Home তিন তরঙ্গের আলোকছটা তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৮

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৮
রাফিয়া জান্নাত রিফা

আলবানের একটু কাজ থাকায় এই রাত ১০ টায় তাকে বাইক নিয়ে বেরাতে হলো। বেলকনি থেকে ইতি আলবানের চলে যাওয়া দেখে অস্থির হয়ে বিথী কে বললো,,,,
__পাঠা টা বাইরে গেল, থাক তোরা,আমি গেলাম এই বাক্সটির রহস্য উদঘাটন করতে।
__ ওকে যা।
ধীরে ধীরে ঢুকলো আলবানের রুমে। দরজাটা খুলাই ছিল। দরজা খোলা দেখে ইতি হাসলো এবং বললো,,,,
__পাঠাটার মাথাটায় নিশ্চিত জং ধরছে রিপেইরিং করা জরুরি।যে ঘরে নিজের মাকেও আসতে দেয় না, কোথাও গেলে দরজা লক করে যায় আজ আবার দরজা খুলে চলে গেছে।এই ঘরে রহস্যটা কি?? এটা আমাকেই ভেদ করতে হবে।
আগের দিন যে জায়গায় বাক্সটাকে দেখেছিল পুনরায় সেখানে গিয়ে দেখলো কিন্তু বাক্সটাকে পেল না ইতি। পরক্ষণে বেডের বালিশ গুলো এলোমেলো করে দেখলো সেখানে ও নেই।বেড সাইডে থাকা ড্রয়ার খুলে দেখলো সেখানেও নেই।পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিলো তখনি চোখ গেলো আলমারির দিকে।

__এই তো সেই গুপ্তধন।এ লোক এমন কেন??যে নিজের মাকেও এই আলমারিতে জীবনেও হাত দিতে দেয় নি, নিশ্চিত এখানে বাক্সটি আছে।বড় মা একটা আস্ত জল হস্তিকে জন্ম দিয়ে পৃথিবী দূষণ করেছে।আমি তো এর রহস্যভেদ করবোই করবো।
এই বলে হনহনিয়ে যায় আলমারির দিকে, আলমারির কাছে যেতে ড্রেসিংয়ের কর্নারে থাকা একটা প্যাকেটের দিকে চোখ যায়, এগিয়ে যায় সেদিকে। ড্রেসিংয়ের এক কোনে পড়ে আছে কিছু সিগারেটের প্যাকেট ও ধুমপান করা কিছু সিগারেটের শেষ অংশ। সেগুলো দেখে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললো ইতি। সিগারেট গুলোকে এপাশ ওপাশ ভালো করে দেখতে লাগলো।

তখনি ধুপ করে ঘরে প্রবেশ করলো আলবান, দরজার সিঁটকিটা লাগিয়ে দিয়ে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাত বুকে গুজে ইতিকে দেখতে লাগলো।ইতি কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হলো বটে, কারণ মোটেও এ সময় ইতিকে তার রুমে আশা করে নি সে ।
ইতি মুহূর্তেই হকচকিয়ে উঠলো,আসতে ধীরে পিছনে ঘুরলো।আলবানের ঘামন্ত মুখ চোখে পড়লো,পড়নের সাদা শার্টটি অর্ধেক ঘামে ভিজে গেছে,বাম হাতের বাহুতে হালকা ছিপছিপে রক্ত দেখা যাচ্ছে ক্ষতটার লাল মাংস স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে,মুখ লাল হয়ে গেছে হয়তো ব্যথার কারণে,ক্ষতটি দেখে মনে হলো কেউ হয়তো ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে দিয়েছে।

