Home তুই আমার বিশ্বাস ছিলি তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৩

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৩

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৩
জান্নাতি আক্তার জারা

__” আমি হাসপাতালে যাবো। তুই মাহিরের সঙ্গে আড্ডা দে। মাহির প্লিজ রশ্মি কে একটা রিকশা ডেকে দিবেন?
আরাত মাহিরের উওরের আশা না করে দ্রুত পায়ে স্কুটির কাছে এসে স্কুটি নিয়ে দুজনের চোখের আড়ালে চলে গেলো। রশ্মি আরাতের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে চেয়ার থেকে উঠতে যাবে। মাহির রশ্মি কে বলে উঠলো,
___” প্লিজ উঠবেন না।
রশ্মি মাহিরের দিকে ছোট ছোট চোখে তাকালো। মাহির রশ্মি কে তাকাতে দেখে মুখে হাসি টেনে বলল,
___” সরি এভাবে বলতে চাইনি,প্লিজ বসুন না। আপনার ফ্রেন্ড আমাদের রেখে চলে গেলো। আপনিও এভাবে খাবার গুলো রেখে গেলে নষ্ট হয়ে যাবে প্লিজ?
রশ্মি মাহিরের কথায় বাধ্যতামূলক পুনরায় চেয়ারে বসে পরলো। এভাবে চেনা নেই জানা নেই অচেনা ছেলের সামনে বসে ভাজাপোড়া খেতে অস্বস্তিকর লাগছে। মাথা নিচু করে চুপচাপ ফুচকা মুখে তুলতেই মাহির আগ বাড়িয়ে কথা বলে উঠলো,

___” আপনি চুপচাপ থাকতে ভালোবাসেন রাইট?
রশ্মি ফুচকা মুখে তুলে আড়চোখে মাহির কে দেখলো। পুনরায় আশেপাশে তাকাতে তাকাতে ছোট্ট করে বলল,
___” জ্বি।
___” আপনার মায়াবী মুখটা বলে দিচ্ছে। আপনি শান্তশিষ্ট এবং চুপচাপ থাকতে ভালোবাসেন। ও সরি আমরা তো পরিচিত হইলাম না। বাই দ্যা ওয়ে মাই নেম ইজ মাহির,মেহেরব ইসলাম মাহির?
রশ্মি মাহিরের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকালো।পুনরায় মাহিরের দিকে তাকাতেই দেখলো মাহির মুখে মুচকি হাসি রেখে হাত বাড়িয়ে দিয়ে আছে। রশ্মি মুখে সৌজন্যমূলক হাসি টেনে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,
___” নাইস টু মিট ইউ প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড! আমাকে একটা রিকশা ডেকে দিবেন?
মাহির বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ফিরে নিয়ে মন ভার করে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

___” এখনই উঠবেন! থাকা যায় না কিছু মুহূর্ত?
___” সরি?
___” নাথিং, আমি কী আপনাকে লিভ দিতে পাড়ি?
রশ্মি যেন আশ্চর্য হয়ে তাকালো মাহিরের দিকে। আজকেই প্রথম পরিচয়। আর প্রথম পরিচয়ে অচেনা একটা মেয়ে কে বাইকে লিভ দিতে চাচ্ছে মাহির। আরাত রশ্মি কে একা রেখে যাওয়া তে আরাতের উপর বিরক্ত লাগলো রশ্মির। মাহিরের সামনে বিরক্ত প্রকাশ করলো না। স্বাভাবিক মুখে মাহির কে বলল,
___” নো থ্যাংকস! আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না প্লিজ একটা রিকশা ডেকে দেন?
___”আপনি আমার বাইকে বসলে আমার কষ্ট হত না। জীবন টা সার্থক হয়ে যেতো।
মাহিরের বিরবির বলা কথায় রশ্মি বুঝতে না পেরে জানতে চাইলো,

___” কিছু বললেন?
___” না কিছু না, এক মিনিট ওয়েট করুন আমি রিকশা ডেকে দিচ্ছি?
মাহির রিকশা ডাকতে গেলো। রশ্মি চুপচাপ কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে মাহির একটা রিকশাওয়ালা কে সঙ্গে নিয়ে আসলো। রশ্মি রিকশা তে ওঠে সিটে বসে শরীরের ওড়না ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। ওড়না দিয়ে মাথাটা সুন্দর করে ঢেকে নেওয়ার মধ্যে হটাৎ মাহিরের নেশাতূর কন্ঠ শুনে অবাক নয়নে তাকালো,
___”ইউ লুক ভেরি বিউটিফুল.
___” হোয়াট?
মাহির মুগ্ধতা মুখে রশ্মি কে দেখতে দেখতে পুনরায় রশ্মি কে বলে উঠলো,
___”আপনার বয়ফ্রেন্ড সো লাকি।
রশ্মি থমকে গেলো, পুরোনো ব্যাথা জেগে উঠতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থেকে চোখ টা বন্ধ করে নিলো। চোখের সামনে পুরনো এক টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠতেই বন্ধ চোখ খুলে বলল,

___”আই ডোন্ট হ্যাভ এ বয়ফ্রেন্ড।
___” থ্যাঙ্ক ইউ,জাস্ট এতটুকুই জানার ছিলো।
রশ্মি অবাক চোখে তাকালো মাহিরের দিকে। মাহিরের মুখে মুচকি হাসি। রিকশা চলতে লাগলো তাঁর আপন গতিতে। রশ্মি মাথা ঘুড়িয়ে মাহির কে আগের ন্যায় অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতেই দেখে । মাহির মুচকি হেসে মাথার চুলগুলোয় হাত বুলাতে বুলাতে চলন্ত রিকশার দিকে রশ্মি কে যতদূর দেখা যায় দেখতে লাগলো।

আনাস, শেখ বাড়ি থেকে ফিরে রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে পুরো রুম তচনচ করছে। মেঝে জুড়ে কাঁচের টুকরো বিছানার চাদর সবকিছু এলোমেলো। আনাস চাদর বিনা বিছানার উপরে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়ে রুমের ছাঁদের দিকে নিস্তব্ধ চোখে চেয়ে আছে। কাঁচ দিয়ে কেটে যাওয়া হাতের ছোট ছোট অংশের রক্ত গুলো শুকিয়ে জমাট বেঁধে যাচ্ছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। ফাঁকা ফাঁকা চোখে তাকিয়ে নিজের জীবনের হিসাবনিকাশ গুনতে ব্যস্ত। আহিন আলভী আনাস কে দুবার ডাকার পড়ে কেনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দুজন বন্ধ দরজা হাত দিয়ে জোরে জোরে ধাক্কাতে ধাক্কাতে চিল্লাতে শুরু করলো,

___” ভাইয়া দরজা খোলো, আইরা আপু অসুস্থ আপুকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, ভাইয়া…
কথাটা কানে পরতেই আনাস এর চোখের পাতা কাঁপতে লাগলো। হুট করে বিছানা থেকে উঠতে পারলো না। কথাটা যেন বারংবার কানে বাজতে লাগলো। ধীরে ধীরে বিছানা থেকে ওঠে অগোছালো পায়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালো। কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে দরজা খুলতেই আহিন ঝাপিয়ে পরলো আনাস এর উপরে। আহিন হটাৎ জাপটে জড়িয়ে ধরতেই দুপা পিছিয়ে গেলো আনাস। আহির আনাস কে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলল,
___” ভাইয়া দরজা খুলতে এত লেট করলে কেনো! আমি ভয় পেয়েছিলাম তুমি ঠিক আছো ?
আহিন আনাস কে ছেড়ে দিয়ে আনাস এর হাত-পা লক্ষ করতে লাগলো। আনাস আহিনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

___” আইরার কী হয়েছে! আইরা কই?
___” আরিশা আপু খাবারের প্লেট নিয়ে আইরা আপুর রুমে গেয়ে দেখে আপু মেঝেতে সেন্সলেস হয়ে পড়ে আছে। আপু আর ফুপি অনেক চেষ্টা করে আইরা আপুর সেন্স ফেরাতে না পেরে আপুকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে…
আনাস আহিনের কথার মধ্যে এলোমেলো পায়ে পুনরায় রুমের ভিতরে এসে বাইকের চাবি নিয়ে রুম থেকে এলোমেলো বড়বড় পায়ে বাড়ির বাহিরে চলে গেলো হাসপাতালের উদ্দেশ্য। আরাত আরিশা ইমারজেন্সি রুমের সামনে চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আনহা শেখ বেঞ্চে মাথা নিচু করে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। রাফি ডাক্তারের সঙ্গে জেদ ধরে ইমারজেন্সি রুমের ভিতরে আছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে তালুকদার বাড়ির সবাই কে ব্যস্ত পায়ে আসতে দেখা গেলো। আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার রাবেয়া তালুকদার আদিবা তালুকদার সঙ্গে আতিফ শেখ। পাঁচজনের পায়ের শব্দ। আরাত আরিশা সেদিকে তাকালো। রাবেয়া তালুকদার আনহা শেখের পাশে বসে আনহা শেখ কে আগলিয়ে নিলেন। আতিফ শেখের নজর ইমারজেন্সি রুমের দিকে। আজ বহুবছর পর এভাবে বাড়ির মেয়ের জন্য চিন্তিত মুখে ইমারজেন্সি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে সবাই। ঠিক এভাবেই। ঠিক এভাবেই একদিন দাঁড়িয়ে ছিলো তালুকদার বাড়ির বড়ো কর্তা আহসান তালুকদারের জন্য। সেদিন সবাই কে ব্যর্থ কান্নারত অবস্থায় ফিরতে হয়েছিল। এতবছর পর সেই ভয় আজকে বাড়ির মেয়ের জন্য সবার মুখে ফুটে উঠেছে। হয়তো এতবছর কারো জন্য হাসপাতালে পা ফেলতে হয়নাই এজন্য ভয়টা সবার চোখেমুখে। রাবেয়া তালুকদার আরিশার কাছে এসে জানতে চাইলো কী হয়েছিলো। আরিশা চিন্তিত মুখে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলল,

___” তোমাদের বাড়ির মেয়ে ভালো না মামনী। সে শুধু নিজের জেদ ইগো নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। আমার বোন আজকে পাঁচ-ছয় দিন থেকে খাবার টুকু ঠিকমতো খায় না সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে শুধু নিজের জেদ কে ভালোবাসে আমার বোন কে না।

আইরা পাঁচ-ছয় দিন থেকে ঠিক মতো খাবার খায় না কথাটা আতিফ শেখের কানে পরতে অবিশ্বাস্য চোখে তাকালো বড়ো মেয়ের দিকে। ভদ্রলোক প্রতিদিন মেয়ের খেয়াল রাখেন। মেয়ের জন্য রাতে বাড়িতে ফিরে খাবারের প্লেট সেজে তিনি নিজেই মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে আসেন। আতিফ শেখের বুঝতে অসুবিধা হলো না তিনি রাতে যতটুকু খাইয়ে দেন মেয়ে শুধু এতটুকুই খেয়ে থাকেন। মূলত কয়েকদিনে ঠিকমতো না খাওয়ার কারণে আইরার চিকন পাতলা শরীর টা দুর্বল হয়ে ছিলো। তারউপর আজকে না খাওয়া শরীরে চিৎকার দিয়ে কান্না করার ফলে হেলিয়ে পরেছে। আরিশা আইরার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শান্ত হয়ে গেছে ভেবে। আইরার জন্য খাবারের প্লেট সাজিয়ে আইরার রুমে আসতেই আইরা কে মেঝের মধ্যে নিশ্চুপ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে বোন বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। খাবারের প্লেটটা বিছানার উপর রেখে দিয়ে আনহা শেখ কে ডাকতে ডাকতে আইরা কে তুলতে লাগলো।

আনহা শেখ আরিশার চিৎকারে দৌড়ে মেয়ের রুমে এসে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দুজন মিলে আইরা কে বিছানায় শুয়ে দিয়ে সেন্স ফিরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধ্য হলো। এরমাঝে আরিশা রাফি আমান এবং তালুকদার বাড়িতে ফোন করে সবকিছু বলছে। তালুকদার বাড়িতে আতিফ শেখ এসেছিলো আহাদ তালুকদারের কাছে মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। আদুরে মেয়ের খবর কানে পরতেই তিনি ভেঙ্গে পড়েন। আহাদ তালুকদার আদনান তালুকদার সবাই মিলে আতিফ শেখ কে ধরে গাড়ি অবধি নিয়ে আসেন। হাসপাতালে এসে সবকিছু বড়ো মেয়ের মুখে শুনার পরে অর্ধাঙ্গিনীর প্রতি অভিমান থেকে অভিযোগের চোখে চেয়ে রইলেন আদুরে মেয়ের যত্নে খামখেয়ালী জন্য। হটাৎ ইমারজেন্সি রুমের দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে সবার নজর দরজার দিকে। ডাক্তার বেরিয়ে এলেন ডাক্তারের পেছনে রাফি মলিন মুখে বের হয়ে ডাক্তারের পাশে দাঁড়ালো। ডাক্তার কে বের হতে দেখে আতিফ শেখ ডাক্তারের কাছে এসে জানতে চাইলো,

___” ডাক্তার আমার মেয়ে, আমার কলিজা কেমন আছে,?
আতিফ শেখের আশাভরা প্রশ্নে ডাক্তার মাথা নিচু করে মুখ দিয়ে দুটো শব্দ উচ্চারণ করল,
___” আই এম সরি… সি ইস নো মোর
মেঝেতে কিছু পড়ার শব্দ সবাই পিছনে তাকালো। আনাস হাসপাতালের বাহিরে বাইক টা ফেলে রেখেই হাসপাতালের ভিতরে দৌড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে আইরার রুম খুঁজার মধ্যে। বাড়ির সবাই কে ইমারজেন্সি রুমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক দু পা করে আসতে নিলেই ডাক্তারের কথাটা কানে এসে বারি খেলো। সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে হাঁটু ভেঙ্গে ভেঙে পরলো। মুখে কোনো কথা নেই ফাঁকা চোখে ইমারজেন্সি রুমের দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু। আদনান তালুকদার ভাতিজার কাছে এসে বসে আগলে নিলেন আনাস কে। আতিফ শেখ নিস্তব্ধ চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আছে। আনহা শেখ নিজেকে সামলাতে না পেয়ে দৌড়ে ডাক্তারের কালার চেপে ধরে কান্না জরানো কন্ঠে বলে উঠলো,

___” আপনার মাথা ঠিক আছে তো ডাক্তার! আমার মেয়ের কিছু হয়নাই। একদম বাজে কথা বলবেন না। আপনাকে আমি পুলিশে দিবো আপনি মিথ্যা বলছেন। আমি আপনাকে জেলের ভাত খাওয়াবো। রাফি তুমি তো ভিতরে ছিলা তাই-না! তুমি বলো আমার মেয়ের কিছু হয়নাই। ডাক্তার মিথ্যা বলছে?
রাফি এতক্ষণ মলিন মুখে আনাস এর দিকে তাকিয়ে ছিলো। আনহা শেখের কথায় সবাই কে একনজর দেখে নিয়ে পুনরায় আনহা শেখের দিকে তাকালো। সবার চোখে পানি বয়ে যাচ্ছে। আরিশা চিৎকার দিয়ে কান্না করছে। আতিফ শেখ এখনো অবিশ্বাস্য হয়ে ডাক্তারের দিকে চেয়ে আছে। রাফি সবার ভেঙ্গে পড়া দেখে আনহা শেখ কে শান্ত করতে বলে উঠলো,

___” আন্টি প্লিজ শান্ত হন, এভাবে ভেঙ্গে পড়লো চলবে না প্লিজ আন্টি শান্ত হন?
___” আমি শান্ত আছি, তুমি বলো ডাক্তার মিথ্যা বলছে! আমার মেয়ের কিছু হয়নাই। আমি, আমি আনাস এর সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো। একবার বলো সবকিছু মিথ্যা। আমি শুধু আমার মেয়েকে চাই আর কিছু না, বলো সব মিথ্যা। আনাস বাবা আমি তোর সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো।
আনহা শেখ রাফি কে ছেড়ে আনাস এর কাছে গেলো। সবাই চোখে পানি নিয়ে আনহা শেখের দিকে তাকিয়ে কান্না করছে। আশেপাশে বাহিরের দু এক জন তাঁদের ঘিরে কান্না দেখতে লাগলো। আনহা শেখ আনাস এর সামনে বসে আনাস এর গালে হাত রেখে কান্না করতে করতে বলল,
___” আনাস আমি তোর সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে দিবো। আমার মেয়ে কে বল আমি ওকে খুব ভালোবাসি। আমিও ভালো মা,আমিও ওর ভালো মা।

___” আই এম সরি আন্টি আপনাদের কষ্ট দেওয়ার জন্য। আমি মানছি আপনাদের মিথ্যা বলা আমার ঠিক হয়নি। আপনাদের এতটা কষ্ট দেওয়ার জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত। আইরা একদম ঠিক আছে। ওর কিছু হয়নাই।
সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে তাকালো রাফির দিকে। রাফি সবার নজর দেখে নিয়ে মাথাটা নিচু করে নিলো। বিস্মিত হয়ে তাকানোর মধ্যে ডাক্তার ভয় ভয় মুখে বলে উঠলো,
___” আই এম সরি আমাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করেছে এই ছেলেটা। আমার একটা মিথ্যা বলার উপর আপনাদের ফ্যামিলির ভালো থাকা নির্ভর করছে। এ-সব বুঝিয়ে আমাকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করছে। আপনাদের মেয়ে একদম ঠিক আছে কিছুদিন রেস্ট আর ঠিকমতো খাবার খেলে পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। প্লিজ আপনারা থানা পুলিশ করবেন না। এতে আমাদের হাসপাতালের বদনাম হবে?

ডাক্তারের কথায় সবার কান্না বন্ধ হয়ে গেলো। চোখেমুখে আশার আলো খুঁজে পেলো। আনহা শেখ মেঝে থেকে উঠে দু’হাতে চোখের পানি মুছে হাসি মুখে ইমারজেন্সি রুমের ভিতরে চলে যেতে নিলেন। ডাক্তার বাঁধা দিতে যাবে আহাদ তালুকদার রাগী গলায় ডাক্তার কে পুলিশের ভয় দেখিয়ে বাঁধা দিলেন। ডাক্তার রাফির উপর রাগী চোখে তাকিয়ে শুধু আনহা শেখ আর আদনান তালুকদার কে ভিতরে যেতে দিলেন। এতক্ষণ যাবত আইরা ইমারজেন্সি রুমে দরজার সামনে সামান্য কাঁচের ফাঁকা অংশ দিয়ে নিজের পরিবার কে দেখছিলো। আইরার নিজেকে ঘিরে পরিবারের কান্না গুলো শুধু রাফির কথায় এতক্ষণ হজম করে বসে ছিলো ।
রাফি প্রথম থেকেই জানতো আইরার সেন্স হারিয়ে ফেলছে। সেন্স ফিরলে ডাক্তার বড়জোর কয়েকদিন রেস্টে থাকতে বলবে। রাফি নিজেকে জুনিয়র ডাক্তার দাবি করে জেদ ধরে অনেক বুঝিয়ে ইমারজেন্সি রুমে ডাক্তার দের সঙ্গে ছিলো। আইরার যখন সেন্স ফিরে এসেছে আইরার বেডের পাশে বসে নরম সুরে বলে উঠেছিল,

___” এই বোকা মেয়ে এমন কেউ নিজেকে কষ্ট দেয়! আমাকে বলতেন! আমাকে আপনার এতটা স্বার্থপর মনে হয়?
রাফির কথায় মলিন মুখে আইরা এক চিমটি হেঁসে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
___”আপনি স্বার্থপর কি-না জানি না। যেখানে নিজের মা তার মেয়েকে বুঝতে পারে না। সেখানে অন্য কে বলেই বা কী হবে।

___” হুম বুঝলাম আন্টির উপর অভিমান জমে গেছে এত বড় মেয়ে হয়ে অভিমান মানায় না বুঝলেন?
রাফির মুচকি হেঁসে বলা কথায় আইরা মলিন মুখে পুনরায় বলে উঠলো,
___” যারা অভিমান বুঝে না তাঁদের উপর অভিমান করাই বোকামি। আর আমি এই বোকামি বারবারই করে এসেছি।
___” অভিমান করবেন না আন্টি কিন্তু আপনাকে অনেক ভালোবাসে শুধু প্রকাশ করে না।
___” ভালোবাসা প্রকাশ করতে হয় না। ব্যবহারে। বুঝা যায়।
___” হ্যাঁ ঠিক বলছেন ভালোবাসা ব্যবহারে বুঝা যায়। তবে নীরবতায় লুকিয়ে থাকে ভালোবাসা। যেটা বুঝার ক্ষমতা সবার থাকে না। ভালোবাসা কে মাফ করে আগলে রাখতে হয়। আপনি যখন কাউকে ভালোবাসবেন তখন ভালোবাসার মানুষের সুখ কে নিজের সুখ মনে হবে। ও সরি আপনি তো একজন কে ভালোবাসেন। আমিই পাগল ভালোবাসা কে ভালোবাসা শেখাতে এসেছিলাম।
আইরা, রাফির মলিন হেঁসে বলা কথায় অন্য দিকে তাকালো। রাফি মুচকি হেঁসে সিরিয়াস হয়ে বলে উঠলো,

___” শুনেন বিয়ান আমি এখন যা যা বলবো। আপনি চুপচাপ সবকিছু শুনে যাবেন। একদম আবেগি হয়ে বের হয়ে আসবেন না।
আইরা কিছু বলতে নেবে রাফি আইরা কে কথা বলতে দিলো না। রাফি জায়গা থেকে উঠে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলল। ডাক্তার প্রথমে রাজি ছিলো না রাফি অনেক রিকোয়েস্ট করে বুঝিয়ে বলার পড়ে ডাক্তার রাজি হয়েছিলো। ডাক্তার রুম থেকে বের হয়ে যেতে রাফি দরজার সামনে এসে। মাথাটা ঘুরিয়ে আইরা কে একবার দেখলো। মুখে মুচকি হাসি।

___”হয়তো বারবার দেখা হবে আমাদের। কিন্তু আমি আর কখনো ভালোবাসা ভরা চোখে আপনার দিকে তাকাবো না।
আইরা রাফির দিকে তাকালো। যে তাকানো তে নেই কোনো ভালোবাসা। নেই কোনো অনূভুতি। শুধু আছে ক্ষমা করবেন। রাফি মেঝের দিকে তাকিয়ে একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেললো। ঠোঁটের কোনে এক চিমটি মলিন হাসি নিয়ে পুনরায় বলে উঠলো,

___” আপনি আমাকে পেয়েও চাননি। আর আমি আপনাকে চেয়েও পাইনি। কী নির্বোধ আমি তাইনা! আমি নিজের হাতে আমার ভালোবাসার ইতি টানলাম। নতুন জীবনে সুখে থাকবেন।
রাফি বের হয়ে গেলো আইরা সেই থেকে দরজার কাঁচের ফাঁকা অংশ দিয়ে পরিবারের আর্তনাদ দেখছিলো। আনহা শেখ ইমারজেন্সি রুমে ঢুকতেই আইরা মলিন মুখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। আনহা শেখ দৌড়ে গিয়ে মেয়ে কে জরিয়ে ধরে চুমু রেখে দিলেন। মুখ দিয়ে কথা বের করলেন না। আইরা দু’হাতে জরিয়ে নিলো আনহা শেখ কে। একে একে রুমের ভিতরে সবাই ঢুকে গেলো। সবাই কিছু না কিছু বলছে। আইরা শুধু মায়ের বুকে মাথা রেখে সবার কথায় হুম হ্যাঁ করছে। আতিফ শেখ দূরে দাঁড়িয়ে মেয়ে কে দেখছেন শুধু। আনাস কে এখনো আগের ন্যায় হাঁটু মুড়ে বসে কেবিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাফি। আনাস এর কাছে এসে এক হাঁটু ভাজ করে বসে পরলো। রাফি আনাস এর সামনে বসার সঙ্গে সঙ্গে আনাস রাফি কে দুহাতে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো।

___” থ্যাংকস,থ্যাংকস আমাকে আমার নিঃশ্বাস ফিরে দেওয়ার জন্য।
রাফির চোখ বন্ধ হয়ে এলো। চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে দুফোঁটা পানি গাল বয়ে গড়িয়ে পরলো। দুজনের চোখেই পানি। কারো পাওয়ার তো কারো হারানোর। রাফি হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে আনাস এর পিটে হাত রেখে মলিন মুখে বলল,
___” যে আমার নসিবে কখনো ছিলোই না। তাকে ফিরিয়ে দিবো কিভাবে! কতটা লাকী তোমার ভাগ্যটা। তোমার ভাগ্যেই সে আছে আমার ভাগ্যই নেই।
আনাস রাফি দুজনেই দাঁড়িয়ে গেলো। রাফি মুচকি হেঁসে আনাস এর কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালো। আহাদ তালুকদার কেবিন থেকে বের হয়ে আসলেন। আনাস কে রাফির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আনাস এর উদ্দেশ্যে বললেন,
___” আমি না ফিরা পর্যন্ত এখান থেকে একপা নড়াচড়া করবে না।
আহাদ তালুকদার যেমন ভাবে এসেছিল। একিভাবেই হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গেলো। আনাস রাফি কিছুই বুঝলো না। আহাদ তালুকদার প্রায় পনেরো মিনিট পড়ে একটা কাজি কে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসলেন। আনাস রাফি যা বুঝার বুঝে গেলো। আহাদ তালুকদার আনাস এর সামনে এসে বলল,

___” কোনো কথা বলবে না চুপচাপ আমার সঙ্গে চলো।
আনাস অবাক চোখে দাঁড়িয়ে থাকলো। আহাদ তালুকদার কেবিনের সামনে এসে আনাস কে আসতে না দেখে পিছু ফিরলেন,
___” দাঁড়িয়ে আছো কেনো! কথা কানে যায় না তোমাকে কী বোবা অ্যাটাক করেছে?
আনাস রাফির দিকে তাকালো। রাফির চোখ কাজির হাতে কাগজ গুলোর উপর। আনাস রাফির দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিলো। রাফি কাগজগুলো থেকে চোখ ফিরিয়ে আনাস এর উপরে রাখলো। মুখে মলিন হাসি দিয়ে ছোট করে বলল,
___” শুভকামনা ব্রো তোমাদের জীবন টা সুখময় হয়ে উঠুক। একি উপরের ঢাল হয়ে কেটে যাক বহুবছর।
___” যেখানে তোমার দোয়া আছে সেখানে আমাদের সুখময় জীবন টা পরিপূর্ণতায় রয়ে যাবে সারাজীবন।
___” ইনশাআল্লাহ ভালো থাক ভালোবাসা।
___” আমার সঙ্গে থাকবে না?
___” ব্রো আমি এখানেই ঠিক আছি। তুমি জলদি যাও তোমার জন্য কেউ একজন ওয়েট করছে।

