তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৭
রাফিয়া জান্নাত রিফা
নিধি আর্দ্রের দুশ্চিন্তার কারণটা বুঝতে পেরে ধীরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু আর্দ্রের হঠাৎ করে এমন রাগ দেখানোটা তার মনে এখনো ভয় আর অস্বস্তির ছাপ রেখে গেছে। শরীরটা কাঁপছে, মনটা অস্থির এই প্রথম সে আর্দ্রকে এতটা রাগান্বিত দেখল। এর আগে কখনো এমন চোখ-মুখ, এমন আগুনঝরা অভিব্যক্তি দেখেনি সে।
আজকের আর্দ্র যেন অন্য কেউ রাগটা স্বাভাবিক লাগেনি একটুও। নিধির শরীর গরম হয়ে উঠতে লাগল, চোখ দুটো সরু হয়ে এল। আর্দ্র যখন তার এই অস্বাভাবিক অবস্থা লক্ষ্য করল, তখনই হকচকিয়ে উঠে কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,,
“এই নিধি! এমন করছো কেন? নিধি… এই চুড়ুই!”
পরক্ষণেই নিধি ঢলে পড়ল আর্দ্রের বুকে।
আর্দ্র দ্রুত তার পিঠে হাত রাখতেই টের পেল নিধির শরীর জ্বরে পুড়ছে। বুকটা হুহু করে উঠল তার। নিধি নিস্তেজ হয়ে ওর গায়ে হেলে রইল। আর্দ্র তাড়াতাড়ি তাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল।
চোখে পানি চলে এল আর্দ্রের। নিজের ওপরই রাগ আর অপরাধবোধ চেপে বসল। নিধির হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে কাঁপা গলায় বলল,,
“আর কখনো এমন হবে না, নিধি… আমি খুবই দুঃখিত। ও চুড়ুই, তোমার তো জ্বর এসেছে… অনেক জ্বর।”
সে কম্বলটা নিধির গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর বেডসাইড টেবিল থেকে থার্মোমিটার এনে তার তাপমাত্রা মাপল ১০০°।
সংখ্যাটা দেখেই আর্দ্রের চোখে আবার জল চলে এল। নিধির কপালে আলতো করে একটা চুমু এঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,,
“আমি বুঝতে পারিনি, নিধি… দেখো না, কত জ্বর তোমার! এখন কী করি… ও হ্যাঁ, পানি পট্টি দিতে হবে। তুমি অপেক্ষা করো, আমি আসছি।”
সে তাড়াতাড়ি একটা বাটিতে পানি এনে কাপড় ভিজিয়ে নিধির কপালে রাখতে লাগল।
এই সময়টা আর্দ্র নিজের শরীরের অবস্থাও টের পাচ্ছিল সেও কাঁপছে, বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তিতে মোচড় দিচ্ছে। ঘামে তার শার্ট ভিজে গেছে, শ্বাসটা ভারী হয়ে আসছে। তবুও সব ভুলে সে শুধু নিধির দিকে মন দিল।
হঠাৎ নিধি ঠান্ডায় কেঁপে উঠল।আর্দ্র সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিধির চুলগুলো একপাশে সরিয়ে কানে মুখ নিয়ে নরম গলায় বলল,,
“আমি আছি তো, চুড়ুই… তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”
নিধি যেন সেই কণ্ঠে আশ্রয় পেল। নিজেকে আরও গুটিয়ে আর্দ্রের বুকে মুখ লুকিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।
আর্দ্র ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল একটা অদ্ভুত শান্তি আর অপরাধবোধ মিশে থাকা ভালোবাসা নিয়ে।
নিধির মা হওয়ার খবরে তালুকদার বাড়িতে যেন খুশির জোয়ার বয়ে গেল। চারদিকে হাসি, আনন্দ অনেক দিন পর সবাই এতটা প্রাণ খুলে হাসছে। ঘরের বাতাসটাও যেন আজ উৎসবের মতো লাগছে।
নিধির মা হওয়ার খবরটি কানে যেতেই নাঈম তালুকদার দেরি করেননি। মুহূর্তেই তিনি শত শত মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে হাজির হন। শুধু বাড়ির মধ্যেই নয়, পুরো মহল্লাজুড়ে মিষ্টি বিতরণ শুরু হয়ে যায়। চারপাশে যেন উৎসবের আমেজ সবাই এই সুখবরটাকে নিজেদের আনন্দ হিসেবেই উদযাপন করছে।
