চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩১
আরোবা চৌধুরী আরু
সায়মানের অটল দখলদারিত্বে নাফিসার সমস্ত শরীরের ভর ছেড়ে দিল।
সায়মান দুই হাতে আগলে নিল নিজের পিচ্চি পুতুলকে।
কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলেও আবারও নাফিসার অধরে নিজের অধর মিলিয়ে দিল।
নাফিসা ঠিকমতো শ্বাস নেওয়ারও সুযোগ পেল না—এর মধ্যেই আবার হামলে পড়ল সায়মান ওর ঠোঁটের ওপর।
দীর্ঘ সময় পরে অবশেষে নাফিসাকে ছাড়ল সে।
তারপর বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আলতো করে মুছে দিল নাফিসার ভেজা ঠোঁট।
নাফিসা ছাড়া পেয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগল।
চোখ বুজে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নাফিসা।
সায়মান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
—— “তোমার রুমে যাও… আর সকালে তুমি আমার সাথে যাবে। মনে থাকে যেন।”
নাফিসা এবার চোখ মেলে তাকাল সায়মানের দিকে।
মুহূর্তেই রাগে মাথা গরম হয়ে উঠল—
—— “আমি নিজে এসেছি নাকি? আপনিই তো টেনে নিয়ে এসে…।”
বাকিটা আর বলতে পারল না, চুপ করে গেল।
সায়মান ওর এই চুপ করে যাওয়া দেখে ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে নিল।
—— “হুম… কি বলছিলে? এখানে টেনে নিয়ে এসে তারপর কি বল…?”
রাগে আর লজ্জায় চোখ রাঙিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—
—— “আপনার মাথা…!”
কথাটা বলে এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল সায়মানের ঘর থেকে ।
ওর চলে যাওয়ার দিকেই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সায়মান।
গভীর স্বরে বলে উঠল——
—— “কালকে কিন্তু আমার সাথে যাবে… মাথায় থাকে যেন।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সকালবেলা, নাফিসা বসে নাস্তা করছে । সামনে চেয়ারে বসে আছে সায়মান। বাড়ির বাকিদের মধ্যে কারো কারো নাস্তা হয়ে গেছে, আর ছোট সদস্যরা বেশিরভাগই এখনো ঘুম থেকে উঠেনি—— গত রাতের দেরি ঘুমের কারণে।
নাফিসা খাওয়া শেষ করে দাঁড়ালো। একবার সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল, সায়মান কফির মাগে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে। নাফিসা আফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল——
“মামনি, আমি তাহলে যাই।”
বেগম হেসে মাথা নাড়ালেন, “সাবধানে যা।”
নাফিসা ঘুরে চারপাশে তাকাল—সায়মান আর নেই। এই তো এখনই এখানে ছিল আবার এটুকুর মধ্যে, কোথায় চলে গেল । আজকে তো কলেজে তাকে ড্রপ করবে বলে বারবার মাথা খাচ্ছিল । এই লোক কি কী রহস্য মাথায় নিয়ে ঘোরে, আল্লাহ মাবুদ মোওলা জানে!
ভাবনার মধ্যে হাটা শুরু করলো । পরীক্ষার আর বেশি দিন নেই কলেজ যাওয়া জরুরী,, এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে । গ্যারেজের দিকে তাকিয়ে দেখল, ড্রাইভার কাকা বসে আছে চেয়ারে। রোজ উনি ওকে কলেজে ড্রপ করে দিয়ে আসে,, নাফিসা এগিয়ে গিয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল ———
“মতিন কাকা, তাড়াতাড়ি চলো, লেট হয়ে যাচ্ছে।”
মতিন কাকা চেয়ার থেকে উঠে নাফিসার দিকে তাকিয়ে
বলল,, —— সায়মান বাবা যে বলল, আমাকে আর যেতে হবে না উনি তোমাকে সাথে করে নিয়ে যাবে। বাইরে অপেক্ষা করছে গিয়ে দেখো তোমার জন্য।
নাফিসা চমকে গেল,,এই লোক তো কেবল ভিতর ছিল এইটুকুর মধ্যে আবার বাইরে এসে গাড়ি বের করা হয়ে গেছে। তারপর মতিন কাকার দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা।”
বাইরে গিয়ে দেখল, সায়মান গাড়িতে আগেই বসে আছে, ড্রাইভিং সিটে। জানালা খুলে চোখে ইশারা করছে—দ্রুত গাড়িতে বসার জন্য।
নাফিসা কোনও কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে পিছনের সিটের দরজায় হাত দিলেই, সায়মান সামনের দিকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“ফ্রন্ট সিটে এসে বসো, তাড়াতাড়ি ।”
নাফিসা কথা শুনেও কান নিল না, পিছনের সিটে বসে পড়ল।
নাফিসা এভাবে সায়মান কথা ইগনোর করে পিছনে সিটে বসাই সায়মান দাঁতের দাঁত চিপে বলল—
“ইডিয়েট, সামনে বসতে বলেছি, আমার পাশে। আর একটা বেশি কথা খরচ করাবে না। চুপচাপ পাশে বসো। দিন দিন তুমি প্রচন্ড লেভেলের জেদি হচ্ছো।”
নাফিসা প্রথমে ধমক শুনে কিছুটা চমকে গেলেও, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই রাগে মাথা গরম হয়ে উঠল। দরজা খুলে বেরিয়ে পিছনের সিটের দরজা জোরে ধাক্কা দিয়ে অফ করলো। তারপর ফ্রন্ট সিটে এসে বসতে বসতে বিড়বিড় করে বলতে থাকলো…
“তাই তো বেশি কথা খরচ করবেন কেন? নিজে তো অর্ধেক কথা মুখের ভিতরে রেখে অর্ধেক কথা বলেন।”
নিজের সিটবেলটা বেঁধে বাইরে তাকিয়ে রইল।
সায়মান ওর বিড়বিড় করা দেখে বলল, “কি বিড়বিড় করছো স্পষ্টভাবে বলো “।
আগে নিজে স্পষ্টভাবে কথা বলতে শেখেন তারপর আমাকে বলতে এসেন, স্পষ্ট ভাবে কথা বলার জন্য দাঁতে দাঁত চেপেআবার বিড়বিড় করে বলল।
এই কি,,বির বির করছ আবার!
