝে মাঝেই টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইতির হাতে একটি বড়সড় ব্যাগ ভেতরে কী আছে, তা বাইরে থেকে অনুমান করা কঠিন। আর নিধির হাতে ধরা একটি সার্টিফিকেট, যেখানে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে,,
__ ভিক্ষুক ইন্ডাস্ট্রির ডোনেশন সার্টিফিকেট।
সার্টিফিকেট টা কম্পিউটারের দোকানে টাকা দিয়ে করে নিয়েছে, দোকান দার তো এ কাজ কিছুতেই করতেই চাচ্ছিল না তাকে জোরপূর্বক এই কাজ করাতে বাধ্য করার কোবরা কুইনরা।
চারজনেরই বর্তমান গেটআপ সম্পূর্ণ ফকিরবেশে। তাদের চেহারা-আশাক, মুখের রঙ আর অদ্ভুত সাজসজ্জা দেখে বিন্দুমাত্র বোঝার উপায় নেই যে তারা আসলে সম্ভ্রান্ত তালুকদার বাড়ির সদস্য।
এই পুরো পরিকল্পনার মূল কারিগর বিথী। তার মনে একটাই ভাবনা এই কৌশল এবার কতটা কার্যকর হয়, সেটাই দেখার বিষয়।
ভ্যানের ভেতরে চিত হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে মুহিনের অবস্থা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আজ যেন ভাগ্যের পরিহাসে সূর্য মামাও ঠিকমতোই হাজির। তীব্র রোদের আলো সোজা মুহিনের চোখে পড়ছে। চোখ খোলা তো দূরের কথা, সামান্য নড়াচড়াও করতে পারছে না সে মাথা আর পায়ের শক্ত ব্যান্ডেজ তাকে সম্পূর্ণ অসহায় করে রেখেছে।
অন্যদিকে ভ্যানের চালকের আসনে বসে সুন্দর নিজের মনেই গভীর আফসোসে ডুবে আছে। আফসোসের কারণ একটাই এই তথাকথিত ‘কোবরা কুইন’দের সাথে সে কেন যে জড়িয়ে পড়ল! এখন ভ্যান চালিয়ে নিজের কৃতকর্মের শাস্তি নিজেকেই ভোগ করতে হচ্ছে। বিরক্তি আর অনুশোচনায় সুন্দর মুখটা ভোঁতা করে রেখেছে,।
চারপাশের মানুষের কোলাহল কে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে বিথী বলে,,
__ সুন্দর ভাই এখানে ভ্যান থামাও।
সুন্দর যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো,তড়াৎ করে ভ্যান থেকে নেমে গামছা দিয়ে মুখ মুছে সে বলল,,,
__ আমি ওসব ভিক্ষা দিক্ষা করতে পাবো না বিথী।
তখনি বিথী তেতে উঠল এবং বলল,,
__ কে বলছে আমরা ভিক্ষা করতে আইছি,আমরা ফকির ইন্ডাস্ট্রি থেকে এসেছি।
চিত হয়ে শুয়ে থাকা মুহিনের কানে কথা খানা পৌঁছা মাত্র শুয়া থেকে উঠে অবাক ভঙ্গিতে বলল,,
__ কি, কোন ইন্ডাস্ট্রি থেকে।
মুহিনের এভাবে উঠে যাওয়ায় ইতি রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ ওই শুয়ে পড়,তোর কাল এক্সিডেন্ট হয়েছে ভুলে গেছিস।
__ কিইইই আমি কখন এক্সিডেন্ট করলাম।
নিধি বলে,,,
__ ওরে বাঁদরমুখো এটা নকল এক্সিডেন্ট।
__ কিন্তু নিধি আপু আমার তো এক চাপ দিছে।
বিথী রাগ দেখিয়ে বলে,,,
__ তোর মুতরে একটা ঝাড়ি দিয়া বল যে কিছুক্ষণ পর চাপ দিতে।
মুহিন হা হয়ে বিথীর দিকে তাকিয়ে রইল,ইতি মুহিনকে আবার শুয়ে দিয়ে বলল,,
__ “আর উঠবি না?চারপাশে অনেক মানুষজন আছে,দেখে ফেললে সন্দেহ করবে”।
এবার বিথী সবার উদ্দেশ্যে বলে,,,
__ “আমি যা যা বলেছি তাই তাই করবে সবাই, সাবধানে ওকে”।
বিথীর কথায় মুহিন বাদে সবাই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালো।
