Home প্রণয় ব্যাকুলতা প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪০

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪০
ইনান হাওলাদার

অপেক্ষার প্রহর সত্যিই অনেক দীর্ঘ হয়। সেই বিকেল থেকে তূর্যের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বারবার হতাশ হয়েছে আহি। অবশেষে রাত বাঁধিয়ে বাড়ি ফিরেছেন জনাব।
বাড়ির গেইটে তূর্যের গাড়ির হর্ন শুনেই রেইডি হতে শুরু করেছে সে। প্রতিদিন তূর্য বাড়িতে আসবে সেই কয়বারই হর্ন বাজাবে।গাড়িতেই আসুক বা বাইকে।আর আহি হর্ন শুনেই এক দৌঁড়ে ড্রয়িং রুমে চলে আসবে।আর ঘুরঘুর করবে। ভাগ্যিস তূর্য ভাই হর্ন বাজান নাহলে সে তো বুঝতেই পারতো না তিনি কখন বাড়িতে ফিরছেন। কিন্তু সে তো আর জানে না তাকে সংকেত জানানোর জন্যেই কোনো একজন বিনা কারণেই হর্ন বাজিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে।

লতা বেগমের আলমারি থেকে সুন্দর একটা শাড়ি নিয়ে চমৎকার করে সেজেগুজে তূর্যের রুমে এসে বসে আছে আহি। এসে আর তূর্যকে রুমে পায়নি। গোসলে ঢুকেছে।আহিও অপেক্ষা করছে।
সেই তখন থেকে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। কিন্তু তূর্যের ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর নামই নেয়।
শুধু তো প্রেম করলেই হবে না,প্রেমিক পুরুষকে একটু রোমান্টিক না হলে হয়?
আর শবনমের কথাটাও তো পরখ করে দেখতে হবে। তূর্য ভাই তাকে শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দেখে কেমন আচরণ করে।
ওয়াশরুমের দরজা থেকে খট করে শব্দ হতেই আহি কপট লজ্জা লজ্জা মুখ করে মাথা নিচু করে ফেললো। তূর্য তাকে এই অবস্থায় দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। গম্ভীর মুখে বলল,

” জোকার সেজে বসে আছিস কেন?”
তারপর ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চুল মুছতে লাগলো। তূর্যের এমন কথায় যেন মাথায় বাজ পড়লো
আহির । তবে কোনো প্রত্যুত্তর করলো না। সে
বেশ খানিকক্ষণ ওভাবেই বসে থাকলো।তূর্যের
এরকম ইগনোর দেখে বি’রক্ত হলো সে।তারপর
আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো।
নাহ ! তূর্য ভাই কিছুই বলছেন না।আহি আর ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারলো না। ভীষণ রকমের অধৈর্য সে।
বসা থেকে উঠে তূর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। লজ্জা ভেঙে বলল,
” তূর্য ভাই ? আমাকে কেমন লাগছে ?”
” প্রতিদিন যেমন লাগে !” নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল তূর্য। একটু আগে যে তূর্য ভাই বললেন জোকার সেজে বসে আছিস কেনো? তারমানে তাকে প্রতিদিন জোকার লাগে। অভিমান হলো আহির।তারপর আবার নিজেকেই বুঝ দিলো ,তূর্য তো এমনই ! ভালো লাগলেও মুখ ফুটে বলবে না। সে বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিক। সে উৎফুল্লতা নিয়ে পুনরায় বলল,

” আজকে তো শাড়ি পড়েছি।আজকে কেমন লাগছে?”
তূর্য ভেজা তোয়ালেটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে তর্জনি আর বৃদ্ধা আঙ্গুল দ্বারা আহির থুতনি ধরে কয়েকবার এদিক – ওদিক ঘুরিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
” কেমন লাগবে ? ”
বি’রক্ত হলো আহি। এইযে তূর্য ভাই তার সামনে শুধু কোমরে একটা টাওয়াল পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।এতেই তো তার বুক ধুকপুক করছে।আর সে শাড়ি পরে কত সুন্দর করে সেজে এসেছে তাও তূর্য ভাই পাত্তা দিচ্ছেন নাহ!
শবনম বলেছিল শাড়ি পরে তূর্য ভাইয়ের সামনে গেলে উনি পাগল হয়ে যাবেন। কোথায়? তিনি তো পাগলের ‘প’ ও হলেন না। বেহায়াপনার সর্বোচ্চ লেভেলে পৌঁছে গেল সে,আবার বলল,

