তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫০
রাফিয়া জান্নাত রিফা
দেখতে দেখতে তিনটি দিন পেরিয়ে গেছে। এই অল্প সময়েই বিথী যেন একেবারে বদলে গেছে। যে মেয়েটি একসময় প্রাণচঞ্চল ছিল, এখন সে চুপচাপ হয়ে গেছে। নিজের ভেতরেই গুটিয়ে নিয়েছে সমস্ত কথা, সমস্ত অনুভূতি।
ডায়েরি লেখা ছিল তার সবচেয়ে অপছন্দের কাজ অথচ ঘরবন্দি এই নিঃসঙ্গ সময়ে সেই ডায়েরিই হয়ে উঠেছে তার একমাত্র আশ্রয়। মনের জমে থাকা আতঙ্ক, অপরাধবোধ, আকুলতা সবকিছু সে শব্দের ভাঁজে ভাঁজে ঢেলে দিচ্ছে।
শরীরেও তার ক্লান্তির গভীর ছাপ পড়েছে। চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ, ঠোঁট শুষ্ক, মুখে ফ্যাকাশে বিবর্ণতা মনে হয় যেন কয়েক দিনের মধ্যেই বহু বছরের অবসাদ এসে ভর করেছে তার ওপর।
আজ আদালতে দির্শকের রায় ঘোষণা করা হবে। এই অনিশ্চয়তার চাপ তাকে ভেতর থেকে আরও ভেঙে দিচ্ছে। রাতে ঘুম তার চোখে আসে না। চোখ বুজলেই ভেসে ওঠে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য দির্শকের ফাঁসির আদেশ। সেই আতঙ্ক তাকে বারবার চমকে তোলে। বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে কখন যে রাত শেষ হয়ে যায়, টেরই পায় না।
ফজরের আজান কানে আসতেই সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। অজু করে নামাজে দাঁড়ায়। তারপর দীর্ঘ মোনাজাতে ভেঙে পড়ে কান্নায় আকুল প্রার্থনা, মিনতি আর অশ্রুজলে ভিজে যায় তার দু’চোখ। একটাই আর্তি দির্শকের জন্য যেন আল্লাহ রহমত ও মুক্তির পথ খুলে দেন।
গত তিনটি রাত ইতি আর নিধি বিথীর সঙ্গেই কাটিয়েছে। বিথী বারবার নিষেধ করেছিল সে একা থাকতে পারবে। কিন্তু তারা কোনো কথাই শোনেনি তারা ,জোর করেই থেকেছে।তবে অনেক জোর করার পর ও নিধি খাটে শোয়াতে পারে নি ইতি,নিধি, অনায়াসে এই ঠান্ডায় মেঝেতে শুয়ে ছিল, কারণ হলো,,,
“ আমার দুষ্শমন স্যার ও এই কনকনে ঠান্ডায় নিশ্চয়ই মেঝেতে শুয়ে আছে,তাই আমি মেঝেতে শুয়ে থাকবো,দির্শক স্যারের একার কেন ঠান্ডা লাগবে, ঠান্ডা একটু আমার ও লাগুক না হয়,সাদ,ভাগ আমার ও হোক।”
এমনকি সামান্য একটা বালিশ বা চাদর বিছিয়ে ও শোয় নি বিথী।ইতি,নিধি অনেক বোঝানোর পরেও বোঝেনি,পরে ইতি নিধি ও বিথীর সাথে মেঝেতে শুতে এলেই চিৎকার করে বলত বিথী,,,
“তোরা বিছানায় যা,এটা শুধু আমি এবং আমার দুষ্মন স্যারের জন্য প্রযোজ্য,যা বিছানায় যা।”
কিছুতে তারা বিথীর সাথে পেরে ওঠেনি পরে তারা ও কেটেকুটে রাত পার করেছে, ভোর হলেই আবার নিজেদের কাজে বেরিয়ে যেত ইতি,নিধি।
বিথীর ভেতরে জমে আছে প্রবল ক্ষোভ তার বাবা ও বড় বাবার প্রতি একরাশ অভিমান, একরাশ রাগ। সেই কারণেই ড্রয়িংরুমে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে সে। মুখোমুখি হওয়ার সাহস বা ইচ্ছা কোনোটাই আর অবশিষ্ট নেই। তবে আলিফা বেগম, সিদ্দিকী বেগম ও মিলি বেগম প্রায়ই তার ঘরে এসে খোঁজ নিয়ে যান নীরবে মাথায় হাত বুলিয়ে যান, কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার চলে যান।
আজ সকালেও ইতি নাস্তা দিয়ে গেছে তাকে। বিথী থালায় হাত দিয়েছিল বটে, কিন্তু খাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। এক টুকরো খাবার মুখে তুলতেই হঠাৎ চোখ ভরে উঠল পানিতে। মনে হলো,,,