এরপর ইতি, বিথী ও নিধি তিনজনেই সাদা শাড়ির গোঁজ থেকে কালো সানগ্লাস বের করে একসঙ্গে চোখে পরে নিল। মুহূর্তের মধ্যেই তাদের ভাবভঙ্গিতে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস ভর করল। বড় বড় কদম ফেলে, স্পষ্ট দাপট আর নাটকীয় ভঙ্গি নিয়ে তারা ভিড় ঠেলে পার্কের ভেতরে এগিয়ে যেতে লাগল।
তাদের এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে সুন্দরের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল যাকে বলে অবাকের চরম সীমা। সে কিছুক্ষণ হতভম্বের মতো তাকিয়েই রইল।
পার্কের চারপাশে তখন জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে বা হাঁটছে। কোথাও হাত ধরাধরি, কোথাও ফিসফিস করে কথা রোমাঞ্চকর সেই পার্কে যেন রোমান্সই জমে উঠেছে। আর ঠিক এই দৃশ্যটাই ছিল ইতি, বিথী ও নিধির টার্গেট। প্রেম-পিরিতিতে মগ্ন এই যুগলরাই হলো তাদের টার্গেট।
তিনজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসল । তারপর একসঙ্গে হাতে হাতে তালি দিয়ে, কোনো গোপন সংকেত আদান-প্রদান করে, তারা সামনে এগিয়ে গেল।
দূরে দাঁড়িয়ে সুন্দর শুধু তাদের চলে যাওয়া দেখল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো ওরা তাকেও সঙ্গে নিল না কেন? কিন্তু সেই ভাবনা মাথায় পাক খাওয়ার আগেই নিধি হাতের ইশারায় তাকে ডাকল। ইশারার অর্থ বুঝে সুন্দর আর দেরি না করে ভ্যান টেনে নিল, মুহিনকে নিয়ে তাদের পিছু পিছু এগিয়ে যেতে লাগল।
পার্কে বেঞ্চে বসা প্রেম পিরিতে মগ্ন থাকা এক জোরা যুগলের পিছনে থামলো ইতি, বিথী, নীধি,ইতি গলা খাঁকারি দিয়ে যথাসম্ভব কন্ঠে বৃদ্ধ স্বর এনে টেনে টেনে বলল,,
__ বাপপপ,মায়য়য় জনন জননী পিছনে তাকা মা বাপ।
মেয়ে ও ছেলেটি হকচকিয়ে পিছনে তাকালো মেয়েটির ঐ জুহি ছেলেটার নাম মিজান,জুহি ইতি, বিথী, নীধির পোশাক আশাক ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে মুখ কুঁচকে বলে,,,
__ কি চাই।
বিথী বলে,,,
__ ওই যে দেখছেন, ভ্যানে ছেলেটা শুয়ে আছে ও কাল মারা গেছে আজ এক্সিডেন্ট করেছে,তাই ফকির ইন্ডাস্ট্রি থেকে আমরা ডোনেশনের জন্য এসেছি।
জুহি অবাক হয়ে বলে,,,
__ কাল মারা গেছে আজ এক্সিডেন্ট করেছে,মানে।
বিথী বুঝলো সে মুখ ফুসকে ভুলভাল বলে ফেলেছে, কিন্তু এখন তা কিছুতেই স্বীকার করা যাবে না হলে সন্দেহ করবে, এবার ফট জুহির বয়ফ্রেন্ড মিজান বলে,,,
__ ওও আমি তাহলে ইন্তেকাল ও করেছে ,তাই না।
এমন কথায় ইতি, বিথী, নীধির প্রচুর হাঁসি পেল কিন্তু হাসতে পারলো না, মিজানের দিকে জুহি কটমট চোখে তাকাতেই বুঝলো যে সেও ভুলভাল কথা বলে ফেলেছে,
এবার আমতা আমতা করে ইতি প্রসঙ্গে পাল্টে বলল,,
__ ডোনেশন দিন তাহলে আপনাদে প্রেম পূর্ণতা পাবে, কারণ প্রেম পিরিতি স্থিতিশীল নহে,ইহা সর্বদা পরিবর্তনশীল।
জুহি ও তার বয়ফ্রেন্ড মিজান আর কিছু না বলে ভ্যান গাড়িতে মুহিনের দিকে গেল,এতে সুন্দরের কলিজা বাজে ভাবে ভয়ে লাফালাফি করতে লাগলো,জুহি মুহিনের কাছে এসে মুহিনের চোখ বন্ধ করা দেখে বলে,,,