এই খুশির দিনে ঘরজুড়ে রকমারি রান্নার আয়োজনও শুরু হয়েছে। রান্নাঘর ভরে উঠেছে সুগন্ধে, আর সবার মুখে লেগে আছে প্রশান্তির হাসি।
এদিকে, খবরটা শুনেই বিথী আর দেরি করেনি। ছুটে গেছে জেলখানায় দির্শক আর নাজিম তালুকদারকে এই আনন্দের সংবাদটা জানাতে। তার সঙ্গে গেছে নিঝুম আর সুন্দরও।
ঘরের সব কাজ শেষ করে ইতি এসে দাঁড়াল বারান্দায়। নিধির মা হওয়ার খবরটা শোনার পর থেকেই তার মনে আজ খুশির জোয়ার বইছে। এই মুহূর্তেও তার চোখে-মুখে হাসির ঝিলিক মায়াবী মুখখানা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ঠিক সেই সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে দু’টো হাত এসে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। গলার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে সেখানে একের পর এক আলতো চুমু এঁকে দিল।
এমন স্পর্শে ইতি মোটেও চমকালো না। বরং খুব ভালো করেই জানে এই মিষ্টি, একটু যন্ত্রণাদায়ক অথচ আপন স্পর্শটা কার। এই তো তার চেনা পুরুষ, একান্ত নিজের মানুষ।
ইতি লজ্জায় রাঙা মুখে হালকা হাসল।
আলবান গমগমে কণ্ঠে বলল,,,
“কি ভাবছিস?”
খুব ধীরে উত্তর দিল ইতি,,
“কই না তো।”
আলবান ছোট করে একটা শ্বাস ফেলে বলল,,
“এটা কি হলো বল তো।”
চোখ কুঁচকে ইতি বলল,,
“কি হলো?”
“আমার আগে আর্দ্র বাবা হচ্ছে,এটা কেমন না বল।”
“কেমন আবার এটা তো ভালোই।”
“ভালোই তবে আমাদের বেবি আগে এলে আরো বেশি ভালো হতো।”
ইতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,,
“একটা কথা বলি।”
“একটা বলবি কেন,শত শত,হাজার, হাজার, কোটি কোটি কথা বল আমি শুনতে বাধ্য।”
ইতি হালকা হাসল,,
“আচ্ছা আমি যদি কখনো মা না হই তখন কি করবেন।”
আলবান মৃদু হেসে আরও শক্ত করে ইতিকে জড়িয়ে ধরল। তার কণ্ঠে ছিল দুষ্টুমি মেশানো স্নেহ,,
“কি আর করবো একটা দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলবো।”
ব্যাস, ইতি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল। ফোঁস ফোঁস করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে আলবানের পেটে কনুই দিয়ে এক গুতা মারল। আলবান হালকা ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও হাসি থামাল না।
ইতি কড়া গলায় বলতে লাগল,,
“কেটে টুকরো টুকরো করে নদীতে ভাসিয়ে দিবো।”
আলবান এবার শব্দ করে হেসে উঠল। তারপর একটু থেমে, কণ্ঠটা নরম করে বলল,,
“আমাদের বেবি না হলেও দুজনে মিলে দিব্বি এক জীবন পার করে দিতে পারবো,বুঝলি, কিন্তু একটা কথা কি জানিস মৃত্যু চিরন্তর সত্য,সে অনুযায়ী আমারই আগে মৃত্যু হবে,আমি মরলে একা হয়ে যাবি তুই তখন কে তোকে দেখবে,আমি মরলেও তোর টাকা পয়সার অভাব হবে না, কিন্তু একা একা বাঁচাতে হবে,এই একা একা বাচাটাই হবে কষ্টদায়ক,তাই তো আল্লাহ সন্তান দেন,বুঝলি আমি কি বললাম।”
ইতির বুকটা কেমন হালকা কেঁপে উঠল। সে একবার আলবানের দিকে তাকিয়ে, একটা ঢোক গিলে টেনেটুনে হাসার চেষ্টা করল,,
“মৃত্যুর কথা মুখে আনবেন না প্লিজ আমার খুব ভয় করে।”
আলবান ইতিকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বুকে শক্ত করে চেপে ধরল। কণ্ঠটা গভীর হয়ে উঠল,,