“দুষ্মন স্যারকে এতো ভালো খাবার খেতে দিচ্ছে না… দির্শক স্যার হয়তো পোড়া রুটি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন জেলে।”
এই চিন্তা আর তাকে গ্রাস করল। থালাটা সরিয়ে রেখে শুধু ঢকঢক করে পানি খেল সে।ব্যাস এতেই বোধহয় ক্ষুধা তার শরীর থেকে উধাও হয়ে গেল,কেবল উদ্বেগই তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি নিয়ে বিথীর কত স্বপ্ন, কত গোপন পরিকল্পনা ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কে জানত, এই দিনেই তার পাশে থাকবে না তার দির্শক স্যার?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে দেখল কত তরুণ-তরুণী হাত ধরাধরি করে হাঁটছে, কারও হাতে লাল গোলাপ। দৃশ্যটা যেন তার বুকের ভেতরটা আরও ফাঁকা করে দিল। হঠাৎ তার মনে পড়ল দির্শকের সেই কথা ,,,,
“বুঝলে উজ্জ্বল নারী, আমার দেওয়া লাল গোলাপটা তোমার হাতে দেখার বড্ড ইচ্ছে আমার।আরো যখন তুমি সে ফুলের ঘ্রাণ নেবে, তখনই সেটা হবে আমার প্রাপ্তির খাতার ‘শ্রেষ্ঠ সুখ’।”
বিথীর ঠোঁটে একটুখানি হাসি ফুটল কিন্তু সেই হাসির সঙ্গেই গাল বেয়ে নেমে এলো অশ্রুধারা। অসহায় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল সে,,,
“সুখ যে স্থায়ী নয়…”
ছাদের ওপর কাপড় মেলছিল নিধি। রোদটা নরম, হালকা বাতাস বইছে কাপড় দুলছে। ইদানীং নিধি সংসারের কাজে বেশ পটু হয়ে উঠেছে। বাড়ির কার কী প্রয়োজন কেউ বলার আগেই সে বুঝে ফেলে, দৌড়ে গিয়ে করে দেয়। অথচ তাকে কখনো আলাদা করে দায়িত্ব দেওয়া হয় না, কেউ বিশেষভাবে অনুরোধও করে না। তবু সে নিজে থেকেই সব সামলে নেয়। এই বাড়তি আগ্রহটাই আর্দ্রের মাঝে মাঝে একটু বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তার মনে হয়, নিধি নিজের যত্ন নিতে ভুলে যাচ্ছে।
হঠাৎ নিধি দেখল, তার সামনে একগুচ্ছ লাল গোলাপ ধরা। প্রথম মুহূর্তে চমকে উঠল সে। বাতাসে গোলাপের মৃদু গন্ধ ভেসে আসছে। ধীরে ধীরে পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল আর্দ্র দাঁড়িয়ে আছে, মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কোনো ভূমিকা না দিয়েই আর্দ্র ঝট করে নিধির ললাটে একটি চুম্বন এঁকে দিল। তারপর গোলাপের তোড়াটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,,
“হ্যাপি ভ্যালেন্টাইন, চড়ুই।”
নিধি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর অপ্রস্তুত হাসি ফুটে উঠল তার ঠোঁটে। সত্যিই তো তার মনেই ছিল না যে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি।আর্দ্র আবার এগিয়ে এসে বলল,,,
“আই লাভ ইউ, লাভলি গার্ল। আই লাভ ইউ সো মাচ।”
নিধির চোখে এক অদ্ভুত দীপ্তি জ্বলে উঠল আশ্চর্য, লজ্জা আর ভালোবাসার মিশ্র আলো। ছাদের খোলা আকাশের নিচে, দুলতে থাকা কাপড়ের ফাঁকে দুজনের অবস্হান তখন,নিধি তখন লাজুক হেসে বলল,,,
“হুম, আমিও আপনাকে ভালোবাসি।”
নিধির কণ্ঠে ছিল লাজুক স্বীকারোক্তি।আর্দ্র মুচকি হেসে বলল,,,
“তাহলে একটা চুমু দাও।”
কথাটা বলতেই যেন দেরি হলো না, আর নিধিরও দেরি হলো না সাড়া দিতে। পা একটু উঁচু করে টুক করে আর্দ্রের গালে চুমু দিয়ে দুষ্টু হাসিতে বলল ,,,
“একটা কেন? আমি আমার স্বামীকে হাজারটা চুমু দেবো। এখন বলুন, আর কত চুমু লাগবে?”