” আপনি আমার পা থেকে মাথা অবধি তাঁকিয়ে ভালো করে দেখে তারপর বলুন ”
তূর্য সত্যি সত্যি আহির কথা মতো তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে লাগলো।কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল পাতলা শাড়ির উপর দিয়ে ভাসমান আহির সরু,চিকন,মসৃন বাঁকানো কোমরের দিকে । সে এদিক ওদিক এলোমেলো তাকিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে দ্রুত নিজের চোখ সরালো।এই মেয়ে আসলেই পাগল ।নাহলে এভাবে কেউ সামনে আসে? নিজেকে সংযত করে কন্ঠ ক’ঠোর করে বললো,
” সর সামনে থেকে ”
আহি সরলো সামনে থেকে কিন্তু রুম থেকে বেরোলো না। আগের মতো খাটে গিয়ে পা ঝুলিয়ে বসলো।
‘গো’ ধরে বসে আছে সে। তূর্যের থেকে কমপ্লিমেন্ট না পাওয়া পর্যন্ত রুম থেকে নড়বে না। তূর্য ফের ধ’মকে বললো,

” যাস না কেনো? চেইঞ্জ করবো ”
” করুন ! আপনি তো আর মেয়ে মানুষ নন। আমার সামনে চেইঞ্জ করতে সমস্যা কি?” থমথমে গলায় বলল আহি।
নাহ!একে একটু শিক্ষা না দিলে হবে না। দিন দিন বেশি বাঁদরামি শুরু করেছে।তূর্য তোয়ালে পরা অবস্থায় এগিয়ে গেল আহির দিকে। আহির দুই পাশ দিয়ে বিছানার উপর দুই হাত রেখে ওর দিকে অনেকটা ঝুঁকে পড়লো।তাল সামলাতে না পেরে আহিও কিছুটা হেলে পড়ল।
কন্ঠ যথাসম্ভব খাদে নামিয়ে বলে উঠলো,
” শালীনতা বজায় রেখেছি।আর শালীনভাবে থাকতে দে।তুই আমাকে দেখেছিস । বাট ,না আমার অ’শ্লীল কথা – বার্তা শুনেছিস ,আর না কাজ – কর্ম দেখছিস। আমি একবার মুখ খুললে নিজের মুখ লুকানোর জায়গা পাবি না। সো, নিজে ভদ্রতা শিখুন। আর ,অন্যকে ভদ্র থাকতে দিন ”
তূর্যের এমন কন্ঠে গলা শুকিয়ে গেল আহির।আচ্ছা কি সাবান মেখেছেন তূর্য ভাই? এরকম মাতাল ঘ্রাণ কেনো? নিজেকে সামলে সে বলল,

” আপনি সরুন দূরে তূর্য ভাই।তারপর বলুন কেমন লাগছে ”
তূর্য সরলো না,বরং আরো কিছুটা ঝুঁকে পড়লো।ফিসফিস করে বলল,
” এক কথা আর কতবার রিপিট করবো? বলেছিলাম না ?আমি কথায় না কাজে বিশ্বাসী! ”
” আচ্ছা,দূরে সরে কাজ করুন ”
” হাউ ইজ ইট পসিবল?” তারপর একটু থেমে হাস্কি স্বরে ফের বললো,
” যেভাবে আমার ভিতরটা এলোমেলো করলি,ঠিক সেভাবেই যদি তোর বাইরেটা এলোমেলো করি, কি করবি তুই?”
” কিছু না ”
কি বলছে ,কি না বলছে কিছু বুঝছে না আহি।একটা উত্তর দিতে হবে তাই গলা হেঁচড়ে কোনো রকমে কথাটা বলল সে। তূর্য সেই কথার সূত্র ধরে বলল,