__ ইনি চোখ বন্ধ করে আছে কেন?
এমন কথা নিধির খুব হাঁসি পেল কিন্তু বিথী খুব বিরক্ত হলো, কাজে কাজ তো কিছুই হচ্ছে না আর এদিকে এই মেয়ের উদ্ভট সব প্রশ্ন।
মেয়েটার এমন প্রশ্নে বেশি বিরক্ত হলো মুহিন এমনিতেই তাঁর মুতে চাপ দিছে তাঁরউপর এমন প্রশ্ন এতে মেজাজ গরম তো হবেই,চোখ জোড়া খুলে মুহিন বলল,,
__ দেখছেন তো মাথায় ব্যান্ডেজ অজ্ঞান হয়ে আছি তাই চোখ বন্ধ,যত সব, ডোনেশন দিলে দিন না দিলে নাই।
জুহি ও মিজান অবাক হয়ে একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো, বিথী বুঝলো এরা ডোনেশন দেওয়ার মানুষ না তাই সে বলল,,
__ ডোনেশন দিবেন কি না।
জুহি আমতা আমতা করে বললো,,,
__ যদি কিছু মনে না করে তো একটা কথা বলতে চাই।
ইতি বলে,,
__ বলো।
__ আসলে আমার ও আমার বয়ফ্রেন্ডের ব্যাগ ও মানিব্যাগ ছিনতাই হয়ে গেছে,সেই তিন ঘন্টা ধরে পার্কে বসে চিন্তা করছি কেমন করে বাড়ি যাবো,একটা টাকা ও আমাদের কাছে নাই তাই আরকি।
এবার তার বয়ফ্রেন্ড মিজান বলে,,,
__ দাদা দাদিরা ৫০ টা টাকা দিলেই হবে,গাড়ি ভাড়া আরকি।
বিথী এবার রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ ওই কোন এঙ্গেল থেকে আমাদের তোর দাদি মনে হয়।
বিথী হয়তো ভুলে গেছে যে তারা এখন বুড়ি বেশে আছে,নিধি বিথীর বাহু চেপে বলে,,
__ বলদি আমরা এখন বুড়িদের বেশেই আছি।
এবার বিথীর স্মরনে এলো এবং গলার স্বর নরম ভাবে টেনে টেনে বলে,,
__ হ্যাঁ দাদু ভাই বল।
কিছু সন্দেহ নিয়েই জুহি ফের বলে,,,
__ যদি ৫০ টা টাকা দিতেন তো গাড়ি ভড়া করে বাড়ি যেতাম এই আরকি, পরে ৫০ টাকাটা আপনাদের কারো বিকাশ নাম্বারে পাঠায় দিতাম।
ওপাশ থেকে সুন্দর বলে,,,
__ বিকাশে তো ৫০ টাকা আসবে না।
এবার মিজান বলে,,
__ তাহলে নগদে দিতাম।
অবাক স্বরে ফের সুন্দর বলে,,,
__ নগতেও আইবো না নাতি।
__ আচ্ছা তাহলে ৫১ টাকা দিয়ে দিবো,পরে কোন একদিন আপনাদের সাথে দেখা করে এক টাকাটা নিয়ে নিবো।
এই কথায় এবার সুন্দরের খুব ইচ্ছে হলো মিজান কে ফটাফট কয়েকটা থাপ্পর দিতে, কিন্তু সেটা সুন্দর পারলো না।মনে মনে সুন্দর বিরক্ত হয়ে বললো,,
__ মগা শালা, ইচ্ছা করছে মগার শালার মদনা ফাইটা দেই।
বিথী সেই লেভেলের এক রাগ নিয়েই কিছু একটা বলবে তখনি ইতি তাকে আটকে দিয়ে ভেবে চিন্তে বলে,,
__ টাকা দিবো কিন্তু একটা শর্তে।
জুহি বলে,,
__ কি শর্ত।
__ আমাদের সাথে ভিক্ষা করতে হবে।
জুহি ও মিজান দুজনেই আবাক হয়ে দুজনের দিকে চাওয়া চাওয়ি করলো, কাঁদো কাঁদো ভঙ্গিতে রাজি হয়ে গেল ইতির কথায়,এছাড়া উপায় ও নেই তাড়াতাড়ি বাড়ি না গেলে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে জুহি জন্য,আর কোনো উপায় না পেয়ে ইতি, বিথী, নীধির সাথে চলতে লাগলো, বিথী চলতে চলতেই বিরক্ত হয়ে বলল,,
__ আইছে প্রেম করতে,একটা ব্যাগ সামলাতে পারে না আবার প্রেম মারাইতে আইছে,অসহ্য।
পার্কের একটু সামনেই একটা চরকি দেখা গেলো, সেখানে অনেক মানুষ ভিড় ও জমিয়েছে,সেদিকে হাটা ধরলো সবাই।
ইতির কথায় সুন্দর সেখানে ভ্যান থামালো এবং ইতি, বিথী, নীধি তিনজনই সেখানে মাটিতে বসে পড়লো।ইতির হাতে থাকা ব্যাগটা সে সামনে রাখলো, বিথী তার হাতের ডোনেশন বক্সটি ও সামনে রাখলো এবং নিধি তার হাতের সার্টিফিকেট টা উঁচিয়ে মানুষকে দেখাতে লাগলো।উপায় না পেয়ে জুহি তার ওড়না দিয়ে মুখ চেপে সে ওড়না পেতে বসে পড়লো সেখানে, এবং তার বয়ফ্রেন্ড মিজান বলতে লাগলো,,
__ আল্লাহর নামে দান করিলে আখিরাতে পাওয়া যায়,এই গরিবরে দান করিলে আখিরাতে পাওয়া যায়
আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান।
আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান।
আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান।
আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান।
মিজান আগ বাড়িয়ে এসব বললো বলে জুহির খুব রাগ হলো,ইতি, বিথী, নীধির কাছেই তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো লাগলো ব্যপারটা।