নাফিসা দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল—“কিছু না।”
সায়মান চুপচাপ ওর কার্যক্রম দেখল। আর কিছু বলল না। নাফিসা ঠিকঠাক বসতেই গাড়ি স্টার্ট দিল ।
রাস্তা জুড়ে চুপচাপ থাকা—দুইজনই কোনো কথা বলল না।
গাড়ি এসে থামল কলেজের সামনে। নাফিসা তাড়াহুড়ো করে সিটবেল খুলে বেরোতে গেলে, সায়মান হাত ধরে টান নিল। হঠাৎ হাতে টান লাগায় নাফিসা ভার সামলাতে না পেরে পড়ে গেল সায়মানের বুকের উপর ঠাস করে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে সায়মানের গায়ের ঘ্রাণ নিজের নাক দিয়ে নেওয়া শুরু করল ও।
কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দিল না সায়মান, নাফিসার বাহু ধরে টেনে তুলে নিজের মুখোমুখি আনলো নাফিসার মুখটা।
“কলেজ ছুটি হওয়ার পর এখান থেকে এক পা নড়বে না। যতক্ষণ না আসবো, সাবধানে থাকবে, গট ইট?”
বললেই নাফিসার ঠোঁটে শুকনো একটি চুমু এঁকে দিল, তারপর ছেড়ে দিল।
ছাড়া পেতেই নাফিসা কোনও দিকে না তাকিয়ে , গাড়ির দরজা বেরিয়ে খুলে কলেজের ভিতরে ঢুকে গেল। এই লোক যখন তখন তার ঠোঁটে আক্রমণ করে বসে।
সায়মান ওর দিকে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না নাফিসা ভিতরে ঢুকছে। তারপর নিজেও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল।
কলেজের ভেতরে ঢুকতেই মেহরিন আর মেহরাব দুইজন দৌড়ে এলো।
মেহরিন প্রথমেই ঝাঁপিয়ে পড়ে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরল,
—— “এই যে মেয়ে, এত লেট করলি কেন? জানিস আমরা কতক্ষণ ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি?”
পাশে দাঁড়িয়েই মেহরাব কথাটা যোগ দিল,
—— “হ্যাঁ রে, এত দেরি করলি কেন? আমরা তো বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম।”
নাফিসা মেহরিনকে আলতো করে নিজের থেকে সরিয়ে নিয়ে বিরক্ত চোখে তাকাল ওদের দিকে।
—— “তোরা দু’জন আমার সাথে কথা বলবি না। তোদের এত করে বললো রিশা আপি যাইতে আর তোরা কি করলি আসলি না। রিশা আপু কত মন খারাপ করেছিল জানিস তোরা ?”
একসাথে দুজনেই মাথা নিচু করে সরি বলে উঠল।
নাফিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,
—— “আচ্ছা ভালোই করেছিস, আসিসনি। তোদের একটা বড় খবর দেওয়ার আছে । জানিস, রুহি আপুর বিয়ে হয়ে গেছে গতকাল… রায়হান ভাইয়ের সাথে।”
মুহূর্তের মধ্যে মেহরিন আর মেহরাব দুজন একসাথে চিৎকার দিয়ে উঠল,
—— “কি——!”
নাফিসা দুহাতে নিচের কান চেপে ধরল ওদের চিৎকার শুনে। তারপর শান্ত গলায় উত্তর দিল,
—— “হ্যাঁ, সত্যি। বিয়েটা হয়েই গেছে।”
মেহরিন তো অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল,
—— “কীভাবে হলো বলতো? সবটা খুলে বল। রায়হান ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলো কেমন করে মানে কিভাবে কি? আমার তো কিছু মাথায় ঢুকছেনা। ”
মেহরাব অধীর হয়ে উঠল,
—— “আর ওই রিয়াদ? ওর ভাইয়ের সাথে তো বাগদান ঠিক ছিল। ভাঙল কিভাবে? কিভাবে কি হলো বল?কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না আমারও। ”
রিয়াদের নাম উচ্চারণ হতেই নাফিসার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখেমুখে ভীষণ অস্বস্তির ছাপ।
মেহরিন ওর পরিবর্তনটা বুঝে নরম গলায় বলল,
—— “কি হলো রে? তোর মুখটা এমন হলো কেন? ওই রিয়াদ বেয়াদবটা নিশ্চয় আবার কিছু করেছে, তাই না?”