” রিয়েলি? তাহলে করি?”
আর কোনো কথা বললো না আহি।বলা বাহুল্য, গলা দিয়ে আর কথা বের হলো না। চোখ বন্ধ রেখে শুধু বারবার জ্বিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাতে লাগলো। তূর্য দুচোখ ভরে প্রেয়সীর সাজসজ্জা দেখলো।তারপর কপালে মৃদু একটা টোকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। বদ্ধ চোখ জোড়া আর খুললো না আহি।সে সেভাবেই পড়ে রইলো। তূর্য সরে ট্রাউজার পরে নিলেও আহি অসাড় হয়ে সেভাবেই পড়ে রইলো।
সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চুলে ব্যাক ব্রাশ করতে করতে গম্ভীর গলায় বললো,
” সোজা হয়ে বস,স্টুপিড ”
সোজা হয়ে বসলো আহি। রিমোট কন্ট্রোল পুতুলের মতো কাজটা করলো সে।এমন যেন তূর্যের বলা বাক্যটা র অপেক্ষা করছিল সে।বলার সাথে সাথে সেভাবেই কাজ করলো। তূর্য একটা লোশনের বোতল হাতে এগিয়ে আসলো।ফের বললো,

” ওপেন ইয়োর আইজ”
চোখ খুললো আহি।তূর্য হাতের লোশনটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
” লাগিয়ে দে ”
আহি বোতলটা হাতে নিলো । তারপর বলল,
” একটা টি শার্ট পরে আসুন, প্লিজ ”
” টি শার্ট পরে আসলে তুই লাগিয়ে দিবি কোথায় ,ই’ডিয়ট?”
আহি একটু সময় নিয়ে খানিকটা লোশন হাতের উপর ঢেলে নিলো।তূর্যের গায়ে দিবে তার আগেই সে আটকে দিলো।বলল,

” সামান্য কথার ভার সামলাতে পারিস না।আমাকে কিভাবে সামলাবি ? এভাবে কাঁপতে কাঁপতে কিছু করতে হবে না। যা তুই ! কাল সকালের আগে যেন আর সামনে না পাই।”
আহিও আর দেরি করলো না। আস্তে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তূর্য ঘাড় কাত করে আহির যাওয়া দেখলো। তারপর দরজা লক করে বুকের বা পাশে হাত চেপে ডিভানে বসলো।সেখানে হাত ডলতে ডলতে ব্যাথাতুর গলায় বলল,
” কবে যেন হা’র্ট অ্যাটাকেই মা’রবি আমাকে। নিউজ পেপারে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকবে ,
‘ নামকরা হা’র্ট সার্জন তাশরীক চৌধুরী তূর্য তার সানবার্ড এর রূপ সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাকে পরলোক গমন করলেন ‘ ”

বিগত কয়েকদিন যাবৎ চৌধুরীদের ডাইনিং টেবিলের একটা না একটা চেয়ার ফাঁকা থেকেই যাচ্ছে। আজকে আসিফ চৌধুরী অনুপস্থিত থাকেন তো কাল তূর্য নাহয় বাড়ির আর দুই কর্তা। আজকে আবার ওনারা সবাই উপস্থিত শুধু আহি আর শবনম বাদে।
তারা নাকি দুপুরের খাবার বাইরে থেকে খাবে।
তাহি যেতে চাইলেও তারা নেয়নি।বলেছে তার জন্যে পার্সেল নিয়ে আসবে। তাহি ছোট মানুষ, খাবার খাওয়াই তার মেইন উদ্দেশ্য সেটা যদি ঘরে বসেই খেতে পারে তাহলে তো কোনো প্রবলেমই নেই।অগত্যা সেও আর জোরাজুরি করেনি।
আকবর চৌধুরী ওদের দুইজনকে না দেখে ‘ তারা কোথায়?’ জিজ্ঞেস করলে পারভিন বেগম জানিয়েছেন ‘ তারা বাইরে থেকে খাবে ‘
আসলাম চৌধুরী কয়েকদিন ধরে একটা কথা বলবেন।কিন্তু কোনো সুযোগ পান না। খাবার টেবিল ছাড়া সবাই একত্রিতও হয় না আর সেখানে আহিও থাকে।
আজ না থাকায় তিনি কথাটা বললেন,