চোখ রক্ত বর্ন ধারন করেছে,সেই রক্ত গরম চুক্ষ দিয়ে তীরের মতো তাকিয়ে আছে ইতির দিকে।ইতি আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না সেই তীরের মতো ফলাফলা করে দেওয়া চক্ষুতে,চোখ নামিয়ে দৃষ্টি নত করলো।
ইতি মুখে যতই বলুক না কেন যে দাবানল ভাইকে সে ভয় পায় না, কিন্তু এখনও সেই আগের মতোই তীব্রভাবে ভয় পায় সামনে থাকা লোকটিকে। পরিস্থিতির কবলে পড়ে সে ভয় এখন সাহসের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়।
আলবান পিট সরালো দরজা থেকে। হঠাৎ চোখ শীতল করে নিলো,ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসির রেখা টেনে এগিয়ে আসতে লাগলো ইতির দিকে।ইতি কি করবে বুঝতে পারছে না বারবার ঢোঁকের পর ঢোক গিলেই যাচ্ছে,ইতি বরফের ন্যায় জমে গেছে, দৌড় দিতেও পারছে না পা গুলো কেমন যেন অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে,বুকে দ্রিমদ্রিম শব্দটা বিস্ফোরণ হচ্ছে খুব দ্রুত বেগে।
দুই হাত পকেটে রেখে ইতির দিকে মাথাটা ঝুঁকে নিল। ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,,,

__ আমাকে ইফ্টিজিং করতে এসে, নিজেই ইফ্টিজিং হচ্ছিস দেখছি??
ইতি মাথা তুলে তাকালো আলবানের দিকে সব ভয়কে একদিকে রাখলো,ইতি এভাবে কারো ভয়ে দমে যেতে পারে না,আলবানের আঘাতটা ভালো করে দেখে নিল। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বেড সাইডের ড্রয়ার থেকে ফাস্ট এইড বক্সটা আনলো তুলো হাতে নিয়ে আলবানকে বললো,,
__ এখন মানব সেবা করবো তাই শার্ট টা খুলুন।
শীতল চোখে ইতির কাজকর্ম গুলো দেখলো।বিনা বাক্যে শার্টটি খুললো,ভেস্ট গেঞ্জি পড়া ছিল।পেশি গুলো উন্মুক্ত হলো।ইতি চোখ গেল তাতে বেশ নজরকাড়ার মতো পেশি গুলো, নিজেকে সংযত রেখে টেনেহিঁচড়ে দৃষ্টিটাকে আঘাত প্রাপ্ত স্থানে নিয়ে গেল।তুলো দিয়ে প্রথমে রক্ত গুলো পরিষ্কার করলো, তুলোতে ডেটোল মিক্স করে লাগালো সেই ক্ষত স্থানের ডেটোল লাগাতেই মনে হলো তার গা ঝিমঝিম করে জ্বলে উঠলো।
ইতি দেখলো আলবানের মুখের পটভূমি কিন্তু তেমন কিছুই সেই মুখে দেখতে পেল না,তার মুখে কোন জ্বালা পোড়ার পীড়া ও ছিল না।এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে ইতির দিকে,মনে মনে ইতি বলল,,

__ দামরাটার আসলেই গন্ডারের চামড়া। একটু কি জ্বালা করছে না নাকি।আজব?
ছোট একটা শ্বাস ফেলে ইতি বলে,,
__ ঘা য়ে লাগছে না, জ্বালা করছে না।
__ বাহ্যিক আঘাত আমাকে ব্যথিত করতে পারে না বা জ্বলে ও না।
__ তবে কোথায় জ্বলে বলুন?লাগিয়ে দিচ্ছি।
__ অন্তরে।
__ সেটা আবার কোথায়।
__ খুঁজে নি?
__ জামা কাপড় খুলুন তবে??
বাঁকা হাসি দিয়ে আলবান বলে,,

__ বললাম তো বাহ্যিক না। অভ্যন্তরীণ?
__ ওহহ তাহলে ভিতরে জ্বলে।
__ হ্যাঁ।
__ তবে একটু কষ্ট করে আপনার পিছনের টেবিলে থাকা ছুরিটা দিন। কেটে কুটে দেখি কোথায় জ্বলে, চিন্তা করবেন না ব্যান্ডেজ করে দিব,আশা করি আর জ্বলবে না।
__ একদম পারফেক্ট মৃত্যু আর জ্বলবেও না?
__ ওই জন্য তো বললাম।
__ মারবি আমায়।
মনোযোগ দিয়ে আঘাত প্রাপ্ত স্থানে ব্যান্ডেজ করতে করতে বললো।
__ মরতে চাইলে তবেই।
__ মার তবে?
__ লাভ কি??
__ লস ও তো নেই?