“এটা চিরন্তন সত্য জান, মানতেই হবে।”
ইতিও আলবানকে জড়িয়ে ধরে মৃদু কাঁপা গলায় বলল,,
“তবে আমিও মরে যাবো।”
আলবান সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল,,
“উহু, আমি মরে গেলে, আমার হয়ে বেঁচে থাকবি তুই।”
ইতি একটু অভিমানী সুরে বলল,,
“এতো শক্ত মনে আমি না, দাবানল ভাই।”
“দাবানল ভাই” নামটা শুনেই আলবানের ভ্রু কুঁচকে গেল। একটু রাগ মেশানো গলায় বলল,,
“আর একদিন এই দাবানল ভাই বললে থাপ্পড় মেরে গাল লাল করে দিবো বলে দিলাম। ইডিয়ট! কতবার বলি এই নামে ডাকবি না।”
চোখে পানি জমলেও ইতি হেসে ফেলল,,
“আচ্ছা আর বলবো না, সরি।”
আলবান হেসে ইতির মুখটা নিজের দু’হাতের তালুতে নিয়ে এল। চোখে চোখ রেখে নরম স্বরে বলল,,
“জান, তোকে ডিপ কিস করতে ইচ্ছে করছে, করি?”
এই কথা শুনেই ইতি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তার গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল।
আলবান আবার বলল,,
“আমি ও না, তোর অনুমতি দিলেই বা কি, না দিলেই বা কি আমি যা করবো তাই।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে ইতিকে আরও কাছে টেনে নিল। দু’জনের মাঝের দূরত্বটা মিলিয়ে গেল এক মুহূর্তেই। ইতির নিঃশ্বাস যেন আটকে এল, সময়টা ধীরে ধীরে থেমে গেল তাদের চারপাশে।
তাদের সেই নীরব, গভীর মুহূর্তটা দীর্ঘ হতে থাকল যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু অনুভূতির স্পর্শ আছে।
টিকিট কেটে নিঝুম, সুন্দর আর বিথী ঢুকল জেলখানার ভেতরে। ভারী দরজা, লোহার গন্ধ, আর অদ্ভুত এক চাপা নীরবতা সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন বুকের ভেতরটাকেও ভারী করে তুলছিল।
দির্শককে দেখা মাত্রই বিথীর মুখে এক ঝলক হাসি খেলে গেল। কিন্তু সেই হাসিটা বেশিক্ষণ টিকল না। চোখের সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে সে কি সত্যিই সেই দির্শক?
চেহারাটা শুকিয়ে গেছে, ফর্সা মুখশ্রী কেমন যেন লালচে হয়ে উঠেছে। চোখ দুটো গভীর, তলিয়ে যাওয়া। ঠোঁট ফ্যাকাশে, চোখ লালচে ক্লান্তিতে ভরা। মুখটা কেমন ছোট হয়ে গেছে, আর হাঁটছে দুলে দুলে যেন শরীরটা আর তাকে সাপোর্ট দিতে পারছে না।
এই দৃশ্যটা সহ্য করতে পারল না বিথী।
তার বুকটা কেঁপে উঠল। চোখে পানি এসে ঝাপসা হয়ে গেল সবকিছু। দির্শক যে ভালো নেই এই উপলব্ধিটা তার ভেতরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগল।
তবুও দির্শক… সে হাসছে।
একটা মিথ্যে, ক্লান্ত হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে বিথীর দিকে।
লোহার ছোট ছোট ছিদ্র করা শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠিক সেই শিকেই কাঁপা কাঁপা হাত রেখে দাঁড়াল বিথী। দু’জনের মাঝে শুধু এই ঠান্ডা লোহা আর অসীম দূরত্ব।
চোখে চোখ রেখে বিথী ভাঙা গলায় বলল,,
“ইশশশ,যদি ছুতে পারতাম।”
দির্শক হালকা হাসল। কণ্ঠটা ভারী, ক্লান্ত,,
“না ছুঁয়েই বেশ আছো,আমাকে ছুলে তো অপবিত্র হবে,জানোই তো পাপি আমি।”
বিথীর চোখে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ল,,
“হ্যাঁ এই পাপের ভাগিদার তো আমি ও।”
দির্শক আবার হাসল, সেই একই ক্লান্ত হাসি,,
“কেমন আছো তুমি?”
