Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল ২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল ২

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল ২
জান্নাতি আক্তার জারা

আরাত বিছানার উপর শাড়ি রেখে পিছনে ফিরে তাকালো, আরাতের চোখমুখ শক্ত, পিছন ফিরে গলায় গম্ভীর্য টানল,
___” হ্যাঁ বলেন?
রশ্মি আরাতের মুখে আপনি শুনে কিছুটা ইতস্ত বোধ করছে, আরাতের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ তে রশ্মি চোখ নামিয়ে নিয়ে হাত কচলাতে লাগলো, কিভাবে শুরু করবে, কোথায় থেকে শুরু করবে, কিছুই মাথায় ঢুকছে না, আরাত রশ্মি কে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,
___” কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন, আমার হাতে বেশি টাইম নেই।
আরাতের কথায় রশ্মি আরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
___” আমার থেকে তোর সময় টা বেশি ইম্পর্টেন্ট?
___” হ্যাঁ কারণ এই সময় টা আমাকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে।
রশ্মির কাছে মনে হচ্ছে, আরাত কঠিন কঠিন কথা বলছে, সেসবের উওর তাঁর কাছে নেই, আরাত রশ্মির দিকে চেয়ে আছে, রশ্মির চাহনিতে লেগে আছে অসহায়ত্ব, আরাত সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো,রশ্মি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আরাতের দিকে এগিয়ে এসে বলল,
___” আমি জানি কোনোকিছুই আর আগের মতো নেই, আমাদের মধ্যে দূরত্ব এসেছে, নীরবতা এসেছে, না বলা হাজারটা কথার দেয়াল দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি তোকে কখনো ভুলে যায়নি, তোর কথা আমার স….
রশ্মির পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে আরাত হাত উপরে তুলে মুখে গম্ভীর্য টেনে বলল,
___” আমাকে আপনার মনে পড়বেই, কারন আমি আপনাকে ঠকাইনি।
রশ্মি আরাতের কথায় এবার ধৈর্য হারালো, আরাতের কাঁধে হাত রেখে ঝাকাতে ঝাকাতে বলতে লাগলো,
___” আমি কী ঠাকাইছি তোকে, হ্যাঁ আমি কী ঠকাইছি, তুই আমাকে দিয়ে মাহিরের সঙ্গে রিভেঞ্জ নিতে চেয়েছিলিস তাই তো, কিন্তু কেনো? মাহির তোকে কথা দিয়ে কথা রাখেনি বলে, হ্যাঁ বল, তাহলে তুই কেমন করে ভালো হইলি, তুই তো আমাদের মতো বেইমান হইলি তাইনা, আমাকে দিয়ে নিজের স্বার্থ পূরণ করতে চেয়েছিলিস, শোন আরাত বন্ধুত্বের মধ্যে স্বার্থ রাখতে নেই…
___” আমি না হয় স্বার্থ রেখেছিলাম, আর আপনি যে স্বার্থপর ছিলেন?
আরাত নিজের কাঁধ থেকে রশ্মির হাত ঝাটকা দিয়ে সরিয়ে বলল কথাটা, রশ্মি অবাক চোখে আরাত কে দেখছে, এখানে এসেছিলো সবকিছু মিটমাট করে নিতে, কিন্তু মিটমাট না হয়ে আরো দন্ড বেজে গেলো, আরাত কে কেমন অচেনা লাগছে, আগের আরাত তো এমন ছিলো না, রশ্মির অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে আরাত তাচ্ছিল্য হেঁসে বলতে লাগলো,
___” আমি যেদিন দেখলাম মানুষ, মানুষ কে প্রচন্ড রকম ভাবে ঠকিয়ে ও, অপরাধ বোধে ভোগে না, আমি মূলত সেদিন থেকে মানুষ ভয় পাই ।
রশ্মি কয়েক মুহূর্ত আরাত কে অবিশ্বাস্য চোখে দেখে চোখের পানি মুছে নিজেকে ঠিক করে নিয়ে মাথা নিচু করে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” ঠিক আছে, আমাকে ভয় পেতে হবে না, আসব না কখনো আর তোর সামনে, বাট পার্থ, পার্থর বিষয়ে আমার কিছু জানার আছে?
আরাত অন্য দিকে তাকিয়ে হেঁসে উঠলো, আরাত আগেই বুঝতে পারছে, রশ্মি পার্থর জন্য এখানে এসেছে, আরাত তো তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ডের স্বভাব সম্পর্কে আগে থেকেই সব জানে, রশ্মি পুনরায় বলল,
___” রশ্মি বাংলাদেশে কিভাবে, আর মিম পার্থর মধ্যে কী চলছে, আরশের মিমের ডিভোর্স হওয়ার পিছনে কারণ কী পার্থ ছিলো?
পার্থর নাম শুনার সঙ্গে সঙ্গে দরজার সামনে মাহিরের মুখ অন্ধকার হয়ে এলো, এতদিন মাহির পার্থ কে দেখে রশ্মির রিয়াকশন দেখে সন্দেহ হয়েছিলো,এটাই পার্থ, কিন্তু নাম না জানায় শিওর ছিলো না, কিন্তু আজকে রশ্মির মুখে পার্থর কথা শুনে মাহির রুমে প্রবেশ না করে বড়বড় পা ফেলে চলে গেলো, পায়ের শব্দে রশ্মি পিছনে ফিরে মাহির কে যেতে দেখে চিন্তার ভাজ পড়ে কপালে, আরাত রশ্মির প্রশ্নে বেকুব হয়ে গেলো, রশ্মি কতকিছু ভেবে নিয়েছে মিম আর পার্থ কে ঘিরে, আরাতের ভাবতেই ঘিন্না লাগছে, আরাতের মুখে এতক্ষণে রাগ দেখা গেলো, রাগী সুরে রশ্মি কে বলতে লাগলো,
___” আমার মনে হয়েছিলো সবকিছু আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে, তুই সাত বছর পড়ে এসেছিস, বাট এখনো তোর একি প্রবলেম, আমি এই বেস্টফ্রেন্ড শব্দটা কে ঘৃণা করি, আজকাল বেস্ট ফ্রেন্ড শব্দটা শুনলেই দম বন্ধ হয়ে আছে আমার।
রশ্মি আরাতের কথা শুনে আর দাঁড়ালো না, মাহির কে যেতে দেখে আরেক চিন্তা এসে ঘিরে ধরছে, দ্রুত পায়ে আরাতের রুম থেকে বের হয়ে গেলো রশ্মি, রশ্মি কে যেতে দেখে আরাতের মুখে তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে উঠলো ,টলমল করছে চোখের পানি,কথাগুলো গলায় আটকে যাচ্ছে, এতক্ষণ খুব কষ্ট করে কান্নাগুলো চাপিয়ে রেখেছিলো, বিছানায় ধপ করে বসে পরলো, চোখের পানি আর বাঁধ মানলো না, আপন গতিতে গাল বেয়ে গড়িয়ে পরতে লাগলো,
___” তুই আমার বিশ্বাস ছিলি, ভেবেছিলাম পুরো পৃথিবী আমার বিরুদ্ধে গেলেও তুই আমার পাশে থাকবি, এতকিছুর পড়ে অন্তত তুই কখনো আমাকে ভুলে যাবি না, অথচ দেখ তোকে ছেড়ে আমার জীবনের সাতটা বছর কেটে গেলো, যে রশ্মি আমার রন্ধে রন্ধে সবকিছু চিনতো, সেই রশ্মি এতটা অচেনা হয়ে গেলো কী করে, আমি আমার রশ্মি কে মিস করি, মিস করিররররর আহহহহ।
আরাত বিছানার চাদর খামচে ধরে মনের মধ্যে না বলা কথা গুলো বের করতে লাগলো,