আর্দ্র আলতো করে নিধির কোমর টেনে নিল নিজের কাছে। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল ,,,,
“রুমে চলো, বলি।”
নিধি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“উঁহু, ওই ধান্দা করলে তো হবে না।”
“কেন?”
“চুমু চুমু পর্যন্তই থাকুক।”
আর্দ্র হেসে বলল,
“সেজন্যই তো রুমে যেতে বলছি। এখানে দাঁড়িয়ে এসব করলে কেউ দেখে ফেলবে।”
নিধি লজ্জায় মাথা নুইয়ে হেসে ফেলল, তবুও দৃঢ় গলায় বলল ,,,
“ঘরে গেলে চুমু পর্যন্ত আপনি থাকবেন না। এখন ছাড়ুন, অনেক কাজ আছে আমার।”
আর্দ্র আর জোর করল না। তার চোখে একরাশ কোমলতা নেমে এলো, প্রতিদিন এই মেয়েটাকে নতুন করে ভালোবাসছে সে। আর্দ্র নিজের অতীতের কঠিন সত্য জানার পর সে একসময় ভেঙে পড়েছিল ভীষণভাবে। তখন নিধিই তাকে দু’হাতে আগলে রেখেছিল। আর্দ্রের চোখে পানি দেখলেই সে নিজে অস্থির হয়ে যেত, কাঁদতে কাঁদতে বলত,,,
“আপনি কাঁদলে আমিও সারাদিন-রাত কাঁদব কিন্তু,হু। একদমই থামব না।”
যেখানে আর্দ্র নিধির চোখের পানি সহ্যই করতে পারে না, সেখানে তাকে দিনরাত কাঁদতে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারাটাই অসম্ভব। সেই দিনই আর্দ্র বুঝেছিল নিধিই তার একমাত্র আশ্রয়, তার সত্যিকারের সুখ। তাকে নিয়ে অনায়াসে বাকি জীবন পার করে দেওয়া যায়।
তবে নিধির অবস্থাও যে খুব ভালো, তা নয়। স্বামীর কষ্ট, বোনের দুঃখ সবকিছু বুকের ভেতর চেপে রেখে সে নিজেও অনেক কাঁদে। শুধু সেই কান্না কাউকে দেখতে দেয় না।
শেষমেশ আর্দ্র আলতো করে নিধিকে ছেড়ে দিল।নিধি ছাড়া পেয়ে হাসতে হাসতে বালতি থেকে কাপড় নিয়ে শুকাতে দিতে আর্দ্র ও সাহায্য করতে লাগলো,আর বারবার দুজনেই চোখাচোখি হতে লাগলো।
ইতির মনটাও আজ বেশ ফুরফুরে লাগছে হাতে কফি নিয়ে আসছে আলবানের কাছে,আলবান ঘরে ল্যাপটপে কাজ করছে বেশ মনোযোগ দিয়ে,ইতি ঘরে এসে তা দেখেই বিরক্তিতে একটা ভ্রু উঁচিয়ে নিল, তারপর একহাত কোমড়ে রেখে কফির মগটা আলবানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,,,
“নেন।”
আলবান ইতির দিকে তাকিয়ে কপির মগটা নিল কিছু বলল না,এই জন্য ইতি রাগে ফোঁস করে উঠলো,তাই রাগ করে আলবানের হাত থেকে কফির মগটা এক ঝটকায় আবার নিয়ে টেবিল রেখে দিল,চোখ মুখ কুঁচকে ইতির দিকে তাকালো আলবান ও বলল,,,
“কি হলো এটা।”
অন্যদিকে তাকিয়ে ইতি বলল,,,
“জানি না।”
“কফি টা দে।”
“দিবো না।”
“হুয়াই?”