প্রশ্নটা শুনে বিথীর ভেতরটা যেন আরও ভেঙে পড়ল। দলা পাকিয়ে কান্না উঠে এল গলায়,,
“এই প্রশ্ন আমার আপনাকে করা উচিত… কেমন আছেন আপনি।”
দির্শক একটু দম নিয়ে বলল,,
“আলহামদুলিল্লাহ ভালোই, শুধু জ্বরটা কাবু করেছে এই যা।”
বিথীর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল,,
“জ্বর কত?”
“বেশি না ১০৪ ডিগ্রী।”
এই কথাটা শুনে যেন পৃথিবীটাই থেমে গেল এক মুহূর্তের জন্য।বিথীর চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল,এত জ্বর আর এই লোক কিনা বেশি না বলছে,,,
“এটাকে কম বলছেন।”
দির্শক চুপ করে তাকিয়ে রইল। বিথীর কান্না সে কোনোদিনই সহ্য করতে পারে না। যে মেয়েটাকে শক্ত, অটল দেখে অভ্যস্ত সে… সেই মেয়েটাই আজ তার সামনে ভেঙে পড়ছে এই দৃশ্যটা তাকে ভেতর থেকে কষ্ট দিচ্ছে।তবুও কোথাও যেন বুকের এক কোণে অদ্ভুত এক শান্তি তার জন্য এখনো কেউ কাঁদে।দির্শক ধীরে, একটু কঠিন স্বরে বলল,,
“বিথী তোমাকে কান্না মানায় না এটা কতবার…”
বিথীর চোখের নোনাজল কিছুতেই থামল না। গাল বেয়ে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে। কাঁপা কাঁপা গলায়, বুকের ভেতর জমে থাকা সব ব্যথা একসাথে বেরিয়ে এলো,,
“আর কতদিন এখানে থাকবেন এভাবে,চলুন না পালিয়ে যাই,এ দেশ ছেড়েই চলে যাবো,চলুন না নতুন করে সংসার শুরু করি,এভাবে আপনাকে ছাড়া আমি থাকতে পারছি না মরে যাচ্ছি।”
দির্শক এক গাল হেসে উঠল। সেই হাসিতে ক্লান্তি আছে, অভিমান আছে, আর কোথাও যেন একরাশ অসহায়তা,,
“সবে সাত মাসেই হাঁপিয়ে গেলে,এখনো কত কত দিন পড়ে আছে,তুমি বরং নতুন করে জীবন শুরু করো বিথী।”
কথাটা যেন বিথীর বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধল।
সে হঠাৎ করেই রেগে উঠল। চোখ ভরা পানি, তবুও কণ্ঠে আগুন,,
“ওমন অবস্থা রেখেছেন নাকি আমাকে,আবার নতুন জীবনের কথা বলছেন, আপনি আসলেই একটা বেইমান,শালার আমার সাথেই এই বেঈমানি করা লাগলো, কষ্টে ধুকে মরছি তার জন্যই,বাল আবার সেই বলছে নতুন জীবন শুরু করতে, আল্লাহ ,বলি নতুন জীবন শুরু করার জীবনটাই তো রাখেন নাই আপনি, আপনার পাল্লায় পড়ে শেষ আমি,পুরটাই শেষ,বুঝতে পারছেন,আমি আপনাতে কতটা মত্ত,কতটা বিভোর, আফিমের থেকেও বড় নেশা আপনি আমার।”
তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৫৬
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা ভেঙে গেল। চোখের পানি থামার নামই নিচ্ছে না।লোহার শিকের ওপাশে দাঁড়িয়ে দির্শক চুপ করে তাকিয়ে রইল।
এই কান্না, এই ভালোবাসা, এই অসহায়তা সবকিছু যেন তার বুকটাকে আরও ভারী করে তুলছে। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারছে না, কাছে টানতে পারছে না এই অসহায় দূরত্বটাই যেন সবচেয়ে বড় শাস্তি।