মিজানের কন্ঠটা মানুষ জনের কাছে খুবই হাস্যকর লাগায় তাঁরা চেয়ে চেয়ে মিজানকে দেখে হাসতে লাগলো,এতে মিজানের লজ্জার থেকে বেশি গর্বিত বোধ হলো এবং আরো বেশি বেশি করে বলতে লাগলো,,
__ আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান।
আল্লাহ নবীজির নাম হাজার টাকা দিয়া যান
এদিকে জুহি তো রাগে ফেটে যাচ্ছে।কটকট চোখে বারবার মিজানের দিকে তাকাচ্ছে বারবার।
ইতি,নিধি ঠোঁট টিপে হেসে যাচ্ছে,সব লোক চায়া দেখছে এতে প্রচুর রাগ হলো বিথীর আরে বাবা কিছু টাকা তো দিতেই পারে নাকি।এতে সুন্দরের ও খুব বিরক্ত লাগলো, বিরক্তি নিয়ে গেয়ে উঠলো,,,
__ চায়া থাকোছ কেন,টাকা দিয়া যা।
ও তুই চায়া থাকোছ কেন,টাকা দিয়া যা।
তুই কইলেই তো আমি কমু হ।
সুন্দরের কন্ঠটা মানুষের কাছে এতো বাজে লাগলো যে তারা ফিসফিসিয়ে গালিগালাজ করতে করতে প্রস্থান ত্যাগ করো। ক্ষুব্ধ চোখে সুন্দরের দিকে তাকালো বিথী, সুন্দর বেচারা থমথমে খেয়ে গেলো, ভাবতে লাগলো,যে তার কন্ঠ তো এতো বাজে না, তাহলে লোকগুলো তার কথা শুনে চলে গেলো কেন।
ইতি জোরে জোরে বলতে লাগলো,,
__ আমরা ফকির ইন্ডাস্ট্রি থেকে এসেছি এই যে ভ্যানে দেখছেন ছেলেটা সে কাল কোমায় গেছে তাই তার সাহায্য দরকার,যার যা আছে তাই দিয়ে সাহায্য করুন।
ইতির কথা শেষ না হতেই,এক বাচ্চার কান্নারত চিৎকার ভেসে এলো তাদের কানে,ইতি, বিথী নীধি সেদিকে তাকিয়ে দেখলো,একটি ছেলে বাচ্চা কান্না করছে ও মুহিনের বুকে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি দিচ্ছে, এদিকে মুহিনের চোখ বন্ধ, বাচ্চার মা ও জোরে জোরে বলছেন,,
__ এই ছেলে ওটো বলছি ওঠো,আমার ছেলের চিপস খেয়েছো তার দাম দাও বলছি, দাও।
হ্যাঁ খিদের চোটে মুহিন বাচ্চাটির চিপস খেয়ে ফেলছে, মুহিন বাচ্চাটির চিপস খেয়ে,দোষের হাত এড়াতে চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে,ইতি বিথী নীধি সেদিকে গেল।নিধি বাচ্চাটিকে মুহিনের থেকে সরাতে সরাতে বলতে লাগলো,,,
__ সোনা বাচ্চা ওরে মারে না,ও তো এমনিতেই কোমায় গেছে।
ফট করে বাচ্চাটার মা চিৎকার করে বলে,,
__ আমি স্পষ্ট দেখেছি ও আমার বাচ্চার চিপস খেয়ে ফেলছে।
ইতি, বিথী, নীধি তিনজনই ভয়ে জড়সড় হলো,মহিলাটি আবার দৃঢ় কন্ঠে বলল,,
__ আমার বাচ্চার চিপসের টাকা দিন।
ইতি বলে,,
__ কত টাকা?
__ ১০০ টাকা।
ইতি উপায় না পেয়ে বিথীর কানে কানে বলে,,,
__ টাকাটা দিয়ে দে,না হলে ঝামেলা হতে পারে।
__ কিন্তু আমার কাছে তো ১০০ টাকাই আছে।
নিধি ফিসফিসিয়ে বলে,,
__ সমস্যা নাই দিয়ে দে,এই মহিলা ডেঞ্জারাস আছে বুঝলি।
বিথী ভোঁতা মুখ করে টাকাটা দিয়ে দিলো,মহিলাটি টাকাটা এপাশ ওপাশ করে দেখতে দেখতে চলে গেল, বিথী রাগ দেখিয়ে মুহিনকে বললো,,,
__ তোর না মুত চাপ দিছিলো।
মুহিনের মুখে বাচ্চা ছেলেটির সর্দি লেগেছে, মুখ কুঁচকে তা পরিষ্কার করতে করতে মুহিন বললো,,,
__ খিদে ও লেগেছিল,আর তোরা তো জানিস এ আমার চিপস কত ফেভারিট,চিপস দেখলে লোভ সামলাতে পারি না, বাসায় মিশকাতের সাথেও এই নিয়ে অনেক চুলোচুলি হয়, তোদের সাথে তো ও হয়।
ইতি মুহিনের মাথায় একটা টালা বসিয়ে বলে,,
__ এখন বাড়ি ফিরবো তোর কাঁধে করে।
নিধি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনি পিছোন থেকে কর্কশ কন্ঠস্বর ভেসে এলো,,,
__ এই, ধর ওদের, ধর,ধর, একটাও যেনো পালাতে না পারে,ধর ধর।
ছয়জনের হকচকিয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখে একদল পুলিশ তেড়ে আসছে তাদের দিকে, মুহুর্তেই ইতি, বিথী, নীধি সুন্দর ও মুহিনের কলিজা লাফাতে শুরু করলো বিথী কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,,
__ ওরা বোধহয় জেনে গেছে আমরা নকল ফকিরা।
মুহুর্তেই জুহি হকচকিয়ে ভয়ে আঁতকে বললো,,
__ কিইইইইই, তোমরা নকল ফকির,এই সন্দেহ আমার আগেই হয়েছিল,এ আল্লাহ আমি কেন এলাম এদের সাথে,এখন কি হবে,ও আল্লাহ, আল্লাহ বাঁচাও।
মিজান জুহির হাত চেপে বলে,,