___” এতদিন তো ভালোই ছিলাম, কেনো আসলি, কেনো মনে করিয়ে দিলি সেই ছোট বেলা, কেনো মনে করিয়ে দিলি তোকে ঘিরে আমার বেঁচে থাকার এক টুকরো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি, কেনো কেনো, কেনো রশ্মি , কেনোওওও?
আরাত মেঝের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যর সুরে পুনরায় বলতে লাগলো,
___” শুনেছিলাম মানুষ প্রেমে ধোঁকা খায়, আর আমি প্রেমে বন্ধুত্বে দুইদিকে খুব বাজে ভাবে ঠকেছি,প্রেমের বিচ্ছেদটা ছিলো কষ্টের, কিন্তু বন্ধুত্বের বিচ্ছেদ ছিলো হাহাকারের আফসোস এর, বেস্টফ্রেন্ডের বদলে যাওয়া কতোটা যন্ত্রণা দায়ক সেইটা একমাত্র হয়তো আমিই জানি, আমরা তো ভালো ছিলাম বল, হ্যাঁ ভালো ছিলাম, ভালো থাকতে থাকতে আমাদের জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির আগমন হয়ে গেলো, ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে গেলো, কথা বলা কমে গেলো, সেই বিকালে ছাঁদে বসে আড্ডা দেওয়া কমে গেলো, এক বিছানায় একিউপর কে জরিয়ে ধরে সারাদিনের অজানা গল্প করা হারিয়ে গেল, তারপর, তারপর একদিন সেই বিচ্ছেদের মুহূর্ত চলেই এলো, তোর উপর আমার কাটানো সমস্ত অধিকার নিষিদ্ধ হয়ে গেলো,

শেষে বুঝলাম বন্ধুত্ব চিরদিন টেকে না, সময়ের ব্যবধানে সেই গভীর সম্পর্কটাকে ধীরে ধীরে অচেনা করে তোলে, এক সময় তোকে ছাড়া একটা দিনও কল্পনা করতে পারতাম না,আজ তোর খোঁজ না নিয়েই দিন কেটে যায়, বন্ধুত্ব নিয়ে কখনো গর্ব করতে নেই, যদি ও এই কথাটা আগে মানতাম না, বিশ্বাস করতাম না, কিন্তু এখন পুরোপুরি বিশ্বাস হয়ে গেছে, আজ আমরা এতটাই দূরে, যতটা দূরে চলে গেলে দুজন দুজনকে ছাড়া অনেক সহজে দিন কেটে যায়,
মন থেকে বড় নিশ্বাস ফেললো আরাত, নিশ্বাস টা হয়তো বন্ধুত্ব হাড়িয়ে ফেলার জন্য , হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বিরবির করলো,
___” একটা কথা জানিস তো, মানুষ ঠকায় ক্ষনিকের জন্য, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সারাজীবনের জন্য জিতিয়ে দেয়, আমি আলহামদুলিল্লাহ সারাজীবনের জন্য জিতে গেছি।

মাহির আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে, রশ্মি তালুকদার বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজেদের বাড়িতে মাহির কে না পেয়ে তিথি কে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে শশুর বাড়ি, মাহির যে হটাৎ তালুকদার বাড়িতে ঢুকে যাবে রশ্মির ভাবনাতে ছিলো না, তিথি কে শাশুড়ীর রুমে রেখে এসে, রুমে মাহির কে খুঁজলো, রুমে মাহির কে খুঁজে না পেয়ে রশ্মি ছাঁদে পা বাড়ালো, দরজার সামনে আসতেই সিগারেটের ধোঁয়া আর গন্ধ নাকে এসে বাড়ি খেলো রশ্মির, মাহির ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট টানছে, পায়ের কাছে দশবারো টা সিগারেটের গুড়া পড়ে আছে, রশ্মি ঢোগ গিলে ধীর পায়ে মাহিরের পাশে এসে দাঁড়ালো, কাঁপা কাঁপা হাত মাহিরের কাঁধে রেখে ছোট করে বলল,

___” তুমি ঠিক আছো তো?
___” এটাই ছিলো তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ড তাই-না?
মাহির এর চোখ সামনে অন্ধকার আকাশের দিকে,
রশ্মি নিশ্চুপ চোখের পানি ফেলতে লাগলো, মাহির যে সবকিছু শুনে ফেলছে, রশ্মি হাত নামিয়ে নিলো, কথা বলল না, নিরবে চোখের পানি ফেলতে লাগলো, রশ্মি কে কিছু বলতে না দেখে মাহির রাগী গলায় বলল,
___” তোমার এই ছেলের প্রতি, হটাৎ করে এতটা ব্যাকুলতা কেনো, নাকি আগে থেকেই ছিলো, শুধু আমার সামনে প্রকাশ করোনি?
___” এ-সব কিছুই না, তুমি ভুল বুঝতেছ।
মাহির রশ্মির দিকে তাকালো, চোখমুখে লেগে আছে অজানা প্রশ্ন,
___” তাহলে সত্যি টা কী, কেনো তুমি এতদিন পড়ে এই ছেলেকে দেখে এতটা হাইপার হয়ে যাচ্ছ, কেনো বারবার আমার চোখ থেকে নিজের চোখ লুকাতে চাইছো কেনো?
রশ্মি কিছু বলতে পারলো না, নিশ্চুপ হয়ে আছে, রশ্মি এখনো সবকিছু অজানা, পার্থ কে ঘিরে অনেক কথায় তাঁর জানা নেই, মাহির কে কী বলবে, স্বামীর সামনে এক্সের কী বলা যায়, মাহির রাগী গলায় বলতে লাগলো,

___” তুমি চাইলে পার্থ চৌধুরীর কথা আমাকে বলতে পারতে, অথচ তুমি আমার থেকে লুকিয়ে গেলে, কিন্তু কেনো, পার্থ চৌধুরী তোমার এক্স এটা আমি প্রথম থেকে জানতাম, ইভেন তুমি নিজে আমাকে বলছো, তাহলে আজকে এত লুকোচুরি কেনো?
রশ্মি কে কিছু বলতে না দেখে মাহির নিজেই রশ্মি কে বুকে টেনে নিয়ে বলতে লাগলো,
___” কেনো লুকিয়ে রাখছো আমার থেকে, আমি তো তেমার সব অতীত জেনেই তোমাকে ভলোবেসেছি, তোমার প্রতি আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে, তুমি কখনো ছেড়ে যাবে না আমাকে।
রশ্মি মাহিরের বুকে মাথা রেখে মাথা ঝাকালো,হুম, মাহির পুনরায় বলে উঠলো,
___” কিন্তু আমার খারাপ লেগেছে কোথায় জানো?
___” কোথায়?
মাহির দু’হাতে রশ্মি কে জরিয়ে ধরে বলতে লাগলো,

___” তুমি আমার কাছে লুকিয়ে গেছো ব্যাপারটা, তুমি যদি প্রথম দিনে সবকিছু বলতে, তাহলে আজকে হটাৎ করে এতটা খারাপ লাগতো না, পার্থ কে দেখে তোমার রিয়েকশন বদলে যায়, এসব দেখে আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, বাট আমি চেয়েছিলাম, তুমি আমার কাছে এসে শেয়ার করো, কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে শেয়ার করছিলে না, এতেই আমার রাগ জমে গিয়েছিলো।
রশ্মি দু’হাতে মাহির কে শক্ত করে জরিয়ে ধরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
___” আর কখনো এমন হবে না, আমি সবসময় সবকিছু তোমার সঙ্গে শেয়ার করব প্রমিস।
মাহির মুচকি হেঁসে,
___” মনে থাকবে তো?
___” হুম।
কিছুক্ষণ দুজন এভাবে থেকেই মাহির বলে উঠলো,
___” পার্থ চৌধুরী হটাৎ বাংলাদেশে কেনো?
___” আমিও তো জানি না।
মাহির কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমতা আমতা করে পুনরায় বলে জানতে চাইলো ,
___” তেমার ফ্রেন্ড কী বলল?
রশ্মি একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলতে লাগলো,
___” ও কেমন বদলে গেছে, আজকে কঠিন কঠিন কথা বলল,আরাত এমন ছিলো না, আমার উপর ওর বিশ্বাস নেই, আরাত অনেক বড় আর বুঝদার হয়ে গেছে, দেখে ভালো লাগলো, তাকবীর ভাইয়া ওকে অনেক সুখে রাখছে।
মাহির আর কথা বলল না, রশ্মি কে গম্ভীর গলায় বলল,
___” চলো অনেক রাত হয়ে গেছে, রুমে চলো।
বলেই ছাঁদ থেকে নিচে নেমে গেলো, রশ্মি কয়েক সেকেন্ড মাহিরের যাওয়া দেখে সেও নিচে নেমে এলো,