ব্যান্ডেজ করা শেষ হলে।মুখে তাচ্ছিল্যের হাসির রেখা টেনে আলবানের চোখে চোখ রেখে বললো,,,,
__আগের স্বভাবটা যায়নি তবে।
__কেমন স্বভাব??
__ মারপিটের??
আলবান এলোমেলো চুল গুলোকে স্লাইস করতে করতে বলে,,,,
__ যাওয়ার কোন কথা হয়েছিল কি?যে যাবে।এই স্বভাবটা আমার সাথেই ভালো যায়।
__ কথায় আছে না কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না, তেমনটাই।
মুহূর্তেই আলবানের কি থেকে কি হলো তা স্পষ্ট নয় কিন্তু কুকুর বলায় নিজের মধ্য এক পৈশাচিকতা চলে এলো,রাগ গুলো ধেয়ে আসতে লাগলো নিজের ভিতরে, নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে ,এক হাত দিয়ে ইতির মুখ টিপে ধরে টেবিলের সাথে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে আলবান বললো,,,

__ হে কুকুর আমি না, সিংহ আমি সিংহ।শিকার করার মতো ক্ষমতা রাখি আমি।
তোর মুখে খুব কথা ফুটেছে তাইনা,তেজ দেখাস, এই মুখ দিয়ে, কি মনে করিস নিজেকে।যা ইচ্ছা তাই বলবি আর আমি শুনবো।দেই মুখটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেই। খুব বাড় বেড়েছে দেখছি?
এমন কেন হলি, আগে তো এমন ছিলি না?
অনেক শক্ত করেই চেপে ধরছে ইতির মুখ, প্রচুর লাগছে,তা প্রকাশ করলো না ব্যাথায় কান্না করতে ও ইচ্ছে করলো, গলায় আসা কান্না গুলো কে গিলে নিল,কেননা সে চায় না আলবানকে কান্না দেখাতে এবং তার কোনো প্রকার দুর্বলতার সাথে আলবানের পরিচয় করিয়ে দিতে।
আলবান একটু থেমে আবার বললো,,,

__ আজকাল এমন ডেস মারা কথা বলে কি প্রতিশোধ নিচ্ছিস? অতীত কে ভুলে বর্তমান মেনে নে এটা তোর জন্যই ভালো হবে,সময় দিচ্ছি বলে এই না যে মাথায় চড়ে বসবি।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে,,
__কী জানিস তুই,কি বুঝিস,আদৌ বুঝিস কেন এমন মারামারি করি?কার জন্য করি?কেন জীবনের ঝুঁকি নেই?
অনেক কষ্টে কান্না,ব্যথা গুলোকে সংযত করলো ইতি, সর্বশক্তি দিয়ে আলবানের হাত ছাড়িয়ে নিল নিজের মুখ ,বুক বরাবর ধাক্কা দিলো আলবানকে, আচমকা ধাক্কায় আলবান দু কদম পিছিয়ে গেল,পড়ে যেতেও ধরে পড়লো না।
ক্ষিপ্ত স্বরে বলে,,
__ আমার পুরোনো ঘা তাজা করবেন না বলে দিলাম??ওটা আপনার জন্যই খারাপ হবে।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে আলবান বলে,,

__ ভালো হোক বা খারাপ। অতীত তোকে মানতেই হবে।
ইতি হো হো করে হেসে উঠলো, মোটেও এটি আনন্দের হাসি ছিল না,এ ছিলো তাচ্ছিল্যের এক তেজি হাসি। হাসতে হাসতে দু হাতের কুনূই পিছনে টেবিলে উপর ভর দিয়ে শরীরটাকে হালকা করে নিয়ে বলল,,,
__ অতীতের ভয় দেখাচ্ছেন বুঝি,ওই বালের অতীতকে আমি মানিই না,ভয় তো দূরে।
আচমকা তড়িৎ বেগে ইতিকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল আলবান, কোমড় আঁকড়ে ধরল,,,,
__ মানতেই তোকে হবেই?
__ বাল সরেন তো‌।গা থেকে বিশ্রী ঘামের গন্ধ বের হচ্ছে,এই নাকি আবার বিদেশ থেকে এসেছে।বার বার এতো কাছে আসার কি আছে।
শব্দ করেই হেসে উঠলো আলবান কিন্তু তাও ছাড়লো না ইতিকে,,,