রাফি প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ালো। আহাদ তালুকদারের পুনরায় ডাক পড়লো। আনাস দু এক পা করে কেবিনে দিকে যেতে লাগলো। বুকের মধ্যে ধুকপুক হচ্ছে অদ্ভুত এক অনুভূতি। আনাস কেবিনের সামনে এসে পুনরায় মাথা ঘুরিয়ে দেখলো একবার রাফির দিকে। রাফি আনাস কে পিছনে তাকাতে দেখে মলিন মুখে মুচকি হাসি দিলো। আনাস রুমের ভিতরে ঢুকতেই সবার চোখ আনাস এর উপর। আনাস সবার চোখ কে অগ্রাহ্য করে আইরার দিকে তাকিয়ে। আইরা আনাস কে আসতে দেখে পূর্ব থেকেই মায়ের বুকে মাথা গুঁজে আনাস এর দিকে তাকিয়ে ছিলো। আনাস এসে আরিশার পাশে দাঁড়াতেই আরিশা আনাস এর হাত ধরে বেডে আইরার পাশে বসালো। আনহা শেখ আইরা কে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আইরা মুখে লজ্জা নিয়ে মাথা নিচু করে হাত কাচলাতে লাগলো। আনাস একনজর আইরা কে দেখে সবার উদ্দেশ্য বলল,

___” হাসপাতাল কে কমেডি সেন্টার না বানিয়ে এ-সব বাড়িতে করা যেত।
আনহা শেখ, আতিফ শেখ, আদনান তালুকদার আহাদ তালুকদার, চারজন মিলে কাজির সঙ্গে বিয়ের কাগজ গুলো দেখতে লাগলো। আদিবা তালুকদার ছেলের কথা ধরে উঠলেন,
___” আমি আমার বউমা কে, একেবারে তালুকদার বাড়ির বউ রুপে প্রবেশ করাবো। তোমার সমস্যা কই তুমি চুপচাপ বসে থাকো।
আদিবা তালুকদারের শাসনে আনাস ভ্রু কুঁচকে সবাই কে দেখতে লাগলো। সবাই মিটিমিটি হাসছে। আনাস আরচোখে আইরার দিকে তাকালো। আইরা লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। আনাস সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আইরা কে দেখতে লাগলো। রাফি এতকিছু বাহিরে দাঁড়িয়ে দেখছে। বুকের মধ্যে মুচড়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে সবকিছু। আরাত কেবিন থেকে বের হয়ে এসে রাফির পাশে দাঁড়ালো। দুজনের চোখ সামনে আনাস আর আইরার বিয়ের প্রিপারেশন উপর। রাফি বলে উঠলো,

___” বলেছিলাম না! তোমার বোন কে সর্বোচ্চ সুখী করতে আমাকে যদি পুড়াতে হয় আমি পুড়বো! আমি আমার কথা রেখেছি। আমার মুখে হাসি থাকলেও অন্তর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
___” আজকের প্ল্যান তো আমাদের লিস্টে
ছিলো না ভাইয়া?
রাফি সামনে চোখ রেখেই আরাতের কথার উত্তর করলো,
___” মাঝেমাঝে এমন কিছুর সামিল হতে হয়। যা কখনো ইচ্ছার বিপরীতে চলে যায়। ঠিক আজকের সিচুয়েশন টাও এমন রুপে এসে ছিলো। সিচুয়েশন যেমনি হোন মূল উদ্দেশ্য এসে পৌঁছেছে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩২

আইরা আনাস এর বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে গেলো তাও আবার হাসপাতালে বেডে। ব্যাপারটা ফানি শুনতে হলেও পরিস্থিতি আর ফ্যামিলির জোরপূর্বক চাওয়া তে হাসপাতালে পবিত্র কাজটা হয়ে গেলো। ডাক্তার এতক্ষণ পুলিশের ভয়ে বিরক্ত হয়ে সবকিছু সহ্য করে গেলেন। আশেপাশে কিছু মানুষ এতে বেশ বিরক্ত। হাসপাতালে অনাগর মানুষের আনাগোনা চলতেই আছে। কেউ কান্না করছে তো কেউ নতুন আগন্তুকের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সেখানে তালুকদার বাড়ির এত জ্ঞানী মানুষ হয়ে আহাদ তালুকদার আর আদনান তালুকদার। নিজেদের ছেলেমেয়ে বিয়ে হাসপাতালে বেডে দিচ্ছে।

তুই আমার বিশ্বাস ছিলি পর্ব ৩৪