“মন চাচ্ছে না।”
“ঠিক আছে লাগবেও না।”
এই বলে আলবান আবার তার কাজে মন দিল,ইতির এবার আর রাগ হলো,তার স্বামী তো এমনই, তো এক রোখা মানুষ,তার কাছে ইতির অভিমান বা বাচ্চামোর মোটেও দাম নেই,তাই বলে আজকের একটা স্পেশাল দিনকে ভুলে যাবে এই রাগি লোকটা,এই জন্যই ইতি এই লোকটাকে ভালোবাসতে চায় নি,কেমনে যে কি হয়ে গেল ইতি তা নিজেও বুঝলো না,ইতি এবার কাঁদো কাঁদো মুখ করে কফির মগটা হাতে নিয়ে আবার আলবানের দিকে এগিয়ে দিল, আলবান সেটাকে দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,,,
“লাগবে না।”
এবার রাগে ইতি মুখটা ভেংচালো পরক্ষণে আবার মুখটা ঠিক করে,আলবানের পাশে বসে আলবানের বাহুতে তার বাহু দিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,,,
“আজ একটা স্পেশাল দিন,মনে নেই আপনার।”
আলবান ল্যাপটপে স্ক্রিনে চোখ রেখেই বলল,,,
“সব রাতই আমার কাছে স্পেশাল।”
ইতি বিরক্তিতে ফেচেল হেঁসে বলল,,,
“আমি স্পেশাল দিনের কথা বলেছি।”
“দিন রাত একই তবে রাতটা বেশি ম্যাটার করে আমার কাছে।”
কথাটা বলে ইতির দিকে আড়চোখে তাকাল আলবান,ইতি দাঁতে দাঁত চেপে আলবানের বাহুতে জোরে একটি থাপ্পড় মেরে বলল,,,
“ বাল ,জোর করে রাত স্পেশাল বানিয়ে আবার বড় বড় বড় কথা বলা হচ্ছে।”
আলবান হাসলো,,,
“এত জোরে মারলি কেন লাগলো তো।”
আরো রেগে ইতি বলে,,,
“আপনাকে মারতে পারলে খুশি হতাম, বিশ্বাস করুন।”
“ইডিয়ট নিজের স্বামীকে মারতে চাস যে তোকে আদর সোহাগ দেয়।”
ইতি মুখখানাকে আবার কাঁদো কাঁদো করে বলল,,,
“আজ তো ১৪ ই ফেব্রুয়ারি।”
“তো”
“তো আবার কি,আজ ভালোবাসা দিবস।”
“ভালোবাসার জন্য আবার দিন লাগে নাকি।”
এই বলে আলবান ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে ইতিকে তার কোলে বসিয়ে বলে ,,,
“চল, ভালোবাসা দিবসে তোকে ভালোবাসি।”
অভিমান সুরে ইতি বলল,,,
“লাগবে না আমার,যান, ছেড়ে দিন আমায়।”
আলবান ইতির অভিমান বুঝতে পেরে হাসলো, অতঃপর গলায় মুখ গুঁজে বলল,,
“রাগ করেছিস?”
কাঁদো কাঁদো স্বরে ইতি বলল,,,
“হু।”
“আজ ভালোবাসা দিবসে ভালোবাসার কথা বলি নি বলে।”
“হুঁ।”
“নির্দিষ্ট করে আজই কেন ভালোবাসার কথা বলবো তোকে।”
কিছু বলল না ইতি,আলবানের কোলেই নিজেকে গুটিয়ে রাখলো সে , আলবান ফের বলে,,,
“আমার কাল নাগিনীকে ভালোবাসার জন্য নির্দিষ্ট কোন দিনের প্রয়োজন নেই,রাত হলেই চলবে।”
মুহুর্তে ইতি ফোঁস করে উঠলো,আলবান তা বুঝতে পেরে আমতা আমতা করে বলল,,
“উঁহুম,দিনেও লাগে।”
“আলবান তোকে প্রতিদিন গভীর ভাবে ভালোবাসে, ভালোবাসা আমায় বলতে হবে কেন ?,আমার ভালোবাসা ঠের টের পাস তুই,তাইতো তুই ও ভালোবাসিস আমায়, ভালোবাসার জন্য একান্ত কোন দিনের প্রয়োজন নেই আমার,সব দিনই আমার কাছে ভালোবাসা দিবস,বুঝলি।”
অবুঝের মতো ইতি বলল,,,
“তাও একটা ফুল দিতেই পারেন।”
“ফুল প্রিয় তোর?”