__ বাবু এখন কি করবো আমরা।
ইতি, বিথী, নীধি তিনজনই তিনজনকার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিথী বলে,,
__ বাঁচতে চাই পালাও সবাই।
এই বলে দৌড় লাগালো ইতি, বিথী, নীধি তাদের পিছনে, সুন্দর ও মুহিন।আর উপায় না পেয়ে জুহি ও মিজান তারাও ছুটলো তাদের পিছু পিছু।
ছয়জনই প্রাণপণ ছুটছে। এদিকে মুহিনের সেই কখন মুএের চাপ দিয়েছিল বেচারার তখন কোনরকমে চেপে রেখেছিল,কিন্তু এবার তো দৌড়াতে হচ্ছে,এবার তা চেপে রাখা খুবই কষ্টকর হতে লাগলো মুমিনের কাছে।
সুন্দর দৌড়াতে দৌড়াতেই পিছোনে তাকিয়ে দেখলো তাদের পিছনে আরো কজন ছেলে দৌড়াচ্ছে,ছেলে গুলোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে তারা গাঞ্জাখোর, সুন্দরের বুঝতেও সময় লাগলো না লাগলো যে, পুলিশ তাদের ধাওয়া করে নি বরং, তাদের পিছনের গাঞ্জাখোর ছেলেগুলোকে ধাওয়া করেছে, কিন্তু এখন তারা দৌড়ে আর এক ভুল করছে,এখন নিশ্চয়ই পুলিশ তাদের ও গাঞ্জাখোর,মদখোর ভাবছে।
দৌড়াতে দৌড়াতে সুন্দর বিথীকে উদ্দেশ্য করে বলল,,
__ বিথী পুলিশ আমাগো ধরার জন্য দৌড়াচ্ছে না,তারা অন্য সব ছেলেদের ধরার জন্য ধাওয়া করছে।
বিথী একবার পিছনে তাকিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতেই বললো,,
__ এখন দৌড় থামালেও বিপদ সুন্দর ভাই, কথা না বলে দৌড়াতে থাকো।
এই বলে আরো দ্রুত গতিক দৌড়াতে লাগলো সবাই, মুহিন দৌড় অবস্থাতেই হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,,
__ সুন্দর ভাই আমি আর মুত চেপে রাখতে আর পারছি না,কি করি এখন।
সুন্দর বিরক্ত হয়ে বলে,,
__ এখন কিছু করার নেই মুহিন,না হয় দৌড়াতে দৌড়াতেই তোর সেচ টা ছেঁড়ে দে।
এবার সুন্দর করে বসলো আর এক অকাজ, দৌড়ানোর কারণে সুন্দরের পায়ের কাছে এক বাচ্চা কুকুর আসলো সে না দেখেই ভুলবশত তার পা লেগে বাচ্চা কুকুরটি ছিটকে অন্য দিকে পড়লো সুন্দর নিজেও পড়ে যেতে ধরেও পড়লো না, কিন্তু তাও সে দৌড় থামালো না।
বাচ্চা কুকুরটির মা কুকুর এবার ঘেউ ঘেউ করে তাদের পিছনে ছুটতে লাগলো।
এখন তাদের পিছনে পুলিশ নেই, পুলিশ অন্য রাস্তা দিয়ে গান্জাখোরদের ধরতে গেছে। কিন্তু এবার তাদের পিছু নিলো কুকুর। কুকুরটি তাদের পিছনে ছুটছে পাগলা কুকুরের মতো, তাদের পেলেই অবস্থা নাজেহাল করে ছাড়বে,তাদের অপরাধ তার বাচ্চাকে ফেলে দেওয়ার জন্য।
__ ঘেউ.. ঘেউ… ঘেউ
করে ছুটছে কুকুরটি।
জুহি ও মিজানের অবস্থা বেশি শোচনীয়। এদিকে ইতি, বিথী, নীধি তারা এমন এলোমেলো দৌড়ে ও তাদের হাতের বাঁধন ছিন্ন করে নি কিছুতেই।হাতের বাঁধন শক্ত রেখেই দৌড়াচ্ছে বরং তাদের সামনে কোনো সাইকেল ওয়ালা,বা কোন গাড়ি আসলে বাঁধ্য হয়ে গাড়ি ওয়ালাই অন্য দিকে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের বাঁধন ছিন্ন হচ্ছে না।
ছয়জনই একবার করে পিছনে দেখছে ও দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে তারা আম বাগানের দিকে চলে এলো এবং মোটা আম গাছটার সামনে এসে বিথী দাঁড়ালো, হাঁটুতে ভর করে হাঁফাতে হাঁফাতে বললো সে,,
__ এই আম গাছে উঠো সবাই, কুকুর এখোনে আমাদের থেকে বেশ দুরুত্বে আছে, তাড়াতাড়ি করো, ফাস্ট।
বিথী কথা মতো প্রথমে ইতি,তারপর নিধি,ও বিথী উঠলো,জুহি ও মিজান ও তাড়াতাড়ি করে গাছে উঠে পড়লো, সুন্দর ও গাছে উঠলো, মুহিন গাছের উঠতে পারে তাই তাকে টেনে তুলল সুন্দর।
গাছে উঠে সব গুলোই জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো, এদিকে কুকুর আম গাছের নিচে এসে তাদের দিকে তাকিয়ে অনেক ক্ষণ ঘেউ ঘেউ করলো, কুকুরটি বেশ কয়েক আম গাছটিতে ওঠার ও চেষ্টা করলো কিন্তু পেলো না।
অবশেষে আরো বেশ কিছুক্ষণ ঘেউ ঘেউ করে চলে গেলো কুকুরটি ।
গাছে থাকা ছয়জনই একে অপরের গায়ে ঢলাঢলি করে জোরে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগলো। ধুকপুক করা বুক গুলোতে স্বস্তি ফেরত এলো,,
কিন্তু স্বস্তি আর হলো কই
হঠাৎ সেখানে একটা বিকট শব্দ হতেই আম গাছে থাকা সবাই ধড়ফড়িয়ে উঠলো,এতে ইতির মেজাজ খুব খারাপ হলো এবং বলল,,