” ভাইজান মাসুদের কথা মনে আছে? আসিফ, তোর তো মনে থাকার কথা।ওর একটা ছেলে ছিল না? সোহেল!সে তো এখন দেশের বাইরে সেটেল।মাসুদ বলছিল একটা মেয়ে দেখতে ,ছেলেকে বিয়ে দিবে। আহির কথা বলতে চায়,কিন্তু সরাসরি বলে না ।আমি তো বুঝি ”
চাচার কথা শুনে মুখের ভাত নাড়ানো আপনা আপনি বন্ধ হয়ে গেল তূর্যের।পারভিন বেগম একবার ভীতু চোখে ছেলের দিকে চাইলেন।তূর্যও তাঁকালো। তিনি ছেলেকে শান্ত থেকে সম্পূর্ণ কথা শোনার ইঙ্গিত দিলেন।তূর্যও সেটাই করলো। এদিকে মারুফা বেগম আর লতা বেগমও চিন্তিত।আজকেই না সবটা সামনে চলে আসে।তূর্যের হাবভাব ভালো ঠেকছে না ওনাদের।
আসিফ চৌধুরী বললেন,

” মেয়েকে এত শিগগির বিয়ে – সাদি দেওয়ার কোনো দরকার নেই ”
আকবর চৌধুরীও সেই কথায় সাঁই জানালেন। আসলাম চৌধুরী বললেন,
” মেয়ে হয়ে যখন জন্ম নিয়েছে বিয়ে আজ দেই বা কাল দেই দিতে তো হবেই।কিন্তু ওই বিলেতি ছেলের সাথে কে দিবে? আমার জামাই হবে একেবারে খাঁটি দেশজ।আমার বাড়িতে আসবে আর আমরা তিন ভাই মিলে তাকে নিয়ে মাছের বাজার,গরুর বাজার ,খাসির বাজার ঘুরে বেড়াবো।আর ওই বিদেশী ছেলেকে পাবদা মাছ বললে পাঙ্গাস নিয়ে চলে আসবে। ”
বলে অট্ট হাসিতে ফেঁটে পড়লেন তিনি।সাথে বাকিরাও ,একমাত্র তূর্য ব্যতীত। সে গম্ভীর গলায় বলল ,

” বাড়ির জামাই হলেই মাছের বাজার,গরু – খাসির বাজার ঘুরতে হবে কেন?”
” আমাদের বাড়ির বড় জামাই হবে সে। দেখবো না বাজার ঘাট কেমন কিদেকি করতে পারে? ”
আসিফ চৌধুরী মস্করা করে বললেন,
” তুই ভয় পাস না বাজান। তোর বিয়ে আমরা তোর চাচার মতো শশুর দেখে দিবো না। আর আগেই বলে রাখবো আমাদের ছেলে বাজার – ঘাট করতে পারে না ”
তূর্য কোনো ভাবে ঠিকঠাক করে সবজির নাম বলতে পারলেও হাতে গোনা দুই একটা মাছ ছাড়া অন্য মাছের নামও বলতে পারবে না। শুধু ইলিশ আর চিংড়িই ভালো করে চিনে।আর বাকি দুই একটা আছে সেইগুলো।
ও যে বাজার করতে জানে না সেটা সে নিজেও জানে ।তবুও জোর গলায় বলল,
” আই ক্যান ”
বাড়ির তিন গিন্নি আসল কাহিনী ধরতে পেরে মুখ টিপে হাসাহাসি করলেন। আকবর চৌধুরী বললে,
” কী পারো তুমি?”
” হাট – বাজার করতে ” থমথমে গলায় বলল তূর্য।
” আমাদের তো জীবনে করে খাওয়ালে না।শ্বশুরকে খাওয়ানোর খুব ইচ্ছা দেখছি।পারো না স্বত্বেও পারি পারি করছো ”