মেহরাব দাঁত চেপে রাগী গলায় বলল,
—— “হ্যাঁ, সব খুলে বল। ওই বেয়াদবটা কী করেছে?”
নাফিসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল,
—— “বাদ দে, এসব নিয়ে আর কথা বাড়াতে চাই না।”
মেহরাব এবার ধমক দিয়ে বলল,
—— “না, তুই চুপ করতে পারবি না। সবটা শুনব আমরা। যা হয়েছে খোলাখুলি বল।”
অবশেষে নাফিসা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
—— “আচ্ছা বলব, কিন্তু এখন না। আগে ক্লাসে চল, অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরে সব বলব।”
ক্লাস শেষে তিনজন আবার একসাথে বটগাছের নিচে সান বাঁধানো জায়গায় বসলো। এখানেই সাধারণত তাদের আড্ডা জমে। নাফিসা ধীরে ধীরে সব ঘটনা খুলে বলল—রুহি আপুর বিয়ের কথা, রিয়াদের বাজে আচরণ, আর তার জন্য কত কিছুর মুখোমুখি হতে হয়েছে।
সবটা শোনার পর মেহরিন আর মেহরাব যেন রাগে ফেটে পড়ল। চোখ লাল হয়ে গেছে দু’জনেরই। মনে হচ্ছে যদি রিয়াদ এখন সামনে থাকত তবে কাঁচা চিবিয়ে খেত দু’জনে মিলে।
ওদের এভাবে উত্তেজিত দেখে নাফিসা হঠাৎ হাসতে শুরু করল। নিজের মন খারাপের মধ্যেও ওদের রাগী চেহারা দেখে না হেসে থাকতে পারল না।
ক্লাস শেষে কলেজ ফাঁকা হতে শুরু করল। মেহরাব আর মেহরিনের গাড়ি এসে দাঁড়াল গেটে। নাফিসাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেহরাব অবাক হয়ে বলল,
—— “এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ড্রাইভার কাকা আসেনি নাকি তোকে নিতে?”
মেহরিন দ্রুত যোগ করল,
—— “চল না, আমরা ড্রপ করে দিচ্ছি।”
নাফিসা একটু অস্বস্তি নিয়ে হেসে বলল,
—— “না না, দরকার নেই। মতিন কাকা আসবে কিছুক্ষণ পরেই। আমাকে আগে থেকেই বলে গেছে, আজ একটু লেট হবে।”
ওদের কাছ থেকে গোপন করে গেল, যে আসলে সায়মান ওকে নিতে আসবে।
কারণ ———মেহরাব আর মেহরিন যদিও ওর বেস্ট ফ্রেন্ড, তবুও সায়মানের ব্যাপারে ও এখনো কাউকে কিছু বলেনি। বলবেই বা কিভাবে? যে মানুষটা এখনো তাকে নিজের বউ হিসেবে স্বীকার করেনি, ভালোবাসে কি না সে-ও বোঝা যায় না, শুধু দায়বদ্ধতা থেকে তাকে বাড়িতে জায়গা দিয়েছে, পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছে——তার সম্পর্কে কি বলবে ওদের?
সব ভাবনা গোপন রেখেই নাফিসা হাসিমুখে ওদের বিদায় জানাল।
মেহরিন আর মেহরাব একে একে গাড়িতে উঠে চলে গেল।
নাফিসা , অপেক্ষা করতে … থাকলো সায়মানের জন্য।
অনেকক্ষণ ধরে কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশ ফাঁকা হয়ে গেছে, মেহরাব আর মেহরিনও অনেকক্ষণ আগে চলে গেছে। সব ছাত্রছাত্রীরাও যার যার পথে চলে গেছে। একমাত্র সে-ই এখনো দাঁড়িয়ে আছে, আর ভেতরে ভেতরে বেজায় বিরক্ত হচ্ছে সায়মানের উপর।
—— “এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, লোকটার কোন নামগন্ধ নেই। নিতে আসবে বলে গেল, অথচ আসছে না। আল্লাহ জানে মাথায় কি রহস্য লুকিয়ে রাখে।”
মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকাল নাফিসা।
সায়ফান নাফিসার কলেজের সামনে এসে ব্রেক কষলো… কানে তখনো ফোন, ওপাশে সায়মানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসছে—
—— “ওকে নিয়ে আমার অফিসের সামনে চলে আসিস। আমার একটু কাজ পড়ে গেছে , তাই নিজে আসতে পারলাম না তুই ওকে নিয়েই এখানে আসবি ।”
সাইফান অবাক হয়ে বলল,
—— “ভাইয়া, হঠাৎ ছোটুকে তোমার অফিসে কেন নিয়ে যাব? রোজ তো মতিন কাকাই ওকে পৌঁছে দেয়। তুমি আবার হঠাৎ কোথায় নিয়ে যাবে ওকে ?”
—— “তোকে এত প্রশ্ন করতে বলিনি। আমি আম্মুকে বলে দিয়েছি, আজ পিচ্চি পুতুল বাসায় ফিরবে না। ওকে নিয়ে গ্রামে যাব ওদের।”
ও আচ্ছা বলার পর সাইফান আবার বলে উঠল,
—— “আচ্ছা ভাইয়া ? তুমি ছোটুকে পিচ্চি পুতুল বলো কেন…………?”
কথা শেষ করার আগেই সাইফান হঠাৎ কেমন ঝড়ে আক্রান্ত হলো। চোখ বড় বড় করে চিৎকার করে উঠল—
—— “এই দাঁড়া! বলছি কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস ছোটুকে! কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?”
ওপাশে সায়মান প্রথমে থমকে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা, তারপর রাগে কণ্ঠ ফেটে বেরোল—
—— “সাইফান! কি হয়েছে? চিৎকার দিচ্ছিস কেন? স্পষ্ট করে বল। কি হয়েছে?”
সায়ফানে চিৎকার শুনা যাচ্ছে শুধু…. কোনো উওর না পেয়ে ফোনের ওপাশ থেকে সায়মানের গলা আরেকটু ভারী, আরো উত্তেজিত হয়ে উঠছে।
—— “কি হয়েছে বলবি তো? ড্যাম ইট..!”
সাইফান রাগ, অন্যদিকে আতঙ্ক কণ্ঠস্বর নিয়ে চিৎকার শোনা যাচ্ছে শুধু
—— “এই দাঁড়া! বলছি কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস ছটুকে!
তখন নাফিসা দাঁড়িয়ে কলেজগেটের পাশে একা একা অপেক্ষা করছে। চারপাশে প্রায় ফাঁকা, শুধু দু’একটা দোকানপাট তখনো খোলা। ও ভাবছে—
“এই লোকটা আসবে কি আসবে না…? এক ঘণ্টা হয়ে গেল দাঁড়িয়ে আছি!”
হঠাৎ সামনে এসে ব্রেক কষলো একটা কালো গাড়ি। শব্দে চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল নাফিসা। প্রথম মুহূর্তে মনে হলো——— সায়মান! গাড়ির রংও তো কালো। কিন্তু চোখ কুঁচকে ভালো করে দেখতেই কেমন যেন সন্দেহ জাগল।
—“না… এটা সায়মানের গাড়ি না।”
এরপরের সেকেন্ডেই ভেতর থেকে একে একে বের হলো তিন–চারজন লোক। সবার মুখ ঢাকা কালো মাস্কে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো পোশাক। কারো চোখও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না।
নাফিসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাদের একজন ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
———“আপনারা কে? কি চান?”
বাকিটা বলার আগেই হঠাৎ লোকটা পকেট থেকে ছোট্ট একটা কাপড় বের করে ওর নাকের কাছে চেপে ধরল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে নাফিসার শরীর ঢিলে হয়ে গেল। চোখ বুজে দুলে উঠল মাথা।
———“আল্লাহ…” ফিসফিস করে বলতেই ধপ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
তখনই বাকিরা মিলে নাফিসার হাত-পা ধরে দ্রুত গাড়ির দিকে টেনে নিতে লাগল।
ঠিক সেই সময়ে কলেজগেটের সামনেই এসে থামল সাইফানের গাড়ি। কানে তখনো ফোন, ওপাশে সায়মানের গলা গমগম করছে।
সাইফান গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়ল——— ক’জন লোক টেনে হিঁচড়ে নাফিসাকে কালো গাড়িতে তুলছে! সেজন্য সে চিল্লাতে থাকে……
———“এইইই দাঁড়া!”
চিৎকার করে দৌড় দিল সাইফান। বুকের ভেতর কেমন হাহাকার করে উঠল, চোখ লাল হয়ে গেল মুহূর্তেই।
কিন্তু সাইফান দৌড়ে পৌঁছানোর আগেই গাড়ির দরজা ধপ করে বন্ধ হলো। চালক এক ধাক্কায় এক্সিলারেটর চাপতেই গাড়ি ঝড়ের মতো ছুটে যতে লাগল।
সাইফান ছুটে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাপাতে লাগল। তার চোখের সামনে নাফিসাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল ওরা!
এদিকে ফোনের ওপাশে সায়মান ক্রমাগত চিৎকার করছে—
———“কি হয়েছে বলবি তো ইডিয়েট? এভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন? পিচ্চি পুতুলের কি হলো?”
সাইফান হাঁপাতে হাঁপাতে কোনরকমে ফোনটা কানে ধরল। গলা কেঁপে যাচ্ছে, আতঙ্কে বুক ফেটে যাচ্ছে যেন—
———“ভাইয়া… ছটু… ছটুকে…।”
———“কি ছটু ছটু করছিস? স্পষ্ট করে বল না..! পিচ্চি পুতুল ঠিক আছে তো?” সায়মানের কণ্ঠ ফেটে বেরোলো উত্তেজনায়।
সাইফান এবার চিৎকার করেই বলে উঠল—
———“ভাই… একটা কালো গাড়ি থেকে কয়জন লোক নেমে… ছটুকে তুলে নিয়ে গেলো!”
ওই কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যেন বজ্রাঘাত হলো সায়মানের মাথায়। অফিস রুমের ভেতর দাঁড়িয়েই জমে গেল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল এক মুহূর্তে। তারপরেই রক্তচক্ষু নিয়ে চিৎকার করে উঠল—
———“কি বললি তুই…! আমার পিচ্চি পুতুলকে নিয়ে গেছে!”
চোখ-মুখ মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। টেবিলের ওপর থাকা ফাইল আছড়ে ফেলল মেঝেতে। শ্বাস ভারি হয়ে যাচ্ছে, বুক ধকধক করছে রাগে। সায়মানের কানে “ছোটুকে নিয়ে যাচ্ছে” কথাটা বাড়ি খাচ্ছে ——— ওর ভেতর যেন আগুন জ্বলে গেল মনে হয়, চোখমুখ লাল হয়ে উঠল এক নিমিষে। বুকের ভেতর দম আটকে আসছে ।
চেয়ার ধাক্কা মেরে উঠে দাঁড়ালো। অফিসের ভেতর কর্মচারীরা ভয় পেয়ে সরে গেল। সায়মানের মুখটা তখন একেবারে ভয়ঙ্কর, চোখ দুটো লাল জ্বলে উঠছে যেন।
——— “কে সাহস করেছে আমার পিচ্চি পুতুলকে…. ? কে ওকে নিয়ে যাচ্ছে বল সাইফান! নাম বল! এখনই বল!”
কথার শেষে ফাইলের উপর রাখা কাঁচের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলল দেয়ালে। টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল।
——— “ওর গায়ে যদি কারো একটা আঙুলের ছোঁয়াও লাগে… আমি শপথ করে বলছি, তাকে পুতে ফেলব।”অফিসের সবাই ভয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়ে পড়ল।
———“সাইফান, আমার কথা মন দিয়ে শোন… এখনই গাড়িতে উঠ! ওই কালো গাড়িটাকে ফলো কর… থামাস না, হারাস না। আমি আসছি… এখনই!”
শেষ কথাটা বজ্রের মতো গর্জে উঠল।
সায়মান আর দেরি করল না। ফোন কেটে দিয়ে গাড়ির চাবি হাতে তুলে নিল। এক ঝটকায় চেয়ার উল্টে দরজার দিকে দৌড় দিল। চোখে আগুন, ঠোঁটে একটাই শপথজ তার বুকের ভেতর ঝড় বইছে। চোখে শুধু নাফিসার মুখ ভেসে উঠছে——
ওর পিছন পিছন রাজিব গিয়ে বসলো গাড়িতে সায়মান গাড়ি স্টার্ট দিল…স্পিডে চলতে থাকলো.. ফোনটা আবার বের করে সাইফানকে কল দিয়ে ফোনটা স্পীকারে রেখে দিল..
আর সাইফান এর লোকেশন অনুযায়ী গাড়ি সে দেখে নিয়ে যেতে লাগলো…….
অনেক আগেই বিকেল পেরিয়ে গেছে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে চারদিকে। টানা তিন ঘন্টা ধরে সাইফান কালো গাড়িটাকে ফলো করছে—গাড়ির ভেতর বুক ধুকপুক করছে, ঘাম ভিজিয়ে দিচ্ছে শার্ট। আর সেই গাড়ির লোকেশন ধরে পিছনেই ছুটছে সায়মানদের গাড়ি সাথে রাজীবও।
অবশেষে শহরের ভিড় ছেড়ে অনেকটা দূরে, নির্জন জনমানবশূন্য এক পোড়া বাড়ির সামনে এসে থামল কালো গাড়িটা। অন্ধকারে চারপাশে কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক আর ভুতুড়ে নীরবতা।
সাইফান কিছুটা দূরে দাঁড় করাল নিজের গাড়ি। বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, তবুও ভেবে দেখল—একা এগোলে উল্টো ফেঁসে যাবে, ওখান থেকে নাফিসাকে একা উদ্ধার করা অসম্ভব। দাঁতে দাঁত চেপে আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে দেখছে—ওই কালো পোশাকের লোকগুলো অজ্ঞান নাফিসাকে টেনে নামাচ্ছে গাড়ি থেকে।
সময় গড়াতে লাগল। মিনিটগুলো যেন বছর মনে হচ্ছে। প্রায় চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর দূর থেকে হেডলাইটের আলো ভেসে এলো। সায়মানদের গাড়ি। সাইফানের বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরোল।
গাড়ি থামতেই সায়মান এক ঝটকায় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো। হাঁফাতে হাঁফাতে সোজা সাইফানের দিকে দৌড় দিল। পিছনেই ছুটে আসছে রাজীব।
সায়মানের মুখের চেহারা দেখে সাইফান মুহূর্তেই থমকে গেল— চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, রাগে আর দুশ্চিন্তায় রক্তচক্ষু হয়ে উঠেছে। চুলগুলো এলোমেলো, যেন বারবার হাত চালিয়েছে টেনশনে। কপাল ভিজে আছে ঘামে, মুখ শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে। ঠোঁট ফেটে গেছে শুষ্কতায়। মনে হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে।
সায়মান সাইফানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই গর্জে উঠল—
—— “Where the f**k is she?”
কণ্ঠটা কাঁপছে রাগে আর আতঙ্কে, যেন বুকের ভেতর থেকে বিস্ফোরণ হচ্ছে। চোখেমুখে কেবল একটাই ছবি ভাসছে—ওর পিচ্চি পুতুল ।
সাইফান পোড়া বাড়িটা দেখিয়ে দিল তারাতাড়ি,,ভাইকে এইরকম পাগলের মত করতে দেখে অবাক হয়ে গেছে ।
সায়মান পোড়া বাড়ির দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল। হাত ঢুকিয়ে অগোচরে নিজের চুলগুলো খামচে ধরে রাজীবকে ডাক দিল।
রাজিব তখন দ্রুত সরে এসে দাঁড়ালো—“জি, স্যার।”
“তাড়াতাড়ি। সবাকে রেডি হতে বল ———আমরা এখনই ভিতরে ঢুকব। কেউ পিছিয়ে পড়বে না, কাউকে ছাড়ব না।”
রাজিব নীরবে মাথা নাড়ালো। তখনই সবাই মিলেমিশে, নিঃশব্দে এবং দ্রুত—পুরো বাড়িটা ঘিরে নিল। পুরনো দেয়াল, নীচু দোয়ান আর খাঁখাঁ করে ঝরা জানালাগুলো তাদের আবহাওয়াকে আরও ভয়ানক করে তুলছে। সাইফানও তাদের সাথে রয়েছে, চোখে ভরা একটা অদম্য কী যেন।
অন্যদিকে, ঘরের ভিতরে নাফিসা ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরতে লাগল। কেঁপে উঠা শরীর—চোখ ধীরে খোলা লাগল। মাথা ঝিমঝিম করছে, বেদনায় বুকটা পিটপিট করছে। চারপাশ ঘোরানো—দেয়াল, ছায়া, আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মানুষগুলো। মনের মধ্যে ধীরে ধীরে তখনকার মর্মান্তিক ঘটনার ঝলক মাথায় আসতে —— আতঙ্কে ভরে গেল সমস্ত মুখ।
নাফিসা মাথা চেপে ধরে দেওয়ালের খাঁজ ধরল, দাঁড়াতেই চেষ্টা করল। সামনে থাকা একজন ধমনিষ্ঠভঙ্গি করে এগিয়ে এলো— নাফিসার সামনে চোখ পড়তেই থমকে গেল। পুরনো মুখ, পরিচিত কণ্ঠ——— কামরুল হাসোন। ওর ঠোঁটে এক দেউলিয়া হাসি, চোখে কুৎসিত কুক্ষিগত জিজ्ञাসা।
কামরুল ধীরে ধীরে নাফিসার কাছে এসে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো নাফিসার গোটা শরীরটা দেখল পা থেকে মাথা——একটির পর একটি——জঘন্যভাবে, নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে। নাফিসার গায়ে কাঁটা উঠল সেই দৃষ্টিতে গা গুলিয়ে উঠলো ।
কামরুলের মুখে হাসি পড়ল———শব্দগুলো বের করল যেন দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত রাখা টুকরা কোনো কুৎসিত রসিকতা।
“আরে, সোনামণি… তুমি এখানে আমিতো ভাবতেও পারিনি জেল থেকে ফিরে সবার আগে তোমার কিডন্যাপের সুপারিশ পাব ——এক ঢিলে তো দুই পাখি মেরে দিলাম, না কি?”
বলেই আরো কাছে এসে, ওরদিকে খানিক ঝুঁকে এলো… নিজের দাড়িতে হাত দিয়ে চুলকিয়ে কুৎসিত দৃষ্টিতে…
আরে তুমি তো পুরাই রসগোল্লা হয়ে গেছো মামনি… তোমাকে এভাবে পাব ভাবতেই পারিনি।
কোথায় ছিলে এতদিন সোনাপাখি … ঐদিন ওই শুয়ো****বাচ্চা** যদি না আসতো তাহলে আজ তুমি আমার বউ হতে। তবে সমস্যা নেই তুমি এখনো কচিই আছো,, দেখেই বোঝা আগের থেকে আরও বেশি মজা পাবো।
নাফিসার গা কুঁচকল; মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওর হাত আজন্ম কাঁপছে, গলা আটকে রইল। কামরুলের সেই জঘন্য তাক—তাকে ক্ষতবিক্ষত করছে , লজ্জা আর ভয়ের মিশ্র অনুভূতি ওর বুক জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। কাছেই থাকা অন্যরা হাসাহাসি করতে লাগল।
কামরুল নাফিসার দিকে আরো কাছে আসতে… বাইরে থেকে কিছু দপ করে একটা শব্দ হলো…
বাহির থেকে একটা শব্দ কানে আসতেই । কামরুল অবাকচকিত কণ্ঠে লোকদের ইশারা করল—বাহিরে বের হওয়ার জন্য। নিজেও পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
অদ্ভুত এক নীরবতা ঘরে নেমে এলো। নাফিসার হৃদয়ের ধুকধুক বাড়তে লাগল একা বদ্ধ ঘরে চুপচাপ বসে থাকলো।মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছে শুধু…
অন্যদিকে সায়মানদের দল ভিতরে ঢুকল। আস্তে আস্তে সবাই ভেঙে পড়ল— জানালার সামনে, কেউ দরজার দিকে—সবাই মিলেমিশে পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেলল।
প্রথমেই হয় সাধারণ ট্যালেন্টেড অ্যাকশন—একদল লোক আগ্রাসীভাবে চেপে ধরতে গেলে সাত আটটা রাউন্ড গুলির শংকধ্বনি শোনা গেল; গুলির আওয়াজে তালগোল পাকাতে লাগল নীরব রাত। কিছুক্ষণের মধ্যে প্যানিক ছড়াল, টুকরো টুকরো কাচপিছের শব্দ, কেউ করে করে পড়ে, কবরের মতো নিঃশব্দ ছড়াল চারপাশে। সায়মানরা এক—একভাবে ঢুকে পড়ে; প্রত্যেকেই যা-তা দেখে গ্রেপ্তার করতে লাগল। কেউ একজনকে ধরল, কেউ কারোর পা ভেঙে দিল—কঠোর, নির্ভয়ার মতো চলল বাঁধভাঙা পাল্টা আক্রমণ।
সেই ভগ্নপ্রায় আন্দোলনের মধ্যে সায়মানের চোখ আটকে গেল কামরুলের উপরে। প্রথমে অবাক হলো ———কিন্তু অচিরেই অবাকিই রূপ নিল রাগে।
“তুই ? তুই এখানে কি করছিস তুই ছাড়া পেলি কবে…. আর কথার পরেই থোড়াই ওকে ঘুষি মেরেই দিল। কামরুল ঠোঁট থেকে লাল রক্ত ফেলল———কিন্তু সায়মান থামছে না।
নাফিসার কথা মনে হতে আবার তার গলায় বেরিয়ে এলো – “আমার পিচ্চি পুতুল কোথায়? আমার পিচ্চি পুতুলের সাথে তুই কী করেছিস? আমার বউয়ের গায়ে হাত দিয়েছিস তুই…!” কথাগুলো বলে সে লাগাতার কামরুলের মুখে আঘাত চালায়, বারবার, অক্ষমতা আর ক্ষোভ মিশে থাকা আঘাত—মুখে ক্রমেই রক্ত বেরোতে লাগল।
সাইফান কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে গেল । সায়মানের মুখ থেকে ‘বউ’ শব্দটা শুনে সে কণ্ঠে অবাক হয়ে উঠল ——— কী বলে? ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলো এক দৃষ্টিতে, “ভাই… বউ? নাফিসাকে নিজের বউ বলছে কেন ভাইয়া কি পাগল হয়ে গেল নাকি ?”
কামরুল, রীতিমত কাঁপতে কাঁপতে হেরে গেলে, কন্ঠ খোঁচা দিয়ে বলল, “স্যার, আমার কোনো দোষ নেই ——— আমায় সুপারিশ দিয়েছিল… কিডন্যাপের সুপারিশ। আমি… আমি কেবল কাজটা করেছি—আমি জানতাম না… নাফিসা—হয়তো আমি ভেবে ছিলাম———” কথা গললো না, কণ্ঠে ভয়ে কাঁটা।
সায়মান আর একটু এগিয়ে গেল; তার চোখে আগুন, গলায় কণ্ঠ ভেঙে উঠল—
“Who the f**k sent you? Who told you to touch her? Say her name—say it!” (“তোকে কে পাঠিয়েছে রে? কে তোকে বলেছে ওকে ছুঁতে? নামটা বল—বল নামটা!”)
“স্যার… এহসান করিম———এহসান করিম ” কামরুল ভয়ে ভয়ে বলল , উনি আমাকে সুপারিশ দিয়েছিল —— কথার শেষ হওয়ার আগেই এক ঘুষি মেরে দিল সায়মান , কামরুলের মুখে রক্ত ছুটল।
আমি জানতাম ওই ফাকিং*** বাস্টার্ড*** কিছু একটা করবে। চুপ করে বসে থাকবে না বলে সায়মান জোরে চেঁচিয়ে… রাজিব
রাজিব দৌড়ে আসলো ——— জি স্যার।
—“এই বাস্টার্ডকে বেঁধে ফেলো। বাকি সবাইকে অ্যারেস্ট করো, এখনই।
ওকে স্যার রাজিব উত্তর দিয়ে সাথে সাথে,, তার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে আসা পুলিশ অফিসাররাও ঘরে ঢুকতে লাগল; থানা থেকে পাঠানো কঠোর-চেহারা অফিসাররা মুহূর্তে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলেন। তারা একে একে অভিযুক্তদের ধরে নিয়ে গেল———প্রত্যেককে আলাদা আলাদা গাড়িতে তুলল। নীরবতা আর অচেতনতা ছড়াল ঘরের কোণে কোণে।
ভিতরের এখন শুধু সাইফান, রাজীব আর সায়মান। চারদিকে তোলপাড় অবস্থা। সায়মান পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে, চোখ লালচে, শ্বাস ভারী— যেন বুকের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। নাফিসাকে না দেখে তার রাগ, ভয় আর অস্থিরতা একসাথে গলা পর্যন্ত উঠে এসেছে।
সাইফান ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর মনে হলো— ভাইয়ের চোখে অস্বাভাবিক কিছু আছে। হঠাৎ ঘুরে রাজীবের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ যে রাজীব গলা শুকিয়ে ফেলল।
চোখ ছোট ছোট করে সাইফান বলল,
—“কেসটা কি বল তো, রাজীব ভাই ? ভাইয়ের সাথে তো তুমি সব সময় চিপকে থাকো । তুমি নিশ্চয়ই জানো, ভাই নাফিসাকে কেন ‘বউ’ বলছে? সব খুলে বল—এখনই।”
রাজীব ঢোক গিলল। ভেতরে ভয় আর দ্বিধা। সে যদি সত্যিটা বলে, সায়মান তাকে গিলে খাবে, না বললে সাইফান তাকে ছাড়বে না। তাই দাঁত কেলিয়ে একটা অগোছালো হাসি দিল।
—“না, না সায়ফান, তুমি ভুল শুনেছো। এ রকম কিছু না।”
কিন্তু সাইফান চুপ করে থাকার মানুষ না। আরও চোখ ছোট করে বলল,
—“আমাকে ভূগোল বুঝাতে এসো না। আমি একদম ঠিক শুনেছি। তাই ভালোই ভালোই সত্যিটা বল।”
রাজীব এবার বুঝল— আর পালানোর উপায় নেই। ঘাড় নিচু করে আবারও একটা ঢোক গিলে বলল,
—“ঠিক আছে, বলতেই হবে তাহলে…”
ওদিকে, নাফিসা অন্ধকার ঘরের কোণে দেয়াল ধরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের কোলাহল, চিৎকার আর কথাবার্তা তার কানে আসছে। ভয়ে বুক ধুকপুক করছে। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ হলো। নাফিসা চমকে উঠল। মনে হলো আবার বুঝি কামরুল চলে এসেছে!
কিন্তু না—কিছু মুহূর্ত পরেই ভিতরে ঢুকল সায়মান।
সায়মানকে দেখেই নাফিসার বুকের ভেতর একটা শান্তি নেমে এলো। ঠোঁটে চাপা একটা হাসি ফুটল। কিন্তু সেই প্রশান্তি বেশিক্ষণ টিকল না। রাগে-ফুঁসতে থাকা সায়মান ঝড়ের মতো এগিয়ে এসে হঠাৎ তার গলা চেপে ধরে দেয়ালের সাথে ঠেসে দিল।
নাফিসার চোখ বিস্ফারিত। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে।
সায়মান গর্জে উঠল—
—“শুধু তোকে বিপদে পড়তে হবে কেন, হ্যাঁ? আমার থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলিস? ওই ভাবনা বাদ দে। আমার কাছ থেকে পালাতে পারবি না। অনেক সময় দিয়েছি তোকে, আর না। একবার যখন আমার নামটা নিজের কপালে লিখেছিস, তখন মৃত্যু পর্যন্ত সেটা মুছতে দিবো না… বুঝেছিস?!”
ওর হাতের চাপে নাফিসা শ্বাস নিতে পারছে না। চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। শরীর কাঁপতে লাগল। সেই দৃশ্য দেখে সায়মানের হুঁশ ফিরল। মুহূর্তের মধ্যে হাত সরিয়ে নিল ও।
নাফিসা এক ঝটকায় মুক্ত হয়ে হাঁফিয়ে হাঁফিয়ে শ্বাস নিতে লাগল। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখে অশ্রু চিকচিক করছে।
ওকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখে সায়মানের বুক মোচড় খেল। সাথে সাথে দুই হাতে ওর গাল আগলে নিল। কণ্ঠটা হঠাৎই নরম হয়ে গেল—
—“পিচ্চি পুতুল… কষ্ট হচ্ছে? সরি, সরি… আমার বউ, আমার ছোট্ট বউ। রাগের মাথায় এমন করে ফেলেছি। জোরে জোরে শ্বাস নাও, দেখো ঠিক হয়ে যাবে।”
নাফিসা হাঁপাচ্ছে, তবু অবাক দৃষ্টিতে সায়মানের দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ সায়মান কোনো পূর্বাভাস না দিয়েই নিজের অধর নাফিসার অধরে মিলিয়ে দিল। এত তীব্র, এত জোরালো চুম্বন—নাফিসা প্রতিক্রিয়া করার সুযোগই পেল না। সায়মান যেন উন্মত্তের মতো তাকে নিজের দখলে নিতে লাগল।
এদিকে বাইরে রাজীব অবশেষে সব খুলে বলছিল। সাইফান মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছে
না——— ভাই চার বছর আগেই নাফিসাকে বিয়ে করেছে! যাকে সবাই ভাবে সায়মানের ছোট বোনের মত… সে আসলে তার ভাইয়ের বৌ!
এই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই ভিতর থেকে সায়মানের চিৎকার ভেসে এলো। মুহূর্তেই সাইফান আর রাজীব দৌড়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ঘরে ঢুকেই দৃশ্য দেখে সাইফানের চোখ গোল হয়ে গেল—মনে হলো চোখ উপড়ে পড়বে। রাজীব ও একই অবস্থা। স্যার কে এভাবে দেখে হা হয়ে গেছে। রাজিব নিজের চোখে হাত চাপা দিল,তারপর হাতের আঙুল উকি দিয়ে সাইফানের দিকে তাকালো,, ওকে হা করে সামনের দৃশ্য গিলতে দেখে রাজিব নিজের আর এক হাত দিয়ে সাইফনের চোখ ঢেকে দিল।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩০
সায়ফান বিরক্ত হলো তার সামনে দেখা চমৎকার দৃশ্যে ব্যাঘাত ঘটানোর ফলে। এই রাজিব ভাই তোমার হাত সরাও… বলছি…. আমার চোখের উপর থেকে আমার দেখার অধিকার আছে আমার ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের রোমান্স…….
সামনে সায়মান পুরোপুরি নাফিসার ঠোঁটে রাজত্ব করছে। উন্মত্ত, বেপরোয়া,তার কোনো হুশ নেই।