__ কে এই অসময়ে পাদ মারলো?
পাদ মারার মতো জঘন্য অপরাধ মুলক কাজটি করেছে জুহির বয়ফ্রেন্ড মিজান, মিজান অসহায় মুখে সবার দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলো,তার পাশে থাকা জুহি নাকে ওড়না চেপে চোখ বড় বড় করে শাসিয়ে বলল,,,
__ পাদ মারলে কেন?
কাঁদো কাঁদো স্বরে মিজান বলল,,,
__ গাছে ওঠার সময় প্যান্ট টা ছিঁড়ে গেছে, এদিকে মল ত্যাগ করাও জরুরি,তাই আর কি।
জুহি রাগ দেখি বলে,,,
__ চুপপপপপপপ..
এই বলে জুহি গাছ থেকে নামতে নামতে বললো,,
__ আজ থেকে তোর সাথে ব্রেকআপ।
মিজান হকচকিয়ে সে নিচে নামতে নামতে বললো,,
__ কেন, ব্রেকআপ কেন?
__ কারণ তুই পাদিস।
তাড়াহুড়ো করে গাছ থেকে নামতে গিয়ে পিছনের দিকে প্যান্ট আবার ছিঁড়ে গেল মিজানের, পশ্চাৎ তের ছেঁড়া অংশে হাত দিয়ে গাছে উপরে থাকা ইতি, বিথী, নীধির দিকে তাকালো,তারা তো এসব কান্ড দেখে একে অপরের গায়ে ঢলাঢলি করে হাসছে। মিজান ছেঁড়া অংশে দুই হাত চেপে জুহি ডাকতে ডাকতে ধীরে ধীরে যেতে লাগলো,,,
__ বেবি দাঁড়া প্লিজ,আজ থেকে আমি আর পাদবো না,বাড়ি গিয়ে পাদের ওষুধ খাবো,তুমি তাও আমাকে ছেড়ে যাইও না , প্লিজ বেবি দাঁড়াও।
এদিকে ইতি বিথী নীধি সুন্দর মুহিন একে একে গাছ থেকে নেমে অনেকক্ষণ যাবৎ হাসতে হাসতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল,আজ তাদের অনেক কিছু লস হলো।এই জন্য ইতি হাসি থামিয়ে বিথী কে বেশ বকাঝক ও দিলো।
আজ ফকির বেশ নিয়ে তারা যেটা বুঝলো
“ফকিরের থেকে এমনি মানুষ গুলো আরো বেশি ফকির।”
বিথী চেয়েছিল এক হলো আর এক।যাইহোক এখন কি আর করার,এবার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা ধরলো তারা, হঠাৎই নিধির চোখ গেলো সুন্দর পানে, সুন্দরের উপর নিচ পরখ করে আবাক হয়ে নিধি বলে,,,