” আমি পারি ,আব্বু।না পারলে কেন বলবো?” বলে একবার আড় চোখে চাচাকে দেখে নিলো। ব্যাটার হাবভাব সুবিধার ঠেকছে না।এখন না বলে বসেন, ‘ তাহলে যা , মাছ – তরকারি কিনে নিয়ে আয় ‘
তূর্যের ধারণাই সত্যি হলো।আসলাম চৌধুরী পারভিন বেগমকে ডেকে বললেন,
” বড় ভাবি ? খানিক আগে কি কি বাজার লাগবে বলছিলে যেন ?আমাদের কারো তো সময় নেই।আগামী দিন তো তূর্যের হাসপাতালও নেই।তাহলে তূর্য? তুই যা বাবা, যা যা লাগবে আম্মা বলে দিবে নিয়ে আসিস ।কেমন ? ”
জীবনের প্রথম এরকম বাজে পরিস্থিতে পড়লো তূর্য। অসহায় দৃষ্টিতে একবার মায়ের মুখের দিকে চাইলো।যেন খুব করে চাইছে পারভিন বেগম দেবরের মুখের উপর কিছু বলে তাকে এইবারের মতো উদ্ধার করুক।কিন্তু পারভিন বেগম সেটা করলেন না।কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে হ’তাশ হয়ে চোখ নামালো সে।এখন বুঝছে মাঝে মাঝে আহিকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যে বেকায়দায় ফেললে বেচারির কতটা অস্বস্তিতে পড়ে। শুধু শুধু আর মুখটা শুকিয়ে অতটুকু হয়ে যায় না। আসলাম চৌধুরী ফের বললেন,

” কি পারবে তো? কি জিজ্ঞেস করছি দেখ!পারবি সেটা তো আগেই বললি। কাল সময় করে যাস তাহলে।”
” হ্যাঁ! ”
নেহাত এক সর্বনাশী মেয়ের জন্ম দিয়েছেন মেজকর্তা।নাহলে কে এসব মি’থ্যা বলতে যেত? কেই বা বাজারে যেতে রাজি হতো। এই আহি লাইফটা পুরো শেষ করে ছাড়লো। নিজে তো সবসময় একেক কাহিনী করে জ্বা’লাবে আর এখন বাপ জ্বা’লাচ্ছে।জামাই হওয়ার সাথে বাজার করার আবার কি রিলেশন?
এখন ঠিকঠাক চিনে বাজার – ঘাট করতে পারলে হয়।নাহলে দেখা গেল বলল, ‘ যেই ছেলে সামান্য মাছ – তরকারি চিনে না,তাকে আমার মেয়ে দিবো না ‘
দেওয়া লাগবে না।সে কেড়ে নিবে।

চৌধুরী গিন্নিদের হাতে সবসময় খুব বেশি টাকা পয়সা থাকে না।যখন যা দরকার হয় স্বামি দের বললেই পেয়ে যায়।স্বামীরাও আগ বাড়িয়ে দিতে যান না।সবাই হয়তো সব কিছু বোঝেন না। তবে যখন গিন্নিরা চান ,যা লাগতে পারে তার থেকে একটু বেশিই দেন।সেই সুবাদে সবার কাছে কম বেশি টাকা পয়সা থাকে তবে খুব বেশি নয় ।আজকে বাড়িতে তিন কর্তার কেউ নেই।এদিকে বাচ্চারা বায়না ধরেছে মার্কেট যাবে।যাবে মানে যাবেই।এত বলছে ওদের মার্কেটে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত টাকা তাদের কাছে নেই।কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।আর এইগুকে হিলিয়েছে কে? বাড়ির বড় বাচ্চা , আহি। পারভিন বেগম ওদের সাথে না পেরে অগত্যা তূর্যের রুমে গেলেন।ছেলের কাছে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তূর্য খাটের হেড বোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে পা মেলিয়ে বসে আছে।ঊরুর উপর ল্যাপটপ রাখা। সেটার দিকে খুব মনোযোগ তাকিয়ে আছে।বাম কানে একটা ইয়ারপড গোঁজা । অন্যটা বিছানার উপরে রাখা।হয়তো সিনেমা দেখছে।মাকে দেখে ল্যাপটপটা পাশে রাখলো।পারভিন বেগম ছেলের পাশে বসে বললেন,
” তোর বাবা – চাচারা কেউ বাড়িতে নেই। এদিকে আহি শপিংয়ে যাবে বলে বায়না ধরেছে।সাথে শান্ত – প্রান্ত – তাহি তো আছেই।আর আমার কাছে মাপা কয়টা টাকা আছে।ওই কয়টা টাকা দিয়ে যদি না হয়! ”
” এত এক্সপ্লেনেসন কেনো দিচ্ছ আম্মু? ড্রয়ারে কার্ড রাখা আছে।কি কিনবে ওরা?” ভিডিও পজ করে কথাটা বলল তূর্য।
” আহি তো সেই দুই মাস আগে থেকে বলছে কি হুডি না ফুডি কিনবে।বাজারে গেলে আরো কত কী কিনবে তার ঠিক নেই।আর ওরাও ওইসব শীতের কি কি কিনবে ”
বলে উঠতে গেলের পারভিন বেগম।তূর্য মাকে থামিয়ে বললো,