সন্ধ্যা কেটে রাত নেমেছে, আরাত রা গ্রামে এসেছে দুপুর দুইটার নাগাদ, আগামীকাল ঈদ, তবে মিম দের বাড়িতে এখন থেকেই ঈদের আমেজে ভড়ে উঠছে, আদনান তালুকদার বলে দিয়েছেন, উনারা যতদিন গ্রামে থাকবে ততদিন যেন রান্নাবান্না মাটির চুলায় হয়, গ্রামে এসে পুরো দমে গ্রামের ফিল নিতে চাইছেন, রুমে এসি থাকা সত্বেও মিমের বাবা কে নিয়ে আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার আতিফ শেখ উঠানে ব্যাকুল গাছের নিচে হাত পাকা নিয়ে বসে গল্পে মসগুল হয়েছে, আর বড়রা মিলে উঠানে মাটির চুলায় রান্না তুলে দিয়েছেন রুপালী বেগম, পুকুর থেকে বড় মাছ উঠাইয়া, গ্রামের সেই ঐতিহ্য খাবার বড় মাছের মাথা দিয়ে আলুর ডাল রান্না করছে, তাঁকে হেল্প করছে আদিবা রাবেয়া আনহা, বাচ্চা গুলো খোলা আকাশ পেয়ে খেলায় মেতে উঠেছে, আনাস আহিন পার্থ তিনজন মিলে মরিচ বাতি দিয়ে পুরো বাড়ি ঈদের ডেকোরেশন করছে,

আর আইরা আরাত মিম মিলে মেহেদী দিতে বসেছে, উঁহু নিজেদের হাতে না, যখন থেকে গ্রামে হই পড়েছে মিম এসেছে, তখন থেকে ছোট ছোট বাচ্চা রা এসে মিম কে ধরেছে চাঁদ রাতে মেহেদী দিয়ে দিতে হবে, আজকে চাঁদ রাত, মিমদের বাড়ির আশেপাশের বাড়ির পাঁচ-ছয়টা বাচ্চা এসেছে মেহেদী হাতে লাগিয়ে নিতে, মিম নিজের সঙ্গে আরাত আইরা কেউ ফাঁসিয়েছে, মেহেদী দিতে দিতে আইরা মিম উঠে গেছে, থেকে গেছে শুধু আরাত, আরাত মিম আর আইরা কেও মেহেদী দিয়ে দিতে দিতে রাত হয়ে গেলো, অন্য কে মেহেদী দিয়ে দিতে দিতে এখন অব্দি নিজের মেয়েকেই মেহেদী দিয়ে দিতে পারেনি, সর্বশেষে নিজের মেয়েকে মেহেদী দিতে বসেছে,কিন্তু বিপত্তি বাজে ছোট মাহা বারবার নাড়াচাড়া করছে, এদিকে রাত আটটা বেজে যাচ্ছে, বাড়ির সবার রাতের খাবার খাওয়া শেষ, শুরু বাকি পড়ে আছে মাহা আর আরাত, মাহা কে অনেক কষ্টে মেহেদী দিয়ে দিয়ে নিজেও এক হাতে দিয়েছে, এর মধ্যে খাবার খেতে ডাকলে আরাত মাহা কে পাঠিয়ে দেন আদিবা তালুকদার এর কাছে, আদিবা তালুকদার নাতনী কে নিয়ে গেলেন খাওয়াতে, আরাত এক হাতে মেহেদী দিয়ে অন্য হাতে মিমের থেকে দিয়ে নিচ্ছে, বাড়ির সকালে বাড়ির উঠানে চেয়ারে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, অনেক দিন পড়ে এমন সুন্দর সময় কাটাচ্ছেন পুরো পরিবার মিলে, বাড়ির ভিতরে শুধু মিম আর আরাত, আইরা মাটির চুলায় লাল চা বানিয়ে সবার হাতে হাতে দিলো, এতে আড্ডায় আসর আরও বেশি জমে উঠলো যেন, বিশেষ করে পার্থ কে নিয়ে তাঁদের আড্ডা চলছে ভরপুর, পার্থ নিজেও তাঁদের সঙ্গে সময় টা উপভোগ করছে, তাকবীর ফোন স্ক্রল করতে করতে বাড়িতে প্রবেশ করলো, তাকবীর কে দেখে আনাস ডেকে উঠলো,

___” ভাইয়া?
তাকবীর ফোন থেকে চোখ উঠিয়ে একনজর সবাই কে দেখে পুনরায় ফোন স্ক্রল করতে করতে বলল,
___” হুম।
___” কই গিয়েছিলে?
তাকবীর আনাস এর প্রশ্নে কপাল কুঁচকালো, পুনরায় সবাই কে এক নজর দেখে নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” সামনে।
আনাস আর কিছু বলল না, আহাদ তালুকদার গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
___” আমাদের সঙ্গে বসো, আড্ডায় সামিল হও?
তাকবীর আহাদ তালুকদার এর কথায় ফোন পকেটে রেখে, আশেপাশে আরাত দেখতে না পেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
___” আমি একটু আসছি।
বলেই তাকবীর বাড়ির ভিতরে যেতে নিলো, রাবেয়া তালুকদার পুনরায় তাকবীর কে পিছু ডেকে বলল,
___” তাকবীর আরাত রাতের খাবার খাইনি, ওকে পাঠিয়ে দিও।
মায়ের কথায় তাকবীর গম্ভীর গলায় বলল,
___” খাবারের প্লেট টা দেন।

রাবেয়া তালুকদার ছেলের কথায় প্লেট সাজাতে গেলেন, বাকিরা গল্পেয় মগ্ন হয়ে গেলো, বাড়ির ভিতরে সোফায় বসে আছে আরাত আর মিম, আরাতের এক হাত ভরা তাজা মেহেদী, গাঢ় রঙ এখনো ঠিকমতো ধরেনি, তাই সাবধানে হাত টা উপরে তুলে ধরে আছে, যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, আরাতের পাশেই বসে মিম আরেক হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে, দু’জনেই খুব মনোযোগ সহকারে হাতের দিকে চেয়ে আছে, মেহেদী প্রায় দেওয়া শেষ, ঠিক তখনই তাকবীর খাবারের প্লেট নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে, কারো পায়ের আওয়াজে মিম আরাত দু’জনেই সদর দরজার দিকে তাকায়, তাকবীর কে দেখে মিম বাকি টুকু দ্রুত শেষ করতে লাগে, এতে আরাত রেগে গেলো,
___” কী সমস্যা, এত তাড়াহুড়ো করছিস কেনো, আমার মেহেদী নষ্ট হয়ে গেলে তোর খবর আছে ?
তাকবীর খাবারের প্লেট টি-টেবিলে রেখে দিয়ে সোফাতে বসে একনজর দু’জন কে দেখে পুনরায় ফোন স্ক্রল করতে লাগলো, মিম আরাতের কথায় বলল,

___” এইতো হয়ে গেছে আপু, থাকো আমি চললাম।
মিম দ্রুত মেহেদী দেওয়া শেষ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে উঠানে চলে গেলো, বাড়ির ভিতরে কেউ নেই, তাকবীর অন্য সময় হলে রুমে চলে যেত, কিন্তু আরাতের সঙ্গে সময় কাটাবে বলেই সোফাতে বসে পরলো, মুখে না বললেও মিম বুঝতে পেয়েছে ব্যাপারটা, মিম চলে যেতেই তাকবীর ফোন পকেটে গুঁজে আরাতের দিকে তাকালো, আরাত নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে মুখ গম্ভীর করে রেখেছে, তাকবীর গম্ভীর গলায় বলল,
___” প্রবলেম কী, মন খারাপ কেনো?
আরাত নিজের হাত তাকবীরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” এটাই প্রবলেম।
তাকবীর এক ঝটকায় বসা থেকে উঠে আরাতের পাশে বসলো, কয়েক সেকেন্ড নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাকবীর কিছুই বুঝতে পারলো না, তাকবীর বুঝতে না পেয়ে বলল,
___” কই প্রবলেম, সব তো ঠিক লাগছে ?
আরাত উপুর হয়ে টি-টেবিল থেকে মুখ দিয়ে মেহেদী নিয়ে তাকবীরের কোলে রাখলো,
___” মেহেদী হাতে নেন, আর হাতের মাঝখানে ফাঁকা অংশটুকুতে মেহেদী লাগিয়ে দেন।
আরাতের কথায় তাকবীরের কপাল কুঁচকে এলো,

___” আমি?
___” এখানে আপনি ছাড়া আর তো কাউকে দেখতে পারছি না?
তাকবীর কিছুপলক আরাতের দিকে তাকিয়ে থাকলো, বউটা আর আগের মতো নেই, কী আর করার বাধ্যতামূলক মেহেদী হাতে নিয়ে পুরো হাত দেখতে লাগলো, তাকবীর এর মনে হচ্ছে তাকবীর পরিক্ষা দিতে বসেছে, ভুল করলেই সাজা মিলবে, মেহেদী দেওয়া হাতে নতুন করে আর কিভাবে মেহেদী দিয়ে দিবে, আরাত পুনরায় দেখে দিলো,
___” মাঝখানে ফাঁকা অংশটুকু দেখছেন না ?
তাকবির মাথা ঝাকিয়ে হুম বলল,আরাত কঠিন গলায় বলল,

___” তো চুপচাপ দেখছেন কেনো?
তাকবীর উপায় না পেয়ে ফাঁকা অংশ টুকুতে ছোট করে আরবি তে ت রাঙ্গিয়ে দিলো, আরাত মুচকি হেঁসে হাত মুখের কাছে নিয়ে দেখতে দেখতে বলল,
___” হাতে রঙ গাড়ো না হয়লে আপনার খবর আছে।
তাকবীর চোখমুখ কুঁচকে,
___” হোয়াট?
___” হ্যাঁ, মেহেদী রঙ গাড়ো হইলে বুঝবো আপনি আমাকে ভালোবাসেন।
তাকবীর আরাতের কথায় হাতাশায় নিঃশ্বাস ফেলে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে আরাত কে বলল,
___” কাছে এসো।
___” কেনো?
তাকবীর তরকারি দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে বলল,
___” ভালোবাসার প্রামান রাতে দিবো, এখন খাবার খেয়ে নেও, মুখ খুলো।
আরাত মুখ বাঁকা করে দুহাত উপরে তুলে হা করলো, তাকবীর নিজের হাতে আরাত কে খাওয়াতে লাগলো, বাড়ির ভিতরে দুজনের এক দুষ্টু মিষ্টি মুহূর্ত ফুটে উঠলো আর বাহিরে পুরো পরিবার মিলে ঈদের চাঁদ রাত আড্ডা খুনসুটিতে মাতিয়ে রাখলো,

ভোরের আলো ফুটে বের হওয়ার সাথে সাথে গ্রামের গাছগাছালি থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে, যেন তাঁড়াও এই পবিত্র দিনে খুশির আমেজ জানান দিচ্ছে, গ্রামের মানুষ ভোরেই সবসময় উঠে থাকে, কিন্তু আজকের দিনটা একটু বেশিই স্পেশাল, এত ভোরে প্রতিটা বাড়ির উঠান থেকে টিউবওয়েল থেকে ছোট ছোট বাচ্চা দের হাসির শব্দ ভেসে আসছে, হয়তো তাঁরা ঈদের আনন্দে একসঙ্গে এক টিউবওয়েলে মজা করতে করতে ঈদের গোসল করছে, এভাবে হয়তো একসঙ্গে নতুন সাজে নতুন পোশাকে ঈদের মাঠে যাবে, উঠান থেকে আরো ভেসে আরছে মা চাচিদের একসঙ্গে মাটির চুলায় ঈদের সেমাই রান্না করতে করতে গল্পের সেই মনমুগ্ধকর আওয়াজ, আরো ভেসে আরছে চারদিক থেকে মাইকে বলা সেই কথাগুলো, সম্মানিত মুসল্লিগণ, আজ পবিত্র ঈদের নামাজ সকাল সাড়ে আটটায় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, সবাইকে সময়মতো ওজু করে উপস্থিত হয়ে, সুন্দরভাবে কাতারে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে, ঈদের নামাজের আগে তাকবির পাঠ করতে থাকুন,আল্লাহু আকবার, এবং যাঁরা এখনো ফিতরা আদায় করেননি, নামাজের আগে তা আদায় করে নিন, মাইকের বলা সেই কথাগুলো একটু বেশিই ঈদের সকাল টা ফুরফুরে অনুভূতিতে গড়ে তুলে,ঈদের আনন্দটা বেড়িয়ে দিতে,

তাকবীর ঘুম থেকে উঠে আরাত কে রুমে দেখতে না পেয়ে গোসল করে এসে আরাতের দেওয়া সাদা পাঞ্জাবি পাজামা পড়ে আয়নায় সামনে বাবরি চুলগুলো পরিপাটি করলো,এবং ড্রেসিন টেবিলের উপর থেকে আতর নিয়ে শরীরে মাখতে লাগলো, ঠিক সে সময় দরজার সামনে থেকে গলা খাঁকারির শব্দ ভেসে এলো সঙ্গে ভেসে এলো মধুময় কন্ঠে সালাম , তাকবীর আতর শরীরে লাগাতে লাগাতে ভ্রু কুঁচকে পিছনে ফিরে তাকিয়ে সালাম এর উত্তর করতেই চোখ জুড়ে মুগ্ধতায় ছেড়ে গেলো,আরাত আজ সাদা সুতির কাজ করা শাড়িতে সাজিয়েছে, মাথার ভেজা চুলগুলো থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানিতে পিঠ আধভেজা হয়ে পিঠের সঙ্গে লিপটে আছে, হাতে তাঁর এক বাটি সেমাই আর এক গ্লাস পানি, তাকবীরের তাকিয়ে থাকার মধ্যে আরাত মুচকি হেঁসে পানির গ্লাস টা ড্রেসিং টেবিল এর উপর রেখে, সেমাই এর বাটি থেকে এক চামিচ সেমাই তাকবীরের মুখে পুড়ে দিয়ে বলল,

___” ঈদ মোবারক।
পুনরায় ডান হাত তাকবীরের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” আমার ঈদ সালামি কই?
তাকবীর সেমাই খেয়ে মুচকি হেঁসে আরাতের হাত থেকে সেমাই এর বাটি নিজের হাতে নিয়ে এক চামিচ সেমাই আরাতের মুখে পুড়ে দিয়ে টুপ করে আরাতের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” আর লাগবে সালামি?
আরাত চোখ বড়বড় করে তাকালো, তাকবীর অতি কাছে আসায় পুরুষালী শরীরের নিজস্ব ঘ্রান আর সুগন্ধির সংমিশ্রণ যেন এক নিমিষেই আরাত কে ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেলো, আরাত কে চোখ বড়বড় করে থমকে থাকতে দেখে তাকবীর দুষ্টু হেঁসে পুনরায় বলে উঠলো,
___” কী ম্যাম আরো চাই, স্পেশাল সালামি?
তাকবীরের কথায় আরাত নিজের হুঁশে ফিরলো, নিজের গালে তাকবীরের ঠোঁট ছুঁয়ে দেওয়া অংশে হাত দিয়ে স্লাইড করতে করতে মুখ ফুলিয়ে বলল,

___” উঁহু,নো চিটিং, আমার ঈদ সালামি চাই নট চুমু।
তাকবীর আরাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
___” কাছে আসো, সালামি পুষিয়ে দেই।
তাকবীরের কথায় আরাত দুপা পিছনে গিয়ে নাক ছিটকে তাকালো তাকবীরের দিকে, তাকবীর আরাতের চাহনি দেখে মুচকি হেঁসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ওয়লেট বের করে টাকা বের করতে লাগলো, এতে আরাতের মুখের অববরণ বদলে হাসি ফুটে উঠলো, ওয়লেট থেকে টাকা বের করে কয়েক জোরা নতুন কচকচে নোট বের করে আরাতের হাতে দিলো,

___” এবার খুশি?
আরাত খুশির বদলে ভ্রু কুঁচকে নোট গুলো উল্টো পাল্টে দেখছে, কেনো না, নোট গুলো এমন যে, দুই টাকা থেকে শুরু করে যত টাকার নোট আছে,পাঁচটা করে সব টাকার নোট এতে আছে, দুই পাঁচ দশ পঞ্চাশ একশ দুইশো পাঁচশ এবং এক হাজার টাকার নোট সবগুলোই পাঁচটা করে, সব মিলিয়ে নয় হাজার তিনশো পঁয়ত্রিশ টাকা।
আরাত অনেকটা সময় নিয়ে টাকা হিসাব করে চকচকে নোট গুলো নাড়াতে নাড়াতে মুচকি হেঁসে বলল,
___” খুশি।
আরাত কে খুশি হতে দেখে তাকবীর আরাত কে এক হাতে জরিয়ে ধরে কপালে আদুরে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
___” আমার পাগলি বউ ।
আরাত দু’হাতে তাকবীর কে জরিয়ে ধরল,দুজনের মুখে মুচকি হাসি, ঠিক তখনই দরজা দিয়ে মাহা পাপা পাপা বলে দৌড়ে রুমে ঢুকে গেলো, সঙ্গে সঙ্গে আরাত তাকবীর সিটকে দূরে সরে দাঁড়ালো, মাহা রুমে এসে মুখে হাসি রেখে ধীরে ধীরে বলল,

___” ঈদ মোবারক পাপা, এবার আমার সালামী দেও?
তাকবীর গলা খাঁকারি দিয়ে মেয়ের দিকে তাকালো, ছোট মাহা কে একদম পুতুলের মতো লাগছে, তাকবীর বিমোহিত হয়ে দেখল তাঁর অদুরে মেয়ে কে, আজ মাহা অন্য সাজে সেজেছে, মাহার পরনে আজ হালকা গোলাপি রঙা পাকিস্তানি সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা নজর কাড়ে সুক্ষ্ম সুতোর কারুকাজ করা, এত ছোট বাচ্চার শরীরে কাজকরা সালোয়ার কামিজ যেন মাহা কে অপরুপ মায়াবী লাগছে, সালোয়ার কামিজে মাথায় গোলাপি রঙের স্কাপ করা, তাকবীর মেয়ে কে কোলে তুলে নিয়ে গালে চুমু রেখে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
___” কারো রুমে ঢুকার আগে দরজায় নক করতে হয় মাম্মা, নেক্সট টাইম থেকে মনে থাকবে?
মাহা মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট গলায় বলল,
___”হ্যাঁ পাপা, নেক্সট টাইম মনে রাখবো।
তাকবীর পুনরায় ওয়লেট থেকে এক হাজার টাকার পাঁচটা নতুন চকচকে নোট বের করে মাহার সামনে ধরে বলল,
___” এটা আমার মাম্মার জন্য।
মাহা টাকা পেয়ে খুশিতে তাকবীরের গালে চুমু রেখে দিয়ে ” থ্যাঙ্ক ইউ পাপা। বলে কোল থেকে নেমে পুনরায় রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে গেলো, আরাত মাহা কে দৌড়াতে দেখে হাসতে হাসতে বলল,” আস্তে দৌড়াও মাম্মা ব্যাথা পাবে, তাকবীর আরাত দুজনের মুখেই হাসি, নামাজের সময় হয়ে যাচ্ছে, তাকবীর আরাত কে নিজের মুখের দিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখে দুষ্টু হেঁসে বলে উঠলো,

____” আই নো তোমার হ্যাববেন্ড একটু বেশিই হ্যান্ডসাম, তাই বলে তোমার ওই নেশাভরা চাহনি দিয়ে তাঁকে মেরে ফেলবে, তোমার নেশাভরা চাহনির প্রতি আমার ভরাশা নেই, জলদি একটা নজর টিপ লেগে দেও দেখি।
তাকবীর দুষ্টুমি করে কথাটা বললেও আরাত সিরিয়াস মুখে বলল,
___” তাই তো বলি কোথাও একটা কমতি লাগছে কেনো, আপনি ঠিক ধরেছেন অন সেকেন্ড।
আরাত ড্রেসিং টেবিলে কিছু একটা খুঁজতে লাগলো, তাকবীর আজব চোখে চেয়ে আছে, আরাত কী সত্যি সত্যি নজর টিপ লাগিয়ে দিবে নাকি, আরাত কাঙ্খিত জিনিস টা খুঁজে পেয়ে তাকবীরের সামনে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়ালো, আরাত কে দাঁত কেলিয়ে হাসতে দেখে তাকবীর ঢোক গিলল, সে কী তাঁর পাগল বউয়ের পাল্লায় পড়ে এখন কপালে নজর টিপ লাগিয়ে মাঠে যাবে নাকি, কথাটা ভাবতেই তাকবীর কপাল কুঁচকে বলল,

___” লাইক সিরিয়াসলি, তুমি কী পাগল?
আরাত তাকবীরের সিরিয়াস মুখভঙ্গি দেখে দুষ্টু হেঁসে বলল,
___” হ্যা, আপনার পাগল বউ না আমি?
আরাত কথাটা বলে হাত মুট করে তাকবীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, মুখে লেগে আছে দুষ্টু হাসি, তাকবীর নিজের কথায় নিজেই বিপদে পড়ে গেলো যেন, আরাত কে নিজের দিকে আগাতে দেখে তাকবীর আমতা আমতা করে বলল,
___” আরে পাগল, আমি তো তোমাকে আদর করে পাগল বলি, তুমি কী সত্যি সত্যি পাগল নাকি?
___” বউ কে পাগল বলে ডাকবেন, আর বউয়ের পাগলামি সহ্য করবেন না, এটা তো হবে না, দেখি এদিকে তাকান ?
তাকবীর মাথা পিছু হেলিয়ে আরাতের হাতের দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বলতে লাগলো,
___” রাত… নো, নো রাত।
তাকবীর এর শুঁকনো মুখ দেখে আরাত শব্দ করে হাসতে হাসতে,মুট করা হাত মেলিয়ে সুরমা তাকবীরের সামনে ধরে বলল,

___” এটা সুরমা, এদিকে তাকান তো দেখি?
আরাতের কথায় তাকবীর ছোট ছোট চোখে আরাতের হাতের দিকে তাকালো, হ্যা সত্যি সত্যি আরাতের হাতে ছোট একটা সুরমাদানি, তাকবীর এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো যেন, আরাতের হাসির দিকে তাকিয়ে তাকবীর আর কিছু বলল না,
আরাত মুখে হাসি রেখেই তাকবীর কে সুরমা চোখে লাগিয়ে দিতে চাইলো, কিন্তু বিপত্তি বেজে গেলো তাকবীর আরাতের থেকে লম্বা হওয়ায় আরাত তাকবীরের চোখে সুরমা লাগাতে পারছে না, মেঝেতে পা উঁচু করে বারবার সুরমা পড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো, শেষে না পেয়ে হতাশ হয়ে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বলল,
___” উফফ আপনি এতটা লম্বা, আপনাকে দেখতে দেখতে আমার মাথা ব্যাথা করছে।
এতক্ষণ তাকবীর চুপচাপ আরাতের কান্ড দেখছিলো, আর মুচকি মুচকি হাঁসতে ছিলো, আরাত কে ব্যর্থ হতে দেখে তাকবীর পুনরায় মুচকি হেঁসে আরাতের সামনে নিচু হয়ে শীতল কন্ঠে বলে উঠলো,

___” প্রবলেম নেই বউ, তুমি বললে তোমার সামনে ঝুঁকে যাবো ।
আরাতের বিরক্তিকর দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠলো, মুখে মনোমুগ্ধকর চাহনি ফুটে উঠলো, তাকবীর কে নিজের সামনে ঝুঁকতে দেখে আরাত মুচকি হেঁসে তাকবীরের চোখে খুব সাবধানে সুরমা লাগিয়ে দিলো,দৃশ্যটা দূর থেকে দেখলে যেন একেবারে শান্ত, কোমল একটা মুহূর্ত মনে হচ্ছে, চারপাশের কোলাহল যেন তাদের দুজনের কাছে এসে থেমে গেছে, আরাতের আঙুলের ছোঁয়ায় তাকবীরের চোখের পাতা কেঁপে উঠছিলো, কিন্তু তাকবীর একবারও জন্য নড়েনি, অদ্ভুত এক বিশ্বাসে স্থির হয়ে আছে, সুরমা লাগানো শেষ করে আরাত একটু দূরে সরে এলো, তাকবীর চোখ মেলে তাকাতেই তাদের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেলো, সেই দৃষ্টিতে না ছিলো বিরক্তি, না ছিলো তাড়াহুড়া, ছিলো শুধু একরাশ অনুভূতির নীরব বিনিময়, আরাত দূরে সরে পুনরায় তাকবীর কে পর্যবেক্ষণ করে হালকা হেঁসে বলল,

___”এখন একদম পারফেক্ট।
তাকবীর ভ্রু তুলে তাকাল, চোখে কৌতূহল আর ঠোঁটের কোণে হালকা মৃদু হাসি নিয়ে বলল,
___” তাহলে আগে আমি অপারফেক্ট ছিলাম?
আরাত কাঁধ ঝাঁকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
___” আমি তো সেটা বলিনি, তবে এখন চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করছে না।
আরাত কথাটা বলেই যেন নিজেই একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল, মুখ ফসকে সত্যি কথা বেরিয়ে যাওয়ায় লজ্জামাখা মুখখানা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো, ঠোঁটের কোণে লুকানো চাপা হাসি, তাকবীর এক পা এগিয়ে এলো, মুখে লেগে আছে দুষ্টুমি,
___” তাহলে তো বউয়ের মুগ্ধ চোখের চাহনি দেখতে, আমি সবসময় এমনই গুছানো থাকব ।
আরাত একটু লজ্জা পেলেও সেটা আড়াল করল তৎক্ষণাৎ, তাকবীরের পাঞ্জাবির কলারটা টেনে ঠিক করে দিয়ে দুহাতে তাকবীরের গলা জরিয়ে ধরে
ফিসফিস করে বলল,

___” উঁহু একটু অগোছালো হবেন,আপনাকে আমি যত্ন করে গুছিয়ে নিবো।
___” ভাইয়া সাড়ে আটটা বেজে গেছে, মাঠে চলো?
দুজনের কথাকথনের মধ্যে বাহিরে থেকে আনাস এর ডাক পরলো, আনাস এর ডাকে দু’জনেই একনজর দরজার দিকে তাকিয়ে পুনরায় দুজন একিউপরের দিকে তাকালো,আরাত চোখের ইশারায় মাঠে যেতে রুম থেকে বের হওয়ার ইশারা করে তাকবীর এর গলা ছেড়ে দিলো,তাকবীর মুচকি হেঁসে আরাতের নাকে নাক ঘেঁষে রুম থেকে বের হয়ে গেলো,

ঈদের দিন, নরম বিকেল চারদিকে একধরনের উৎসবের আমেজ লেগে আছে, নতুন কাপড়ের গন্ধ, দূরে কোথাও বাচ্চাদের হাসির শব্দ, আর হালকা বাতাসে ভেসে আসা রান্নার সুভাস, এই সুন্দর পবিত্র বিকেলটাকে উপভোগ করতে সবাই মিলে একসাথে ঘুরতে বের হয়েছে, সবাই বলতে তাকবীর, আরাত, তাকবীরের কোলে তাঁর আদুরে মেয়ে মাহা, তাকবীরের পাশেই আরাত, ছোট বীরাত এর হাত ধরে হাঁটছে, তাঁদের থেকে কয়েক হাত দূরে আনাস আইরা পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গল্পে মসগুল, আনাস এর কোলে এরান, তাঁদের পিছনে পার্থ আহিন গল্প করতে করতে হাঁটছে, পার্থ আজকে প্রথম গ্রাম ঘুরে দেখছে, গ্রামের ঠান্ডা আবহাওয়া শীতল করে তুলছে শরীর , চারদিকে সবুজ শ্যামল মুগ্ধ হয়ে দেখছে, আর কিছুক্ষণ পরপর আহিন কে বলছে এটা কিসের ক্ষেত এবং কিভাবে চাষ করা হয়,আহিন নিজেও সঠিক জানে না গ্রামের চাষবাস বিষয়ে, যতটুকু কাঁচা সবজি চিনে ততটুকুই পার্থ কে বুঝিয়ে বলছে, কাঁচা রাস্তায় নেই কেনো বড় গাড়ির চলাচল, শুধু মাঝেমধ্যে দেখা মিলছে দু’একটা রিকশা আর ভান আঁটো,আজকে পবিত্র ঈদের দিন বিধায় ছেলেমেয়ে রা ঘুরতে বের হয়েছে বলে হয়তো অন্য দিনের তুলনায় আজকে এত রিকশা আঁটোর দেখা মিলছে, রাস্তায় দুপাশে ধানের ক্ষেত, এবং মাঝেমধ্যে জমিতে লাগলো নানারকমের শাকসবজি গাছ, চারপাশের এত সবুজ শ্যামল যেন সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে দিয়েছে, পার্থ আহিনের সঙ্গে গল্প করতে করতে হটাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই পিছনে ফিরে তাকালো,

___” লেডি গুগল, তুই এত পিছনে কেনো?
পার্থর ডাকে মিম নিজের মধ্যে ফিরে এলো, মলিন বিষন্নতা ঘেরা মন, আজকে যেন নতুন করে জীবন কে নিয়ে ভাবছে মিম, কই আগে তো এমন মনে আসে নি, এত একাকীত্ব ঘিরে ধরছে কেনো, সেদিন আরশ গ্রাম থেকে যাওয়া পড়ে তাঁর আর দেখা মেলেনি, কই রুপালী বেগম কে তো খুব বড় মুখ করে বলল, আমি তো ফিরবেই, কই তাঁর তো দেখা মিলল না আর,
___ “কী রে, তুই আবার কোন দুনিয়ায় চলে গেলি?
পুনরায় পার্থর ডাকে মিম নিজের ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো,
___” হু হ্যা, কিছু না চল।

বলেই মিম আহিন পার্থ দের রেখেই হাঁটা ধরলো, আহিন পার্থ দুজন দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে পুনরায় দুজন হাঁটতে হাঁটতে, কয়েক মিনিট কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেঁটে নদী পাড়ে চলে এলো, হ্যাঁ সবাই মিলে একসঙ্গে নদীর পাড়ে নতুন তৈরি বাঁশের পুল দেখতে গিয়েছে, বিকালের দমকা হাওয়া সঙ্গে কয়েক জোড়া কাঁপল, নদীর পাড়ে বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে প্রেমময় কথায় বাস্ত, কেউ কেউ একি উপরের হাত ধরে বাঁশের পুল পার হয়ে নদীর ওপাড়ে যাচ্ছে, তাঁদের মধ্যে আনাস আইরা তাকবীর আরাত রাও যোগ হলো, যদিও তাকবীর চারপাশে এত কাঁপল দেখে নাক ছিটচ্ছে বারবার, তাকবীর এসবে অভ্যস্ত না, কিন্তু আজকে আরাতের আবদার ফেলতে পারলো না, নিজেও ভাবলো, গ্রামের এই অপরূপ দৃশ্য গুলো নিজ চোখে উপভোগ করতে, কিন্তু এখানে এসে চারপাশে এত কাঁপল দেখে তাকবীর বিরক্ত হয়ে গেলো, ভেবেছিলো ছেলে মেয়ে কে নিয়ে ভালো একটা সময় কাটাবে, কিন্তু চারদিকের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, না ছেলেমেয়ে কে নিয়ে বেশিক্ষণ থাকা যাবে না, নদীর ওপাড়ে ফুচকার দোকান, সবাই মিলে বাঁশের পুল পার হয়ে ওপাড়ে যাচ্ছে, আকাশটা মেঘলা,

শীতল বাতাস বইছে, সেই হালকা বাতাসে বাঁশের সরু পুলটা দুলছে , নিচে ধীর গতিতে পানি বইছে, সবাই সাবধানে একে একে পার হচ্ছে, পুল দুলাল কারণে ছোট মাহা এরান বীরাত তিনজনই ভয় পাচ্ছে, আরাত নিজেও কিছুটা ভয় পাচ্ছে, প্রথম বার এমন অদ্ভুত পুলে নদীর ওপাড়ে যাচ্ছে, যদিও তাকবীর ও প্রথম বার, আনাস আইরা সেম অনুভূতি, তাকবীর এক হাতে ছোট্ট মাহাকে কোলে জড়িয়ে রেখেছে, অন্য হাতে শক্ত করে ধরে আছে বীরাতের হাত, বীরাতও নিজের অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরাতের হাতের মধ্যে, আরাত ছেলের হাত আঁকড়ে ধরে আছে,যেন এটা ভরসার হাত,তিনজনের হাতের এই ছোট্ট চেইনটা যেন সাহসের বন্ধন, একজন আরেকজন কে ধরে রেখেই এগিয়ে যাচ্ছে নদীর ওপাড়ে, তাঁদের পিছনে আনাস আইরা, কিন্তু বিপদ লেগে যায় পার্থ কে নিয়ে, সাহস করে কয়েক পা এগুতেই পুলের মাঝখানে পৌঁছালে পুলটা একটু দুলে ওঠে, পার্থ নিচুু হয়ে নদীর ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে দুলতে দুলতে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে ,

___” আহ… আমার হাতটা শক্ত করে ধরো আমি পড়ে যাচ্ছি, আল্লাহ এবারের মতো বাঁচিয়ে নেও, আর কখনো নদী দেখতে আসবো না, না না মাই মিস্টেক, আর কখনো বাংলাদেশেই আসবো না, প্লিজ আল্লাহ সেভ মাই বডি।
পার্থর চিৎকারে সবাই হা হয়ে পার্থর দিকে চেয়ে আছে, সবার মুখে একি ভঙ্গি এত বড় একটা ছেলে হয়ে ভয়ে চিৎকার দিচ্ছে, এতক্ষণে তাকবীর আরাত আনাস আইরা ওপাড়ে নেমে গেছে, আহিন তো বাঁশের পুল দেখেই ছবি ওঠাতে ওঠাতে আগেই চলে গেছে, পার্থর চিৎকারের মধ্যে হাতের কেনো মেয়েলি হাতের নরম ছোঁয়া পেয়ে চিৎকার করা বন্ধ করে অবাক চোখে সামনে তাকালো, মিম পার্থ কে ভয় পেয়ে চিৎকার করতে দেখে মুচকি হেঁসে পার্থর হাত ধরে হাঁটতে লাগলো, পার্থ মিম কে দেখে মিমের হাত আটকে ধরে বাঁধা দিয়ে বলতে লাগলো,

___” আমি যাবো না, আমাকে ওই পাড়ে রেখে আয়, আমি আর যাবো না।
পার্থর কথায় মিম বলে উঠলো,
___” তুই না ছেলে, এই তাঁর নমুনা?
মিমের কথা যেন পার্থর ইগোতে আঘাত হানলো, তবুও মিম কে বুঝতে না দিয়ে আমতা আমতা করে বাচ্চাদের মতো বলে উঠলো,
___” আরে ভয় পাইনি আমি,সত্যি বলছি! কিন্তু পুলটা যেভাবে দুলছে, মনে হচ্ছে পা ঠিক রাখতে পারবো না, পুলের সঙ্গে মাথাটাও কেমন দুলছে।
মিম পার্থর দিকে তাকিয়ে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে পার্থর হাত টেনে সামনে হাঁটতে হাঁটতে বলল,

___” আরে ভয় পাস না তো,আমার উপর বিশ্বাস রাখ, আমি তোর হাত ছাড়বো না, প্রমিস শক্ত করে ধরে রাখবো।
পার্থ মিমের চোখে দায়িত্বের দৃঢ়তা দেখতে পেলো, নিচে দুলতে থাকা পুল, পানির ঢেউের ভয় সবকিছু যেন একটু একটু করে দূরে সরে যেতে লাগলো, পার্থর দৃষ্টি আটকে গেলো নিজের হাতের দিকে, মিম কতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে তাকে,সেই শক্ত মুঠোয় একটা অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা ছিলো, যেন কিছুতেই সে পড়ে যাবে না,পার্থ হালকা করে নিশ্বাস নিয়ে মিমের পিছনে হাঁটতে লাগলো, হাতের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধীরে বলে উঠলো,
___”ঠিক আছে, ছাড়িস না কিন্তু, আমি চেষ্টা করছি তুই পাশে থাকলে আমার জন্য সবকিছু ইজি হয়ে যাবে।
___” হুম চল।

অবশেষে ধীরে ধীরে ওপাড়ে পৌঁছে যায় দুজন, পায়ের নিচে শক্ত মাটি পড়তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে পার্থর মুখে, নদীর এপাড়ে আসতেই মিমের চোখ কপালে, মিম ছোট থেকে বাঁশের পুলে এপাড় ওপাড়ে ঘুরে অভ্যস্ত, কিন্তু এর আগে এত দোকানপাট দেখেনি মিম, এই সাত বছরে এত পরিবর্তন হতে দেখে নিজেও সবার সঙ্গে মুগ্ধ চোখে দেখছে সবকিছু, চারপাশে এত এত দোকান যেমন বাদাম, চটপটি
ঝালমুড়ি, ভুট্টা ভাজা পপকর্ন, চিপস, এত এত দোকান বসার কারণ আছে বৈকি, এই পুলে প্রতিদিন কেনো না কেনো কাঁপল ঘুরতে আসে,আজকে ঈদ উপলক্ষে একটু বেশিই দেখা যাচ্ছে, সেই সুভাতে দোকানপাট অনেক বসেছে অন্য দিনের তুলনায়, শুধু এখানে কাঁপল দের দেখা যাচ্ছে না, কিছু কিছু পরিবার দেখা যাচ্ছে, কেউ হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছে, কেউ আবার একে অপরকে নিয়ে হাসাহাসিতে মেতে উঠেছে, মাঝে মাঝে কারও হাসির শব্দ এতটাই জোরে ভেসে উঠছে যে পাশ দিয়ে যাওয়া মানুষও তাকিয়ে দেখছে, মেঘলা আকাশ টা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আরছে, তাকবীর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল,

___” বেশিক্ষণ থাকা যাবে না, যা করার ফাস্ট করো।
তাকবীরের কথায় আরাত চোখমুখ কুঁচকালো,
___” আমরা কী কেনো স্পেশাল মেশেনে এসেছি নাকি, যে দ্রুত ঘুরাঘুরি শেষ করবো?
আরাতের কথায় তাকবীর এক পলক আরাত কে কপাল কুঁচকে দেখে পুনরায় আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
___” তো কী করবে, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে।
___” নামতে দেন, বৃষ্টি এসে ধুয়ে নিয়ে যাক সকল অভিমান, না পাওয়ার সকল হতাসা আর ব্যর্থতা কে।
তাকবীর কিছুক্ষণ চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো আরাতের কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনলো, মেঘগুলো যেন সত্যিই ভার হয়ে আছে, তাকবীরের ঠোঁটে হালকা একটুখানি হাসি ফুটে উঠলো, আকাশের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,

___”বৃষ্টি যদি সব কষ্ট ধুয়ে নিয়ে যেতো, তাহলে মানুষকে এতটা শক্ত হতে হতো না।
আরাত শুনলো তাকবীরের কথা, তবুও মন মানতে নারাজ, আরাতের কাছে তো মন ভালো রাখার আরেক নাম প্রকৃতি, আরাত আশেপাশে তাকিয়ে তাকবীর কে আদেশের ন্যায় বলল,
___” শুনেন ঘুরাঘুরি মন কে রিফ্রেশ করে দেয়, প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করা, নতুন জায়গায় সঙ্গে পরিচয় হওয়া, এই মেঘলা আকাশ দমকা হাওয়া, চারপাশে মানুষের কোলাহল, চোখ বন্ধ করে অনুভব করেন,দেখবেন মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে।
তাকবীর এবার সামনে এগুতে এগুতে বলল,
___” থাক, অনেক প্রকৃতির সুখ নিয়েছেন, এবার সামনে চলুন।
___” হুম চলেন।
মেঘলা আকাশ দমকা হাওয়া, প্রতিটি দোকানে ভীড় জমেছে, কেউ ভাজাপোড়া খেতে খেতে নদীর পানিতে পা ভেজাচ্ছে তো কেউ পিক উঠাচ্ছে, কারো কারো মধ্যে বাড়ি যাওয়ার ভিষণ তাড়া দেখা যাচ্ছে, আরাত রা সবাই মিলে ফুচকার দোকানে ফুচকা খাচ্ছে, তাকবীর তাঁদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখছে, পুনরায় নদীর দিকে তাকিয়ে ধীর উপুড় হয়ে পায়জামা একটু উপরে তুলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো পানিতে পা ভেজাতে , নদীর বালু মাটিতে তাকবীরের ফর্সা পা জলজল করছে,আরাত ফুচকা খেতে খেতে দূরে দাঁড়ালো তাকবীরের দিকে তাকিয়ে, তাকবীর কে একা একা পানিতে পা ভেজাতে দেখে আরাত ফুচকার বাটি নিয়ে তাকবীরের কাছে এলো, তাকবীর আরাতের উপস্থিত বুঝতে পেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

___” শেষ, এবার বাড়ি চলি?
তাকবীরের কথায় আরাত ভ্রু অন্ধকার করে বলল,
___” কী তখন থেকে বাড়ি বাড়ি করছেন, আপনার বউ বাচ্চা তো আপনার সঙ্গেই।
আরাতের বিরক্তিকর কন্ঠে শুনে তাকবীর ফিক করে হেঁসে উঠলো, তাঁর বউ যে বেজায় রেগে গেছে, এতটুকু মেয়ের এত রাগ ভাবতেই তাকবীরের ভিষণ হাসি পেলো, তাকবীর কে হাসতে দেখে আরাত আরো তেতে উঠে বলল,
___”কী হলো, হাসছেন কেন?
তাকবীর এবার নিজের হাসি বন্ধ করে বলল,
___” আচ্ছা বাবা ঠিক আছে এত রাগতে হবে না, তোমাদের যত ইচ্ছা ঘুরাঘুরি করো, আমি ওয়েট করব নো প্রবলেম।
আরাত কিছুটা শান্ত হলো যেন,

___” হুম, এবার হা করেন।
তাকবীর কপাল কুঁচকে বলল,
___” হোয়াট হা?
আরাত একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে ইশারায় হা করে দেখিয়ে দিলো,
___” হা, হা, মুখ টা এভাবে হাহহহহ করেন।
তাকবীর আরাতের মুখের দিকে তাকিয়ে হা করল, আর সঙ্গে সঙ্গে আরাত ফুচকা টা তাকবীরের মুখে পুড়ে দিলো, তাকবীর তাজ্জব বনে গেল এতে, মুখ থেকে ফুচকা বের করতে নিলেই আরাত হুমকি দিয়ে বলল,
___” না না না একদম মুখ থেকে ফুচকা বের করবেন না, নয়তো আমার হাতের থাকা সবগুলো ফুচকা আপনাকে খাওয়াবো।
তাকবীর বাধ্যতামূলক চোখমুখ খিঁচে ফুচকা চিবাতে লাগলো, লাইফের ফার্স্ট টাইম এই ফুচকা নামে মেয়েদের ইমোশনাল খাচ্ছে তাকবীর, তাও কিনা বউয়ের হুমকি তে, আরাত তাকবীরের মুখের দিকে ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো ,

___” কেমন ?
তাকবীর আরাত এর কথায় স্বাভাবিক মুখেই উওর করলো,
___” নট ব্যাড, পুরাই তোমার মতো, টক ঝাল মিষ্টি।
আরাত লজ্জা পেলো বোধহয়, মাথা নিচু করে ধীর কন্ঠে বলল,
___” আরেকটা খাবেন?
___” নো একটাই এনাফ, একটা খেয়ে জীবন শেষ দুইটা খেলে সামলাবো কিভাবে।
তাকবীর এর কথায় আরাতের লজ্জিত মুখখানা ভাবনায় পড়ে গেলো, কথাটা কেমন যেন চিনাচেনা লাগছে, ফুচকা মানে আরাত কে বুঝালো, আর একটা খেয়ে জীবন শেষ মানে, উনি কী আরেকটা বলতে অন্য মেয়ে কে বুঝালো, কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আরাত চেচিয়ে উঠলো,

___” কীহহহহ, আমি থাকতে আপনি অন্য মেয়ে কে নিয়ে ভাবেন?
বলেই আরাত নিচু হয়ে কাঁদা মাটি তুলে নিয়ে তাকবীরের দিকে ছুড়ে মাললো, তাকবীর বুঝতে পারলো না হটাৎ আরাতের এমন উদ্ভট রিঅ্যাকশনের কারণ, আরাতের চিৎকার দেওয়ার কারণে আনাস আইরা মিম পার্থ সবাই আরাত আর তাকবীর এর দিকে তাকালো, মাহা আহিন কে বলল,
___” কাক্কু আমাকে মাম্মা পাপার কাছে নিয়ে যাও, মাম্মা পাপা আমাকে না নিয়ে খেলা করছে, আমিও খেলবো।
মাহা আহিনের কাছে বাহানা ধরলো, আহিন কী করবে বুঝতে না পেয়ে বীরাত আর এরান কে নিজের কাছে ডাকলো, আহিন ডাকার সঙ্গে সঙ্গে দুজন হাজির, আহিন দুজন কে বলল,মাহা কে নিয়ে খেলা করতে, আহিনের কথায় দুজন মাহার পাশে বসলো, মাহা তবুও বাহানা ধরে বলল,

___” না না কাক্কু, আমি মাম্মা পাপার কাছে যাবো।
মাহা কে বাহানা করতে দেখে এরান ধমকে উঠলো,
___” চুপপপপ, কানের কাছে বকবক করবি না, চুপ করে বস এখানে।
বলেই এরান মাহা কে কোলে তুলে একটা টুলে বসালো, মাহা ধমক খেয়ে মন খারাপ করে তাকালো, বীরাত এর দিকে, বীরাত নিজের বোন কে ধমক দিতে দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
___”আমার বোনের সঙ্গে তুমি এভাবে কথা বলবা না, আমি কিন্তু মণি কে বলে দিবো।
বীরাত এর কথায় এরান চুপ করে গেলো, আহিন আগেই পার্থর কাছে গেছে, দুজন একটার পর একটা পিক উঠাচ্ছে, তাকবীর আরাতের কথার মানে বুঝতে পেয়ে বলল,

___” হোয়াট ইস দিস রাত, এ-সব কেমন অসভ্যতা?
আরাত যেন আরো রেগে গেলো, রেগে পুনরায় কাঁদা মাটি তুলে তাকবীরের দিকে ছুড়ে মারলো,
___” অসভ্যতা না, আমার কাজ এখন অসভ্যতা মনে হচ্ছে তাইনা, আচ্ছা ঠিক আছে আজ আমি অসভ্য হবো।
তাকবীর এক ঝাঁকায় আরাত কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল,
___” ওকে ডান, চলো দুজন মিলে অসভ্যতা করে ফেলি।

কথাটা বলেই তাকবীর নিচু হয়ে কাঁদা মাটি তুলে আরাতের গালে মেখে দিলো, আরাত ভেবাচেকা খেয়ে কিছুপলক তাকবীরের মুখের দিকে চেয়ে আছে, তাকবীরের ঠোঁটের কোণে লেগে আছে মুচকি হাসি, আরাত কয়েক পলক ঝিম ধরে থেকে হটাৎই তাকবীর এর বুকে ধাক্কা দিয়ে তাকবীর কে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে হাসতে হাসতে নদীর পানি দু-হাতে ছিটাতে লাগলো, তাকবীর আজ নিজেও দিকবিদিক না দেখে তাঁর পাগল বউয়ের সঙ্গে পাগলামিতে মেতে উঠলো, আনাস আইরা মিম রা সবাই হা হয়ে তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর ঘরে আরাতের সঙ্গে হাসিখুশী দুষ্টুমি করলেও আজও পুরো পরিবারের সামনে সেই পুনোরো গম্ভীর আছে, কিন্তু আজকে যেন সবাই এই এক নতুন তাকবীর কে দেখছে, তাকবীর আরাত এর দেখা দেখি আনাস আইরা নদী তে নেমে গেলো, আরাত তাকবীর আনাস আইরা চারজনের এর মুখমণ্ডল শুরু কাদামাটি দিয়ে রাঙ্গানো, শুকনো জায়গা থেকে সেই হাসিখুশির সুন্দর মুহূর্ত গুলো উপভোগ করতে করতে আহিন একপর্যায়ে স্মৃতি হিসেবে ভিডিও করে রাখলো, এভাবে প্রায় ২০ মিনিট কেটে গেলো, তাকবীর ক্লান্ত হয়ে আরাত কে নিজের কাছে টেনে নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে আহিনের দিকে ছুরে মেরে বলল,

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি ঈদ স্পেশাল ১

___” পিক উঠা।
আহিন তাকবীর এর ফোন ক্যাশ ধরে হাসি মুখে পিক তুলতে লাগলো তাকবীর আর আরাতের, তাকবীর আজ নিজ থেকে অনেক পিক উঠালো, দুজনের নানারকম ভঙ্গিতে পিক তুলে, আনাস আইরা কেউ নিজের পাশে ডেকে চারজন পিক উঠালো, এভাবে একে একে তাকবীর আরাত বীরাত মাহা একসঙ্গে অনেক পিক উঠাতে লাগলো, বাদ পরলো না আহিন ও, আর সবগুলোর পিকের ক্যামেরাম হিসাবে পার্থ ছিলো, আরাত মিম কে ডাকলে মিম আসে না, চুপচাপ এক সাইটে দাড়িয়ে দেখছে সবকিছু, চারপাশে এত পূর্ণতা দেখে আজ যেন মিমের একটা কথায় মনে হচ্ছে, অতিরিক্ত ভালোবাসা আমাদের একদিন অতিরিক্ত একা করে দেয়।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৬৩