__কথায় আছে না যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।
__ আপনি চোর? আমি তো জানতাম আপনি খুনি।
মুহূর্তেই আলবানের চোখ মুখের রং বদলে গেল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল, শরীর হালকা হলো,শরীরে শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসলো।ছেড়ে দিল ইতিকে।
__ রিলেক্স ডোন্ট প্যানিক?এটা তো শুধু আমিই জানি। ওফফ পুলিশের ভয় পাচ্ছেন বুঝি? আই এম রিয়েলি সরি।
কিন্তু এটা তো সত্যি?
আলবানের ভিতরে তীব্র এক ঝাঁঝালো কন্ঠাস্বর পীড়া দিতে লাগলো। সেই কন্ঠ কানে এসে আওয়াজ তুলছে। ভিতরে সেগুলোকে দমিয়ে রেখে,ক্রুদ্ধ কন্ঠে আওয়াজ করে ইতিকে বললো,,,
__ এই মুহূর্তে তুই আমার সামনে থেকে যা,নাহলে এখন তুই আমার হাতে খুন হবি।
ইতি ভয় পাওয়ার মতো অভিনয়ে ব্যঙ্গ করে বললো,,
__ ও বাবা গো আমি তো ভয় পেলাম।
সিনেমার স্ক্রিপ্টের মতো করে হাতে তুরি বাজাতে বাজাতে বললো,,,

__ শুনুন মিস্টার আলবান আগের ইতির মতো এই ইতিকে, আপনি উঠতে বললে উঠবে না ,বসতে বললে বসবে না, শুয়ে পড়তে বললে শুয়ে পর…..থুক্কু এটা হবে না।এটার জায়গায় অন্য কিছু একটা হবে,যে বালই হোক গে।
আলবানের রাগ এবার আরো বেড়ে গেল,রাগে ফুঁসতে লাগলো, ঘরের চারিদিকে কিছু একটা খুঁজল, খুঁজে না পেয়ে, কোমড়ের বেলটাই খুলতে লাগলো।
ইতি বড়বড় চোখ করে সেদিকে তাকলো,এবার সত্যি ভয় লাগছে আলবানকে। শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,,,
__ওকি ওটা খুলছেন কেন?ওটা খুলবেন না,বেল খুললে তো আপনার প্যান্ট কোমড় থেকে পড়ে যাবে।তারপর ইজ্জতের ফালুদা হবে।আর আস্ত একটা মেয়ে মানুষ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ভুলে গেলেন নাকি? চোখে দেখছেন না বুঝি?এমন করে না দাবানল ভাই।
ইতির ভিতরে ভয় “বেল দিয়ে দাবালন ভাই আবার মারবে না তো” কিন্তু সে ভয় প্রকাশ না করে উল্টো আলবানের প্যান্ট গতিসীমার বাইরে যেতে পারে এটা নিয়ে মিছে চিন্তিত হলো।
আলবান বেল টা খুলে বলতে লাগলো,,,

__ পিটের ছাল আজ তুলবোই তোর।
ইতি যেন কথাটা শুনেও শুনলো না উল্টো না শুনার ভান করে বললো,,,
__ এ্যাঁ কি? না না আমি আপনার ইজ্জত দেখতে চাই না তো,চলে যাচ্ছি আমি। আসলেই আপনি একটা বেশরম।
এই বলে দৌড় দিল দরজার দিকে যেতে যেতে বলল,,,
__ আপনার প্যান্ট গতি সীমার বাইরে,ওটাকে ধরুন।
ইতি চলে যাওয়ার পরপরই আলবান বেল্টটা ফেলে দিল মেঝেতে।ধুপ করে বসে পড়লো বিছানায়। ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়তে শুরু করলো, বুকের ব্যথাটা তীব্র হতে লাগলো।
ইতি এখনো যায় নি দরজা দিয়ে অল্প মুখ ঢুকিয়ে দিলো, হাতে থাকা আধো খাওয়া বিড়ি টি হাত উঁচিয়ে আলবানকে দেখাতে লাগলো,,

__ওয়ান, টু , থ্রি পাইলাম একটা বিড়ি,বিড়িতে নেই আগুন, পাইলাম একটা বেগুন, বেগুনে নেই বিচি পাইলাম একটা কেচি,কেচিতে নাই ধার , পাইলাম একটা হার,হারে নাই টাকা, চইলা গেলাম ঢাকা।
এই বিড়ি কিন্তু আমি খাবো বলে দিলাম,মেলা কষ্টে আছি।বিড়ি খেয়ে অতীত ভোলার চেষ্টা করবো।বাইইইইই
এই বলে ভো দৌড় লাগালো নিজের রুমে।
রাগ প্রচুর হচ্ছে আলবানের কিন্তু অতীতের ভাবনা গুলো মনে প্রবল ভাবে হানা দিচ্ছে, বারংবার খন্ডিত করছে হৃদয়।আলবান ইতির কথার আর কোন ভাবান্তর না দেখিয়ে ওয়াস রুমে চলে যায়।

__দুষ্শমন স্যার রুমে আসবো??
নামটা বিরক্তিকর হলেও দির্শক কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না।দির্শক তখন বিছানায় হেলান দিয়ে ইংরেজি বই পড়ছে। বিথীর কন্ঠস্বর শুনে মুখ থেকে বই সরিয়ে বললো,,
__ উজ্জ্বল নারী নাকি??
__ হ্যাঁ।
__ আসো।
বিথী রুমে প্রবেশ করেই চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগলো রুমটিকে।এত এত বই দেখে চোখ মুখ কুঁচকে নিলো।মনে মনে বিরবির করে বলে,,
__ এত বই কিভাবে পড়ে লোকটা।বাবা কত বই? প্রফেসর মানুষ বলে কথা?
দির্শক বিথীর মুখটা ভালো করে দেখতে লাগলো, একটু ঝুঁকে ঝুঁকেই দেখছে মুখখানা।বোঝার চেষ্টা চলছে এটা বিথী নাকি নিধি। চিনতেও বেশি একটা সমস্যা হয় না দির্শকের, বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখে বলতে পারবে কোনটা বিথী কোনটা নিধি। বিথী মুখটা একটু চ্যাপ্টা,বাম গালে একটি ছোট তিল আছে যা দির্শকের চোখে বেশ ভালো লেগেছে। গালের তিল চোখে পড়লো দির্শকের বুঝলো এটা বিথি।বিরবির করে বললো,,,

__ বিউটি স্পট, কিউটি।
বিথী দির্শকের দিকে চোখ রেখে বলে,,,
__ কিছু বললেন।
__ নাহ।
__ ওহ।
__ হু।
__ বসতে বলবেন না।
__ তোমাদের এ তো বাড়ি আবার বসতে বলতেও হবে!
__ তাতে কি ??
__ ওকে বসো,দেখো কোথায় বসতে তোমার ভালো লাগে।
বিছানার এক কোনে বসে পড়লো বিথী।দির্শক বলে,,
__ উজ্জ্বল বিথী কি কিছু বলবে আমায়??
__ হুম,ওই জন্য তো এলাম।
__ তবে বলে ফেলো।
__ তখন খাবারের টেবিলে আমার এঁটো খাবারটা কেন খেয়ে ফেললেন, এঁটো খাবার নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন জানেন আপনি??
বইয়ের পাতায় চোখ দিয়ে দির্শক বলে,,,

__ জানি না? বল শুনছি।
__ আমার এঁটো খাবার আগে জামাইকে খাওয়াইতাম।
__ তো ।
__ তো মানে আবার কি আপনি খেলেন কেন?
__ তোমার জামাইয়ের কাজ আমি করে দিলাম সিম্পিল।
কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না বিথী তাও বললো,,
__ সেটা না হয় বুঝলাম।এখন কথা হচ্ছে অন্যকিছু।
__ কি সেটা??
__ আমার এঁটো খাবার খেয়ে আপনার অনুভূতি কেমন,মানে ফিল কেমন আসছে?
__ পেট ব্যথা অনুভব হচ্ছে,জ্বর জ্বর ফিল হচ্ছে,বমি বমি ভাব হচ্ছে।
__ বমিও হচ্ছে।
__ হ্যাঁ।
__ তাহলে সেটা আমার এঁটো খাবার খাওয়া জন্য হচ্ছে না।
__ তবে কেন হচ্ছে?
__ গর্ভবতী হওয়ার সম্ভাবনায়?
চমকে উঠলো দির্শক,এমন কথায় তাজ্জব বনে চলে গেল দির্শক। বইয়ের পাতা থেকে মুখ সরিয়ে বিথীর দিকে তাকলো মিটমিট করে হাসছে মেয়েটা।হা হয়ে কিছুক্ষণ দেখলো বিথীকে তারপর প্রশ্ন করলো,,,

__ ছেলেরাও বুঝি গর্ভবতী হয়??
__ এঁটো খাবার খেলেও বুঝি কারো বমি, জ্বর হয়?
__ আমার কথার প্যাঁচে আমাকেই প্যাচাইলা দেখছি।
__ বুদ্ধি আছে তবে।
হাতে থাকা বইটা বন্ধ করে বালিশের কাছে রাখলো দির্শক,বইয়ের কভারে ছবিটি চোখ পড়লো বিথীর, অঙ্কিত দুটি ছেলে মেয়ে একে অপরকে জরিয়ে ধরে আছে বইটির নাম Romeo and Juliet লিখেছেন William Shakespeare। বিথী বেশ বুঝতে পারলো এটা প্রেম ভালোবাসার বই। গলার স্বরটা অসহায় করে বলে,,

__ আহা কি প্রেম।
__ কোথায়??
__ বইয়ে।
__ ওহহ।
__ আমাদের ওতো ইংরেজি না পড়িয়ে এই বই গুলোর প্রেমে ব্যাখ্যা দিলে ও তো পারেন।
__ এসব বই আমি বেশি একটা পড়ি না।
__ তবে আজ কেন??
__ মন ভালো তাই।
__ এসব পরে বড় বিপদে পড়তে পারেন?
__ যেমন।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বিথী বলে,,,
__ প্রেম পিরিতি চক্র ভালা না।
__ করেছো মনে হয়??
__ আরেহহ নাহহ, আমাদের তিন বোনের জীবনেও প্রেম টেম হবে না।এইতো গতকালকেই একটা ছেলে আমাকে প্রোপোস করতে এসেছিল তার আগেই কয়েকজন ছেলে এসে তাকে বেধারাম পিটিয়ে চলে গেল। কেন,কোন কারণে তা আমার জানা নেই।
দির্শক বাঁকা হাসি দিলো,,,

__ ওসব বখাটে ছেলে।
__ আপনি জানলেন কিভাবে??
__ যারা ভালোবাসে তারা মার খেতে জানে না, বরং মেরে আধমরা করে দিতে জানে।
কথাটা কেমন যেন সাইকো কথার মতো মনে হলো বিথীর কাছে। কিন্তু ওতোটা পাত্তা দিল না।
__ ওসব ভয়ংকর ভালোবাসার দরকার নেই বাবা?
__ দরকার আছে?
__ হতেই হবে, না হলেই তো ভালো ??
__ হয়ে গেছে?
__ কারো সাহস নেই, বিথীকে পটানো একবারে ইমপসিবল?
__ একজন ছাড়া কারো নেই সে সাহস, আচ্ছা ইমপসিবলের বাংলা মিনিংটা বলো তো।
__ অসম্ভব?
__ পারো দেখছি?
__ কিছু কিছু পারি,তবে আপনার মতো ওমন ইংরেজি বই পড়তে পারব না?
__ তবে উল্টো পাল্টা ইংরেজি বলো কেন??
__ আমরা এমোনিই। ওতো ইংলিশ ম্যাম না, যেটুকু ইংরেজি জানি ওটুকু না জানার ঐ সমান।
__ বেশি বেশি করে পড়তে হবে ??
__ ওটাই সমস্যা? আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
__ অফকোর্স?
__আপনি এমন বিদেশি মানুষদের মতো দেখতে কেন? একটু একটু বাংলাদেশি মানুষের মতো দেখতে, কিন্তু এমন কেন?।

__আমার মায়ের জন্ম ইতালির রোম শহরে,বাবা বাংলাদেশি।
বিথীর চোখ দুটি বড় বড় হয়ে গেল,,
__ তাহলে আপনার মা গ্রামে ছিল যে?
__ বাবা ছিল যে তাই??
__ আর কখনো ইতালি যায় নি আপনার মা।
__ বর্তমানে সেখানে আমার মায়ের কেউ নেই,তাই য়ায নি।
__ ওহহ। আপনার আর ভাই বোন নেই।
__ না।
__ ওহহ।
বিথী নিজের হাতের চামড়ার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিরবির করে বলে,,,

__ বাবা গো আমার থেকে ও মেলা ফর্সা দেখছি, এবার আমারি তো হিংসা হচ্ছে?
__ আচ্ছা আজ তবে আসি?
__ থাকার জন্য এসেছিলে বুঝি?
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বলে,,,
__ গাদি গাদি পড়া দিয়েছেন ও গুলোই পড়তে হবে।
__ ওকে যাও পড়ো,কাল পড়া‌ না পাড়লে পানিস্ট আছে??
__ পানিস্ট আর আমাদের,আমরা যদি চাই তাহলে আপনার সাধ্য নেই আমাদের পড়ানোর,আমার চাই বলেই আমাদের পড়াতে পাচ্ছেন,কজ ওফ বাবা এবং বড় বাবা এরা খুব করে চাচ্ছে আমরা যাতে মনোযোগ দিয়ে পড়ি।
__ আমাকে তোমাদের ইচ্ছায় রেখেছো রিয়েলি?
__ জি দু্ষ্শমন স্যার।
__ নো উজ্জ্বল ওম্যান, তোমার ধারনা সম্পূর্ণ ভুল,আমি চাই বলেই এখানে আছি।
বিথী আর কোন কথা না বলে ‘গুড নাইট’ বলে হাই তুলতে তুলতে চলে যায়।দির্শক বিথী যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ পর বললো,,,,
__ দ্যাটস গ্রেট নারী, পারফেক্ট স্পট কিউটি।

বিথী রুমে এসে দেখলো ইতি নিধি বিছানায় শুয়ে ফোন দেখছে। বিথী নিধির পায়ে মেরে বললো,,
__ কি যে পাদরো ভাইয়ের কাছে গেছলি?
__ পরে যামু নে? এ বাড়িতেই তো আছে।এখন একটু রিলস দেখি।
বিথী ও টেবিলের উপর থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে ইতি নিধির মধ্যেখানে শুয়ে পড়লো। তিনজনেই গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোনে রিলস দেখছে।আর শব্দ করে হাসছে।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৭

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ কানে আসলেই তিন বোনেই তড়িৎ বেগে ফোন গুলোকে বালিশের নিচে রেখে দিয়ে, তিন জন তিন জনকে আষ্টে পিষ্ঠে জরিয়ে ধরে ভদ্র মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়লো,তারা ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে এখন তাদের রুমে তাদের মা জননী এসেছে।
সিদ্দিকী বেগম রুমে ঢুকেই বললেন,,,,
__ নামাজ পড়ার জন্য সকালে যেন ডাকতে না হয় বলে দিলাম।
এই বলে লাইট ওফ করে দিয়ে নিজের রুমে চলে গেলেন।

তিন তরঙ্গের আলোকছটা পর্ব ৯