” তোমাদের মেয়েকে হুডি বাদে যা চায় কিনে দিবে ”
” সে যাবেই ওই কিনতে। নাহলে আর কি কিনে দিবো?”
“হুডি বাদে বাকিসব !”
” কেনো? ওই সোয়েটারে কি অপরাধ করলো ?”
” হুডি যাকে বলবে সে কিনে দিবে।আমি না দিলে নাকি কিছু আসবে – যাবে না। কিনুক!দুই মাসেও কিনে উঠতে পারেনি#”
” এসব কথা কখন বলল তোকে? গত দুইদিন তো তোর ঘরে আসতে দেখলাম না ”
” বলেছিল,দুই মাস আগেই। ”
” আচ্ছা যা ,দিবো না কিনে।আগে বাজারে তো যাই ”
” তোমাকে যেটা বলেছি সেটা করবে ”
” তুইও ওর মতো বাচ্চামি করবি?”
বলে কার্ডটা নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন পারভিন বেগম।তূর্য ফের পিছু ডাকলো ।আস্তে করে মিনমিনিয়ে বলল,

“একটু ডেকে দেও ওকে ”
” কেন? এই কথা তুলে আবার কিছু বলিস না। পরে মেয়েটা মন খারাপ করে ফেলবে ”
” বলবো না। আর শোনো,বলো না আমি ডেকে দিতে বলেছি। ”
এ আর নতুন কি! যদি এমন কখনো হয়েছে যে তূর্য বাড়ি ফিরেছে,আর আহি আসেনি ,পেয়েছে মাকে!মাকে দিয়ে ডাকাবে অথচ বলা যাবে না ছেলে তার ডাকছে।তিনি বললেন,
” ডাকবি,আবার বললে কি সমস্যা,আব্বা?”
” ভ’য় ভেঙে যাবে। পরে খুব দ্রুত শ্বাশুড়ি আম্মা হয়ে যাবে ”
” আমি তো হতে চাচ্ছি। তুই বানাবি কবে আমার বাপ?”
” আমার প্ল্যান মাফিক সবটা হলে মাস খানিকের মধ্যেই হচ্ছো।আর বাকিটা তোমার হাজব্যান্ড আর দেবরের উপর ”
” সেদিনও বললি দেরি আছে।এখন আবার বলছিস মাস খানিকের মধ্যে। ব্যাপার কি ,আব্বা?”
” কোনো ব্যাপার নেই।আই থিঙ্ক সবটা দ্রুত সেরে ফেলাই বেটার।থেকে থেকে তোমাদের মেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলে। ”

শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বলল তূর্য।
যদিও পারভিন বেগম শুনতে পেয়েছেন।ছেলের কথায় মুখ চেপে হাসলেন তিনি।তারপর চলে গেলেন।তূর্যের কথা মতো আহিকে পাঠালেন সাথে একটা কফির মগ ধরিয়ে দিলেন। তূর্য এতক্ষন দরজার দিকেই তাঁকিয়ে ছিল।বোধ হয় প্রেয়সীর আসার অপেক্ষা করছিল।পায়ের শব্দ পেয়ে সেদিক থেকে চোখ সরালো । ল্যাপটপে কপট মনোযোগ দিলো। আহি,সে তো শপিংয়ে যেতে পারবে ভেবে বেজায় খুশি।উৎফুল্ল চিত্তে রুমে এসে কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,