“প্রিয় মানুষের থেকে পেলে অবশ্যই তা হাজার গুণ প্রিয় ফুল।”
ইতির কানের লতিতে হাল্কা চুমু দিয়ে বলে,,,
“ফুলের থেকে ও প্রিয় আমি তবে,বলছিস।”
গলার খাদ নামিয়ে ইতি বলে,,
“হুঁ।”
“তাহলে আজ ভালোবাসা দিবসে ‘ভালবাসি’ এ কথা তুই বল আমায়।”
ইতি হাসলো,,
“অবশ্যই বলব।”
“চোখে চোখ রেখে বলতে হবে,আবার চুমু ও দিতে হবে।”
ইতি হালকা হেসে আলবানের গলা জড়িয়ে বলল,,,
“এভাবে আমার মনে আপনার জন্য এমন ভালোবাসা না জন্মালেও পারত,এই ভালোবাসা আজকাল অহংকার হয়ে উঠেছে আমার, ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি আপনাকে।”
আলবান হেঁসে বলল,,,
“তোর এই ভালোবাসার কথা বলে কি হলো জানিস?”
“কি হলো?”
“খুব আদর আদর পেল,চল ভালোবাসি।”
“ভালোবাসার নামে এই একটাই কথা জানেন আপনি।”
“ওটাই ভালোবাসা বেইবি।”
“হয়েছে ‘ভালোবাসা দিবস পালন করা শেষ এখন ছাড়ুন।”
“উঁহু চুমু দেওয়ার কথা ছিলা।”
ইতির আর কোন কথা না বলল না,ইতির ও আলবানের এক বিশেষ অঙ্গের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ অকারেই, সেখানে চুমু দিতেও খুব ইচ্ছে করে তার, যদিও সাহসে কুলায় না,তবে আলবানের গলার এ্যাপেল এ্যাডেলস টা ইতির কাছে খুব আকর্ষণীয় লাগে, ইচ্ছা করে সেখানে টুক করে চুমু খেতে,আজ হয়তো সেই সময়টা হয়ে এলো,তাই বিনা বাক্য আলবানে আকর্ষণীয় এ্যাপেল এ্যাডেলস এ নিজের ওধর জোড়া ঠেকিয়ে দিল,বেশ কিছুক্ষণ সেখানেই ইতির ওধর জোড়া থাকল, এদিকে আলবানের অবস্থা বেসামাল হয়ে এলো,এমনিতেই এই নারীকে দেখলে অবস্থা বেগতিক হয়, তখন কি না কি করে বসে,আজ আবার এই নারী নিজেই রোমান্টিকতা দেখাচ্ছে,এতে পুরুষত্ব তো জাগবেই,মনে মনে আলবান বলল,,,
“কন্ট্রোল আলবান, কন্ট্রোল,ইটস নট টাইম।”
কিন্তু নিজেকে বুঝিয়েও কোন কাজ হলো না আলবান,তার অবাধ্য হাত জোরে চলে গেল ইতির জামার ভিতরে,ইতির সর্বাঙ্গে কেঁপে উঠতেই সড়তেই চাইলো,,,
“ছাড়ুন যেতে হবে আমায়।”
“আগুন না নিভিয়ে তো যেতে দিচ্ছি না কোথাও।”
ইতির নিজেকে ছাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে লাগল।হুট করে তাদের ঘরের দরজায় কড়া পড়লো,আলবান বিরক্তিতে বলে উঠলো,,,
“কে?”
“আমি আর্দ্র।”
ইতি তড়াৎ করে আলবানের কাছ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটু দুরে সরে জামা কাপড় ঠিক করে গলা উঁচিয়ে বলল,,,
“ভিতরে আসেন আর্দ্র ভাই।”
আর্দ্র ভিতরে এল আলবান তাকে বসতে বলল আর্দ্র বসল,আলবান ইতির দিকে তাকিয়ে ইশারা করে তাকে যেতে বলল,ইতি বিনা বাক্য চলে গেল।
ইতি চলে যেতেই আর্দ্র বলে,,,
“ যে পাঁচজনকে দির্শক খুন করেছে তাদের কল রেকর্ড,আইডি, পেইজ, ঠিকানা সব খোঁজ পেয়েছি।”
আলবান ল্যাপটপের শ্যাটার খুলে বলে,,,
“কে ওরা।”
“স্পামাগলার,নামকড়া গুন্ডা,বড় বিজনেস ম্যান,আর একটা কথা কি জানিস।”
“কি?”
“ওদের মধ্যে দুইজন ইতালির ও তিনজন বাংলাদেশী।”
আলবান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,,,
“প্রত্যেকেই দির্শক নিখুঁত ভাবে মেরেছে,যেমন হাতের আঙ্গুল, পায়ের আঙ্গুল,কান,রগ কেটে ফেলেছে।চোখ, কিডনি, এসব বের করে নিয়েছে।সিরিজ দিয়ে শরীর থেকে রক্ত ও বের করে নিয়ে। অনেক দিন যাবৎ ওই শরীর জঙ্গলেই পড়ে ছিল, পুলিশের জানার কথাই ছিল না।”
“তবে পুলিশ জানলো কি করে।”
“আমার মনে হয় দির্শক নিজেই চেয়েছিল এসব পুলিশ জানুক।”
আর্দ্র ভাবুক হয়ে বলে,,,
“পাচজনকেই এত নিখুঁত ভাবে মারার কারণ কি,পরের অতীত টুকু তোর বাবার থেকে জানতেই হবে,আই থিংক তবেই সব ক্লিয়ার হবে।”
আলবান আর্দ্রের দিকে তাকিয়ে বলে,,,
“আমার বাবা।”
ফেচেল হেসে আর্দ্র বলে,,,
“অবশ্যই”
আলবান হাসলো,,,
“আচ্ছা আর্দ্র, ছোট থেকে তোর সাথে কোন জিনিস নিয়ে এমনটা কি কখনো হয়েছি “যে এটা আমার মানে তোর নয়।”
“না”
“তাহলে এখন যে বললি ‘আমার বাবা’”
আর্দ্র মাথা নুইয়ে বলল,,,
“ওমন বাবাকে বাবা বলতে ঘৃনা হচ্ছে যে।”
“সে তো আমার ও হচ্ছে।”
আর্দ্র কিছু বলল না কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ থাকল, আলবান ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে,,,
“একটু পর আদালতে যেতে হবে?”
হুট করে আর্দ্রের কিছু একটা মনে পড়তেই সে বলল,,,
“আলবান তোর মনে আছে?”
“কি?”
“দির্শক একদিন আমাদের কথাৎ কথায় বলেছি “ওর একটা ভাই আছে,সবসময় ওর সাথে থাকে,যদিও তালুকদার বাড়িতে আসে নি সে।”
আলবানের মনে পড়তেই সে বলল,,,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ,নাম কি যেন বলেছিল,মনে পড়েছে?”
আর্দ্র হকচকিয়ে বলে,,,
“কি?”
“নিথেক্স।”
“হ্যাঁ, আমার মনে হয় এই নিথেক্সকে ধরলেই সব রহস্যের জট খুলবে।”
আলবাল সোফায় গা এলিয়ে বলল,,,
“হ্যাঁ তার আগে নাজিম তালুকদার ও নাঈম তালুকদারকে এই এতো এতো সব প্রশ্নের উওর দিতে হবে।”
সকাল ১০ টা , বিথী তখন আদালতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বিছানায় বসে আছে, দির্শকের পছন্দের নীল রঙের জামা পড়েছে মেয়েটা,ইতি তখন বিথী ঘরে ভাত নিয়ে এলো, ভাতের প্লেটে বিথী চোখ গেল,দেখলো গুরুর মাংস,মুরগির লেগ পিস,মাছ,ডাল ডিম,সালাদ,ইতি তাকে খাইয়ে দিতেই ,বিথী ডিরেক্ট রাগ দেখিয়ে বলে,,,
“এতো ভালো ভালো তরকারি দিয়ে ভাত এনেছিস কেন?”
“তুই খাবি তাই।”
“আমার দুষ্মন স্যার তো এতো ভালো তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছেন না,তাহলে আমি কেন খাব।”
সামান্য রাগ হয়ে ইতি বলে,,,
“এমন বাড়াবাড়ি বাদ দে বিথী,তিন দিন থেকে কিছু খাচ্ছিস না ভালো মতো,আজ একটু খা,মা তোর সামনে আসতেই পারছে না,আসলেই তোর এই বেহাল দশা দেখে কাঁদতে থাকে।”
টলমলে চোখে অন্য দিকে তাকিয়ে বিথী বলে,,,
“কাদুক?কাদুক?আমার কি?”
“এভাবে বলিস না বিথী,খেয়ে নি বোন আমার।”
বিথী ইতির দিকে তাকিয়ে বলে,,,
“হ্যাঁ খাব তো।”
এই বলেই হনহনিয়ে চলতে লাগলো বিথী,ইতি ভাতের প্লেট নিয়েই বিথী, বিথী বলে সেও যেতে লাগলো তার পিছু, বিথী ডিরেক্ট রান্না ঘরে আসল, রান্নাঘরে তখন আলিফা বেগম, সিদ্দিকী, বেগম ও মিলি বেগম তারা এ সময় বিথীকে রান্না ঘরে দেখে খুব অবাক হলো , বিথী তাদের সাথে কোন কথা না বলে,রাইচ কুকারের পোড়া ভাত গুলো তুলে প্লেটে নিয়ে সেখানে পাতলা ডাল নিয়ে গবগবি আওয়াজ তুলে খেতে লাগল, মুহূর্তেই সিদ্দিকী বেগম মুখে কাপড় চেপে কাঁদতে লাগলেন,তখন আলিফা বেগম বিথীর দিকে এগিয়ে এসে তাকে বলল,,,
“মা তুই এসব কি করছিস,তুই এসব কেন খাচ্ছিস।”
খেতে খেতেই বিথী বলে,,,
“দুষ্মন স্যার ও এসব খাচ্ছে বড় মা তাই আমাকেও খেতে হবে।”
আলিফা বেগম কাঁদতে কাঁদতেই বললেন,,,
“তোর দুষ্মন স্যার ও আজ ভালো খাবার খাবে মা।”
বিথীর খাওয়া থামল,আলিফা বেগমের দিকে ঘুরে বলল,,,
“মানে।”
আলিফা বেগম তখন হাতে থাকা বড় সাইজের থাক থাক বাটি দেখিয়ে বললেন,,,
“এই যে এখানে দির্শক বাবার জন্য রান্না করা অনেক খাবার নিয়েছি।”
বিথীর মুখে তখন বিশ্ব জয়ের হাসি ফুটে উঠল,আলিফা বেগমের দুই বাহু ধরে বলল,,,
“সত্যি ইইই এগুলো দুষ্মন স্যারের জন্য।”
আলিফা বেগম মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সম্মতি জানালো কেঁদে কেঁদেই, বিথী তড়িৎ বেগে আলিফা বেগম গালে মুখে কয়েক দফা চুমু খেয়ে জড়িয়ে ধরে বলল,,
“আই লাভ ইউ বড় মা,এটা আমার করা উচিত ছিল কিন্তু তা তুমি করলে, ধন্যবাদ।”
আলিফা বেগমকে ছেড়ে এবার তার মা সিদ্দিকী বেগমকে জড়িয়ে ধরল খুশিতে,,,
“আমার খুশি লাগছে মা।”
এরপর খাবার বাটি গুলো হাতে নিয়ে বলল,,,
“এগুলো তো ব্যাগে ঢুকাতে হবে ব্যাগ কোথায়?”
সবাই শুধু বিথীকে দেখলো কেউ কিছু বলল না তাই বিথী বলল,,,
“আচ্ছা আমিই খুজে নিচ্ছি।”
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৪৯
বিথী ব্যাগ খুজে খাবারের বাটি ঢুকিয়ে নিল,এবার সিদ্দিকী বেগম হাসি খুশি বিথী কে দেখে করুন সুরে বললেন,,,
“এবার তোকে একটু খাইয়ে দেই,আয় মা,সোনা আমার,একটু খা।”
বিথী হাসি দিয়ে বলে,,,
“না মা,আমি ওখানে দির্শক স্যারের খাওয়া দেখে তবেই খাবো, তুমি চিন্তা কর না।”