__ সুন্দর ভাই তোমার লুঙ্গি কই?
এবার সুন্দরের দিকে ইতি,নিধি ও মুহিন ও তাকালো, সুন্দর ও হকচকিয়ে নিচে দিকে তাকিয়ে দেখে আসলেই তার লুঙ্গি নেই,ভাঙ্গিস হাঁটু পর্যন্ত থ্রি কোয়াটার প্যান্টটা আছে,ইতি, বিথী, নীধি,মুহিন অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো,তখন দৌড়ানোর সময় সুন্দরের লুঙ্গি খুলে গেছে যা খেয়াল করে নি সুন্দর, তাতেই সুন্দরের কি? হাফ প্যান্ট তো আছেই নাকি।
মুহিনের গায়ে পড়া হাঁসিতে সুন্দরের রাগ হলো খুব তাই সে মুহিন কে বলল,,
__ তোর যে তখন মুত চাপ দিছিলো ,এখন কই গেলো তোর মুত।
বিথী হাঁসি থামিয়ে বলে,,
__ আসলেই তো।
মুহিনের মুখ খানা চুপছে গেল মাথা নিচু করে বললো,,
__ দৌড়াতে দৌড়াতে আর চেপে রাখতে না পেরে কাজ ছেড়ে ফেলছি।
আবারো ইতি, বিথী, নীধি,ও সুন্দর অট্রহাসিতে হাঁসিতে ফেটে পড়লো, পেটে হাত দিয়ে হাসতে লাগলো এঁকেক জন।
অতঃপর তাদের কাছে কোন টাকা না থাকা হাসতে হাসতে দৌড়াদৌড়ি করে বাড়ির রাস্তা ধরলো।
রাত নয়টা,,,
আলবানের বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে রয়েছে ইতি। এই ঘরে আসতে তার একেবারেই ইচ্ছে ছিল না কিন্তু বিথী জোর করেই তাকে এখানে পাঠিয়েছে। সেই দৌড়ঝাঁপের ফলেই পায়ের যন্ত্রণা এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে টনটন করে ব্যথা করছে। বিথীর বিছানায় শুয়ে সে বারবার এপাশ-ওপাশ ফিরছে, তবু যন্ত্রণার হাত থেকে কোনওভাবেই মুক্তি মিলছে না, শান্তি তো দূরের কথা।
বাড়ির কারও কাছে ব্যথার কথা বলার সাহসও পাচ্ছে না ইতি। জানে, বললেই একের পর এক প্রশ্নের বন্যা বয়ে যাবে যার উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক শক্তি এই মুহূর্তে তার নেই,আর কি বা বলবে,যা সব ঘটলো,শুনলে সিদ্দিকী বেগমের একটা মাইর ও মাটিতে পড়তো না। তার চেয়েও ভয়াবহ চিন্তা ঘিরে ধরেছে তাকে আজকের রাত যে তার জন্য কতটা ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে, সেই আশঙ্কায় শরীর শিউরে উঠছে তার।
হাত দিয়ে চোখ দুটো শক্ত করে ঢেকে সে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল।
ঠিক সেই সময়েই আলবান ঘরে প্রবেশ করল। বিছানায় ইতিকে দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল, চোখ বুলিয়ে নিল নিঃশব্দে। তারপর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই তোয়ালে হাতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে ভেসে আসা ‘খট’ শব্দে চমকে উঠল ইতি। ধড়ফড় করে চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সে দরজার দিকে তাকাল। বুঝতে বাকি রইল না আলবানই ঢুকেছে। বিষয়টিতে আর বিশেষ মন না দিয়ে গায়ে কম্ফোর্টারটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল সে, আর মিথ্যে ঘুমের ভান করে চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর শাওয়ার শেষ করে আলবান তোয়ালে শরীরে জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। দরজার শব্দে ইতি আবারও অনিচ্ছায় চোখ মেলে তাকাল সেদিকে। মুহূর্তের মধ্যেই দৃষ্টি সরানোর কথা থাকলেও, অজান্তেই সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল আলবানের নগ্ন শরীরের দিকে,,
__ এই লোক এই ঠান্ডায় গোসল করলো কেমনে, এদিকে আমি তো আজ গোসলেই করি নি,কাল করবো কিনা তা ও সন্দেহ।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইতি মুখের উপর কম্ফোটারটা দিয়ে রাখলো।
আলবান আলমারি থেকে টাওজার ও টিশার্ট পড়ে,ইতি দিকে আসলো।
ইতির গায়ে থাকা কম্ফোটারটা অন্য দিকে মেলে দিলো, ঠান্ডায় ছ্যাত করে উঠলো ইতি,পা দুটোকে গুটিয়ে বিরক্তিতে বলল,,
__ কি চাই।
আলবান মাথার চুল গুলো ব্যাক ব্লাশ করতে করতে বললো,,
__ খিদে পেয়েছে,খাবো,ওঠ খাবার বেড়ে দে।
ইতি প্রচুর রাগ নিয়ে বলে,,
__ তো আমি কি খাবার মাথায় নিয়ে ঘুরছি নাকি, আজব।
ইতি আলবানের রাগি চোখ দেখে গলার খাদ নামিয়ে বলে,,
__ টেবিলে খাবার বেড়ে দেওয়া আছে খেয়ে নিন।
__ তাহলে পানি এনে দে।
ইতি তেতে উঠল,,
__ এমন করছেন কেন, একটু পানি এনে খেয়ে নিলে কি এমন সমস্যা হবে।
আলবান আর কোন কথা না বলে টেবিলে দিকে যেতে যেতে বললো,,
__ এই মুহূর্তে না উঠলে, আজ রাতে এর শাস্তি চরম ভাবে ভুগতে হবে।
ইতি বুকটা ছ্যাত করে উঠলো বিপদে আশংকা আঁচ করতে পেরে পায়ে ব্যাথা নিয়েই উঠে দাঁড়ালো সে,টেবিল থেকে জগটা নিয়ে পানি এনে ফের টেবিল রেখে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
আলবান প্লেটে ভাত নিয়ে ইশারায় ইতিকে বসতে বললো,ইতি বাধ্য মেয়ের ন্যায় বসে গেল।
আলবানের ভাত তরকারি দিয়ে মেখে ইতি মুখে সামনে ধরলো,ইতি শুধালো,,,
__ আমি খাবো না, আপনি খান।
আলবান রাগ দেখিয়ে বলে,,
__ হা কর বলছি।
ভয়ে ইতি প্রায় হাঁ করে গ্রাসগুলো গিলে নিল। ঠিক সেইভাবেই আলবান খেতে লাগল, আর প্রয়োজনমতো ইতিকেও খাওয়াল। বাধ্য, নিরুপায় এক মেয়ের মতো ইতি নীরবে সবটুকু গ্রহণ করল। কোনো কথা নেই, কোনো চোখাচোখি নেই,দুজনেই নিঃশব্দে খেতে থাকল।
খাওয়া শেষে আলবান নিজ হাতে ইতিকে পানি খাইয়ে দিল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে নিল সে। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি পড়ল ইতির ঠোঁটের চারপাশে লেগে থাকা পানির ছোট ছোট ফোঁটার দিকে।
সেই দৃশ্য দেখে মুখভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন না এনে, নির্বিকার কণ্ঠে আলবান বলল,,
__ মুখ টাও মুছে দিতে হবে।
ইতি একবার আলবানের দিকে তাকিয়ে নিজের ওড়না দিয়ে মুখ মুছে নিলো।
এরপর ইতি বিছানার দিকে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে চাইল। কিন্তু পায়ের ব্যথা এত তীব্র যে টনটন করে ব্যথা আরও বাড়ল। বারবার চেষ্টা করেও সে সক্ষম হল না।
এই দৃশ্য আলবানের চোখে পড়তেই, কোনো শব্দ না বলে সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ইতিকে কোলে তুলে বিছানায় শুয়ে দিলো, এবং নরম, সান্ত্বনাদায়ক কণ্ঠে আলবান বলল,,,
__ কি হয়েছে পায়ে?
আলবানের এমন নরম কন্ঠসর অপরিচিত লাগলো ইতির কাছে,আমতা আমতা করে ইতি বলল,,,
__ তেমন কিছু না, এমনিতেই ব্যাথা করছে।
__ ওষুধ খেয়েছিস।
ইতি মাথা নাড়িয়ে না বললো।
আলবান বেড সাইডের ড্রায়ার থেকে ওষুধ নিলো,টেবিল থেকে গ্লাস পানি এনে ইতির সামনে দিয়ে বলল,,
__ এটা খেয়ে নি।
ইতি খেয়ে নিলো নিঃশব্দে।
আলবান ঘরে লাইট ওফ করে ড্রিমলাইট ওন করে ইতির গা ঘেঁষে গাঁয়ে কম্ফোটার জড়িয়ে নিলো।
অতঃপর ইতির কপাল,চোখ নাক গালে চুমু দিলো পরপর ইতির চোখ বড় বড় হলো,বুকটা দ্রিমদ্রিম করছে তার,এরপর আলবান ইতির ঠোঁট তার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো এবং ইতির কানে হিসহিসিয়ে বললো,,
__ এই ব্যাথায় আমি তোকে আরো ব্যাথা দিতে চাই ন
,আজ বেঁচে গেলি কিন্তু এর পর আর রক্ষা নেই, যেহেতু স্বামী হই সেই অধিকার আছে আমার,এখন এতে তোর সম্মতি আই ডোন্ট কেয়ার।
আলবান ইতির গলায় মুখ গুঁজে শান্ত ছেলের মতো গুটিয়ে রইলো,ইতির শরীর এই ঠান্ডায় ও যেন জমে বরফ হয়ে আছে আলবান এমন এলোমেলো ছোঁয়ায়, এদিকে আলবান কিছুতেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারলো না বেশ বিরক্তি নিয়ে ফের বললো,,
__ মাথায় হাত বুলিয়ে দে কালনাগিনী,যেনো তাড়াতাড়ি ঘুম ধরে,নাহলে কন্ট্রোল লেস হয়ে এখানেই কিছু একটা করে বসবো,সেটা তোর জন্য ভালো হবে না।আই উুইল কন্ট্রোল মাই সেল্ফ।
ধ্যাত,
এভাবে আস্ত শিকারকে সামনে রেখে, নিজেকে কন্ট্রোলে রাখা বড্ডো কষ্টকর।
ইতি কাঁপতে কাঁপতেই আলবানের মাথা হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,,
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪০
__ আমি আপনার শিকার বুঝি।
আলবানের কিছুতেই শান্তি লাগছে না বিরক্তির ন্যায় ফের বললো,,
__ তুই বুঝবি না ওসব, মেজাজ খারাপ না করে যা বলছি তাই কর।
ইতি ঠোঁট টিপে হাসলো আর কিছু বললো না,ইতি নিজেও আলবানের ছোঁয়াতে শিহরণ হচ্ছে, এজন্য মুখ ফসকে কখন কি বের হয় তা বলা বাহুল্য তাই চুপ থাকাই শ্রেয় তার জন্য।