” আপনার কফি ”
” গত পরশু তোর সাথে ঠিক কী কী করেছি ? ” কফি নিতে নিতে গম্ভীর কন্ঠে বলল তূর্য।
” কিছু না তো ! “আহি আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল।
” কিছু না! তাহলে মুখ দেখা – দেখি বন্ধ করেছিস কেনো?”
সেদিন আহি ল’জ্জা ঠিকই পেয়েছিল।কিন্তু পরে ঠিকও হয়ে গিয়েছিল।এই দুইদিনে তো সে অন্য কাজে ব্যস্ত ছিল।এখন কি কাজে ব্যস্ত ছিল সেটা বললে তো আর রক্ষে থাকবে না। সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলল,
” আপনি মেহেদী ভাইয়াকে কি থ্রে’ট দিয়েছেন আগে সেটা বলুন ”
ভ্রু কুঁচকালো তূর্য।আহির দিকে ফিরে স’ন্দিহান গলায় বলল,
” ওয়েট,ওয়েট ,ওয়ান সেকেন্ড !একথা তুই কোথায় পেলি? কে বলেছে তোকে?”
এক বিপদ থেকে বাঁচতে আরো বড় বিপদ এনে খাঁড়া করলো। ভাগ্যিস শবনম আছে,ওর ঘাড়ে দিয়ে দেওয়া যাবে।
আহি আমতা আমতা করতে করতে বলল,

” শবনম… শবনম বলেছে ”
” ট্রাস্ট মি আহি এইবারে যদি আমি কিছু দেখি, তোর কি অবস্থা করবো ভাবতেও পারছিস না ”
খুব শান্ত কন্ঠে বললো তূর্য। কিন্তু তার এই শান্ত কণ্ঠের হুমকিতে ভয়ে আহির আ’ত্মা শুকিয়ে গেল।মুখ চুপসে এইটুকু হয়ে গেল।তূর্য স্বাভাবিক ভাবেই ফের বললো,
” শোন,শপিংয়ে শবনমকেও নিয়ে যাস।আর, আম্মুকে বেশি ঘুরাবি না।যা এখন ! ”
তূর্য রা’গ করেছে কিনা পরখ করে দেখতে আহি বলল,

” তূর্য ভাই ল্যাপটপে কি দেখেন?”
” মুভি ”
” আমিও দেখবো ”
” রো’মান্টিক !”
” তাতে কি?”
” পরে আবার অটিস্টিকের মতো বিহেভ করবি না তো ?”
” ধুর! করবো না ” বলে তূর্যের পাশ ঘেঁষে বসে পড়লো আহি।
তূর্য আহির দিকে একবার আড় চোখে তাকিয়ে বললো,
” কি’সিং সিন আছে ”
আহি এবার হাসফাস করে উঠতে নিলো। তূর্য বাঁকা হেসে আরেকটু চেপে বসলো।আহি মুড়িয়ে উঠে স্বাভাবিক গলায় বলল,

” থাক গে,দেখবো না। একটু কাজ আছে ”
তূর্যও আটকালো না।ওঠার জন্যে স্পেস দিলো।আহিও স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল।ও যেতেই তূর্য ফিচলে হাসলো।আসলে এমন কিছুই ছিল না।আহির ভাবগত গতি পরখ করতে মিথ্যা বলেছে ।
সে বাংলাদেশী একটা নাটক দেখছিল।আহি অস্বস্তি পড়লেও প্রকাশ করেনি।বিষয়টা ভালো! আরেক দফা হাসলো তূর্য।বিড়বিড় করে বলল,

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৯

” দেখতেই এত অস্বস্তি,আর…..” বাকিটা আর শেষ করলো না সে।লম্বা করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
” আল্লাহ মালুম ”
যত অস্বস্তি হবে হোক। হু কেয়ার’স? স্বাভাবিক হওয়ার বহুত সুযোগ দিচ্ছে সে। এর পরেও যদি না হতে পারে তার কি করার?
কিন্তু আহি কি তাকে সত্যিই বললো? শবনমের কাছ থেকে ওওই কথা জেনেছে? সত্যিই যদি এমনটা হয় তাহলে ও তো একবার জিজ্ঞেস করে থেমে যাওয়ার মেয়ে নয়।

প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪১